জানতে ইচ্ছে করছে- সমগ্র উপন্যাসে তারাশঙ্কর বাবু সমাজের নিম্নবিত্ত ও সর্বহারা ভাসমান মানুষের সম্পর্কের মানবিক দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়ানের দুঃখ ও বিচ্ছেদে জরাজীর্ণ জীবনের অপূর্ণতা, আক্ষেপ, ভালোবাসা-বৈরাগ্যের দোলাচল, পৃথিবীতে 'পাওয়া' না হওয়া সব 'চাওয়া', ওপারের জীবনে পূর্ণতার সম্ভাব্যতা খুজতে গিয়ে এক মহাকাল অনুসন্ধ্যান করেছেন। তারাশঙ্কর বাবু কি তার জীবদ্দশায় পেয়েছিলেন সেই মহাকালের সন্ধ্যান! তার সেই আক্ষেপের যন্ত্রণাক্লিষ্ট প্রশ্নগুলার উত্তর!
ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি উপন্যাসের পৃষ্ঠায়। কারন পৃথিবীতে বিশুদ্ধ অনুভূতি আর কোথাও মৌলিক রূপে পাওয়া সম্ভব না। এই উপন্যাস, লেখনশৈলী আমার মাঝে যে অনুভূতির সঞ্চার করেছে বা আমি যে অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি তা দুঃখ-কষ্ট কিছুই না। কিন্তু তীব্র বিষাদের। এইটা অদ্ভুত বিষাদ। আপনার কষ্ট হবে না, হতাশ লাগবে না, শুধু মনে হবে কী যেনো নাই। কিন্তু যা নাই সেইটার জন্য কান্নাকাটি করাটাও বিরক্তজনক মনে হবে। ইচ্ছা হবে, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে, ঈশ্বর এই অসীম শূন্যতা, কিছু একটা না থাকার অনুভূতি থেকে আপনাকে মুক্তি দিক। এই বিষাদ হারিয়ে যাক আপনার কাছ থেকে এতো দূরে যে, আপনার শহরের ধূলাবালিও যেনো তাকে খুজে না পায়। কী বলবো, উপন্যাসে আটকে গেছি এক্কেবারে প্রথম লাইনে বর্ণনাভঙ্গি পড়ে!
শুধু দস্তুরমত একটা বিস্ময়কর ঘটনাই নয়, রীতিমত এক সংঘটন। চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাৎ কবি হইয়া গেল।
এই না হলে সাহিত্য মাইরী! প্রথম লাইনের বর্ণনা ভঙ্গিতেই খেই হারিয়ে ফেলতে আমি বাধ্য! হিন্দু সমাজের পতিততম ডোম বংশে নিতাই চরণের জন্ম। এই ডোমরা একসময় বাংলার নবজাগরণের বিখ্যাত লাঠিয়াল ছিল। প্রাচীনকাল থেকেই পেশী শক্তির জন্য তাদের নাম ডাক ছিলো। কিন্তু কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর নবাবদের জমিদারী ঐতিহ্য ও আশ্রয় চ্যুত হয়ে এরা ডাকাতে পরিণত হয়,নিতাই এই বীরবংশী ডোম বংশেরই উত্তরাধিকারী। তারাশঙ্করবাবুর কবিয়াল নিতাইচরণ চরিত্রটি চট্টগ্রামের পটিয়ার বিখ্যাত কবিয়াল রমেশ শীলের জীবনছায়া অবলম্বনে রচিত বলে অনেকে মনে করেন। ১৯৩৯ দিকে কংগ্রেসের এক সম্মেলনে যোগ দিতে এসে তারাশঙ্করবাবু কবিয়াল রমেশশীল সম্পর্কে অবগত হন। উৎসাহী তারাশঙ্কর রমেশীলের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে অনেকের মত। তবে এ ঐতিহাসিক সূত্রের যথাযথ প্রমাণ মেলেনি এখনো পর্যন্ত। নিতাই এর জীবন একজন কবিয়ালের জীবন। সে পড়তে ভালোবাসে, গাইতে ভালোবাসে বাপ দাদার পেশা ডাকাতি সে করতে রাজি নয়। তাইতো বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেই এক বন্ধুর কাছে। সেখানেই সে প্রেমে পড়ে ঠাকুরঝি’র। প্রেমের বিভিন্ন পর্যায়ে কবি মনের আকুলতা, অনুভূতিগুলো যেন স্পষ্ট ধরা দিয়েছে প্রত্যেক কবিতায়। নিতাই এর ব্যক্তিজীবনের অনুধাবন লেখক ধারাবাহিক ভাবে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তাতে নিতাই এর পাশাপাশি প্রত্যেক টা অনুধাবন গভীরভাবে ছুয়ে গেছে এই নগণ্য পাঠককেও-
আলকাতরার মত রঙ। ছি, ঐ কথাই কি বলে। কালো? ঐ মেয়ে কালো? রাজনের চোখ নাই। তা ছাড়া কালো কি মন্দ। কৃষ্ণ কালো, কোকিল কালো। চুল কালো- আহা হা! আহা হা! বড় সুন্দর বড় ভালো একটি কলি মনে আসিয়া গিয়াছে রে। হায় হায় হায়। কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে? কালো চুলে রাঙ্গা কুসুম হেরেছো কি নয়নে?
