আমাদের প্রায় প্রত্যেকের সার্কেলেই এমন একজন বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা কাছের কেউ থাকে; যারা গল্প জমাতে ওস্তাদ। পরিস্থিতি যেমনই হোক, তাদের গল্প মানেই ব্যতিক্রম কিছু। ধরুন জার্নিতে বেরিয়ে ক্লান্তি লাগছে, কোথাও ঘুরতে গিয়েও বিরক্তি লাগছে, স্কুল-কলেজ-ক্লাসে মন বসছে না অথবা আড্ডায় প্রাণ নেই; অমনি সেই ব্যক্তিটা গল্প শুরু করল আর মুহূর্তটাও জমে উঠল পুরোপুরি। এই বইটা ঠিক অমনই এক গল্পবাজ বন্ধুর ‘রিপ্লেসমেন্ট’। যা অল্পকথায়, স্বল্প সময়ে পরিবেশ জমিয়ে তোলে।
“এক পাতার গল্প” একবসায় পড়ে ফেলার মতো বই হলেও এটি পড়ার স্বার্থকতা মূলত সময় নিয়ে পড়ার মাঝে। মাংস যেমন অল্প উনুনে বারবার জ্বাল দিলে তার স্বাদ বৃদ্ধি পায়, তেমনি এই বইটি প্রতিদিন একটু একটু করে পড়লে গল্পগুলোর স্বাদ বুঝতে পারবেন। কী? মাংসের উদাহরণ জমলো না? পিওর ভেজিটেরিয়ান? তাহলে চা’কে উদাহরণ হিসেবে ধরুন। গরম চা ধুম করে গলাধঃকরণ করলে যেমন স্বাদ তো পাবেনই না, উল্টো জিহ্বা-মুখ পুড়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা হবে। অথচ সময় নিয়ে, এক চুমুক দুই চুমুক করে যদি চা খান, তখন তার স্বাদ বুঝতে পারবেন। লিকার কতটা কড়া বা হালকা হয়েছে, চিনির পরিমাণ কেমন, সব স্পষ্ট লাগবে।
তেমনি এই বইটি একটানা পড়লে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় মিস করে যাবেন। হয়তো টানা কয়েকটি গল্প পড়ে নিজের উপরেই বিরক্ত হবেন, বুঝতে পারবেন না মূল থিম। মনে হবে, ‘ধ্যাত! কী পড়লাম। শুরু করতেই শেষ।’ কিন্তু এসকল অনুগল্প বা খুদে গল্প, অথবা কেতাবি ভাষায় মাইক্রো ফিকশন গল্পগুলোর আমেজই এমন- অল্প কথায় তার শব্দ, বাক্য ও গল্প বলার জাদুতে আপনাকে ক্ষণিকের জন্য মোহাবিষ্ট করে রাখবে। “এক পাতার গল্প” সেই বিচারে দুর্দান্ত একটি গল্প সংকলন। লেখক সজল চৌধুরী তার সেরাটাই দিয়েছেন। পরিমিত ও শ্রুতিমধুর শব্দের ব্যবহার, বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ বর্ণনা, বর্তমান সমাজ ও বাস্তবতার আলোকে কাহিনি গঠন, তাতে উপযুক্ত মেটাফোর ও মন্তাজের প্রয়োগ গল্পগুলোকে অনন্য তুলে করেছে। লেখনশৈলীতে সাহিত্যরসের প্রাচুর্য বলে দেয়, কতটা সময় ও যত্ন নিয়ে তা লেখা। আবার গল্পগুলো ভীষণরকম ছোট হলেও সেগুলোতে টুইস্ট আর ক্লিফহ্যাঙ্গার রাখার ব্যাপারে লেখকের মুন্সিয়ানা চোখে পড়ার মতো।
