‘কণ্ডূয়ন’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো ‘চুলকানো’, তাহলে স্মৃতিকণ্ডূয়ন মানে দাঁড়াচ্ছে- পুরোনো দিনের কথা স্মৃতি চুলকে চুলকে বের করা আরকি! বইয়ের নামের মত পুরো বই জুড়েই প্রণব বাবুর সূক্ষ্ম রসবোধের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
অর্থনীতিবিদ প্রণব বর্ধণ পড়াশোনা করেছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে। কর্মজীবনে কাজ করেছেন- ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজী, বার্কলে ইউনিভার্সিটি, দিল্লী স্কুল অফ ইকনমিকস, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকস, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সহ প্রখ্যাত অনেক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে।
বইটিকে মোটাদাগে আত্মজীবনী বললে ভুল হবে, নিজের সম্পর্কে বলার চেয়ে নিজের পরিপার্শ্বিকতা নিয়েই লেখক বেশি আলোচনা করেছেন। অবশ্য নিজেকে যে একেবারেই ছায়ায় রেখেছেন এমনটাও নয়। প্রণব বর্ধণের বাবা-মা পূর্ববঙ্গের ছিলেন যদিও তারা দেশভাগের অনেক আগেই পশ্চিমে চলে আসেন তবে দেশভাগের পর তাদের কলকাতার বাসায় অনেক আত্মীয় সমাগম হবার কারণে তার বাবা তাকে শান্তিনিকেতনে, মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। বইয়ের প্রথমভাগে শান্তিনিকেতনে মামাবাড়িতে বাল্যকাল কাটানোর স্মৃতি ও কলকাতায় নিজের পাড়ার স্মৃতি উল্লেখিত হয়েছে। বাল্যকাল থেকে শুরু করে বইটি ধীরে ধীরে লেখকের পরিণত বয়সের দিকে এগিয়ে যায়, তবে সময়ের এই আগল খুব কড়াকড়ি ভাবে রক্ষা করেননি প্রণববাবু; মাঝেমধ্যেই কথাপ্রসঙ্গে পরের বা আগের বিষয়ের অবতারণা করেছেন, অবশ্য তাতে লেখার মজলিশি আড্ডার ভাবটা আরো সুসংহতই হয়েছে।
প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে তখনকার কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্রদের ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ সমাজের এক চিত্রও এই বইতে পাওয়া যায় যেমন দেখেছিলাম অমর্ত্য সেন ও তপন রায়চৌধুরীর লেখায়। তখনকার কলকাতার সমাজে জ্ঞানচর্চার ‘ব্যাটন’ মত ছিল যেটা হয়তো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হাতবদল হয়ে আসছিল। তখনকার ভারতের উচ্চ শিক্ষার উচ্চমান (যা কিনা তখন আমেরিকার কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকেউ উঁচু ছিল) সে সম্পর্কে যেমন আলোচনা করেছেন তেমনি পরবর্তী সময়ে সেই মান নেমে যাওয়া নিয়েও সমালোচনা করেছেন ও এর কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। লেখকের নিজের চারপাশের সমাজকে দেখার ও বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছা ছিল, অনেকদিন কাজও করেছেন ভারতীয় গ্রামীণ সমাজের অর্থনীতি ও এর বিকাশ নিয়ে।
কলকাতা ও যুক্তরাজ্যে পড়বার ও কাজ করবার সময়ের নানা ঘটনা ও অভিজ্ঞতা লেখক সূক্ষ্ম রসবোধে জারিত করে উপস্থাপন করেছেন। পুরো জীবনে প্রণব বর্ধণ অসংখ্য গুণী, নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের সাথে কাজের, মিথস্ক্রিয়ার সুমিষ্ট স্মৃতিচারণ বইটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। বইয়ের মাঝামাঝি এক অংশে লেখক তার প্রিয় কিছু সিনেমার নাম ও সেই সিনেমার কিঞ্চিৎ বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর মধ্যে আমার অতিপ্রিয় তিনটি সিনেমা দেখে প্রভূত আনন্দ পেয়েছি। পেশায় অর্থনীতিবিদ হলেও সাহিত্য ও সিনেমা নিয়েও প্রণব বর্ধণের আগ্রহ বা জানাশোনা ছিল অনেক বিস্তৃত।
বইটি কেন পড়ার হাজারটা কারণ চাইলে খুঁজে বের করা সম্ভব তবে, তন্মধ্যে সমচেয়ে জোরালো হবে বর্ধণ সাহেবের ভাষার ব্যবহার। রসিকতা ব্যাপারটা খুবই ‘ডেলিকেট’, সামান্য তারতম্য হলে তার সাথে ভাঁড়ামোর কোন তফাত থাকে না। যারা ভারী বিষয়ে ‘উইটি’ লেখা পছন্দ করেন তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য।