Jump to ratings and reviews
Rate this book

শ্রাবণের দিন

Rate this book
কেমন হতো যদি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে না যেত?

হ্যাঁ। এমনই একটি গল্প, যেখানে ২০০৪ সালেও ইংরেজ মুকুটের অধীনস্থ উপমহাদেশ।

অসম্ভব মেধাবী ছাত্র রবিন ইংরেজদের বানানো একটি ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যায়। সেখানে দেখা হয় আশ্বিনের সাথে, যে অসম্ভব ভালো ফুটবল খেলে।

বাংলার সবচেয়ে কুখ্যাত বিদ্রোহী মজনু গালিব, যাকে ধরার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে বিদ্রোহী দমন সংগঠনের প্রধান ইয়াসির আলী। উপমহাদেশের সমস্ত বিদ্রোহীরাই অপেক্ষায় আছে, উপযুক্ত নেতৃত্বের অপেক্ষায়। বিরান্নব্বইয়ের যুদ্ধের সমস্ত উপমহাদেশের বিদ্রোহী নেতা মারা যাওয়ার আগে যার হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল তার অপেক্ষা। এক যুগেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্ত সবাই জানে সে আসবে একদিন। তাকে সবাই ছায়া নামে ডাকে। প্রাক্তন নেতার ছায়া।

ইউনিভার্সিটিতে একজনের সন্ধান পায় রবিন, আশরাফ শ্রাবণ যার নাম। ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষ ছেড়ে যে গিয়েছিল বিদ্রোহী দলে। আবার ফিরেও এসেছিল। রবিনের চোখের সামনেই তাকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।

এদিকে মজনু বিদ্রোহীর আক্রমণ বেড়ে যায়। বড়ো বড়ো আক্রমণ চালায় তারা। ইয়াসির যেকোনো কিছুর বিনিময়ে মজনুকে ধরতে চায়।

সাধারণ যুবক, বিদ্রোহী কিংবা পুলিশের বড়ো অফিসার। পরাধীন দেশে তাদের গল্পটা জানতে তুলে নিন শ্রাবণের দিন....

216 pages, Hardcover

Published December 1, 2023

3 people are currently reading
77 people want to read

About the author

Aminul Islam

15 books123 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
39 (40%)
4 stars
42 (43%)
3 stars
15 (15%)
2 stars
1 (1%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 30 of 40 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,667 reviews430 followers
June 16, 2024
৩.৫/৫
"শ্রাবণের দিন" আমিনুল ইসলামের সবচেয়ে পরিণত লেখা। সাধারণত তার লেখা নিয়ে যে আফসোসটা থাকে তা হচ্ছে - গদ্যের মধ্যে তাড়াহুড়ো বা অপটুতার ছাপ থাকে।যেমন - "বাটারফ্লাই ইফেক্ট" এর গল্পটা দারুণ কিন্তু বইয়ের ভাষা সেই গল্পকে যোগ্য সঙ্গ দেয়নি। "শ্রাবণের দিন" পড়ে সেই আফসোস অনেকটাই দূর হলো। পুরো কাহিনি খুব গোছালো এবং কোথাও বিন্দুমাত্র অসতর্কতা বা অযত্নের ছাপ নেই। দুর্বলতা বলতে ব্রিটিশ ও পুলিশ ফোর্সের কাজে তাদের অদক্ষ ও আনাড়ি মনে হয়েছে। রবিন যতো সহজে সবকিছু অনুমান করে ফ্যালে তাতে পুলিশেরও সেগুলো বুঝে না ফেলার কোনো কারণ নেই। তারপরও বইটা থেকে প্রাপ্তির পরিমাণই বেশি। শেষ অংশটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ গল্প নিয়ে জমজমাট একটা সিনেমা বানানো যেতে পারে।
Profile Image for Aishu Rehman.
1,106 reviews1,084 followers
April 28, 2024
আমরা সবাই প্রতীক্ষা করি কোনো এক শ্রাবনের দিনের জন্য। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম করেছে। আমরাও করি। ভবিষ্যতের প্রজন্মও করবে।

পুরো গল্পটা পড়ে মনে হচ্ছিল এ যেন আমার অতি চেনা কোনো গল্প। মুক্তির গল্প। ৭১ এর গল্প। যে গল্পে আমিও শ্রাবণ হতে চাই হাজার লক্ষ কোটিবার।
Profile Image for Kazi Hasan Jamil.
61 reviews21 followers
December 17, 2023
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?


মুহাম্মদ জাফর ইকবালের “আমার বন্ধু রাশেদ” পড়েছেন? কেমন লেগেছিল? আমি একদম বই পড়ার শুরুরদিকে বইটা পড়েছিলাম। তখন ঠিক যেন হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল, খুবই ভালো লেগেছিল। এটা ৫-৬ বছর আগের কথা।

“শ্রাবণের দিন” পড়তে গিয়ে “আমার বন্ধু রাশেদ” এর কথা মনে পড়ে নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম। দুইটা বইয়ের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, একটা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের অধীনে থাকা পূর্ব বাংলার মানুষের গল্প; আরেকটা ২০০৪ সালে এসেও ব্রিটিশদের অধীনে থাকা এই উপমহাদেশের মানুষের গল্প। প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও দুইটা গল্পেই একটা মিল রয়েছে। সেটা কী? মুক্তির তৃষ্ণা...স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদনের তীব্র ইচ্ছা...

পেছনে ফিরে মানব সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে যুগ যুগ ধরেই মানুষ একে অপরের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এতো যুদ্ধের মধ্যে অধিকাংশই শুধুমাত্র স্বাধীনতা অর্জনের জন্য। কেউ অন্যের স্বাধীনতা হরণ করে আধিপত্য বিস্তার করতে চায় তো কেউ দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে নিজের স্বাধীনতা রক্ষা করতে কিংবা পুনরুদ্ধার করতে চায়। কী আছে এই “স্বাধীনতা” শব্দের মধ্যে যে এতো এতো রক্ত ঝড়ার পরেও মানুষ স্বাধীনতা চায়?

-----------------------------------------------------
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপমহাদেশে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। উপমহাদেশ প্রায় স্বাধীন হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু তখনই ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী কয়েকজন নেতা আততায়ীর হাতে নিহত হয় এবং তৎকালীন প্রতিবেদন অনুযায়ী সেইসব খুনের পেছনে রয়েছে উপমহাদেশেরই এক রাজনৈতিক সংগঠন। এই নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে অরাজকতা ঠেকাতে ব্রিটিশরা সারা দেশের নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয় এবং উপমহাদেশকে এই রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে তুলে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বলেই তারা ধারণা করে। বিশ্বের সবগুলো ক্ষমতাবান রাষ্ট্র তাদের এই সিদ্ধান্তে সাধুবাদ জানায়। আর তারাও শেষ মুহুর্তে যুগান্তকারী কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন ক্ষমতায় থাকা কয়েকজন ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করে এবং উপমহাদেশের মানুষের কাছে এতোদিনের শোষণমূলক আচরণের জন্য ক্ষমা চায়। পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা প্রস্তাব করে যার ফলে সাধারণ মানুষসহ রাজনৈতিক দলগুলোও ঠান্ডা হয়ে যায়।

কিন্তু অনেকেই ব্রিটিশদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও তারা এই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক থেকে স্বাধীনতা লাভ করতে চেয়েছিল। সমস্ত উপমহাদেশের এই বিদ্রোহীদের নেতা ছিলেন মির্জা গালিব; পুরো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে দিয়েছিল যে নাম। এসব পুরোনো কথা, মির্জা গালিবের মৃত্যুরও এক যুগ হতে চললো।

বর্তমানে বাংলার সবচেয়ে কুখ্যাত বিদ্রোহী মজনু গালিব; যাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে 'রিপ্রেসন রিভেলিয়ন ব্যাটেলিয়ন - আর. আর. বি' দলের প্রধান, বাংলার স্বাধীনতাকামী বাহিনীর ত্রাস ইয়াসির আলী। পুরো উপমহাদেশে যতগুলো বিদ্রোহী সংগঠন আছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুযোগ্য নেতা মজনু। নিখুঁত পরিকল্পনার সাথে প্রতিটা অভিযান পরিচালনা করে সে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ আদেশ দেওয়া হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব, মজনুকে শেষ করতে হবে। মজনুর বিদ্রোহকে ব্রিটিশ সরকার খাটো করে দেখার ভুল করবে না। যেই ভুল তারা করেছিল মির্জা গালিবের বেলায়।

মজনুসহ উপমহাদেশের সমস্ত বিদ্রোহীরা অপেক্ষায় আছে, উপযুক্ত নেতৃত্বের। বিরান্নব্বইয়ের যুদ্ধে উপমহাদেশের বিদ্রোহী নেতা মির্জা গালিব মারা যাওয়ার আগে যার হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল তার অপেক্ষায়। তাকে সবাই ডাকে “ছায়া” নামে। তাদের প্রাক্তন নেতার “ছায়া”। গত এক যুগেও সে প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্ত সবাই জানে সে আসবে একদিন, স্বাধীনতার ডাক দিবে; তখন উপমহাদেশের সকল বিদ্রোহী দল এক হয়ে যাবে।

অন্যদিকে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র রবিন, এবার রেকর্ড পরিমাণ নাম্বার পেয়ে বেঙ্গলি ইন্সটিটিউট অভ টেকনোলজি - বি. আই. টি এর ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে। সেখানে তার দেখা হয় আশ্বিনের সাথে, যে অসম্ভব ভালো ফুটবল খেলে। সদাহাস্যজ্বল আশ্বিন স্বপ্ন দেখে স্বাধীন দেশের।

ইউনিভার্সিটিতে আরো একজনের সাথে দেখা হয় রবিনের, আশরাফ শ্রাবণ যার নাম। ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষ ছেড়ে যে গিয়েছিল বিদ্রোহী দলে। আবার ফিরেও এসেছিল। রবিনের চোখের সামনেই তাকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।

এদিকে মজনু বিদ্রোহীর আক্রমণ বেড়ে যায়। বড়ো বড়ো আক্রমণ চালায় তারা। উপর মহলে থেকে চাপ আসায় ইয়াসির আলী যেকোনো কিছুর বিনিময়ে ধরতে চায় মজনুকে।
.
◑ পাঠ প্রতিক্রিয়া:

❝মানুষকে কারা বেশি আঘাত করতে পারে জানিস? নিজের আপন মানুষরা। ব্রিটিশরা আমাদের কষ্ট দিচ্ছে, এতে আমাদের যতটা না গায়ে লাগছে, দেশ স্বাধীনের পর নিজের মানুষদের থেকে অন্যায় অবিচার পেয়ে এর চেয়ে বহুগুন বেশি কষ্ট লাগবে।❞

গল্পটা আশ্বিনের, যে স্বপ্ন দেখে স্বাধীন দেশের যেখানে থাকবে না কোনো বহিরাগত শাসকগোষ্ঠী এই উপমহাদেশের মানুষদের শোষণের জন্য, যেখানে থাকবে না কোনো অন্যায়-অবিচার, যেখানে দেশের মেধাবী সন্তানরা মুখিয়ে থাকবে না পড়ালেখার পাট চুকিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য।

❝তোমার নাম শ্রাবণ, কারণ আব্বা শ্রাবণ মেলা ভালো মাস। এই মাসে সুন্দর একখান ফুল ফুটে, কদম ফুল। তারপর বিলে গেলে পাওয়া যায় বিল ভর্তি শাপলা। আম, কাঁঠাল, আনারস চারদিকে ফল আর ফল। কোনো অভাব থাকে না আব্বা, তুমিও আমাগো জীবনের সব অভাব নিয়া গেছ। তুমি শ্রাবণ মাসেই জন্মাইছ তাই মাসের লাহান তোমার নামও শ্রাবণ রাখছি।❞

গল্পটা শ্রাবণের, ছোট বেলায় যার মা তাকে বলেছিল আগামী শ্রাব�� মাসে শ্রাবণের জন্য তিনি একটা ছোট বোন নিয়ে আসবে, শ্রাবণ যার সাথে সারাদিন খেলবে। কিন্তু সেই শ্রাবণের দিন আর কখনোই আসেনি; শ্রাবণও তার সেই মা কে আর কখনো দেখতে পারেনি। যার কাছে শ্রাবণের দিন হলো, আকাশের ওই চাঁদখানা। যা দেখে আমরা মুগ্ধ হই, কিন্তু কখনও হাত বাড়িয়ে ধরতে পারি না। এত কাছে, এত কাছে, মনে হয় যেন হাত বাড়ালেই ধরতে পারবো কিন্তু কখনও পারি না। যে আজও অপেক্ষায় আছে শ্রাবণের দিনের।

❝তুই আমার জন্য একটা কাজ করতে পারবি? যখন দেশ স্বাধীন হবে তখন ককক্সবাজার সী বিচে গিয়ে বড় করে আমার নাম লিখে আসবি। যেন হ্যালিকপ্টার থেকেও দেখা যায়।❞

গল্পটা স্বাধীনতাকামী মানুষের, যারা স্বাধীন ভূখণ্ডে মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিল। যাদের কাছে পরিবার মানে শুধুমাত্র মা-বাবা, ভাই-বোন না; সমগ্র দেশের মানুষকেই যারা নিজের পরিবারের সদস্য ভাবে, আপন ভাবে। যাদের দুর্দশা দেখে তাদের মন ডুকরে কেঁদে ওঠে। পরাধীনতার শেকল ভেঙে যারা দেশকে স্বাধীন করতে চায়, দেশের মানুষকে মুক্ত করতে চায়, গল্পটা তাদের।

একটা যুদ্ধ শুধুমাত্র দুই পক্ষের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না, চারপাশে থাকা সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে, অনেকগুলো স্বপ্নকে ভেঙে তছনছ করে ফেলে এবং এরসবচেয়ে বেশি প্রভাব পরে সাধারণ মানুষের জীবনে। এছাড়া এই বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান ছিল সম্পর্কের টানাপোড়েন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের দায়বদ্ধতার সামনে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা, দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাও ভারি হয়ে ওঠে; এসবই লেখক গল্পেচ্ছলে বলেছেনে এই বইয়ে। বইটা পড়ার সময় এতো এতো অনুভূতি চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছিল...সবকিছুই যেন আবেগ মিশ্রিত।

পাশাপাশি বইয়ের কিছু অংশ, চরিত্রদের সংলাপ পাঠকদের চিন্তার খোরাক জোগাবে, কিছু বিষয় নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। ব্রিটিশদের থেকে উপমহাদেশের স্বাধীনতা হোক কিংবা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাই হোক, যে স্বাধীনতার স্বপ্ন এই গল্পের আশ্বিনের মতো লক্ষ-কোটি আশ্বিন দেখেছিল, সেই স্বাধীনতা কী আমরা আজ পর্যন্ত আদৌ পেয়েছি? নাকি শ্রাবণের কথাকেই সত্য প্রমাণ করে আজ আমাদের নিজেদের মানুষরাই, আপন মানুষরাই আমাদের সাথে অন্যায়-অবিচার করছে? ভাবনার একটা পরত পার হতে না হতেই আরেকটা পরত উঁকি দিবে অবচেতন মনে।

বইয়ের প্রতিটা চরিত্রকে লেখক তৈরী করেছেন অত্যন্ত যত্নের সাথে। সকল ধরনের মানবীয় অনুভূতি দিয়ে লেখক প্রতিটা চরিত্রকে উপস্থাপন করেছেন, ফলে চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে বাস্তব। বইয়ের অনেকগুলো চরিত্রই বিশেষ করে আশ্বিন, হৃদিতা, শ্রাবণ মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো।

“শ্রাবণের দিন” এ লেখক আসলে কিছু গল্প বলতে চেয়েছেন। গল্পগুলো ঔপনিবেশিক শাসনের না, পরাধীন উপমহাদেশের সাধারণ কিছু মানুষের গল্প। যে গল্পে উঠে এসেছে বর্তমান সময়ের কিছু তিতকুটে বাস্তবতা। সবমিলিয়ে দেশপ্রেম, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার এক দারুণ আখ্যান “শ্রাবণের দিন”।

◑ লেখনশৈলী:

আমিনুল ইসলামের লেখা প্রায় সকল বই পড়া থাকায় নির্দ্বিধায় বলতে পারি “শ্রাবণের দিন” লেখকের এখন পর্যন্ত লেখা সেরা লেখাগুলোর একটি। বইয়ে লেখকের শব্দচয়ন, বাক্যগঠন ভালো ছিল। কিছুক্ষেত্রে উন্নতিরও সুযোগ ছিল, তবে তা সামান্যই। এছাড়া লেখকের আগের কিছু বইয়ে হঠাৎ হঠাৎ ইংরেজি শব্দের প্রবেশ ভ্রু সামান্য কুঞ্চিত করলেও এই বইয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো ভ্রুকুটির জায়গা ছিল না। কেননা এই গল্পের পটভূমি অনুযায়ী সংলাপে ইংরেজি শব্দ না আসাটাই বরং অস্বাভাবিক হতো। এছাড়া ভিন্নধর্মী প্লট বাছাই, কাহিনির যথাযথ সমাপ্তি, শক্তিশালী চরিত্রায়ন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

◑ বানান, প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন ও অন্যান্য:

বইটা পড়ার সময় তেমন কোনো বানান ভুল আমার চোখে পড়েনি। এছাড়া বইয়ের প্রচ্ছদও বেশ নান্দনিক। প্রোডাকশন বেনজিন প্রকাশন এর অন্যান্য বই থেকে কিছুটা ভিন্ন কেননা এটা স্পেশাল এডিশনের একটি। হালকা নীলাভ কাগজের ছাপা, জেল কভারে লেদার বাইন্ডিং, গোল্ডেন এজ স্পেশাল এডিশনের মূল্যের হিসেবে ঠিকই লেগেছে। এখানে একটা কথা উল্লেখ্য স্পেশাল এডিশনের পাশাপাশি বেনজিন প্রকাশনের অন্যান্য বইয়ের মতো গতানুগতিক প্রোডাকশনেও বইটি প্রকাশিত হয়েছে যা পাঠক সুলভ মূল্যে সংগ্রহ করতে পারবে।

