ক্রিকেট ঘিরে ‘বেটিং’ বা জুয়া খেলাটির মতোই পুরনো। কিন্তু, সেইসব জুয়াড়ি বা জুয়ার বুকিরা যখন খেলাটির কুশীলব অর্থাৎ, খেলোয়াড়, আম্পায়ার থেকে শুরু করে পিচ প্রস্তুতকারককে পর্যন্ত সবাইকে হাত করে পুরো খেলাটি অদৃশ্যে নিয়ন্ত্রণ করে –তখন তা প্রহসনে পরিণত হয়। তাই, আমরা মাঠে বা টিভির পর্দায় যে ম্যাচগুলো দেখি, তা অনেকাংশেই আসলে, একটা “লিখে দেওয়া” স্ক্রিপ্টের নাটক। শুধু ক্রিকেট জুয়ার ওপরে ভিত্তি করে, বাংলা ভাষায় সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত এই বইটির প্রথম খন্ড, দুই বাংলার বেশ কিছু পাঠকের সমাদর পেয়েছে। সেই সাহসে ভর রেখে দ্বিতীয় খন্ডের অবতারণা। টি- ২০ ক্রিকেট আজকের দিনে ক্রিকেট বিশ্বের মূল চালিকা শক্তি। প্রথম খন্ডে আইপিএল এবং বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ ছাড়া, প্রায় ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা ভারতে ও বিদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজী লীগগুলো নিয়ে প্রায় কিছুই আলোচনা হয়নি। দ্বিতীয় খন্ডে সেই অভাব পূর্ণ করা হয়েছে। তাছাড়া, প্রথম খন্ডে বর্ণিত জুয়ার খুঁটিনাটির তাত্ত্বিক আলোচনার পরে, এই খণ্ডে কিছু আসল ম্যাচে তার প্রয়োগ কিভাবে হয়েছে - তা তুলে ধরা হয়েছে । কিছু সাংবাদিকের অসম্পূর্ণ স্টিং অপারেশনের (অসম্পূর্ণ কারণ, আইসিসি’র সেইসব অপরাধের স্বীকৃতি দেয়নি- তাই সেগুলো অনালোচিত) তথ্যগুলো ব্যবহার করে – এই বইটি সম্ভাব্য অপরাধীদের খুঁজতে চেষ্টা করেছে বইয়ের দ্বিতীয় পর্বে। সেইসব সম্ভাব্য অপরাধে যুক্ত আছেন এমন সব শ্রদ্ধেয় ক্রিকেটার – যা পাঠককে বিস্মিত করবে। জুয়ার বাইরে বিভিন্ন অক্রিকেটিয় বিষয় – যেমন, ক্রিকেট প্রশাসনে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ও অন্তহীন দুর্নীতির ইতিহাস, ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নির্বাচনে পর্দার পিছনের নানা কাহিনী, ম্যাচ ফিক্সিং আটকাতে আইসিসি’র তদন্ত বিভাগ ‘আকু’র সীমাবদ্ধতা, কী কৌশলে ভারতের বুকে অবৈধ জুয়ার অনলাইন সাইটগুলো চলতে থাকে অনন্তকাল - এসব নিয়ে আলাদা করে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে কিছু বিতর্কিত চরিত্র এবং বিবাদিত অক্রিকেটিয় ঘটনাও জায়গা পেয়েছে, এই খন্ডে। এছাড়াও, একটি দীর্ঘ আলোচনায় ড্রাগস- আন্ডারওয়ার্ল্ড- ক্রিকেট জুয়া, ক্রিকেটের সাথে জড়িত এক অজানা ত্রিকোণের সাথে পরিচয় হবে। ক্রিকেট জুয়া আজকের দিনে সন্ত্রাসবাদী ফান্ডিং’র একটি বড় উৎস। এটিকে অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য সম্ভাব্য কি কি রাস্তা খোলা রয়েছে, আলোচনা আছে সেটি নিয়েও।
এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলে আছে আদ্দিকাল থেকে। থাক, এখন আর এর উত্তর জানতে চাইছি না।
আচ্ছা বলুন তো,
ক্রিকেট আগে না ক্রিকেট বেটিং আগে?
এর উত্তর দিতে গেলেও মনে হয় একটু জলঘোলা হবে। কেউ স্বীকারই করবে না আবার কেউ আগে পরে একটা উত্তর দেবেন আরকি।
যাই হোক, সৃষ্টিকর্তার সেরা সৃষ্টি হিসেবে মানুষের গুণের পাশাপাশি দোষের অভাব নেই বা বলা যায় রিপুর অভাব নেই। ষড়রিপুতে আক্রান্ত মানবজাতি কত কান্ড-ই না ঘটিয়ে ফেলেছে।
রিপুর এই খেল আছে ক্রীড়া জগতেও। এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান যেন ক্রিকেটের পোকা। ক্রিকেটকে স্বপ্নে লালন করি আমরা। ক্রিকেটীয় আবেগে কত কান্ড-ই না ঘটিয়ে ফেলি। তবে যাদের ভালোবেসে আমরা অদ্ভুত সব কাজ করি তাদের অনেকের আসল চেহারা যখন হয় তৃতীয় রিপুর ফাঁদ তখন কেমন লাগবে? ইতোমধ্যে আমরা তো ক্রিকেটে রিপুর খেল সম্পর্কে জানি। ম্যাচ পাতানো তথা ফিক্সিং, ক্রিকেট জুয়া, বুকি কান্ড তো সবই জানা। যেসব খেলোয়াড়দের আইকন মেনে ভক্তকুল পা গল থাকে সেসব আইডল খেলোয়াড়দের আসল চেহারা যখন সামনে আসে তখন বলতে হয়, ❛ɪꜱ ᴄʀɪᴄᴋᴇᴛ ʀᴇᴀʟʟʏ ᴀ ɢᴇɴᴛʟᴇᴍᴀɴ’ꜱ ɢᴀᴍᴇ?❜
ভদ্রলোকের এই খেলা কলুষিত হয়েছে বলা যায় ক্রিকেট শুরুর থেকেই (অবাক লাগতে পারে, পা গলের প্রলাপ বা ফিকশন মনে হতে পারে। কিন্তু কথা সত্য)। সেশন ফিক্সিং, ওভার ফিক্সিং সহ কত ঘটনা যে ঘটে তার ইয়াত্তা নেই। আমরা তো শুধু ক্রিকেটে এক দুই ম্যাচ ফিক্সিং হয় জানি, খেলোয়াড় টাকার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয় শুনেছি। তবে কখনো শুনেছেন একটা পুরো লীগ, পুরো দল, স্টেডিয়ামসহ সবকিছু ভুয়া? ফিক্সিং এমনও হয়? হ্যাঁ হয়! ঘটনা ঘটেছিল করোনার সময়ে। যেখানে মুখে মাস্ক পরে বিখ্যাত খেলোয়াড়দের নামধরে বিজাতীয় কেউ ম্যাচ খেলেছিল। ঘটনাটা ভারতের এক রাজ্যের। বিশ্বাস হয়? না হলেও ঘটনা সত্য। গুগলে উভা প্রিমিয়ার লীগ দিয়ে খোঁজ করলে সন্ধান পাবেন। তবে ক্ষমতাবানেরা যদি সে তথ্য সব গায়েব করে না থাকে তো!
