গত শতাব্দীর শেষ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার পতনের পর থেকে কার্ল মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন সূচীত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রায়োগিক সম্ভাবনা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি সমাজতন্ত্র তথা কমিউনিজম, এ ব্যাপারে এখন গুরুতর সংশয় দেখা দিয়েছে অনেক সমাজবিজ্ঞানীর মনে। কিন্তু বাস্তবতা হলো যে, বিশ্বায়নের সুযোগে পুঁজি নিজের বিকাশের খানিকটা হলেও জায়গা পেয়েছে। পরিণতিতে পুঁজির বিশ্বায়নের সাথে সাথে সারা পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষ বহুজাতিক পুঁজির নির্মম শোষণের শিকার হচ্ছে ক্রমাগত। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দাকে ঠেকিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো দেশে দেশে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে রমরমা অস্ত্র ও তেল ব্যবসা করছে। মোদ্দাকথা, পুঁজিবাদ এই বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি দিয়েও মেহনতি মানুষের মুক্তি আনতে ব্যর্থ হয়েছে। দিন যতই যাবে, ততই পুঁজিবাদের সংকট ঘনীভূত হবে; মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আরও বৃদ্ধি পাবে। এমতাবস্থায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মহান দার্শনিকরা আবারও মানুষের কাছে প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে আসছেন। সমাজতন্ত্রের তিন মহান দার্শনিক কার্ল মার্কস, ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ও ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। তাঁদের জীবন ও দর্শন নিয়ে বহুল পঠিত চমৎকার তিনটি বই লিখেছেন ইয়েভগেনিয়া স্তেপানভা। লেখক বি এল দাস বইগুলোর সহজবোধ্য ও সাবলীল ভাষায় অনুবাদ করেছেন। প্রত্যাশ্যা করি এ ত্রয়ী পুস্তক পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে এবং আমাদের চিন্তা চেতনাকে বহুলাংশে সমৃদ্ধ করবে।
Soviet historian, Doctor of Historical Sciences (1959).
Graduated from the Institute of Red Professors in 1931. Member of the CPSU since 1918, candidate member of the Central Committee of the CPSU from 1952-56. From 1918 to 1928 she carried on party and teaching work. In 1931 she graduated from the Institute of Red Professors. From 1931 to 1952 he was a senior researcher (with interruptions), from 1953 to 1958 he was deputy director, and from 1958 a consultant to the Institute of Marxism-Leninism under the Central Committee of the CPSU. Author of the work "Friedrich Engels" (1935, Lenin Prize of the Academy of Sciences of the USSR, 1936, 2nd, revised and enlarged edition 1956). A member of the group of authors who prepared the works: “Karl Marx. Biography "(1968, 2nd ed. 1973)," Friedrich Engels. Biography "(1970). Prepared and edited a number of volumes of the 1st and 2nd edition of the Works of K. Marx and F. Engels. She was buried in Moscow.
মৃত্যুর মাত্র চার বছর আগে তরুণ কমিউনিস্টদের একটি সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন লেনিন। সেখানে তিনি তরুণদের উদ্দেশে অনেক কিছুই বলেন। তবে, সবচেয়ে বেশি জোর দেন তিনটি শব্দে,
' শেখো, শেখো এবং শেখো। '
আজীবন শেখার চেষ্টা করেছেন লেনিন। তরুণ লেনিন পড়তে খুব ভালোবাসতেন। দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম, অর্থশাস্ত্রসহ জ্ঞানের অপরাপর সকল শাখায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে পারতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের আ্যকাডেমিক কোর্স মাত্র দেড় বছরে শেষ করেন এবং অসামান্য ফলাফল করেছিলেন তিনি।
জ্ঞান চর্চাকেই শেখার একমাত্র হাতিয়ার করেননি মহামতি লেনিন। তিনি সব সময় মিশতে চাইতেন জনগণের সঙ্গে। কৃষকদের নিয়ে তাঁর ছিল অপরিসীম আগ্রহ। তাই ঘন্টার পর ঘন্টা তরুণ লেনিন চাষীদের সান্নিধ্যে কাটাতেন। কোন সময়ে কী ফসল হয়, কৃষিকাজের সংকটগুলো কোথায়, তা তিনি কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে বুঝতে চাইতেন। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন তাদের কথা। হতে চাইতেন কৃষকদের একজন। আর, তাতে কোনো খাদ থাকত না।
শ্রমিকদের মাঝে লেনিন নিজেকে খুঁজে পেতেন। তিনি শ্রমিকদের জীবনকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। তাদের জীবনের ছোটো ছোটো অভাব-অভিযোগ ও সমস্যাগুলোকে তিনি তুচ্ছ মনে করতেন না। নিজে শ্রমিক না হলেও শ্রমিকদের নিয়ে জানতেন অনেকটাই বেশি। দিনের পর দিন লেনিন শ্রমিকদের সাথে কাটিয়েছেন। তাদেরকে বুঝতে চেয়েছেন। তাদের মনের কথা জানতে চেয়েছেন। রাতারাতি লেনিন বিপ্লবী লেনিনে পরিণত হননি। শ্রমিকদের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি ছিল শতভাগ খাঁটি।
জারের বিরুদ্ধে একদিকে লেখালিখি করেছেন, নিজের পড়াশোনা হরদম চলেছে। আবার, কিষাণ-মজদুরদের একতাবদ্ধ করার কাজ করেছেন অবিরাম। এককথায়, লেনিন ছিলেন অক্লান্তকর্মী।
বিপ্লবীকে সমাজ ও দেশকালকে চিনতে হয় হাতের তালুর মতো। লেনিনের প্রস্তুতি দেখে তা-ই মনে হলো। একইসাথে তত্ত্বজ্ঞানার্জনের জন্য দরকার প্রভূত পড়াশোনা। নতুবা গলাবাজি করে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা যাবে। কিন্তু আখেরে বিপ্লবের ফসল ঘরে তোলার আগেই হবে বেহাত বিপ্লব। লেনিন সর্তক ছিলেন। তাই তত্ত্বকথার ভিড়ে হারিয়ে যেতে দেননি নিজের সংগঠক সত্তাকে। গণমুখী লেনিনও বিলীন হননি বুদ্ধিজীবী লেনিনের ছায়ায়। এ যেন গণনেতার সাথে বুদ্ধিজীবীর দারুণ এক মিশেল!
