"প্রিয় মানুষের হারানোর ভয়ের থেকে আর কোন বড় ভয় নেই। এই ভয়টা এত তীব্র যেটার ভয়ে মাথা নুইয়ে প্রিয়জনকে বিদায় দেওয়া যায় তবুও মুখ ফুটে বলা যায় না সে ভয়টার কথা।"____ভ্রম, এম.জে. বাবু
ঘুম থেকে উঠেই শেষ করলাম বইটা। একটানে পড়ার মত একটা বই৷ সাবলীল ভাষা,আর রসবোধ মিশ্রিত বাক্য গঠন আমাকে মুগ্ধ করেছে। যাহক,এসব পরে বলবো আগে মূল কথায় আসি....
বইঃ ভ্রম
লেখকঃ এম. জে. বাবু
প্রকাশনীঃ গ্রন্থরাজ্য
মূল্যঃ ২২০
জনরাঃ (বুঝতে পারছি না কী জনরায় ডিফাইন করবো)
🎇সার সংক্ষেপ-
গল্পের কথক একজন সাদামাটা, অপদার্থ শ্রেণীর মানুষ যার জীবনে সফলতা নেই বললেই চলে, শুধু ব্যর্থতা দিয়ে ভরা। ২২ শে শ্রাবণ, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু দিবস। এদিন কথকের নানান কাজ করার পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু সমস্ত কাজ ভেস্তে যায় সারদা নামের একটি মেয়ের জন্য।
একটা চিরকুট পেয়ে মেয়েটির কাছে ছুটে যায় কথক। মেয়েটি কথকের জন্য একটা ব্যাগ রেখে যায় যেটা কথককে এক ঠিকানায় পৌছে দিতে হবে। ব্যাগটিতে রয়েছে এক গুচ্ছ রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শুরু হয় কথকে নতুন পথচলা। সেই পথে কথক মুখোমুখি হয় নানা উত্থান পতনের।
কথকের জবানীতে ফুটে উঠে তার নানা জীবন। তার ক্যাম্পাস জীবন,হল জীবন,কিংবা ব্যাক্তিগত জীবন। কথকের সমস্ত জীবন জুড়ে একজন মাত্র মেয়ের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেটা হলো সারদা। সারদা কথকের প্রেমিকা না,তাহলে কে যার জন্য কথক সব করতে রাজী? জানতে হলে এই চমৎকার বইটি আপনাকে পড়তে হবে।
❤️🙂❤️পাঠ প্রতিক্রিয়া-❤️❤
>> লেখকের দিমেন্তিয়া পড়েছিলাম, সুতরাং লেখকের লেখনীর সাথে পরিচিত ছিলাম। কিন্তু এই গল্প শুরু করে চমকে উঠলাম। লেখনি একদম ভিন্ন। হুমায়ূন দ্বারার লেখনি। পড়তে গিয়ে অনেক জায়গায় মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ছি। যাস্ট অবাক হলাম।
>> চরিত্রায়ন সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে আমাকে। গল্পে তিনটি নারী চরিত্র আছে। আমি অবাক হলাম এর মধ্যে একটা চরিত্র একদম আমার সাথে মিলে। এটাই বোধহয় লেখকের চরিত্রায়নের সার্থকতা যে পাঠক পড়ার সময় নিজেকে গল্পের একজন মনে করবে।
👉👉 গল্পে কিছু লাইন আপনার মনের দাগ কেটে নিবে। আর কিছু ঘটনা আপনার জীবনের সাথে মিলে যাবে। আমার হাজব্যান্ডের সাথে আমার ক্যাম্পাসে পরিচয়,আর দুইজন দীর্ঘ ৪ বছর প্রেম করি। ৪ বছরের প্রেমে এই ঘটনাটি একদম মিলে যায়।
আর এটা পড়ার সময় আর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছিলো। প্রায় এক যুগ পর কোন বইয় পড়তে গিয়ে চোখ দিয়ে পানি পড়লো। বিরহের পানি না,পুরনো স্মৃতি রোমহন্থন করে আবার সুখ পাওয়ার কান্না। এই প্যারাগ্রাফটি হয়ত অনেকের সাথে মিলে যাবে..
"তরুণ তরুণীর কাছে গিয়েই বুঝলাম জুনিয়র। মেয়েটি বসে আছে। তার হাতে একটি বাটি। আরেকটু কাছে গিয়েই বুঝলাম। হাতে খাবারের বাটি। মেয়েটি নিজ হাতে ছেলেটিকে খাইয়ে দিচ্ছে। হয়ত মেয়েটি কাল রাতে হলে কিছু ভালো রান্না করেছে। সেখান থেকে কিছু হয়ত ছেলেটির জন্য তুলে রেখেছে। নাহয় বাড়ি থেকে ফিরতে ছেলেটির জন্য লুকিয়ে নিয়ে নিয়ে এসেছে। ছেলেটিও মাথা নিচু করে খাচ্ছে।
আমাকে দেখে মেয়েটি মাথা নিচু করে ফেললো। তাদের এই মুহূর্তটাকে নষ্ট করতে ইচ্ছে হলো না। হয়ত এই একটি মুহূর্তের প্রতিদান দিতে গিয়ে ছেলেটি কখনো মেয়েটির হাত ছাড়বে না। মেয়েটি হয়ত এই ভালবাসার কথা চিন্তা করে ছেলেটির হাত ছাড়বে না। সম্পর্কে ভালবাসার থেকে অনেক সময় বেশি গুরুত্ব হয়ে উঠে কিছু মুহূর্ত, সময় অথবা অবস্থা। ভালবাসাটা হয়ত সবসময় এক রকম থাকে না কিন্তু মানুষ তাদের ভালবাসার মুহূর্তগুলোর কথা ভেবে তাদের ভালবাসাকে আবার পুনর্জীবিত করে।"
অনেক আগেই সেই দিনগুলি ভুলে গেছি,এই বইটা পড়ে যেন দিনগুলিতে আবার ফিরে গেলাম। হ্যাজবেন্ড মূলত থ্রিলারপ্রেমী,জোর করে দিলাম বইটা পড়তে। এই পৃথিবিতে কেউই চায় না ভালোবাসা হারিয়ে যাক।
আসলেই ভালোনাবাসা টিকিয়ে রাখার জন্য সারা জীবন একসাথে পার করতে হয় না, একটা মূহুর্ত সারা জীবনের জন্য ভালোবাসা টিকিয়ে রাখে।
বইটা শেষ করে হা করে বসেছিলাম। নিতান্ত কমেডি দিয়ে শুরু হওয়া গল্প কী পরিমানে আপনাকে আঘাত করবে সেটা কল্পনাও করতে পারবেন না। এত সুন্দর, সাবলীল,গুছানো একটা বই যে একটু বিরক্তি জন্ম দেয় না।
একটা মাস্ট রিড বই। বাজারে যখন বস্তা পচা রোমান্টিক গল্পের সমাহার, সেখানে এমন একটা ক্লাসি বই সত্যিই আমাদের জন্য উপহার। যতটুকু আশা নিয়ে কিনেছিলাম, তার বেশিই পূরণ হয়েছে।
ব্যক্তিগত রেটিং - ১০/১০