তেরোটি গল্প নিয়ে সাজানো পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর গ্রন্থটি লেখকের প্রকাশিত প্রথম বই। পরাবাস্তব ও সায়েন্স ফিকশন বা সায়েন্স ফ্যান্টাসি জনরার এই গল্পগুলো একটু অদ্ভুত কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে খানিকটা উদ্ভট।
যেখানে অটোগ্রাফ দেখেই যেমন অনাগত বিপদ আঁচ করতে পারে হামিদ, তেমনি অতিরিক্ত দেখে বিপত্তি বাঁধায় নামহীন এক বালক! অতি সাধারণ পাগলেরাও এই গল্পের জগতে মহা গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতিশূন্য মস্তিষ্ক নিয়ে ভোরে জেগে ওঠা আর রাতের অন্ধকারে স্মৃতি ফিরে পাওয়া ব্যাক্তির গল্পের পাশাপাশি আছে রিকিতা নামের এক মেয়ের গল্প; যার স্মৃতিতে অনুপ্রবেশ করে কিছু বলতে চায় অপরিচিত এক বৃদ্ধ! গ্রামের সবচেয়ে সুখী মানুষ জামিল মিয়া কোনো কারণ ছাড়াই আত্মহত্যা করে যেমন সবাইকে ধন্দে ফেলে দেয়। তেমনি আবার সমান্তরাল দুটি জীবনের গল্প বলে চমকে দেয় পেশাদার খুনি। কালো ও ধুসর স্যুট পরা দুই আগন্তুককে দেখা যায় ঢাকার রাস্তায়, নিরীহ একটি খেলার প্রস্তাব নিয়ে। একই শহরে বর্ষাস্নাত সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসে হিটলারের পুনরাগমনের গল্প শোনায় অন্য কেউ। চৈতী ও আশরাফের ভালোবাসার গল্প সময়ের বৃত্তে ঘূর্ণিপাক খেতে খেতে থমকে দাঁড়ায় লোকে লোকারণ্য এক প্ল্যাটফর্মে। সেই সময়ের বৃত্তেই আলোড়ন তুলে নতুন এক ভালোবাসার চক্রে জড়িয়ে পড়ে হাবিব ও অনুরিক্তা। ফারাতিনের হাত ধরে আরেকটি ভালোবাসার গল্পের সম্ভাবনা তৈরি হলেও, শেষমেশ জন্ম নেয় প্রজেক্ট অ-নর; যেন ভিন্ন কোনো পৃথিবীর গল্প! সব মিলিয়ে বেশ গোলমেলে অবস্থা। তাতে আরও জট পাকাতেই যেন নেয়ামত শেখের পুঁথি শেষ হওয়ার সাথে সাথে থেমে যায় পৃথিবীর সব সুর! বাস্তবতার কঠোর নিয়মে আবদ্ধ থেকে যারা হাঁপিয়ে উঠেছেন, অদ্ভুত এই গল্পের জগতে তাদের নিমন্ত্রণ রইল!
বিনিয়ামীন পিয়াসের জন্ম ও শৈশব কেটেছে ঢাকায়। তবে কৈশোরের পুরোটা সময় কাটিয়েছেন বরগুনাতে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে৷ বই পড়া, লেখালেখি, ভ্রমণ কিংবা আড্ডা দেয়া এসবই তার ভীষণ পছন্দের। সায়েন্স ফিকশন, থ্রিলার ও পরাবাস্তব জনরায় লিখতে পছন্দ করেন, তবে অন্যান্য ঘরানার গল্পও লিখে থাকেন তিনি। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ম্যাগাজিন রহস্যপত্রিকায় তার বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও দেশের একাধিক প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকাসহ লিখেছেন বেশ কিছু সাময়িকী ও যৌথ সংকলনে। ই-বুক প্ল্যাটফর্ম বইঘরে লেখকের একাধিক ই-বুক প্রকাশিত হয়েছে। "পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" তার প্রথম প্রিন্টেড বই।
৩.৫/৫ একটা সংকলনের সব গল্প সমানভাবে উপভোগ্য হবে না এটা মেনে নিতেই হয়। এ বইতে সবচেয়ে ভালো লাগা গল্প হচ্ছে - যখন ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ, অধিলোচন আর উপজীবন। কিছু গল্পের পরিসমাপ্তি আরেকটু জোরালো হতে পারতো। যেমন - পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর, পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না। অনেক লেখকের প্লট চমৎকার হলেও উপযুক্ত ভাষায় তা প্রকাশ করতে পারেন না (বা পাঠক তার সাথে একাত্ম হতে পারে না।) বিনিয়ামীন পিয়াস এ ব্যাপারে বেশ সফল। সহজ ও সাবলীল ভাষায় তিনি পাঠককে নিজের জগতে টেনে নিয়ে গেছেন। হরর, পরাবাস্তব বা উদ্ভট উপাদানের আড়ালে গল্পগুলোর মানবিক অংশ নাড়া দিয়ে যায়। লেখকের কাছ থেকে আরো ভালো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা রইলো।
সাড়ে তিন তারা। গল্পগুলো বেশ উপভোগ করলাম। আত্মহত্যা নিয়ে একটা গল্প আছে, অনেক সুন্দর। চোখ নিয়ে গল্পটা পড়ে ভয় পেয়েছি। কিছু গল্পে অপ্রয়োজনীয় ভায়োলেন্স আর শক এসেছে। আর কিছু গল্প আরেকটু ডেভেলপ করলে ভালো হতো, মনে হলো আইডিয়া পর্যায়ে রয়ে গেছে। আশা করি লেখক উপন্যাস নিয়ে কাজ করবেন। বড়ো পরিসরের লেখা ওনার হাত আর মাথাকে আরও চ্যালেঞ্জ করবে, আমরাও দারুণ কিছু পাবো আশা করি।
সংকলনে সব রকমের গল্পই থাকে। কিন্তু তারমাঝে এত বৈষম্য? "তখনও ডুবে নি পঞ্চমীর চাঁদ" এত অসাধারণ কনসেপ্ট কলমে এনেছেন এই জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাই।
