মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনের মহত্তম ঘটনা, চরম বেদনা ও পরম বীরত্বে মণ্ডিত যে অভিজ্ঞতা শহরে ও গ্রামে অযুত মানুষের জীবনে তােলপাড় জাগিয়েছিল কতােই না ভিন্নভাবে। কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের বহুব্যাপ্ত বাস্তবতার প্রতিফলন কোনাে সহজসাধ্য কাজ নয়, এক্ষেত্রে সার্থকতার উদাহরণও তাই বিশেষ বিরল। তেমনি বিরল কতক শৈল্পিক সাফল্যের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে রশীদ হায়দারের উপন্যাস ‘খাঁচায়’। নগরীর জীবনে আটকে-পড়া মধ্যবিত্ত বলয়ে মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাত অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তােলা হয়েছে উপন্যাসটিতে।
রশীদ হায়দার ১৯৪১ সালের ১৫ জুলাই পাবনার দোহারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তখনকার জনপ্রিয় সিনে ম্যাগাজিন চিত্রালীতে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে চিত্রালীর পাশাপাশি তিনি পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড এর মুখপত্র পরিক্রম পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এক সময় চিত্রালীর কাজ ছেড়ে গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দেন ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমিতে চাকরি নেন রশীদ হায়দার। ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে অবসরে যান। পরে নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা একাডেমিতে থাকাকালে রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষের স্মৃতিচারণা নিয়ে গ্রন্থ ‘স্মৃতি : ১৯৭১’, যাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘দালিলিক গ্রন্থ’ হিসেবে বিবেচনা করেন সমালোচকরা। ১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় রশীদ হায়দারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নানকুর বোধি’। ১৯৭২ সালে দৈনিক সংবাদে ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেন নিজের প্রথম উপন্যাস ‘গন্তব্যে’। গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭০ এর বেশি। রশীদ হায়দার মঞ্চে অভিনয়ও করেছেন। ১৯৬৪ সালে মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় তিনি অভিনয় করেন ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নাটকের ‘কিংকর’ চরিত্রে।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য সরকার ২০১৪ সালে রশীদ হায়দারকে একুশে পদকে ভূষিত করে। তার আগে ১৯৮৪ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য খুব সমৃদ্ধ একথা বলা যায় না। মানসম্মত লেখার অভাব আছে, যুক্তির বদলে আবেগকে প্রাধান্য দেওয়ার সমস্যা আছে। আরেকটা সমস্যা প্রকট। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভালো লেখা যা-ও আছে সেগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছায় না। পাঠক বইয়ের খোঁজ পেলেও দেখা যায় সেই বই প্রিন্ট আউট! গতবছর মঈনুল আহসান সাবেরের "কবেজ লেঠেল" পড়ে মনে হয়েছিলো এ বইটা সবার পড়া উচিত। যুদ্ধ ও এর পরবর্তী তমসাচ্ছন্ন সময়কে উপন্যাসের ক্ষুদ্র পরিসরে লেখক জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন "কবেজ লেঠেল" এ। আফসোস বইটার কথা সিংহভাগ পাঠক জানেই না। এ বছর পড়লাম রশীদ হায়দারের "খাঁচায়।" ১৯৭৫ এ প্রকাশিত এ উপন্যাস নিঃসন্দেহে ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রাখে। উপন্যাসের সময়কাল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথমার্ধ; কুশীলব হিসেবে আছেন ধানমণ্ডির মিরপুর রোডের কিছু বাসিন্দা। সবার মনে উদ্বেগ ও ক্ষীণ আশা, ইন্দিরা গান্ধী কি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেবেন? বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবেন? কাঙ্ক্ষিত