📚বুক রিভিউ 📚
বইয়ের নাম :- প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সমগ্র-১
লেখক :- স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
অনুবাদ :- মারুফ হোসেন+ মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ
ধরন :- সাই-ফাই অ্যাডভেঞ্জার
প্রকাশনী :- বিবলিওফাইল
প্রচ্ছদ :- রুদ্র কায়সার
পৃষ্ঠা সংখ্যা :- ৩৫২
মুদ্রিত মূল্য :- ৫৫০৳
শুরুর আগে :-
❝কখনও কখনও আমার মনে হয় -এই মঞ্চটা তার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে, এই ধারণাটা মানবজাতির সবচাইতে বড়ো ভুল।❞
'স্যার আর্থার কোনান ডয়েল'কে সবাই চেনে তাঁর অমর সৃষ্টি শার্লক হোমসের লেখক হিসেবে। কিন্তু শার্লক হোমস ছাড়াও এই লেখকের হাতে তৈরি হয়েছে আরো বিখ্যাত কিছু চরিত্র। তাদের মধ্যে একজন হলেন 'প্রফেসর জর্জ এডওয়ার্ড চ্যালেঞ্জার'। খ্যাপাটে ও রগচটা এই বিজ্ঞানীকে নিয়ে ডয়েল লিখেছেন মোট তিনটি উপন্যাস এবং দুটি গল্প। বিবলিওফাইল প্রকাশনীর এই খণ্ডে স্থান পেয়েছে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সিরিজের সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস "দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড" এবং গল্প "দ্য পয়জন বেল্ট"।
কাহিনী সংক্ষেপ :-
"দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড"
এই পৃথিবীটা এক সময় ছিল ডায়নোসরদের। প্রাগৈতিহাসিক যুগে এই পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতো বিভিন্ন প্রজাতির প্রাগৈতিহাসিক সব প্রাণীরা, আকাশে উড়ে বেড়াত পাখির মতো টেরোড্যাকটিল। মানুষের জন্মের লক্ষ বছর আগেই ধ্বংস হয়ে যায় এইসব অতিকায় দানবেরা, যাদের ফসিল আমরা দেখতে পাই এই বর্তমান সময়ে। কিন্তু কি হবে, যদি জানতে পারেন পৃথিবীর কোনো এক জায়গায় এখনো বেঁচে বর্তে আছে এসব প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাণীরা!
এমনই এক 'WHAT IF?' তত্ত্ব মানুষের সামনে উপস্থাপন করলেন রগচটা পাগলা বিজ্ঞানী হিসেবে কুখ্যাত প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। আর স্বাভাবিক ভাবেই হাসাহাসি ও কটাক্ষের শিকারে পরিণত হলেন সবার কাছে। তবে দমে যাওয়ার পত্র নন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, তার দাবির সত্যতা যাচাই করতে তৈরি করা হলো একটি কমিটি যারা সশরীরে ঐ হারানো পৃথিবীতে গিয়ে প্রমাণ করবে এখনো পৃথিবীর বুকে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে মিলিয়ন বছর আগেই হারিয়ে যাওয়া ডায়নোসরেরা। অথবা প্রমাণিত হবে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার আসলেই একজন মিথ্যুক পাগল।
সাংবাদিক এডওয়ার্ড ডি. ম্যালোন, জীববিজ্ঞানী প্রফেসর সামারলি, শিকারি লর্ড জন রক্সটন সহ তৈরি হলো এমন একটি দল যারা স্বেচ্ছায় এই অভিযানে যেতে প্রস্তুত। পৃথিবীর হাজারো অভিযাত্রীর নজর বাঁচিয়ে আমাজন বনের গহীনে লুকিয়ে থাকা এই "লস্ট ওয়ার্ল্ড" কি আদৌ খুঁজে পাবে তারা? খুঁজে পেলেও কিসের সম্মুখীন হতে হবে তাদের? সত্যিই কি এখনো বেঁচে আছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই প্রাণীরা? ছোট্ট এই দলটি বেঁচে ফিরতে পারবে তো, নাকি ডায়নোসরের খাবারে পরিণত হবে? সেই লস্ট ওয়ার্ল্ডে কি শুধুই ডায়নোসরদের বাস, নাকি লুকিয়ে আছে মানুষের কল্পনার চেয়েও বেশি কিছু? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে শুধু মাত্র "দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড" এ।
"দ্য পয়জন বেল্ট"
পাগলা বিজ্ঞানী 'প্রফেসর চ্যালেঞ্জার' আবারো হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন পুরো পৃথিবীতে, আর এর সূত্রপাত টাইমস পত্রিকায় দেওয়া একটি চিঠি। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা হঠাৎ করে লক্ষ্য করছেন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে 'ফ্রাউয়েনহফার' রেখা, এর প্রভাব সম্পর্কে কেউ কিছু বুঝতে না পারলেও চ্যালেঞ্জার তার চিঠিতে দাবি করলেন পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে ভয়ঙ্কর কিছু। এর ফলে পৃথিবীর পুরো প্রাণিজগৎ হুমকির মুখে পড়বে।
ঠিক সেদিন সকালেই জরুরি ভিত্তিতে টেলিগ্রাম করে ডেকে পাঠালেন পুরোনো বন্ধুদের। অন্যদের মতো পুরোনো অভিযানের সঙ্গী সাংবাদিক 'এডওয়ার্ড ডি. ম্যালোন', জীববিজ্ঞানী প্রফেসর সামারলি এবং শিকারি লর্ড জন রক্সটন-ও চ্যালেঞ্জারের এই তত্ত্বকে উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা হিসেবে ধরে নিলো। কিন্তু তাদের ভুল ভাঙলো খুব দ্রুতই, যখন চ্যালেঞ্জার প্রমাণ করে দিলেন বিষাক্ত ইথারের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তাদের উপরেও। খুব শীঘ্রই এই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে পুরো জীবজগৎ। মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে মানুষ, পশুপাখি সবাই। বাঁচতে পারবে না কেউই!