তার চিন্তা ও কল্পনাশক্তি কতটা গভীর, কতটা প্রখর বুঝিয়েছেন " পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে" বা "পাগল ছাড়া দুনিয়া চলেনা " গল্পে। যতোই এক্সিকিউশন দূর্বল হোক না কেন৷ বাকি গুলো হয়তো আরো এভারেজ, বা তার থেকেও কম ভালো লেগেছে। কিন্তু ওই একটা গল্প দিয়ে লেখক আমার কিউরিয়াস লিস্টে যোগ হয়ে গেছেন, বই কতটা ভালো লেগেছে কি লাগেনি সেটা অনেক পরের হিসাব। তবে একটা অবসার্ভেশন থ্রিলার থেকে পরাবাস্তবে লেখকের হাত দারুণ খেলা দেখিয়েছে তুলনামূলক ভাবে৷ লেখকের জন্য শুভ কামনা।
গল্প সংকলন আমাকে খুব একটা টানেনা। এর কারণ ফেসবুকের অমুক তমুক ২০-২৫ জন বিখ্যাত (!) লেখকদের ছোটগল্প নিয়ে একসময় (২০১৭ সাল অব্দি) প্রচুর সংকলন বের হয়েছে যার বেশিরভাগেরই বেশি সংখ্যক গল্পই আমার খুবই বাজে লেগেছে। ফলাফল, গল্প সংকলন কেনা বাদ, পড়াও বাদ।
এরপরে দীর্ঘদিন পরে সুলতান ভাইয়ের রেকমেন্ডেশনে পড়লাম সুমন রহমান এর 'নিরপরাধ ঘুম'। বইটা এতই ভালো লেগেছিলো যে, আমি আবার গল্প সংকলনের পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী হলাম (বইটা নিয়ে বিস্তারিত রিভিউও দেয়া আছে)। সেটার জের ধরেই ২০২৪ বই মেলায় কিনলাম, বিনিয়ামীন পিয়াস এর ১৩টি ছোটগল্পের সংকলন 'পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর'। আজকে কথা বলবো এই বইটা নিয়েই। তবে যেভাবে বিস্তারিত রিভিউ দিই, এই বইটার ক্ষেত্রে সেটা দিচ্ছি না। কেন দিচ্ছি না সেটা শেষে বলছি।
এই বইতে সায়েন্স ফিকশন, ফ্যান্টাসি, পরাবাস্তব, থ্রিলার জনরার মোট ১৩টি ছোট গল্প আছে। শুরুর দিকে কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ে, বস্তুত ১ম গল্পটা শেষ করে আমি খানিকটা হতাশ হলাম। আবারও সেই একই ধাঁচের থ্রিলার, সেই ক্লিশে জিনিস। কিন্তু পরের গল্পেই লেখক আমাকে নড়ে চড়ে বসতে বাধ্য করলেন। গল্পটার নাম 'অধিলোচন'। সম্ভবত সবাই এই গল্পটাকে সংকলনের সেরা গল্প হিসেবে দেগে দেবেন। দেয়ার লজিকও আছে। দূর্দান্ত প্লট আর সুন্দর, সাবলীল লিখনশৈলীর এই গল্পটাকে সেরা না বলে আসলে উপায় নেই। তবে এই বইয়ের সেরা গল্প আমার কাছে 'তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ'। কারণ এই গল্পের যেই কনসেপ্ট এটা নিয়ে জীবনের একটা সময় আমি অনেক ভেবেছি। আমার ভাবনার এন্ডিংটাও এমনই ছিলো। এটা আর 'অধিলোচন' বাদ দিলে আমার কাছে পরবর্তী সেরা গল্প 'উপজীবন'। গল্পটা আমাকে লেখকের চিন্তাশক্তির ব্যাপারে খুবই উচ্চ ধারণা দিয়েছে। এরপরে ভালো লাগার গল্প বইয়ের নাম যে গল্পের, 'পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর'। গল্পের নাটকীয়তাটা আমার ভালো লেগেছে।
এরকম একে একে বইয়ের ১৩টি গল্পের মাঝে ১০টি আমার বেশ ভাল লেগেছে, ২টি লেগেছে এভারেজ আর একটি একদমই ভাল লাগেনি (১ম গল্পটা)। কবিতা কিংবা গল্প সংকলন পড়ার ক্ষেত্রে নিদেনপক্ষে ৫০% লেখা ভালো লাগলে আমি বইটাকে ভাল বলে স্বীকৃতি দিই। সেখানে এই বইটার ৭৫% লেখা আমার ভাল লেগেছে। সুতরাং যারা আমার বইয়ের সাজেশানের ওপরে ভরসা রাখেন তারা এই বইটা নিঃসন্দেহে দেখতে পারবেন (ছোট গল্প যারা ট্রাই করতে চান)। তবে আমি সাজেস্ট করবো বইটা কেনার আগে বইমেলায় গিয়ে একটা গল্প অন্তত পড়ে লেখকের লেখার মানের সাথে আপনার পাঠকমনের ক্ষুধার তুলনা করে নেবেন (বইমেলায় সতীর্থ প্রকাশনীর ৪৩৯ নাম্বার স্টলে বইটা পাবেন)। এবং এই কাজ করতে গেলে অবশ্যই ১ম গল্পটা পড়বেন না, অন্য যে কোন গল্প পড়বেন, এটা আমার পার্সোনাল চয়েসের বেসিসে বলা। ১১২টা পৃষ্ঠার ক্রাউন সাইজের বইয়ে একেকটা গল্প ৮-১০ পৃষ্ঠার৷ একেকটা গল্পের শব্দ সংখ্যা হবে ২৫০০+-। এই প্যাঁচালটা পারতেছি কারণ এই পিচ্চি বইটা আপনি চাইলেই আপনার ব্যাগে রেখে দিতে পারেন। বাসে, মেট্রোরেলে বসে টুক করে একটা গল্প পড়ে ফেলতে পারেন কারণ একটা গল্প পড়তে সর্বোচ্চ ৭-৮ মিনিট লাগার কথা। এরপর গল্পটা পড়ে বইয়ের মলাট বন্ধ করে জিনিসটা নিয়ে ভাববেন, দেখবেন ঢাকার জ্যাম, অশান্তি খানিকটা সময়ের জন্যে হলেও পালিয়ে গেছে।
চমৎকার সব ছোট গল্প দিয়ে ঠাসা এই বইটা আমার ধারণা পাঠকপ্রিয়তা পাবে। এর এখানে এসেই আমার মনে হয়েছে বইয়ের ব্যাপারে লেখককেও একটা সাজেশান দেয়ার প্রয়োজন আছে (এই সাজেশানটা লেখক চাইলে নাও নিতে পারেন)।
