আমরা পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, আকাশের দিকে তাকালেই সবাই জ্যোতির্বিদ হয়ে যাই। এর জন্য দুরবিন লাগবে না, টাকা খরচ করতে হবে না। লাগবে না বড় ডিগ্রি, যেতে হবে না বিদেশে। শুধু থাকতে হবে ভালো চোখ। জানতে হবে আকাশের উজ্জ্বল তারার নাম। তাদের হাত তুলে চিহ্নিত করতে হবে। এর মধ্যে যে আনন্দ, তা নির্দোষ ও ঈর্ষাবিহীন। সেই আনন্দের মাঝে আমরা সবাই পাব পর্যবেক্ষকের তকমা। আর এই তকমা মহাবিশ্বের মাঝে আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবস্থানকে বুঝতে সাহায্য করবে। এখানে পেশাদারি ও অপেশাদারির মধ্যে কোনো তফাত নেই। বইটি জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যার নয়। এখানে আকাশের তারা, নীহারিকা, গ্যালাক্সি ও গ্রহদের চিহ্নিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তাদের পদার্থবিদ্যার ওপর নয়। আকাশ চেনানো, আর সেই চেনা থেকে আনন্দ পাওয়াই বইটির উদ্দেশ্য। সেই আনন্দের জগতে পাঠককে আমন্ত্রণ।
দীপেন (দেবদর্শী) ভট্টাচার্য (Dipen Bhattacharya) জ্যোতির্বিদ, অধ্যাপক ও লেখক। জন্ম ১৯৫৯ সালে। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল। ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল, নটরডেম কলেজ ও ঢাকা কলেজে পড়াশুনা করেছেন।
মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যারিল্যান্ড-এ নাসার (NASA) গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইনস্টিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিআর) গামা রশ্মি জ্যোতি জ্যোতিঃপদার্থবিদ হিসেবে যোগ দেন। মহাশূন্য থেকে আসা গামা-রশ্মি পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে বেলুনবাহিত দূরবীন ওঠানোর অভিযানসমূহে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কমিউনিটি কলেজে; এছাড়া পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে অধ্যাপনা করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার মোরেনো ভ্যালি কলেজে। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় ‘অনুসন্ধিৎসু চক্র’ নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬-২০০৭ সালে ফুলব্রাইট ফেলো হয়ে ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞান আন্দোলন ও পরিবেশ সচেতনতার প্রসারে যুক্ত।
পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা ছাড়াও বাংলা ভাষায় তাঁর বিজ্ঞান-কল্পকাহিনিভিত্তিক ভিন্ন স্বাদের বেশ কয়েকটি ফিকশন বই প্রকাশিত হয়েছে।
চাকুরীর সুবাদে মাঝসাগরে অজস্রবার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। মাঝ সমুদ্রে (বা জনমানবহীন ঝুম পাহাড়ের মাঝে) না গেলে "Light Pollution" বলতে যে একটা ব্যাপার আছে, কয়েক মাইল দূরের সামান্য এক বিন্দু আলো যে চোখে কটু লাগতে পারে - এই ব্যাপারে কোনো ধারণা পেতাম না। পূর্ণিমা তো ছোটবেলা থেকেই সুন্দর জেনে আসছি, কিন্তু অমাবস্যা যে আরো মোহনীয়, সেটা আলো শূন্য পরিবেশ ছাড়া বোঝার কায়দা নেই। "তারার আলো" বলতে যেটা বোঝানো হয়, নাগরিক জীবনে সেটা অনুভব করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। সভ্যতা আমাদের ঘর আলোকিত করলেও, তারা দেখার আনন্দ থেকে আমরা চিরতরে বঞ্চিত হচ্ছি।
যাঁরা রাতের আকাশ দেখতে পছন্দ করে, তারাদের গল্প শুনতে চায়, তারা চিনতে চায়, এই বইটা তাদের জন্যে গোছানো সমাধান। নামের মাঝেই বইয়ের ধারণা পাওয়া যাবে - "আকাশ পর্যবেক্ষকের নোটবই"। মূলত রাতের তারাদের আদ্যপান্ত নিয়ে হালকা একাডেমিক ভঙ্গিতে আলোচনা করা হয়েছে এখানে।
মাঝের কয়েকটা পরিচ্ছদ বুঝতে হলে উচ্চ মাধ্যমিকে পদার্থবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের অপটিকস চ্যাপ্টার নিয়ে ভালোভাবে জানা থাকা জরুরী (এই অংশটা একটু কাঠখোট্টা এবং মোটেই সার্বজনীন নয়)।
বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অংশ হচ্ছে শেষের দিকে: গ্রীষ্ম, হেমন্ত ও শীতের আকাশে কোন তারা কোথায় থাকে, কখন কোন দিকে তাকালে কোন তারাদের চিহ্নিত করা যাবে - এই অংশটা। এছাড়াও, তারা দেখবার যন্ত্রপাতির মধ্যে বাইনোকুলার, দূরবীন - এসব নিয়ে হালকা ধারণা দেয়া হয়েছে।
সবমিলিয়ে সুখপাঠ্য (ব্যক্তিগতভাবে রাতের আকাশ নিয়ে আকর্ষন থাকায় ভালো লেগেছে)।