এখন কি করবেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার? বসে বসে দেখবেন সবার মৃত্যু? নাকি তার তুখোড় মস্তিষ্কে আছে বেঁচে থাকার কোনো পরিকল্পনা? এই মহাজাগতিক সংকট মোকাবেলা করা কী কোনো সামান্য মানুষের পক্ষে সম্ভব?
পাঠ প্রতিক্রিয়া :-
❝যতক্ষণ অদৃশ্য হাত উঠে না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউই বুঝতে পারে না সে ওই হাতের ইশারায় নাচা একটা পুতুল মাত্র; সে কতটা অক্ষম ও অজ্ঞান!❞
"দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড"
ডায়নোসরের সাথে আমার প্রথম পরিচয় বিটিভিতে প্রচারিত হওয়া "গডজিলা" কার্টুন শো এর মাধ্যমে। নাওয়া খাওয়া ভুলে অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম এটা দেখার জন্য। এরপর আব্বু দেখালো ডিজনির এনিমেশন মুভি "DINOSAUR", এরপরেই শুরু হলো প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই প্রাণীদের সম্পর্কে জানতে চাওয়ার কৌতূহল।
ডায়নোসরদের নিয়ে অনেক মুভি তৈরি হয়েছে, লেখা হয়েছে উপন্যাস। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস বোধহয় স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের লেখা "দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড"। এই উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় হলিউড মুভিও। কোনান ডয়েলের লেখনশৈলী নিয়ে বোধহয় কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। যারা শার্লক হোমস পড়ছেন তারা জানেন লেখক কিভাবে পাঠককে আটকে রাখতে পারেন তার লেখায়। এই বইতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গল্পের প্লট সেই সব প্রাগৈতিহাসিক যুগের দানবদের খুঁজে বের করা নিয়ে যারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে লক্ষ কোটি বছর আগেই। লেখক দারুণ ভাবে এবং বিশ্বাসযোগ্য করে সেই পরিবেশ তৈরি করেছেন, দিয়েছেন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও। যারা অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন তাদের কাছে 'দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড' অবশ্যই ভালো লাগবে। অ্যাডভেঞ্চার জনরার ক্লাসিক একটা বই এটা।
তবে যারা নতুন পাঠক তাদের কাছে শুরুতে গল্প কিছুটা ধীর গতির মনে হবে। লেখক শুরুতে প্রতিটা চরিত্রকে যথেষ্ট সময় দিছেন, বিশেষ করে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার এবং ম্যালোনের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে শুরুর বেশ কিছু সময় নিছেন লেখক। যার কারণে শুরুতে নতুন পাঠকদের কিছুটা বোরিং লাগতে পারে, তবে চরিত্রগুলোকে বুঝতে এবং উপলব্ধি করতে এটার দরকার ছিল অবশ্যই। ধৈর্য ধরে কিছুটা পড়ে গেলেই এরপর টেরোড্যাকটিল শিকার না করার আগে পর্যন্ত বই থেকে কেউ বের করতে পারবে না আর।
"দ্য পয়জন বেল্ট"
'দ্য পয়জন বেল্ট' লেখকের সাইন্স ফিকশন গল্প হলেও এর মধ্যে কিছুটা কসমিক হরর ভাইব আছে। চোখের সামনে যদি একে একে পুরো পৃথিবীর মানুষ, পশু-পাখি মারা যেতে শুরু করে আর তাদের মৃত্যু আপনাকে বসে বসে দেখতে হয় তাহলে সেটা কোনো ভাবেই কারো জন্য সুখকর কিছু মনে হবে না। বরং তখন চারিদিকে লাশের স্তুপ দেখে মনে হবে নিজেও এদের সাথে মারা গেলেই ভালো হতো।
