একসময় বাংলায় মহিলা/মেয়ে রহস্যভেদীর সংখ্যা যে কতটা কম ছিল, তা সুধীজন জানেন। শিশু-কিশোর সাহিত্যকে নারীবর্জিত রাখার বিচিত্র প্রয়াসে ঘর-সংসারের আসল মালকিনদের ব্রাত্য করে রাখার এই কিম্ভূত স্ট্র্যাটেজি যে আমাদের লেখাকে দীর্ঘদিন ধরে ঘোর অবাস্তব করে রেখেছিল— সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। সেই পটভূমিতেই আজ থেকে সাড়ে সাত বছরেরও বেশি আগে প্রকাশিত হয়েছিল এই হৃষ্টপুষ্ট, সুমুদ্রিত, অলয় ঘোষাল এবং সত্যজিৎ রায়ের (নলিনী দাশের গল্পে) অলংকরণে সমৃদ্ধ বইটি।
নানা ঝামেলায় প্রায় গিঁট-পড়া মগজকে আগের অবস্থায় নিয়ে আসার আশায় বইটা পড়ে ফেলা গেল। কেমন লাগল?
এই বইয়ের সেরা লেখা রয়েছে বইয়ের শুরুতেই, যেখানে অত্যন্ত সংক্ষেপে মহিলা গোয়েন্দাদের ইতিহাস তুলে ধরেছেন সম্পাদক। তারপর এসেছে এই বইয়ে সংকলিত গল্পদের লেখক ও তাঁদের সৃষ্টি সম্বন্ধে দু-চার কথা। এর পর এসেছে নিম্নলিখিত গল্পরা~
১. সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের 'বিন্দিপিসির গোয়েন্দাগিরি': মিস মার্পলের 'দ্য কম্প্যানিয়ন' কাহিনিটির বঙ্গীকরণ;
২. সুকুমার সেনের 'ইন্দুমতীর সঙ্কট': কালিদাসকে কেন্দ্রে রেখে লেখা একটি বুদ্ধিদীপ্ত কাহিনি;
৩. গজেন্দ্রকুমার মিত্রের 'হিরের টুকরো': মূলত সামাজিক গল্প— যাতে একটি খুন এবং প্রতিশোধের ব্যাপার আছে;
৪. আশাপূর্ণা দেবীর 'গল্পই কী অল্প': আতস কাচ হাতে খুঁজলে হয়তো এতে রহস্য পাওয়া যাবে; কিন্তু কিংবদন্তি সাহিত্যিকের কাছে ক্ষমা চেয়েই বলি, লেখাটা আদ্যন্ত বাজে বকায় পরিপূর্ণ।
৫. অজিতকৃষ্ণ বসুর 'ডিটেকটিভ নন্দিনী সোম ও দানুমামা': এইসব বৈঠকি গল্প এখন পড়াও বেশ কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
৬. নলিনী দাশের 'সিমলার মামলা': গোয়েন্দা গন্ডালুর একটি অ্যাডভেঞ্চার— যা নস্ট্যালজিয়ার টানেই পড়া চলে।
৭. মঞ্জিল সেনের 'সেভেন পার্লস': ডাকাবুকো কটি মেয়ের উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসের চমৎকার নিদর্শন।
৮. পবিত্র সরকারের 'বাচ্চাটা এত কাঁদছিল কেন?': এই বইয়ের একমাত্র শিশু রহস্যভেদীর কাহিনি।
৯. নবনীতা দেবসেনের 'বিষহরির প্রসাদ': গত শতাব্দীতে এইরকম জড়িয়ে-মড়িয়ে রহস্যকাহিনি লেখার বোধহয় চল ছিল। কিন্তু এখন এই লেখাগুলো পড়তে গেলে অনাবশ্যক চরিত্র আর অবান্তর কথার ভিড়ে সব ঘেঁটে যায়।
১০. শিবানী রায়চৌধুরীর 'উত্তরাধিকারী': টানটান, কম্প্যাক্ট গল্প।
১১. হীরেন চট্টোপাধ্যায়ের 'বুনো হাঁসের খোঁজে': এ-ও বেশ টানটান, কিশোরপাঠ্য গল্প।
১২. তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'গার্গীর এ.বি.সি.ডি রহস্য': কী বিশাল, আর আলুনি লেখা!
১৩. সুচিত্রা ভট্টাচার্যর 'মারণ বাতাস': এই সংকলনের প্রথম সিরিয়াস, মনস্তত্ত্ব-প্রধান ও প্রাপ্তমনস্ক লেখা। মিতিনকে নিয়ে লেখা এই 'বড়োদের' গল্পটিই আমার মতে তাঁর সেরা আখ্যান।
১৪. স্বাতী ভট্টাচার্যর 'আর.ডি.এক্স রহস্য': এ-ও বেশ টানটান, কিশোরপাঠ্য লেখা।
১৫. রাজেশ বসুর 'দিয়ালা যখন গোয়েন্দা': শিশুপাঠ্য লেখা।
১৬. হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তর 'রেনেট মুলারের পোর্ট্রেট': টিনা ও কিটির তৃতীয় রহস্যভেদের এই কাহিনিটি নিতান্ত সহজ হলেও পড়তে বেশ লাগল।
১৭. আশিস কর্মকারের 'গিফট হ্যাম্পার': এ-ও বেশ দ্রুতপাঠ্য ও কিশোরোপযোগী কাহিনি।
১৮. রমেন গাঙ্গুলীর 'যথার্থ কাজের মেয়ে': মিস মার্পলের 'দ্য কেস অফ দ্য পারফেক্ট মেইড'-এর অনুবাদ— তবে বড়োই শুকনো আর নীরস।
সব মিলিয়ে পড়ার মতো বেশ কিছু লেখা আছে এই বইয়ে। তবে গত শতাব্দীর হ্যাং-ওভারে জর্জরিত অন্যান্য লেখার চাপে সেগুলোর দম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, এটাই দুঃখের। সম্পাদক স্রেফ এই সময়ের লেখকদের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নতুন গল্প লিখতে দিলে সংকলনটার মান আরও ভালো হত বলেই আমার বিশ্বাস। (হয়তো) আজকের পাঠক ও সময়কে বুঝেই নতুন যুগের মিস মার্পল, কিনসে মিলহোন, জেসি ফ্লেচার থেকে রেনে মন্টোয়াদের পরিবেশন করতে পারতেন তাঁরা।