কেমন ছিল বইয়ের গল্পগুলো? বিস্তারিত বলা যাক। বইয়ে মূলত ন্যানো ফিকশন (৫৫ শব্দের পূর্ণাঙ্গ গল্প), ড্রাবল ফিকশন (১০০ শব্দের পূর্ণাঙ্গ গল্প) ও মাইক্রো ফিকশনের (যা অনুর্ধ্ব ৩৫০ শব্দের হবে হয়তো) সর্বমোট ৪৭টি গল্প রয়েছে। একাধিক জনরা, সাব-জনরার গল্পগুলোর প্রত্যেকটিই অনবদ্য এবং মাইন্ড রিফ্রেশিং। এখানে একটি হিসাব মনে রাখা বেশ জরুরি। কাগজের এক পিঠকে ‘পৃষ্ঠা’ বলে। আর ‘পাতা’ বলতে বুঝায় কাগজের এপিঠ-ওপিঠ। মানে দুই পৃষ্ঠা মিলে এক পাতা। সেই হিসাবে এই গল্পগুলোকে লেখক ‘এক পাতার গল্প’ বলেছেন। যার বেশকিছু গল্প যেমন এক পৃষ্ঠাতেই শেষ হয়ে গেছে, আবার কয়েকটি গল্প এক পাতার সীমা অতিক্রমও করেছে। লেখকের ভাষায় সেগুলোকে ‘বিদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া যায়, যারা একই ছাঁচের কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন আকারের এই জগৎ-সংসারে টিকে থাকার সামর্থ্য রাখে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রতিটি গল্পই খুব উপভোগ করেছি। তবে গল্পগুলো ছোট হওয়ায়, তার কাহিনি ও চরিত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিটি গল্পের সারসংক্ষেপ কিংবা পাঠ অনুভূতি ব্যাখ্যা করা মুশকিল। এতে না চাইতেও অনেককিছু স্পয়লার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবুও গুটি কয়েক গল্পের উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।
“রাজা-প্রজা-সাজা”র অসহায় বাবা কিংবা “৫০২ আর ৫০৩” এর অসহায় মা, চরিত্র কাছাকাছি হলেও কাহিনি-দৃশ্যপট ভিন্ন। চরিত্র যেমনই হোক, লেখক তার বৈচিত্র্যময় কাহিনি দ্বারা পাঠকের হৃদয়ে আঁচড় ফেলতে ব্যর্থ হননি। আপনি এই লেখাটি পড়ছেন মানে স্যোশাল নেটওয়ার্কে যুক্ত আছেন। একবার চিন্তা করুন, এই যে ফেসবুক-মেসেনজারে প্রতিদিন কত গল্পের জন্ম হয়। কখনো কখনো ইনবক্সের কয়েকটি আলাপও বিশাল কাহিনি দাঁড় করাতে পারে। বুকের ভেতরে তুলতে পারে কপট হাহাকার, যার দেখা মেলে “পূর্ণেন্দু পত্রী” গল্পে।
“পাইলট প্রকল্প” গল্পে এক অদ্ভুত আইনে এক অদ্ভুত সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীর দৃষ্টিকোণ থেকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় প্রশ্ন। যেই প্রশ্নে বিবেকের কাছে তাড়িত হবেন আপনিও। ভিন্ন একটা উদাহরণ টানা যাক, এই যে আমরা চোরের পিছু ছুটি। কিন্তু কেন সে চুরি করে, তা কখনো চিন্তা করে দেখি না। আমাদের চিন্তাশক্তির উপর অদৃশ্য এক দেয়াল গড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কারা করেছে এমন? যাই হোক, এসকল খুদে গল্পের মজাটা কি জানেন? কথা কম কাজ বেশি। বাড়তি মেদ-ভুড়ি-চর্বির বালাই নেই। ডিরেক্ট পয়েন্টে এসে গল্প শুরু, আবার সেখানেই শেষ। “এক কাপ চা” গল্পটাও তেমন। এত ছোট রহস্যগল্প আপনি ‘সম্ভবত’ আগে পড়েছেন কি-না বলা মুশকিল। রহস্যের সমাধান হয়ে যায় এক পাতাতেই। একদম টুইস্টসমেত সলিউশন। আরও মজার ব্যাপার হলো, এক কাপ চা নিয়ে গল্পটা পড়তে বসলে দেখবেন চা শেষ হবার আগেই গল্প শেষ হয়ে যাবে।