◑ ব্যক্তিগত রেটিং: ৫/৫

◑ বই পরিচিতি:
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
বইয়ের নাম: শ্রাবণের দিন
লেখক: আমিনুল ইসলাম
জনরা: অল্টারনেট হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার
প্রকাশনী: বেনজিন প্রকাশন
প্রচ্ছদশিল্পী: উমর ফারুক আকাশ, সজল চৌধুরী
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২১৬
মুদ্রিত মূল্য: ৪৫০ টাকা (রেগুলার এডিশন)
Profile Image for Samsudduha Rifath.
428 reviews23 followers
March 27, 2024
৩.৫/৫

'স্বাধীনতা তুমি আসো ভিন্ন রূপে ভিন্ন সময়ে।'

অল্টারনেট হিস্ট্রি জনরায় লেখা আমিনুল ইসলামের বই শ্রাবণের দিন' যেখানে উপমহাদেশ এখনো ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পায় নি। এখনো আমরা তাদের গোলাম হয়েই মাথা নিচু করে আছি।


 গল্পটা রবিন আর আশ্বিনের যারা বি.আই.টিতে তাদের ছাত্রজীবন স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাচ্ছে। রবিন তুখোড় মেধাবী ছাত্র। অন্য দিকে আশ্বিন দুর্দান্ত ফুটবল প্লেয়ার। কিন্তু দুইজনের মধ্যে একজনের মাঝে বিরতিহীনভাবে জ্বলছে অঙ্গার। সেই অঙ্গার প্রতিশোধের, সেই অঙ্গার মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য। 


গল্পটা শ্রাবণের যে অপেক্ষা করে যাচ্ছে এক শ্রাবণের দিনের। পরিবার, সমাজ, ভালোবাসা, স্বপ্ন সবকিছুর মাঝে নিজেকে চালিয়ে নিতে করে যাচ্ছে পরিশ্রম, প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে সংগ্রাম।


গল্পটা বিদ্রোহী দমনকারী কুখ্যাত পুলিশ ইয়াসির আলী ও বিদ্রোহী মজনু গালিবের। পরাধীন এই দেশকে স্বাধীনতার ছোঁয়া দেওয়ার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে যেমন কাজ করছে স্বাধীনতাকামী মানুষ তেমনি তাদের বর্বর শাস্তি দিয়ে যাচ্ছে ইয়াসির আলীর মত বাঙ্গালী পুলিশ।


১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যায় নি এই দেশ ছেড়ে। তার বদলে সেই শাসন চলে আসছে ২০০৩ ও ২০০৪ পর্যন্ত। লেখক সেই সময়টার বর্ণনা দিয়েছেন যে ২৫০ বছরেও কিছু মানুষ স্বাধীনতা খুঁজে আর কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থের জন্য ছেড়ে যাচ্ছে নিজের দেশ। 

লেখক এখানে ব্রিটিশদের শোষণের পাশাপাশি যে উন্নতি ঘটিয়েছে এবং তাদের ভূমিকা যে বিষয়গুলোকে তরান্বিত করেছে সেটা দেখিয়েছেন। 


বইয়ে ভালো লাগার দিক বলতে গেলে বলব মজনু গালিব, ইয়াসির আলী ও রবিন কে ঘিরে যে ঘটনা গুলো ঘটেছে তা বেশ উপভোগ্য ছিলো।

 এই তিনজনের চিন্তা ধারা তাদের মধ্যকার সম্পর্ক, বুদ্ধিমত্তা ও আক্রোশগুলো নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন লেখক। যদিও রবিনের রোমান্টিক সিকোয়েন্স গুলো ভালো লাগে নি। বিশেষ করে ভার্সিটির সাজ্জাদ টুল নামে এক টুলের সিকোয়েন্স খুবই বিরক্তিকর ছিলো। 


এদের পর যদি কোনো চরিত্র নিয়ে বলতে হয় তাহলে সেটা হচ্ছে শ্রাবণের। শ্রাবণের ছোট বেলার সেই ঘটনাটা খুবই মর্মান্তিক ছিলো যার মন খারাপ করে দিবে অনেকের। সেই অপেক্ষার জন্য যে শ্রাবণ কষ্ট পায় তা পাঠক অনুভব করতে পারবে। তাছাড়া ওর মজনু ও ইয়াসিরের সাথে সিকোয়েন্স গুলো অনেক সাসপেন্স তৈরী করেছে। 


আশ্বিনের ফুটবল টুর্নামেন্ট এর জায়গাটা বইয়ের অন্যতম জায়গার একটা বলতে গেলে। দারুণ লেগেছে ওই সিকোয়েন্স। প্রিন্স হ্যারির আগমন সাথে ফুটবল ম্যাচ স�� মিলিয়ে পাঠককে অনেক চিন্তায় ফেলেছেন লেখক এবং সেখানে হতবাকও করেছেন। 


আর ছায়া নামের চরিত্র নিয়ে যে রহস্য সেটাও ভালো ছিলো। কিছু কাকতালীয় ঘটনা ছিল যেগুলোর পরে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এতে করে চরিত্রের গভীরতা বোঝা গিয়েছে। 


এবার যদি বলি কোন কোন দিক আরো ভালো করার দরকার বা যোগ করা দরকার ছিল তা হচ্ছে :- বইয়ে ব্রিটিশ চরিত্রের একদমই আনাগোনা নেই। গ্রেস নামে যে মেয়ে চরিত্র এসেছে তা নিতান্তই রোমান্টিক অ্যাঙ্গেলে দেখানোর জন্য আনা হয়েছে।


 ব্রিটিশ শাসিত উপমহাদেশে বর্বর এক ইংরেজ অফিসার থাকলে বইটা অন্য মাত্রায় থাকত। এতে করে স্বাধীনতার যে ক্ষুধা মজনুদের আছে তা পাঠকের মাঝেও জায়গা করে নিত। সেটা না থাকায় মনে হচ্ছিলো করছে স্বাধীন করুক।


 অল্টারনেট হিস্ট্রি হলেও এখানে গুরুত্বপূর্ণ  রাজনৈতিক দিকগুলোর বর্ণনা দরকার ছিল। নেহরু, জিন্নাহ, গান্ধী কথা এদের কোথাও উল্লেখ নেই। এটা অল্টারনেট ইউনিভার্স না তাই এদের উল্লেখ করা দরকার ছিল। ম্যারাডোনার নাম আছে অথচ ভারতের বিশিষ্ট রাজনৈতিকদের কোনো হদিস নাই।  বিষয়টা সাকিব ছাড়া তামিমের মতো, একদম নুন চা। 


স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য শুধু বাংলাকেই গ্লোরিফাই করে দেখাতে গিয়ে ইতিহাসের মূল বিষয়টা তালগোল পাকিয়েছে। বাংলা, ভারত,পাকিস্তান ৩টা আলাদা কনফেডারেশন ব্রিটিশের শাসনাধীন দেখানোর যৌক্তিকতা বুঝতে পারলাম না।


 যদি ভারতবর্ষ স্বাধীনতাই না পায় তাহলে ভারত বা পাকিস্তান নামেই আলাদা স্টেট কিভাবে আসে? আসল ইতিহাসে ধর্মীয়, দাঙ্গার জন্য ইন্ডিয়া পাকিস্থান হয় কিন্তু এই বইয়ে তো তা ছিলো না তাহলে কেন ভাগ হলো। হ্যাঁ আন্দোলন দমে গিয়েছিলো আর তাদের শান্ত করতে আলাদা করেছে ব্রিটিশরা কিন্তু যুক্তিসম্মত হয়নি এই ব্যাখ্যা । লেখক চাইলে অবিভক্ত উপমহাদেশের উপর এই আখ্যান গাইলে আরো উপভোগ্য হতো।


যাই হোক এতো খুতখুতে হয়ে লাভ নেই। আপনারা যারা রাজনৈতিক ঘটনা বা চরিত্র গুলোকে সাইডে রেখে সাধারণ কিছু চরিত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার স্ফুলিঙ্গ দেখতে চান তাহলে পড়ে দেখতে পারেন শ্রাবণের দিন বইটি।


আমিনুল ইসলামের লেখা বই আগেও পড়া হয়েছে। তাই বলা যেতে পারে যে এই বইটা উনার ভালো লেখার একটা। আমার পড়া হয়েছে যেগুলো তার মাঝে এটা সবার উপরে থাকবে লেখনশৈলীর দিক দিয়ে। কিছু কিছু জায়গায় আরো ভালো করা যেতো সেগুলোর ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়াই যায়। বানান আর সম্পাদনা ভালো এই বইয়ে। প্রডাকশনের দিক দিয়ে বেনজিন সবসময়ই পাঠকদের কাছে প্রিয় ছিল। এই বইয়ের প্রডাকশনও সেই মান ধরে রেখেছে। তাছাড়া প্রচ্ছদটা অনেক আকর্ষণীয় আর গল্পের অনেক কিছু বলে যায়।
Profile Image for Sakib A. Jami.
337 reviews38 followers
December 18, 2023
১৯৪৭, ১৯৭১….

ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ হয়েছিল তিনটি ভাগে। প্রথম ভাগে ধর্মের বিভেদ আলাদা করে দিয়েছিল হিন্দু, মুসলিমদের। জন্ম নিয়েছিল, ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের। এরপর আবারও বিভেদ। জাতিসত্তা কিংবা অন্যায় অবিচারের সাথে আপোষহীন এক জাতি অ স্ত্র তুলে নিয়েছিল নিজেদের টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে। অস্তিত্ব জানান দিয়ে ছিনিয়ে নিয়েছিল বিজয়। মানচিত্রের বুকে জন্ম নিয়েছিল নতুন একটি দেশ!

কিন্তু যদি এমন কোনো ঘটনাই না ঘটত? যদি পরাধীনতার দুইশ বছর দীর্ঘায়িত হতো? ১৯৪৭ সালের পরও ব্রিটিশদের এই বিশাল ভূখণ্ডে ঘাঁটি গেড়ে আরও পঞ্চাশ বছর নিজেদের শাসন চালিয়ে যেত? তবে কী হতো? কীভাবে চলত সবকিছু?এখনো সেই শোষণের বেড়াজালে জড়িয়ে থাকতে হতো? না-কি অন্য কোনো উপায়ে এই ভারতবর্ষকে হাত করে রাখার চেষ্টা? স্বাধীনতাকামী জনসাধারণ তা মেনেই বা নিবে কেন?

গল্পটা এমনই এক সময়ের। যখন স্বাধীন হয়নি এই ভারতবর্ষ। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থেকে এখনো পরাধীনতার গল্প লিখে যাচ্ছে। তার মধ্যেই চলছে জীবন। জনগণকে খুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ব্রিটিশ শাসকগণ। উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। একবিংশ শতাব্দীর সূচনা হয়েছে কেবল তখন। সেই সময় বাংলার সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় বিআইটিতে ভর্তি হতে এসেছে রবিন। বাংলা কখনো এমন প্রতিভা নিজ চোখে দেখেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সকল রেকর্ড ভেঙে দিয়ে নিজেকে জানান দিয়েছে। পেয়েছে গণিত অলিম্পিয়াডে গোল্ড মেডেল। এমন একজন কেবল পড়াশোনা ছাড়া কিছুই বোঝে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তো এমন ক্ষেত্র, যেখানে পড়াশোনার বাইরেও অন্য কিছু চলে। আর এই চলনে খেই হারাবে না তো রবিন?

অশ্বিন গ্রামের ছেলে। ভালো ছাত্র ছিল, ফলে বিআইটিতে সুযোগ পাওয়া অবধারিত ছিল। রবিনের রুমমেট, প্রথম ও একমাত্র বন্ধু সে। পড়াশোনার বাইরেও তার অপার জ্ঞান। ভালো ফুটবল খেলে। এই ফুটবল নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দলে সুযোগ পেয়েছে সে। এবার লক্ষ্য জাতীয় দল। কিংবা গ্রেট ব্রিটেনের হয়ে খেলা। এই ফুটবল খেলতে গিয়েই জড়িয়ে যাওয়া ভয়াবহ এক ঘটনায়। হয়তো বিজয়ীর বেশে ফেরা, নয়তো নিঃশেষ হয়ে যাওয়া! আশ্বিনের ভাগ্যে কোনটা ঘটবে?

সকল পরাধীনতার পেছনে গল্প লেখা হয় স্বাধীনতার। স্বাধীনতাকামী মানুষেরা লড়াই করে। ছিনিয়ে আনতে চায় বিজয়। পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে চায়। আর সে কারণেই জন্ম নেয় বিদ্রোহীরা। কালে কালে কত বিদ্রোহী আসে, কত লড়াই চলে— তারপরও কি বিজয়ের এসে ধরা দেয়? মির্জা গালিব ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য এক লড়াইয়ের। কিন্তু তিনি পারেননি। হারিয়ে গেছেন গভীর অন্তরালে। তবে তিনি নির্বাচন করে গিয়েছেন উত্তরাধিকার। ছায়া আসবে, আবারও ডাক দিবে স্বাধীনতার। তখন আর পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। এ দেশ একদিন ঠিকই স্বাধীন হবে। মুক্ত হবে ব্রিটিশদের থাবা থেকে।

শ্রাবণ ছেলেটা বদলে গিয়েছে। বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে বিআইটিতে ভর্তি। দিন কাটছিল ভালো। কিন্তু সবসময় যে ভালো সময় যায় না। কোনো এক কারণে ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া শ্রাবণ, চলার পথে খেই হারিয়েছে বারবার। যোগ দিয়েছিল বিদ্রোহীদের দলে। সেখান থেকে ফিরেও এসেছিল। পড়াশোনা আর আগের মত নেই। শ্রাবণও যে নিজের মত নেই। শ্রাবণ অপেক্ষা করে শ্রাবণের দিনের। যে দিন হয়তো স্বাধীনতা আসবে, কিংবা আসবে তার মা। যে কথা দিয়েছিল ফিরে আসার। অথবা কিছুই আসবে না। অপেক্ষা করতে করতে একসময় নিঃশেষ হয়ে যেতে হবে।

মির্জা গালিবের পুত্র মজনু গালিব হাল ধরেছে বিদ্রোহীদের। সে অপেক্ষা করছে। তার বাবার উত্তরাধিকার ছায়া একদিন ঠিকই আত্মপ্রকাশ করবে। তার আগে নিজের দায়িত্ব সে পথ সুগম করে দেওয়া। কিন্তু এ লড়াই যে বড্ড কঠিন। তারই বন্ধু আজ বিপরীত অবস্থানে। বিদ্রোহী দমন দলের নেতা ইয়াসির আলী খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজেরই বন্ধুকে। খুঁজছে ছায়া নামের সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও। আর সেজন্য যত গভীরে যাওয়া যায় ইয়াসির আলী যাবে। এ কেবল বিদ্রোহী দমন বা ব্রিটিশদের সাথে হাত মেলানো নয়। এর সাথে মিশে আছে ব্যক্তিগত ক্ষোভ, প্রতিশোধের নেশায় পাগল হওয়া এক হিংস্র আবেগ। যার বীজ বপন হয়েছিল এক যুগেরও বেশি সময় আগে।

হৃদিতার সাথে রবিনের সম্পর্ক সেই কলেজ জীবন থেকে। সেই সম্পর্ক এসে ঠেকেছে বিশ্ববিদ্যালয়েও। পড়াশোনা ভিন্ন কোন কিছু না বোঝা রবিনও ভালবাসতে জানে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে আছে রাজনীতির অদৃশ্য এক জাল। দেশের জায়গায় জায়গায় বিদ্রোহ হচ্ছে। মানুষ হারাচ্ছে প্রিয়জনকে। এ অবস্থায় কি থাকা যায়? অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট রবিন এক সময় দেশ ছাড়বে। সবার মতো সে-ও একই আশা তাকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাগ্য কখনো কখনো অন্য গল্পের দৃশ্যপট রচনা করে।

এ গল্প এক পরাধীন দেশের, যে দেশ এখনো খুঁজে ফিরে স্বাধীনতা। এ গল্প ভালোবাসার, বন্ধুত্বের; এক আবেগ মোড়ানো যাত্রার। যে যাত্রার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কিছু জীবনের আখ্যান। সবশেষে যে প্রশ্নটা করা যায়, অবশেষে বিজয়ের উপাখ্যান লেখা হবে তো?

▪️বই পর্যালোচনা ও পাঠ প্রতিক্রিয়া :

“শ্রাবণের দিন” একটি অলটারনেটিভ হিস্টোরি ঘরানার বই। পৃথিবীর এ যাবৎকালের শত-সহস্র ইতিহাসের মধ্যে যা সংঘটিত হয়েছে, তা যদি সংঘটিত না হতো? বদলে যেত অন্য রূপে? কেমন হতো? ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের দ্বারা। পরাজিতদের কেউ মনে রাখে না। পরাজিতরা যদি সেবার না হেরে বিজয় ছিনিয়ে নিত, কিংবা যেভাবে বিজয়ের গল্প লেখা হয়েছে তার ভিন্ন কোনো গল্প হতো, তবে কেমন হতো? মূলত বিকল্পের ইতিহাস এমনভাবে রচিত হয়। “শ্রাবণের দিন” সেই ইতিহাসকে ভালোভাবে উপস্থাপন করেছে।

১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ শাসন বিদায় না নিয়ে ধরা যাক ২০০২/৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হলো। লেখক বইটিতে ��ে বর্ণনাই করেছেন। এখানে লেখক খুব দারুণভাবেই ব্রিটিশ শাসনের এই সময়কাল রচনা করেছেন। বিশেষ করে যেভাবে তাদের এই শাসনকার্য সম্পন্ন হয়, সেই দিকে আলোকপাত করেছেন। ব্রিটিশরা যে শাসন শোষণের পাশাপাশি এই উপমহাদেশের উন্নতিও ঘটিয়েছে, লেখক তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে রাজনীতির রূপ এখানে ভালো মতো ফুটে উঠেছে।

এখানে লেখক বাংলা অঞ্চলকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন। হিন্দুস্তান বা পাকিস্তানের পাশাপাশি এই বাংলাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তো বিআইটি নামের এক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় এখানে শোভা পায়। ভাষা হিসেবে বাংলার গুরুত্বও কম নয়। খেলাধূলাতেও বাংলার যে এগিয়ে যাওয়া, লেখকের লেখাতে তাও ফুটে উঠেছে। উপমহাদেশের ব্রিটিশ শাসনের গল্প এখানে বলা হলেও লেখকের লেখার ভিত্তি ছিল বাংলা। এই বাংলায় গড়ে ওঠে বিদ্রোহ।

ব্রিটিশ শাসনে দেশের উন্নতি হলেও অনেকে মনে করেন এমন পরাধীনতায় বন্দী থাকা উচিত হয়। তাই বিদ্রোহ হয়, স্বাধীন হওয়ার জন্য চেষ্টা চলে। কিন্তু এর ভবিষ্যত কী? যুদ্ধ-বিগ্রহ কখনো কোনো জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। বরং প্রতিষ্ঠিত জাতিকে নিমিষে পিছিয়ে দেয় শত কিংবা তারচেয়েও বেশি বছর। আর হয়তো সে কারণেই সাধারণ মানুষ যেকোনো মূল্যে তা এড়িয়ে যেতে চায়। পালিয়ে বেড়াতে চায়। তবে এই বাংলার মানুষ জাতিগতভাবে আবেগে ভেসে যেতে পছন্দ করে। সেকারণেই হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। নিজেদের অধিকার পালনে সচেষ্ট হয়। সাদা চামড়ার মানুষেরা আমাদের নিজেদের সকল ক্ষেত্র দখল করবে, মেনে নেওয়া যায় কি? আর সে কারণেই বিদ্রোহের সূচনা, কিন্তু সমাপ্তি কোথায়?

