রশীদ হায়দার ১৯৪১ সালের ১৫ জুলাই পাবনার দোহারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তখনকার জনপ্রিয় সিনে ম্যাগাজিন চিত্রালীতে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে চিত্রালীর পাশাপাশি তিনি পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড এর মুখপত্র পরিক্রম পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এক সময় চিত্রালীর কাজ ছেড়ে গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দেন ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমিতে চাকরি নেন রশীদ হায়দার। ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে অবসরে যান। পরে নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা একাডেমিতে থাকাকালে রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষের স্মৃতিচারণা নিয়ে গ্রন্থ ‘স্মৃতি : ১৯৭১’, যাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘দালিলিক গ্রন্থ’ হিসেবে বিবেচনা করেন সমালোচকরা। ১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় রশীদ হায়দারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নানকুর বোধি’। ১৯৭২ সালে দৈনিক সংবাদে ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেন নিজের প্রথম উপন্যাস ‘গন্তব্যে’। গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭০ এর বেশি। রশীদ হায়দার মঞ্চে অভিনয়ও করেছেন। ১৯৬৪ সালে মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় তিনি অভিনয় করেন ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নাটকের ‘কিংকর’ চরিত্রে।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য সরকার ২০১৪ সালে রশীদ হায়দারকে একুশে পদকে ভূষিত করে। তার আগে ১৯৮৪ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান।
দ্রষ্টব্যঃ এই বইটি খুব পরিচিত কোন বই নয় (অন্তত আমার মতে!) বুক রিভিউ এর মূল উদ্দেশ্য যেহেতু রিভিউকৃত বইয়ের সাথে পাঠকের পরিচয় ঘটানো, তাই ক্ষেত্রবিশেষে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত বই এর প্রাপ্তিস্থান উল্লেখ করে দেয়াটা মনে হয় উচিতই হবে। এই চিন্তা থেকেই রিভিউ এর শেষে প্রাপ্তিস্থান উল্লেখ করা হলো।
মোটামুটি এক টিকিটে দুই ছবি দেখে ফেলার মত অভিজ্ঞতা হলো রশীদ হায়দার এর 'খাঁচায় অন্ধ কথামালা' বইটি পড়ে! দুটি পৃথক উপন্যাস 'খাঁচায়' আর 'অন্ধ কথামালা' নিয়ে এই সংকলনটি। দুটি উপন্যাসেরই উপজীব্য আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, কিন্তু একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। এখানে যুদ্ধের বর্ণনা কম, আছে যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু মানুষের নিজেদের উপলব্ধি আর তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভাবে অনুভূত দুর্দশার গল্প। যুদ্ধ সরাসরি থেকেও নেই, কিন্তু যুদ্ধের যে ঠান্ডা ভয়ের অনুভূতি, তা সদর্পে বিদ্যমান!
'খাঁচায়' উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে তিনতলা এক বাড়ীতে আশ্রয় নেয়া মধ্যবিত্ত একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ তেরো দিনের গল্প 'খাঁচায়', যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র জাফরের দিন কাটে সারাদিন বাড়ীর অন্যান্য সদস্যদের সাথে তাস খেলে আর রেডিও শুনে। তাস খেলাটা উপলক্ষ মাত্র। মনোযোগটা আসলে রেডিওর দিকে সনির্বন্ধ। কখন ইন্দিরা গান্ধী যুদ্ধের ঘোষণা দেবেন, কখন মদ্যপ ইয়াহিয়া আবার ইথারে তার মাতাল কণ্ঠের ভাষণে সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেবে পঁচিশে মার্চের