সেই শুরুর দিকে থেকেই ক্রিকেটে লোলুপ দৃষ্টি আছে কিছু অর্থলোভী মানুষের। যারা অর্থের লোভ দিয়ে ভালো মানুষের এই খেলাকে একটা নাটকের চিত্রনাট্য বানিয়ে দিত। আর মাঠের কুশীলবরা সে অনুযায়ী অভিনয় করে যেত। প্রাচীনকালের ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কথাই ধরা যাক। বিভিন্ন খেলায় তাদের খেলাসুলভ কাজ ছাড়াও পর্দার আড়ালে চলতো রিপুর খেলা। কেউ ক্ষমতার দাপটে, কেউ অর্থের দাপটে, কেউ হিংসার ফলে কলুষিত করতো ক্রিকেটকে। এদের মধ্যে নাম আছে বড়ো এবং ভারী সব কিংবদন্তিদের। বর্তমান ক্রিকেটের সেরা দল হিসেবে ভারতের নাম লোকমুখে আসবেই। তবে যদি সেরা ক্রিকেট খেলুড়ে এই দেশের ক্রিকেটের অতীত ইতিহাস নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করা হয়, তবে এর কালো অধ্যায় দেখতে পাবেন। যা এখনো অব্যাহত। অতীত থেকে ক্রিকেটের অন্যতম মোড়ল এই দেশটির ক্রিকেট খেলার ইতিহাস জুড়ে আছে ক্ষমতা, টাকা, হিংসা, ইগো এবং নিয়ন্ত্রণ (লেখকের মতে তারাই একমাত্র দেশ যার ক্রিকেট বোর্ডের নামের সাথে ❛কন্ট্রোল❜ শব্দটি জড়িত। বিশ্বাস না হইলে নিজেই দেখেন!)। বলাই বাহুল্য এই সংস্কৃতি এখনো চালু। অবিভক্ত ভারতবর্ষ থেকেই ক্রিকেট একটু একটু করে উত্থান হতে হতে আজকের এই অবস্থায় এসেছে। এরমধ্যে বিশাল উপমহাদেশ তিন ভাগে ভাগ হয়েছে কিন্তু দাপট রয়েছে এক ভাগেই। একসময় অবিভক্ত এই উপমহাদেশের লোকেরা ধর্ম ব্যতিরেকে খেলতো। ধর্মের ভিত্তিতে ক্রিকেট দল হলেও এক ধর্মের দল জিতলে অন্যরাও আনন্দ করতো। কিন্তু সেখানেও সঙ্ঘাতের দানা তৈরি করে দিলো রাজনীতি। কেউ ক্রিকেটকে সাদা চামড়ার লোকেদের তৈরি খেলা হিসেবে ঘেন্না করতো আবার কেউ সে খেলা তাদের সাথে জিতে তাদের উপরে চ পে টা ঘাত হিসেবে মনে করতো। ক্রিকেট জু য়া বললে স্বাভাবিকভাবে যে দেশটির নাম মুখে আসে সেটি পাকিস্তান। তবে এর নিয়ন্ত্রণে যে দেশটি আছে তার নাম বলতে পারেন? ডি কোম্পানিকে চিনে না এমন লোক কম আছে। বর্তমান বা নিকট অতীতের ক্রিকেট জু য়ার ইতিহাসে তাদের অবদানের শেষ নেই। তবে তাদের হয়ে কাজ করা লোকের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা নেহায়েত কম নয় কিন্তু!
দর্শক যখন মাঠের খেলায় মত্ত তখন মাঠের বাইরে বা উপর থেকে কলকাঠি নেড়ে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়ায় মত্ত থাকে অনেক সুযোগ সন্ধানী। আর সাথে থাকেন বিবেক বিসর্জন দিয়ে দামী উপহারের কাছে বিকিয়ে দেয়া মাঠের কিছু খেলোয়াড়। একজন চেনা পরিচিত বুকির সাথে কেন বর্তমানের সেরা ব্যাটার বিরাট বা রোহিতকে দেখা যাবে? তার সাথে কী কথা? এর উত্তর তারাই জানেন বৈকি। লোকে বলে, দামী উপহার, গয়না, ব্র্যান্ডের জিনিসের কাছে নারী ঝুঁকে যায়। তবে দামী চেন, রোলেক্স ঘড়ি কিংবা দামী মোবাইলের কাছে পান্ডিয়ার মতো খেলোয়াড় ঝুঁকে গিয়েছিল কেন (এরকম আরো বহু জনপ্রিয় নাম আছে।)? দামী উপহার আর একটু বাড়তি সুবিধার কাছে অতীতের আপনার আমার অনেক প্রিয় খেলোয়াড়ও হার মেনেছিল। তৃতীয় রিপুকে আটকে রাখতে পারেনি তারা। সামলাতে পারেনি প্রথম রিপুকেও!