লেখক আমিনুল ইসলামের অন্যান্য বইয়ের তুলনায় এই বইয়ের লেখনী বেশ পরিণত লেগেছে। শব্দচয়ন, বাক্য গঠন ভালো ছিল। কিছু জায়গায় অবশ্য মনে হয়েছে আরো বেটার হতে পারত, তারপরও খারাপ না। বিশেষ করে লেখকের অন্যান্য বইয়ে সংলাপের কিছু দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়, এই বইয়ে সংলাপ ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে কিছু কিছু সংলাপ এতটাই মনোমুগ্ধকর, যেন মনের মধ্যে অন্য রকম প্রশান্তি অনুভূত হয়। গল্প বলার চেয়ে সংলাপের গুরুত্ব এই বইতে অনেক বেশি।

বইটির সবচেয়ে যে। বিষয়টি ভালো লেগেছে, কিছু ফ্ল্যাশব্যাক এনেছেন লেখক, সে অংশগুলো ভালো ছিল। টুকরো টুকরো ঘটনা, এর সাথে পেছনের কিছু দৃশ্যের সংযোগ স্থাপনের চিত্র বইটিকে আরও প্রানবন্ত করে তুলেছে। এছাড়া যে ঘটনাগুলো সামনে আসে সেগুলোর সাথে এক ধরনের আবেগী সংযোগ ছিল লেখকের। বেশ কিছু মুহূর্ত হৃদয় দিয়ে অনুভব করা গিয়েছে।

তবে সব ভালোর তো বিপরীত অংশ থাকে। কিছু জায়গা অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ। বিশেষ করে কিছু রোমান্টিক, প্রেমময় দৃশ্য না এলেও পারত। সিরিয়াস মুহূর্তে এমন দৃশ্য বেশ বিরক্ত লেগেছে। আগেই বলেছি, কিছু অংশ হৃদয় দিয়ে অনুভব করা হয়েছে। এখানে লেখক কিছু মুহূর্ত পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন অনুভব করার করার জন্য। যা বেশ ভালো লেগেছে। পাঠক নিজ দায়িত্বে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে নিজেকে জড়িয়ে নিবেন, যা হতে পারে ভালো বা খারাপ। কিছু জায়গায় অবশ্য লেখক সেই অনুভূতি লেখক চাইলেই আনলেই পারতেন। যেমন, একটা দৃশ্যের কথা মনে আছে— যখন রবিন একটা বিপদ থেকে ফিরে, তখন হৃদিতা রবিনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই অংশ অন্যভাবে বর্ণনা করা যেত। তাহলে হয়তো তাদের ভালোবাসা, আবেগ পাঠক হিসেবে নিজেও অনুভব করতে পারতাম।

কিছু কাকতালীয় বিষয় ছিল। সব এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। কোথাও কোথাও সবকিছুর সংযোগ এক। এই এক বিন্দুতে মিলিত হওয়া অবশ্য খারাপ লাগেনি। বরং উপভোগ্য ছিল। তবে আমার মনে হয়েছে গল্পের কলেবর আরেকটি বাড়তে পারত। বিশেষ করে ইংরেজদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখক বর্ণনা করতে পারতেন। খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার একটা আক্ষেপ আছে। যদিও সেটা চমৎকার। আমার মনে হয়েছে এমন সমাপ্তি এক প্রকার তৃপ্তি দেয়। তারপরও চাইলে ঘটনাক্রম বৃদ্ধি করা যেত।

▪️চরিত্রায়ন :

এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে চরিত্র। লেখক এখানে বাজিমাত করেছেন। যে কয়টি মূল চরিত্র ছিল, প্রতিটি চরিত্র ফুটে উঠেছে অসাধারণভাবে। খুব যে ব্যাখ্যা ছিল এমন না, যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই চরিত্র গঠনে ভূমিকা পালন করেছে।

রবিন, অশ্বিন, হৃদিতা, শ্রাবণ, ইয়াসির আলী, মজনু বিদ্রোহী, মির্জা গালিব, গ্রেস কিংবা পার্কার— সবাই প্রয়োজন মতো সমানভাবে সুযোগ পেয়েছে। কেউ বেশি বা কম এমন না। সবার হয়তো পছন্দের চরিত্র হবে শ্রাবণ। কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ হয়েছে রবিনকে। রবিনের দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা সবকিছুই বেশ ভালো লেগেছে। যে আবেগে হারায় না, বিচার বুদ্ধি দিয়ে সবকিছু জয় করতে পারে। তাই তো শেষবেলায় এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। কিন্তু দিন শেষে হয়তো আক্ষেপ থেকে যাবে আশ্বিন বা শ্রাবণের জন্য।

তবে এই বইয়ে দীপা নামের এক চরিত্রের আগমন ঠিক যেন মিলল না। এখানে শ্রাবণের চরিত্রও দুর্বল হয়ে গিয়েছে। আমি বুঝছি, লেখক হয়তো শ্রাবণের মানসিক স্থিরতা হারানো বোঝাতে এমন এক দৃশ্য চিত্রায়িত করেছেন, তবে অন্যভাবেও করা যেত। এখানে একজন স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে স্থান দিয়েগল্পের মাধুর্য্য কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে গিয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের কথা তো বলাই হয়নি। ছায়া! কে সে? সেই রহস্যটা যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে। সেই রহস্য তোলা থাক!

▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :

বইটির স্পেশাল এডিশন বাজারে থাকলেও আমি নিয়েছি রেগুলার এডিশন। প্রোডাকশন কোয়ালিটি বেশ ভালো লেগেছে, সম্পাদনার ত্রুটিও খুব একটা লক্ষ্য করিনি। বানান ভুল তেমন চোখে পড়েনি। প্রোডাকশনের দিক দিয়ে বেনজিন তার সেরা কাজটি করেছে। অবশ্য বইয়ের গল্পে এমনভাবে ডুবে গিয়েছিলাম, বানান ভুল বা সম্পাদনা ত্রুটি চোখে ধরা দেয়নি। তবে দুয়েক জায়গায় শব্দের এদিক ওদিক ছিল।

এই প্রচ্ছদটা আমার বেশ ভালো লাগে। বিশেষ করে সামনের অংশের চেয়েও প্রচ্ছদের পেছনের অংশ আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।

▪️পরিশেষে, গল্পের শেষেও কি শেষ হলো এই পরাধীনতার গল্প? কে জানে? হয়তো শেষ হয়েও হইলো না শেষ। হয়তো পাওয়া হলো না স্বাধীনতা। কিংবা পাওয়া গেল বিজয়ের মঞ্চে নতুনের উত্থান। কেউ হারালো, হারিয়ে গেল। কেউবা ফিরে পেল নিজেকে নতুনভাবে। সম্পর্কের অদলবদল, প্রিয় মানুষের জন্য আকুতি— তারপর? আমরা যেভাবে কল্পনা করি, সেভাবে কি জীবনের গল্পটা লেখা হয়?

▪️বই : শ্রাবণের দিন
▪️লেখক : আমিনুল ইসলাম
▪️প্রকাশনী : বেনজিন প্রকাশন
▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২১৬
▪️মুদ্রিত মূল্য : ৪৫০ টাকা
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২/৫
Profile Image for Nafisa Tarannum.
77 reviews24 followers
April 22, 2024
অল্টারনেট হিস্টোরি কনসেপ্টটার সাথেই আমার পরিচয় হয়েছে খুব বেশিদিন আগে নয়। বাংলায় এই বিষয়ে কোনো বই লেখা হয়েছে কিনা আমার সঠিক জানা নেই। তাই যখন এই বইয়ের ঘোষণা আসে, সাথে সাথেই এইটা উইশলিস্টে উঠিয়ে রেখেছিলাম।
আমিনুল ইসলামের কাছে আমার এক্সপেক্টেশন বরাবরই অনেক হাই, তার লেখার ও আমি বেশ ভক্ত। এই বই নিয়ে আমি বেশ ভয়ে ছিলাম, আমার এক্সপেক্টেশন ফিলাপ হয় কিনা, নাকি আমিনুল আবার সেন্টি খায়।
এবং অনেক আনন্দ ও তৃপ্তি নিয়ে বলছি বইটি চমৎকার হয়েছে!
এক বসায় এক রাতে বইটি শেষ করেছি।

কেমন হতো যদি ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসন থেকে কখনোই স্বাধীনতা না পেতো? এই ২০২৪ সালে কেমন হতো ঢাকার চিত্র? অথবা আমাদের সিস্টেমটাই কেম��� হতো? শোষণের পদতলে পিষ্ট নাকি পৃথিবীর অন্যতম জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর মতো দৃঢ়তা?
বইটিতে আমিনুল অনেক স্যাটায়ারিক সিচুয়েশন তুলে ধরেছে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের রাজনীতি নিয়ে। কিছু কিছু অংশ পড়ে আমার নিজেরই মনে হয়েছি ছাই স্বাধীনতা আমাদের!

যদিও বইয়ে দাবী করা হয়েছে এটিতে টানটান উত্তেজনা নেই, কিন্তু বইটির কাহিনী বেশ সুন্দর। মনোযোগ ও আগ্রহ দুইটিই ধরে রাখত��� পুরোপুরিই সমর্থ!
Profile Image for Sanowar Hossain.
281 reviews25 followers
October 26, 2024
পলাশীর যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বাংলার  শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রহসনের যুদ্ধে হেরে যাওয়ায় ব্রিটিশরা তাদের শাসনের পতাকা বাংলায় স্থাপন করে। ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ অংশ ব্রিটিশদের আয়ত্ত্বে চলে আসে। প্রায় দুইশো বছর শাসনের পরে ব্রিটিশরা ভারত ও পাকিস্তান নামের দুইটি রাষ্ট্র গঠন করে এই এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রেও ভাঙন ধরে এবং বাংলাদেশ নামে আরেকটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এটাই আমাদের ইতিহাস। কিন্তু যদি এমন হতো যে ব্রিটিশরা কখনোই এই এলাকা ছেড়ে যায়নি, একবিংশ শতাব্দীতেও তারা দোর্দণ্ডপ্রতাপে দক্ষিণ এশিয়াকে শাসন করছে; তাহলে কেমন হতো পরিস্থিতি? ভিন্ন এক ইতিহাসের পাতায় তারই গল্প বলেছেন আমিনুল ইসলাম। 


ব্রিটিশ শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতাকামী মানুষেরা সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে স্বাধীনতা চেয়েছেন। ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় কিছু নেতা আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার কারণে ভারতবর্ষ স্বাধীন হতে পারে নি। সেই থেকে একবিংশ শতাব্দীতেও এই দেশে ব্রিটিশরা শাসন চালিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশরা তাদের শাসনব্যবস্থার সুবিধার্থে ভারতবর্ষকে তিন ভাগে ভাগ করে রেখেছে। যেখানে ভারত ও পাকিস্তানকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করলেও বাংলাকে ভাগ করেছে ভাষার ভিত্তিতে। শিক্ষার উন্নতিকল্পে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছে।


২০০৪ সাল। মেধাবী ছাত্র রবিন ভর্তি হয় বেঙ্গল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে। বন্ধুত্ব হয় ফুটবল খেলোয়াড় আশ্বিনের সাথে। ক্যাম্পাসে তারা ব্রিটিশ ছাত্রদের চোটপাট দেখে নিজেদের পরাধীনতার আসল চিত্র দেখতে পায়। ক্যাম্পাসেই হৃদিতার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে রবিনের। কবুতরের জোড়ার মতো ঘুরে বেড়ায় তারা। ব্রিটিশ ছাত্রদের দ্বারা লাঞ্চিত হলে ত্রাণকর্তা হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায় শ্রাবণ। ছন্নছাড়া জীবন শ্রাবণের। বিপ্লবী দলে যোগ দিয়েও চলে এসেছিল কোনো এক অজানা কারণে। অনেকেই ভয় পায় তাকে।


ব্রিটিশ শাসনকে উৎখাত করতে মির্জা গালিব যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তা এখনো চলমান। তবে অনেকটা গোপনেই সব কাজ চলে তাদের। মাঝেমধ্যে হামলা জোরদার করে আবার হাওয়া হয়ে যায় দলের সদস্যরা। পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনের ডাকের জন্য অপেক্ষা করছে সবাই। 'ছায়া' নামের কোনো একজন ব্যক্তির অনুসরণ করেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে বাকি সদস্যরা। এই আন্দোলনে এখন পর্যন্ত 'ছায়া' নামক ব্যক্তির পরিচয় না পাওয়া গেলেও মির্জা গালিবের ছেলে মজনু গালিবের নেতৃত্বেই চলছে বলে ধারণা পুলিশের। কুখ্যাত এই বিদ্রোহীদের দমনে একাগ্রচিত্তে কাজ করে যাচ্ছেন ইয়াসির আলী। বাঙালি হলেও এই বিদ্রোহী দলের সদস্যদের দু'চোখে দেখতে পারেন না। নিয়মিতই বিদ্রোহীদের ধরতে অভিযান পরিচালনা করেন। বিদ্রোহী দলের সাথে ঘটনাচক্রে রবিন, আশ্বিন ও শ্রাবণেরাও জড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় চোর পুলিশ খেলা। 'ছায়া' কি আসলেই ঘোষণা দিবেন চূড়ান্ত আক্রমণের? অনিশ্চিত দোলাচলে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায় রবিনেরা। তাদেরই বা পরবর্তী পদক্ষেপ কেমন হবে? 


একটি প্রেমের গল্প, পরিবার হারানোর গল্প, স্বপ্নকে বাস্তবায়নের গল্প, পরাধীনতার গল্প; এসব মিলিয়ে একটা 'অ-গোছানো' গল্প বুনেছেন লেখক। চরিত্রগুলোকে তাদের পেছনের ইতিহাসের মাধ্যমে একটি প্রাসঙ্গিক অবস্থানে দাঁড় করানো হয়েছে। গল্পের প্রবাহ সুন্দর গতিতে এগিয়ে গিয়েছে। একঘেয়ে লাগার মতো সুযোগ রাখেন নি লেখক।


লেখক প্রথমেই স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি এই বইটি লেখার আগে বাংলায় কোনো 'অল্টারনেট হিস্ট্রি' জনরার কোনো বই পড়েন নি এবং তিনি নিশ্চিত নন এই জনরার কোনো বই আছে কিনা। তো বলা চলে একেবারে শূন্য ধারণা নিয়ে তিনি বইটি লেখা শুরু করেছেন। এই শূন্য ধারণাটাই বইটিতে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ব্রিটিশ শাসনের জটিলতার মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করলো রাষ্ট্রগুলো; সেই জটিল বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা লেখক দিতে পারেন নি। যে বিষয়গুলোর ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলো বাস্তব ইতিহাসে স্বাধীন হয়েছিল, সেই বিষয়গুলোই কনফেডারেশন গঠনের ক্ষেত্রে দেখা যায়। আরো অনেক বিষয় সম্পর্কেও সমালোচনার জায়গা আছে তবে 'লেখকের শূন্য ধারণার' স্বীকারোক্তির কারণে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। ব্রিটিশ চরিত্রগুলোর মধ্যে তাদের ব্রিটিশ চারিত্রিক দূর্বলতা দেখা যায়। কেউ কেউ পুরান ঢাকার সুরে কথা বলে, আবার হুমকি দেয় শুদ্ধ বাংলায়। তারপর ব্রিটিশরা অনেক ভালো আবার অনেক খারাপ দ্বিচারিতামূলক বর্ননা দেখা যায় বইটিতে। আরেকটা ব্যাপার খুব দৃষ্টিকটু ছিল; 'বিস্ফারিত' শব্দের স্থলে সবখানে 'বিস্ফোরিত' শব্দের ব্যবহার। এটা কি লেখক বা প্রুফ রিডারের ভুল? 


