রাষ্ট্রহীন এক জনগোষ্ঠী। দেশ নেই। শেকড় নেই। সভ্যতা বিচ্ছিনড়ব। তারা মূলত রাষ্ট্র থেকে হারিয়ে যাওয়া একদল মানুষ। ধর্মে ইসলাম। জাতিতে বিহারী। ভাষা উর্দু। তারা কিন্তু বাংলাদেশেই আছে। বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানীরা এখন কেমন জীবনযাপন করছে, মানব-ট্রাজেডির এই উপন্যাস মোহাজের। আর হরিপদ দত্তের লেখা মানেই তো প্রান্তিক ও নতুন কোনো ঘটনার মর্মন্তুদ পর্যন্ত টেনে আনা।
হরিপদ দত্ত বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার। তাঁর জন্ম ১৯৪৭ সালে, নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলায়। ২০০৬ সালে তিনি উপন্যাস শাখায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।
সেই ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে ২০০০ এর পর পর্যন্ত ছোট্ট একটা উপন্যাসের সময়সীমা, ফলে এই সুদীর্ঘ কালপরিক্রমায় বাংলাদেশের বিহারী সম্প্রদায়ের অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরতে পারেননি হরিপদ দত্ত, সবকিছু আলতোভাবে ছুঁয়ে গেছেন। তিন প্রজন্মের অতীত বর্তমান, মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা, বাংলাদেশে ঊনমানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা, তাদের ওপর হওয়া নিপীড়ন - কোনোটাই রাখঢাক না রেখে বর্ণনা করেছেন লেখক। অনেক ঘটনা অতিনাটকীয় কিন্তু হরিপদ দত্ত জোর করে পাঠকের সহানুভূতি আদায় করতে চাননি। মূল চরিত্র মোতালেবের জন্মভিটায় ফেরার দুর্নিবার প্রত্যাশা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। এই ট্র্যাজেডি বিষণ্ণ আবহে দক্ষতার সাথে উপস্থাপিত হওয়ায় উপন্যাসের ছোটখাটো অনেক ত্রুটি ঢাকা পড়ে গেছে।তবে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালটা আরো বিশদে আলোচিত হতে পারতো।
'৪৭ এর দেশভাগের সময় বিহার থেকে একদল মানুষ পূর্বপাকিস্তানের দিকে যাত্রা শুরু করে। বাংলায় আসার তাদের একটাই কারণ ছিল তারা মুসলিম, বহু দূরের পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়া তখন সম্ভব নয়। এসব ভিটেমাটিহারা জনতা এমন এক ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে যেখানে তাদের ধর্ম এক, ভাষা আলাদা। কৃষক বিহারী পরিবার চাষের জমি পায় না। এক সময় তারা বুঝতে পারে বসতভিটা, দু-পয়সা রোজগার করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখাও অবান্তর। বস্তির খুপড়ি ঘরে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় সংগ্রাম এখানে। সময়ের স্রোতে '৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীনরা পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত গেলেও বাংলাদেশে আটকা পড়ে যায় দোষী-নির্দোষী সব বিহারী। দেশভাগের