টাকা দিয়ে অপেশাদার, অযোগ্য লোককে দলে জায়গা করে দেয়া, আ ক্রোশ মেটাতে নিজের দলকে বিপদে ফেলে দেয়া অথবা একজন নবাব হয়ে ক্রিকেটের ন্যূনতম যোগ্যতা না রেখেও অধিনায়ক হয়ে বিদেশের মাটিতে দেশকে লজ্জাজনকভাবে হারিয়ে দেয়ার কীর্তিও আছে। অধিনায়কের সুনজরে থাকা, ব্যাক্তিগত লাভ এবং একাদশে জায়গা পেতে তেলমর্দন কিন্তু ক্রিকেটের কোহলি যুগেও চলে আসছে। সেটা কোহলি-রোহিত বিবাদ ইস্যুতে অনেকেই হয়তো জানি।
এই বিবাদ জেনারেশন বাই জেনারেশন চলছে। সেটা জগমোহন, অমরনাথ, ভিজি মহারাজা, মেলো, সৌরভ, গাভাস্কার, কপিল কিংবা আহজার যুগেও ছিল এখনো আছে।
ক্রিকেটের সেলিব্রেটি কিংবা যাদের আমরা কাপল গোল হিসেবে মানি তাদের বিয়ের বিশাল খরচের স্পন্সরের নাম দেখলে বা ইতিহাস জানলে তখন অবাক হতেই হয়! তাদের প্রেমটাও ঐ রাজনীতি কিংবা অন্ধকারের কোনো নাটক নয়তো?! এত অন্যায়ের মাঝে কি কেউ ছিল না প্রতিবাদের? অবশ্যই ছিল। সরফরাজ নেওয়াজ যে এই ফিক্সিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সোচ্চার ছিলেন অনেক সাংবাদিক। কিন্তু ক্ষমতার খেলায় সেসব ফাইল কার্পেটের তলায় আর প্রতিবাদকারীরা বেশিরভাগ ক বরে! বিসিসিআই, আকসু, আইসিসি এর হাজারো নিয়ম সত্ত্বেও এসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তারা আইন দিচ্ছে, প্রণয়ন করা দেখাচ্ছে এরপর কার্পেটের তলায়। যুগের পর যুগ এভাবেই আমাদের প্রিয় খেলা শুধু একটা গড়াপেটা স্ক্রিপ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আনন্দ পাওয়ার এই খেলায় আছে ক্রা ইম, করাপশন, আর সিনেমা! খেলোয়াড়দের মাথা খেয়ে দিতে রমণী দিয়ে বশ করা হতো। এই তালিকায় ইয়ান বোথামের থেকে শুরু করে ওয়েস্টইন্ডিজের সেরা কিছু খেলোয়াড়ের নামও আছে। আছে আজহারউদ্দিন এমনকি লর্ডসে ঘুরপাক জামা দাদাও!
এরকম অনেক অনেক রিপুর খেলা ছড়িয়ে আছে ভদ্রলোকের এই খেলায়। আলোক উজ্জ্বল গ্যালারিতে হাততালির মাঝেই কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হচ্ছে। কলুষিত হচ্ছে অনেক কিছু। প্রদীপের নিচেই আছে অন্ধকার।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
বিশাল লেখায় কী জ্ঞান বাটলাম অনেকেই না বুঝে লেখা এড়িয়ে চলে গেছেন। তাদের বিদায়। তবে যারা বা যে সময় নিয়ে এইটুক পড়লেন তাদের বলি। বিশাল লেখায় খেই হারিয়ে বলছিলাম একটা বইয়ের কাহিনি সংক্ষেপ। ওপার বাংলার লেখক সোমনাথ সেনগুপ্তের লেখা ক্রিকেটীয় কিন্তু ক্রিকেট নয় বিষয়ে লেখা বই ❝তৃতীয় রিপু❞। প্রথম খন্ড পড়���ছিলাম। তার রিভিউও করেছি। এবার এসেছি বইটির দ্বিতীয় খন্ড নিয়ে। প্রথম খন্ডে আমাদের তৃতীয় রিপু তথা লোভের সাথে ক্রিকেটের জানাজা কীভাবে হয় তার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। এবারের দ্বিতীয় খন্ডে লেখক লোভের পাশাপাশি বাকি রিপুর খেলকেও আলোকপাত করেছেন ক্রিকেটের জগতে। প্রথম খন্ডে প্রায় সব ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের মধ্যে হওয়া ফিক্সিং এবং বেটিংয়ের বিষয় এবং অপরাধী খেলোয়াড়দের কথা বলেছেন। যে ঘটনাগুলোর অনেক কিছুই জানা এবং বইটি সে ঘটনাগুলোর গভীর বিশ্লেষণ করেছে। এই খন্ডে লেখক কয়েকটি অধ্যায় এবং বিভিন্ন কেস স্টাডির মাধ্যমে ক্রিকেটের কালো অধ্যায়গুলো পাঠককে জানিয়েছেন। দ্বিতীয় খন্ডে মূলত প্রাধান্য পেয়েছে ক্রিকেটের শুরুর দিকের ইতিহাস এবং জু য়ার ঘটনা, ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস, তাদের ক্ষমতা এবং একপেশে করে নেয়া অনেক ম্যাচের বিবরণ। অনেকে ভাবতে পারেন এগুলো হয়তো মনগড়া কিংবা নিছক ❛সন্দেহ❜! তবে লেখকের দেয়া তথ্যসূত্র, লিংক, ছবি এবং সঠিক তথ্যের সোর্স সবকিছু পড়ার সময় নিজেও পরখ করে দেখার পর অবিশ্বাস করার উপায় থাকে না।