সিরিয়াসলি? আজ থেকে ৮১ বছর আগের অনুভূতির আকুলতার বর্ণনাভঙ্গি এইটা! ভাবা যায় না। সত্যি বলছি মাইরী, আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম রেলের দুই লাইন এক বিন্দুতে মিলে বেকে চলে গেলো, সেইখানে মাথায় সোনার টোপর দেয়া ঠাকুরঝি হেটে আসছে! সেখানে আছে কৃষ্ণচূড়া গাছ! নিতাই বুঝলো, সব কিছু পাইতে হয় না। ছন্দায়িত করে ফেললো অকপটে!
চাঁদ দেখে কলঙ্ক হবে বলে কে দেখেনা চাঁদ?
তার চেয়ে যাওয়াই ভালো ঘুচুক আমার দেখার সাধ।
ওগো চাঁদ তোমার নাগি-
ওগো চাঁদ তোমার নাগি-না হয় আমি হব বৈরাগী
পথ চলিব রাত্রি জাগি সাধবে না কেউ আর তো বা
প্রত্যেকটা বাক,ঘাত-প্রতিঘাতের বর্ণাভঙ্গি এত অসাধারণ, পুরো উ���ন্যাস ই কোট করে দিয়ে দিলেও তা টিকে যাবে হয়তো! তারপরে আসে প্রিয়জন হারিয়ে ফেলার তীব্র বেদনার কি অনন্য উপস্থাপন!
মরণ তোমার হার হলো যে মনের কাছে
ভাবলে যারে কেড়ে নিলে সেযে দেখি মনেই আছে!
এই বর্ণনাটুকু পড়ে আমি ধপ করে বইটা বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। জ্বালিয়েছি একটা চারমিনার। এত সুস্পষ্ট সুই এর মতো তীক্ষ্ণ পিন-পয়েন্ট অনুভূতির প্রকাশ করতে বিধাতা প্রদত্ত মেধার প্রয়োজন। তারাবাবু তা দেখিয়েছেন সূচারুরূপে। শ্রেণী বিভেদ, ঝগ্রা-ঝাটি, হানাহানি,মারামারি পারস্পরিক ঘৃণা এই সমস্ত অশুচিকর কর্মের সৃষ্টি ও পরিত্যাগের উপায় খুজতে গিয়ে লেখক এর অনুসন্ধ্যান এবং তত্ত্ব শুনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছি আমি। সমাজের শ্রেণী সংঘাত এর উৎস, প্রতিকার বা প্রতিরোধ খুজতে গিয়ে তারাবাবু যে দর্শন মহাকালের গহ্বরের ভেতর খুজে পেয়েছেন তা আমার মনে থাকবে সারাটাজীবন। কাউকে ঘৃণা করতে গেলে মনে আসবে আমার এটা বরাবর!