সময়ে দেখা বিহারীদের সব স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্খা ধূলোয় লুটিয়ে যায়। উপন্যাসটা পড়ার সময় মনে হবে হরিপদ দত্ত একজন বিহারি মুসলিমের চোখ থেকে কাহিনিটা বলে যাচ্ছেন। গল্পটা দীর্ঘ ৫৫ বছরের, এই বিশাল সময়কালের ভিতর চলে তাদের জন্ম আর মৃত্যুর খেলা। তিন প্রজন্মের তিন পুরুষ ; আবু আল সাইদ, আবু আল মোতালেব, আবু আল আবিদের বয়ানে ঠিকানাহীন, রাষ্ট্রহীন এক পরিবার-এক জনগোষ্ঠীর রক্তাক্ত ইতিহাসের আখ্যান “মোহাজের”।
'মোহাজের' বাংলাদেশে আটকে পড়া রাষ্ট্রহীন বিহারীদের নিয়ে লেখা উপন্যাস। সাতচল্লিশের দেশ ভাগ যাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারেনি। দিতে পারিনি তাদের নাগরিক অধিকার। ঘটনাচক্রে তারা হয়ে গেছে রাষ্ট্রহীন, শেকড়হীন এক জনগোষ্ঠী। যারা জন্মে ছিলো অখণ্ড ভারতবর্ষের বিহার মুলুকে।তারা জাতিতে বিহারি, ধর্মে মুসলমান এবং তাদের ভাষা উর্দু। কেবল মাত্র ধর্মের জন্যে সাতচল্লিশ সালে সমস্ত কিছু ত্যাগ করে, তারা চলে এসেছিলো মুসলমানদের স্বপ্নের দেশ পাকিস্তানে। চলে এসেছিলো এক বুক স্বপ্ন নিয়ে। পিছনে ফেলে এসেছিলো, পিতা, পিতামহ,প্রপিতামহ দের অস্তিত্বে গড়া জন্মভূমিকে। তাদের বুক ভরা সব রঙিন স্বপ্ন। পাকিস্তান তাদের স্বপ্নের দেশ। সেখানে মুসলমানদের কেউ চোখ রাঙিয়ে কথা বলবে না, সেখানকার ভূমি উপর তাদেরও অধিকার থাকবে, নির্বিঘ্নে তারা আজান দিতে পারবে, কারো গোলামি করতে হবে না। এমন সব নিরাপত্তার কথা ভেবেই, বিহারিরা বাঙাল মুলুকে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) চলে এসেছিলো। কিন্তু যা তারা চেয়েছিল, তা কি সত্যিই পেয়েছিলো?পায় নি! বরং স্বপ্নভঙ্গ আর আশাহত হতে হতে তারা নিজেদের আবিষ্কার করেছিলো বাংলাদেশের খুপরি-গিঞ্জিগলির জেনেভা ক্যাম্পে। ততদিনে তারা পৃথিবীবাসীর কাছে হয়ে গেলো রাষ্ট্রহীন এক জনগোষ্ঠী। তাদের কেউ স্বীকার করে না। যে পাকিস্তানিদের জন্যে তারা বাঙালিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে ছিলো, নিজেদের ভেবেছিলো পাকিস্তানের সাচ্চা নাগরিক, সেই পাকিস্তানও তাদের অস্বীকার করলো। ঠেলে দিলো নর্দমার পোকামাকড়ের জীবনের দিকে।
ধর্ম তাদের মেলাতে পারলো না। পারলো না কেবল ভাষার জন্যেই।যে স্বপ্ন তারা ১৯৪৭ সালে দেখেছিলো, তা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের মধ্যে দিয়ে ভেঙে খান খান হয়ে গেছিলো। তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মারিয়া হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু পারেনি। পারবে কেমন করে? যে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিলো ভ্রান্ত এক ধারণার উপর ভিত্তি করে,তাকে টিকিয়ে রাখা কী সম্ভব? এখানে বিহারিরা নিজেদের জন্ম ভূমি ফেলে এসে, তারা কিছুতেই নিজেদের আত্মপরিচয় তৈরি করতে পারলো না।