বইটিকে সাধারণ একটা গল্প হিসেবে গড়ে তুললে আরো ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাহলে 'অল্টারনেট হিস্ট্রি' থ্রিলার বলে প্রচারণা কেন করা হলো? এটা হয়তোবা মার্কেটে পরিচিতি বাড়ানোর জন্যই। ভিন্ন ইতিহাস লিখতে আগে মূল ইতিহাসের বিশ্লেষণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া জরুরি। এতে করেই ভিন্ন পথের সম্ভাবনাকে আয়ত্তে আনা যায়। সাধারণ একটা গল্প হিসেবে পড়লে এটা সুন্দর গল্প; আর যদি আপনি ইতিহাসকে ধর্তব্যের মধ্যে আনেন তাহলে ভালো লাগবেনা। হ্যাপি রিডিং।
Profile Image for Rifat Jahan.
7 reviews
May 30, 2025
একটা যুদ্ধে মূল চরিত্রের সাথে অনেক পার্শ্ব চরিত্রও থাকে। দেখা যায়, মূল চরিত্রের থেকে পার্শ্ব চরিত্রগুলোর সেক্রিফাইস বেশি থাকলেও হাইলাইট করা হয় মূল চরিত্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো। পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে যাদের নাম উঠে আসে, তারা গল্পের মাঝেই হুটহাট হারিয়ে যায়। অল্প একটু মন খারাপ হলেও যার খুব বেশি ভাবান্তর আমাদের মনে আসে না।
"শ্রাবণের দিন" বইয়ে আমিনুল ইসলাম সেই পার্শ্বচরিত্রগুলোর সেক্রিফাইস, তাদের জীবন কাহিনী তুলে ধরেছেন পরোক্ষভাবে। লেখকের চমৎকার লিখনশৈলী আমার মনে যেমন আশ্বিনের স্পষ্ট ছবি একেঁ দিতে পেরেছে। সেরকম রবিন, শ্রাবণের ছবিও আঁকতে পেরেছে। যেনো চোখ বন্ধ করলে ভেসে উঠে, শ্রাবণ কিভাবে বারান্দা থেকে গ্রিসের দিকে তাকিয়ে ছিলো। আশ্বিন কিভাবে ফুটবল নিয়ে মাঠে গোলপোস্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। রবিন কিভাবে তার বাবাকে ইয়াসিরের সাথে কানেকশনের কথা জিজ্ঞেস করেছিলো।
এটা এমন একটা বই যেটাকে আমি অনেক বেশি এপ্রিশিয়েট করবো।
Profile Image for Ichthy Ander.
20 reviews24 followers
December 27, 2025
“শ্রাবণের দিন”-এর সাথে দারুন একটা সময় কাটলো। মূলত বইটা নিয়ে লেখকের কনফিডেন্টের কারণেই সংগ্রহে নিয়েছিলাম। যেহেতু আগে আমিনুল ইসলামের আর কোনো লেখা পড়া হয়নি তাই ভাবলাম, এমন ইউনিক একটা প্লটের সাথে লেখকের সেরা কাজটা দিয়েই না হয় শুরু করা যাক! এমন একটা গল্প যেখানে দুই হাজার সাল পেরিয়ে গেলেও ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করেনি উপমহাদেশ। এবং বইটা শেষ করার পর অত্যন্ত মুগ্ধতার সাথে বলতে হচ্ছে যে, লেখক এবং প্রকাশকের কনফিডেন্ট বৃথা যায়নি। সত্যিই দারুন লেখনীর সাথে বেশ উপভোগ্য একটা গল্প উঠে এসেছে।

পড়তে বসার পর প্রথম কয়েক পেজ পড়ে একটু এলোমেলো অবশ্য মনে হয়েছিলো। তবে, ৩/৪ অধ্যায়ের পরেই সেটা কাটিয়ে উঠে ভালোভাবে গল্পের গতি এগিয়েছে। এবং সবচেয়ে ভালো লাগার যে দিকটি, প্রত্যেকটা চরিত্রের পেছনের গল্প কিংবা জীবনের গল্পটা বেশ শৈল্পিকভাবে ফুটে উঠেছে বইয়ে। সাধারণত এই পার্ট গুলো পড়তে গেলে বিরক্তি আসে। তবে এই বইয়ের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। বরং আরো বেশী ভালোভাবে বইয়ের সাথে জড়িয়ে যেতে হয়েছে। শেষটা জানার জন্যে, প্রত্যেকটা চরিত্রকে জানার জন্যে আগ্রহ বাড়ছিল অনেকটা। বন্ধুত্ব, দেশপ্রেম, প্রতিশোধ, প্রিয়জনের প্রতি অভিমান, মানব জীবনের সার্বিক হতাশা সমস্তকিছু মিলিয়ে সত্যিই একটা ইমোশনাল জার্নি শ্রাবণের দিন।
Profile Image for Rabby Hassan Bin Miraj.
9 reviews
January 4, 2024
২০২৩ সালে আমার পড়া শেষ বই ছিলো 'শ্রাবণের দিন'। এর আগে অল্টারনেট হিস্ট্রিকাল থ্রিলার জনরার কোনো বই আগে পড়া হয়নি। এই জনরার পড়া প্রথম বই হিসেবে বইটা ছিলো অনেক উপভোগ্য। ২০২৩ সালে পড়া আমার সেরা বই গুলার একটা হয়ে থাকবে এটা, সাথে আমার পছন্দের বইগুলার একটা। আমার কাছে বইটার সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে যে এটা যেকেউ এক বসাতেই পড়ে শেষ করতে পারবে। খুব সুন্দর করে লেখা বইটা। লেখকের জন্য শুভকামনা। লেখক যেন আরও এমন সুন্দর সুন্দর বই পাঠকদের উপহার দিতে পারে।💖
Profile Image for Sajia Morshed Disha.
3 reviews
December 22, 2023
Khub shundor ekta boi...boi ta porte giye kanna chole eshechilo...boi tar kahini amar mon chuye geche...khub joldi e boi tar review niye ashbo amar youtube channel "Disha's Diary" te...
Profile Image for Isma Ekram.
24 reviews7 followers
December 13, 2023
কাহিনী সংক্ষেপ: অল্টারনেট ইউনিভার্স নিয়ে গল্প বাংলা সাহিত্যে প্রায় নাই আর এতো থ্রিলার।
কেমন হতো যদি ৪৭ এ দেশভাগ না হতো! গল্পের কথক আর দশটা মেধাবী ছাত্রের মতোই দেশের ঝামেলা এড়িয়ে বিদেশে নিস্তরঙ্গ জীবন গড়ে নিতে চায়। এই লক্ষ্যেই দেশ দুঃখিত প্রদেশ সেরা টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়, বন্ধু হিসেবে পায় এক অদম্য ফুটবলারকে আর রহস্যময় বড়ভাই শ্রাবণকে। আর তো আছেই কথকের প্রেমিকা। আপাত দৃষ্টিতে প্রত্যেকেই আলাদা কিন্তু এক অদৃশ্য সুতায় দেশের ভবিষ্যতের সাথে সবার ভাগ্য যেন জড়ানো।
কি হয়, আমাদের কথক কি MIT তে ভর্তি হয়! আশ্বিন কি ন্যাশনাল ফুটবল দলে ডাক পায়! শ্রাবন কি সুখ খুঁজে পায়! এই উপমহাদেশ কি স্বাধীন হয়! এই সব প্রশ্নের জবাব পেতে প্রেম -বন্ধুত্ব -বিশ্বাসঘাকতায় মোড়ানো উপন্যাসটি পড়তে হবে।
আমার কাছে প্রধান দুই চরিত্রের মাঝে আমি ক্র্যাক প্লাটুনের দুই সদস্যের ছায়া খুঁজে পেয়েছি যা ভালোই লেগেছে আর এক জায়গায় সপ্তপদীর ছাপ আছে মনে হয়েছে। আমি বলবো এইটা একটা চমৎকার ব্যাপার,হোমেজ টাইপের। একটাই দুঃখ উপন্যাসটি আরো বড় করা উচিত ছিলো।
বই সব আসে বাবার বাড়ির ঠিকানায়। এসেছে সারাদিন জানতে পারি নাই। রাতে জেনে নিয়ে এসে আমার ছোট্ট বই পোকাটা ঘুমাইলে পড়া শুরু করেছিলাম।
প্রথমেই আসি প্রোডাকশনের কথায়, আহ্ গোল্ডেন এজ আর লাইট ব্লু পেজ কি সুন্দর! পেজ আর কালির কোয়ালিটিও বেশ ভালো।প্রোডাকশন, ক্যারেক্টার কার্ড সবই চমৎকার।
This entire review has been hidden because of spoilers.
Profile Image for Jawad  Ul Ul.
Author 8 books43 followers
February 14, 2024
এমন একখানা পৃথিবীর কথা যদি চিন্তা করি যেখানে উপমহাদেশ কভু ব্রিটিশ দাবানল থেকে বাঁচতে পারেনি তখন সর্বপ্রথমেই নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন এসে যায়। ভাবি এও কি সম্ভব? যদি হতো তবে আমার গা'র রঙ কেমন হতো? কোনো ব্রিটিশ তরুণ কি আমার বাবা হতো? আমিও হতাম সাদা চামড়ার?

উদ্ভট সব প্রশ্নগুলো গাছের লতাপাতার মতো তরতর করে বেড়ে উঠে একটা ভাবনায় গিয়ে থামে - হয়তো মহাবিশ্বের কোনো এক টাইমলাইনে এমন ঘটনাও ঘটছে?

কোনো এক মধ্যদুপুরে এমন চিন্তা থেকেই বুঝি লেখক আমিনুল ইসলাম এই গল্পটা বুনেছিলেন মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবে! আর সেই গল্পখানা ধীরলয়ে দু দু বার করে পড়ার পর আমি বুঝতে পারলাম কী চমৎকার কিছু চরিত্রের সাথে সময় কাটিয়েছি যে এখন তাদের ছেড়ে দিয়ে বড্ড খারাপ লাগছে।

শ্রাবণের দিনকে মোটা দাগে অল্টারনেট হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার বলা যায় না বলে আমি মনে করি। বরঞ্চ মনে হয়, লেখক হয়তো এই একটা ঘরানাকে টুল হিসেবে ব্যবহার করে কিছু কথা বলতে চেয়েছেন, নিজস্ব কিছু ধারণা আর মতবাদ রাখতে চেয়েছেন বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের সামনে। আর কিছু কি নেই? চুপচাপ মাথা ঠান্ডা রেখে যদি ভাবেন তবে মনে হবে লেখক বোধ হয় এখানে নিজস্ব মতবাদ রেখে ক্ষান্ত হননি, একটা অতি সাধারণ তবে দারুণ গল্প বলেছেন, হয়তো ছেড়েছেন কিছু দীর্ঘশ্বাস।

তাই শ্রাবণের দিন গতানুগতিক থ্রিলার বইগুলো হতে গিয়েও অনেক বেশি কিছু হয়ে গেছে। এক একখানা চরিত্র ও তাদের ডেভলপম্যান্টগুলো সেই 'বেশি কিছু' হয়ে যাওয়াকে দিয়েছে পূর্ণতা। কিছু জায়গায় হয়তো গল্প ঝুলে গিয়েছে, দুয়েক জায়গায় চরিত্র রূপায়নে দেখা গিয়েছে অপ্রয়োজনীয় ঘটনা এবং সংলাপে থেকে গিয়েছে কিঞ্চিৎ অপরিপক্কতা; কিন্তু দিনশেষে লেখকের চরিত্রগুলোকে এক সুতোয় বাঁধার দারুণ দক্ষতা সব কিছুকে করেছে পে অফ।

শেষটা খানিক ড্রামাটিক। পড়তে গিয়ে কেউ কেউ বিরক্ত হবেন, অথবা কেউ হবেন আবেগী। তবে সে যা-ই হোক না কেন, আমার মতে এই ড্রামাটিক ক্লাইম্যাক্সটা না দিলে পুরো উপন্যাসখানা বোধ করি খাপছাড়া থেকে যেত। ওই যে কিছু সময় হয় না, তরকারিতে একটু ঝাল বেশি হলেও তৃপ্তি পাওয়া যায়? আমার কাছে বইয়ের ক্লাইম্যাক্স লেগেছে তেমন।

শ্রাবণের দিন হলো ট্রেন্ডে থাকা সব হিপহপের মাঝে একটি ক্লাসিক সং, যা শুনলে আপনি উত্তেজনায় টগবগ করবেন এমন না তবে নিশ্চিতভাবেই তা আপনাকে আধুনিক দুনিয়া থেকে এক ধাক্কায় দূরে ঠেলে দিয়ে নিয়ে যাবে পুরোনো কোনো এক সময়ে, কোনো এক আফসোসে, কোনো এক অপূর্ণতায়, কোনো এক ভালো লাগায়; যেখানে আপনিও বাঁকা হেসে ভাববেন মহাবিশ্বের কোনো এক টাইমলাইনে হয়তো সত্যিই এমন কিছু ঘটেছিল!

লেখক আমিনুল ইসলামের জন্য শুভ কামনা। আশা করি সামনে উনার কাছ থেকে আমরা আরও দারুণ কিছু কাজ উপহার পাব!
2 reviews1 follower
January 22, 2024
আমি সাধারণত কোনো বইয়ের রিভিউ লিখি না। আমি ভালো রিভিউ দিতে পারি না এইটা তার প্রধান কারন৷ কিন্তু কেন এই বইয়ের একটা রিভিউ দিচ্ছি। কারন বরছের শুরুর দিকে এত ভালো একটা বই পড়ার পর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না।
ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন,

কেমন হতো যদি ব্রিটিশ ১৯৪৭ সালে এদেশ ছেড়া না যেত বাংলা স্বাধীন না হতো। এই জিনিসটা দেখে ভেবেছিলাম কোনো ফ্যান্টাসি নিয়ে লেখা এন্ডিংয়ে যুদ্ধ হবে বাংলা স্বাধীন হবে৷ যেহেতু থ্রিলার ক্যাটাগরির একটা বই গল্পের মঝে অনেক টুইস্ট থাকবে চোখের পলকেই গল্পের মোড় ঘুরে যাবে যেমনটা সাধারণ থ্রিলার বইয়ে হয়ে থাকে। এই বইয়েও একজন মানুষকে ঘিরে অনেক রহস্য ছিল 'ছায়া'। বিদ্রোহী দলের নেতা মির্জা গালিবের মারা যাবার সময় সবার উদ্দেশ্য বলেছিল আমি মারা যাবার পর পুরো বিদ্রোহ দলকে যে লিড করবে সে হচ্ছে 'ছায়া'। কে এই 'ছায়া' কেউ জানে না৷ 'ছায়া' কোথায় আছে দেখতে কেমন কেউ তা জানে না। মির্জা গালিব তারা একমাত্র ছেলে মজনু গালিবকে তার উত্তরসূরী না বনিয়ে কেন 'ছায়া' কে বানালো। এই একটা রহস্য আপনাকে গল্পের শেষ অব্দি ধরে রাখবে।

এইবার কতগুলো চরিত্র নিয়ে বলি,

অসম্ভব মেধাবী ছাত্র রবিন ইংরেজদের বানানো একটি ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যায়, ভর্তি পরিক্ষাতে গত সব বছরের থেকে অনেক বেশি পরিমান রেকর্ড করা নাম্বার নিয়ে সে প্রথম হয়। সেখানে দেখা হয় আশ্বিনের সাথে, যে অসম্ভব ভালো ফুটবল খেলে। তারা ভালো বন্ধু হয়ে যায়। তারপর ইউনিভার্সিটিতে একজনের সন্ধান পায় রবিন, আশরাফ শ্রাবণ যার নাম। ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষ ছেড়ে যে গিয়েছিল বিদ্রোহী দলে। আবার ফিরেও এসেছিল। রবিনের চোখের সামনেই তাকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। ধারণা করা হয়েছিল এই আশরাফ শ্রাবণই হচ্ছে 'ছায়া'। অন্য দিকে শ্রাবণ বেচে থাকার সব আশা ছেড়ে দিয়েছিল। তার চারদিকে শুধু হতাশা। ছোট কাল থেকেই সে 'শ্রাবণের দিন' এর জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছে তার মা তাকে কথা দিয়েছিল শ্রাবণ মাসের প্রথম দিন তার মা তার জন্য একটি বোন নিয়ে আসবে৷

'শ্রাবনের দিন' কখনো আসবে না তার জীবনে সে তা কখনো বুঝেনি।


(বই পড়ে কান্না করার মতো মানুষ আমি না। কিন্তু এই বইটা পড়ার সময় অনেক খারাপ লাগে। চোখের জল ধরে রেখেছিলাম কিন্তু ভেতর থেকে অনেক খারাপ লাগা কাজ করে৷ "বই পড়ে কান্না করে" কতটা খারাপ দেখা যায় তাই না৷ কিন্তু বইয়ের ভেতর আপনি যদি কোনো একটা চরিত্রকে আপনি ভেবে নেন, কল্পনা করেন আপনি ও ঐ গল্পের ভেতর কোথাও আছেন৷ আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি বইটা আপনার কাছে অনেক ভালো লাগবে।)
Profile Image for রোকেয়া  আশা.
5 reviews1 follower
January 10, 2024
#বই_রিভিউ

"শ্রাবণের দিন" অল্টারনেট হিস্ট্রির একটা গল্প, যেই গল্পে ভারতবর্ষ কখনো স্বাধীন হয়নি। ব্রিটিশরা কখনো উপনিবেশ ছাড়েনি।
সেই উপনিবেশের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির ছাত্র রবিন, সাধারণ এক তরুণ। নিজেরই মতো সাধারণ আরেক তরুণী হৃদিতাকে নিয়ে এক সন্ধ্যায় দূরের কোনো একটা দেশে বসে তুষারপাত দেখার স্বপ্ন। তার খ্যাপাটে রুমমেট আশ্বিন, চমৎকার ফুটবল খেলে যেই ছেলেটা। ইউনিভার্সিটিতে তাদের সিনিয়র, শ্রাবণ।
অন্যদিকে, বিদ্রোহীদের নেতা মজনু, যাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুরো দেশের পুলিশ ফোর্স। যদিও, বিদ্রোহীদের আসল অধিনায়ক মজনু নয়, অন্য কেউ। ছায়া নামে তার কথা ভাসাভাসা শোনা যায়। শুধু, তার পরিচয় কেউ জানে না।

আমিনুলের সবচেয়ে সুন্দর লেখনীর একটা "ইতি, আপনাদের প্রিয় গোস্ট খুনী", যেটা অসম্ভব আন্ডাররেটেড। অন্যটা, "শ্রাবণের দিন"।

এই গল্পটাকে থ্রিলার হিসেবে না পড়ে বরং একটা আখ্যান হিসেবে পড়লেই ভালো। অবশ্যই, ভালো কিছু টুইস্ট আছে গল্পে। ছায়ার পরিচয় আমি শুরুতেই বিঝে ফেলেছিলাম, তবে আমার ধারণা বেশিরভাগ পাঠকের বুঝতে দেরী হবে। অন্য টুইস্টগুলোও দারুণ।