দূর্দান্ত এসব প্লট নিয়ে লেখা ছোট গল্পগুলোতে খুব বেশী লিখনশৈলী দেখানোর সুযোগ থাকে না, যতটা থাকে উপন্যাসে। তবু আমার ধারণা আপনার জনপ্রিয়তা আপনাকে উপন্যাস লেখার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করবে। তবে আপনি উপন্যাস প্রকাশ করার আগে পর্যাপ্ত সময় নেবেন প্লিজ। প্লটে আপনি উতরে গেলেও, লেখাও উতরে যেতে পারবেন কিনা এটা দেখার সুযোগ ছোটগল্পগুলো দেয়নি। অনেক লেখককেই দেখেছি, দূর্দান্ত ছোটগল্প লিখে ফেসবুক, ব্লগ কাঁপাতে পারলেও উপন্যাসে সেটার প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি। পাঠকদের চাহিদার মুখে একের পর পর উপন্যাস প্রসব করে গেছেন কিন্তু মানে নিজেকে ছাড়িয়ে না গিয়ে ঝরে গেছেন একটা মৃত তারার মত। আপনার ক্ষেত্রে এমন না হোক, সে কামনা থাকলো। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আপনি বাংলা সাহিত্যে আকাশে জ্বলজ্বলে তারা হবার যোগ্যতা রাখেন।
১ম প্যারার শেষ লাইনে বলেছিলাম, এই বইটার ক্ষেত্রে বিস্তারিত রিভিউ আমি দিচ্ছি না। কারণ আমার ধারণা এই বইয়ের প্লটগুলো এত উইয়ার্ড এবং এক্সক্লুসিভ সেটা সেটা নিয়ে এক লাইন লিখলেও পাঠকের সাথে অবিচার করা হবে। পড়েই দেখুন না, ভালো লাগবেই।
দুর্দান্ত একটা গল্প সংকলন। সবগুলো গল্পই অতিপ্রাকৃত, পরাবাস্তব বা সাইফাই জনরার। গল্পের নামকরণে আর কাহিনিতে লেখক নতুনত্বের পরিচয় দিয়েছেন। পাগল, কন্ট্রাক্ট কিলার, হিটলার, বিজ্ঞানী, পুঁথিপাঠ, সুন্দরী তরুণী, বৃষ্টি, স্বপ্ন, প্রেম, প্রতিশোধ, নিষ্ঠুরতা, ভবিষ্যৎ দেখা সবই খুব সুন্দরভাবে মিলেমিশে গিয়েছে চমৎকার এই সঙ্কলনে। সেরা গল্প "পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না" আর "ব্রাদার অফ প্রফেট"।
১৩টা ছোটগল্পের সংকলন। বেশিরভাগ গল্প মেলোড্রামাটিক। গল্পগুলোর আইডিয়া চমৎকার তবে দৈর্ঘ খুবই সংক্ষিপ্ত। 'ব্রাদার অভ প্রফেট' গল্পটা দারুণ। ইহুদিদের নিয়ে এভাবেও ভাবা যায়! আমার প্রিয় টপিক আত্মহত্যা নিয়ে 'তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ' গল্পে আত্মহত্যার এমন আশ্চর্য সুন্দর বর্ণনা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। 'অধিলোচন' গল্পটাও ভালো ছিল। ইস! বাস্তবে যদি আমার খারাপ গুণগুলো কেউ এভাবে প্রকাশ করে দিত! অন্য গল্পগুলো মোটামুটি। তবে গল্পগুলোর দৈর্ঘ আরেকটু দীর্ঘ হতে পারতো। লেখকের শব্দচয়ন চমৎকার। 'ব্রাদার অভ প্রফেট' গল্পটার জন্য লেখক ধন্যবাদ প্রাপ্য।
'অধিলোচন' 'তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ' 'পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না' ' উনসন্ধান' 'পৃথিবীর সব সুর থেমে গেল পর' 'খঞ্জরের খেলাঘর'। আপনারা এই বইটা পড়ার সময় এগুলোর থেকে যেকোনো একটা প্রথমে পড়বেন। একেবারে প্রথম গল্প পড়বেন না। আশাহত হবেন। কিন্তু এগুলোর একটা পড়লে আপনার বাকিগুলো পড়ার ইচ্ছা হবে আরো। বইয়ের সবচেয়ে সেরা গল্প তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ'।
লেখক যখন পূর্ব পরিচিত তখন এমনিতেই একটা বায়াস কাজ করে। তবুও, কিছু লেখক সে বায়াসের উর্ধ্বে চলে যান। পিয়াস সাহেব বায়াসের উর্ধ্বে উঠতে সফল।
বইয়ের কয়েকটি গল্প দুর্দান্ত লেগেছে, বাকিগুলোও সুন্দর কিন্তু প্রেডিক্টেবল কাহিনী। অনেকের মতে "অধিলোচন" ও "ব্রাদার অভ প্রফেট" বইয়ের শ্রেষ্ঠতম গল্প হলেও আমার কাছে "উপজীবন" গল্পটা সবচেয়ে ভাল লেগেছে। একটু ভিন্ন আঙ্গিকের লেখা। বইয়ের গল্পগুলোর পরিধি আরও বড় হতেই পারত, খুব সম্ভবত ফেসবুকের গল্প দেখে পরিধি ছোট।
আর প্রছদ নিয়ে কিঞ্চিৎ অভিযোগ আছে, এই বইয়ের প্রচ্ছদ আরও সুন্দর হতে পারত। আমার মতে, পরিধি বাড়িয়ে সুন্দর প্রচ্ছদে বেটার প্রোডাকশনে বইটা আবার বের করা উচিত।
তা প্রায় বছরখানেক আগের কথা, একজন কমলালেবু (নিহাব) ইনস্টাগ্রামে একটা ছোট্ট বইয়ের রিভিউ পোস্ট করে। বইটার নামটাই প্রথম দেখায় আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। অনেকটা কবিতার লাইনর মতন। পরবর্তীতে ঠিক করি যে এই বইটা কালেক্ট করে না পড়লেই নয়। কিন্তু এরপর একটা দীর্ঘ PAUSE. অতঃপর এই বছর হুট করেই কিনে ফেলি বইটা।
ছোট্ট ক্রাউন সাইজের বইটা সহজেই যেকোন জায়গায় ক্যারি করা যায়। বইটাকে বানিয়ে ফেললাম আমার যাত্রা সঙ্গী। ক্লাস করে বাসায় ফেরার পথে, অটোতে বসে পড়তে পড়তে আসি। অটোর ঝাকুনির সাথে মিলে আস্তেধীরে বেশ সময় নিয়েই শেষ করি ছোট্ট এই বইটা।