সেই ঘোষণা এলো। শুরু হোলো আকাশপথে যুদ্ধ। কেউ জানে না পরবর্তী দিনের ভোর দেখার সৌভাগ্য হবে কি না। একদিকে সরাসরি যুদ্ধ দেখার উত্তেজনা, আরেকদিকে হেরে যাওয়ার ভয়। ঢাকা ও এর বাসিন্দাদের মনে সার্বক্ষণিক সংশয়, যুদ্ধে জেতার আশা, অন্যদিকে চাপা ভয়, হানাদারদের বোমার আঘাতে মৃত্যুর আশংকা - এ এক বিচিত্র ত্রিশঙ্কু অবস্থা। প্রতি পদে বদলে যাচ্ছে পরিবেশ, আশা পরিণত হচ্ছে আশঙ্কায় আবার আশঙ্কা পরিণত হচ্ছে আশায়। ঢাকা থেকে পালানোর উপায়ও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আনন্দে চিৎকার দেওয়ার সময়ও সাবধান থাকতে হচ্ছে যাতে সেই শব্দ পাকিস্তানি বা বিহারিদের কান পর্যন্ত না পৌঁছায়। রশীদ হায়দার যেভাবে অবরুদ্ধ ঢাকার শেষ সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর চিত্র তুলে ধরেছেন তা আজ অবধি কোনো বইতে পাইনি আমি। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হতে যাচ্ছে তা-ও ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন লেখক। "খাঁচায়" অবশ্যপাঠ্য এক বই; মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে ন্যূনতম আগ্রহ আছে এমন সবারই বইটা পড়া উচিত। অনেক নতুন কিছু জানার আছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত সুন্দর একটি উপন্যাস 'খাঁচায়'। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথমদিকের কিছু ঘটনা প্রবাহ নিয়ে এই উপন্যাস। গৃহবন্দী এক পরিবারের আশা, হতাশা, উদ্বেগ এবং বিজয় আসছে এই সুখের সন্ধানে যে আবেগ সবকিছুরই প্রকাশ ঘটেছে এই বইতে। ঔপন্যাসিক রশীদ হায়দার রচিত এই উপন্যাসটি আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচিত সাহিত্যের অন্যতম একটি সংযোজন। কোনে জটিলতা নেই, সুন্দর এবং ছিমছাম লেখা। সহজেই পাঠককে ধরে রাখবে বইয়ের পাতায়। ঘটনার মূলে মুক্তিযুদ্ধ হলেও আদপে বইটির প্রধান চরিত্রগুলো মুক্তিযোদ্ধা নয়। যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় অথচ এই গৃহবন্দী মানুষগুলো যেন যুদ্ধেরই অংশ। শঙ্কা নিয়ে দিন কাটাতে থাকলেও মনের মধ্যে জেগে আছে স্বাধীনতার স্বাদ নেওয়ার অদম্য আগ্রহ।
বর্তমানে 'খাঁচায়' এবং 'অন্ধ কথামালা' নামে দুইটি উপন্যাস একসাথে পাওয়া যায়। বইয়ের নাম ''খাঁচায় অন্ধ কথামালা''।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ঢাকা শহরে অবরুদ্ধ এক পরিবারের মানসিক অবস্থাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে গল্পের স্তম্ভ। পুরো বইয়ের মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে স্বাধীনতা লাভ পূর্বের শেষ কয়েকদিনের টাইমলাইনে। যদিও ঢাকার বাইরের বেশিরভাগ অঞ্চল স্বাধীন হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু ঢাকা সবসময়ই রিস্কে ছিল। এয়ারফাইট এর পর স্ট্রিট ফাইটের প্ল্যান ছিল পাকিস্তানি আর্মির। কিন্তু, ভারত যখন আল্টিমেটাম দিল যে আত্মসমর্পণ না করলে ঢাকায় অল আউট অ্যাটাক হবে সেগুলো ঢাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষের কাছে কেমন রুদ্ধশ্বাসের ছিল বইটা বুঝতে অনেক সহযোগিতা করেছে। আমি জানতাম না যে, ঢাকায় বসবাসকারী রা ১৬ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত ও দ্বিধায় ছিলেন স্বাধীনতা আসবে কিনা নাকি অকালে প্রাণ হারাতে হবে তাদের।
জাফরদের রেডিও তে ভিন্ন দেশের ভিন্ন প্রোপাগাণ্ডার নিউজে বিভ্রান্তি, পাকিস্তানের সাথে ভারতীয়দের সাথে প্লেন অ্যাটাক দেখে স্বস্তি লাভ, অফিসে বাঙালী-অবাঙালীদের যুদ্ধের অবস্থাভেদে উল্লাস, ইন্দিরা গান্ধী কিংবা ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের জন্য অপেক্ষা সব যেন সাধারণ পরিবারের সামগ্রিক মনস্তত্ত্বকে ফুটিয়ে তুলেছে অসাধারণভাবে।
রশীদ হায়দারের লেখনী অত্যন্ত সাবলীল, একটানা পড়ে যাবার মতন। সুন্দর বই!
মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে ভারত যোগ দিলে গতিপথ বদলে যায় যুদ্ধের। উৎকন্ঠায় কাটানো সেসময়কার প্রতিটি দিন সযত্নে ফুটিয়েছেন রশিদ হায়দার। দেখা যায় নিয়মিতই নানান রেডিওর খবর ঘুরেফিরে শুনে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা চলছে। ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা মনে আনন্দ দেয় কিন্তু পরিপূর্ণ ভরসা জাগাতে পারেনা। স্বাধীনতা পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়েও যে শংকার ছবি দেখিয়েছেন তা আমাদের বিমোহিত করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। তার উপর মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলোতে আবেগের ছড়াছড়ি। খুব কম উপন্যাসেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানুষের প্রকৃত অবস্থার আঁচ পাওয়া যায়। সেদিক দিয়ে ব্যতিক্রম একটি উপন্যাস 'খাঁচায়'। ঢাকা শহর যুদ্ধের সময় ছিল খাঁচাস্বরূপ। সেই খাঁচায় আটকে ছটফট করেছে বাঙালিরা। সেই ছটফটানিকেই উপজীব্য করে উপন্যাসটির অবতারণা করেছেন রশীদ হায়দার।
গোলটেবিল বৈঠক বানচাল করে দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু করে দেয়। প্রাথমিক হত্যাযজ্ঞের প্রধান টার্গেট ছিল ঢাকা ও তার আশেপাশের এলাকাগুলো। যুদ্ধের শুরুতেই যে যেভাবে পেরেছিল ঢাকা ছেড়েছে। আবার অনেকেই রয়ে গিয়েছিল অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার আশায়। সেপ্টেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত খিলগাঁয়ের বাসায় চাকুরীজীবী জাফর তার স্ত্রী লিলি ও মেয়ে শর্মিষ্ঠাকে নিয়েই থাকতো। ছোট ভাই আবিদ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে জুলাইতে। কিন্তু সে ভিড়ে গিয়েছে মুক্তিবাহিনীর দলে। আবিদ, লুৎফর, ফেরদৌস'রা ভারত থেকে আনা কাগজে লিফলেট ছাপায় জাফরের বাসায়। পরীক্ষায় যেন কেউ অংশ না নেয় সেই সাবধানবাণী হিসেবে লিফলেটগুলো দেওয়া হবে ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থীদের বাসায়। বাসার কাছেই আনসার অফিস। খুব গোপনে কাজ করলেও একদিন লালমুখো কর্নেল ইকবাল পাশের বাসার এক মেয়েকে তুলে নিলে লিলির মনেও ভীতির সঞ্চার হয়। তখন খিলগাঁয়ের বাসা ছেড়ে তারা উঠে আসে ধানমন্ডির মিরপুর রোডে লিলির বড় বোনের বাড়িতে। খিলগাঁয়ের নির্জন বাসার চাইতে এখানেই বেশি ভালো। এখানে পুরো বাড়ি ভর্তি মানুষ। ওপরতলায় থাকেন ইতিহাসের অধ্যাপক তাহের সাহেব ও তার পরিবার; নিচতলা ও দোতলায় বড় বোনের পরিবার।
যুদ্ধের মাঝেও মানুষের আদিম রিপু থেমে থাকেনা। তাই বাড়ির কাজে��� লোক ও বুয়া বোম্বিং এর সময়েও নিজেদের জৈবিক চাহিদা পূরণে ব্যস্ত। তাদের মনে একটাই নিশ্চয়তা যে বোমার আঘাতে মারা যাওয়ার আগে মজা নিতে পারছে। অন্যদিকে নতুন বিয়ে করা মন্টু তার স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা বাসায় থাকতে চায় এবং সুযোগ পেলেই প্রেমে মত্ত হয়ে যায়। প্রেমিকের কাছে চিঠি লেখাও থেমে থাকেনা এই যুদ্ধের সময়ে। ইতিহাসের অধ্যাপক তাহের সাহেবের ধর্মে অবিশ্বাসী চরিত্রটাই এতদিন সবাই দেখে এসেছে। অথচ তার মাঝেও আল্লাহ ভীতি চলে আসে। নয় মাসেই কি কোনো জাতির চরিত্র পাল্টাতে পারে?