মত, কোথায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে, এইসব সংবাদ পেতে জাফরদের কান সদা উন্মুখ। অজানা এক ভয় তাদের মনে সবসময়, কী হবে যুদ্ধে হেরে গেলে? পাকিস্তানী রেডিও বারবার উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছে ভারতীয় বাহিনীর পরাজয় অতি সন্নিকটে, পূর্বের আর পশ্চিমের দুই পাকিস্তানের 'অচ্ছেদ্যতা' কেউ রুখতে পারবেনা। জাফরদের ভেতর প্রচণ্ড অস্থিরতা, বারবার ছাদে গিয়ে দুই বাহিনীর যুদ্ধ বিমানের ডগ ফাইট দেখে। তারা মিত্র বাহিনীর দুটি বিমান ধ্বংস দেখে, কিন্তু রাজাকার আর বিহারীদের কাছে শুনে ছয়টি বিমানের কথা। রেডিওর মিথ্যে ঘোষণা, রাজাকারদের উল্লাস, বিহারীদের রক্তচক্ষু, রাজনীতিবিদদের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের অভেদ্য জট, সদ্য জন্ম নেয়া কন্যাশিশু ও স্ত্রীর ভাবনা এসব কিছুই যেনো জাফরদের নিজেদের বিশেষত্ব বিহীন ছোট একঘেয়ে জীবনকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সদাজাগ্রত এক মৃত্যুভয় এর খাঁচায় ঠেলে বন্দী করে দেয়। ওদের পোষা টিয়ে পাখিটা খাবারের অভাবে খাঁচার এক কোণায় নির্জীব, নিরাসক্ত হয়ে পড়ে থাকে, কল্পনাপ্রবণ পাঠক হয়ত টিয়ে ও টিয়ের মালিকের মাঝে কোথাও মিল খুঁজতে চাইবেন। এই একটি মাত্র পরিবারের অনেকগুলো সদস্যের সবার একসাথে থেকে মৃত্যুবরণ করতে চাইবার ইচ্ছেপ্রকাশ জানিয়ে দেয় যুদ্ধটা কত ভয়ানক ছিলো। পাকবাহিনীর সেই পাশবিক হিংস্রতাকে একা কেউই দেখতে চায়নি।
'অন্ধ কথামালা' এই বইয়ের দ্বিতীয় উপন্যাস। ১৯৭৯-৮০ সালে লেখা এই উপন্যাসটির প্রকাশের পেছনে হুমায়ূন আহমেদের আগ্রহের কথা রশীদ হায়দার উল্লেখ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদ এর সাহিত্যের রুচি ভীষণ উঁচু ছিলো, এই উপন্যাসটি এটি আবারো প্রমান করে দিলো! গ্রাম বাংলার পটভূমিতে পাবনার আঞ্চলিক ভাষার সংলাপে রচিত উপন্যাস 'অন্ধ কথামালা'; ল্যাটিন সাহিত্যের অপেক্ষাকৃত নতুন ঘরানা যে 'ম্যাজিক রিয়েলিজম', তার প্রচ্ছন্ন ছাপ এই উপন্যাসে বিদ্যমান। রশীদ হায়দার এক্সিকিউট করেছেন নিপুণ ভাবে, নিজস্ব কায়দায়, তাই আরোপণের কোন অবকাশ এখানে নেই। গ্রামের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়া নাম না জানা এক যুবকের উত্তম পুরুষে বলা গল্প 'অন্ধ কথামালা' যাকে তার বাল্যবন্ধু মোকসেদ বিশ্বাসঘাতকতা করে ধরিয়ে দেয় শান্তি বাহিনীর সেক্রেটারির কাছে। কারণ, মোকসেদ ঈর্ষান্বিত, তার ভালোবাসার মেয়েটিকে বিয়ে করেছেন নামহীন নায়কের শিক্ষক সিরাজ স্যার। হাত, মুখ ও চোখ বাঁধা যুবককে তার বাসা থেকে তার বিশ্বাসঘাতক বন্ধু মোকসেদ আর টাউন থেকে হায়ার করে আনা অন্য তিন যুবক হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে নদীর ঘাটে, যেখানে ঘাতক অপেক্ষা করছে, ভোজালি হাতে। এই সময়টুকুতে যুবকের মনে ভীড় করা অসংখ্য কথা, স্মৃতি ও আবেগ যা তার মুখ আটকে রাখা গামছার ফাঁক গলে বেরোতে পারেনা, তা-ই অন্ধ কথামালা। চোখ বাঁধা, তবু যেনো সে সব দেখতে পায় সামনে, হোঁচট খায়না ছাগল বেঁধে রাখার খুঁটিতে। দৃশ্যায়ন এত বাস্তব, ডিটেইলিং এর কাজ এত দক্ষ হাতে করা যে শেষ মুহূর্তে আবেগতাড়িত হয়ে পড়া মোকসেদ যখন তার বন্ধুর প্রতি দুর্বলতার কথা হায়ার করা তিন ছেলের কাছে প্রকাশ করে ফেলে, তাদের টিটকারি মেরে বলা "পোঁদ মারামারি করতেন নাকি?" কানে শুনতে পাওয়া যায় যেনো। যুবকের না বলতে পারা অন্ধ কথামালার মাঝে যে দ্রোহ, ক্ষোভ, হতাশা আর কষ্ট, পড়তে গেলে সেটি বোধহয় নিজের ভেতরও অনুভব করতে পারি। গুডরিডসে 'খাঁচায়' উপন্যাসটিকে যদি ৫ এ ৪.৫ দেই, 'অন্ধ কথামালা' কে মনে হয় ৬-৭-৮ এমন কি ১০ ও বোধহয় দেয়া যায়!