বইটাতে সর্বমোট ১৩ টি ছোটগল্প রয়েছে। ১১৩ পৃষ্ঠার বইটা পড়তে ক্লান্তি না বিরক্তি কখনই লাগে নাই। গল্পগুলা ঝড়ঝড়ে, আর উদ্ভট। পরবাস্তব, সাইন্সফিকশন, থ্রিলার, ইমোশনাল আরো বেশ কয়েক প্রকার মশলাপাতি দিয়েই পিয়াস ভাইয়া রান্না করেছন ছোট্ট এই বইটাকে।
গল্পের বই রিভিউ করা কঠিন কারণ একক ভাবে একে পরিমাপ করা যায় না। ১৩ টা গল্প ১৩ রকমের। কোন কোনটা খুব ভাল লাগছ, কোন কোনটা ভাল লাগে নাই আবার কোন কোনটা ঠিক ভাবে বুঝি নাই। এভাবেই শেষ করেছি বইটা।
আমি এই মুহুর্তে গাঁট বাধা এক রিভিউ দিয়ে যাচ্ছি, কারণ এই বইটা আমার আরো একবার পড়তে হবে। তবে এবার আর যাত্রা সঙ্গী করব না। বাসায় বসে আরামস পড়ব। এবং পড়া শেষে চেষ্টা করব সঠিক বাটকারা দিয়ে পরিমাপ করতে।
এটি লেখকের প্রকাশিত প্রথম বই।বইয়ের বিশেষত্ব হলো প্রতিটা গল্পই একটি থেকে অন্যটি ভিন্ন।যার মধ্যে অতিপ্রাকৃত,সাই-ফাই ও পরাবাস্তব ব্যাপার গুলো প্রকাশ পেয়েছে।সব গল্পের মিল একজায়গায় তা হচ্ছে সবগুলো গল্পই উদ্ভট।
অটোগ্রাফ থেকে ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়া,একজনের শরীরে শুধু নিজের আসল চোখ দুটো নেই এছাড়া শরীরে রয়েছে হাজার হাজার চোখ যা দিয়ে তিনি আপনার অতীত দেখতে পারেন,একজন নিয়মিত আপনার স্বপ্নে প্রবেশ করছে অথচ শুধু প্রবেশেই সীমাবদ্ধ এর বাইরে কি কোন কিছুই নয়?
ছোট গল্প সংকলের এই বইটায় মোট তেরোটা গল্প প্রকাশ পেয়েছে।গল্পগ্রন্থের সবকয়টি গল্প যে দুর্দান্ত তা নয়।কিন্তু এটি ভিন্ন ধরনের বই।"অধিলোচন" এবং "পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না" এই দুটি গল্প আমার কাছে দারুণ লেগেছে।ছোট্ট একটা বই ক্রাউন সাইজের।এক বসায় পড়ে ফেলবার মতো।
বিনিয়ামীন পিয়াসের লেখা আমি প্রথম পড়েছি বইঘর অ্যাপে। ওখানে তার তিনটা ইবুক আছে। এরপর দেখলাম এই বইটা প্রকাশিত হলো। ওই ইবুকগুলো পড়েই মূলত তার লেখা ভালো লাগে৷ কিন্তু এই বইতে সেই ভালো লাগাটা আরো পূর্ণতা পেয়েছে। একদমই ভিন্নধরণের প্লট, আজগুবি সব গল্প কিন্তু পড়তে বেশ ভালো লেগেছে৷ অধিলোচন, আমি পাই না খুজে তোমায়, ঊনসন্ধান গল্প তিনটি আমার হিসেবে এই বইয়ের সেরা তিন। দুইটি গল্প বাদে বাকি সবগুলো গল্প পড়েই অভিভূত হয়েছি।
এইবারের মেলায় এটি আমার পড়া সেরা ১০ টি একক গল্প সংকলনের মধ্যে থাকবে। অসাধারণ ১৩টা গল্পের সংকলন। কোনটা ভয়ের, কোনটা ফেন্টাসি , কোনটা অতিপ্রাকৃত , কোনটা আবার পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু মানুষের মনকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন স্বাদের গল্পগুলি ভাবনার খোরাক ও যোগায়। লেখকের কাছে আরো এরকম গল্পের আশা রইলো।
কেমন হয় যদি আপনি কারো সম্পর্কে চিন্তা করলে আপনার মানসপটে ত���র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, তার ভবিষ্যত কিংবা মৃত্যুক্ষণ ভেসে ওঠে? প্রিয়জন হারানোর বেদনায় আপনার মস্তিষ্ক একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনকিছু স্মরণ করতে সক্ষম না হয়, অথবা পৃথিবীর সব সুখ আপনি ইতোমধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন বিধায় আর বেঁচে থেকে সুখটাকে বিনষ্ট করার আকাঙ্খা প্রকাশ না করেন? ঘুমের ভেতর রহস্যময় ব্যক্তির সাথে দেখা হওয়া কিংবা ভবিষ্যত অথবা অতীতের মানুষ এক বৃত্তে এসে মিলেমিশে একাকার হওয়া- সবই জট পাকিয়ে এক মিশেল তৈরী করেছে।
বইটিতে মোট ১৩ টি গল্প রয়েছে।
১. অটোগ্রাফ: পুরাতন বইয়ের ভাঁজে পাওয়া হুমায়ূন আহমেদের একটি অটোগ্রাফ। অটোগ্রাফের তৎকালীন মালিক 'তুতুন' নামের ছোট্ট মেয়েটির বর্তমান জীবন কেমন হতে পারে তা নিয়ে ভাবছেন হামিদ। কিন্তু ঘুমানোর পর তার স্বপ্নে এক বিভৎস খুনের দৃশ্য ফুটে ওঠে। একজন নারী এবং একটি বাচ্চা মেয়ে খুন হবে, তাদের পরিচয়ও যেন হামিদের কাছে স্পষ্ট। ট্রিপল নাইনে কল দেয়ার পরও কোন উল্লেখযোগ্য সাহায্য পায়নি এবং ঠিক তার দিন তিনেক পর একই উপায়ে খুনটি হয়। আর পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছোট করে লেখা, "রাজধানীতে চাঞ্চল্যকর খুন, মা-মেয়ের গলাকাটা লাশ উদ্ধার।"