(২) ভারতবর্ষের দীর্ঘ খানাখন্দে ভরা ইতিহাসের পর, কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে ১৯৪৭ সালে বহুজাতিক রাষ্ট্রকে ভেঙে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করে দেয়া হলো। সঙ্গে ভেঙে দেয়া হলো বহু জাতিগোষ্ঠীকে। হিন্দুদের জন্যে ভারত, মুসলমান দের জন্যে পাকিস্তান।কোটি কোটি হিন্দু নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে হিন্দুস্থানে চলে গেছে। আবার বহু বেদনা আর আশা নিয়ে বুকের ভিতরে রঙিন স্বপ্নে মোড়া মুসলমানদের রাষ্ট্রে চলে আসে হিন্দুস্থানের মুসলমানরা। তেমন বিহার মুলুক থেকে বিহারি মুসলমানরা কেবল ধর্মের টানে, নিরাপত্তা র জন্যে তারা পাকিস্তান পাড়ি জমায়।
বলা হয়েছিলো কেবল ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র দুটি ভাগ হচ্ছে। আদতে কী তাই? এখন এই সময়ে এসে আমরা পিছন ফিরে বা বর্তমান পাকিস্তান আর হিন্দুস্থান রাষ্ট্রের দিকে তাকালে কি দেখতে পাই? ধর্ম কি সমস্ত জাতিগোষ্ঠীকে মিলাতে পেরেছিলো? বা পারছে? যদি মিলাতে পারতো, তবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হতো না। কাশ্মীরা, বেলুচরা,পাঞ্জাবিরা এখনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করতো না। যেখানে স্রেফ ধর্মের দোহাই টেনে দুটো দেশ তৈরি করা হলো, আদতে তার কেন্দ্রভূমে দাঁড়িয়ে ছিলো অর্থনৈতিক বঞ্চনা।যা মানুষ বুঝলো তখন, যখন আর কিছুই করবার ছিলো না। এবং তখনই তারা আবার ইতিহাসের পদরেখায় হাঁটা শুরু করলো। নিজেদের অধিকারের জন্যে লড়াইয়ে নামলো। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সেই বঞ্চনার প্রথম শিকার হলো।তারা আবিষ্কার করলো নিজেদের আত্মপরিচয়। এবং ঐ পদরেখায় হেঁটে তারা পাথুরে জমিতে রঙিন ফুল ফোঁটালো। স্বাধীনতা এলো। কিন্তু সেই পথে ফুল ফোঁটাতে গিয়ে যারা তাদের তুমুল ভাবে ভোগালো, তাদেরকে কিভাবে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে? তাইতো তাদেরকে (বিহারিদের) ঠেলে দেয়া হলো তুমুল অন্ধকারের দিকে। বা বলা যায়, তারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অন্ধকারের দিকে যেতা বাধ্য হলো।যে অন্ধকারের ঘুপচি-গলিতে আজও বিহারিরা গুমরে গুমরে মরছে।
(৩)
"যা কিছু আমার চার পাশে ছিল ঘাসপাথর,সরীসৃপ ভাঙা মন্দির যা কিছু আমার চার পাশে ছিল নির্বাসন,কথামালা একলা সূর্যাস্ত যা কিছু আমার চার পাশে ছিল ধ্বংস,তীরবল্লম ভিটেমাটি সমস্ত একসঙ্গে কেঁপে ওঠে পশ্চিম মুখে স্মৃতি যেন দীর্ঘযাত্রী দলদঙ্গল ভাঙা বাক্স প’ড়ে থাকে আমগাছের ছায়ায় এক পা ছেড়ে অন্য পায়ে হঠাত সব বাস্তুহীন।"
-(পুনর্বাসন/শঙ্খ ঘোষ)