প্রয়াত কথাশিল্পী মাহমুদুল হক এর 'অশরীরী'ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটি উপন্যাস। মিলিটারী ক্যাম্পে আটক এক যুবক আম্বিয়ার ওপর চলা অমানুষিক নির্যাতন এর চিত্র আছে সেখানে। যুদ্ধের কোন দৃশ্যায়ন নেই কিন্তু যুদ্ধের কষ্টগুলো ঠিকই আছে। রশীদ হায়দার কিংবা মাহমুদুল হক এর যুদ্ধের সরাসরি বর্ণনা বিহীন এই উপন্যাসগুলো খুব মোটা দাগে সেই ধারণা দিয়ে দেয়, পাকবাহিনী আর রাজাকারের সমন্বয়ে গড়া কী ভয়ঙ্কর এক অসুর এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে আমাদের। মানুষ বিস্মৃতিপ্রবণ প্রানী। সময়ের পার্থক্যে বড় বড় অনেক অপরাধও তুচ্ছ হয়ে দাঁড়ায় মানুষের বিচারে। মাত্রই ৪৩ বছর হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার, এরই মধ্যে আমরা গুলিয়ে ফেলছি যুদ্ধের সময় কার রাজাকারের ভূমিকা ছিলো আর কার দেশপ্রেমিকের ভূমিকা ছিলো। ইতিহাসের বই থেকে যার যার ইচ্ছেমত পাতা গুলো ছিঁড়ে নতুন পাতা জুড়ে দেয়া হচ্ছে, যেনো পরীক্ষার খাতায় সরল অংকে গুণের জায়গায় যোগ আগে করার ভুল চোখে পড়ার পর কলমের খোঁচায় কেটে দিয়ে নিচে 'পি.টি.ও' লিখে পরের পাতাটায় নতুন অংক করা। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের জন্মেরই ইতিহাস। এটি হারিয়ে গেলে আমাদের আর কি থাকবে? ওদের 'অসুরতার' পরিচয়টা আমরা কখনো যেনো ঘোলা হয়ে যেতে না দেই।
প্রাপ্তিস্থানঃ সাগর পাবলিশার্স (উত্তরা, বেইলী রোড), গ্রন্থকলি (ঢাকা নিউ মার্কেট)
“খাঁচায়” আর “অন্ধ কথামালা” এই দুই বই এই মলাটে “খাঁচায় অন্ধ কথামালা” শিরোনামে। বই দুটা বৃহত্তর অর্থে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক হলেও এদের গদ্য বেশ আলাদা মেজাজের, মুক্তিযুদ্ধের আলাদা দুটি সময়ের। তাই পাঠ প্রতিক্রিয়াও হয়েছে ভিন্ন ধরনের।
“খাঁচায়” বইটা মুক্তিযুদ্ধের শেষ কদিনের কাহিনি। সেদিন গুলোতে জাফর, তাহের সাহেব, মন্টু-ফিরোজরা অবসর পার করছে কার্ড খেলে আর রেডিও শুনে। খাঁচায় বন্দী কিছু মানুষেরই মতন যেন। মাঝে মাঝে রেডিও শোনা হয়, তারা অপেক্ষায় থাকে ইন্দিরা গান্ধীর যুদ্ধ ঘোষণার। এক সময় আকাশ জুড়ে শুরু হয় মিত্রবাহিনী আর শত্রুপক্ষের বিমান যুদ্ধ। কখনও আনন্দিত বাংলাদেশিরা। কখনও বা হতাশায় ছেয়ে যাচ্ছে মন। প্রায় গ্রাম গুলোই স্বাধীন হয়ে গেছে। একদিকে আছে বোমার আঘাতে প্রাণনাশের আশংকা, অন্যদিকে আসন্ন বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত মন। একসময় বিজয় আসে তবে অম্ল মধুর হয়ে, জাফরের ভাই মুক্তিযুদ্ধ থেকে জীবিত ফিরে এলেও ফিরে আসে না লুৎ���র। শেষে খাঁচা থেকে সদ্যমুক্ত টিয়া পাখিটা যখন উড়তে গিয়ে পড়ে যায়, তখন সদ্য জন্ম নেয়া দেশটার সামনের দিনগুলোর কিছুটা সংকেত মিলে।
মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় নিয়ে এই বইটা, তবে এতো চরিত্র এসেছে আর গেছে যে পড়তে ভালই বিরক্ত লেগেছে। গদ্যও আহামরি টানেনি। ২/৫ তারা