অল্পকথায় গল্প কীভাবে জমানো যায়, তা আপনি “নক্ষত্রের খসড়া গান” গল্পটি পড়লে অনুভব করতে পারবেন। কী নিদারুণ এক জীবনের খসড়া তুলে ধরা হয়েছে। যা চোখের পলকেই নিঃশেষ হয়ে যায়। গল্প ও জীবন, দু’টোই কত অসহায়। অপরদিকে “মায়ের অবাধ্য ছেলেটি” এক পাতা নয়, রীতিমতো এক পৃষ্ঠার গল্প। তাও আবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক। যা শেষ করার পর কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে থেকেছিলাম। “জ্যোৎস্না হনন” গল্পের প্রসঙ্গ পরে আসবো, আগে এটার প্রথম কয়েকটি লাইন পড়ুন-
বউ হাইসা হাইসা কইছিল, ‘বাচ্চা দেখলেই পলায়ে যান। নিজের যখন হইবো তখন কই পলাইবেন?’ জবাবে কী বলছিলাম তা মনে নাই। কিন্তু যখন সে আমাকে কন্যা সন্তান উপহার দিয়া পলাইয়া গেল আল্লাহর কাছে, তখন আর আমার পলায়ে যাওয়ার কোনো পথ অবশিষ্ট ছিল না।
সামান্য এই কয়েকটি লাইনই হুকড হয়ে যাবার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ধারণাও করতে পারবেন না সামনে আপনার জন্য কী অপেক্ষা করছে। গল্পের বর্ণনা, পরিণাম, বাস্তবতার নির্মমতা বাকরুদ্ধ করে দেয়। সেইসাথে আশ্চর্য হবেন, বইয়েরই আরেকটি গল্পের সাথে এটার নিখুঁত যোগসূত্র রয়েছে। সেইবার কন্যার চোখে বাস্তবতা দেখে থাকলে, এইবার পিতার চোখে দেখতে হবে।
আগেই বলা হয়েছে, এই বইটি পড়তে হবে গ্যাপ দিয়ে। সময় নিয়ে, জমিয়ে জমিয়ে। নাহলে পরবর্তী গল্প “গহীন বনে একা হরিণী”র গভীরতা ও তাৎপর্য বুঝতে কষ্ট হবে। এক পাতা ছাড়িয়ে যাওয়া গল্পটি আপনার কাছে হয়তো চেনা মনে হতে পারে, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক যে আবহ সৃষ্টি ও তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেটা আপনাকে একইসাথে হতবাক করবে; শেখাবে কী করে কাছের মানুষদের আগলে রাখতে হয়। পূর্বের গল্পগুলোতে একটি বিশেষ চরিত্রের প্রতি মায়া-মমতা ঘেরা জগত এখানে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তাই যদি গ্যাপ দিয়ে না পড়েন, ধাক্কাটা ঠিকমতো অনুভব করতে পারবেন না।
একটি দোকানে বয়ামভর্তি সন্দেশ। তা ঘিরে একজনের শৈশব থেকে বৃদ্ধ বয়স অবধি কত আশা, আকাক্সক্ষা, তাড়না, আক্ষেপ। জীবন বৈচিত্র্যময়, জীবনের চাওয়া-পাওয়াও ঠিক তেমনই। পড়ার সময় মনে হচ্ছিল, এমন মানুষও নিশ্চয় আছে। তাদের গল্প আমরা তেমন কেউ জানি না। একদম শেষ লাইনে এসে গল্পের হিসেবটা এলোমেলো হয়ে যায়। আমি নিশ্চিত, আমাদের সবার জীবনেই এমন কিছু না কিছু রয়েছে, যা “কাচের বয়ামে বন্দি”।
গল্প বিষয়ক আলোচনা আপাতত এতটুকুই। ভেবেছিলাম বইয়ের সেরা গল্পগুলো নিয়ে লিখব। কিন্তু প্রতিটি গল্পই এত আপন আর ভালো লেগেছে যে, বাছাই করতে ইচ্ছে করেনি। তাই বইয়ের একদম শুরুর দিককার ১০টি গল্প নিয়ে লিখলাম।
