সংঘাত আর সংঘর্ষের জেরে কৈশোরে বাড়ি থেকে পালিয়ে পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়া এক মানুষের আশ্চর্য ঘটনাবহুল জীবনের কাহিনী ‘নিনাদ’। আখ্যানটির প্রধান চরিত্র আব্দুর রশিদ—ভঙ্গুর অথচ সাহসী, আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক জিজ্ঞাসায় সদাতাড়িত, দু:খজর্জর অথচ ধ্যানী—চমকপ্রদ, কৌতূহল জাগানিয়া এক চরিত্র। সময়ের ঘুর্ণিতে পাক খেতে খেতে, হতবিহ্বল রশিদের সঙ্গে দেখা মেলে বহুবর্ণিল, অবিস্মরণীয় কিছু নারী ও পুরুষের। উজ্জ্বল এইসব চরিত্রের মিথষ্ক্রিয়ায় উপন্যাসজুড়ে বেজে চলে নৈশব্দ্যের নিনাদ; যা –রশিদের মতো— পাঠকেও করে তোলে ঘোরগ্রস্ত। স্মৃতি, প্রিয়-অপ্রিয় মানুষ আর অপ্রত্যাশিত ঘটনার স্রোত তাকে তাড়া করে, প্রতিনিয়ত ভাসিয়ে নিয়ে যায়; অথচ আপাত নিষ্ঠুর কিন্তু দেবশিশুর মতো কোমল আব্দুর রশিদ প্রেম-অপ্রেম, প্রতিশোধ, প্রত্যাখান এবং যুদ্ধের ভেতর এগিয়ে যেতে যেতে যেন আটকা পড়ে যায় এক অলঙ্ঘণীয় নিয়তির ভেতর। এমন অভিনব চরিত্র বাংলা কথাসাহিত্যে দ্বিতীয়টি নেই—দাবি করাটা অতুক্তি হবে না। লিরিক্যাল অথচ গতিশীল ও প্রাঞ্জল এক গদ্যভাষায় রচিত উপন্যাস নিনাদ। চরিত্র আর কাহিনীর নিখুঁত বুননে পাঠককে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার সমস্ত আয়োজন এই উপন্যাসটিতে আছে। প্রিয় পাঠক, বাংলা কথাসাহিত্যে সতেজ হাওয়া বয়ে আনা নতুন কন্ঠস্বরের অভিনব, ঘোরলাগা এক কল্পবিশ্বে আপনাকে স্বাগত।
মুরাদ কিবরিয়ার গদ্যশৈলী আকর্ষণীয়। একবার পড়া শুরু করলে থামার উপায় নেই। বইয়ের প্রধান ইতিবাচক দিক হচ্ছে গল্পটা গতিশীল। প্রধান সমস্যাও হচ্ছে গল্পটা অতিরিক্ত গতিশীল। একের পর এক কাকতালীয় ও নাটকীয় ঘটনা ঘটেই চলেছে। নায়ক রশিদের নিয়তি হচ্ছে মেলোড্রামার মধ্যে জড়িয়ে যাওয়া।অর্ধেক পর্যন্ত যা-ও ভালো লাগছিলো, পরবর্তীতে আরো আরো নাটকীয় ঘটনায় ভালো লাগা অনেকটাই কর্পূরের মতো উবে গেছে।
মোঃ আব্দুর রশিদ। শৈশবে নিজের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কারণে বাবা-মা হারা এই মানবসন্তান 'কুফা রশিদ' নামে তাঁর গ্রামে বেশি পরিচিতি পায়।
সমাজে সর্বজনগৃহীত হওয়ার প্রবণতা বা সোশ্যাল এক্সেপটেন্সের বলি শিশু রশিদ। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক কিন্তু নিষ্ঠুর মব ম্যান্টালিটি তাকে তুলে এনে ফেলে সংঘর্ষ, সংঘাত, স*হিংসতা এমনকি ভূরাজনৈতিক দোলাচলে সৃষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে।
আজব এক চরিত্র 'নিনাদ' উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট। তাঁর অদ্ভুত জার্নি কোন 'হিরো'জ জার্নি নয়। বরং একজন অ্যান্টি-হিরোর অভিযাত্রা মনে হয়েছে বেশি। ধার্মিক, নিজস্বতায় পূর্ণ দার্শনিক জিজ্ঞাসার অধিকারি, স্থিরচিত্তের একজন মানুষ আবার সময়ে সময়ে রূপান্তরিত হয়ে যান একদম বিপদজনক খু*নিতে।
মোঃ আব্দুর রশিদকে আমার একজন হাইলি ফাংশনাল সোশিওপ্যাথ মনে হয়েছে। যার মনের মাঝে কখনো এক পাখি ডেকে ওঠে আবার কখনো গর্জন করে এক পশু। রশিদ যেন এ সমাজ, সমাজের মানুষের কেউ নন। পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে বাবাকে বলতে চাওয়া, সৎ মার হাতে ব্যাপক অত্যাচারের শিকার শিশুটির জীবনে এক-দুটি নয়, খারাপ দিন এসেছে অনেক।
সময়ের সাথে অত্যন্ত মেধাবী আবার পোশাকি সমাজ জীবন থেকে বিচ্যুত এই চরিত্র দক্ষ হয়ে যায় ভা*য়োলেন্সে। ফলে সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির আগ্রহের মানুষটিতে পরিণত হন রশিদ। চরমপন্থি কমিউনিস্ট থেকে ইসলামিস্ট সবার দরকার এরকম আপাতদৃষ্টিতে ফ্যানাটিক টাইপ ছেলেটিকে।
উপন্যাসের পরিধি বিস্তৃত। আছে থ্রিল, একশন। তবে মূলত এটি প্রোটাগনিস্টের ফার্স্ট পার্সনে বলা মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার আখ্যান। রশিদ বিরাট এই পথে যাকে আপন করতে চায় সে-ই হারিয়ে যায়। অবশ্য তাঁর আপন করার ভঙ্গিমাও স্ববিরোধি। নিজেই নিজেকে 'কুফা' মনে করায় অনেকের সাথেই তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে না। মক্কা-মদিনা নয় বরং রশিদের থাকতে ইচ্ছা করে 'সিদরাতুল মুনতাহা' নামের সেই বিষণ্ন একা বৃক্ষের কাছে।
মুরাদ কিবরিয়ার ভাষা নির্মেদ, একধরণের কাব্যিক অভিব্যক্তির সাথে সাথে ক্ষীপ্র গতির গদ্যের দেখা পেয়েছি এই উপন্যাসে। ঔপন্যাসিক হিসেবে এটি তাঁর প্রথম কাজ। তবে অভিষেকেই প্রায় গ্রাউন্ডব্রেকিং কিছু করে ফেলেছেন লেখক। উপন্যাসের বিস্তৃতি বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তান পর্যন্ত। রশিদ যেন প্রচন্ড ঝড়ে উড়ে বেড়ানো এক বিষাদগ্রস্ত প্রজাপতি। পুরো 'নিনাদ' জুড়ে যে পরিমাণ বিষণ্ণতা মুরাদ কিবরিয়া পাঠকের মনে ঢুকিয়ে দিতে পারেন, নিজেকে উপন্যাসে 'নাই' করে দিয়ে, তা প্রশংসার দাবিদার।
