ভালোবেসেছিল তারা। তবুও রুমি কখনো রাতুলের মতো সাধারণ মাপের শিল্পীর সঙ্গে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেনি। শুধুই কি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নাকি রুমির জীবনে আছে কোনো গূঢ় সত্য? বিয়ে, বিচ্ছেদ, অন্য পুরুষের হাতছানি! তবুও কেন আজও রাতুলের চওড়া বুকে মাখামাখি সেই মাটির গন্ধ ভুলতে পারে না রুমি?
লেখকের কথায়, ‘সংসারে বহু মানুষ পাশাপাশি বাস করে। তারা কাছে আসে, দূরে সরে যায়। উপন্যাস লেখার সময়েও সম্পর্কের এই ভাঙাগড়া, হৃদয়সংঘাতের অনুরণনের এমন অনুচ্চকিত কিছু সুখ-দুঃখের কথাই মনে পড়ে আমার। রাজনীতি, রাষ্ট্রবিপ্লব কিংবা দুর্নীতির মতন জ্বলন্ত সমস্যা নয় তারা। তবু সাধারণ মানুষের জীবন বদলে দেয় এইসব সম্পর্কের টানাপোড়েন।’
‘তবুও জীবন জ্বলে’ তেমনই কিছু সমকালীন এবং সাধারণ মানব-মানবীকে ঘিরে গড়ে ওঠা কাহিনি, যেখানে লেখকের দুরন্ত মুনশিয়ানায় বিধৃত হয়েছে প্রেম-অপ্রেম, আশা-আকাঙ্ক্ষা, হার এবং জয়। সবমিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক আটপৌরে অথচ অনন্য উপন্যাস।
তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
মফস্বলের হাওয়া খেলে বইয়ের পাতায়। ঘুলঘুলি জুড়ে আড়মোড়া ভাঙ্গে পায়রার দল। কার্নিশ আগলে, শুকনো শাড়ির প্রহরা। জগৎপুরে, প্রতিমার মুখে অব্যক্ত প্রেমের আদল। মাটিতে কান পাতলে, শোনা যায় ঢাকের হর্ষোল্লাস। পরিত্যক্ত কুঠিবাড়ি ও সচল ট্রেন-লাইন পেরিয়ে অপেক্ষমান শহর কলকাতা। ক্ষমাহীন শহরে, কষ্টেরা কুচকাওয়াজ করে অবিরত। কাটাছেঁড়ায় ভোগে দুটো মানুষ। রক্তক্ষরণে সিক্ত, তাদের অপ্রেমের সমীকরণ। তবুও জীবন জ্বলে। বিরামহীন।
বলিহারি লেখককে। অলৌকিক, রহস্য, কল্পবিজ্ঞান, হাস্যরস, স্পেকুলেটিভ্ ফিকশন- আর কত? আবার সামাজিক উপন্যাস লিখে মন-টন খারাপ না করে দিলেই চলছিল না?
যা হওয়ার, তাই হলো। ক্লিন বোল্ড, সপাটে আরো একবার। একটু জমিয়ে আঁটোসাঁটো হয়ে খেলবো, সেই উপায় নেই। লেখকের গদ্য যেন ইংল্যান্ডের মেঘলা আকাশে চনমনে সুইং। খেলা কঠিন। স্রেফ হেলমেট বাঁচিয়ে উইকেট সমর্পণ। সাথে একরাশ মুগ্ধতায় মাথা উঁচিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাওয়া। মন জানে, এমন বোলারের হাতে উইকেট খোয়ানো যায়। এতে আদতে কোনো গ্লানি নেই।
পত্র ভারতীর কাছে ঋণী, উপন্যাসটিকে এত পরিপাটি করে পরিবেশনা করায়। সুবিনয় দাসের অমন সুন্দর প্রচ্ছদখানি, লেখকের গদ্যের সমানুপাতে বইটির মূল্য বৃদ্ধি করেছে। এরম একটি বই সংগ্রহে রাখতে মন চায়। স্রেফ, আক্ষেপ হয়, আরো কটা পাতা কেনো লিখলেন না লেখক? মানছি, অল্প কথায় অনেক কথা বলা আদতে সহজ নয়। তবুও, দুজন মানব-মানবীর সংকুলিত প্রেম, বিরহ ও জীবনযাত্রার প্রতি আরো কয়েকশো শব্দ, কি বাড়তি কটা পৃষ্ঠা ব্যায় করাই যেত।
ওপেন এন্ডিং নিয়ে অভিযোগ নেই। তবে পাঠক হিসেবে এত যত্নে সাজানো পৃথিবীটা থেকে কতকটা অকালেই বেরিয়ে আসতে হলো, এটাই আক্ষেপ। খামতি কিছু থেকে থাকলে, ওই পরিধিটুকুই যা। নইলে, প্রায় স্যালি রুনী রচিত 'নরমাল পিপল' জাতীয় একটি উপন্যাসের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম যেন। যা হয়তো বা কালজয়ী নয়। তবে, অনেক বেশি চেনা। অনেক বেশি ছোঁয়াচে। এই গল্পে দুটো মানুষ, দিনের পর দিন, ঠোক্কর খায় মোড়ের বাঁকে। কোন এক মহাজাগতিক ষড়যন্ত্রে, বারংবার মিলে যায় রুমি ও রাতুলের সুর। কেটে যাওয়া তালে, শীতের বিকেলে। না চাইতেও, হাত ঠেকে অপর হাতের পিঠে।
মন বলে, ভালোবাসায় আদতেই কোনো স্বস্তি নেই। মন জানে, এটাই ধ্রুব সত্য। তবুও, থেকে যেতে হয়। তবুও...
