স্বপ্নময় চক্রবর্তী এ সময়ের প্রতিনিধি স্থানীয় কথাসাহিত্যিক তো বটেই—উপরন্তু তিনি চিন্তক, তিনি জিজ্ঞাসু। তাঁর জিজ্ঞাসায় রয়েছে বাংলার ছড়ার আঙ্গিক, যৌন-শিক্ষা, বঙ্গনারীর মুখের ভাষা, সম্প্রচারে সম্বোধন, ভোটের ছড়া, প্রেমপত্র, হ্যাণ্ডবিল ইত্যাদি প্রায় বাইশটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ। স্বপ্নময় তাঁর স্বাভাবিক স্বাদু রম্য গদ্যে দেখেছেন বিচিত্র বিষয়। এখানে থাকা সব নিবন্ধ-প্রবন্ধই তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে জাত।
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর জন্ম ২৪ আগস্ট, ১৯৫১ সালে উত্তর কলকাতায়। রসায়নে বিএসসি (সম্মান), বাংলায় এমএ, সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করেছেন। লেখকজীবন শুরু করেন সত্তর দশকে। প্রথম দিকে কবিতা লিখলেও থিতু হয়েছেন গল্প ও উপন্যাসে। তাঁর লেখা গল্পের সংখ্যা প্রায় ৩৫০। প্রথম উপন্যাস ‘চতুষ্পাঠী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। পাঠক মহলে সাড়া ফেলেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ এবং কলাম কিংবা রম্যরচনাতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর রচিত ‘হলদে গোলাপ' উপন্যাসটি ২০১৫ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়। ‘অবন্তীনগর' উপন্যাসের জন্য ২০০৫ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কার, সর্বভারতীয় কথা পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার, গল্পমেলা, ভারতব্যাস পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। সাহিত্যের বাইরে তিনি গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
এটা ১৯৯৬ সালের একটা নির্বাচনী সঙ্গীত, বিএনপির করা! বইয়ের "ভোটের ছড়া" প্রবন্ধে জানা গেলো এ তথ্য। "আলাপ বিলাপ" বিচিত্র সব বিষয়ে লেখা। "ভারী প্রবন্ধ লেখার এলেম আমার নেই, আমি কিছু গালগপ্পো করবো" কথাটা লেখক মজাচ্ছলে বললেও তার প্রবন্ধ পড়ে আসলেই মজলিশি গদ্যের অকৃত্রিম স্বাদ পাওয়া যায়।"নামে আসে যায়" প্রবন্ধে আছে ধর্ম, সমাজ ও হিন্দুদের শ্রেণিভেদ প্রথা অনুযায়ী নাম রাখার ইতিহাস, "ভাষা ভেসে যায়" তে অঞ্চলভেদে ভাষা কীভাবে বদলে যায় তা নিয়ে আগ্রহ জাগানিয়া বিশ্লেষণ আছে। "প্রেমপত্র" পড়ে মজা পেয়েছি। চিঠিতে প্রেমাস্পদের জন্য কতো যে সম্বোধন ছিলো ৫০ বছর আগেও! ( চরণেষু প্রাণের দেবতা, হৃদয়ের রাজা, নয়নের মণি, দুষ্টু প্রজাপতি, আমার সোনার হরিণ, হে মম দেবতা, ভালবাসার ধন, প্রাণ সরোবরের পদ্ম ইত্যাদি ইত্যাদি)। পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের উপন্যাসের চিঠিতে যৌনতার খোলাখুলি বর্ণনা পড়ে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যেতে পারে একেকজনের। "ভোটের ছড়া"য় ছড়া বানিয়ে বিপক্ষ দলকে ধরাশায়ী করার প্রবণতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দ্রোহ আর শ্লেষ সম্পর্কেও জানা যায়। একটা ছড়া এমন -
"ঘর দিলা না, কাম দিলা না ভোট চাও, লাজ লাগে না?"
সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছি "বাঙালি মধ্যবিত্তের ধর্মটর্ম" আর "বাঙালির অশ্লীলতাবোধ" পড়ে। বাঙালি জীবনে অনেক অশ্লীল কাজ করে, আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর রসালো কথা আছে কিন্তু অশ্লীলতাদোষে দুষ্ট বলে অনেক শব্দই আমাদের মধ্যবিত্ত রুচি সেগুলো ত্যাগ করেছে। মলদ্বারের প্রচলিত শব্দ "পোঁদ" শুনে আমাদের রুচিতে আঘাত লাগলেও এ শব্দ নিয়ে আছে প্রচুর প্রবাদ।যেমন -নিজের পোঁদে ন-মন গু পরকে বলে তোর পোঁদে থু, পোঁদ ল্যাংটা মাথায় ঘোমটা, পচা পোঁদে বিষ্ণুতেল, পোঁদে নেই ইন্দি ভজরে গোবিন্দি। একটা অংশ পড়ে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসলাম। "আমরা হাগা মোতা শব্দ উচ্চারণ করি না অথচ যত্রতত্র হাগি, মোতার তো কথাই নেই।" "বঙ্গনারীর মুখের ভাষা" আর "বাঙালির রান্নাবান্না"তে আমাদের সমাজ পরিবর্তনের কিছু চমকপ্রদ ইতিহাস ধরা আছে। "যৌনশিক্ষা: একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা" তে লেখক তার রেডিও অনুষ্ঠানে যৌনশিক্ষাবিষয়ক ট্যাবু ভাঙা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। জানিয়েছেন, বিদেশি দাতারা বলে যে তারা সবাইকে যৌনশিক্ষা দিতে চায় কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য অবাধ যৌনতা। যৌন সচেতনতা আর অবাধ যৌনতাকে তারা এক করে দ্যাখে অথচ দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এদের মূল উদ্দেশ্য ব্যবসার সম্প্রসারণ। আমাদের নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই।
বইয়ের প্রত্যেকটি প্রবন্ধ কোনো না কোনো কারণে উল্লেখযোগ্য। নবীন লেখকরা এতে লেখালেখির ও চিন্তাভাবনার বহু উপকরণ খুঁজে পাবে। খেয়াল না করে পারলাম না, এত বিবিধ বিষয়ে আগ্রহ ও অন্বেষণ স্বপ্নময়ের গল্পকার সত্তাকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রাবন্ধিক স্বপ্নময় আর গল্পকার স্বপ্নময় একই সত্তার দুটো ভিন্ন উৎসারণ।
প্রাণবন্ত প্রবন্ধসংগ্রহ! প্রবন্ধগুলোর বিষয়বস্তুর নতুনত্বের চেয়ে এক্সিকিউশন নজর কাড়ে বেশি। (অনেক ক্ষেত্রে) লেখকের জীবনস্মৃতির সঙ্গে অভিজ্ঞতার সংশ্লেষ - সামাজিক চালচিত্র, রীতিনীতিকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়, নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কিছু লেখার কাছে আবার ফিরে আসা যায়।
জীবনে চলার পথে আমরা অনেক রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই.. কোনওটা মিষ্টি, কোনওটা তিক্ত.. কিন্তু আমরা সেগুলো মনে রাখি না, বা বলা ভালো মনে রাখার চেষ্টা করি না, সারাদিনের ব্যস্ততাতে ভুলে যাই.. এরকমই বেশ কিছু মনে না রাখা ঘটনা বা অভিজ্ঞতাকেই প্রবন্ধ সংকলনের আকার দিয়েছেন লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তী.. লেখক তার এই "আলাপ বিলাপ" বইটিতে তুলে ধরেছেন আমাদের চারপাশের কিছু সাধারণ ও অতি সাধারণ ঘটনা, যা গুরুত্বের দিক দিয়ে নেহাতই মামুলি হলেও বিশ্লেষণ মারাত্মক.. আলাদা আলাদা প্রবন্ধে স্থান পেয়েছে তাঁর নজরে আসা এই ঘটনাগুলির এক আশ্চর্য সুন্দর বিশ্লেষণ ও অক্লান্ত পরিশ্রম করা বেশ কিছু মৌলিক গবেষণা.. আর এই বিশ্লেষণভিত্তিক বা গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলিরই সংকলন হল এই বই.. আমাদের চারপাশে ঘটে চলা সাধারণ থেকে অতি সাধারণ ঘটনাই এই প্রবন্ধগুলির বিষয়বস্তু.. নাম বিভাজন, হ্যান্ডবিল, লাইন, রান্না, যৌনশিক্ষা, বেতার, প্রেমপত্র, রবীন্দ্রনাথ, সুন্দরবন ও আরও নানা ধরনের তথাকথিত আলোচনা না করতে চাওয়া বিষয়ই আলোচিত হয়েছে এই বইটিতে.. ক্ষুদ্রাদিক্ষুদ্র ঘটনার চমকপ্রদ বিশ্লেষণ পড়ে দেখতে চাইলে আপনাকে মুগ্ধ করবে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর এই বইটি..