সমসাময়িক উপন্যাস নিয়ে গুণিজনদের অনেকের বিভিন্ন অভিযোগ আছে। যেমন বড়গল্পকে উপন্যাস বলা কিংবা বিভিন্ন গোল গোল গল্পকে এক করে উপন্যাস হিসেবে অভিহিত করা। তবে মুরাদ কিবরিয়া হেঁটেছেন উপন্যাস এবং সার্থকতার পথে। রশিদের এক ধরণের নিরাসক্তি, নির্লিপ্ততা, ধ্যানীর মতো ধর্মপালন আবার যাদের সে আপন মনে করেছে তাদের জন্য ব্যাপক ক্যাওস সৃষ্টি করার মতো প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব আছে তাঁর।
মেঘবতি, রেঁনেসা, লায়লা, অথবা বোন রূকুর জন্য ক্রন্দনরত, ব্যথিত মন নিয়ে পথ চলা রশিদের ক্লান্তিকর পথের দৈর্ঘ্য যেন উপন্যাসের চেয়ে অনেক বড়। বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি-ভ্রান্তিতে ভুগা রশিদের মধ্যে আছে অভিনব এক শিশুর মতো মন। তাঁর দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক পথ-পরিক্রমা এবং জিজ্ঞাসা পাঠকের মনকে ঝাঁকিয়ে দিতে পারে।
লেখক যেরকম ভাষার নিজস্বতা, মাত্রাবোধ দেখিয়েছেন প্রথম উপন্যাসেই তা আমাকে বেশ খানিকটা আশ্চর্যই করেছে। রশিদসহ মুরাদ কিবরিয়ার সৃজন করা উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্রগুলোর চিত্রায়ণ ফিকশন এবং বাস্তবতার এক অপরূপ মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে। আমার মনে হয় এক ঘোরের মাধ্যমে পাঠকের সংবেদী মনকে জাগ্রত করার কারণে এ উপন্যাসের সার্থক নামকরণ হয়েছে 'নিনাদ'। উক্ত উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে বললে বাড়িয়ে বলা হয় না।
বই রিভিউ
নাম : নিনাদ লেখক : মুরাদ কিবরিয়া প্রথম প্রকাশ : ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ প্রকাশক : দুয়েন্দে পাবলিকেশন্স প্রচ্ছদ : শফিক শাহীন জনরা : সামাজিক উপন্যাস, একশন, থ্রিলার, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে মানুষকে যে অনুসন্ধান তাড়া করে ফিরছে তা হলো নিজেকে জানবার আকুলতা। হয়তো, প্রথম শহরের ইট গাঁথবার আগে, কিংবা আগুনের উষ্ণতা আবিষ্কারেরও বহু আগে তার ভেতরে জেগে উঠেছিল কিছু প্রশ্ন। এমন সব প্রশ্ন যারা জন্ম নিয়েছে অমরত্ব নিয়ে। সময়ের সাথে যারা পুরোনো হয় না, বরং হয়ে ওঠে আরো প্রাসঙ্গিক। এবং এই প্রশ্ন গুলোই হয়তো তাকে ধাবিত করেছে সভ্যতার দিকে। আমি কে? কোথা হতে আমার উৎপত্তি? জীবন নামের এই অনিশ্চিত যাত্রাপথের সাথে কে জুড়ে দিল আমায়? কে পরিয়ে দিল আমায় সময় আর ভবিতব্যের মালা? এই দীর্ঘ পথচলার শেষ গন্তব্যও বা কোথায়?
মানুষ মহাসাগরের বুকে খোদাই করেছে পথ, জয় করেছে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ , মেপেছে নক্ষত্রের দূরত্ব, নিজ পদচিহ্ন এঁকেছে চাঁদের মাটিতে, উন্মোচন করেছে পরমাণুর অন্তর্গত রহস্য। এই করতে করতে এমনকি জীবনের নিজস্ব নকশাকেও পরিবর্তন করতে শিখেছে। তবুও নিজের অস্তিত্বের এই কয়েকটি প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়ালে আজও অসহায় হয়ে পড়ে সে। মনে হয়, মানবজাতির সবচেয়ে দীর্ঘ ও দুরূহ অভিযান কোনো অজানা মহাজগৎ কিংবা মহাশূন্যের উদ্দেশে নয়; বরং নিজের অস্তিত্বের অচেনা এক ভূখণ্ডের দিকে, যেখানে প্রতিটি মানুষ একই সঙ্গে পথিক, মানচিত্রকার এবং গন্তব্য।
সহস্রাব্দ ধরে দর্শন তার যুক্তি নিয়ে, ধর্ম তার বিশ্বাস নিয়ে, সাহিত্য তার কল্পনা নিয়ে, আর বিজ্ঞান তার অনুসন্ধিৎসা নিয়ে এই রহস্যের দ্বারে কড়া নেড়েছে। কেউ কখনোই সম্পূর্ণ উত্তর পায়নি, কারণ হয়তো এই প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তরই নেই; অথবা উত্তরটা সীমাবদ্ধ নয় আভিধানিক কোনো তত্ত্বে। প্রত্যেক মানুষকে নিজের জীবন দিয়েই তার উত্তর লিখতে হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পূজনীয় জ্ঞানী ব্যক্তিরা বারংবার বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন ভঙ্গিমায়, বিভিন্ন সময়ে আওড়ে গেছেন "নো দাই-সেলফ" কিংবা "আত্মানং বিদ্ধি" কিংবা প্রাচীন মন্দিরে খোদাই করে লেখা হয়েছে "গ্নোথি সেয়াউতোন"। আবার বলা হয়ে থাকে, " হি হু কনকিউরস হিমসেলফ ইজ দ্য মাইটেস্ট ওয়ারিয়র" কিংবা " হোয়াট লাইজ বিহাইন্ড আস অ্যান্ড হোয়াট লাইজ বিফোর আস আর টাইনি ম্যাটারস কম্পেয়ার্ড টু হোয়াট লাইজ উইদিন আস "। এইযে এত বড় বড় জ্ঞানগর্ভ সব কথা। এই সবগুলোরই অর্থ কিংবা সারমর্ম কিন্তু একই। আর তা হলো - নিজেকে জানো। যে নিজেকে জেনে ফেলেছে সে নাকি সবকিছু জেনে ফেলেছে। কথা হয়তো সত্য। তবে নিজেকে জানবার পথ আসলে কী? কিংবা সত্যিকার অর্থে নিজেকে জানবার উপায় কী? কে কবে পেরেছে নিজেকে জানতে?
২.
নিনাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ শব্দ বা ধ্বনি। জীবনের স্রোতে ভাসতে থাকা এক চরিত্র মো: আব্দুর রশিদ; সমাজের কাছে যে পরিচিত কুফা রশিদ নামে। ছেলেবেলাতেই সে পরিচয় পেয়েছে সমাজের স্বাভাবিক অস্বাভাবিকতার। পরিচিত হয়েছে মানুষের অন্ধকার দিক গুলোর সাথে। এবং অজান্তে নিজেকেও জড়িয়ে ফেলেছে সেসবে।
রশিদ জেদি তবে নির্মোহ। পৃথিবীর সকলের থেকে পালিয়ে বেড়াতে চায় সে অথচ একই সাথে মমতারও কাঙাল। মমতার তৃষ্ণা তাড়া করে ফেরে তাকে অবশ্য কারোর থেকে কোনো প্রত্যাশা তার নেই। তবুও হঠাৎ এক ফোঁটা ভালোবাসা কারোর থেকে পেলে সেই প্রিয়জনদের জন্যে সে হয়ে উঠতে পারে তাণ্ডবসম।
রশিদ নিজের মনের কথা কাউকে বলেনা। বলার প্রয়োজন মনে করেনা। কারণ চারপাশের মানুষের সাথে সাথে নিজেও নিজেকে সে কুফা হিসেবে ধরে নিয়েছে। নিজের সাথেই নিজের রয়েছে তার গভীর বিরোধ। তার ভেতর একই সাথে বাস করে এক হিংস্র পশু এবং এক পাখি। জীবনের বাঁকে বাঁকে আঘাত পেতে পেতে ত্যক্ত বিরক্ত পাখিটা হারিয়ে যায় আচমকা এবং রশিদকে ফেলে যায় একা এক হিংস্র পশুর সঙ্গী করে।
রশিদ বিপজ্জনক। রশিদ নিষ্ঠুর। তবে প্রবলভাবে আধ্যাত্মিক এবং কোমল। সে মানুষ চেনে। সমাজ চেনে। চেনে মানুষের ভেতরের আলো এবং অন্ধকারকে। তবু নিজেকে চিনে উঠতে পারেনা ঠিক। পৃথিবীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ নয়। তার জীবনের ঘটনাপ্রবাহ গুলো তার মনে জন্ম দেয় দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। আর তাই - "নিনাদ" হয়ে উঠেছে মো: আব্দুর রশিদের গিলে ফেলা সব অভিমান, লুকিয়ে রাখা বিষাদ, দুনিয়া ও মানুষকে পর্যবেক্ষণের তার নিজস্ব ভঙ্গির পরিচয়, না চাইতেও জড়িয়ে পড়া অপ্রত্যাশিত অথচ সাহসী ও আশ্চর্য সব ঘটনাপ্রবাহ, এবং তার দুঃখজর্জরিত ধ্যানী মনস্তাত্ত্বিকতার উপাখ্যান।
৩.
উত্তম পুরুষে বর্ণিত নিনাদ শুরু হয় রশিদের শৈশবের গল্প দিয়ে। তার কুফা রশিদ হয়ে ওঠার গল্প। তার পরিবারের গল্প। এবং তার ভেতরে এক পাখি ও এক পশুর জন্ম নেওয়ার গল্প। প্রথম অধ্যায়েই, বিশেষত প্রথম লাইনেই, পাঠককে আটকে ফেলার ক্ষমতা রয়েছে নিনাদ-এর। দশ বছর বয়সের এক ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে অবহেলিত শিশুর কাহিনির সূচনা, সেই কাহিনি ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক জটিল, ক্ষতবিক্ষত ও সংঘাতে জর্জরিত মানুষের জীবনগাথায়। যার অন্তিম গন্তব্য সম্পর্কে সে নিজেও অজ্ঞাত।
রশিদ ছোট থেকে বিতাড়িত। বঞ্চিত। জীবনস্রোত তাকে নানান জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফেলে। পরিচয় করিয়ে দেয় নানান চরিত্রদের সাথে। যারা হয়ে ওঠে তার জীবনের একেকটা অংশ কিংবা স্মৃতি। এবং সব কিছুরই ইতিতে রশিদের হাতে ঘটে যায় একেকটা ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা বলা যায় এক পক্ষের জন্যে তা ধ্বংস হলেও অন্যের জন্যে আশীর্বাদ।
রশিদের বাস পোশাকি সমাজ থেকে অনেকটা দূরে। আর যেহেতু সমাজের সাধারণ ও সুযোগসন্ধানী উভয় মানুষদেরই স্বাভাবিকের চাইতে অস্বাভাবিকের প্রতিই আনুগত্য বেশি তাই রশিদ না চাইলেও তার জীবনে আসে নানান ধাঁচের মানুষ। এবং সাথে করে নিয়ে আসে বিভিন্ন মতবাদ। দৃষ্টিভঙ্গি। অনুভূতি। এমনকি যুদ্ধও। সে হয়ে ওঠে সমাজ এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রবল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। যার কারণে তার জীবন বাংলাদেশের এক ছোট্ট গ্রাম থেকে ভারত, পাকিস্তানের মাটি এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত বিস্তৃতি পায়।
৪.
মানুষের মতবাদ এবং দৃষ্টিভঙ্গি আশ্চর্যরকমের হয়ে থাকে। আর তাই পেছনের গল্প, কারণ সমূহ ইত্যাদি সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রবল সোশিওপ্যাথ কিংবা সাইকোপ্যাথের প্রতিও মমত্ববোধ জাগানো যায় মানুষের মনে। আবার চাইলেই আপাততদৃষ্টিতে ভালো চমৎকার ঘরানার মানুষের কিছু দোষ বৃহৎ পরিসরে বিচার করে পরিণত করা যায় তাকে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিতে।
নিনাদ তো মো: আব্দুর রশিদ কিংবা কুফা রশিদের জীবনের গল্প। তার মনস্তাত্ত্বিকতার গল্প। তবে সে কেমন? সে নায়ক নাকি খলনায়ক? সুন্দর না কুৎসিত? কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তাকে?
না রশিদকে আমি হিরোয়িক কোনো ক্যারেক্টার বলবো না। আবার সরাসরি ভিলেনও বলব না। যদিও অ্যান্টিহিরো হিসেবে তাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় তবে আমি তাকে তার ভাষায়ই সংজ্ঞায়িত করাটা বেশি যৌক্তিক মনে করছি। কারণ রশিদ তো জীবনকে প্রশ্ন করতে জানে। রশিদ জানে মানুষের একমাত্র যুদ্ধ তার নিজের সাথেই নিজের। রশিদ জানে জীবন এবং মৃত্যু এবং তার মাঝে থাকা সময়টুকু একই সূক্ষ্ম সুতোয় বাঁধা। আর তাই মো: আব্দুর রশিদ কিংবা কুফা রশিদ হলো গোটা পৃথিবীকে এবং নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত এবং পুণ্যের অভিশাপ বয়ে চলা এক পৌরাণিক চরিত্র। যে হয়তো সবটা জেনে গিয়েছে আবার কিছুই জানতে পারেনি। যে নিজের কিংবা পৃথিবীর অন্তিম মুহূর্তের দিকে হেঁটে চলেছে নিজের ভবিতব্য কিংবা কর্মফলের পাশাপাশি।
৫.
নিনাদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এর চরিত্রায়ন এবং গতিশীল লিরিক্যাল লেখার ধাঁচ। একটা উপন্যাস হলেও এর প্রতিটা অধ্যায়কেই রশিদের জীবনের একেক সময়ের একেকটা গল্প বলা যায়। বলা যায় তার উপলব্ধি এবং দ্বন্দ্বের সমাহার। এবং মাত্র আড়াইশো পেজের একটা বইয়ে এত এত গল্প আটানো বিরাট একটা সার্থকতা। এই বইয়ে আছে রহস্য, আছে থ্রিল এবং মনস্তাত্ত্বিকতাও। যদিও বা পড়তে পড়তে একটা সময়ে খেই হারিয়ে রশিদের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ গুলোকে অতিরিক্ত মেলোড্রামাটিক বলে মনে হয়েছে তবে লেখার জোরেই হয়তো শেষপর্যন্ত গল্পটা খারাপ আর লাগতে দেয়নি নিজেকে। আর তাই নিনাদকে আমার মনে থাকবে অনেকদিন।
৬.
নিনাদ পড়তে পড়তে যেমন হঠাৎ-ই অস্থিরতা গ্রাস করে হৃদয়কে। তেমনই শেষও হয় অদ্ভুত এক হাহাকার নিয়ে। এবং পড়ে যেতে হয় তীব্র অস্তিত্ব সংকটে। লেখক রশিদ চরিত্রটা তৈরি করতে যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন তা প্রশংসাযোগ্য। আর তাই জন্যেই রশিদের মতো একই সুরে পাঠকের হৃদয়েও প্রশ্ন তোলে কেউ একজন, ব্যক্তিগত জীবন নাকি বৃহত্তর স্বার্থ কোনটা বড় বেশি? কোথাকার দুঃখ প্রবল? বলা হয়ে থাকে, এত বড় মহাজগতে মানুষের অস্তিত্ব এক বিন্দুর থেকেও ক্ষুদ্রতর তবে কেন কাতর হয়ে ওঠে মানুষ অনুভূতির দংশনে? এত এত প্রশ্ন কেউ কী উত্তর খুঁজে পাবে কখনো?