২. অধিলোচন: একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হয়েও ডাক্তারি পেশায় না যাওয়াটা কিছুটা অস্বাভাবিক বৈকি। এর পেছনে রয়েছে একটি অদ্ভুত গল্প। একজন রোগী; রোগ শুরু হওয়ার পর থেকে যতজন ব্যক্তি তার সাথে দেখা করতে আসে, তার দেহ থেকে একটি করে চোখ গজাতে থাকে এবং সেই চোখ যেন সম্মুখের ব্যক্তির অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব ভেদ করে বের করে আনে প্রকাশিত অপ্রকাশিত সকল সত্য। রোগাক্রান্ত ছেলেটির বাবা তাকে নিয়ে যান ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতি এ অস্বাভাবিকতা মেনে নিতে পারেনি। সকল সত্য প্রকাশ প্রকৃতি মেনে নেয় না। তাই চিহ্ন বিলীন করে আত্মগোপন করে সাত বছর কাটানোর পর ফিরে আসেন গল্পকথক এবং নিজের শরীরে প্রবেশ করান ছেলেটির রক্ত। তিনি হয়তো এখন দেখতে পাচ্ছেন আপনার অতীত-ভবিষ্যতও!
৩. স্মৃতিরাও ফিরে আসে: ঘুম ভেঙে নিজেকে এক অপরিচিত জায়গায় আবিষ্কার করা, কিন্তু ভ্রম হয় যেন তা অতি পরিচিত। সত্যি নাকি শুধুই দেজা ভ্যু! মনে পড়ে তার স্ত্রী লিজার কথা যার সাথে সে ঘুরতে বেরিয়েছিল। এরপর সবকিছু অস্পষ্ট। মফস্বলের নির্জন রাস্তা আর বিপদ, ভয় - সবকিছু মনে পড়তেই রক্তে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিশোধের উত্তাপ। তাজা মাংসের স্তুপ থেকে আস্তে আস্তে বস্তা ভর্তি করা শুরু করে। অপরাধীদের শাস্তির দায়িত্ব সে নিজের ঘাড়ে তুলে নেয়াই শ্রেয় মনে করেছে।
৪. তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ: 'সুখ' এর সংজ্ঞা চাইলে একেকজনের কাছে তা একেকভাবে প্রতীয়মান হবে। কিন্তু জগতে নির্ভেজাল, নির্ঝন্ঝাট জীবন থাকার পরও জামিল মিয়া কেন আত্মহত্যা করলো, পুরো গ্রামবাসীর কাছে তা এক রহস্য। কৌতূহল মেটাতে অন্তর্ধান রহস্য সমাধানে নামলো এক যুবক। কিন্তু সে-ও একই পরিণতির সম্মুখীন হলো। কিন্তু কেন? জগৎ কি সুখ সইতে পারেনা? নাকি আমরাই সুখকে দুঃখে রূপান্তরের ভয় পাই?
৫. পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না: কাছের বন্ধুর মানসিক ভারসাম্যহীনতায় পতিত হওয়া মেনে নিতে বেশ কষ্ট হলেও কিছুদিন পরপর পাগল বন্ধুর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কৌতূহল কাজ করে গল্পকথকের। কারণ উদঘাটনে কোমর বেঁধে নামলে জানতে পারে এ কোন পাগলের কাজ নয়, বরং এই পুরো গোষ্ঠীটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে ৩য় এক পক্ষ- আলখাল্লা পরিহিত এক ব্যক্তি। গল্পকথকের উপস্থিতি, উদ্দেশ্য কোনকিছুই তার অজানা নয়। কি তাদের উদ্দেশ্য এ সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়না। তার আগেই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।
৬. আমরা সবাই একসাথে একা: বিয়ের সাজ নিয়ে প্রেমিক আশরাফকে বিয়ে করতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় অর্থি। কিন্তু সময়ের গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে যায় দুজনই। আশরাফ অর্থির চিঠি পায় ঠিকই, অন্য কোন সময়ের গল্পে।
৭. ঊনসন্ধান: একজন বৃদ্ধ লোক যিনি কিনা রিকিতার স্বপ্নে প্রতিদিন হানা দেন, কিন্তু কখনো স্পষ্ট কোন কারণ ব্যাখ্যা করেননি। কিন্তু আশ্চর্য কোন কারণে একদিন হঠাৎ স্বপ্নে আসা বন্ধ করে দেন, যার পেছনে কারণ ব্যক্তির মৃত্যু। তিনি শুধু একটু গল্প করতে চেয়েছিলেন।
৮. আমি পাইনা খুঁজে তোমায়: ভাবুন তো, আপনার জীবনে প্রেম এলো। এমন একজন ব্যক্তি যাকে কেবল আপনিই দেখতে পান, কারো সাথে তার দেখা হয়নি, কিংবা সে আপনাকে তার যে নাম, পরিচয় জানিয়েছে সেই নামে কেউ ছিলই না, যে ঠিকানা দেয়া হয়েছে তাতেও এমন কোন ব্যক্তি কোনদিন বাসই করেনি। তার কয়েক যুগ পরে হাবিবের বয়স বেড়েছে ঠিকই আর অনুরিক্তা যুবতীই রয়ে গেছে। ভাগ্য তাদের টেনে এনে এক সুতোয় বেঁধেছে। বর্তমানে কাহিনীর টানাপোড়নে দেখা তাদের হয় ঠিকই, কিন্তু এমন অবস্থায় যা হয়তো দুজনের কেউই আশা করেনি।
৯. পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর: এ গল্পটির উপস্থাপনা সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে। আধুনিক পুঁথির ভাঁজে ভাঁজে এক পরাবাস্তবিক গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অন্য এক গ্রহের প্রাণিরা আসে বিনোদনের প্রয়োজন মেটাতে পৃথিবী থেকে কেবল একজন শিল্পীকবি নিতে। কিন্তু সে যাওয়ার সাথে সাথে যে পৃথিবীর সব গান, সুর, তাল, ছন্দ থেমে যাবে তা কে জানতো!