আর কী বলবো? কাগজ, ছাপা, প্রচ্ছদ, বাইন্ডিং... এগুলো? বলা যায়। বাদ রেখে কী লাভ! লেখক যেমন তার সেরাটা দিয়েছেন, প্রকাশক-প্রকাশনীও কোনোরকম কার্পণ্য করেনি। কাগজের মান দারুণ। ছাপাও সুন্দর হয়েছে। বইয়ের কনটেন্ট অনুযায়ী প্রচ্ছদটি প্রাসঙ্গিক এবং দৃষ্টিনন্দন। বাইন্ডিংসহ পুরো প্রোডাকশনই টপনচ। উল্লেখ্য যে, ভেতরকার ফন্ট খুবই ইউনিক আর কভারে গোল্ডেন এবং সিলভার ফয়েলের ব্যবহার ক্রাউন সাইজের এই বইটির কোয়ালিটিকে আরও এক ধাপ বর্ধিত করেছে। সম্পাদনায় কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। তাই বানান ভুলও চোখে পড়েনি।
পরিশেষে আরও কিছু লেখার মতো কি বাকি আছে? হ্যাঁ, সামান্য কিছু। বর্তমানে অনুগল্প, ছোটগল্প লেখক-পাঠকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। প্রতি বছর তাই এ ধরনের বেশকিছু বই ও সংকলন প্রকাশিত হয়। তারপরও “এক পাতার গল্প” নিজের বৈশিষ্ট্য ও ধরনে সেসকল থেকে ব্যতিক্রম। সেটা কেমন, তা পড়লেই বুঝতে পারবেন। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, এই বইটির অনুকরণে সামনের সময়ে আরও বই দেখতে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে নতুন লেখকদের জন্য বইটি দারুণ এক উৎস হিসেবে প্রমাণিত হবে। যদি সত্যিই এমনটা হয়, আশ্চর্য হবো না!
যারা অনুগল্প, খুদে গল্প ভালোবাসেন কিংবা ব্যতিক্রম কিছু পড়তে চান, তাদেরকে অবশ্যই “এক পাতার গল্প” সাজেস্ট রইল। যদি আপনার পরিচিত বা কাছের কেউ বই পড়তে চায়, কিন্তু সময় ও ধৈর্যের অভাবে পড়তে পারে না; আগ্রহ করে যদিও-বা বই তুলে নেয় হাতে, হয়তো দেখা যায় প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই হাঁপিয়ে যায়, তুলে রাখে বুকশেলফে। তাদেরকে চাইলে এই বইটি উপহার দিতে পারেন। তিনি যদি ৫/৬ পৃষ্ঠাও পড়েন, আমি নিশ্চিত, আপনাদের আবার দেখা হলে তিনি মিষ্টি হেসে বলবে, ‘বইয়ের গল্পগুলো দারুণ ছিল।’
বিঃদ্রঃ এই রিভিউটি যখন লিখছি, বইয়ের ৪০টি গল্প পড়া শেষ। তবে শেষের দিককার ৭টি গল্প এখনো পড়া বাকি। আমি সেগুলো সহসাই শেষ করতে চাই না। আগামী ৭ সপ্তাহের জন্য সেগুলো সযত্নে তুলে রেখেছি।
ফ্ল্যাপের অংশ:
চাষার মেয়ে এস্ট্রোনাট হতে চেয়েছিল। শুনতে চেয়েছিল নক্ষত্রের গান। কিন্তু পরিণামে কী শুনতে পেয়েছিল?
পাইলট প্রকল্প হিসাবে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দেওয়া হলো এক অভিনব মুক্তি! তারপর...
মিরচি ঢালীকে সমাধান করতে হবে এক অদ্ভুত সমস্যার- একটা মেয়ে কেন সবসময় পরে থাকে স্কুল ড্রেস!
এক পাগলের বড্ড শখ বিরিয়ানি খাওয়ার, এগিয়ে এলো এক টোকাই। শেষটা হয়তো সে কখনও এভাবে ভাবেনি।
ভিন্ন স্বাদের ৪৭টি খুদে গল্প নিয়ে সাজানো এই “এক পাতার গল্প”।
.
বই: এক পাতার গল্প
লেখক: সজল চৌধুরী
প্রচ্ছদ: সজল চৌধুরী
প্রকাশনা: ভূমিপ্রকাশ
ধরন: গল্প সংকলন
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৯৬