শহর থেকে অনেক দূরে ঘন জঙ্গলের কিনারায় একটি আবাসিক স্কুল। সেখানে এল এক নতুন দিদিমণি। একঝাঁক আকর্ষণীয় অথচ রহস্যময় চরিত্র, জঙ্গলের নিজস্ব বিপদ আর টান, সর্বোপরি হৃদয়ের অদ্ভুত দোলাচল— এ-সবের মধ্যে সে আবিষ্কার করল এক অন্য রহস্য। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের অতীত, হয়তো বা ভবিষ্যৎও। কী জানতে পারল সে? সহজ গদ্যে, জঙ্গলের মনোরম বর্ণনাকে গুরুত্ব দিয়ে, প্রচুর আবেগের সঙ্গে, বেশ রোমান্টিক ভঙ্গিতে লেখা হয়েছে উপন্যাসটি। যাঁরা এই বিশেষ ভঙ্গিটি পছন্দ করেন, তাঁরা বইটিকে নিশ্চয় আপন করে নেবেন।
পাহাড় জঙ্গল ঘেরা গ্রাম কাওনঝোড়ায় মিশনারী স্কুলের শিক্ষিকার চাকরি নিয়ে আসে শহর কলকাতায় বড় হওয়া রাইমা। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই এই আদিম পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে পরে সে। এই পাহাড়ি জঙ্গলের মায়া তাকে টানে, আর টানে ডেভিড। রহস্যাবৃত সেই মানুষটা যার ভুলে যাওয়া স্মৃতির আড়ালে হয়ত লুকিয়ে আছে কোনও ভয়ঙ্কর অতীতের হাতছানি। অবশ্য রাইয়ের নিজের অতীতও কম রহস্যাবৃত নয়। কেন নিজের আরামের শহুরে জীবন ছেড়ে সে এই অচিনপুরে চাকরি নিয়ে পড়ে আছে? এক বিপদের মুহূর্তে রাইয়ের সঙ্গে আলাপ হয় এই জঙ্গলের মুকুটহীন সম্রাট ঠাকুর সাহাব ওরফে রুদ্রপ্রসাদ চৌধুরীর সঙ্গে। রেঞ্জার অভিষেক রাঠোরের মতে জঙ্গলের দুর্ধর্ষ ডাকাত শের বাগী নাকি এই ঠাকুর সাহেবেরই মদতপুষ্ট। সত্যিই কি তাই? অভিষেক কি পারবে শের বাগীকে কব্জা করতে? ঠাকুর সাহাব আর অভিষেক রাঠোরের মধ্যে এই অহং-এর লড়াইতে কার পক্ষ নেবে রাই? আত্মভোলা, ক্ষ্যাপাটে ডেভিডের আত্মহত্যার চেষ্টা করার কারণ কি উদ্ধার করতে পারবে সে? এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে পড়ে ফেলতে হবে এই বইটি।
এই বইতে পাহাড়ি পরিবেশের অনেক বর্ণনা আছে যা আমার খুবই ভালো লেগেছে। কাহিনীও পড়তে ভালোই লেগেছে। মোটের ওপর সামাজিক উপন্যাস বলেই মনে হলো তবে এতে রহস্য আছে। অভিব্রত সরকারের আঁকা প্রচ্ছদের গুণে বইটার বাহ্যিক রূপ যে বেশ খোলতাই হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অলংঙ্করণ গুলো ও পাতার মান ও বেশ ভালো। যারা পাহাড়ি পরিবেশের প্রেক্ষাপটে উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন, তারা একবার পড়ে দেখতেই পারেন।
বইটি পড়া শেষ করেছি অনেকদিন হল। এর আগেও লেখকের *অপারেশন কোডেক্স নাম বইটি আমি পড়েছি। তাই লেখনী নিয়ে কোন কথা হবে না। এই গল্পের শুরু পাহাড় ঘেরা এক গ্রাম কাওনঝোড়া কে নিয়ে। এই গল্পে প্রশ্নচিহ্ন অনেকগুলো। কেন শহর কলকাতায় বড়ো হও রাইমা একজন শিক্ষকা হিসেবে চাকরি নিয়ে চলে আসে এই গ্রামে। কিভাবেই বা সে নিজেকে মানিয়ে নেয় এই আদিম পরিবেশের সাথে? কিভাবে তার সাথে পরিচয় হয় পাহাড়ের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো ডেভিডের সাথে,এই পাহাড়ের মুকুটহীন সম্রাটের সাথে,এক দূধষ্ ডাকাত শের বাগীর সাথে। কিভাবেই বা এক বাবা, মা হারা বাচ্চা ছেলে হয়ে উঠেছিল শেরবাগী। কেই বা অভিষেক রাঠৌড়?
সত্যি কথা বলতে গল্পের প্রথম শেষ প্রতিটা মুহুর্ত আমার ভাল লেগেছে। তার সাথে গল্পের প্রতিটি চরিত্রের বুনন একদম পারফেক্ট। বইয়ের পাতা যত এগিয়েছে রহস্য তত ঘনীভূত হয়েছে। কিন্তু যখন জট ছাড়ানো শুরু হয় তখন হয়তো পাঠক বুঝেই যাবে শেষ পড়ন্ত কি হতে চলেছে। তবুও আমি পড়েছি শেষ পযন্ত, যদি শেষে এসেও একটু টুইস্ট পাওয়া যায় সেই আশায়।
এবার আসা যাক বইটির কথায়। বইয়ের বাইন্ডিং মোটামুটি। পেজ কোয়ালিটি ভালো।প্রচ্ছদ মানানসই। তবে লেখার অনেক জায়গায় বানান ভুল চোখে পরেছে, তার সাথে এক জায়গায় একি লাইনের পুনরাবৃত্তি। এটি বইটির প্রথম মুদ্রন তবে আশা রাখবো পরের মুদ্রনে প্রকাশক মহাশয় এগুলো খেয়াল রাখবেন।