বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের যে এক স্বর্ণিম ঐতিহ্য আছে— এ-কথা বোধহয় সবাই মানবেন। কিন্তু কেমন ছিল তার শুরুর দিনগুলো? সেই প্রসঙ্গে পড়তে গেলেই কয়েকটি পত্রিকার নাম আসে, যাদের মধ্যে অন্যতম হল 'রামধনু'। গুণমান ও বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে পত্রিকাটিকে এক অন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন তার বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন সম্পাদক মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর নিজের লেখালেখির অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছিল এই পত্রিকায়। কিন্তু সেইসব লেখালেখি— যার মধ্যে ছদ্মনামের লেখাও আছে, প্রবন্ধ ও কবিতাও আছে— তথ্য ও টীকা-সহযোগে এতদিন পাওয়া যায়নি। অকালপ্রয়াত সৌরভ দত্ত তাঁর মনোরঞ্জন মিউজিয়ামে এই লেখাগুলো সম্বন্ধে নানা কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু বই হিসেবে... এই এতদিনে, মনোরঞ্জনের মৃত্যুর পর প্রায় পৌনে এক শতক অতিক্রান্ত হলে, লেখাগুলো সযত্নে ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের সঙ্গে আমাদের সামনে এল। 'সম্পাদকের কথা'-র পর এতে আছে~ ১. জাপানি গোয়েন্দা হুকা-কাশির তিনটি উপন্যাস এবং পাঁচটি গল্প; ২. 'নূতন পুরাণ' পর্যায়ের ছটি গল্প; ৩. একটি নাটিকা; ৪. সুকুমারী কীর্তির অনুসরণে এগারোটি কবিতা (যাদের একটির নাম আবোল তাবোল!); ৫. এগারোটি সরস ও সুখপাঠ্য প্রবন্ধ; ৬. পরিশিষ্ট হিসেবে মনোরঞ্জনের জীবনী এবং 'রামধনু' পত্রিকা সম্বন্ধে নানা তথ্য। লেখাগুলো এক কথায় অসাধারণ। হুকা-কাশির লেখায় নিতান্ত ঘরোয়া পরিবেশে বুদ্ধির ঝলক, 'নূতন পুরাণ'-এ সমকাল ও মহাকাব্যিক ভাবনার সকৌতুক সমন্বয়, প্রবন্ধগুলোর সহজ তথ্যনিষ্ঠা— এগুলো প্রথম প্রকাশের এতদিন পরেও মুগ্ধ করে। তবে এই বিশেষ বইটির মহিমা অন্য জায়গায়। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের নানা কাজ নানা সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। হুকা-কাশি-কে নিয়ে লেখা গল্প-উপন্যাস বিভিন্ন প্রকাশনা নানাভাবে পরিবেশন করেছে। কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণ প্রতিভার স্বাক্ষরবাহী এমন একটি সুসম্পাদিত, সুমুদ্রিত এবং যত্নলালিত কাজ এযাবৎ পাইনি। কল্পবিশ্ব প্রকাশনা এবং এই খণ্ডের সম্পাদক এমন একটি অসাধারণ কাজের জন্য আমাদের সকলের কাছে ধন্যবাদার্হ হলেন। আগামী দিনে রচনাসমগ্রের দ্বিতীয় খণ্ডেও এমন সব অধুনাবিস্মৃত কিন্তু অত্যন্ত সুখপাঠ্য লেখাপত্র এমনই যত্নে তাঁরা আমাদের হাতে তুলে দেবেন, এই আশায় রইলাম। অলমিতি।