১০. উপজীবন: রাতের তিনটার সময় কল করে যত ইন্টারেস্টিং গল্পই শোনানো হোক, তা যে কারোর বিরক্তির উদ্রেগ ঘটাতে সক্ষম। আর গল্প যদি হয় এক সিরিয়াল কিলারের, যা কিনা গভীর রাতে গাঁজাখুরি গল্প ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না, তবে তো কথাই নেই। সে দাবি করে তার দুটি বাড়ি, দুটি ভিন্ন পরিবার, ২য় পরিবারের ব্যাপারটা তার সম্পূর্ণ অজানা ছিল। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে সেখানে কোন পরিবর্তনই ঘটেনা। কাহিনীর পরিক্রমায় লেখক এমন সত্য জানতে পারেন, যে সত্য হয়তো গোপন থাকাই শ্রেয়।
১১. অ-নর: এটি একটি সায়েন্স ফিকশন ছোটগল্প। পছন্দের মানুষের নামে নিজের তৈরীকৃত রোবটের নাম রাখা হয় মৃতিমায়া। এর পেছনে ফারাতিনের উদ্দেশ্য ছিল, মানুষকে অনুভূতির উর্ধ্বে তোলা। মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাকে বিনষ্ট করতে পারলে তাদের পক্ষে অনেক উন্নতি সাধন সম্ভব। কিন্তু বায়োবট মৃতিমায়ার হাতেই ক্রিয়েটর ফারাতিনকে প্রাণ খোয়াতে হলো, নাহয় ক্রিয়েটর জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতোনা।
১২. খঞ্জরের খেলাঘর: মানুষকে নিয়ে পুতুলখেলা খেলানো হয়েছে এ গল্পে। কালো স্যুটধারী তার ইচ্ছানুযায়ী যাকে যেভাবে ইচ্ছা নাচিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু ফলাফলস্বরূপ অংশগ্রহণকারীদের দেয়া হয়েছে কেবল দুঃখ এবং যন্ত্রণা। এ যেন রূপকার্থে বর্তমান সমাজব্যবস্থাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
১৩. ব্রাদার অফ প্রফেট: লেখকের নাম 'বিনিয়ামীন' কেন হলো। এর পেছনে রহস্য সৃষ্টি করে, চরিত্রের অবতারণা, আবার বিলুপ্তি ঘটিয়ে এ গল্প রচিত হয়েছে। হিটলারের ইহুদীবিদ্বেষ মনোভাবকে গল্পে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন ঠিক 'হেরে গিয়ে জিতে যাওয়া'র মতো। এমন গল্প আগে পড়িনি। কন্সেপ্ট ভালো লেগেছে।
ছোট্ট একটা বই। প্রতিটি গল্পের মধ্যে ভিন্ন ধাচের কিছু দেয়ার চেষ্টা করেছেন লেখক। কিন্তু বইটি পড়ার সময় 'লেখা গল্প পড়া'র চেয়ে কেউ গল্প বলছে, আমি শুনছি -এমন অনুভূত হয়েছে। বেশিরভাগ কাহিনীই যেন আগে শোনা। প্রায় সব গল্পই সেই রহস্য করা, শুধু শুধুই ক্লিফহ্যাঙ্গারে ঝোলানো হয়েছে। মেশানো হয়েছে রহস্য, রোমাঞ্চ, পরাবাস্তবিকতার অনুভূতির স্বাদ। লেখনী খুব অপরিপক্ব লেগেছে। ফ্ললেসভাবে পড়তে পারছিলাম না। ব্রাদার অফ প্রফেট গল্পটি ভালো লেগেছে। বাকিগুলো এভারেজ।
প্রোডাকশন ও অন্যান্য: সতীর্থ'র প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারছি না। পেজগুলো বাঁকা বাঁকা হয়ে আছে। ছোট বই হওয়া সত্ত্বেও দুহাত দিয়ে ধরে না পড়লে অসুবিধায় পড়তে হয়। তাই এ দিকটা উন্নতি করার অনুরোধ থাকবে। প্রচ্ছদটা সিম্পল, দেখতে সুন্দর।
পার্সোনাল রেটিং- ২.৫/৫ বই: পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর লেখক: বিনিয়ামীন পিয়াস প্রকাশনী: সতীর্থ প্রকাশনা প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ মূদ্রিত মূল্য: ২৫০/-
This entire review has been hidden because of spoilers.