বিপ্লবী লেনিনকে জারের আমলে বছরের পর বছর পিতৃভূমি সোভিয়েতের বাইরে নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। মায়ের মৃত্যুতে তিনি তাকে শেষবারের মতো দেখতে পাননি। ছিলেন দূরদেশে। বিচিত্র ছদ্মবেশে তার জীবনকে যাপন করতে হয়েছে। যদিও সব সময় থাকতে চেয়েছেন শ্রমজীবী মানুষের কাছাকাছি।
বিপ্লবের পর আরও বেশি দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় লেনিনকে। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো বিপ্লবকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে হামলা করে। যুক্ত হয় দেশীয় শ্বেতসন্ত্রাসীবাহিনী। তবুও লেনিন স্বপ্ন দেখা থামাননি।
কমরেড লেনিন শৃঙ্খলায় কঠোরভাবে বিশ্বাস করতেন। কোনো কাজ দশবার ভুল হলে তা দশবার সংশোধন করতেই হবে -এমন নীতিতে লেনিন ছিলেন আস্থাশীল। বিপ্লবের মহানায়ক লেনিনের বাড়তি কোনো চাওয়া ছিল না। তিনি সোভিয়েতের বাকিদের মতোই নিজেকে সাধারণ মানুষ জ্ঞান করতেন। তার প্রমাণ পাই,
'রুমিনায়ৎসেভ গ্রন্থগার (বর্তমানে ভ. ই. লেনিন গ্রন্থাগার) থেকে একবার খানকতক বইয়ের দরকার পড়ে লেনিনের । বইগুলো তিনি চেয়ে পাঠান । সেই সঙ্গে বলে দেন, বইগুলো যদি বাড়িতে পাঠানোর নিয়ম না থাকে, তাহলে এগুলো তাঁকে যেন দেওয়া হয় কেবল এক রাতের জন্য, যখন গ্রন্থাগার বন্ধ থাকে । আর সকালে তিনি সেগুলো ফেরত দেবেন। '
তড়িৎগতিতে সংস্কার লেনিন অপছন্দ করতেন। বরং ভেবেচিন্তে ও সকলের মতামত নিয়ে কাজ করার পথকেই তার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় মনে হতো। আইন প্রণয়নের সময় করণীয় সম্পর্কে লেনিনের মত, তিন গুণ সময় নিয়ে ও সাতবার দেখেশুনে আইন তৈরি করতে হবে।
লেনিন মানতেন, বিপ্লবের প্রাণ জনগণ। তাই বিপ্লবীকে থাকতে হবে জনগণের মাঝে। তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে গণমানুষের প্রাণের স্পন্দন। নতুবা বিপ্লব ব্যর্থ হবে। এই সুবচন তিনি আমৃত্যু প্রচার করেছেন।
লেনিনের জীবনীকার ইয়েভগেনিয়া স্তেপানভা। তিনি লেনিনের গুণমুগ্ধ ও বিপ্লবের আপনা বান্দা। তাই লেনিনের কোনো খামতি তার চোখে পড়েনি। ফলে রাবেয়া বুকস কর্তৃক প্রকাশিত বইটি এক ধরনের প্রোপাগান্ডা সাহিত্যতুল্য হয়ে গেছে। বিপ্লবী লেনিনের জীবনের চাইতে ১ শ ৭৬ পাতার বইয়ের বড়ো অংশ দখল করে আছে তত্ত্বকথা। যা ভালো লাগেনি এবং এই ভালো না লাগার জন্য দায় বেশির ভাগের অংশীদার বইটির অনুবাদক বি এল দাস। তিনি অনুবাদে অপটু। আক্ষরিক তরজমার মাধ্যমে বইটিকে আরও দুর্বোধ্য করেছেন অনুবাদক।
লেনিনকে নিয়ে একপাক্ষিক জানতে চাইলে বইটা পড়তে পারেন। অনুবাদ ভালো হয়নি। মূলবইতে তত্ত্বকথার ছড়াছড়ি আছে। তবুও মহামতি লেনিনের নিষ্ঠা, জ্ঞানচর্চার প্রতি অকৃত্রিম টান এবং মেহনতি জনতার জন্য দরদ আমাকে মুগ্ধ করেছে।