বায়ান্নর ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র "ভাষা জয়িতা" দেখতে গিয়ে একটা তথ্য জানতে পেরে রীতিমতো চমকে উঠি। মমতাজ বেগম নামের এক নারী একুশে ফেব্রুয়ারির দিন নারায়ণগঞ্জের মত এক মফস্বল (তৎকালীন) শহরে ছাত্রছাত্রী, পাটকল শ্রমিক আর জনতাদের একত্রিত করে পুরো নারায়ণগঞ্জে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে মিছিল করেছিলেন। শুধু একুশের দিনই নয়, পরপর ২২, ২৩, ২৪... দিনগুলোতে মিছিলের পরে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন ২৯ ফেব্রুয়ারি। মুচলেকা দিয়ে জামিনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও স্বামী, সংসার ও শিশু সন্তানের মায়া এড়িয়ে ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন নিজের সম্মান ও ভাষার দাবীকে সমুন্নত রাখতে। ফলশ্রুতিতে দেড় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড আর সাজানো গোছানো সংসার ভেঙে গিয়েছিল তার। একই সেলে জেল খেটেছিলেন আরেক অগ্নিকন্যা, নাচোলের রাণী, বিপ্লবী ইলা মিত্রের সাথে!
আমার খুবই মন খারাপ হয়েছিলো তথ্যটা জেনে। মমতাজ বেগমের জন্য নয় অবশ্য, বরং নিজের জন্যই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও বটে। এমন একজন মহীয়সী নারীর কথা, যিনি আমাদের ইতিহাসের অংশ, তাকে আমরা কোথাও স্থান দিতে পারলাম না! না কোন পাঠ পুস্তকে, না কোন ইতিহাস গ্রন্থে, এমনকি একুশে ফেব্রুয়ারিতেও কোন স্মরণ, শ্রদ্ধার্ঘ্যেও তাকে স্মরণ করা হয় না!
আমার মতই ঘটনাক্রমে মমতাজ বেগমের কথা জেনে আত্মগ্লানিতে ভুগেছিলেন বইটির লেখক হাসনাত আবদুল হাই। যার ফলশ্রুতিতে এই ডকু-ফিকশন "কল্যাণী/মমতাজ"। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের এক অগ্নিকন্যা " মমতাজ বেগম"কে যিনি কলমের আঁচড়ে তুলে এনেছেন বিস্মৃতির অতল থেকে।
বিস্মৃতপ্রায় ভাষ্কর্য শিল্পী নভেরা আহমেদের যেভাবে পুনর্জাগরণ ঘটেছিল হাসনাত আবদুল হাই-এর "নভেরা" র মাধ্যমে, তেমনি ভাষাকণ্যা মমতাজ বেগম-ও নতুন করে জন্ম নিক আমাদের মাঝে "কল্যাণী/মমতাজ"-এর মাধ্যমে।
প্রথমা প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত বইটির বহুল প্রচার ও পাঠ কামনা করি৷ একুশ, একুশের ইতিহাস, একুশের ভাষা সৈনিকদের নিয়ে লেখালেখি, গবেষণা, লালন আর চর্চার ক্ষেত্রটা আরেকটু বড় হোক।