"আষাঢ় মাসের কিচ্ছা কমু, শুনতে যদি চান পোষা খরগোশের মতোন খাড়া করেন কান।"
'আষাঢ়ে গল্প' তেও যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করা যায়, তারই চেষ্টা বোধয় করেছেন লেখক বিনিয়ামীন পিয়াস। আর সে চেষ্টার নাম দিয়েছেন 'পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর'। বইটা একটা গল্প গ্রন্থ। আরও নির্দিষ্ট করে বললে তেরোটি ছোট গল্পের সংকলন।
• বইটা নিয়ে আলোচনার শুরুতেই বলবো এর গল্পগুলোর প্লট নিয়ে। আমার মতে লেখকের 'প্লট আইডিয়া' এই বইটার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। কেমন? উদাহরণ দিয়ে বলছি।
• নীলক্ষেত থেকে স্বল্পমূল্যে একটা বই কিনেছে হামিদ। বইটার ভেতর হুমায়ূন আহমেদের অটোগ্রাফ। লেখা, "তুতুনকে অনেক ভালোবাসা।" সেই রাতে হামিদ তুতুনকে ভয়ানক এক স্বপ্নে দেখতে পায়। ইন্টারেস্টিং না? গল্পের নাম 'অটোগ্র��ফ'। হামিদ স্বপ্নে কি দেখেছে, তা নাহয় পাঠক নিজেই জানবে। আমরা অন্য গল্পে চলে যাই। • • গল্পের নাম 'তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ'। প্রকৃত সুখী এক লোক, তার পরিবারের প্রতিটা সদস্য সুখী, তার মতো সুখী সারা গ্রামে নেই, সে একদিন গলায় দড়ি দিলো। কেন? এই কেন'র উত্তর যারা জীবনানন্দের এই কবিতাটা পড়েছেন তারা একটু ভাবলেই পেয়ে যাবেন। এখানে লেখকের কবিতাকে নিয়ে 'বিশ্লেষণ দৃষ্টি' আমাকে অবাক করেছে। কবিতার দু'লাইনের উপমাকেও যে গল্পের প্লট আঁকারে প্রকাশ করা যায় কখনো ভাবিনি। • • এমন আরেকটা ভিন্ন চিন্তার গল্প বলি। নাম 'পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না'। গানটা নিশ্চয়ই শুনেছেন কোথাও না কোথাও। কিন্তু কখনো কোনো পাগলকে কৌতূহলবসত পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন কি? সারাটাদিন পাগলেরা পাগলামি করে রাতে কোথায় উধাও হয়ে যায়? উত্তর খুঁজতে গল্পকথক রাতে পিছু নিলেন তার পাগল বন্ধুর। পিছু নিয়ে কী দেখলেন তিনি? • • চলে যাই বইটার নাম গল্পে। 'পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর'। কী হবে পৃথিবীর সকল সুর থেমে গেলে? বিষয়টার পূর্বাভাস দিতে গ্রামের মানুষকে জড়ো করেছেন নেয়ামত। সবাকেই পুঁথি পড়ে শোনাবেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ পুঁথি কেন? গ্রামের মানুষের মাঝে কৌতূহল। এ গল্পে পুঁথিশিল্প নিয়ে লেখক যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন, তা প্রশংসার যোগ্য। পাশাপাশি গল্পে লেখা পুঁথিগুলোও ভালো লেগেছে। এ অংশগুলো আমি পুঁথি পাঠের মতো করেই পড়েছি। • • একইভাবে আছে, 'উনসন্ধান'-এ রিকিতা কেন প্রতিদিন স্বপ্নে একজন অপরিচিত মানুষকে বারবার দেখে কিংবা একজন সিরিয়াল কিলারের একই সময়ে একইসাথে দুই সমান্তরালে অবস্থান নিয়ে গল্প 'উপজীবন' এবং 'ব্রাদার অভ প্রফেট' গল্পে হিটলারের ফিরে আসা নিয়ে কথা।
• তবে সবগুলো গল্পই যে একইরকম ভালো লেগেছে এমনটা নয়। যেমন: 'আমরা সবাই একসাথে একা', 'আমি পাইনা খুঁজে তোমায়' গল্পদুটির বুনন ভিন্নভাবে হলেও মূল প্রেক্ষাপট একই ধাঁচের লেগেছে। 'অ-নর' গল্পটাও পাঠকমহলে পরিচিত হওয়ার কথা, এখানে তার পরিবেশনা ভিন্ন। 'অধিলোচন' গল্পটা গায়ে কাঁটা দেয়ার মতো একটা অনুভূতি সৃষ্টি করেছিলো। 'ট্রাইপোফোবিয়া'য় আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে তো আরও বেশি অদ্ভুত লাগবে।
আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্প 'খঞ্জরের খেলাঘর'। "Karma hits back." তথাকথিত এই বাক্যটাই মাথায় এসেছে গল্পটা পড়ে। সমাপ্তি গল্প এটাই দেয়া দরকার ছিল বলে আমি মনে করি।
এবার একটু নেতিবাচক বিষয় নিয়ে আলোচনা করি।
নেতিবাচক বলতে আমি শুধু সংলাপ এর কথাই উল্লেখ করবো। লেখকের লেখনশৈলী ভালো। যদিও লেখার অভ্যাস বহাল থাকলে আরও উন্নতি করা সম্ভব। তবে তার চেয়ে বেশি লেখককে সংলাপ লেখায় মনযোগী হতে হবে। ভিন্ন ভিন্ন ধাঁচের সবগুলো গল্পেই যেহেতু পরাবাস্তবতার ছাপ আছে, স্বাভাবিকভাবেই গল্পের চুম্বকাংশে একটা সাসপেন্স বজায় থাকে। দীর্ঘ সংলাপ সেই সাসপেন্সের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কয়েকটা গল্পে দীর্ঘ সংলাপের ব্যবহার একটু অদ্ভুত লেগেছে। উদাহরণস্বরূপ, 'আমরা সবাই একসাথে একা' গল্পে দোকানদার আশরাফকে সরাসরি পনেরো বছর আগের কথা ভূমিকা ছাড়াই বলতে শুরু করে দিলো। অথবা 'আমি পাইনা খুঁজে তোমায়' গল্পে হাবিব যখন ঠিকানা মাফিক অনুরিক্তাকে খুঁজতে গেল, তখন সেই ঠিকানায় থাকা মহিলা বললেন, "বাহ, বেশ সুন্দর নাম তো।" অপরিচিত একজনের সাথে প্রথম সংলাপ এমন হলে অদ্ভুত লাগতে পারে। একই গল্পে সায়েমকে যখন অনুরিক্তা মামার কথা জিজ্ঞেস করলো, তিনি কোথায় থাকেন? তখন সায়েম একটা দীর্ঘ সংলাপে মামার যাবতীয় বর্ণনা দিয়ে দিলো। এক্ষেত্রে সংলাপটা দ্বিপাক্ষিক রাখলে হয়তো আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকতো না। সংলাপের এ বিষয়টা লেখকের গল্প বলার গতিকেও প্রভাবিত করেছে। লেখক চাইলেই কিছু গল্প আরও ধীর গতিতে শেষ করতে পারতেন। তবে যেহেতু 'আষাঢ়ে গল্প' হিসেবে পড়েছি, তাই পাঠক হিসেবে এ বিষয়ে বড় কোনো অভিযোগ নেই।