প্রভুর সংসারে নীচ কেউ নেই বাবা। নিজে, পরে নয়- নিজে নীচ হলে সেই ছোঁয়াচে পরে নীচ হয়। নীল চশমা চোখে দিয়েছ বাবা? সূর্যের আলো নীলবর্ণ দেখায়। তোমার চোখের চশমার রঙের মতো তোমার মনের ঘৃণা পরকে ঘৃণ্য করে তোলে।
তারাবাবুর প্রকৃতির বর্ণনার প্রশংসা না করলেই নয়। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়বার মতোই। বিশেষত শেষরাতের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তা যে পাঠকে দাগ কাটবে না এমন পাঠক সম্ভব নাহ!
রাত্রির শেষ প্রহর অদ্ভুত কাল। এই সময় দিনের সঞ্চিত উত্তাপ নিঃশেষে ক্ষয়িত হইয়া আসে, এবং সমস্ত উষ্ণতাকে চাপা দিয়া একটা রহস্যময় ঘন শীতলতা ধীরে ধীরে জাগিয়া ওঠে। সেই স্পর্শ ললাটে আসিয়া লাগে, চেতনা অভিভূত হইয়া পড়ে। ধীরসঞ্চারিত নৈঃশব্দ্যের মধ্য দিয়া একটা হিমরহস্য সমস্ত সৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, নিস্তরঙ্গ বায়ুস্তরের মধ্যে নিঃশব্দসঞ্চারিত ধূমপুঞ্জের মতো। মাটির বুকে মধ্যে, গাছের পাতায় থাকিয়া যে অসংখ্য কোটি কীট পতঙ্গ অবিরাম ধ্বনি তুলিয়া থাকে, তাহারা পর্যন্ত অভিভূত ও আচ্ছন্ন হইয়া পড়ে রাত্রির এই শেষ প্রহরে। হতচেতন হইয়া এ সময় কিছুক্ষনের জন্য তাহারাও স্তব্ধ হয়। মাটির ভিতরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই হিম-স্পর্শ ছড়াইয়া পড়িতে চায়। জীব জীবনের চৈতন্যলোকেও সে প্রবেশ করিয়া সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলোকে অবশ করিয়া দেয়। আকাশে জ্যোতির্লোক হয় পাণ্ডুর; সে লোকেও যেন হিম-তমসার স্পর্শ লাগে। কেবল অগ্নিকোনে ধকধক করিয়া জ্বলে শুকতারা-অন্ধ রাত্রিদেবতার ললাটচক্ষুর মতো।
বলতে চেয়েছিলাম অনেক কিছু। পারলাম না তৃপ্তি করে একটা কিছু লিখতে। হইলো না। এখন আমি আরো লিখলে নতুন পাঠক নিতাই এর নিজেকে খুজে পাবার আত্মোপোলব্ধির যাত্রার স্বাদটুকু থেকে বঞ্চিত হবে।
যা ভালো লাগে নাই বলতে চাই একটুখানি। বসন্ত নিতাই এর ঘর থেকে যাবার পরে পরের দিনেও মনে রেখেছিলো নিতাই এর মনের মানুষ আছে, ঠাকুরঝি ঘরে উকি দিয়েছে কিন্তু বসন্তের সাথে গাটঝড়া বাধবার সময় বসন্ত একবার ও জিজ্ঞ্যাসা করলো না সেই সম্পর্কে। বিষয়টা ভাবায় আমাকে। ক্ষুরধার নারীমাত্রই ভোগ বিলাসী স্বার্থপর? বসন্তের ক্যারেক্টারের ব্যাকগ্রাউন্ড বক্তব্যের অভাব কিছুটা অনুভব করেছি। তারাবাবু আক্ষেপ রাখতে চেয়েছিলেন, হয়ে গিয়েছে আফসোস।
এক কথায় কবি একটা জ্বলন্ত দীর্ঘশ্বাস। ছুড়ে ফেলে দেওয়া সিগারেটের মাথায় জ্বলতে থাকা আগুনটার মতো-
“এই খেদ মোর মনে
ভালবেসে মিটল না আশ- কুলাল না এ জীবনে।
হায়, জীবন এত ছোট কেনে?
এ ভুবনে?”