আচ্ছা, রশিদের কাছে জীবন কী? শুধুই কি তকদীর নামের এক বহমান স্রোত? হারিয়ে ফেলা শৈশব? অপমান কিংবা দুঃখ কষ্টে জর্জিত হওয়া হৃদয়? নাকি না চাইতেও প্রেম, প্রতিশোধ, যুদ্ধ, হ ত্যায় জড়িয়ে একে একে শূন্য হয়ে যাওয়া আরও? আমার অবশ্য মনে হয় রশিদ অথবা কুফা রশিদের জীবন আসলে হারিয়ে যাওয়া এক শতবর্ষী পুরোনো পয়সা যার গল্প কোনোদিন শোনা হবেনা। অথবা দীর্ঘদিন বয়ে চলতে চলতে হঠাৎ হারিয়ে ফেলা একটা চিঠির খাম! যার অস্তিত্ব বিলীনের সাথে সাথে দুনিয়ার জাগতিক সমস্তকিছু থেকে মুক্ত হওয়ার অন্তিম ঘণ্টা বেজে ওঠে! অথবা অন্তরের সাথে, ঈশ্বরের সাথে বাহাস করতে করতে হঠাৎ তারই কাছে পৌঁছনোর যাত্রা। বিভিন্ন বিন্দু হতে একে একে মহাশূন্যতার পথে মিলিত হওয়ার এক যাত্রা। আচ্ছা, আমাদের সকলের জীবনই কী তাই নয়! কে জানে, হবে হয়তো! কেইবা কবে উন্মোচন করতে পেরেছে জীবনের রহস্য..!
ছোট্ট রশিদ হাসপাতাল থেকে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার সময় তার মা যখন খেয়াঘাটে নদীর পানিতে দুলতে থাকা নৌকায় এক পা দিয়েছে আরেক পা শূন্যে তখন রশিদের মনে হয় মা তাকে ফেলে চলে যাচ্ছে, আকুল হয়ে সে বাতাসে ভাসা মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে টান দেয় আর তাতে মায়ের পা পিছলে ঘাটের বড় পাথরের উপরে পড়ে মাথা ফেটে মারা যায়। সেই থেকে রক্ত আর অশ্রু রশিদের সঙ্গী। যেখানেই যায় সেখানেই কিছু না-কিছু এমন ঘটে, রক্ত ঝরে। সে যেন নিয়তির হাতের পুতুল। তার যাওয়া আছে, আসা নেই। রশিদ যেখান থেকে চলে যায় সেখানে তার নিয়তি তাকে আর ফিরিয়ে আনে না। একটা সময় রশিদ জীবনকে আকড়ে ধরতে চাইলেও নিয়তি তাকে সে সুযোগ দেয় না। এরপর রশিদ আর কখনো জীবনকে ধরতে চায়নি হাতের মুঠোয়। রশিদের এই চরম উদাসীনতা পাঠককেও ছুঁয়ে যায়। আমাদের অনেকের জীবনের গল্পও তো এমনই। মুরাদ কিবরিয়ার ক্ষেত্রে একটা কথা সব সময়ই স্বীকার করতে হবে উনার গদ্য ভীষণ সুন্দর। তীরতীর করে বয়ে চলা ঠান্ডা পানির স্বচ্ছতোয়া নদীর মতন। উনার ‘প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু’ পড়ে ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। ‘ক্যাফে রেভুল্যুশন’ ও চমৎকার বই। নিনাদ পড়তে ভালো লাগলেও কিছুটা অতৃপ্তি রয়ে গেল। প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু আর নিনাদ দুটো উপন্যাসের মূল চরিত্র মনে হচ্ছিল একই ছাচে গড়া, যেন দুই জমজ ভাই। একই রকম উদাসীনতা, একই ভাবনার গতিপথ, একই স্বল্পবাক, একই একাকীত্ব, একই রকম খুন-খারাপি, একই রকম রক্তে রাঙা হাত। আর রশিদের জীবনের পথ একটু বেশিই নাটকীয় লেগেছে। প্রেম প্রার্থনা মৃত্যূ আগে পড়ে ফেলার কারণে নিনাদ আমার কাছে রেটিং কম পাবে। নিনাদ আগে পড়লে হয়তো হাত খোলে রেটিং দিতে পারতাম। যারা এই দুটো বইয়ের একটা পড়ে ফেলেছেন তারা বাকি বইটা বড় একটা গ্যাপ দিয়ে পড়িয়েন। তাহলে আমার মতন ভ্যাজালে পড়বেন না।
কখনো মনে হয়েছে এটা থ্রিলার, উপন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক বই, ফিলোসোফির বই, অ্যাডভেঞ্জারাস বই, আত্নজীবনী গ্রন্থ, সবশেষে মনে হয়েছে, এটা একটা ভালোবাসার গল্প। মানুষ যা কিছুর পেছনেই ছোটে না কেন, ভালোবাসার জন্যই তো ছোটে। লেখকের লেখার হাত ভালো, পাঠক ধরে রাখার মত বই। এর পরে কি হবে? এটার পর কি ঘটবে? শেষে কি হবে? এইসব আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়া অল্প কিছু বইয়ের মধ্যে নিনাদ একটি। পড়ার সময় এমন এমন লাইন চলে আসবে, ইচ্ছে হবে লাইনগুলো ব্যক্তিগত ডায়েরিতে তুলে রাখি। জীবনকে, মনকে, মস্তিষ্ককে, হৃদয়কে একদম ময়নাতদন্ত করে দেবার মত লাইন!
মানুষ যদি শয়তানের খপ্পরে পড়ে খারাপ হয়ে যায় তাহলে জিতে যায় শয়তান, আর ভালো হয়ে গেলে জিতে যায় আল্লাহ। সৃষ্টিকর্তা, তাহলে এখানে মানুষ কোথায়?!