মহাজাগতিক সংকটের কাছে আমরা মানুষরা কতটা ক্ষুদ্র এবং আমাদের এই ছোট্ট গ্রহটি যে কতটা অসহায় সেটা লেখক খুব ভালো ভাবেই ফুটে উঠেছে এই গল্পে। এই গল্পটা মানুষকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবাবে, ভয় পাওয়াবে, ভাবতে বাধ্য করবে কিভাবে আমরা এই মহাকাশে কত ক্ষুদ্র অংশ দখল করেই নিজেদের সব কিছুর কেন্দ্রে ভাবতে ভালোবাসি।
লেখক শুধু ভাবাননি, সেই সাথে গল্পের শেষটাও দারুণ বুদ্ধিমত্তার সাথে এবং যৌক্তিক ভাবে উপস্থাপন করছেন। যেটা আমার কাছে দারুণ লেগেছে, এবং এটাকে একটা টুইস্টও বলা যায়। যারা ব্যতিক্রমধর্মী লেখা পড়তে পছন্দ করেন, পড়ার পর লেখাটা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন, তাদের কাছে "দ্য পয়জন বেল্ট" ভালো লাগবে বলেই আমি মনে করি।
❝যে প্রাণিজাতির সদস্য আমরা ছিলাম, তারা সবাই মারা যাবার পরেও আমাদের বেঁচে থাকা- যেন একটা প্রচন্ড শারীরিক আঘাত হয়ে আমাদের একেবারে ধরাশায়ী করে ফেলেছিল।❞
অনুবাদ কথন :-
এই সমগ্রের অনুবাদক ছিলেন দেশের সেরা দুই অনুবাদকদের মধ্যে অন্যতম, মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ ও মারুফ হোসেন। বইয়ের ভেতরে লেখা নাই কোনটা কার অনুবাদ, এবং সত্যি বলতে গেলে যদিও আমি আগে থেকেই তাদের অনুবাদের সাথে পরিচিত তারপরও এই বইতে বুঝতে পারিনি কে কোনটা অনুবাদ করছেন নাকি দুটোতেই দুজনের কন্ট্রিবিউশন আছে।
যারা অনুবাদ নিয়ে চিন্তিত থাকেন তাদের বলবো, অনুবাদ বরাবরের মতই সহজ এবং সাবলীল ছিল, তাই অনুবাদ নিয়ে চিন্তা করার কিছু নাই আমার মতে। সেই সাথে বাড়তি সুবিধা হিসেবে যোগ করা আছে প্রায় প্রতিটি পাতায় একাধিক টিকা, যা সেই সময়ের পরিস্থিতি, স্থান এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করে।
তবে এই টিকা আবার মাঝে মাঝে পড়ার গতিকে কিছুটা ধীর করেও দেয়। আমার যদিও এসবে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি বরং এই টিকা গুলো অনেক কিছুই জানতে এবং সেই সময়টাকে ঠিক ভাবে কল্পনায় ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করছে। তবে কারো যদি এতে সমস্যা হয় তাহলে টিকা ইগনোর করে বা অধ্যায়ের শুরুতে পড়ে নিতে পারেন।
প্রচ্ছদ,প্রডাকশন ও অন্যান্য :-
এই বইয়ের প্রচ্ছদ 'রুদ্র কায়সার' ভাইয়ের করা। দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড কে এরচেয়ে ভালো এবং আকর্ষণীয় ভাবে মনে হয় না প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিল। আমার কাছে দারুণ লেগেছে প্রচ্ছদটা।
বিবলিওফাইল এর প্রোডাকশন বরাবরের মতোই ভালো ছিল। তবে বেশ কিছু ছোট ছোট টাইপিং মিস্টেক ছিল পুরো বইতে। টাইপিং মিস্টেক গুলো পড়ায় যদিও কোনো সমস্যা করে না, কিন্তু তারপরও আরো কমানো যেতো আমার মনে হয়।
সব মিলিয়ে দারুণ একটা জার্নি ছিল পাগলা প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সাথে। ধন্যবাদ লেখক সুস্মিতা জাফর আপুকে এই দারুণ এবং অনেক কাঙ্ক্ষিত বইটা উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য। আশাকরি বিবলিওফাইল খুব দ্রুতই পরের খণ্ড নিয়ে আসবে আমাদের জন্য।
বই হোক সব সময়ের সঙ্গী ❤️
Happy Reading ❤️