স্বপ্নের বীজ জিনের গভীরে থাকে। নিজেকে ছুঁয়ে, চেনা দিন-প্রতিদিনকে ঘিরে, বৃহৎ ও মহৎকে ছুঁয়ে সেই স্বপ্ন বহতা হয়ে যায়। বিশ্বাস কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে? রামচন্দ্র যে আজীবন স্বপ্ন দেখে, তার শিক্ষক মি. সারবার্নকে বলতে পারে— ‘We were asleep so long but did not know how to dream. That is what your teaching has provoked in me. I've learnt to dream.' 43 উপন্যাস শেষ অবধি অস্তিত্বের। সংগ্রামের কথা বলে, ঐতিহ্য আর আত্মপরিচয় খোঁজে। এই উপন্যাসের বীরু অনেক সময় পথের পাঁচালী'-র অপুকে মনে করিয়ে দিয়ে গেছে। তার মা মােহিনীদেবী চরিত্রটি কখনও ‘সর্বজয়া’, কখনও ‘গােরা’-র মা আনন্দময়ী বা গাের্কির মা-এর কথাও মনে এনে দিয়েছে পাঠকের। তিন প্রজন্মের কথা ধরা আছে এই দুই মলাটে। ধুলাে’, ঝড়ের দিন’, দিনরাতের ঝড়’ ও ‘মাটি’ এই চার অংশে বিভাজিত এই উপন্যাস আসলে স্বপ্ন, বিশ্বাস আর পূর্ব ও উত্তর প্রজন্মের পারস্পরিক প্রতিবিম্বের কথা বলে। এ উপন্যাস অনুভবী হৃদয় দাবি করে।
ননী ভৌমিকের জন্ম ১৯২১ সালে, বর্তমান বাংলাদেশের রংপুরে। রংপুর শহরে স্কুলে পড়তেন। রংপুর কলেজে থেকে আই.এসসি ও পাবনা সরকারি কলেজ থেকে বি.এসসি পাস করেন। অর্থাভাবে এম.এসসি পড়তে পারেননি। পরে বীরভূম জেলার সিউড়িতে চলে আসেন। বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী বিপ্লবী নিত্যনারায়ণ ভৌমিক তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা।
ননী ভৌমিক তরুণ বয়েসেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং স্বাধীনতা পত্রিকায় সাংবাদিকের কাজ করতে শুরু করেন। ৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার ভেতরেও নির্ভীকভাবে সংবাদ সংগ্রহ করে গেছেন তিনি। পরে তেভাগা আন্দোলনের খবর জোগাড় করেছেন গ্রামে গ্রামে গিয়ে যা স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশিত হত। তার এই অভিজ্ঞতাভিত্তিক ছোটগল্প সংকলন 'ধানকানা' বের হয়। অরণি পত্রিকায় নিজের সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। চৈত্রদিন তার অপর গ্রন্থ। ফ্যাসিবিরোধী প্রগতি লেখক সংঘ ও ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির সদস্য ছিলেন। পরিচয় পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন কিছুকাল। তার বিখ্যাত উপন্যাস ধুলোমাটি ধারাবাহিকভাবে পরিচয়ে বের হয়। ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে তিনি গ্রেপ্তার হন ও প্রেসিডেন্সি, বক্সা ইত্যাদি জেলে আটক থাকেন।
১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি তিনি মস্কোর প্রগতি প্রকাশনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে অনুবাদকের কাজ নিয়ে সোভিয়েত রাশিয়া যান। রুশ মহিলা স্বেতলানা'কে বিয়ে করে সে দেশেই থেকে যান। বহু রুশ সাহিত্যের অসামান্য বাংলা অনুবাদ তার হাত দিয়ে বেরিয়েছে। রাজনৈতিক সাহিত্য ছাড়াও অজস্র শিশু কিশোরদের গল্প, উপন্যাস অনুবাদ করেছেন। ফিওদোর দস্তয়েভ্স্কির বঞ্চিত লাঞ্ছিত, জন রীডের দুনিয়া কাঁপানো দশদিন, ল্যেভ তল্স্তোয়ের আনা কারেনিনা ইত্যাদি ছাড়াও বাংলা- রুশ- বাংলা অভিধান, ইউক্রেনের গল্প, সোনার চাবি, উভচর মানব ইত্যাদি। তবে অনুবাদের কাজ করতে গিয়ে নিজের মৌলিক লেখার কাজ ব্যহত হয়। সোভিয়েত মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমন করে রিপোর্টাজ ধর্মী 'মরু ও মঞ্জরী' গ্রন্থটি লেখেন সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে।
ননী ভৌমিকের শেষ জীবন অবহেলা আর আর্থিক সমস্যায় কাটে। পুত্রের মৃত্যুতে মানসিক আঘাত ও স্মৃতিভ্রংশে ভুগতেন। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে তিনি রাশিয়াতেই পথ দুর্ঘটনায় মারা যান।