বই : নিনাদ লেখক : মুরাদ কিবরিয়া প্রকাশক : দুয়েন্দে পাবলিকেশন্স পৃষ্টা : ২৫৬
আব্দুর রশিদ। বাচ্চাকালে তারই পরোক্ষ কারণে দৈব্যক্রমে মা মারা যায়। আর সাথে জুটে যায় "কুফা রশিদ'' পদবি। এই কুফা পদবি কিংবা সৎ মায়ের কারণে ঘরে ঠাই হয়না রশিদের। আশ্রিত হতে হয় আত্মীয়ের বাড়িতে। চরম নিগ্রহ আর কুফা পদবির গ্লানি বয়ে বেড়ায় রশিদ। কখনও মনের ভেতরে ডেকে ওঠে পাখি, কখনও পশুর হিংস্রতা। দীর্ঘদিন পর দারুণ আকাঙ্খা নিয়ে নিজ বাড়িতে যায় রশিদ - ভাবে বাবার ভালোবাসা পাবে। কিন্তু হায়! আশায় গুড়েবালি। নিজ পিতার অপমান সইতে না পেরে মনের পশু অজান্তেই জেগে ওঠে। রাতের আঁধারে কুফা রশিদ পিতার হন্তারক হয়। অলৌকিক ভাবে হত্যার দায় থেকে বেচেও যায়। অতঃপর একের পর এক নাটকীয়তা রশিদের স্থান হয় মাদ্রাসায়, গৃহশিক্ষক হিসেবে। সেখান থেকে বাউল গানের দল, নিষিদ্ধ পল্লী, জেলখানা, জেলপালানো, কমিউনিস্ট বিপ্লবীর দল, প্রেমে পড়া, জ/ঙ্গী সংগঠন, আফগান, পাকিস্তান প্রভৃতি - কি নেই গল্পে। লেখক গল্পের মূল চরিত্রকে হোয়াইট বা ব্ল্যাকে না রেখে গ্রে স্যাডো দিয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যখন রশিদের পরিণতি করুণ হতে যাচ্ছে ঠিক তখন দারুণ নাটকীয়ভাবে পরিস্থিতি উতরেও যাচ্ছে। গল্প গতিশীল, একটু বেশিই গতিশীল। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে উঠে এসেছে দার্শনিকতার ছোঁয়া। কিছু কিছু দার্শনিকতায় মোড়ানো উক্তি এতো ভালো লেগেছে, ইচ্ছে হচ্ছিলো টুকে নেই নোটবুকে। লেখক মুরাদ কিবরিয়ার গদ্যশৈলী চমৎকার। একটানা পড়ে যেতে ইচ্ছে করে। গল্পটাও দারুণ মেলানকোলিতে ভরা।
বইয়ের নেগেটিভ পয়েন্ট হলো অতিনাটকীয়তা। রশিদের নিয়তিই যেনো বারবার অলৌকিকভাবে ঠেলে দিচ্ছিলো মেলোড্রামায়। শুরুর থেকে মাঝ অবধি এই অতিনাটকীয়তা উপভোগ্য হলেও, শেষে গিয়ে কিঞ্চিৎ বিরক্তই হয়েছি। বিশেষত নায়কের আফগান যুদ্ধে জড়ানো থেকে। লেখকের প্রথম উপন্যাস হিসেবে সূচনা বেশ ভালো বলাই যায়। দেখা যাক "প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু'' উপন্যাস এটিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কিনা।
খুব কমই বই-ই রয়েছে যার প্রথম লাইন পড়ার পরই পাঠককে গল্পের ভিতরে একেবারে টেনে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। অন্তত আমি এখনো তেমন বই পড়িনি, "নিনাদ" সেই ব্যতিক্রমী একটা বই।
সত্যি বলতে একদম অনিচ্ছায় বইটা পড়ার জন্য বের করেছিলাম। কিন্তু পড়া শুরু করার পর আমি যেন 'নিনাদ' চক্রে ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছিলাম এবং শেষ করার পর এখনো তাই হচ্ছে...। গল্পটা একজন হতভাগা কিংবা তাকদীরে'র ফেরে ছুটে চলা এক কিশোর কিংবা যুবকের।
সেই কিশোরের গল্প শুরু হয় নদীতীরে মায়ের হলুদ শাড়ির পার ধরে। মাতা ও পিতৃহন্তা উপাধি কিংবা ভালোবাসা না পাওয়ার আক্ষেপ কিংবা অভিশাপে তরুণ গ্রাম থেকে শহর, জেলখানা থেকে যুদ্ধের ময়দানে তাকদীরের ফেরে ঘুরে বেড়ায়।
"নিনাদ" অন্তত আমার কাছে বর্তমান সাহিত্যের সর্বসেরা একটি মহাকাব্য।
গত ৩দিনে ৩টা উপন্যাস শেষ করে ২টার রিভিউ লেখে এই ৩ নাম্বারটির রিভিউ করা বেশ কষ্টের ব্যাপার। কিন্তু না লিখলে যে মাথার ভেতরের শব্দের ঝংকার মিইয়ে যাবে মাথার ভেতরেই। বলা যায় শব্দের গোরস্থান হয়ে যাবে মাথাটা। তাই রশিদ হোক বা 'কুফা' রশিদ যেই হোক, তার মতো চুপ করে সব সয়ে নিতে পারবো না বলেই এই রিভিউ। তো শুরু করা যাক...
লম্বা রিভিউর আগে ছোট করে শুধু একটু বলতে চাই। অনেকের লম্বা লেখা পড়ার ধৈর্য বা সময় নেই বলে। 'নিনাদ' মুলত ভাগ্যের ফেরে 'কুফা' ট্যাগ খাওয়া একজন রশিদের গল্প। যার জীবন ছোট একটা ঘটনার পর থেকে আমুল বদলে যায় সেই ছোট্ট বেলাতেই। ঘর ছাড়তেও হয় সেই কারণে।
রশিদ ঘুরে ফিরে পথে-প্রান্তরে। কখনো একটু 'ভালোবাসা' বা 'মমতা' তাকে আটকে রাখে সেই ছোট্ট জমিনে। কিন্তু সেই জমিনে তার আর বসা হয় না। সে ভালোবাসার টানে রক্তের খেলায় জড়িয়ে পরে। সে যেখানেই যাক। মুলত রশিদ তার ভাষায় 'মৃত্যু' সাথে নিয়ে ফেরে। সে যেখানেই যাক, কারো না কারো মৃত্যু হবেই।
এভাবে আগাইতে আগাইতে রশিদ একসময় ঘরে ফেরে। ২৫ বছর বয়েসে সে ঘরে ফেরে। তখনও তার হাতে লেগে থাকে 'রক্ত'।তার ভেতরের গম্ভীর শব্দ বা গর্জন কেই লেখক 'নিনাদ' বলেছেন। মুলত 'রশিদ' কি বা এমন কেন? তার কিসের অভাব মূলত? এগুলো জানার জন্য বইটা পড়ছি।
বাংলাদেশে ছাড়িয়ে এই কাহিনি গিয়ে ঠেকেছে 'পাকিস্তান-আফগান' এ ও। কাবুল,কান্দাহার, পেশাওয়ার, দিল্লির ছোয়া এই কাহিনিরে একটা শক্ত অবস্থান দেয়। পড়তে গিয়ে মনে হতে পারে 'থ্রিল' পড়তেছি। আবার মনে হতে পারে 'ক্লাসিক' কোনো কিছু পড়তেছি৷
নিচের অংশটা হালকা বিস্তারিত –
❝আমি বুঝে এগারো বছর বয়স হলে তাকে আর মিথ্যা প্রবোধ দেওয়া যায় না।❞
রশিদের পুরো বর্ণনা লেখক আমাদের কে ফাস্ট পার্সনে বলেছেন। রশিদের নিজের ভাষায়। রশিদ আসলে কেমন মানুষ? পুরো বই জুড়ে আপনি হয়তো এসব ভাবতে ভাবতে এগোবেন। কিন্তু সে ভাবনা–চিন্তা শেষ হওয়ার আগে আপনি দেখবেন লেখক আপনাকে আগের চেয়ে একটু অন্যরকম রশিদের সাথে পরিচয় করাচ্ছেন।
শুরু হয় রশিদের ছোট্ট গ্রামে রশিদ আর তার 'আম্মি'র মাঝে হয়ে যাওয়া ঘটনা দিয়ে। ছোট এই ঘটনায় তার নাম ফুটে যায় 'কুফা রশিদ' হিসেবে। বইয়ের প্রথম অংশে আমার মনে হয়েছে বারবার রশিদ কেনো এমন করছে? কেনো তেমন করছে? পরবর্তী তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে 'সামান্য' একটু 'ভালোবাসা'র কাঙাল এই রশিদ চরিত্র।
আরো সামনে আগাই আর ভাবি এ কি আসলেই শুধু ভালোবাসার বিষয়? না কি রশিদ এক সাইকোপ্যাথ? না রশিদের মানসিক বিচ্যুতি আছে? আসলে রশিদ কি? এসব উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ১০০ পৃষ্ঠা পার হয়ে যাই। লেখকের কলমের খোঁচা আমাকে স্থির হতে দেয় না। গল্পটা নাটকীয় ও বোল্ডনেস এ ভর্তি। কাহিনি সাবলীল ভাবে আগায় তবে প্রচুর তাড়াতাড়ি আগায়।
রশিদের সাথে করে সম্ভবত লেখক আমাকে স্বাধীনতার পরবর্তী মুজিব আমলে ঘুরায়ে আনছেন। বিপ্লব বিপ্লব আওয়াজে বইয়ের একটা অংশ মুখরিত ছিল তখনের গল্প। আর সেই গল্পে লেখক আমাদের দেশের তখনকার অবস্থানের সামান্যটাই দেখান। 'কমিউনিজম' বিপ্লবের উপর ভর করা বিপ্লবীদের কয়েকটা চরিত্র আর রশিদ রে নিয়ে আগায় আমাদের গল্প।
তারপর বিপ্লবীদের সাথে রশিদের পরিচয়ের পর আমি আরো আগাই। আগাইতে গিয়ে পেছনে ফেলে আসা 'ওবায়েদ' ডাক্তারের মেয়ে 'রেনেসাঁ' উঠে আসে। রশিদের জীবন তখন একটু অন্যরকম যায়। সেই মেয়ের সাথে এক রিকশায় পুরো খুলনা শহর ঘুরা। নিজেদের কে একে অপরের কাছে মেলে ধরাও বলা যায় একে। কিন্তু প্রচলিত কোনো প্রেমের উপস্থিতি তাদের মাঝে পাওয়া যায় না। তারপর আসে রশিদের 'জি হা দি' হয়ে উঠার গল্প!