মোহাজের উপন্যাসের লেখক হরিপদ দত্ত দেখালেন, বিহারের ইমামপুরা গ্রাম থেকে একটি পরিবার বাঙাল মুলুকের দিকে আসছে। সেখানে পিতা আবু আল সাঈদ এবং তার পুত্র আবু আল মোতালেব। তাদের চোখ রঙিন স্বপ্নে ঘেরা। তারা কিছুতেই আশাহত হচ্ছে না। তার বর্ণনা লেখক এভাবে দিচ্ছেন—
"মানুষগুলো স্বপ্নতাড়িত, উন্মাদ প্রায়। যে-মুলুকের উদ্দেশ্যে পা ফেলেছে তা তারা চেনে না। এমনও শুনেছে,ধর্মে মুসলমান হলেও সেই পূর্বমুলুকের মানুষের মুখের বুলি খোদাতায়ালা আলাদা করে দিয়েছেন।খানাপিনাও আলাদা।ভাতের চেয়ে রুটিকে নাকি ওরা প্রিয় মনে করে না।হোক, তাতে কী, ধর্মে তো এক।রাসুলে করিম আখেরি হজে আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে কি বলে যান নি, মুসলমান মুসলমান ভাই? মুসলমান মুসলমানে দুশমনি হারাাম।"
চোখজোড়া এমন স্বপ্ন যে তাদের বেশি দিন টেকেনি, তা আমরা পর-মূহুর্তেই দেখতে পাই। দেখতে পাই আবু-আল-সাঈদ এবং আবু-আল-মোতালেবের ধীরে ধীরেই স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে।তারা পতিত হচ্ছে দীর্ঘ এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে। হিন্দুস্থানের মতো, পাকিস্তানেও তারা হয়ে পড়েছে সংখ্যালঘু। লেখক উপন্যাসের এক জায়গায় তার বর্ণনা দিচ্ছেন এইভাবে—
"বিহারিরা এখানে সংখ্যালঘু,যেমনটা ছিল হিন্দুস্থানে।পাকিস্তানেও তা-ই।হিন্দুস্থানের হিসেবটা ছিল ধর্মের। পাকিস্তানের হিসেব আলাদা। এখানে ওরা সংখ্যালঘু উর্দু ভাষার কারণে, রক্ত, গোত্র বিবেচনায়।এসব জটিল হিসাব হিন্দুস্থানে থাকাকালীন মনে পড়েনি।এখন বুঝতে পারছে ধর্ম মানুষকে এক করতে পারে না। ভাষা,মুখের বুলি,গোত্রধারা ধর্মের বন্ধনকে কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়। "
আবু-আল-সাঈদ এবং আবু-আল-মোতালেবের মনে এই ধ্রুব সত্য উদিত হতে বড্ড দেরি হয়ে গেলো। ততদিনে তারা বাঙাল মুলুকে শিকড় ছড়াতে চাচ্ছিলো।আবু-আল-মোতালেবের ঘরে ততদিনে আবু-আল-আবিদ,আবু-আল-জাহিদ এবং এক কন্যা শাহজাদির জন্ম হয়ে গেছে। তবুও তারা জলে ভাসা দিকভ্রান্ত কচুরিপানার মতো ভেসে চলেছে। পাথরের উপর পাখির শস্যবীজ ফেলার মতোই শেকড় ছড়ানোর বৃথা চেষ্টা তারা করছে। তবু প্রশ্নটা অস্তিত্বের বলেই পাকিস্তান টিকে থাকুক,এই-প্রত্যাশা তাদের। তাদের প্রত্যাশায় কি ভুল ছিলো? তাদের দোষ কি ছিলো?তারা কি মহাকালের শিকার হয় নি?
"এদেশের বাঙাল মুসলমানদের হাতের ছোরা কি বিহারিরা? ছোরা তৈরি করে গোস্ত-কিমা,মজা লুটে নেয় অন্যজন! ছোরা কেবল হত্যার অছিলা।"
উপন্যাসের এক জায়গায় লেখক এমন একটি প্রশ্ন রেখেছেন।যা আমাদের ভাবনার জগৎতে এক তুমুল ঝড় তোলে। আমরা কি খুঁজে পাই এই প্রশ্নের জবাব? বিহারিরা যখন এদেশে আসে, তখন তাদের স্বপ্ন ছিলো বিশুদ্ধ। তারা তো তখন বাঙাল মুসলমান আর নিজেদের ভাই ভাইই ভেবেছিলো।কিন্তু সময় তাদের শিকার করালো নষ্ট খেলায়। লেখক উপন্যাসের এক জায়গায় তার বর্ণনা দিচ্ছেন এইভাবে—