একে টানটান থ্রিলার বললে অত্যুক্তি হবে না মোটেও। এমন সব তথ্য, ঘটনা নিয়ে লেখক বইটি সাজিয়েছেন যা একজন ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে আপনার বিশ্বাসকে মুহুর্তের মধ্যে শত টুকরা করে দিবে। যেমনটা প্রথম খন্ড পড়ে আমার দশা হয়েছিল। তাই পরের খন্ডে মানসিক প্রস্তুতি ছিল। তবুও অতীত থেকে বর্তমানের এমন জ্বালা ধরা ঘটনাগুলো পড়ে নিতান্তই অবাক হচ্ছিলাম। কোথাও হয়তো ❛থ❜ হয়ে গেছিলাম। রিভিউতে সব উল্লেখ করার ইচ্ছা থাকলেও খেই হারিয়ে ফেলেছি। দর্শক পয়সা খরচ করে ক্ষমতাবান কিছু লোকের তৈরি করা নাটক দেখতে যায় ভাবলেই কেমন লাগে! যেখানে আমরা একটা ম্যাচের জয় পরাজয় নিয়ে জীবনবাজি রেখে ফেলি। সবই ওই তৃতীয় রিপুর খেল। ক্রিকেট সম্পর্কে আগ্রহ থাকায় এবং ক্রিকেটের ভেতরের এই মহামারী রোগের সম্পর্কে ধারনা থাকায় বইটা পড়তে আমার কাছে ভালো লেগেছে অবশ্যই। লেখকের এই স্পর্শকাতর বিষয়ে লেখার সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানাই। বই পড়া থাকায় এবং কীভাবে এই চক্র কাজ করে ধারনা থাকায় যখন বর্তমানে চলামন বিশ্বকাপের অনেক ঘটনা দেখি তখন আমার মনেও ঐ রিপুর কথাই বাজে। নিশ্চিত জেতা ম্যাচ হেরে গিয়ে বা উলটো ঘটনা ঘটিয়ে যখন সবাই অবাক হওয়ার রেশ কাটাতে পারে না তখন আমি চিন্তা করি এখানে কয় কোটি টাকার ব্যবসা হলো। শুধুই কাকতাল কিংবা আজকে খেলোয়াড় ভালো খেলেছে ছাড়াও যে অদৃশ্য নাটক হয়ে যায় সেটাকে এড়াতে পারি না।
প্রথম খন্ড আমার কাছে তুলনামূলক বেশি ভালো লেগেছে। কারণ হিসেবে বলা যায় সেখানে ঘটনাগুলো বেশ পরিচিত ছিল। এই খন্ড তুলনামূলক বেশি অবাক করে দিয়েছে, মুগ্ধ করে দিয়েছে তবুও ঘটনাগুলো একেবারেই অজানা ছিল বিধায় একটু একঘেঁয়ে লেগেছিল। আর এই বইয়ের মূল ফোকাস আমার কাছে ভারতীয় ক্রিকেট এবং এর অতীত ইতিহাস লেগেছে। কিছু জায়গায় শুধু কাঠখোট্টা বর্ণনা পড়ে একটু অসহ্য লাগছিল, কোথাও আবার চুম্বকের মতো টানছিল। আরো খন্ড আসবে না-কি জানি না তবে দুই খন্ডেই যা আছে সেসব হজম করতে বেগ পেতে হয়েছে। আমার ক্রিকেট খেলা দেখার মাঝে নানান চিন্তা আনার জন্য লেখককে ধন্যবাদ দিবো না দায়ী করবো জানা নেই!
সম্পাদনা এবং অন্যান্য:
দারুণ এবং রসমালাই গেলার মতো চটকদার তথ্যে ঠাসা বইটি পড়তে আমার প্রচুর সময় লেগেছে, প্রচণ্ড বিরক্ত লেগেছে, মেজাজ খারাপ হয়েছে এবং আমার পড়ার গতি শ্লথ হয়েছে। এর কারণ লেখকের লেখা নয় বরং বইটির আগাগোড়া প্রোডাকশন। আমার মনে হয়েছে বইটির unedited file-কেই বই আকারে ছাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বিন্দুমাত্র সম্পাদনা করা হয়নি। অসম্পূর্ণ বাক্য, ইনভার্টেড কমার অদ্ভুত শুরু এবং শেষ, বানান ভুল, অ্যালাইনমেন্ট থেকে শুরু করে অদ্ভুত ছোটো আকারের ফন্ট সবকিছুতে অভাবের ছাপ স্পষ্ট। ছুটে যাচ্ছে যাচ্ছে মানের বাঁধাই, বইয়ের ফ্ল্যাপে হালকা হয়ে যাওয়া লেখা, এবং পুরো বইয়ের সজ্জাতেই ছিল বিরক্তির চরম পর্যায়। অধ্যায় এবং বিভিন্ন কেস স্টাডি শুরুর সময় আসলে বোঝাই যাচ্ছিল না নতুন কোনো টপিক শুরু হয়েছে। অধ্যায়ের নাম একটু বড়ো করে দেয়া ছাড়া আর কিছু ছিল না। এক টপিক থেকে আরেক টপিকের শুরু হিসেবে একটু ফাঁকা দেয়া, লেখাকে একটু আন্ডারলাইন বা বোল্ড করে দিতে বড়োই কার্পণ্য করেছে প্রকাশনী। একেক জায়গায় বড়ো ছোটো ফন্ট, অর পুরো বই পড়তে চোখ পিতিরি পিতিরি করে রাখতে হয়েছে। কিছু জায়গায় মূল লেখার সাথে প্রকাশনীর নামের প্রিন্ট এক হয়ে গেছে। এত বিরক্ত শেষ কোন বই পড়ে হয়েছি মনে নেই। আমি জানি না ভারতীয় এডিশনের কী দশা। তবে বাংলাদেশী এডিশনে প্রকাশক মনে হয়েছে দায়সারা করলাম একটা বই বের, এই মনোভাবে ছিলেন। প্রোডাকশন তথা সম্পাদনা, বাঁধাইয়ের মান এসব নিয়ে যতো খারাপ বলি ততো কম মনে হবে। এত বাজে প্রোডাকশনের বইটি পড়ে শেষ করতে পেরেছি বলে প্রকাশনীর উচিত আমাকে উপহার দেয়া। অধৈর্যশীল কেউ হলে বইয়ের বিষয় যতোই মশলাদার হোক না কেন ছুঁড়ে ফেলত শুধুমাত্র বাজে প্রোডাকশনের জন্যে।
দুইদিন আগেই একটা দারুণ খেলায় যখন সবাই পোস্ট করছে আজকে ৪০০ হবে? বা ৫০০ই না হয়ে যায় তখন আমি ভাবছিলাম ৪০০ তে জু য়া বেশি। কিন্তু ৪০০ না হলে অন্যপক্ষের লাভ কিন্তু বিশাল! আমার ধারনার সাথে যখন মূল স্কোর মিলে যায় তখন এটাকে আমার গেসিং পাওয়ার বলবো না সাধারণ জু য়ার অংকের সঠিক হিসাব বলবো সেটা ভেবে পাই না। ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা উপরেই থেকে যাক। এতকিছুর পরেও ক্রিকেটকে ভালোবাসা যায় কি?