আসলে কি রশিদ 'জি হা দি' হইতে চায়? তার পুরো জীবনে যে কয়টা ঘটনা ঘটে সে কয়টা ঘটনা কি 'রশিদ' নিজে চায়? না আসলে, রশিদ বরং সময়ের আর গটনার স্রোতের টানে ভাসে। বলতে গেলে রশিদ রে জীবনের এক 'গাঙ' থেকে অন্য 'গাঙে' ভাসাইয়া নেয়।
আর এভাবে ভাসতে ভাসতে আমরা উপন্যাসের শেষ দিকে আগাই। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য বেশ কয়েকটি চরিত্র আসে। রশিদে 'ভারত-পাকিস্তান-আফগান' হয়ে আবার একসময় দেশে ফিরে সম্ভবত। কিন্তু রশিদ কি আদৌ ফিরে? আমি আসলে বুঝিনা।
মুলত রশিদের মতো করে বলতে হয় 'আমি বুঝি না, কিংবা হয়তো বুঝি।' রশিদের ভাঙা এই জীবনের কাহিনি এখানে শেষ হলেও পারতো। কিন্ত যে রশিদের হাতে এতো রক্ত! সে রশিদের জন্য দেশে আইসাও চমক থাকে। নিজের না চেনা রশিদের আবার চেনা কারো সাথে দেখা হয়। তবে এখানেও কি তার হাতে বা ভাগ্যে 'রক্তে'র প্রলেপ পরে কিনা তা জানতে বইটা পড়তে হবে।
হাহাহ,সব যদি বলেই দিই আপনি পড়বেন কি। যদিও বেশ অর্ধেক মনে হয় বলেই দিয়েছি। জানিনা এটা আদৌ রিভিউর কাতারে পরে কিনা। তবে আমি আমার মনের ভাব জানাইলাম।
সমালোচনা করতে গেলে, উপন্যাসটা মাঝে একসময় একটু বেশি নাটুকে মনে হওয়া শুরু হয়। জানিনা কেন! কিন্তু এসব একপাশে রেখে আগাইতে আগাইতে যখন শেষে এসে থামি তখন আবার দার্শনিক আলাপ চালু হয়। তখন রশিদের প্রশ্নগুলোতে বিরক্তি এসে ঝড়ে পড়তে থাকে। তখন মনে হতে থাকে এই কাহিনি শেষ হবে কবে? আর হ্যা, আগের লাল প্রচ্ছদ ভালো লাগছিলো, এটা ভালো লাগে নাই।
এই মাঝে আর শেষে ছাড়া বাকি পুরো টা উপভোগ করেছি। নিজেকে সময় কম দিয়ে কিসের নেশায় জানি পুরো উপন্যাস শেষ করেছি একদিনে। কিছু প্রশ্ন মনে রয়ে গেছে এখনো। সেসব মনে মনে রেখে মনের ভেতর গুমরে মরছি৷ তার ভেতর একটা এরকম খানিকটা!
লেখকদের কিছু কিছু সৃষ্টি থাকে যাকে কোনো মাপেই পরিমাপ করা সম্ভব না। মুরাদ কিবরিয়ার নিনাদ তেমনি একটি সৃষ্টি।
নিনাদ – মুরাদ কিবরিয়া: এক গভীর জীবনবোধের উপন্যাস
নিনাদ মুরাদ কিবরিয়া’র একটি বাস্তবিক এবং আবেগপ্রবণ উপন্যাস, যেখানে প্রতিটি চরিত্রের জীবনদর্শন, একাকীত্ব এবং সংকটগুলো পাঠকের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়। কিবরিয়া গল্প বলার যে অদ্ভুত ক্ষমতা দেখিয়েছেন, সেটা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। তাঁর লেখায় এমন এক ধরনের সত্যবোধ ও অনুশীলন রয়েছে, যা প্রতিটি পৃষ্ঠায় পাঠককে একটি অনুভূতিপূর্ণ ভ্রমণে নিয়ে যায়।
এখন কথা বলা যাক চরিত্র নির্মাণের ব্যাপারে, যা প্রতিটি ফিকশন লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু কিবরিয়া যেন জানেন ঠিক কীভাবে চরিত্রগুলিকে জীবন্ত করে তোলা যায়। নিনাদ এর চরিত্রগুলি শুধু গল্পের অংশ নয়, তারা যেন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বাস্তব জীবনযাপন করছে। তাদের সংকট, তাদের দুঃখ, তাদের হাসি—সবই আমাদের মনে স্থান করে নেয়। এমনকি তাদের একাকীত্বও যেন পাঠকের হৃদয়ের গহীনে প্রবেশ করে, যেখানে নিজের জীবনের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
আর এই চরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে যে মানবিকতা ফুটে উঠেছে, তা একে অন্যের প্রতি সহানুভূতির অনুভূতি জাগায়। কিবরিয়া তাঁদের শুধু জীবন্ত করে তোলেননি, বরং আমাদের সামনে এমন এক পৃথিবী তুলে ধরেছেন যেখানে সত্যিকারের মানুষরা নিজেদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবং সেই পথে নিজেদের খুঁজে পায়।
এখানে নিনাদ এর মূল থিম—ভাগ্য, একাকীত্ব, এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি নির্ভরশীলতা। উপন্যাসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে পৃথিবীতে আমরা যতই শক্তিশালী হই না কেন, একদিন আমাদের ভরসা রাখতে হয় সৃষ্টিকর্তার উপর। তবে, কিবরিয়া সেই উপন্যাসের গল্পে কখনোই পাঠককে দুঃখ বা হতাশায় ফেলে দেন না। বরং, তিনি প্রতিটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে জীবনের অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাবনার দিকগুলো তুলে ধরেছেন। এতে এক ধরনের ভারসাম্য সৃষ্টি হয় যা জীবনকে যেমন কঠিন, তেমনি সুন্দরও করে।
লেখকের ভাষা কখনো মিষ্টি, কখনো দুঃখভরা, কখনো আবার সোজাসাপটা—এই বিভিন্ন শৈলীতে তিনি চরিত্রদের জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন। রিডারের মনে একটা নির্দিষ্ট উত্তেজনা তৈরি থাকে, যেন সে জানতেই চায় পরবর্তী পৃষ্ঠায় কী ঘটবে। এখানে কিবরিয়া এক ধরণের চুম্বকীয় শক্তি সৃষ্টি করেছেন, যা পাঠককে গল্পের মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়।
গল্পের গতি এতটা মসৃণ, যে কোনো অদৃশ্য বাঁধা পাঠককে থামাতে পারে না। প্রতিটি ঘটনা একের পর এক উন্মোচিত হতে থাকে, যেন মনে হয় এক স্রোতে ভেসে চলা এক জীবনযাত্রা।
আরেকটি দিক যা নিনাদ এর বিশেষত্ব, তা হল এর আবেগ। কিবরিয়া যেমন চরিত্রদের বেদনাকে কল্পনাশক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি তাদের মধ্যে যে মানবিকতা, আশা এবং সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিও আমাদের আবেগের সঠিক স্থানে পৌঁছায়। একটি উপন্যাসের সফলতা সেখানেই—যতটা মানুষ ভাবতে পারে, সেভাবেই সে আবেগকে পৌঁছে দেয়। কিবরিয়া এই বিষয়টি সুন্দরভাবে ধারণ করেছেন।
