আজ আমাদের ছোট পুত্র সন্তানটি ছয় মাসে পড়লো। আমি যে টেবিলে লিখছি তার পাশে অ্যালিসের কোলে ও বসে আছে। হাসিখুশিতে ভরা সুন্দর স্বাস্থ্যবান ছেলে। আমি চাই সে বড় হয়ে উঠুক, জগতের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়াক,হয়ে উঠুক আমাদের বংশের গৌরব। সে আবার আমার কলমটা হাত থেকে নিয়ে ডায়েরিতে হিজিবিজি কাটছে আর তার ছোট ছোট আঙ্গুলগুলোর ছাপ ও ফেলেছে। গহীন অরণ্যে বসে যদি ডায়েরিতে এই কথাগুলো লিখেন তাহলে বুঝতে পারছেন যে লেখক কোন পরিস্থিতিতে এ ধরনের বিষাদমাখা অদ্ভুত সুন্দর কথাগুলো লিখেছেন। এই ঘটনা জানার জন্য আমরা ফিরে যাবো অতীতে, অনেক অনেক বছর আগের ঘটনায়।
১৮৮৮ সালের কোনো এক সময়ের ঘটনা। জন ক্লেটন তার স্ত্রী লেডি অ্যালিসকে নিয়ে আফ্রিকা যাচ্ছিলেন। তারা ফুওয়ালদা নামের একটি জাহাজে চড়েন তাদের গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু গন্তব্য স্থানে পৌঁছানোর আগেই সেই জাহাজ বা গ্রেস্টোক ফ্যামিলি চিরদিনের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায় পৃথিবীর বুক থেকে। ভাগ্যক্রমে তাদের জায়গা হয় এক নির্জন উপকূলে। অ্যালিস এদিকে সন্তানসম্ভাবা অন্যদিকে গহীন অরণ্য অজানা সব পশুপাখিতে পরিপূর্ণ। বিশাল বনের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে ভয়ংকর সব জন্তু জানোয়ারের গর্জন শোনা যেতো। এই নির্জন বনভূমি কি গ্রেস্টোক ফ্যামিলির আশ্রয়ে পরিণত হবে? নাকি দূরে আবছা দেখা একটা মানুষের আকৃতি তাদের জন্য নতুন বিপদে আনবে?
ছোটবেলায় আমরা অনেকেই টারজান পড়েছি। আমার মনে পড়ে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় টারজানের কমিক স্ট্রিপ ছাপা হতো যেটা রেগুলার কেটে আমি সংগ্রহ করতাম। টারজান অভ দ্য এইপস পড়ার সময় আপনার ছোটবেলার স্মৃতি অবশ্যই মনে পড়বে। এত বছর পর টারজানের প্রথম উপন্যাসটা আবার পড়ার সময় অনেক কিছু জানার পরিবর্তন হলো। যেভাবে ঘটনাটা আমি জানতাম সেটা আসলে পুরোপুরি আমার কাছে কখনো ক্লিয়ার ছিল না। তার বাবা-মার ভাগ্যে কি হয়েছিল সেটা জানা ছিল না। উপন্যাসের শুরুতেই এই বিষয়গুলো আপনার মনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করবে। ক্লেটন দম্পতি অরণ্যে নতুনভাবে জীবন শুরু করার যে চেষ্টা করেছিল সেটা মানুষের আদিম যুগে বেঁচে থাকার সংগ্রামের সাথে তুলনা করা যায়। একটা উপন্যাস হিসেবে না নিয়ে যদি কোন ভ্রমণ কাহিনি হিসেবে আপনি এই বইটা পড়ে দেখেন তাহলে ঘটনাগুলো পড়ার সময় মনের অজান্তে ওই প্রতিকূল পরিবেশ,পরিস্থিতিতে নিঃসঙ্গ একাকী মানুষের অসহায়ত্ব বুঝতে পারবেন।