বছর চারেক আগে পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছিল। করোনা নামক এক ক্ষুদ্র অণুজীব যেন জিম্মি করে ফেলেছিল মানব সত্তাকে। জীবনের অস্তিত্ব প্রাণহীন হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবী হারিয়ে ফেলেছিল নিজস্ব ছন্দ। জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হয়েছিল, তেমনই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল দেশ-জাতি নির্বিশেষে তথা প্রতিটি মানুষ। খেলার সাথে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি যেন অলস জীবন পার করছিল। মাঠে খেলা নেই, কিছু করার নেই। অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে কী হবে? বেঁচে থাকার জন্য কিছু তো একটা করতে হবে।
খেলাধুলায় জুয়া খেলে আয় করা না সর্বস্ব খোয়ানো মানুষের অভাব নেই। খেলা বন্ধ থাকলে তাদের আয়, উপার্জনের একটা পথ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে বেটিং সাইট যেগুলো ছিল, করোনার সময়কালে তাদেরও ধাক্কা খেতে হয়। যে রমরমা ব্যাবসা ছিল, তা যেন মুখ থুবড়ে পড়ে। তারই ফলশ্রুতিতে না-কি কে জানে, করোনা পরবর্তী খেলা শুরু হতেই এক ভিন্ন লীগের আবির্ভাব হয়। শ্রীলঙ্কার এক রাজ্যের নামে সে লীগ, দেশটির বড়ো বড়ো খেলোয়াড় খেলবে কথা থাকলেও; শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট বোর্ড কিংবা খেলোয়াড় কেউ জানে না এই লিগটির সম্পর্কে। ইউটিউবে একটি চ্যানেল লাইভ দেখালেও কেউ কোনো খেলোয়াড়ের চেহারা পর্যন্ত দেখেনি। কেননা, করোনা পরবর্তী সময় বলে মাস্ক পরে খেলা চালিয়ে যায়। তবে যা জানা যায়, আইসিসির পূর্ণ সদস্য একটি দেশের বা খেলোয়াড়দের নাম ভাঙিয়ে যে খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়, তা হয়েছিল ভারতের কোনো একটি গ্রাম্য অঞ্চলে। ভাবা যায়! একটি পুরো লিগ ভুয়া, খেলোয়াড়রা ভুয়া— শুধু ইউটিউবে সম্প্রচার হয়েছিল বলে জুয়ার বাজারে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। এভাবেই ক্রিকেট তার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে, অর্থলোভী কিছু মানুষের কাছে।
অনেকেই মনে ���রেন, ক্রিকেটে ফিক্সিং একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কেননা, কালেভদ্রে দুয়েকটা ঘটনা আমাদের চোখের সামনে প্রকাশ পায়, তাকে বিচ্ছিন্ন না বলেও উপায় নেই। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এই ফিক্সিং কখনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে না। যারা একবার অর্থের সন্ধান পেয়েছেন তারা এক দুইটা ঘটনা ঘটিয়ে থেমে থাকবে, সেটা ভেবে নেওয়াই তো নির্বুদ্ধিতা! যেখানে জুয়ার বাজার বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, সেখানে স্বচ্ছতা থাকার সম্ভাব্যতা শূন্যের কোঠায়। তারপরও ক্রিকেপ্রেমীদের মনে বিশ্বাস জায়গা করে নেয়। ক্রিকেট এখনো স্বচ্ছ আছে! কিংবা ফিক্সিং হয় কখনো সখনো।
যখন বড়ো বড়ো কারবার হয়, তখন সাধারণ মানুষের জানার এখতিয়ার সবখানে থাকে না। ফিক্সিং বিষয়টা তেমনই। এখানে মাফিয়া জড়িয়ে পড়ে, জড়িয়ে পড়ে বড়ো বড়ো খেলোয়াড়। কিংবা সবচেয়ে বেশি হয়তো জড়িত থাকে এমন কিছু ব্যক্তিবর্গ, যাদের ক্রিকেটের আদর্শ মনে করা হয়। তারা ক্রিকেট বিক্রি করে দেয়, টাকার কাছে নিজেদের জিম্মি করে ফেলে। এই দুনিয়ায় যে সবার উপরে টাকাই সত্য, তাহার উপরে নাই।