নিনাদ শুধু এক লম্বা গল্প নয়, এটি একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা—যেখানে পাঠক নিজের জীবন, নিজের অন্তর্দ্বন্দ্ব, এবং পৃথিবী সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে। কিবরিয়া’র লেখায় নিখুঁত মানবিকতা, চিন্তাশীলতা এবং একটি পৃথিবীজুড়ে মানুষের একাকীত্বের সার্বজনীন অনুভূতি ফুটে উঠেছে। এক কথায়, নিনাদ পাঠককে এক নতুন দৃষ্টিকোণ এবং জীবনবোধ উপহার দেয়, যা তাকে দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা করতে বাধ্য করবে।
এটি এমন একটি উপন্যাস, যা একে একে মানুষকে তার অন্তর্দৃষ্টি এবং আবেগের দিকে টেনে নিয়ে যায়—আর এই যাত্রায়, কিবরিয়া প্রমাণ করেছেন যে তিনি শুধু একজন লেখক নন, একজন সৃষ্টিশীল শিল্পী, যিনি সাহিত্যকে জীবন্ত করে তোলেন।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: "মানুষ যদি শতানের খপরে খারাপ হয়ে যায় তাহলে জিতে যায় শয়তান, আর যদি ভালো হয়ে যায় তাহলে জিতে যায় আল্লাহ্, সৃষ্টিকর্তা তাহলে এইখানে মানুষ কোথায়?"
‘নিনাদ’ এটি শুধু একটি উপন্যাস নয়, বরং এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক যাত্রা, যা পাঠকের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মোঃ আব্দুর রশিদ, যিনি ছোটবেলায় ভালোবাসা ও মমতার অভাবে বেড়ে ওঠা এক বিষাদগ্রস্ত আত্মা। সমাজের নির্মমতা, ব্যক্তিগত বঞ্চনা ও তার নিজস্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব মিলে তাকে এক অপ্রচলিত পথে ঠেলে দেয়। তার এই যাত্রা কখনো একজন নিরাসক্ত চিন্তকের, কখনো এক বিপদজনক প্রতিশোধপরায়ণ ব্যক্তির।
রশিদের জীবনের গল্প এক সাধারণ মানুষের আত্মসংকটের গল্প হলেও, এটি বহুমাত্রিক এক উপাখ্যান। একদিকে তার ধর্মীয় অনুসন্ধিৎসা, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার লড়াইয়ে তার অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে পড়া—এ দুটি দিক উপন্যাসটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। কমিউনিজম ও ইসলামিজমের সংঘাতে যখন রাষ্ট্র ও সমাজ দোদুল্যমান, তখন রশিদের মতো এক চরিত্র কীভাবে বিভিন্ন আদর্শের চোরাগলিতে হারিয়ে যায়, সেটি অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
উপন্যাসের পরিধি বিস্তৃত—বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান পর্যন্ত এর বিস্তার। লেখকের ভাষা কখনো ক্ষীপ্র, কখনো কাব্যিক, আবার কখনো নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানের যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, এবং চরিত্রের আত্মপরিচয় সংকটকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে।
রশিদের চরিত্রটি রহস্যময় এবং বহুমাত্রিক। তার হৃদয়ে একই সাথে বাস করে নির্লিপ্ততা ও প্রবল আবেগ। সে ভালোবাসতে চায়, কিন্তু তার আপন করার ভঙ্গিমা স্ববিরোধী। তার জীবনে মেঘবতি, রেঁনেসা, লায়লা কিংবা বোন রুকু—প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সে কারও সাথেই সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হতে পারে না। ছোটবেলার বঞ্চনা তার ব্যক্তিত্বে এমন গভীর ছাপ ফেলেছে যে, সে একদিকে চরম নিরাসক্ত, অন্যদিকে প্রচণ্ড বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
লেখক মুরাদ কিবরিয়া প্রথম উপন্যাসেই এক অভূতপূর্ব সাহিত্যকর্ম উপহার দিয়েছেন। উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ই গভীরভাবে চিন্তাশীল এবং প্রতীকী। যেমন, প্রথম অধ্যায়ের ‘পশু পাখির ইতিহাস’ শিরোনামটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, তা আসলে মানুষের মনোজগতের প্রতীকী চিত্রায়ণ। একইভাবে শেষ অধ্যায় ‘মুসাফিরের সাতটি জীবন’—একটি পরিণতির গল্প, যেখানে রশিদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও যাত্রার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশিত হয়।
‘নিনাদ’ শুধুমাত্র একটি চরিত্রের কাহিনি নয়, বরং এটি এক গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন। এটি এমন এক উপন্যাস, যা পাঠককে বাধ্য করবে নিজের জীবন, একাকীত্ব, বিশ্বাস এবং ভাগ্যের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে। কিবরিয়ার লেখায় এমন এক গভীরতা রয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যের সমসাময়িক ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্যের এই নতুন অধ্যায় নিঃসন্দেহে পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