কিন্তু, এই গল্পটা টুইস্টের জন্য না, বরং গল্প বলার ধরনের জন্য, আর গল্প ইটসেল্ফের জন্য চমৎকার। শ্রাবণের পুরো গল্পে উপস্থিতি কম। কিন্তু তারপরও গল্পটা শ্রাবণের দিনের অপেক্ষার গল্পই। কেন, সেটা বুঝতে হলে পড়তে হবে।
শ্রাবণ, পরিচিত একজন ত্রিস্তান- দুঃখের সন্তান। এই গল্পটা একটা অসম্ভব মায়াময় গল্প, বিষাদের গল্প, স্বপ্নভঙ্গ, বিসর্জন আর অপ্রাপ্তির গল্প। কিন্তু তারপরও, শেষ পর্যন্ত গল্পটা একটা স্বপ্ন দেখাবে।

ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৫/৫

বইঃ শ্রাবণের দিন
প্রকাশনীঃ বেনজিন
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ২১৫
3 reviews2 followers
January 3, 2024
সল্প কথায় বেশ ভালই ছিল পুরোটা সময়, কেবল কিছু কিছু জায়গায় সংলাপ আদান প্রদানে দুর্বলতা অনুভব করেছি, বাদ বাকি উপভোগ্য
Profile Image for Rehnuma.
449 reviews21 followers
Read
January 5, 2024
❛𝘊𝘢𝘯 𝘺𝘰𝘶 𝘪𝘮𝘢𝘨𝘪𝘯𝘦 𝘢 𝘸𝘰𝘳𝘭𝘥 𝘸𝘩𝘦𝘳𝘦 𝘰𝘶𝘳 𝘴𝘶𝘣𝘤𝘰𝘯𝘵𝘪𝘯𝘦𝘯𝘵 𝘯𝘦𝘷𝘦𝘳 𝘨𝘰𝘵 𝘪𝘯𝘥𝘦𝘱𝘦𝘯𝘥𝘦𝘯𝘤𝘦 𝘧𝘳𝘰𝘮 𝘵𝘩𝘦 𝘉𝘳𝘪𝘵𝘪𝘴𝘩?
𝘑𝘶𝘴𝘵 𝘵𝘩𝘪𝘯𝘬! 𝘕𝘰 1947 𝘥𝘪𝘷𝘪𝘴𝘪𝘰𝘯, 𝘯𝘰 14𝘵𝘩 𝘰𝘳 15𝘵𝘩 𝘈𝘶𝘨𝘶𝘴𝘵, 𝘯𝘰 𝘗𝘢𝘬𝘪𝘴𝘵𝘢𝘯 𝘢𝘯𝘥 𝘐𝘯𝘥𝘪𝘢, 𝘢𝘯𝘥 𝘯𝘰 1971! 𝘕𝘰 𝘉𝘢𝘯𝘨𝘭𝘢𝘥𝘦𝘴𝘩! 𝘑𝘶𝘴𝘵 𝘢 𝘴𝘶𝘣𝘤𝘰𝘯𝘵𝘪𝘯𝘦𝘯𝘵 𝘶𝘯𝘥𝘦𝘳 𝘉𝘳𝘪𝘵𝘴 𝘩𝘰𝘱𝘪𝘯𝘨 𝘧𝘰𝘳 𝘷𝘪𝘤𝘵𝘰𝘳𝘺!❜


১৯৪৭ এ হয়নি দেশভাগ। ফলে ৫২, ৬৯, ৭০ কিংবা ৭১ এর কোনো অ্যাখ্যান নেই। এমন এক উপমহাদেশে আছে ৬১ এর বি দ্রো হ, ৭৯ এর কলকাতা বি দ্রো হ, ৮২ কিংবা ৮৭ এর বি দ্রো হ, আর ৯২ এর মির্জা গালিবের সেই সম্মিলিত বি দ্রো হ।


দ্বিতীয় বিশ্বযু দ্বের পর ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার আন্দোলন ব্যাপকভাবে শুরু হয়। কোণঠাসা ব্রিটিশ বাহিনী প্রায় সিদ্ধান্তে এসেই পড়েছিল দিয়ে দিবে স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণ যে তখনো এই উপমহাদেশের কাছে অধরাই হয়ে থাকবে কে জানতো! সিদ্ধান্তের আগ মুহূর্তেই খু ন হয়ে যায় উপমহাদেশের বেশ স্বনামধন্য কিছু নেতা এবং ঘা তক দেশীয় রাজনৈতিক সংগঠন। শেষ বিশ্ববাসীও তাদের মত ঘুরিয়ে ব্রিটিশ শাসন বলবত থাকুক এই মর্মে আখ্যা দিয়ে উপমহাদেশকে তিনটা অঙ্গরাজ্যে ভাগ করে দেয়। পাকিস্তান অঙ্গরাজ্য, হিন্দু বা ভারতীয় অঙ্গরাজ্য এবং গোটা পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী নিয়ে বাংলা অঙ্গরাজ্য। সাথে জুড়ে দেয় বেশকিছু শর্ত।
ঐ ফিরিঙ্গির দলেরা তাদের শর্ত পূরণ করবে কিংবা সবাইকে সমান অধিকার সম্মান দিবে এমনটা কেউ আশাই করেনি। পরাধীনতার শেকলের সাথে দাসত্ব যোগ হয়ে নিচু হয়েই হয়তো কাটিয়ে দিতে হবে জীবন। কিন্তু উপমহাদেশকে অবাক করে দিয়ে সাদা চামড়ার শাসকেরা ঠিকই তাদের শর্ত অনুযায়ী কাজ করে যায়।


❛স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,
কে পরিবে পায় ।❜


তাইতো এসকল শর্তের পরেও একদল বিদ্রোহ করে বসে। তারা নিজের দেশ, নিজের স্বাধীনতা চায়। এরই প্রেক্ষিতে শুরু হয় আন্দোলন। তিনটি অঙ্গরাজ্য থেকেই ব্যাপকভাবে সাড়া পাওয়া যায়। মির্জা গালিব, যিনি উপমহাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। এখানেই উঠে আসে মজনু গালিব সহ বঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী নেতার নাম। কিন্তু সাদা চামড়ার লোকেদের তৎপরতায় প্রায় সফল এই আন্দোলনেরও সমাপ্তি হয়। গালিব প্রাণ দেয় অধরা ঐ স্বাধীনতার জন্য। কিন্তু রেখে যায় তার লিগাসী। গালিবের উত্তরসূরী ❛ছায়া❜ নামে এক ব্যাক্তি যে কিনা সময়মতো আবির্ভাব হবেন এবং স্বাধীনতার ডাক দিবেন।


সময়টা ২০০৩ কিংবা ২০০৪, পরাধীন বেঙ্গল অঙ্গরাজ্য। এভাবেই মানিয়ে নিয়েছে তাদের জীবন। সে সময়েরই এক মেধাবী বালক রবিন। পুরো উপমহাদেশে বেশ কয়েক বছরের ইতিহাসে গণিত অলিম্পিয়াডে প্রথম হওয়া বাঙালি ছাত্র। চান্স পেয়েছে বি.আই.টিতে। একদম আঁতেল যাকে বলে সে ধরনের ছেলে। যার ইচ্ছা এম.আই.টিতে পড়বে। প্রিয় মানুষ হৃদিতাকে নিয়ে সুন্দর ঘর বাঁধবে। বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করবে। স্বাধীনতা কী কিংবা রাজনীতি তার মাথায় আসে না। এর থ���কে জটিল অংক সমাধান করা ঢের সোজা।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে হৃদিতাও। উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত, সুন্দরী, মেধাবীর এক চমৎকার কম্বিনেশন যাকে বলে।
আশ্বিন, বি.আই.টিতে ভর্তি হয়েছে সেও। ফুটবলপ্রেমী ছেলেটি ভার্সিটিতে ঢুকেই নাম কুড়িয়ে ফেলেছে তার প্রতিভা দিয়ে। সবাই আশা করে ব্রিটিশ দলে খেলার সুযোগও হয়তো পেয়ে যাবে সে। চঞ্চল, মিশুক এই ছেলেটির সাথে রবিন এবং হৃদিতার বেশ ভাব হয়েছে। ভালোই কাটছে তাদের জীবন। টুকটাক পাবলিক ভার্সিটিতে যে সমস্যা হয় সেগুলো বাদে চলছে ভালো।
শ্রাবণ মাসে জন্ম নিয়েছে বলে মা নাম রেখেছিলেন শ্রাবণ। বি.আই.টিতে ড্রপ খেয়ে খেয়ে এখনো তৃতীয় বর্ষে রয়ে গেছে সে। শুরুটা বেশ ভালো ছিল। কিন্তু কীভাবে যেন ছন্দপতন হয়ে গেল। যোগ দিয়েছিল মজনুর বি দ্রো হী দলেও। কিন্তু আদর্শের মিল না হওয়ায় ছেড়ে এসেছে সব। শ্রাবণের মনে অতল দুঃখ। সে অপেক্ষা করে আছে হয়তো একদিন শ্রাবণের দিন আসবে।
ইয়াসির আলী, আর.আর.বি এর অফিসার। বাংলা অঙ্গরাজ্যের বি দ্রো হী দে র নিকেষ করতে এক ত্রাসের নাম সে। লোকে বলে সে নির্ঘাত সাইকোপ্যাথ। হেসে হেসে গু লি চালিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন। এক অসীম ঘৃণা নিয়ে অনেকগুলো বছর পার করছে সে। জীবন তাকে এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলেছে যেখানে বিপরীতমুখী হইতে হয়েছে এককালের প্রিয় বন্ধুর।
সবাই স্বপ্ন দেখে একদিন স্বাধীন হবে দেশ, নিজ পতাকা হবে, আপন হবে সব। আবার কেউ এই দাসত্বকেই মেনে নিয়ে মুখ গুজে চলছে। কিন্তু স্বাধীনতা লাভ হলেই কি সব ঝামেলা শেষ? কথায় আছে,
স্বাধীনতা অর্জনের থেকে রক্ষা করা কঠিন। তবে এই বিশাল উপমহাদেশের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার যে আশা সেটা কি অধরা রবে? এমন কি হতে পারে এখন পিষছে ফিরিঙ্গিরা, স্বাধীনতা পেলে পিষবে নিজ ভূমির লোকেরা! কে জানে। তবুও তো স্বাধীন হতে ইচ্ছে হয়। কেমন লাগে মুক্ত আকাশে, মুক্ত দেশে একটু নিঃশ্বাস নিতে?
ছায়ার আবির্ভাবের অপেক্ষায় আছে জাতি। মাঝে অনেকগুলো ঘটনা ঘটে যায়। তবে এই কি সময় ❛ছায়া❜ এর নিজেকে বাইরে আনার? ২০০ বছরের পরেও যে স্বাধীনতা ধরা দেয়নি সেটা ২৫০ বছর পরে আসবে এমন আশা নিয়ে এগিয়ে যাবে পাকিস্তান, ভারত আর বাংলা অঙ্গরাজ্যের লোকেরা।
আগুনের দিন শেষ হয়ে শ্রাবণের দিন আসুক না তবে!




পাঠ প্রতিক্রিয়া:


ঐতিহাসিক উপন্যাস মানেই গোগ্রাসে গিলে ফেলা। বর্ণনার আধিক্য থাকলেও অতীতের বীরদের ঘটনাগুলো পড়তে বেশ লাগে। আর কেমন হয় যদি অতীতের ঘটনাগুলো যেমন ঘটেছিল তেমন না হয়ে অন্যকিছু হতো? ধরলাম, A time traveler moves a chair! Result? Indian subcontinent never got independent!
যাক এত সময় ভ্রমণের দিকে নাই গেলাম। এমন যদি আসলেই হয় আমরা কোনোদিন ভাগ হইনি আর পাইনি আমাদের স্বাধীনতা? ইতিহাসের বিকল্প এক ইতিহাস। একেই সাহিত্যের ভাষায় বলে ❛অল্টারনেট হিস্টোরিক্যাল ফিকশন❜।
লেখক আমিনুল ইসলামের লেখা ❝শ্রাবণের দিন❞ উপন্যাসটি এই ধারার এক উপন্যাস। ইতিহাসটা এমন না হয় বিকল্প হলে কেমন হতো সে ঘটনাকে নিয়েই এগিয়ে গেছে এই উপন্যাস। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সত্যতা বা ঐতিহাসিক চরিত্রের ধার ধেরে কোন লাভ নেই। কারণ ওগুলো ঘটেইনি কখনো!
এরকম ভিন্ন স্বাদের উপন্যাস হিসেবে বইটির ঘোষণা যখন শুনেছিলাম তখনই ঠিক করেছিলাম এটা তো পড়তেই হবে। লেখকের আগে লেখা দুটো লেখা পড়া আছে। ❝শ্রাবণের দিন❞ আমার পড়া তৃতীয়। এবং অবশ্যই আমার পড়া উনার সেরা লেখা।
বিকল্প ইতিহাসে কেমন হতে পারে একসময়ের বিশাল এই ভারতীয় উপমহাদেশ? ১৯৪৭ পর্যন্ত আগের সেই ইতিহাসের পরেই লেখক বদলে ফেলেন ঘটনা। সেখানে থেকেই এই উপন্যাসের শুরু।
পরাধীন উপমহাদেশ তখনো স্বাধীনতা পাওয়ার আশা করে যাচ্ছে। কেউ যোগ দিচ্ছে স্বাধীনতাকামী বি দ্রো হী দে র দলে। কেউবা যেমন স্রোত তেমনভাবেই ভেসে চলেছেন। নিজ দেশে সাদা চামড়ার লোকেদের হম্বিতম্বি, ভয় নিয়ে চলা, উঁচু পদের সবাই ঐ সাদা চামড়ার লোকেদের প্রাধান্য পাওয়া চলে আসার সেই সময়গুলো কেমন কাটতো, এই বর্ণনাগুলো পড়তে দারুণ লেগেছে।
রবিন, হৃদিতা, আশ্বিনের বন্ধুত্বটা আমার সবথেকে ভালো লেগেছে। কোনো লুকোচুরি নেই, হিংসা নেই, একজনের বিপদে আরেকজন রুখে দাঁড়ানো এসব ব্যাপারগুলো দারুণ ছিল।
অতীত এবং বর্তমানের মিশেল ভালো ছিল। দুটোর ধারাবাহিক আগমন আবার গল্পের প্রয়োজনে অতীত থেকে বর্তমানে টার্ন এবং বিপরীত ব্যাপারগুলো উপভোগ্য ছিল খুব।
তিনটা অঙ্গরাজ্যের ঐ বিভক্তির একটা ব্যাপার আমার সবথেকে ভালো লেগেছে। সেটা হলো, বাংলাকে ভাগ না করা। পশ্চিমবঙ্গকে এক রেখে বাংলা ভাষাভাষীদের নিয়ে বাংলা রাজ্য গঠন ব্যাপারটা বর্তমানের এই ইতিহাসে হয়নি দেখে একটা আফসোস ছিল। সেটা এই উপন্যাসে মিটেছে। ব্রিটিশ আ ন্দো লনের বেশিরভাগ ঘটনা ইতিহাস পাকিস্তান কিংবা ভারতের নেতাদের আধিক্য দেখা যায়। বাংলার অবদান, তাদের ত্যাগের বিষয়টা খুব একটা গোচর হয়না। লেখক এখানে বাংলাকে প্রাধান্য দিয়েছেন এটাও বেশ ভালো লেগেছে।


এই উপন্যাসে অন্যতম ব্যাপার যেহেতু চরিত্র তাই এক্ষেত্রে লেখক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ঐতিহাসিক চরিত্রের খুব একটা ধার না ধেরে নিজস্ব ইউনিভার্স তৈরি করে নিজস্ব ঐতিহাসিক নেতাদের আগমন ঘটিয়েছেন। একেবারে বাস্তব চরিত্রও ছিল তবে সেটা নগন্য।
শ্রাবণ, রবিন এবং আশ্বিনকে যে ভালো লেগেছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। শ্রাবণের ইতিহাস খুবই বেদনা দিয়েছে। শ্রাবণকে ঘিরে লেখক যে রহস্যের আবহ তৈরি করেছেন সেটা ভালো ছিল।
রবিনের চরিত্রের গঠন মনে হয়েছে সবথেকে সুন্দর এবং পরিপূর্ণ ছিল। পরিস্থিতি, সময় এবং প্রয়োজনে রবিনের যে পরিবর্তন সেটা প্রশংসাযোগ্য।
এখানে ভিলেন বলতে গেলে অবশ্যই ব্রিটিশ বাহিনী। তবে ইয়াসির আলীকে দুর্ধর্ষ হিসেবে দারুণ উপস্থাপন করেছেন।
উপন্যাসের রহস্য ছিল ❛ছায়া❜ নামক উত্তরসূরীকে ঘিরে। তাকে নিয়ে বেশ চমক দিয়েছেন। এই চরিত্রের রহস্য ভালো লেগেছে বেশ। তবে উপন্যাসে লেখক ইয়াসির আলীকে দিয়ে বলিয়েছেন,


❛গোয়েন্দা গল্পে মূল অপ রাধী পেতে খুব সহজ এক ধরনের ধারণা করতে হয়। সম্ভাব্য সন্দেহভাজন তো থাকেই। তবুও দেখা যায় সবথেকে ইনোসেন্ট বা যার পক্ষে এমন কাজ করা সম্ভব না, কেউ ভাবতেই পারবে না দেখা যায় সেই আসল অপ রাধী।❜


❛ছায়া❜ কে হতে পারে আমি এই উক্তির মাধ্যমে বুঝে গেছিলাম। কারণ ওখানে সন্দেহ করা যায় না এমন ছিল...........