এই উপমহাদেশে ক্রিকেটের আবির্ভাব ব্রিটিশদের হাত ধরে। তখন থেকেই ক্রিকেটটা খেলতে শুরু করে এই অঞ্চলের মানুষ। আজকের এই ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেট নিয়ে এত শোরগোল, তার সূত্রপাত তখন থেকেই। তখন অবশ্য ধর্ম ভেদে দল ভিন্ন হতো। হিন্দু, মুসলিম, পার্সি, ইংরেজ ইত্যাদি। এবং এই দলগত খেলা যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। উৎসবমুখর এক পরিবেশের সূচনা করে। ফলশ্রুতিতে শত্রুপক্ষেরও আনাগোনা হয়। যেখানে ভারতবর্ষের বোর্ড গঠনের পরও ঘরোয়া লীগ প্রাণ পায় না এমন এক টুর্নামেন্টের জন্য, সেখানে যে নানা প্রকারের ষড়যন্ত্র হবে সেটাই স্বাভাবিক। এমনকি ধর্মের বিভেদ নিয়ে নোংরা রাজনীতির মতো ঘটনা ঘটে। যেহেতু টুর্নামেন্টটির দল গঠন ধর্মের ভিত্তিতে হতো, তাই এই বিষয়টি সহজ ছিল। যদিও হিন্দু দলের সাথে, মুসলিম দল না অন্য দলের খেলোয়াড়দের সখ্যতাই ছিল বেশি। এমনকি দর্শকরা পর্যন্ত একসাথে উৎসব করত। তবে কি ধর্মের এই বিভেদ, হিন্দু মুসলিমের বর্তমান বিরূপ মনোভাব তৈরিতে সবচেয়ে বেশি দায়ী রাজনৈতিক নেতারা? কে জানে? সে অন্য আলাপ। তবে আজকের এই ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেট নিয়ে এত শোরগোল, তার গোড়াপত্তন কিন্তু সেই সময়েই হয়েছিল।
ক্রিকেটে জুয়ার বাজার অনেক আগে থেকেই সরব। শুরুতে ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার আনঅফিসিয়াল টেস্ট খেলা হতো নিয়মিত। বর্তমানের অ্যাশেজ শুরুর আগে থেকেই। আর সেই সময় অনেক খেলোয়াড় ছিল, যারা নিজেরা খেলা নিয়ে বাজি ধরত। ফলে খেলাকে নিজের মতো পরিচালনা করা তো যৌক্তিক, তাই না? খেলা জেতার চেয়ে অর্থপ্রাপ্তি অনেক বেশি আনন্দদায়ক। আর উনিশ শতকে এতটাও প্রযুক্তি ছিল না, যে মানুষ সব বুঝবে বা দেখবে। তারপরও গুজব ছড়িয়ে যেত বাতাসের গতিতে। কিন্তু আলোর দেখা পেত কি?
উপমহাদেশে ক্রিকেটের আগমনের সাথে সাথে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বুঝতে পারে, তারা আসলে সোনার ডিম পাড়া হাঁস পেয়েছে। যাকে ইচ্ছা মতো রগড়ে ইচ্ছে মতো নিজেদের পকেট ভারী করা যায়। তৃতীয় রিপু বইটির দ্বিতীয় খন্ডে লেখক এমন কিছু কাহিনি তুলে এনেছেন, যা ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের সাথে জড়িত। সবচেয়ে বেশি জড়িত তৃতীয় রিপুর সাথে। অর্থলোভ মানুষকে নির্মম করে তোলে, ক্ষমতা লোভ করে তোলে নিকৃষ্ট। আর এই ক্ষমতার পালা বদলে আমরা এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী হই, যা আমাদের হতবাক করে তোলে। ক্রিকেটও এর থেকে বাইরে নয়। বোর্ডের ক্ষমতা, অধিনায়কের ক্ষমতা পাওয়ার জন্য কত নিচে নামা যায়— তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বইটি। টাকায় ক্ষমতা কেনা যায়। আর সেই ক্ষমতা পাওয়া যায় অযোগ্য হয়েও। হয়তো সে কারণে যে খেলোয়াড়ের একাদশেও সুযোগ পাওয়ার কথা না, সে বসে থাকে অধিনায়ক হয়ে। ফলে নিজের নিজের ভেতরের প্রতিশোধের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে এমন কিছু ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে, যা দলের জন্যও ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। ক্ষমতালোভী মানুষেরা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া ভেবেছিলই বা কবে? হয়তো এই কারণেই অনেক সম্ভাবনা থাকার পরও অনেক খেলোয়াড় অচিরেই নিজের ক্যারিয়ারের ইতি ঘটিয়েছেন। ক্ষমতা দখলের লড়াই ভারতীয় ক্রিকেটে বেশ পুরনো বিষয়। সেই দেশভাগের আগে থেকে শুরু হয়ে ডালমোহন-ললিত মোদী-শ্রীনিবাসনের ত্রিমুখী লড়াই, কিংবা হালের ভিরাট কোহলি-রোহিত শর্মার অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে দলের মধ্যে বিভেদ সব পুরনো চিত্র।
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য— এর মধ্যে আমাদের গল্প তৃতীয় রিপু নিয়ে হলেও অন্যান্য রিপুও এর আওতামুক্ত নয়। লোভের বশবর্তী হয়ে টাকার কাছে বিক্রি হয় মানুষ। কেউ কেউ হয়তো সেটা অগ্রাহ্য করতেই পারে। কিন্তু নারী শক্তির কাছে সকল পুরুষ অসহায়। তাই প্রায়শই হানি ট্র্যাপের গল্প লেখা হয়। যার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন আজহারউদ্দিন কিংবা লু ভিনসেন্টের মতো ক্রিকেটার। অনেক বড়ো বড়ো ক্রিকেটারের নাম পাওয়া যাবে যারা এর থেকে মুক্তি পায়নি। বরং আরো ডুবে গিয়েছেন। তাদের ক্রিকেট। দুনিয়ায় আদর্শ মনে করা হয়। হয়তো এই কারণেই সৌরভ গাঙ্গুলি বিবাহিত হওয়ার পরও একজন নায়িকার সাথে ঘুরে বেড়ান। কিংবা অন্য কারণেও!