"কে বলবে মানুষগুলো ছিল সাতচল্লিশ সালে ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই। আজ সবার চোখে খুনের আগুন। একে অন্যের লোভনীয় শিকার। এখানে এখন ক্ষমা নেই,ভালোবাসা নেই প্রতিশোধের গলিত উত্তপ্ত সিসার স্রোত বয়ে চলে অবিরাম। "
নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে একাত্তরে বিহারিরা পাকিস্তানের পক্ষে যে তান্ডবলীলা চালায়, তাতে করে বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করতে পারেনি। সমস্ত জায়গা থেকে বিহারিদের একত্রিত করা হলো মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে। এখন সেই অন্ধকার গলিই তাদের একমাত্র অস্থায়ী ঠিকানা। বাংলাদেশ সরকার চাইলেই তাদের এখান থেকেও ঠাঁই-নাড়া করতে পারে। আবু-আল মোতালেব মুক্তিযুদ্ধে পর তার রাজাকার পুত্র আবু-আল-আবিদকে হারিয়ে, এই জেনেভা ক্যাম্পেই আশ্রয় নেয়, তার স্ত্রী, ছোট ছেলে আবু-আল-জাহিদ, কন্যা শাহজাদিকে নিয়ে। শাহজাদি তার মায়ের মৃত্যুর পর এক বাঙালি ছেলে হাত ধরে পালিয়ে যায়। এবং শিকার হয় এক বিভৎস ঘটনার। আবু-আল-জাহিদ একদিন পিতা আর স্ত্রী নিকট প্রস্তাব করে সে জিহাদ করতে আফগানিস্তান যাবে। তার বর্ণনা লেখক এইভাবে দিচ্ছেন—
"এটা ছিল অবিশ্বাস্য এবং আবু-আল-মোতালেবের জন্য ভাবনার অতীত। একমাত্র জীবিত পুত্র জিহাদে অংশগ্রহণ করতে ওই দূর আফগানিস্তানে যাবে, এমনটা পিতা হিসেবে তার মেনে নেয়া কঠিন বৈকি।কিন্তু পুত্র জাহিদের কাছে মনে হয়েছিল তার জীবনের চারপাশ ঘিরে সুড়ঙ্গের মতো যেসব গুহাপথ রয়েছে তাও বন্ধ হয়ে গেছে। যে অবরুদ্ধ। এই শরণার্থী শিবির, পাকিস্তানে ফিরে যাবার অনিশ্চয়তা, একাত্তরের যুদ্ধে বড় ভাই আবেদের শহীদ হওয়া,ছোট বোনের বাঙাল ছেলের হাত ধরে পলায়ন এক অসহ্য পরাজয় এবং বন্দিজীবনেরই যেন বাস্তবতা। "
এমনই ভাবে দিকভ্রান্ত হতে হতে তারা জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলো। জাহিদ আফগানিস্তানে গিয়ে মারা পড়ার খবর ফেলো মোতালেব এবং জাহিদের স্ত্রী শাকেরা। তাদের সামনে আরেক যুদ্ধ অবতীর্ণ হলো। একদিন আবু-আল-মোতালেব ঠিক করলো তারা বিহারের ইমামপুরায় ফিরে যাবে। কিন্তু ফেরা কি এতো সহজ? তারা সীমান্ত রক্ষীদের হাতে ধরা পড়লো।এবং নিজেদের আত্মপরিচয় আবিষ্কার করলো— পাকিস্তানি নয়, বাংলাদেশী নয়, ভারতীয় নয়, হিন্দু নয়, মুসলমান নয়,বরং সে রাষ্ট্রহীন একজন মানুষ!
এমন নাটকীয় ব্যঞ্জনার মধ্যে দিয়ে লেখক হরিপদ দত্ত তুলে আনলেন মানব সভ্যতার এক ঘৃণ্য অধ্যায়কে। ধর্ম আর ভাষার বিভাজনে সভ্যতা থেকে মানুষের বিচ্ছিন্ন হবার বর্বরতা কোথায় গিয়ে শেষ হবে? এমনই এক প্রশ্ন তিনি ছুঁড়ে দিলেন মানবসভ্যতার কাছে!