গল্পের শুরুটাই ভীষণভাবে শকিং এবং ট্র্যাজিক। ছোট্ট রশিদ হাসপাতাল থেকে মায়ের সাথে বাড়ি ফেরার পথে খেয়াঘাটে ঘটে যায় এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা—নৌকায় ওঠার মুহূর্তে মায়ের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। সেই এক মুহূর্তের ঘটনাই রশিদের পুরো জীবনকে উল্টে দেয়। এরপর থেকেই তার জীবনে যেন রক্ত আর অশ্রুই নিত্যসঙ্গী হয়ে যায়। গল্পে রশিদকে এমন এক চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার সাথে বারবার অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। সে যেখানেই যায়, সেখানেই যেন কোনো না কোনো ট্র্যাজেডি বা রক্তক্ষয়ী ঘটনা তার পিছু নেয়। ধীরে ধীরে মনে হতে থাকে, রশিদ যেন নিজের ইচ্ছায় নয়—বরং নিয়তির হাতে একধরনের পুতুল। এই নিয়তি তাকে বারবার ভেঙে দেয়, আবার টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারের দিকে। লেখক মুরাদ কিবরিয়ার লেখনশৈলী এখানে সত্যিই আলাদা। সাবলীল হলেও অনেকটা কাব্যিক ধাঁচের, আর পুরো বই জুড়ে একটা ক্লাসিক উপন্যাসের ভাইব পাওয়া যায়। প্রতিটি ঘটনাই খুব ভারী একটা আবহ তৈরি করে, যা পাঠককে ধীরে ধীরে গল্পের ভেতরে টেনে নিয়ে যায়। রশিদ চরিত্রটি কিছুটা সোশিওপ্যাথ ধাঁচের মনে হয়েছে—তার ভেতরের অস্থিরতা, ঘৃণা আর নিয়তির বিরুদ্ধে লড়াই সব মিলিয়ে চরিত্রটাকে খুব জটিল এবং গভীর করে তুলেছে। মনে হয়েছে, সে শুধু একজন মানুষ নয়—বরং এক ধরনের মানসিক টর্নেডো, যার চারপাশ সবসময় ভাঙনের মধ্যে ঘুরছে। সব মিলিয়ে আমি বলবো, এই বইটি একটি আন্ডাররেটেড মাস্টারপিস। মুরাদ কিবরিয়ার আরও কিছু কাজের সাথে মিল রেখে এই বইটিও একই ধরনের গভীরতা আর অন্ধকার মনস্তত্ত্বের ছাপ রেখে যায়। যারা ডার্ক, সাইকোলজিক্যাল এবং ট্র্যাজিক স্টোরি পছন্দ করেন—তাদের জন্য এটি অবশ্যই পড়ার মতো একটি বই। বই : নিনাদ লেখক : মুরাদ কিবরিয়া জনরা : সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার প্রকাশনী: আদর্শ প্রকাশন
নিনাদ এর মাধ্যমে মুরাদ কিবরিয়ার লেখার সাথে প্রথম পরিচয়। বসন্তের এক মনোরম বিকেলে হাতে তুলে নিয়েছিলাম লেখকের প্রথম উপন্যাস, মূল চরিত্র রশিদের সঙ্গী হয়ে তার অবিশ্বাস্য ঘটনাবহুল জীবনকে কাছ থেকে দেখলাম।
নিনাদ অসম্ভব গতিশীল ভাষায় লেখা, পড়া শুরু হতেই এর বহমানতা আমাকে চমকে দেয়। ক্ষয়িষ্ণু মনোযোগের এই বর্তমানে নিরবচ্ছিন্নভাবে কয়েক পাতা পড়াই যখন দুষ্কর, তখন হঠাৎই আবিষ্কার করি, এক বসায় পড়ে ফেলেছি বইয়ের প্রায় এক চতুর্থাংশ। প্রাঞ্জল বর্ণনা আর কাহিনীর বুনটের গুণে বাংলা সাহিত্যে রশিদ চরিত্রটি দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা এই যখন ভাবছি, তখনই হঠাৎ ছন্দপতন।
উপন্যাসের শেষাংশ যেন অন্য কোন লেখকের লেখা, যিনি দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে রশিদের ওপর ভর করেন আর আগের ফেলে আসা কাহিনীর জটগুলো খোলার চেষ্টা না করে দর্শনের ভেলায় ভাসতে ভাসতে রশিদের ভাষ্যে বলে যেতে থাকেন তার নিজের মনের যত না বলা কথা আর এলোমেলো হেঁয়ালি।
তাই দারুণ একটা শুরুর পরও নিনাদ মুখ থুবড়ে পড়ে, গতিশীল ভাষা আর কাহিনীর চমকপ্রদতাও তাকে টেনে নিয়ে যেতে পারে না সাহিত্যের অন্য উচ্চতায়, সম্ভাবনা জাগিয়েও এর সাহিত্যিক অপমৃত্যু ঘটে।
প্রথম উপন্যাস হিসেবে পাশ মার্ক দেয়াই যায়, তবে লেখকের সাহিত্য প্রতিভার যে স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় নিনাদে, নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে তা আরো পরিণত হবে এবং আরো ভালো ভালো কাজ তার কাছ থেকে আমরা পাব - এই প্রত্যাশা করাই যায়।
কিছু বই আছে না যেগুলোর জন্য মানুষ কমন কিছু সমস্যায় পড়ে। সেই সমস্যার উপন্যাস ‘নিনাদ।’ সমস্যাগুলোর মধ্যে একটা হলো আরে— শেষ হয়ে যাবে তো বইটা। বইয়ের সাথে যে আনন্দময় জার্নি, টেনশনের জার্নি এটাও তো হালকা হয়ে যাবে। অবশেষে তাই হলো। শেষ হয়ে গেল মাথায় মধ্যে একটা চাপ রেখে। বই সম্পর্কে যা বলতে চেয়েছিলাম সেটা দেখলাম সুন্দর করে ফার্স্ট ফ্ল্যাপেই লেখা।
তবে আমার অনূভুতি শেয়ার করা যেতে পারে স্পয়লার এলার্ট রেখে।
রশিদ নামের এক হিরোয়িক ক্যারেক্টারের গল্প। রশিদকে আপনারা কেউ চিনবেন না। রশিদ হওয়া এত সহজ না। আমাদের যে গতানুগতিক জীবন এখানে রশিদ নেই কেউ। তবে রশিদকে পড়তে পড়তে রশিদ হতে ইচ্ছে হবে অনেকেরই। উপমহাদেশের সংকট রশিদ নিজের মতো করে দেখে। বুদ্ধিমান মানুষের মতো ডিল করে সমাজ-মানুষ। যদিও রশিদ জানে মানুষ হলো মাদারচোদ। রশিদের কই মাছের প্রাণ। রশিদ মরতে মরতে বাঁচে। আর গল্প পাঠককে আটকে রাখে। রশিদের জন্য মন খারাপ হয়। রশিদের জন্য মন ভালো হয়।
আহা রশিদ। যেদিকে যায় বিপদ যেন তাকে আকড়ে ধরে। আর বিপদের আঘাতও সাধারণ কিছু না। কিন্তু অসাধারণভাবেই সব মোহ কাটিয়ে রশিদ আমাদের সাহসী হতে শেখাতে চায়।
কমেন্ট- পৃথিবীতে এমন লেখা আছে বলেই পৃথিবীকে এখনো সুন্দর মনে হয়।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বই পড়ুয়া মানুষের বাড়িতে আশপাশে হাজারখানেক বইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে পছন্দমতো একটা বই টেনে নিয়ে পড়তে বসার অনুভূতি ভিন্নরকম... বইয়ের নামটিই আকৃষ্ট করেছিল প্রথমে। তারপর কী যে পড়লাম, এখনো বলতে পারি না৷ তবে এইটুকু বলতে পারি যে, সচরাচর আমরা যে ধরনের উপন্যাস পড়ি, এটি তার থেকে বেশ আলাদা; একেবারে অন্যরকম। দর্শন, ধর্ম, মনস্তত্ত্ব, প্রেম, বিরহ...সবকিছুর মিশেলে মনস্তাত্ত্বিক দিকটিই পাঠককে চুম্বকের মতো টেনে ধরে রাখবে। আর তার টানেই পাঠক এগিয়ে যাবেন শেষ পর্যন্ত। ভাষার গাঁথুনিতেও লেখক তার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বইটি পড়ে পাঠক হতাশ হবেন না এইটুকু বলাই যায়...আর অনুভূতি তো তোলাই রইলো।