অন্যদিকে “অন্ধ কথামালা” মুগ্ধ করল অনেক বেশি। “খাঁচার” পরে বেশ হালকা চালে শুরু করেছিলাম বইটা, কিন্তু এবারে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলাম। গদ্য এমনও হয়? কী সুন্দর অথচ কত বিষাদময় এর অবতারণা! এই গল্প পাবনার যুবক বেলাল উরফে বেলটুর। বন্ধু মোকসেদের বিশ্বাসঘাতকতায় কয়েক রাজাকারের হাতে ধরা পড়ে বেলটু। অথচ সে রাতেই মোকসেদের সংকেতে পাঁচ-ছ বন্ধু মিলে গোপন অভিযানে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল বুড়ি দ'র সাঁকো। চোখ বাঁধা অবস্থায় আসন্ন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবে সারা জীবনের নানান ঘটনা। কোনটা দুঃখের, কোনটা সুখের। যেমন উঠে আসছে বাবার মৃত্যুর স্মৃতি, তেমনি বলছে মোকসেদ, নওশের, গণি, কাশেমদের সাথে বন্ধুত্বের দিনগুলির কথা। পঞ্চাশের মন্বন্তরে কেরোসিন মাখা ভাত খেয়ে মারা গেছিল সরলার ছোট্ট খোকাটি। আবার রহম আলীর অভিশাপে ছারখার হয় কুদ্দুসদের পুরো সংসার। আসে পরিনতি না পাওয়া বেলাল আর শরীফার প্রণয়ের গল্প। এভাবেই বেলটুর “অন্ধ কথামালা”য় রচিত হয় এই অসামান্য উপন্যাসটি। সবাইকে পড়ার আমন্ত্রণ। ৪/৫ তারা
"খাঁচায় অন্ধ কথামালা" এক মলাটে দুইটি উপন্যাস। প্রথমটা হলো 'খাঁচায়' আর দ্বিতীয়টি 'অন্ধ কথামালা'। লেখক রশীদ হায়দারের এই দুইটি লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে সবে।
প্রথমে বলি 'খাঁচায়' উপন্যাসটা নিয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত সুন্দর একটি উপন্যাস 'খাঁচায়'। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথমদিকের কিছু ঘটনা প্রবাহ নিয়ে এই উপন্যাস। গৃহবন্দী এক পরিবারের আশা, হতাশা, উদ্বেগ এবং বিজয় আসছে এই সুখের সন্ধানে যে আবেগ সবকিছুরই প্রকাশ ঘটেছে এই বইতে। ঔপন্যাসিক রশীদ হায়দার রচিত এই উপন্যাসটি আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচিত সাহিত্যের অন্যতম একটি সংযোজন। কোনে জটিলতা নেই, সুন্দর এবং ছিমছাম লেখা। সহজেই পাঠককে ধরে রাখবে বইয়ের পাতায়। ঘটনার মূলে মুক্তিযুদ্ধ হলেও আদপে বইটির প্রধান চরিত্রগুলো মুক্তিযোদ্ধা নয়। যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় অথচ এই গৃহবন্দী মানুষগুলো যেন যুদ্ধেরই অংশ। শঙ্কা নিয়ে দিন কাটাতে থাকলেও মনের মধ্যে জেগে আছে স্বাধীনতার স্বাদ নেওয়ার অদম্য আগ্রহ।
এরপরে বলি 'অন্ধ কথামালা' নিয়ে। যদি তুলনা করি প্রথম উপন্যাসটির চেয়ে দ্বিতীয়টি বেশি ভালো লেগেছে আমার। 