টারজান অভ দ্য এইপসের ঘটনাগুলো ছোট ছোট খণ্ডে আলোচনা করলে সব থেকে ভালো হয় কারণ তার ছোট থেকে বেড়ে ওঠা এবং পরবর্তীতে তার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার ঘটনাগুলো পর্যায়ক্রমে এসেছে। প্রত্যেকটা ঘটনা আলাদাভাবে আলোচনার দাবি রাখে। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় সেটা হলো টারজানের কাছে মানব সভ্যতার কোন অস্তিত্ব ছিল না। টারজান ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছিল গরিলা দলের সাথে। সাদা হওয়ার কারণে তাকে ডাকা হতো টারজান, গরিলাদের ভাষায় যার অর্থ সাদা বাঁদর(tarmangani)। অরণ্যের প্রতিকূল পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে টারজন বেড়ে উঠেছিল অত্যন্ত সাহসী ও শক্তিশালী পুরুষ হিসেবে। টারজানের দক্ষতা, তার অতিমানবীয় চরিত্রকে এজন্য সাধারণ মানুষের সাথে তুলনা করতে পারবেন না। উপন্যাসে সবচেয়ে দুর্দান্ত লেগেছে লেখকের কল্পনাশক্তির ব্যবহার। শুরু থেকে কাহিনি বিল্ডআপে সবগুলো ঘটনা ধাপে ধাপে তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন যে আপনি একটা সময়ে গিয়ে ভাবতে বাধ্য হবেন যে আসলেই কি বাস্তব কোনো এ্যাডভেঞ্চার কাহিনি পড়ছেন নাকি এটা কোনো পাল্প ফিকশন?
এ উপন্যাসের খুব উল্লেখযোগ্য যে বিষয়গুলো অবশ্যই আলোচনা দাবি রাখে তার ভেতর প্রথমে আসবে মানুষের প্রকৃতি প্রদত্ত কৌতূহল, অজানাকে জানার উদগ্র বাসনা। মানুষের এই নিজস্ব চিন্তাধারা তাকে সবসময় অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখে। এই উপন্যাসেও গরিলাদলের ভিতর বড় হবার পরেও টারজানের নিজস্ব চিন্তাধারার বিকাশ হয়েছে যার কারণে সে নিজের মতো করে বিভিন্ন বিষয়ে শেখে। শক্তিমত্তা, খাদ্যাভ্যাস বা আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তা কিন্তু লোপ পায়নি। আরেকটা বিষয় খেয়াল করবেন উপন্যাসটি পড়ার সময় টারজান একজন মানুষ হিসেবে সবসময় শক্তিশালি ছিল না। মানুষের সাহস তখনই আসে যখন তার কাছে থাকে প্রতিরক্ষা করার মত প্রযুক্তি বা হাতিয়ার। সেজন্য যখন দড়ি বা ছুরির সংস্পর্শে আসে তারপর থেকে সে বদলে যেতে শুরু করে এবং মানব বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে তার ক্ষমতার উৎস খুঁজে পায়। এ ঘটনাগুলো পড়ার সময় আপনি কল্পনায় আদিম যুগের মানুষের জীবনে ফিরে যাবেন। উপলব্ধি করতে পারবেন কিভাবে তারা প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে ছিল, কিভাবে মানুষ সময়ের সাথে নিজেকে উন্নত করে বর্তমান উন্নত সভ্যতায় এসেছে।