বই - তবুও জীবন জ্বলে লেখক - সৈকত মুখোপাধ্যায় প্রকাশক - পত্রভারতী মুদ্রিত মূল্য - 250/-
◻️"প্রকৃতির বুকে মানুষের মনখারাপের ছাপ পড়েনা। আকাশ আকাশের মতন থাকে, বাতাস বাতাসের মতন বয়ে যায়।"
◻️ভালোবেসেছিল তারা। তবুও রুমি কখনো রাতুলের মতো সাধারণ মাপের শিল্পীর সঙ্গে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেনি। শুধুই কি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নাকি রুমির জীবনে আছে কোনো গূঢ় সত্য? বিয়ে, বিচ্ছেদ, অন্য পুরুষের হাতছানি! তবুও কেন আজও রাতুলের চওড়া বুকে মাখামাখি সেই মাটির গন্ধ ভুলতে পারে না রুমি?
◻️আমি হচ্ছি সৈকত মুখোপাধ্যায় স্যারের একনিষ্ঠ পাঠিকা-উনি যা লিখবেন আজ না হোক কাল আমাকে সেটা পড়তেই হবে। তবে ওনার যেসব অসাধারণ লেখা আমার পছন্দের প্রথম দিকে থাকে, তার মধ্যে এতদিন পর্যন্ত সামাজিক উপন্যাস ছিল না; এবার থেকে থাকবে। তাহলে "তবুও জীবন জ্বলে" কি শুধুই সামাজিক উপন্যাস? নাহ্। মানুষ, পরিবেশ, গল্পের ক্ষেত্রে আমি ঠিক যেমন 'সাধারণ হয়েও অসাধারণ' ভাবটা খুঁজি, এই উপন্যাসটি যথাযথ সেরকমই - "আটপৌরে অথচ অনন্য"।
◻️ পৃথিবীর নানা ধরনের মানুষের মধ্যে এক ধরনের হলো যারা কাউকে ভালোবাসার আগে সবদিক ভেবে দেখে।অনেকটাই লাভ-ক্ষতির হিসাবের মতন - ঠিক উপন্যাসের রুমি যেমন। আবার এমন কিছু মানুষ আছে যারা বর্তমান, ভবিষ্যৎ আগে পিছে কিছুই বিচার না করে শুধু মন চায় তাই ভালোবাসে - ঠিক যেমন রাতুল। এমনই দুই ভিন্ন মেরুর মানুষ কেমন করে যেন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তার পরিণতি কী? সেটা জানতে চেয়ে উপন্যাসটি ঠিক একদিনে পড়ে ফেলার মনে হচ্ছে এ আমি কি পড়লাম!! এখনো আমার ঘোর কাটেনি। অদ্ভূতভাবে রুমির প্রথমদিকের শীতল মনোভাবের মধ্যে পুরো নিজের স্বভাব খুঁজে পেলাম। আবার উল্টোদিকে মূর্তি গড়ার কারিগর, প্রেমিক পুরুষ রাতুলকে তৈরি করেছেন খুব যত্ন করে। এমন প্রেমের কাছেই তো মানুষ নতজানু হতে পারে বারবার, ফিরতে পারে অবলীলায়।
◻️লেখক শব্দে বুনেছেন কল্পনা আর ভাষায় বুনেছেন বাস্তব। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নিবিড় , নিঁখুত প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ এবং তার স্পষ্ট-সুন্দর বর্ণনা। মানুষের সাথে আশেপাশের পরিবেশ মিশে গেছে, যেমন - "সে চায় রুমি একটু দূর থেকে তাকে আবৃত করে থাকুক - যেভাবে হেমন্তের সন্ধ্যায় নিড়িয়ে-নেওয়া ধানখেতকে আবৃত করে রাখে সাঁজালের নীল ধোঁয়ার আস্তরণ" বা এই কার্তিক মাসের সন্ধ্যেতেও 'বসন্তের ফাঁদে' আটকে যাই।
◻️মানুষের জীবন গতানুগতিক হিসেব নিকেষে যে চলে না, সেটা অনেক সময় আমরা ভুলে যাই।জীবনকে জ্বালিয়ে রাখতে মানুষকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। তবুও শত দুঃখ কষ্ট, লাঞ্ছনা, অপমান, ভেঙে যাওয়া ভালোবাসা, স্বার্থপরতার মধ্যে দিয়েও জীবন এগিয়ে চলে, জ্বলতে থাকে। লেখক মানুষের মনের বিভিন্ন স্তরগুলো নিয়ে খেলা করেছেন, ৩-৪ পাতা হলেও কল্যাণ চরিত্রের মাধ্যমে কঠিন বাস্তববাদী কথা বলিয়েছেন। শ্রদ্ধেয় লেখক, আপনার লেখনীর এই ধরনের আরো জাদু দেখার অপেক্ষায় থাকবো।
🎋সদ্য পড়ে শেষ করলাম সাহিত্যিক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখা “তবুও জীবন জ্বলে” উপন্যাসটি। লেখকের লেখা বেশ কয়েকটি বই আগেও পড়েছি। “মাই ডিয়ার মিকি/অর্কিড রহস্য ” আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। লেখকের লেখনীশৈলী নিয়ে কোনো কথা হবে না, ভীষণ ভালোলাগে আমার। পুরো উপন্যাস জুড়ে লেখক প্রত্যেকটি চরিত্রকে সুনিপুণ হাতে বিশ্লেষণ করেছেন। আমার ভীষন ভালো লেগেছে। এই উপন্যাস সম্পর্কের টানা পড়েনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলে....