এই বইটিতে অনেক কেস স্টাডি উঠে এসেছে। যা হয়তো আমাদের সন্দেহকে শক্তপোক্ত করে। আদতে কোনো প্রমাণ নেই। এই বইটি পড়তে হলে অবশ্যই প্রথম খন্ড পড়া আবশ্যক। নাহলে এই অংশটি বোঝা যাবে না। কী করে বেটিং হয়, কীভাবে জুয়ার দর নির্ধারণ করা হয়— সব জানতে প্রথম খন্ড পড়া আবশ্যক। আর সেই অংশটি বুঝে থাকলে এই বইটি বোধগম্য হবে। কেন এত ফিক্সিং হওয়ার পরও খেলোয়াড়েরা শাস্তির আওতায় পড়ে না? তার মূল কারণ প্রমাণের অভাব। এর সাথে যারা যুক্ত তাদের অনেক দীর্ঘ হাতের ফলশ্রুতিতে প্রমাণ গুলো সামনে আসে না। ফলে আপনি জানেন, বোঝেন— তবুও কিছু প্রমাণ করা যায় না। যেমন, জুয়ার দরের দিকে লক্ষ্য রাখলে আপনি দেখছেন দর ওঠা নামা করছে আর খেলাও সেই অনুকূলে প্রতিফলিত হচ্ছে, তাহলে সন্দেহের অবকাশ থাকে বৈকি! একটি দুর্দান্ত দল, দুর্দান্ত খেলোয়াড় গত ম্যাচে ভালো করে আজকে খারাপ করছে। মনে হতে পরে সব দিন সমান যায় না। এটা অবশ্য ঠিক। কিন্তু জুয়ার দরের সাথে যখন খেলা মিলে যায়, তখন আসলে কী বিশ্বাস করব? এসব দৃশ্যপটের সাথে তো বর্তমান সময়ের ক্রিকেট খুব বেশি পরিচিত। এই দৃশ্যপট রচনা হয় ভিন্নভাবে। ধরুন কোনো খেলোয়াড় বল করতে দৌড়ে আসতে গিয়ে থেমে গেল। ভাবলেন রানআপে সমস্যা বলেই হয়তো! কিন্তু এর পেছনে যে অন্য গল্প লেখা থাকে!
একটা উদাহরণ দিই, সদ্য শেষ হওয়া ক্রিকেট বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারত ৪০০ থেকে কিছু রান কম করেছিল। একটা সময়ে মনে হচ্ছিল ৪০০ পর করে ফেলবে। কিন্তু খুব অদ্ভুতভাবে মাঝের তিন চার ওভারে যে গতিতে রান আসেনি, আর তাও এমন সময় যখন বেটিংয়ের সেশনের সমাপ্তি আসন্ন (এটা বুঝতে প্রথম খন্ড আবশ্যক)। ফলে স্বভাবতই ৪০০ রান হয়নি। যারা বিশ্বাস রেখে ৪০০+ রানের ক্ষেত্রে বাজি ধরেছিল, তারা অবশ্যই সব খুইয়েছে। মনে হতে পারে এ আর এমন কী? কয়েক ওভার রান কম হতেও পারে। কিন্তু ওই যে! এমন সময়ে রান কম করা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের চেয়ে সেশন ফিক্সিং আর্থিকভাবে অনেক বেশি লাভবান করে তোলে। এমন কিছু ঘটনা বইটিতে পাওয়া যাবে। সাথে এমন কিছু প্লেয়ারের নাম আসবে, যারা নিজেরাই এক একটি ব্র্যান্ড। নাহলে কেন রোহিত বা কোহলি বা দ্রাবিড়ের সাথে একজন বুকিকে দেখা যাবে? কিন্তু প্রমাণের অভাবে সোজাসাপ্টা কিছু বলা যায় না। সন্দেহ করা যায় শুধু।
শুধু কি তাই? দামি দামি কোটি টাকার উপহারসহ ধ���া পড়া আন্তর্জাতিক ভারতীয় ক্রিকেটারদের তো অভাব নেই। তবুও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। কারণ ভারতের ছড়ি ঘোরানোর প্রবণতা। বড়ো বড়ো ক্রিকেটারদের নাম যদি প্রকাশ্যে আসে তাহলে, সেই দেশের ক্রিকেটের মান সম্মান যাবে। তাই প্রমাণের অভাব বলে পার পাওয়া বা দায়সারা তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণে ফিক্সিং আজ প্রতিষ্ঠিত। অথবা বলা যেতে পারে “ডি কোম্পানি”-এর অনেক ক্ষমতাও এখানে মুখ্য। শুধু ভারত নয়, অন্যান্য দেশেও তাদের শীর্ষ ক্রিকেটারদের বাঁচানোর প্রক্রিয়া চলে। ফলে চুনোপুঁটিদের ঘরে শাস্তির খড়গ নেমে এলেও রাঘব বোয়ালরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আর এই তৃতীয় রিপুর লোভ ক্রিকেটারদের মনে ঢোকানোর মূল কারিগর আইপিএল। আইপিএলের সূচনা থেকে অতিরিক্ত অর্থপ্রাপ্তির লোভ থেকে নিজেদের খেলোয়াড়দের কী করে ফেরানো যায়, তার চেষ্টা অনেক বোর্ডই করেছিল। কিন্তু পেরেছিল কি? আইপিএল থেকে খেলোয়ারদের দূরে রাখতে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়িয়ে মাফিয়া, ড্রাগস এবং অন্যান্য অনেক অন্যায়ের গভীরে ঢুকে যেতে নিয়েছিল ক্রিকেট। যার মাশুল একটা সময় দিতে হয়েছিল ইংলিশ ক্রিকেট বোর্ডকে। বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে ইউটিউব বা ফেসবুক লাইভ এর মাধ্যমে সব ধরনের খেলা সরাসরি সম্প্রচার সহজলভ্য। ফলে খুব সহজেই নারী ক্রিকেট কিংবা সহযোগী দেশের খেলা গুলো দেখতে পাওয়া যায়। আর বুকিরা সেসব দেশকেই লক্ষ্য বানায়। কেননা আইসিসি কর্তৃক সেসব দেশে নজরদারি সীমিত। ফলে সেসব জায়গায় পিচ ফিক্সিং, টস ফিক্সিং বা অন্যান্য অনেক ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে।