উপন্যাসে মানুষের সংস্পর্শে আসাটা টারজনের জন্য খুব বেশি সুখকর ছিল না। এ বিষয়টা যে খুব অস্বাভাবিক তা কিন্তু নয় কারণ আমাদের সমাজে মিথ্যা কথা,ধোঁকা,খুন-খারাবিসহ অনেক নিকৃষ্ট কাজ অহরহ চলমান। কিন্তু টারজান যে সমাজে বসবাস করেছে সেখানে কেউ অন্যায় ভাবে কোন কিছু করতে পারতো না। টারজান নিজেও একসময় বুঝতে শুরু করে যে সে গেরিলাদের কেউ নয়। তবে এর মাঝে সুখের পরশ হিসেবে আসে লেডি জেন। এ বিষয়টা খুব স্বাভাবিক যে একজন মানুষ তার বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষণ কাজ করবে। উপন্যাসের পাতায় পাতায় আপনি পাবেন একজন মানুষের তার অস্তিত্ব খুঁজে ফেরার গল্প, তার পূর্বসূরীদের খোঁজে প্রতিনিয়ত সংগ্রামের কথা। আপনি যদি খুব সিরিয়াস মুডে একটা কিশোর ক্লাসিক অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী পড়তে চান তাহলে এই বই আপনার পড়ার দরকার নেই। বর্তমান সভ্যতার বিচারে এই বইটা আলোচনা করতে গেলে পাতায় পাতায় ভুল ধরাটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। ভাষা জানলেও একজন মানুষ তার নাম 'TARZAN' কিভাবে লিখে এই প্রশ্নটাই তখন আপনার মাথায় প্রথম চলে আসবে। আমি বাংলা ভাষা জানি কিন্তু বাংলা ভাষায় আমার নাম কিভাবে লিখতে হয় সেটা নিশ্চয়ই বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের ভিতরে লেখা থাকবে না, তাই নয় কি? এডগার রাইস বারোজের লেখায় রেসিজম স্পষ্ট। টারজানকে শেতাঙ্গ হিসেবে কখন কোন পরিস্থিতিতে বার বার অভিহিত করা হয়েছে যেটা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন।
এই ধরনের বিষয় যদি একপাশে সরিয়ে আপনি অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস উপভোগ করার জন্য পড়তে চান; আমি অবশ্যই বলব যে টারজানের কাহিনি আপনাকে আফ্রিকার এমন সব জায়গায় নিয়ে যাবে, এমন সব ঘটনা বলবে যেগুলো পড়ে যেকোনো বয়সের মানুষ মুগ্ধ হবেন। তার আকর্ষণ ছোটবেলায় ঠিক যেমনটা পেয়েছিলাম এখন বড় হওয়ার পরও দ্বিতীয়বার পড়ে ঠিক ততটাই লেগেছে। বইয়ের শেষে তার বলা একটা কথা আপনাকে নতুন করে আবারো ভাবতে শেখাবে, এই সভ্য সমাজ আসলেই আমাদের কি দিয়েছে? সভ্য জগতে আসার পর সভ্যতা থেকে টারজান কিছুই পায়নি ঠিক কিন্তু এই সভ্যতার সংস্পর্শে এসে বুঝতে পেরেছে জীবনে চলতে হলে বন্ধু বা সঙ্গীর দরকার এবং প্রকৃত বন্ধুর সঙ্গ ও ভালবাসার উত্তাপ কত মধুর। যার জীবনে মনের কথা, প্রাণের কথা বলার মত কোন সঙ্গী বা বন্ধু নেই তার জীবন কতটা নিরস তাও সে বুঝতে শিখেছে। উপন্যাসের এই উক্তিটা স্থান কাল বিবেচনায় অসম্ভব তাৎপর্যপূর্ণ_The time has arrived when patience becomes a crime and mayhem appears garbed in a manner of virtue.
আমার লেখা শেষ করার আগে আপনাদের কাছে একটা প্রশ্ন রেখে যাই; মনে করুন টারজানের সাথে আপনাদের কারো দেখা হয়েছে। আপনার কি মনে হয় টারজন আপনাকে কি বলতে পারে? সে হয়তো বলবে, আমি হচ্ছি বাঁদর দলের রাজা টারজান। আর যদি আপনাকে কোনো উত্তর সে না দেয় তাহলে বুঝে নেবেন সভ্য সমাজ��� থেকে সে অল্প দিনেই বুঝেছে এই জগতে টাকা আর সামাজিক মর্যাদা ছাড়া জীবনের কোনো দাম নেই।
🖍️টারজান অভ দ্য এইপস