"বল মা, আমি দাঁড়াই কোথা। আমার কেহ নাই শঙ্করি হেথা।।"
এই শ্যামা সঙ্গীতটিকে ভরসা করে তিন পুরুষের ভিখারি পশুপতি চক্রবর্তী ব্যারাকপুর থেকে রানাঘাট পর্যন্ত ট্রেনে ট্রেনে ভিক্ষা করে। এই গানটি তার পিতৃদত্ত। পেশাটিও। জন্মসূত্রে আর যেটা পেয়েছে সেটা চাটুজ্যেদের বাগানের এক টুকরো জবরদখলি জমি। এছাড়া সহায় সম্বল কিছু নেই। এক আছে বিধবা বোন । সে থাকে রোডের ওপারে ।মাঝে মাঝে তাকে ভালো কিছু রান্না করে খাইয়ে যায়, বিপদে মায়ের মতো আগলে রাখার চেষ্টাও করে । অবিবাহিত বাউন্ডুলে পশুপতির জীবনযাপন লেখক সুব্রত মুখোপাধ্যায় তাঁর 'বীরাসন' উপন্যাসটিতে দেখিয়েছেন। কিভাবে সে চাটুজ্যেদের পরবর্তি প্রজন্ম তৎসহ পার্টির লোকেদের চোখরাঙানি , ভয়, প্রলোভন উপেক্ষা করে তার ভদ্রাসনটি রক্ষা করে আছে। 'বীরভোগ্যা বসুন্ধরা' এই প্রবাদটিকে সফল করেছে তাই এটি বীরাসন। পশুপতির কোন পিছুটান নেই। তার কোন সঞ্চয়ের ইচ্ছা নেই। তার মৃত্যুর পর তার শবদেহ নিয়ে কি হবে তা নিয়েও সে চিন্তিত নয় । সে শুধু আরও অনেক বছর বাঁচতে চাই। তার এই বসতবাটিটুকু , তার গাছের মধুকুলকুলি আম , খেজুর রস এইসব আরও অনেকদিন উপভোগ করতে চাই। মৃত্যুচিন্তা যে একেবারেই আসে না তা নয় , সে যখন নিজের সঙ্গে কথা বলে, তখন জীবন সম্পর্কিত নানান দর্শন উঠে আসে তার কথায় । আবার কখনও কল্পনায় মৃত ঠাকুরদার সঙ্গে জীবন-মৃত্যু নিয়ে আলোচনা থেকে জানতে পারি তার মৃত্যু ভয়ের কথা। এই কথোপকথনের মধ্যেই উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা প্রকাশ পায়। এই উপন্যাসটিতে লেখক ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্বকে সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষ চাইলে সে নিজেই নিজেকে সাহস জোগাতে পারে , সে নিজেই নিজের ভরসা হতে পারে। এই উপন্যাসের জন্য লেখক ২০১২ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ১৭৬ পৃষ্ঠার এই বইটির মুদ্রিত মূল্য ১০০ টাকা ।( দ্বিতীয় মুদ্রণ )