(৪) জানি না মোহাজের কার কেমন লাগেছে।আমার কাছে মোহাজের দিব্যি লেগেছে। হরিপদ দত্তের মোহাজের উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে আমি আমার নিকট অমীমাংসিত অনেক প্রশ্নের, উত্তর আবিষ্কার করেছি। দেশভাগের সমস্ত ইতিহাসটাকে অন্য আলোতে ফেলে দেখতে চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারিদের জীবন নিয়ে পার্টিশন সাহিত্য বা এমনিতেও তেমন কোনো লেখালেখি চোখে পড়ে না (এই সময়ের একজন সাদিয়া সুলতানা 'উঠল্লু' নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। জানি না সেইটি কেমন হবে) ।তার মধ্যে হরিপদ দত্তের মোহাজের উপন্যাসটি আমাদের সাহিত্যে অনন্য এক সংযোজন। এই উপন্যাস নিয়ে বিস্তার আলাপ-আলোচনা করবার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু তাগদে কুলোয় নি। তবুও যদ্দুর সম্ভব হলো লিখলাম। কেউ পড়ে যদি বইটার প্রতি আগ্রহী হন, তাহলে আমার শ্রম সার্থক হবে।
’৪৭ সাল, ধর্মের ভিত্তিতে দুই ভাগ হলো ভারতবর্ষ। দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হলো তাদের নিজ জন্মভূমি থেকে।
বিহার মুলুক থেকে এমনি এক মুসলিম পরিবার পুণ্যভূমির(!) উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। না, এই যাত্রা নবিজির হিজরতের মত মক্কা ছেড়ে মদিনায় গমন না। এই হিজরত ছিল বিহার মুলুক ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে গমন। স্বপ্নের সেই পুণ্যভূমির জন্য যারা বিহার ছেড়ে পাকিস্তানে যাত্রা করেছিল, তারাই ইতিহাসে মোহাজের নামে পরিচিত।
কিন্তু সেই পুণ্য ভূমি মোহাজেরগণ কখনো পায় নি। কারণ ধর্ম এক হলেও ভাষা আলাদা। আর মুখের বুলির কাছে হেরে গেলো ধর্ম, তাই বাঙাল থেকে আলাদা থেকে গেল তারা।
আর এই আলাদা থাকার কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর যেন আলাদা একটা রাষ্ট্র গড়ে উঠল, উর্দু বোলের এক নতুন রাষ্ট্র বা বিহারি কলোনি বা জাহান্নাম! আর উর্দু বুলির মোহাজেরগণ সেই জাহান্নামের কিট-পতঙ্গ!
’৪৭ সালের আবু সাঈদ যে হিজরত শুরু করেছিল, আবু সাঈদের পৌত্র সেই হিজরত আবার পুনরাবৃত্তি করে ৫৫ বছর পর। আবার সে ফিরে যেতে চায় তার মাতৃভূমি বিহার মুলুকে… আর এই ৫৫ বছরের কাহিনি তিন পুরুষের বিহারির দৃষ্টিকোণ থেকে উঠে এসেছে ‘মোহাজের’ উপন্যাসে।
ধর্ম এক হলেও মুখের বুলির কারণে বাঙালি সমাজ কেন গ্রহণ করেনি বিহারিদের, কেন মূল স্রোতে মিশতে না পারার কারণে বস্তিতে থাকতে হয়েছে তাদের আর এজন্য তারা জড়িয়ে পড়েছে নানা অপরাধের সাথে- এই সব প্রশ্নের উত্তর একজন বিহারির দৃষ্টিকোণ থেকে পাওয়া যাবে এই উপন্যাসে। বিহারিদের কথা মাথায় রেখে ‘আদমজি জুট মিল’ স্থাপন হলেও ভাগ্য বদলায়নি তাদের, বরং পাকিস্তান সরকার তাদের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করেছে বিহারিদের, বার বার। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ আর পরবর্তী সময়ে যখনি বাঙালি-বিহারি দ্বন্দ্ব হয়েছে, কোন না কোন মহল ব্যবহার করেছে সাধারণ এই মোহাজেরদের। সেই আখ্যান নিয়েই এই উপাখ্যান। কেন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হলেও পাকিস্তান সরকার ফেরত নেয়নি তাদের, জেনেভা ক্যাম্পে কিট-পতঙ্গের মত কিভাবে বসবাস করতে হয়েছে তাদের সেই চিত্র ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে।
একজন বিহারির দৃষ্টিতে দেখা এই ৫৫ বছরের আখ্যান পড়তে গিয়ে বার বার হোঁচট খেতে হয়েছে, হজম করতে কষ্ট হয়েছে। বাঙালিদের কাছে হয়তো বিহারীরা কখনো প্রকৃত বাংলদেশী হতে পারবে না ; তবুও এই আখ্যান যতটুকু বিহারীদের ততটুকুই বাংলাদেশের আখ্যান, তাদের দৃষ্টিতে দেখা ৫৫ বছরের ইতিহাস।