'অন্ধ কথামালা' উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বেলাল। একদিন রাতের আঁধারে কারা যেন তার চোখ, মুখ, হাত বেঁধে নিয়ে যেতে থাকে হত্যার উদ্দেশ্য। তার অপরাধ দেশের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়েছে। এর মধ্যে একজন আততায়ী তার চির পরিচিত। নিজের ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময়ে তার স্মৃতিচারণা নিয়ে এক এক স্থানে। একজন বন্দীর অসহায়ত্বের চেয়ে প্রগাঢ় হয়ে ওঠেছে তার চারপাশে তাকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া পৃথিবী। এ যেন পুরানো এক গ্রাম বাংলায় ফিরে যাওয়া। যে সময়ে সবে পাকিস্তান ঢাকায় আক্রমণ করেছে কিন্তু তার আভাস সম্পূর্ণভাবে গ্রামেগঞ্জে আসেনি তখনো। তবে আসতে শুরু করেছে, শহরের মানুষ গ্রামের দিকে পালাচ্ছে আর গ্রামের কিছু কিছু মানুষ ফায়দা লুটতে ব্যস্ত। আর কিছু মানুষ গ্রামে নিজের স্থানে থেকে কীভাবে এই যুদ্ধের মাঠে দাঁড়ানো যায় তা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। গল্পের বেলাল সেই কিছু মানুষদের একজন, যে দেশের মানুষের জন্য লড়তে চেয়েছে। এমন সময়ে কে বন্ধু আর কে শত্রু তা চিহ্নিত করাই শক্ত। তাই গ্রাম বাংলার স্বাভাবিক জীবনেও লাগে অস্বাভাবিকতার ছোঁয়া।
দুইটি উপন্যাসই ভালো লেগেছে। লেখকের লেখায় কোন মারপ্যাঁচ নেই, সাবলীল ভাবে তার বয়ানকে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করাই যেন তার লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে লেখা ঝোঁক কোনদিকে ঝুঁকে যায়নি। এরপরে যদি প্লট নিয়ে বলতে হয় তাহলে বলবো যুদ্ধ নিয়ে রচিত এমন প্লটের উপন্যাস আগে পড়িনি। দুইটি প্লটে রয়েছে অভিনবত্ব। দুইটি প্লটেই মানুষ অসহায়, বন্দী। প্রথম উপন্যাসে বন্দী একটি পরিবার আর দ্বিতীয় উপন্যাসে বন্দী একজন ব্যক্তি। প্রথমটার বিস্তার ঢাকা শহরে দ্বিতীয় উপন্যাসের কেন্দ্র পাবনা জেলার একটি গ্রামে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রচনা হলেও দু'টো গল্পেই যুদ্ধের কেন্দ্র হতে কিছুটা সরে এসেছেন লেখক, তবে মোটেও নেতিবাচক লাগেনি এই প্রচেষ্টা। যুদ্ধকালীন সময়ে জনমানসের ওপর পারিপার্শ্বিকের প্রভাব সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলাতেই অখণ্ড মনোযোগ ছিল, তা বেশ বোঝা যায়। এক পরিবারের রোজকার সাধারণ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের শেষ তেরো দিনের মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায় 'খাঁচায়' গল্প হতে। মোটামুটি বলছি কারণ আশা করছিলাম ১৪ই ডিসেম্বরের কথাটা অন্তত উঠে আসবে; আসেনি। 'অন্ধ কথামালা' গল্পে মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত সময়ের কথা তুলে ধরার কথা মুখবন্ধে বলা হলেও মুক্তিযুদ্ধের আবহের চাইতে যুদ্ধের ফলে রাতারাতি ঘটে যাওয়া সম্পর্কের আমূল পরিবর্তনের ছবিই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে এই গল্পটাকে আমার পাঁচতারা দিতে ইচ্ছে করছে এবং আলাদা করে রেটিং দিতে পারলে হয়তো তাই করতাম। সুন্দর, বেশ সুন্দর! তবে একটা বিষাদময় ব্যাপারকে সুন্দর বলা উচিত হচ্ছে কী-না, ধরতে পারছি না। লেখকের জন্য শ্রদ্ধা রইলো!