একটু এবার সমালোচনা করি। এই বইটা যেমন প্লট শুনেই পড়বো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তেমন একটু গাঁইগুঁই ভাবও ছিল। কারণ লেখকের আগের দুটো বই পড়ার অভিজ্ঞতা। অনেক প্রেম, অনেক সেন্টি খায় তিনি। নিব্বা নিব্বির প্রেম, ইতুপিতু কথা শুনলে আমার গা গুলায়। সবসময়েই আমি রোমান্টিক উপন্যাসকে অ্যাভয়েড করেছি। আমার পছন্দের জনরা নয়। আর লেখকের কাছে মনে হয় ❛প্রেমেই আসল সুধা❜। তাই কিছু রোমান্টিক বিষয় আমার হজম হতে কষ্ট হয়েছে। উপন্যাসের তাগিদে সেসব অনেকগুলো ইগনোরও করেছি। তবে পরীক্ষার আগে দিয়ে নায়িকা কেন ছেলের বাপকে ফোন করে ছেলের কী রঙ পছন্দ জিজ্ঞেস করবে!
রবিন সুস্থ সমেত ফিরে এসেছে দেখে হৃদিতা তাকে ওরকম পরিস্থিতে খালার সামনে জাদু কী ঝাপ্পি দিয়ে দিবে? কেন রাহা নেহি যাতা?
গ্রেসের আচরণ এবং একজনের জীবন তছনছ করে দেয়ার পিছে সে কারণ ছিল সেটা খুবই অযৌক্তিক লেগেছে। ❛আমি ভেবেছি এমন করলে ওমন হবে❜ মানে নিজের একটা ভাবনা বা পসিবিলিটি থেকে একজনের জীবন জ্বা লিয়ে দেয়ার কোনো জাস্টিফিকেশন নেই, মানে একেবারেই নেই।
এসব দিক বাদ দিলে উপন্যাসটা অবশ্যই উপভোগ্য এবং পাঠক এর সাথে দারুণ একটা বিকল্প ইতিহাসের যাত্রা করতে পারবেন আশা করি।


স্বাধীনতা এক আশীর্বাদ, এক আরা��্য বিষয়। যে জাতি স্বাধীনতার স্বাদ পায় না, সে জাতি জীবনের আসল মানে খুঁজে পায় না। পরাধীনতার শিকল, দাসত্বের খেলা খেলতে খেলতে জীবন তরী নিভে গেলেও অতৃপ্ত, অধরা এই স্বাধীনতার আশা করে যায়। যুগ, শতবছর পেরিয়ে গেলেও ক্লান্ত হয় না স্বাধীনতা লাভের যাত্রা। একদিন সেই সোনার হরিণ কেউ ঠিকই ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারে। নিজ দেশে, নিজ সীমানায়, নিজ পতাকার আর নিজস্ব স্বাধীনতার বল ই যে ভিন্ন এক শক্তি। স্বাধীন দেশের শ্রাবণ ধারা তো আরো বেশি মিষ্টি।

Profile Image for Snigdha Noor.
5 reviews
April 29, 2025
স্বাধীনতা কি?কারো কাছে স্বাধীনতা মানে নিজ দেশকে শত্রুমুক্ত করা, কারো কাছে স্বাধীনতা মানে শান্তিতে থাকা। আবার কেউ কেউ মনে করে স্বাধীনতা স্রেফ অসম্ভব কিছু একটা। বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। মানুষ কখনোই স্বাধীন নয়। মানুষ এক পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে মূলত আরেক পরাধীনতাকে বরণ করে। তাহলে আমরা কেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করলাম? স্বাধীনতার আশা নিয়ে আমাদের যে আপন মানুষগুলো প্রাণ দিয়েছে, তাদের প্রাণের মূল্য দিতে। আমরা মূলত একেই বিদ্রোহ বলি। যে স্বাধীনতার স্বপ্নে প্রিয় বন্ধুটা জীবন দিল,ভাই ফিরবে বলেও ফিরলো না, প্রিয়তমার সাথে সমুদ্রতীরে চা খাওয়া হলো না,দরিদ্র বাবা মিথ্যা আনন্দ নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল ।সে স্বাধীনতা কেবলই একটা চক্র। পরাধীনতার চক্র। আমিনুল হাসানের "শ্রাবণের দিন " বইটার নাম শুনে যে কারোরই মনে হবে গল্পটা কোনো রোমান্টিক উপাখ্যানে লেখা। অথচ এই গল্পে কি দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে স্বাধীনতার পেছনে ছোটা মানুষগুলোর অতীত-বর্তমান। কখনো মনে হয়েছে শ্রাবণের গল্প পড়ছি,যার মা তাকে শ্রাবণের দিনে আসবে বলে কথা দিয়েছিল। কিন্ত শ্রাবণের জীবনে সেই শ্রাবণের দিন কখনোই আসেনি।কখনো মনে হয়েছে রবিনের সাদা সিধা জীবনের গল্প পড়ছি। যে সবসময়ই দেশ ছাড়তে চাইতো। একসময় তাকেও পেয়ে বসে স্বাধীনতার স্বপ্ন।
গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনি জোঁকের মতো লেগে থাকবেন। প্রতিটা চরিত্র কিভাবে ধীরে ধীরে নিজেদের রহস্য উন্মোচন করে তা জানতে জানতে আপনি গল্পের শেষ পর্যায়ে চলে আসবেন।তখনই আপনাকে ঘিরে ধরবে অপূর্ণতা।আরো কিছু জানতে ইচ্ছা হবে।
এটা মূলত একটা থ্রিলার বই।যার সাথে যুক্ত হয়েছে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা,বিশ্বাস আর বিসর্জন। এক কথায়, এটা একটা পারফেক্ট কম্বো।প্রথম দশ বারো পৃষ্ঠা পড়ার পর বাকি অংশটুকু এক বসাতে শেষ করেছি।মূল চরিত্র রবিন হলেও শ্রাবণকে বেশি ভালো লেগেছে। এই গল্পের প্লট যে কারো পছন্দ হবে।
বই:শ্রাবণের দিন।
জনরা:থ্রিলার।
লেখক:আমিনুল ইসলাম।
পার্সোনাল রেটিং:৪.৫/৫

*বেনজিন প্রকাশনীর বই এর আগে কখনো কেনা হয়নি। বানানে বেশ কিছু ভুল চোখে পড়েছে। যেমন "পোশাক পরা" না লিখে "পোশাক পড়া " লিখে রেখেছে। বই পড়ার সময় এই ধরনের ভুল খুবই বিরক্তিকর।
Profile Image for Sajibur Rahman.
13 reviews2 followers
December 28, 2023
One of the best book I read in 2023.
Aminul bhai delivered a masterpiece after 'Eo Dorado Curse'.
Recommended!
Profile Image for Tä Sü.
50 reviews1 follower
May 29, 2025


আমরা চোখের সামনের অনেক জিনিসকে অধিকাংশ সময়ই তুচ্ছ করে দেখি। মনে করি, “আরেহ! এটা আর এমন কি!”। ঠিক এরকম চিন্তার কারণেই সামনের জিনিসটার মূল্য আমরা বুঝতে পারি না। পারলেও সেটার সঠিক মূল্য বুঝি না। যেমন ধরেন স্বাধীনতা শব্দটা আমরা এত সহজভাবে বলি অথচ এই স্বাধীনতা কি একদিনেই এসেছে? এর জন্য কি বলি দিতে হয়নি লক্ষ লক্ষ প্রাণ? শত সহস্র বছরের এই আকাঙ্ক্ষা নিশ্চয়ই অনেক ত্যাগের বিনিময়েই এসেছে। কিন্তু আমরা সেই ত্যাগের পূর্ণ অনুভূতি কখনোই নিজের মধ্যে অনুভব করতে পারব না। যারা এ ত্যাগ প্রত্যক্ষ করেছে তাদের অনুভূতির সাথে আমাদের অনুভূতির রয়েছে বিস্তর ফারাক।

সময়টা ২০০৪। আমাদের হিসেব অনুযায়ী এখন ব্রিটিশ শাসন অবসানের প্রায় ৫৭ বছর। কিন্তু না। গল্পে এখনও ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হয়নি। আমাদের এখনও ব্রিটিশরাই শাসন করছে। রবিন একজন অসাধারণ ছাত্র। মানুষ হিসেবেও সে ভালো। কিন্তু অনুভূতি প্রকাশের বেলায় সে যাচ্ছে তাই। রবিনকে গিয়ে যদি বলা হয়, তোমার বাবা মারা গিয়েছে। সে হয়তো উত্তরে বলবে— ওহ আচ্ছা। অথচ তার ভিতরে টর্নেডো বয়ে যাবে। সম্প্রতি সে বি. আই. টি. ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। যা বাংলা অঙ্গরাজ্যের সেরা ইউনিভার্সিটি। ভর্তি পরীক্ষায় রবিন পেছনের সকল বছরের রেজাল্ট রেকর্ড ভেঙে দিয়ে প্রথম হয়েছে। তার বাবার ধারণা মতে রবিন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সেরাদের একজন হতে পারবে। রবিনের এখন এক ও একমাত্র স্বপ্ন হলো ভালো রেজাল্ট করে এম.আই.টি-তে চান্স পাওয়া। এরপর বিদেশে পাড়ি জমানো।

রবিন প্রথমদিন যখন খুঁজে খুঁজে তার রুম বের করে সেখানে ঢুকলো, তখন এক হ্যাংলা পাতলা ছেলেকে তার রুমে দেখল। হয়তো রুমমেট। রবিনের মুখে দ্বিধা থাকলেও ছেলেটি এসে তার সাথে আলাপ শুরু করে দিল। তাও প্রথম কথাতেই তুইমুই করে। তার কথা শুনলে কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝবে না যে তারা একে অপরের সাথে এইমাত্র পরিচয় হয়েছে। ছেলেটির নাম আশ্বিন। রবিন যেমন পড়ালেখায় সেরা আশ্বিন তেমন ফুটবল খেলায় সেরা। রবিন অল্প সময়েই বুঝে গেল আশ্বিন অত্যন্ত ভালো ও যত্নশীল একজন মানুষ। রবিনের কত খেয়াল রাখে! রুমটা সবসময় পরিপাটি করে রাখে একা হাতে , রবিনের ছোটখাটো সব বিষয় তার মাথায় গাঁথা। আর আশ্বিন সবসময় স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে। কিন্তু সেসব রবিনের মাথায় ঢোকে না। কারণ রবিনের ছোট থেকে একটাই স্বপ্ন, সে এম.আই.টি. তে চান্স নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাবে। তার কাছে স্বাধীনতার কোনো মানে নেই। স্বভাবতই অল্প সময়েই তারা একে অপরের ভালো বন্ধু হয়ে যায়।

পরাধীন জীবন যাপন করার চেয়ে মৃত্যুই অনেক সময় শ্রেয় মনে হয়। এই উপমহাদেশকে স্বাধীন করার জন্য যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এমনটা না। আজ থেকে প্রায় ১০-১২ বছর আগে মির্জা গালিব, সময়ের সেরা লিডার স্বাধীনতার ডাক দিলে সকল বিদ্রোহী দল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। শুরু হয় বিশাল যুদ্ধ। লক্ষ্য মানুষের প্রাণহানি হওয়ার পরও স্বাধীন হয়নি এ রাজ্য। মির্জা গালিব পরাজয় বরণ করলেও মৃত্যুর আগে দেন এক স্বস্তির খবর। তার উত্তরসূরী হিসেবে রেখে গিয়েছেন তিনি “ছায়া”-কে। এই ছায়াই একদিন এই উপমহাদেশ স্বাধীন করবে। তারপর চলে গিয়েছে অনেক বছর। মির্জা গালিবের সন্তান মজনুই এখন উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী দলের নেতা। ছায়া কে বা কোথায় আছে, তা কেউই জানে না। সবাই শুধু অপেক্ষায় আছে, ছায়া একদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দিবে আর সকল বিদ্রোহীরা আবার একত্রিত হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা....

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন গল্পের পটভূমি সম্পর্কে। এমন পটভূমি কল্পনা করে এর আগে কখনো কোনো গল্প লেখা হয়েছে কিনা আমি জানি না। তবে এই বইয়ের লেখক দারুণ চিন্তা থেকে এই গল্প লিখেছেন। গল্পটার ফ্ল্যাপ পড়েই বইয়ের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলাম৷ এখন লেখক কতটা গল্পে কতটা সফল হয়েছেন সেটাই জানানোর চেষ্টা করি বরং।

প্রথমেই যদি গল্পের প্লট নিয়ে বলি তাহলে অসাধারণ একটা প্লট ছিল বলাই যায়। কী নেই এই গল্পে? বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, মানুষের শোষিত রূপ, স্বাধীনতার জন্য আকুতি, দেশপ্রেম, একশন, থ্রিল...সবকিছুর মিশেল। এখন কথা হলো সবকিছু নিয়ে লেখক ম্যানেজ করেছে কিভাবে। শুরু থেকে গল্প এমন ভাবে এগোচ্ছিল যেন কোনো সামাজিক গল্প পড়ছি। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে লেখক খুবই বিচক্ষণতার সাথে গল্পের প্লটের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এরপর যখন গল্প আরেকটু সামনে এগোয় তখন অনেকগুলো চরিত্রের সাথে আমরা পরিচয় হই। একেকটা চরিত্রের ভূমিকা একেকরকম। এরপর এলো বিদ্রোহীদের ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা। এগুলোও লেখক সাধারণ ঘটনার মাঝে মাঝে খুবই বিচক্ষণতার সাথে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ লেখকের বর্ণনাশৈলি ছিল খুবই পরিপাটি ও পরিকল্পিত। পাঠকের সাইকোলজিক্যাল ব্যাপারগুলোর সাথে ম্যাচ করে খুব পরিকল্পিতভাবে বর্ণনা করে গিয়েছেন।

ধরুন আপনি এখন একটা চরিত্রের ফ্ল্যাশব্যাক বা ব্যাকস্টোরি পড়ছেন। যেটা খুবই চমকপ্রদ। যখন গল্পটা একটু ইন্টারেস্টিং পয়েন্টে আসলো তখনই গল্প কাট হয়ে চলে গেল বর্তমান সময়ের একটা একশন বা থ্রিলিং সিনে। এই সিনটাও যথেষ্ট চমকপ্রদ। এই সিনে আবার যখন আপনি একটা ইন্টারেস্টিং পয়েন্টে গেলেন তখনই আবার গল্প কাট হয়ে পূর্বেই সেই পয়েন্টে চলে গেল। এখানে হলো কী? আপনি আগের সিনটা জানার জন্য সামনে এগোচ্ছেন, আবার সামনের সিনটা জানার জন্য পেছনেরটা পড়ছেন। এভাবে আপনি একইসাথে দুইটা চমকপ্রদ জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছেন আর সামনে এগোচ্ছেন। প্রায় সব কৌশলী লেখকগণই এটা করেন কিন্তু আমিনুল ইসলাম এই জায়গায় একটু ভালোই কাজ করেছেন। অন্যদের কথা জানি না কিন্তু আমি লেখকের লেখার লুপের মধ্যে এমনভাবে আটকে গিয়েছিলাম যে ছেড়ে উঠতে পারছিলাম না। একটার পর একটা পৃষ্ঠা পড়ে গিয়েছি হুঁশ হীন মানুষের মতো। গল্প যেন অজানা এক আকর্ষণে সামনে নিচ্ছিল।

আমার মতে গল্পের প্রাণ বা হৃদয় হলো চরিত্র। এই হৃদয় যতটা স্বচ্ছ, সুন্দর, গল্প ঠিক ততটাই সুন্দর। এই বইয়ে লেখক সবগুলো চরিত্র নিয়ে কাজ করেছেন। বেশিও না, কমও না। যার জন্য যতটুকু জায়গা প্রয়োজন তাকে ঠিক ততটুকুই জায়গা লেখক দিয়েছেন। সবগুলো চরিত্র যেন নিজের বা আশেপাশের মানুষদের সাথে রিলেট করা যায়। প্রত্যেকটা চরিত্র নিজেদের জায়গায় অনন্য। বইটা যখন শেষ করে উঠবেন তখন দেখবেন যে গল্পের প্রতিটা চরিত্র আপনার মাথায় গেঁথে গিয়েছে। এখানে মূল চরিত্র যে কে, সেটাই হয়তো গল্প শেষে বুঝতে পারবেন না। নির্ঘাত স্পয়েল হবে বলে বেশি এক্সপ্লেইনে যেতে পারছি না৷ নচেৎ হয়তো প্রতিটা চরিত্র নিয়ে আলাদা করে লিখতাম। গল্পের ফ্লো ছিল একদম পারফেক্ট। ২১৬ পৃষ্ঠার মোটামুটি বড় একটা বই হলেও এক বসাতেই পড়ে ফেলা যায়। অনেকদিন পর অনেক তৃপ্তি নিয়ে একটা বই পড়লাম৷

বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি যথেষ্ট ভালো। বেনজিনের বইগুলো এমনিতেই কোয়ালিটিফুল হয়। বানানের কিছু ভুল চোখ পড়েছে। বিশেষ করে 'র' এর জায়গায় 'ও' এর ব্যবহার বেশকিছু জায়গায় পেয়েছি। এছাড়া সব ঠিকঠাক। প্রচ্ছদও যথেষ্ট আকর্ষণীয়। সম্ভবত এ আই দিয়ে করা। সবমিলিয়ে দারুণ।

পরিশেষে, এই গল্প স্বাধীনতার জন্য কারো পরিবার হারানোর গল্প, ভালোবাসা হারানোর গল্প, আবার কারোর প্রাণ হারানোরও গল্প বটে। এই গল্পে রয়েছে ভালোবাসা, অভিমান, বন্ধুত্ব, স্বাধীনতার জন্য আকুতি, ত্যাগ আর আমাদের জন্য স্বাধীনতার সঠিক মূল্য চোখ দিয়ে দেখানো।