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাঙালিরা একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। কারণ সারা শহর জুড়ে তখন পাকিস্তানি আর্মি ও বিহারিদের রাজত্ব। অ-বাঙালিরা সুযোগ পেলেই বাঙালিদের হেনস্থা করতো। মার্চের পরপরই যে শরণার্থীরা ভারতে গিয়ে পৌঁছেছিল তারা অন্তত গুলি খেয়ে মরতে হবেনা এই নিশ্চয়তা পেয়েছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বিশেষ করে ঢাকার বাঙালিরা পরদিন সকালের সূর্য দেখবে কিনা সেই আশঙ্কা নিয়ে দীর্ঘ নয় মাসের দূর্বিষহ জীবন কাটিয়েছে। সকলেই আশা করছিল ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিবে। প্রতিদিন এই একটি খবরের আশায় রেডিওর সামনে বসে থাকতো তারা। পাকিস্তানি আর্মি ভারতে আক্রমণ শুরু করলে ভারতও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। শুরু হয় আকাশযুদ্ধ। ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে টার্গেট করে ভারতীয় মিগ বিমানগুলো হামলা চালাতো। তখনই বেজে উঠতো সাইরেন এবং মিগ বিমানকে ধাওয়া করতো পাকিস্তানি স্যাবর জেটগুলো। ঢাকার মানুষেরা ছাদে দাঁড়িয়ে এই আকাশযুদ্ধের সাক্ষী হয়। যখনই কোনো স্যাবর জেট বিধ্বস্ত হতো তখনই সকলের মাঝে আনন্দের ফোয়ারা বয়ে যেত। তবে পাকিস্তানি আর্মির বিমান বিধ্বস্তে একটু জোরে কথা বলে আনন্দ প্রকাশ করতেও পারেনি বাঙালিরা। কারণ অ-বাঙালিদের কানে গেলেই মৃত্যুর দূত এসে হাজির। ১৬ ডিসেম্বর সকালেও সবাই যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে অজ্ঞাত ছিল। বিকালে আত্মসমর্পণ হবে এই তথ্য সম্পর্কে সাধারণ জনগণের ধারণা ছিল না। সকলেই ভাবছিল পাকিস্তানি আর্মি যদি হেরে যায় তাহলে সারা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাবে। এই ভয়েই কাতর ছিল তারা।
একদিকে জীবনকে হাতের মুঠোয় রেখে বসে থাকা, অন্যদিকে মুক্তিবাহিনীর বীরত্বের সংবাদ ও ভারতের সাহায্য। আমরা উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধে ঢাকার মানুষদের প্রকৃত অবস্থার কথা জানতে পারি। উৎকন্ঠা ও হতাশা গ্রাস করেছিল তাদের। আরেকটি হতাশার কথা হলো এই উপন্যাসটি হারিয়ে যাওয়ার পথে। দীর্ঘদিন প্রিন্ট আউট থাকার পরেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছেনা। এভাবে যদি এত ভালো একটি উপন্যাস হারিয়ে যায়, তাহলে তার দায় আমাদেরই। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনীর এগিয়ে আসা উচিত। হ্যাপি রিডিং।
যুদ্ধ একটা দেশের সকলকে শারিরীকভাবে আক্রান্ত করে না। তবে অবশ্যই করে মানসিকভাবে। বেঁচে থেকে প্রতি মুহূর্ত মরে যাওয়া যে আসলে কী, তা নিশ্চয়ই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করা একজন মানুষ সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধাবস্থায় প্রতি পাঁচজনের একজন মারাত্মক মানসিক সমস্যায় ভোগেন। আবার দেখেন, যুদ্ধ শেষ হওয়া মানেই কিন্তু মানসিক যতনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অথচ চোখে দেখা যায় না বলে এই ক্ষতির আন্দাজ পাওয়া যায় না। আন্দাজ পাওয়া যায় না বলে গুরুত্বও দেওয়া হয় না। আর বাস্তবেই যেটার গুরুত্ব নেই, সাহিত্যে তা গৌণ হয়ে থাকলে অভিযোগের তেমন সুযোগও থাকে না বোধহয়। এক্ষেত্রে রশীদ হায়দারের আলোচ্য উপন্যাসটি এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। সম্মুখ যুদ্ধের