সোমনাথ সেনগুপ্ত তার তৃতীয় রিপু সিরিজে ক্রিকেটের এমন সব অন্ধকার জগতের কথা বলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ক্রিকেট কীভাবে একটা বাণিজ্যিক রূপ নিয়ে কেবল হাতের পুতুলের মতো দৃশ্যপট রচনা করে। বিশ্বাস করা, না করা পাঠকের বিষয়। কোনো খেলায় ফিক্সিং হলে একটি দলের সবাই যে ফিক্সিং করে তেমন না, কয়েকজন দিয়েও কোটি কোটি টাকা আয় করা যায়। লেখক দেখিয়েছেন ক্রিকেটের ষড়রিপুর প্রভাব। কেন এত ফিক্সিং হয়েও আইসিসি তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, লেখক সেই সীমাবদ্ধতার দিকেও আলোকপাত করেছেন। ফিক্সিং কেলেঙ্কারি থামাতে হলে কেন এর সূত্রপাত তা জানতে হয়। জুয়া খেলার মূল সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয়। অনেকের হয়তো এসব বিষয়ে ধারণাই নেই। লোকবলের সীমিত সংখ্যাও আইসিসি বা আকসুর সবচেয়ে বড়ো সীমাবদ্ধতা।
এছাড়া লেখক ভারতের জুয়ার বাজার নিয়েও কথা বলেছেন। বিশাল দেশ, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য। যার নিয়মকানুন ভিন্ন। যেখানে কিছু জায়গায় জুয়া খেলাকে বৈধতা দেওয়া দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু জায়গায় এমন সব নিয়ম বানিয়েছে, যেখানে একে অপরের সাংঘর্ষিক। এছাড়া ফিক্সিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা কিছু মানুষকে তুলে এনেছেন। তেমনই কীভাবে তৃতীয় রিপুর ফাঁদে পড়ে ডুবে যাওয়া মানুষগুলোকেও দেখিয়েছেন। আমার দ্বিতীয় খন্ডের প্রথম খন্ড বেশি ভালো লেগেছিল। কেননা সেই খন্ডে লেখক আমাদের জানাশোনা কিছু গল্পই তুলে ধরেছিলেন। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় খন্ড জানাশোনার বাইরে থাকা এমন কিছু ঘটনার সম্মেলন, যা চমকে দিবে। হতবাক করে দিবে।
নন ফিকশন বইতে যেভাবে লেখা হয়, লেখক সেভাবেই লিখেছেন। পাঠককে কেবল তথ্য জানানোতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। এমন কিছু নাম লেখক তুলে ধরেছেন, হয়তো বিস্ময়কর। এরাও শেষে তৃতীয় রিপুর কাছে বিক্রি হয়ে গেল? তবে বাংলাদেশি সংস্করণের মূল সমস্যা ছিল সম্পাদনা। লেখা কোথাও চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছে, কালি কোনো কোনো বাক্যে বেশি পড়েছে। অধ্যায় ছাড়া কোনো শিরোনামই বোল্ড করা হয়নি, ফলে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল। বানান ভুল, ছাপার ভুল ছিল অনেক। সবচেয়ে বড় সমস্যা কিছু তথ্যগত ভুল। মনে হয়েছে লেখক যে ফাইল দিয়েছে, সেটাই ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক জায়গায় স্টিফেন ফ্লেমিংকে অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপ্টেন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিছু জায়গায় লেখক সিরিজের পূর্ববর্তী বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছিলেন। পৃষ্ঠা সংখ্যা বলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংস্করণের পৃষ্ঠার সাথে মিল পাইনি। বোধহয় ভারতের সংস্করণের পৃষ্ঠা সংখ্যা দেওয়া। আবার অনেক জায়গায় (...) ছিল। লেখক হয়তো ভেবে রেখেছিলেন পৃষ্ঠা নম্বর দিবেন, কিন্তু কোন কারণে দিতে পারেননি। সেটাও ঠিক করা হয়নি। আশা করব পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশের সময় এই বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া হবে।
পরিশেষে, হয়তো ভাবতে পারেন ক্রিকেটে ফিক্সিং হয় কালেভদ্রে। যা হয় সব কাকতালীয়। হয়তো তা-ই! তবে এখানে একটা কথা থাকে, এত কাকতালীয় ঘটনা কি সম্ভব? এমন বিচ্ছিন্ন ঘটনা কেন বারবার জুয়ার দরের সাথে মিলে যাবে? ধরে নিলাম বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু একবার বিচ্ছিন্নভাবে যে অর্থের লোভে পড়েছে, সে কেন সেখান থেকে ফিরে যাবে? মধু খেতে বারবার কেন আসবে না? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? যেখানে কেবল ক্রিকেটেই বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন জুয়ার খেলা হয়, এত অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকার পরও সেখানে স্বচ্ছতা থাকতে পারে কি? প্রশ্নটা তোলা থাক… উত্তর? — অজানা…
▪️বই : তৃতীয় রিপু - ক্রিকেটীয় কিন্তু ক্রিকেট নয় (দ্বিতীয় খন্ড) ▪️লেখক : সোমনাথ সেনগুপ্ত ▪️প্রকাশনী : ঈহা প্রকাশ ▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২২৪ ▪️মুদ্রিত মূল্য : ৪৪০ টাকা ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