📌 ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৭/৫

বই : শ্রাবণের দিন
লেখক : আমিনুল ইসলাম
প্রকাশনী : বেনজিন প্রকাশন
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২১৭
মুদ্রিত মূল্য : ৪৫০৳ (রেগুলার এডিশন)
Profile Image for AFROZA CHOITY .
29 reviews10 followers
January 12, 2024
লেখকের এটা একটু ভিন্ন ধাঁচের লেখা। তার উপর অল্টারনেট হিস্ট্রি নিয়ে পড়া এটা আমার প্রথম ব‌ই। আমি সাধারণত প্রেমের উপন্যাস পড়ি না। এবং যদিও লুতুপুতু প্রেমের উপন্যাস না কিন্তু এখানে ভালোবাসার বুনন টা এত সুন্দর ছিলো যে মনে গেঁথে গেছে। রবিন আর হৃদিতার জন্য আমার‌ও মন কেমন করছে। জানতে ইচ্ছে করছে স্বাধীনতার পর কী তারা সমুদ্র রঙের কাপড় পরে সমুদ্রে গিয়ে ছবি তুলে ছিলো?
রবিন কী বড় করে স্বাধীন দেশের সমুদ্র পাড়ে বড় করে আশ্বিনের নামটা লিখেছিলো?
শ্রাবণের চোখের সেই শ্রাবণের দিনের স্বপ্ন, মজনু আর ইয়াসির সেই অভিমানী সম্পর্ক, আশ্বিনের প্রতিটা পদক্ষেপ তার আত্মত্যাগের পথে, উইলিয়াম এর জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা প্রতিটা চরিত্রের অনুভূতি নিখুঁত। ব‌ইয়ের সাথে সময় দারুণ কেটেছে। এখানে ভালোবাসা, অভিমান, ঘৃণা, স্বাধীনতা, ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ, আত্মত্যাগ সব মিলেমিশে পাঠককে এক ভিন্ন অনুভূতি দিবে।
Profile Image for Fårzâñã Täzrē.
279 reviews21 followers
July 29, 2024
                     🎨 আচ্ছা কেমন হতো যদি পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত না হতো? যদি বাংলায় থাকতো সেই ভারতীয় উপমহাদেশ? যদি এখনো আমাদের শাসন করতো ইংরেজরা? এমন এমন চিন্তা আমার মাথায় কখনো কখনো হুট করে চলে আসে যখন এমন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা সম্বলিত বই পড়ি। মনে হয় আসলেই তো সেদিন ঘটনা যদি বিপরীত হতো ইতিহাস তবে কীভাবে লেখা হতো? ইতিহাস বদলাতে দেখতে ইচ্ছে কিন্তু হয় মাঝে মাঝে।


🎨 রবিন নামের ছেলেটি খুবই মেধাবী। গনিত অলিম্পিয়াডে বাঙালিদের মধ্যে গোল্ড মেডেলিস্ট। আবার চান্স পেয়েছে বিআইটিতে। যেখানে পড়ার স্বপ্ন ছিল ওঁর বাবার। পরাধীন দেশে বাবা যদিও ডাক্তার তবুও ছেলেকে বড় করেছেন এই ধ্যান ধারণায় যে তাঁকে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে হবে। বড় কিছু করতে হবে। পড়াশোনার বাইরের জগতের থেকে রবিন নিজেকে সবসময় দূরে রাখে। দেশ যে এখনো বৃটিশরা চালাচ্ছে তাতে তাঁর তেমন সমস্যা নেই।


🎨 ভার্সিটির হলে এসে তাঁর পরিচয় হয় রুমমেট আশ্বিনের সাথে। বেশ হাসিখুশি মিশুক ধরনের ছেলেটা মূহুর্তেই রবিনকে আপন করে নেয় একদম "তুই" সম্বোধন করে। রবিন বেশ অবাক হলেও আশ্বিনকে মনে মনে তাঁর পছন্দ হয়। একসময় তাঁদের গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আশ্বিন ভালো ফুটবল খেলে। ভার্সিটির ফুটবল দলে সুযোগ পেয়েছে খেলার। ছেলেটা সাদা চামড়ার ফিরিঙ্গিদের খুব ঘৃণা করে। স্বাধীনতার কথা বলে। দেশ কী আদৌ কখনো স্বাধীন হবে এসব ভাবনা আশ্বিনের।


🎨 হৃদিতা মেয়েটা রবিনের ক্লাসমেট কলেজ লাইফ থেকে। শুধু ক্লাসমেট নয় তাঁর থেকেও বেশি তাঁদের সম্পর্ক। হৃদিতা নীল শাড়িতে লাল গোলাপ নিয়ে একদিন এই চুপচাপ মেধাবী ছেলেটাকে প্রপোজ করেছিল। হৃদিতাকে অবাক করে রবিন রাজি হয়ে যায়। ভার্সিটিতেও দুজনে একই ক্লাসে একই সাবজেক্টে পড়ছে। এবং হৃদিতা যেমন রবিনকে ভালোবাসে, হৃদিতাকে অবাক করে রবিন এক চিঠি লিখে নিয়ে এসে বোধহয় জানান দেয় সেও ভালোবাসে সবসময় খালি মুখে বলতে পারে না অনুভূতিগুলো ঠিক করে। হৃদিতার মা ছোটবেলায় এক্সিডেন্টে মারা যায়। বাবা সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত। মেয়েটা বড্ড বেশি যেন একা এই পৃথিবীতে। তাই হয়তো কাউকে পেলেই মনের সুখে গল্প জুড়ে দেয়।


🎨 আব্রাহাম কল্লোল। রবিনদের ভার্সিটির শিক্ষক। জাতে বাঙালি হলে কী হবে সবসময় বাঙালিদের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাব। বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে অপমানসূচক কথা বলেন যা শুনলে আশ্বিন বেচারা খুব খেপে যায়। বাঙালি হয়ে বাঙালিদের উনি কেন যে অপমান করেন! নিজেকে কী সাহেবদের দলের লোক ভাবেন! কল্লোল স্যারের আচরণে অবাক হয় রবিন নিজেও।


🎨 মজনু বিদ্রোহীদের দল। এই দলের নেতা মজনু পুরো নাম মিজানুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা মানুষটি একসময়ের জনপ্রিয় বিদ্রোহী নেতা মির্জা গালিবের বড় ছেলে। মির্জা গালিবের নেতৃত্বে হয়েছিল বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন। গোটা দেশের বাঙালিরা চাইতো স্বাধীনতা। মির্জা গালিবের এমন দাপট ছিল গোটা বৃটিশ সরকার একসময়ের বিদ্রোহে কোনঠাসা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একসময় বৃটিশদের সাথে সাতদিন ধরে চলা যুদ্ধে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 


🎨 মজনু বাবার সাথেই বিদ্রোহী দলে কাজ করেছে। বাবা মারা যাবার পর সে দলের দায়িত্ব নেয় এবং অনেক জায়গায় অপারেশন চালিয়ে বৃটিশদের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে পেরেছে। তবে মির্জা গালিব কিন্তু মজনুকে দলনেতা ঘোষণা করে যাননি। তিনি বলেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর সময় বুঝে এই যুদ্ধের হাল ধরবে "ছায়া"। এই ছায়া কে মির্জা গালিব নাম বলেননি শুধু মৃত্যুর আগে বলেছেন সঠিক সময়ে ছায়া বেরিয়ে আসবে। তখন এদেশের স্বাধীনতা বৃটিশরা থামিয়ে রাখতে পারবে না। ছায়ার আহ্বানে শত শত বিদ্রোহী সংগঠন বেরিয়ে আসবে নীরব দর্শকের ভূমিকা থেকে। শুরু হবে যুদ্ধ। হয়তো সেই ছায়ার অপেক্ষায় সবাই।


🎨 বৃটিশদের বিদ্রোহ দমন সংগঠনের বাংলা শাখার অফিসার ইয়াসির কিন্তু চেষ্টার ত্রুটি রাখছেন না। পাগলের মতো এই জাঁদরেল অফিসার খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিদ্রোহী নেতা মজনুকে। মজনুকে ধরতে পারলেই জানা যাবে সব। বন্ধ হবে বিদ্রোহ। কিন্তু এই ইয়াসির একটা সময় মির্জা গালিবের স্নেহভাজন ছিলেন। মজনু ছিল ভাইয়ের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে আজ কেমন করে বদলে গেলেন ইয়াসির?


🎨 আশরাফ শ্রাবণ ক্যাম্পাসের সিনিয়র বড় ভাই। রবিনরা শুনেছিল সে একটা সময় বিদ্রোহী দলে যোগ দিয়েছিল। ছয় মাস পরে আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু কেন ফিরে এসেছিল? ছেলেটা অন্য সবার থেকে কেমন অন্যরকম। হতাশা, বিষন্নতা তাঁর চোখে মুখে সবসময়। একটা বৃটিশ মেয়ের সাথে নাকি সম্পর্কে ছিল। তবুও তাঁর দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব রবিনকে দারুন আকর্ষণ করে। 


            🎨 আচ্ছা এই এত এত চরিত্র, পরাধীন দেশে বৃটিশদের ক্ষমতায় থাকা। বিদ্রোহী মজনুর দলকে ধরতে মরিয়া ইয়াসির, রবিন হৃদিতার সম্পর্ক কিংবা আশ্বিন বা আশ্রাফ শ্রাবণের দেশ নিয়ে ভাবনা এই গল্পটায় একটা জিনিসই মূখ্য সেটা হলো "স্বাধীনতা"। পরাধীন হয়ে বৃটিশদের অধীনে থাকতে চায় না বাঙালিরা। কিংবা ওই যে "ছায়া" যে আড়ালে রয়েছেন সঠিক সময়ের অপেক্ষায়। তিনি দেবেন যুদ্ধের ঘোষণা ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সেই ছায়া মুখ কবে আসবে?


🎨 আশরাফ শ্রাবণের কাছে স্বাধীনতা মানে শ্রাবণের দিন। যেটা খুব কাছে থাকলেও চাইলেই ধরা যায় না। শুধু আকাঙ্ক্ষা থাকে একদিন ধরা দেবেই। আচ্ছা "শ্রাবণের দিন" কবে আসবে?


                   🎨 পাঠ প্রতিক্রিয়া 🎨


আমিনুল ইসলামের লেখা আমার পড়া এটি দ্বিতীয় বই। প্রথমে পড়েছিলাম "দ্যে জা ভ্যু"। সেটা বেশ অন্যরকম ছিল তবে "শ্রাবণের দিন" হিস্টোরিকাল ফিকশন যেখানে টপিক সম্পূর্ণ আলাদা।


প্রথম বইয়ে ওনার লেখন শৈলী সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছিলাম এবং দ্বিতীয় পড়া এই বইটিতেও বেশ কিছু সামঞ্জস্যতা পেলাম। লেখকের লেখনী ভালো। এবং হিস্টোরিকাল ফিকশন নিয়ে চেষ্টা করেছেন বেশ ভালো কাজ করার।


সত্যি বলতে শুরুতে লেখনী শৈলী ভালো লাগেনি আমার। বেশ বোরিং লাগছিলো। গল্পের ধারাটা বুঝতে পারছিলাম না। তবে মাঝখান থেকেই যেন আসল খেল দেখাতে শুরু করলেন লেখক। এখান থেকেই বেশ সাবলীল ভাবে গল্পকে টেনে নিয়ে গেছেন এবং শেষটায় দুইটি চমৎকার টুইস্ট রেখেছিলেন।


এই গল্পটার সিকুয়াল এলে খুশি হবো কারণ এরপর কী হলো জানার আগ্ৰহ রয়ে গেল। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে পড়েছি বেশ কিছু বই লেখক চেষ্টা করেছেন সেভাবেই সাজাতে। বইয়ে কিছু স্লাং শব্দ আছে, হয়তোবা চরিত্রের প্রয়োজনে।


আমার কাছে শেষের লাইনগুলো বেশ চমকপ্রদ লাগলো। এবং সেই সাথে ভালোও লেগেছে। শুরুতে খাপছাড়া গল্পটাকে লেখক মাঝপথে লাগাম টেনে দারুন সমাপ্তি দিয়েছেন। তবে যুদ্ধ এখনো বাকি। তাই সিকুয়াল চাই।


বেনজিনের বাঁধাই বেশ মজবুত। মাঝের পৃষ্ঠাগুলো খুলে পড়তে একটু বেগ পেতে হয়েছে তবে বই নিয়ে চিন্তা হবে না, পৃষ্ঠা খুলে আসার ভয় নেই। প্রচ্ছদ মোটামুটি লেগেছে। ঝকঝকে প্রিন্ট বলতে হবে। 


🎨 বইয়ের নাম: "শ্রাবণের দিন"

🎨 লেখক: আমিনুল ইসলাম 

🎨 প্রকাশনী: বেনজিন প্রকাশন

🎨 ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৩/৫
Profile Image for Rifat Shohan.
34 reviews19 followers
January 11, 2024
৩.৫/৫
অল্টারনেট হিস্ট্রি জনরার জন্যে ০.৫ এক্সট্রা দিলাম। ওভারল ভালো বই তবে কিছু যায়গায় সংলাপ খুবই দূর্বল এবং অতিমাত্রায় নাটকীয়। বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন জনরায় সাহস করে কিছু লিখার জন্যে লেখকের প্রতি শুভকামনা রইলো।
Profile Image for ANIT.
86 reviews3 followers
December 28, 2023
"An emotionally gripping tale that captures the heart and soul, leaving a lasting impression."

Recommended.

✰✰✰✰
Profile Image for কৌশিক.
29 reviews2 followers
January 8, 2024
লেখকের অন্যতম সেরা একটি লেখা। কিছু অংশের অতি রোমান্টিকতা বাদ দিলে বাকি সবটুকুই বেশ ভাল ছিল।
Profile Image for Md Abdul Kayem.
184 reviews3 followers
April 5, 2024
কেমন হতো যদি ১৯৪৭সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে না যেত? ৪৮, ৫২, ৬৯ কিংবা ৭১ এর ঘটনা বলতে কিছুই না থাকতো? হ্যাঁ, 'শ্রাবণের দিন' তেমনই  একটা গল্প, যেখানে ২০০৪ সালে এসেও এই ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ মুকুটের অধীনস্থ হয়ে এখনো শোষিত হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। যেখানে লেখক ব্রিটিশ শাসনের মাঝে থেকে এই ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশকে ব্রিটিশ শাসিত একটা কেবল অঙ্গরাজ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যে অঙ্গরাজ্যের প্রতিটা পদে পদে জ্বলে উঠার জন্য অপেক্ষায় আছে স্বাধীনতার আন্দোলনের লেলিহান শিখা, যা জ্বালিয়ে গিয়েছিলো উপমহাদেশেরই আরেক স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী দলের নেতা মির্জা গালিব।

গল্পটা অসম্ভব মেধাবী ছাত্র রবিনের, যে ইংরেজদেরই বানানো বাংলার এক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসে দেখা হয় আশ্বিনের সাথে, যে অসম্ভব ভালো ফুটবল খেলে। শুধু তাই না হাসিখুশি এই ছেলেটা খুব অল্পতেই মিশে যেতে পারে যে কারো সাথে। গল্পে আমার সবথেকে পছন্দের চরিত্রও আশ্বিন। তার সাথে রবিনের হাত ধরেই পরিচয় হয় হাসিখুশি প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ইউনির্ভাসিটিরই আরেক মেয়ে হৃদিতার সাথেও।

বাংলার সবচেয়ে কুখ্যাত বিদ্রোহী মজনু গালিব, যাকে ধরার জন্য হন্য হয়ে ঘুরছে বিদ্রোহী দমন সংগঠনের প্রধান ইয়াসির আলী। এদিকে মজনু বিদ্রোহীর আক্রমণও আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। বড়ো বড়ো আক্রমণ চালায় তারা। এদিকে ইয়াসির যেকোনো কিছুর বিনিময়ে মজনুকে ধরতে চায়।

অন্যদিকে উপমহাদেশের সমস্ত বিদ্রোহীরাই অপেক্ষায় আছে, উপযুক্ত নেতৃত্বের অপেক্ষায়। বিরান্নব্বইয়ের যুদ্ধে সমস্ত উপমহাদেশের বিদ্রোহী নেতা মির্জা গালিব মারা যা���য়ার আগে যার হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল তার অপেক্ষায়। এক যুগেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু সবাই জানে সে আসবে একদিন। তাকে সবাই ছায়া নামেই ডাকে। প্রাক্তন নেতা মির্জা গালিবের ছায়া।

ইউনিভার্সিটিতে এসেই রবিনের নজর কাড়ে একজন, আশরাফ শ্রাবণ যার নাম। ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষ ছেড়ে যে গিয়েছিল বিদ্রোহী দলে। আবার ফিরেও এসেছিলো। রবিনের চোখের সামনেই তাকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। যে ছেলেটা স্বপ্ন পূরণ করতে এসেছিলো বাবার, তারপর কাটিয়ে দিয়েছে এক রোমাঞ্চকর জীবন যেখানে প্রেম আছে, বন্ধুত্ব আছে আছে বিদ্রোহী হয়ে জীবন কাটানোর গল্প।

গল্পটা শ্রাবণ, রবিন, আশ্বিন, বিদ্রোহী দমন বাহিনীর প্রধান ইয়াসির আলি, মজনু গালিবসহ আরো অনেকের, যেখানে গল্পের ভিতরেও আছে গল্প, আছে রহস্যের আড়ালে রহস্য। তবুও এই যে সাধারণ যুবক, বিদ্রোহী কিংবা পুলিশের বড়ো অফিসার, এদের সবার গল্পই ঘুরপাক খাচ্ছে কেবল একটা বিষয়কেই কেন্দ্র করে, পরাধীন দেশকে স্বাধীন করা।

লেখক আমিনুল ইসলামের এর আগে আরো কয়েকটা বই পড়া হয়েছে, এবং সর্বশেষ পড়া হলো এই শ্রাবণের দিন বইটি। আর তাতেই আমার মনে হচ্ছে লেখকের তার প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে সবথেকে ভালো হয়েছে এই 'শ্রাবণের দিন'। যেখানে লেখক চেষ্টা করেছেন ইতিহাসকে বদলে দিয়ে একটা ভিন্ন সময়ের সম্ভাব্য ঘটনাকে মলাটবন্দি করতে। আর তাতে আমার মনে হয় তিনি সফল হয়েছেন।