বর্ণনা নেই। নেই রক্তপাত। নেই অন্য কোনো প্রকারের হুলুস্থুল। আছে শুধু আতঙ্ক নামক এক নীরব ঘাতক। খাঁচায় বন্দী আতঙ্কগ্রস্ত কিছু মানুষের মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার ভিন্ন রকমের আখ্যান এটা। ওয়ার লিটারেচারের চিরাচরিত অনেক ফর্মুলা ‘খাঁচায়’ না থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রদর্শনে কিন্তু উপন্যাসটি বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি! ‘খাঁচায়’ এখানেই অধিকাংশ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য থেকে আলাদা।
উপন্যাসটির ব্যাপারে জেনেছিলাম আহমাদ মোস্তফা কামালের কাছ থেকে। আর দুষ্প্রাপ্য বইটা উপহার পেয়েছি হারুন আহমেদের কাছ থেকে। দুজনকেই ধন্যবাদ।
নতুন মাসের শুরু... ডিসেম্বরে তখন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীন বাংলাদেশের সুবাতাসের হাওয়া বয়তে শুরু করেছে কিন্তু তখন অবরুদ্ধ রাজধানী ঢাকা শহর। ভারতীয় বাহিনীর লক্ষ্য ঢাকা শহরকে পাক বাহিনী থেকে মুক্ত করা। দুই পক্ষের আক্রমনাত্মক বিমান হামলায় ক্রমশ মৃত্যু সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে ঢাকাবাসীদের। গৃহবন্দীদের উৎকন্ঠায় দিনরাত্রীযাপন যেন মৃত্যু ঘরের দোয়ারে বসে আছে তাদের জন্য অপেক্ষা করেছে। জনসাধারন খাঁচায় বন্দী আর দিনকে দিন খাঁচার পরিধি ছোট হয়ে আসছে এগিয়ে আছে যমদূতেরা।
'ঘরে মৃত্যু, বাইরে মৃত্যু, শূন্যে মৃত্যু, সান্ধ্যআইন ও নিস্প্রদীপ অবস্থা।' বন্দিত্ব জিনিসটা আসলে যে কি- তা বুঝতে নিরাপদ আশ্রয়ে হোম কোয়ারান্টাইনে থাকা বিরক্ত বাঙালির এ বইটা পড়া খুবই জরুরী। এটি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ঢাকায় আটকে পড়া একটি পরিবারের খাঁচা দাবড়ে বেড়ানোর গল্প। প্রধান চরিত্র জাফর। সরকারি চাকুরে। একদিকে সুন্দরী স্ত্রী লিলির সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছুটছে, অন্যদিকে জীবনের মায়ায় প্রতিদিন অফিসে যেতে বাধ্য হচ্ছে। মিরপুরের যে বাসাটিতে তারা আপাতত আছে, সেখানে আত্মীয়স্বজন আর প্রতিবেশী মিলিয়ে আরও ক'জন থাকছে। সবাই বন্দী। শত্রু অভিন্ন হলেও, একেকজনের বন্দিত্ব একেকরকম। আতংকের অবসরে সময় কাটাতে তারা তাস খেলে, রেডিও শোনে। ইন্দো-পাকিস্তান রাজনীতি, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, যুদ্ধে উন্নত বিশ্বের অবস্থান - কোন কিছুই বাদ যায় না তাদের আলোচনা থেকে। এদিকে, জাফর অফিসে যায়। বাসায় ফিরে উদ্ভ্রান্তের মতো বিড়বিড় করে আর খাঁচায় বন্দী টিয়া পাখিটাকে খাবার দেয়। এভাবেই সবার দিন কাটছিলো। একদিন এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন এসে পৌঁছালো সেই বাসায়। বন্ধুভাবাপন্ন হাসি দিয়ে 'ভারতীয় কাফের'দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে তাদের সমর্থন ও একান্ত সহযোগিতা কামনা করলো। অতি বন্ধুবাৎসল্যতা দেখাতে গিয়ে সে এক সময় কোলে তুলে নেয় জাফরের পিচ্চি মেয়েটাকে। নাম জিজ্ঞেস করে। মেয়েটির নাম 'শর্মিষ্ঠা'। এখানেই তো বিপত্তি! বেশ ভালো বই। সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে সেরা কয়েকটার একটা। বইটি লেখা হয়েছে ১৯৭৩ এ। প্রথম প্রকাশিত ১৯৭৫। ঢাকার কোথায় এটি এখন পাওয়া যেতে পারে, সে ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই। কিনেছিলাম পুরান পল্টন মোড় ��েকে ১০ টাকা দিয়ে।