🌿~উপন্যাস সম্পর্কে আলোচনা~🌿
🎋এই উপন্যাসটি সংক্ষিপ্ত আকারে 'এই সময়' পত্রিকার উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। বই আকারে পূর্ণাঙ্গ রূপে প্রথম প্রকাশ পায় আগস্ট ২০২৩!
🎋এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রে ‘পারমিতা’ ওরফে রুমি। রুমির জীবন আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো না, সে ছোটবেলাতেই মা কে হারায়। রুমির বাবা একজন মেন্টালি পেসেন্ট। ছোট থেকেই রুমি পড়াশোনায় ভীষন ভালো।
🎋 রুমির জীবনের প্রথম প্রেম ‘রাতুল’। রাতুল একজন শিল্পী। রাতুল তার বাবার সঙ্গে মূর্তি-গড়ার কাজ করে, মূর্তি-গড়ার কাজটা সে ভালোই পারে। রাতুল ভাস্কর হতে চায়। প্রতিমা নয়, ও চায় ভাস্কর্য সৃষ্টি করতে.... রুমি যেহেতু পড়াশোনায় ভীষন ভালো তাই সে নিজের উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা শহরে চলে আসে, সেই সম্পর্কের ইতি টেনে। ভর্তি হয় যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে।
🎋এর পর বেশ ভালো কাটছিল, এমন সময় রুমির জীবনে প্রবেশ করলো দ্বিতীয় পুরুষ ‘অনুপম’। রুমি যেন ঠিক অনুপমের মতো একটা মানুষকে খুঁজছিলো এতোদিন ধরে। খুব তাড়াতাড়ি রুমি আর অনুপমের বিয়ে ও হয়ে যায়। বিয়ের পর রুমি চেয়েছিলো আরো পড়তে, কিন্তু অনুপম সেটা আর হতে দেয়নি। এর পর আসে তাদের সন্তান ‘বাবাই'। বাবাইয়ের জন্মের ঠিক পরই ডিভোর্স নিয়ে চলে আসে রুমি। কি কারণে রুমির সাথে অনুপমের বিচ্ছেদ হলো? অনুপম পুরুষ মানুষ হিসেবে কেমন ছিলো?
🎋 রুমির সন্তান ‘বাবাই' জন্ম থেকেই একটু অস্বাভাবিক। সেই সন্তানকে একা হাতে মানুষ করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠে। ঠিক এমন সময় তার জীবনে আসে তৃতীয় পুরুষ ‘দীপেশ’। দীপেশ একজন নারীলোভী পুরুষ, চটজলদি সে রুমিকে বিছানায় নিয়ে যেতে চায়। রুমি কি রাজি হবে?
🎋একটা সময় রুমির মনে হয়, তাকে আবারও ঠকতে হলো অপর একজন পুরুষের কাছে। প্রথম জীবনে প্রেম সে যে বড়োই নিঃস্বার্থ ছিল। সেই প্রেমকে কি রুমি ভুলতে পেরেছিলো? শেষ পর্যন্ত রুমির জীবনে কি অপেক্ষা করে আছে জানতে হলে অবশ্যই উপন্যাসটি পড়তে হবে.......
জীবনের অনিশ্চয়তার মাঝেও যেভাবে আশার আলো জ্বলে থাকে, সেটাই এই কাহিনির মূল সুর। বাস্তবতার কঠিন সত্য তুলে ধরলেও বইটি শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনে এক গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো উপন্যাস।