এক্ষেত্রে সাতচল্লিশের দেশভাগের ঘটনাকে বদলে দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশেকে বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশকে অঙ্গরাজ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এই জায়গায় লেখক আমার মনে হয়েছে খুব হালকা ভাবেই বিষয়টা উপস্থাপন করে মূল ফোকাসটা বরং গল্পে দিয়েছেন। যার ফলে এক্ষেত্রে এই উপমহাদেশকে অঙ্গরাজ্য পরিণত করার যে ব্যাপারটা বা পদ্ধতিটা তা পুরোপুরি ভাবে বা বিস্তারিত তেমন লিখেননি। অন্যদিকে তিন অঙ্গরাজ্যের কথা বলা হলেও গল্পে কেবল স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ যার আবার প্রায় অধিকাংশ কাহিনিই বর্ণনা হয়েছে ইউনির্ভাসিটি ঘিরেই। অর্থাৎ অঙ্গরাজ্য ব্রিটিশ শাসিত হলেও এক্ষেত্রে ব্রিটিশ নিয়ে আলোচনা বলেন বা গল্প তা হয়েছে খুবই কম। তাই বলা যায় অল্টারনেট হিস্ট্রি হিসেবে লেখক গল্পের পরিধি খুব বেশি বড়ো করেননি, যার ফলে লেখকের গল্পে পড়তে গিয়ে ছন্দ হারানোর ভয় নেই। বরং অল্প চরিত্রে কাহিনি বর্ণনা হওয়ায় প্রতিটি বিষয় ভালো ভাবেই উপভোগ্য লেগেছে। সেই সাথে একটা চরিত্রের সাথে অন্য চরিত্রের যে কানেক্ট হয়ে পড়ার ব্যাপারটাও বেশ উপভোগ্য লেগেছে। তবে কেউ যদি এই যে ব্রিটিশদের উপমহাদেশ ভাগ করার ব্যাপারটা খুঁত হিসেবে ধরতে চান, তাতে তা ধরতে পরবেন, বরং গভীরভাবে এ নিয়ে ভাবলে অনেকগুলোই প্রশ্নবোধক চিহ্ন পাবেন।

বইটার সবথেকে বেশি আমাকে মুগ্ধ করেছে কাহিনি বর্ণনা, এর আগে লেখকের বই পড়ার সুবাদে আমার মনে হয়েছে লেখক প্রায়ই ফাস্ট ফরওয়ার্ডে গল্প বর্ণনা করেন বেশি।  কিন্তু এবার সেটা মনে হয়নি বরং সবকিছু একেবারে পারফেক্ট লেগেছে। তবে এবারও লেখক গ্রেস, দীপা বা হৃদিতাকে দিয়ে তাঁর সেই রোমান্টিক বর্ণনা অধিকাংশ বইয়ের মতোই বজায় রেখেছেন।  এই বইয়ের ক্ষেত্রে প্রেমের কাহিনির মাত্রাটা আমার বেশি লেগেছে, এই পরিমাণটা কমিয়ে আরো বেশ কিছু বিষয়ে নজর দিলে বিষয়টা ভালো হতো। বিশেষ করে রাজনীতি। আমার মনে হয়েছে গল্পে সবথেকে কম পেয়েছি রাজনীতিকে। গল্পটা কেবল মজনু গালিব, ইয়াসির, শ্রাবণের আর রবিনের মাঝে ঘুরপাক খেয়েছে, এই জায়গায় ব্রিটিশদের কথা, বিশ্ব রাজনীতি এবং কী বাংলাদেশ অঙ্গরাজ্যের রাজনীতি নিয়েও গল্পে জায়গা করে নেওয়া যেতো। এবং কী বিদ্রোহীর কাহিনি নিয়েও বলার জায়গা ছিলো অনেক।

সবমিলিয়ে বইটিতে যদি খুঁত ধরতে চান তবে অনেকগুলোই প্রশ্নবোধক চিহ্ন পাবেন, কিন্তু সবকিছু পাশে রেখে ৪৭ এর দেশভাগ না হলে এই দেশের ভাগ্য কী হতে পারতো কিংবা তখন এই দেশের গল্পগুলো কেমন হতে পারতো তা নিয়ে জানতে চান, আর সবকিছু হালকা ভাবেই নিতে পারেন তবে উপভোগ করতে পারবেন শ্রাবণের দিন গল্পটা। অল্টারনেট হিস্ট্রি হিসেবে শুধু একটা গল্প তৈরি করলেই বিষয়টা শেষ হয়ে যায় না, সাথে নজর রাখতে হয় ইতিহাসের দিকেও, লেখক সেটা ভালো ভাবেই হ্যান্ডেল করেছেন। এমন একটা জটিল চিন্তাকে বাস্তবে রূপদান করাটা সৃজনশীলতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বলা যায়।

বইটির প্রোডাকশন, প্রচ্ছদ সবই দারুণ লেগেছে।  বানান ভুলও চোখে পড়েনি তেমন, তবে বেশ কয়েকটা টাইপিং মিস্টেক ছিলো যার সংখ্যা কম হওয়ায় একে দূর্বলতা হিসেবে গণনা করার প্রয়োজন নেই। শ্রাবণের দিন দারুণ একটা গল্প যা যেকেউ উপভোগ করতে পারবেন।
Profile Image for সাম্য সৈকত.
8 reviews3 followers
January 22, 2024
📚বুক রিভিউ 📚

বইয়ের নাম :- শ্রাবণের দিন
লেখক :- আমিনুল ইসলাম
ধরন :- অল্টারনেট হিস্টোরিক্যাল ফিকশন
প্রকাশনী :- বেনজিন প্রকাশন
প্রচ্ছদ :- উমর ফারুক আকাশ
পৃষ্ঠা সংখ্যা :- ২১৬
মুদ্রিত মূল্য :- ৪৫০৳

শুরুর আগে :-
❝কেবলমাত্র বোমা বা বন্দুক দিয়ে বিপ্লব আসেনা, বিপ্লবের তলোয়ার ধার পায় বৈপ্লবিক চিন্তাশক্তিতে।❞
–ভগৎ সিং

অল্টারনেট হিস্টোরিক্যাল ফিকশন জনরাটা দারুন ইন্টারেস্টিং একটা জনরা। এখানে লেখকের হাতে প্লট তৈরি করার অনেক সুযোগ থাকে। ইতিহাসকে ইচ্ছা মতো পরিবর্তন করে অনেক প্লট তৈরি করে ফেলা যায়। ইংরেজরা এই দেশে কখনোই আসেনি, নবাব সিরাজউদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে হারেননি, ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হলেও দেশ ভাগ হয়নি, ১৯৭১ এ পাকিস্তান স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ায় কখনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসে শেষ না হয়ে তা এখনো চলমান, মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার রাশিয়া চিন জাপান সবাই জড়িয়ে পড়ায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু, এমন হাজারটা অল্টারনেট হিস্টোরি তৈরি করে উপন্যাস লেখা সম্ভব। তেমনই এক অল্টারনেট হিস্টোরি তৈরি করে 'আমিনুল ইসলাম' লিখেছেন "শ্রাবণের দিন", যেখানে ইংরেজদের শাসন থেকে ভারতবর্ষ কখনো মুক্ত হতে পারেনি।

কাহিনী সংক্ষেপ :-
❝স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ কাজ নয়।
কিন্তু একে ছাড়া বেঁচে থাকাও কঠিন।
তাই যে কোনও মূল্যে স্বাধীনতা অর্জন করাই আমাদের প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত।❞
-মহাত্মা গান্ধি

আমাদের এই গল্পে ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হতে পারেনি। ইংরেজরা নিজেদের চতুর বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। সে সময়ের রাজনৈতিক দল এবং বিদ্রোহীদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতা আরো পাকাপোক্ত করে ফেলে ইংরেজরা। আগের মতো লুটপাট না করে উপমহাদেশের উন্নয়নেও নজর দেয়, ফলে বহির্বিশ্বের কাছে জবাবদিহির আর ভয় থাকে না। কেটে যায় আরো দীর্ঘদিন।

সময় ২০০৪ সাল, রেকর্ড পরিমাণ মার্ক নিয়ে মেধাবী ছাত্র রবিন পড়তে আসে ইংরেজদের তৈরি করা দেশের সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি 'বেঙ্গলি ইনস্টিটিউট অভ টেকনোলজি (B.I.T.)' তে। B.I.T এর সব রেকর্ড ভেঙে দেওয়া রবিনের সাথে রুমমেট হিসেবে পরিচয় হয় গ্রামের সাধারণ ছেলে আশ্বিনের। পড়া ছাড়া তেমন কোনো কিছুতেই আগ্রহ নেই রবিনের। এদিকে ফুটবল পাগল আশ্বিন খেলোয়াড় হিসেবে অল্প সময়ের ভার্সিটির জনপ্রিয় ছাত্রে পরিণত হয়‌। পুরো ভার্সিটিতে রবিনের বন্ধু কেবল আশ্বিন আর ভালবাসার মেয়ে হৃদিতা। কিন্তু ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে সবকিছু, বদলে যেতে থাকে রবিন-আশ্বিন-হৃদিতার জীবন‌ও।

ইংরেজরা ১৯৪৭সালে বিদ্রোহের আগুন দমন কর��� ফেললেও পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলতে পারেনি। পুরো উপমহাদেশে নতুন করে শুরু হয় বিদ্রোহ, তৈরি হয় নতুন নতুন বিদ্রোহী দল। আর তাদের দমন করার জন্য ইংরেজ সরকার তৈরি করে স্পেশাল ফোর্স "আর. আর. বি"। আর এই দলের প্রধান ইয়াসির আলী যাকে অনেকেই ডাকে 'দ্য বিগ ডগ'। যার একমাত্র লক্ষ্য বিদ্রোহীদের খতম করা।

এদিকে বসে নেই বিদ্রোহীরাও, জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট হামলার মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কুখ্যাত এবং ভয়ংকর মজনু গালিব এর দল। ১৯৪৭ এর পর আরো একবার বড় আকারে বিদ্রোহ শুরু হয়, আর এই যুদ্ধের কেন্দ্রে ছিলেন মির্জা গালিব। যার ডাকে সারা দিয়ে উপমহাদেশের সব বিদ্রোহী দল একসাথে লড়াই শুরু করে। সেবার মির্জা গালিব ইংরেজ সেনাবাহিনীর হাতে মারা যাওয়ার আগে বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়ার ভার দিয়ে যান "ছায়া"র হাতে।

'ছায়া' এক রহস্যময় চরিত্র। বিদ্রোহীরা বিশ্বাস করেন ছায়ার হাত ধরেই স্বাধীনতার স্বাদ পাবে উপমহাদেশ। কেউ কেউ বলেন মজনু গালিবই ছায়া। তবে ছায়ার সঠিক পরিচয় কেউই জানে না। সবাই বিশ্বাস করে একদিন আড়াল থেকে বের হয়ে আসবে ছায়া, সেদিন আবারো পুরো উপমহাদেশের বিদ্রোহী দলগুলো এক হবে, শুরু হবে স্বাধীনতার লড়াই।

পাঠ প্রতিক্রিয়া :-
❝স্বাধীনতা এক আশীর্বাদ, এক আরাধ্য বিষয়। যে জাতি স্বাধীনতার স্বাদ পায় না, সে জাতি জীবনের আসল মানে খুঁজে পায় না।❞

অল্টারনেট হিস্টোরি নিয়ে লেখা বই এর আগে কখনো পড়িনি, এটাই ছিল প্রথম। তাই শুরু করছিলাম জিরো এক্সপেক্টেশন নিয়ে। এবং এটা বলতেই হয় যে দারুন একটা বই ছিল "শ্রাবণের দিন"। পড়ার পুরো সময়টা আটকে রাখার মতোই একটা বই, কখনো মনে হয়নি স্লো বা বিরক্তিকর।

ইংরেজরা এই উপমহাদেশে থেকে গেলে কেমন হতো সেটা লেখক দারুন ভাবেই নিজের লেখায় তুলে ধরছেন। সাথে ছোট বড় কিছু টুইস্ট, দ্রুত গতির গল্প, চমৎকার লেখনশৈলি বইটাকে উপভোগ্য করে তুলছিলো। ব‌ইয়ের প্রতিটি চরিত্র সুন্দর ভাবেই ফুটিয়ে তুলছেন লেখক। চরিত্রগুলোর চিন্তাধারা, চিন্তার পরিবর্তন খুব সুন্দর ভাবেই ফুলে উঠছে লেখায়।
এছাড়া অনেক কিছুই ছিল যেগুলো আমাদের বর্তমান সময়ের সাথে অপরিবর্তিত আছে। আছে টাইটানিক মুভি, সমাজের দুর্নীতি, ভার্সিটির র‌্যাগিং, ছাত্র রাজনীতি, ধর্ম রাজনীতি সহ আরো অনেক কিছুই যা আমাদের চিরপরিচিত।

এখন আসি কোন কোন জায়গায় আরো ভালো হতে পারতো বলে আমার মনে হইছে সেই বিষয়ে। ইংরেজরা এখনো এই দেশ শাসন করলেও বইতে স্ট্রং কোনো ইংরেজ চরিত্র নাই, ইংরেজদের বর্তমান কাজ কর্ম, শাসন শোষণ ভাসাভাসা দেখানো হইছে।
এমনিতে দেখা যায় অনেক বই অযথা টেনে বড় করে অনেক লেখক, এই বইয়ের ক্ষেত্রে আমার কাছে উল্টো মনে হইছে। প্লট এমন ভাবে তৈরি করা যে এই গল্পকে আরো বড় করার যথেষ্ট জায়গা ছিল। লেখাটাকে বড় করলে আমার মনে হয় আরো ভালো হতো। সেই সাথে কিছু স্ট্রং ইংরেজ চরিত্র থাকলে তাদের শোষণের চিত্রটাও ভালো ভাবে ফুটত।

তবে সব মিলিয়ে এই বই দারুন ছিল এটা বলতেই হবে। নতুন একটা জনরা নিয়ে লেখা এমনিতেই যে কারো জন্য কঠিন, সেখানে লেখক সুন্দর ভাবেই সব সামলেছেন। যারা সামাজিক উপন্যাসের মাঝে ব্যতিক্রম কিছু পড়তে চান তাদের কাছে এই ব‌ইটা নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে এবং উপভোগ করবে।

প্রচ্ছদ,প্রডাকশন ও অন্যান্য :-
এআই দিয়ে বানানো এই প্রচ্ছদটা সুন্দর ছিল। সেই সাথে বেনজিন প্রকাশন এর প্রডাকশন‌ও দারুন হ‌ইছে। ডাস্ট কাভারটা লেদার টাইপের উঁচুনিচু ফিল দেয়, এটা সবচেয়ে ভালো লাগছে।

প্রডাকশন অসাধারণ হলেও সম্পাদনা এবং প্রুফ রিডিং আরো ভালো করা দরকার ছিল। ছোট ছোট টাইপিং মিস্টেক ছিল কিছু জায়গায়। এছাড়া তিন জায়গায় গল্পে অসঙ্গতি চোখে পড়ছে আমার, যেটা সম্পাদকের‌ও চোখে পড়া উচিত ছিল।
১ম অসঙ্গতি পঞ্চম অধ্যায়ে, যখন রবিন আর আশ্বিন হলের ক্যান্টিনে ভয়ে ভয়ে খেতে যাচ্ছিল কারণ সেটা তাদের প্রথমবার হলের খাবার খাওয়া। কিন্তু রবিন হলে উঠছে আরো দুইদিন আগে বিকেলের দিকে, আশ্বিন আরো আগেই উঠছে। তারা নিশ্চ‌ই দুইদিন না খেয়ে ছিল না, আরো আগেই তাদের হলের খাবার খাওয়ার কথা।
২য় অসঙ্গতি তখন যখন খেলা শেষে আশ্বিন পুরস্কার নিতে প্রিন্স হ্যারির কাছে যায়। এখানে বিস্তারিত বললে স্পয়লার হয়ে যাবে তাই বলবো না, যারা পড়ছেন আশাকরি বুঝে যাবেন। সেই সময় রবিন দৌড়ে আশ্বিনের কাছে গেছে। কিন্তু এটা ঘটার কথা না, তাকে অনেক আগেই সিকিউরিটি আটকে দেওয়ার কথা অথবা আশ্বিনের সাথে যা ঘটছে রবিনের সাথেও এক‌ই জিনিস ঘটার কথা।
প্রায় একমাস আগে পড়া শেষ করে এতোদিন পর রিভিউ লিখতে গিয়ে ৩য় অসঙ্গতি কোন জায়গায় ছিল এখন আর মনে পড়ছে না। স্মৃতিশক্তি বড়‌ই দুর্বল হয়ে গেছে।

যাইহোক, ছোট এই দুই তিনটা অসঙ্গতি বা টাইপিং মিস্টেকের জন্য পড়ার গতিতে বা কাহিনীতে তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না। গল্পের ফ্লোতে এসব বেশিরভাগ পাঠকের চোখেও পড়বে না হয়তো। আশাকরি রিপ্রিন্ট এর সময় এগুলো ঠিক করে ফেলবেন লেখক এবং প্রকাশনী।

সব মিলিয়ে দারুন উপভোগ্য একটা ব‌ই ছিল এটা। আশাকরি লেখক এই জনরায় আরো লিখবেন।

বই হোক সব সময়ের সঙ্গী ❤️
Happy Reading ❤️
Profile Image for Asif Tamim.
5 reviews2 followers
January 3, 2024
দুই হাজার তেইশ শেষ হলো ‘শ্রাবণের দিন’র মতো চমৎকার একটি বই দিয়ে। গল্পটা আসলেও চমৎকার! বইটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছে আমি সবকিছু নিজের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এমনিতে প্রায় বই পড়ার সময় এই অনুভূতিই হয় তবে, এই বইটি পড়ার সময় অনুভূতিটাকে একেবারে বাস্তব মনে হয়েছে। গল্পের প্রতিটি চরিত্র যখন যে কাজ করেছে তখন মনে হয়েছে আমিও সেইখানে পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সব কাজ নিজ চোখে অবলোকন করছি। এমনকি রাত্রে স্বপ্নেও আমি গল্পের চরিত্রদের সাথেও সময়যাপন করেছি! এই হলো আমার এই বই পড়ার সংক্ষিপ্ত পাঠানুভূতি!!!
Profile Image for Nadia.
115 reviews
June 16, 2024
আমার "ছায়া” কে দেখে অতটা Trusted না লাগলেও, গল্পটা আমার মারাত্নকভালো লাগে।

একটা হাদীস বা কোন সাহাবীর উক্তি ছিল, ঠিক মনে করতো পারছি না। কথাটা কিছুটা এরকম - "যে সরকারী পদ চেয়ে নেয় অথবা তার প্রতি লোভ রাখে, তাকে অবশ্যই আমরা এ কাজ দিই না।"

তাই ছায়াকে আমি যদি ধরেও নেই বিভ্রান্ত কিন্তু বাকি প্রত্যেকটা character ই আমার পছন্দ ছিল। তাই ৪ তারকার কথা মাথায় হালকা করে আসলেও, রবিনেল মায়ের কথাটার পর পর আর দিতে পারি নি।

🥰🥰🥰🥰
Displaying 1 - 30 of 40 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.