নিকারাগুয়ার এক ক্যাথিড্রালের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় জেরবার হন লেখক। সিনোরিতা আদ্রিয়ানা এখনো এসে পৌছেনি, হার্টের সমস্যায় নির্জন এপার্টমেন্টের কাউচে সে কী পেইনকিলারের ঘোরে পড়ে আছে? দেখতে পান–ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজার মারফিকে, যার স্ত্রী সম্প্রতি সুইসাইড করেছেন। এ বিপত্নীকের সাথে আদ্রিয়ানার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক লেখককে উদবিগ্ন করে। জাদুঘরের আঙিনায় লেখকের সাথে পাঠকের সাক্ষাৎ হয় দুই চীনা তরুণীর সঙ্গে— যারা নিকারাগুয়ায় এসেছে অপরিশোধিত স্বর্ণের সন্ধানে। অনিশ্চিত যাত্রার পাঠকও তাঁর সাথে শরিক হন সেইলবোটে রোলেট খেলার আমোদে । অতঃপর জনহীন এক দ্বীপে বিরল প্রজাতির কচ্ছপের প্রজনন দেখতে গিয়ে পাঠকও অবগত হন সন্দেহপ্রবণ ক্রিসটেলা ও সেন্টিমেন্টাল বিয়াংকার জীবনের নানাবিধ দ্বন্দ্ব সংঘাতের সঙ্গে। পরিশেষে আগুন-পাহাড় মমোতমবোর কাছাকাছি একটি ক্যাটল রেঞ্চে দিনযাপনের বয়ানে পাঠকও শামিল হন ক্যাম্পফায়ারে, পোষা প্যালিকানের নৃত্যপ্রবণতা, কিংবা পরকীয়ার বিষয়-আশয় তাদের করে তুলে দারুণভাবে কৌতূহলী। পর্যটনের শেষ পর্বে লেখক ও পাঠক এসে হাজির হন পুরাতাত্ত্বিক একটি নগরীতে, আদিবাসীদের নিপীড়ন তাদের বিষাদগ্রস্ত করে। এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জকে তোয়াক্কা না করে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দম্পতির ফের একাডেমিক উদ্যোগের বিষয়-আশয়ও তাদের মনে যোগায় বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়ার লেওন শহরে অবস্থানকালীন সময়ের দিনলিপি এই বই। লেখক পরিচিত হয়েছেন বিভিন্ন মানুষের সাথে, গিয়েছেন দ্বীপে, ক্যাটল র্যাঞ্চে এবং মমতমবো আগুন পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত প্রত্নতাত্ত্বিক শহর লেওন ভিয়েখাতে। মঈনুস সুলতানের ভ্রমণকাহিনী লেখার ধরণ বেশ আরামদায়ক। তবে নারীদের নিয়ে তার বর্ণনা বা দেখার ধরণ ঠিক মনঃপুত হয়নি ব্যক্তিগতভাবে।
নিকারাগুয়া নামটা সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে কয়েকবার পড়েছি। আর মাঝে মাঝে পত্রিকায় অথবা টেলিভিশন নিউজে বিচ্ছিন্নভাবে নামটা চোখে পড়তে পারে। কারণ দেশটা ক্রিকেট বা ফুটবলে ততটা জনপ্রিয় নয়। এই অখ্যাতনামা দেশের কিছু পুরাতাত্ত্বিক নগরী ও নির্জন দ্বীপে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন মঈনুস সুলতান। সেই অভিজ্ঞতাই বর্ণনা করেছেন এখানে।
লেখকের নিকারাগুয়া ভ্রমণ শুরু হয় সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গুরুত্বপূর্ণ লেওন নগরীতে। শৌখিনভাবে গোল্ড প্যানিং এর আশায় ঘুরে বেড়ান জাদুঘর, সমুদ্রসৈকত ও দ্বীপে। কিছু সময় কাটে তার মমোতমবো আগ্নেয়গিরির কাছে পুরাতাত্ত্বিক এক সাইটে। ঘুরে বেড়ানোর সময় মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হন মেরিন-গাইড তরুণী, শিল্প সংগ্রাহক পুরুষ, বিপত্নীক ইনভেস্টর, শিল্পপতি ও ঘরছাড়া জননীর সন্ধানে নিকারাগুয়ায় আসা পাখিপ্রেমী যুবতী প্রমূখ মানুষজনদের সাথে।
পর্যটনের শেষ পর্বে লেখক ও পাঠক এসে হাজির হন পুরাতাত্ত্বিক একটি নগরীতে, আদিবাসীদের নিপীড়ন তাঁকে বিষাদগ্রস্ত করে। এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত আপদকে তোয়াক্কা না করে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দম্পতির ফের একাডেমিক উদ্যোগের বিষয়-আশয়ও তাঁকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়।