• লেখার বাইরেও বইটার প্রচ্ছদ নিয়ে যদি বলি, প্রচ্ছদের কালার কন্ট্রাস্ট আরও ভালো করে ফুটে উঠতো যদি বইটার জ্যাকেট আরও শক্ত হতো। এক্ষেত্রে দায়টা প্রকাশনীরই। প্রচ্ছদশিল্পী পরাগ ওয়াহিদ ভাইয়ার যতগুলো প্রচ্ছদ আমার দেখা সবই ভালো লাগার মতো। উনি প্রচ্ছদে ডিটেইল ভালো রাখেন। আবার অল্প চিত্রেও অনেক ইঙ্গিত রাখেন। 'পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর' বইটার প্রচ্ছদে আমরা দেখতে পাই কেবল সবুজ রঙ্গা আকাশে সাদা একটা চাঁদ। আকাশের রঙ সবুজ, সেটা কি বইটায় গল্পগুলো পরাবাস্তব বলে কিনা জানি না। তবে সাদা চাঁদের বিষয়টা হয়তো বুঝতে পেরেছি। 'তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ' গল্পে আমরা দেখতে পাই, চাঁদের আলোতে আলোকিত এক রাতে একজন সুখী মানুষ নিজের জীবন ত্যাগ করলেন। গল্পের মূল আকর্ষণ তখন চাঁদ। 'পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না' গল্পে গল্পকথক তার বন্ধুর পিছু নিতে গিয়ে কী দেখলেন? রক্তিম চাঁদ। নাম গল্পের নেয়ামত তার পুঁথিতে বলে দুই চাঁদের কথা। আবারো গল্পে 'চাঁদ'। তাছাড়া আকাশে চাঁদ মানেই রাতের ইঙ্গিত। বইয়ের বেশ কয়েকটা গল্পই রাতের সময়টাকে ইঙ্গিত করে। তাই রাত ও চাঁদের এই বিষয়টার জন্য প্রচ্ছদটা একদম পারফেক্ট। তাছাড়া বইটার নাম বড়, তাই এই সাইজের বই বিবেচনায় শুধুমাত্র চাঁদের চিত্র দিয়ে প্রচ্ছদ তৈরি করে প্রচ্ছদশিল্পী বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন।
আলোচনা আর বড় করছি না। লেখক যেহেতু সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হয়ে পাঠককে প্রতিক্রিয়া জানাতে বলেছেন, তাই খুঁটিনাটি যা চোখে পড়েছে, উল্লেখ করেছি। লেখকের জন্য শুভকামনা রইলো। আশা করি তিনি ভবিষ্যতে আরও দারুন সব লেখা দিয়ে আমাদের চমকে দিতে পারবেন।
• ব্যক্তিগত রেটিং: ৩.৭৫/ ৫
• বই: পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর • লেখক: বিনিয়ামীন পিয়াস • প্রকাশনী: সতীর্থ প্রকাশনা • ধরণ: গল্পগ্রন্থ • প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১২ • মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা
"পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" নামখানা আমার মনে বেশ আগ্রহ জন্মায়। ছোট গল্পের সংজ্ঞায়ন করার প্রয়োজন নেই, তবে ছোটগল্পের উদাহরন হিসেবে গল্পগুলোকে নির্দ্বিধায় উল্লেখ্য করা যায়। প্রতিটি গল্প যেনো একেকটা নিজস্ব চিন্তাধারার চিত্রায়ন, যেখানে কল্পনার ঘুপচির গভীরে অনেক প্রশ্ন, নতুবা ঘোর আধার। কোথাও মনুষ্য চিন্তা নিয়ে খেলা, কোথাওবা মানুষকে চিন্তা করানোর খেলা। গল্পগুলোকে "উদ্ভট" নাম দেয়া যায় তবে গল্পগুলো আগ্রহৌদ্দীপক বটে।
লেখক সম্পর্কে আমি অজ্ঞ, তাই বইটি হাতে নিয়ে তেমন একটা আশা রাখিনি, উপরন্তু লেখকের প্রথম বই তাই আরো তেমন কিছু ভাবিনি। বইটি ক্রাউন সাইজের এক বসায় পড়ে ফেলার মত। প্রতিটি গল্প দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বেশ ছোট হলেও লেখনি ও চিন্তার গভীরত্বে বেশ অন্যরকমের। ভিন্ন স্বাদের ১৩ টি গল্পের কোনোটাই নিরাশ করার মত নয়, তবে কিছু গল্প মনে দাগ কাটার মত ছিলো যা পড়ে বেশ লেগেছে।
পছন্দের গল্পের মধ্যে অধিলোচন, পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না, উপজীবন বেশ ভালো লেগেছে। অ-নর গল্পটা সাইফাই ধাচের প্লট কিছুটা প্রেডিক্টেবল ছিলো কিন্তু মন্দ নয়। ব্রাদার অব প্রফিট গল্পটা যেনো লেখক অনেক কিছু লিখতে গিয়ে কিছুটা কনফিউশান এ পরে গেলেন, শেষটা কেন জমলো নাহ। তখনো ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ গল্পে মেইন প্লটখানা যেনো অসম্পূর্ন ই রয়ে গেলো। বাকি গল্পগুলো তুলনামূলক উপভোগ্য।
অটোগ্রাফের মাধ্যমে ভবিষ্যত, বায়োবট, আত্মহত্যা, টাকার খেলা খেলানো, পাগলের কারবার কিংবা স্বপ্ন, সবগুলো গল্পের চ��ন্তাধারায় লেখকের সৃজনশীলতা উপস্থিত এবং প্রতিটি চরিত্রের ভূমিকা পালন ও মেদহীন লেখনি প্রশংসার প্রাপ্য৷ গল্পগুলো আরো উন্নত হবে আশা করা যায়। লেখকের জন্য রইলো শুভকামনা।
বইটিতে লেখকের মোট ১৩ টি গল্প স্থান পেয়েছে । লেখকের কথায় লেখক বলেছেন, “১৪৩০ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলাম ত্রিশ দিনে ত্রিশটা গল্প লিখব। প্রজেক্টের নাম দিলাম ‘আষাঢ়ে গল্প’। যদিও শেষমেশ গল্প লিখেছিলাম চব্বিশটা, সেখান থেকে বাছাই করা তেরোটা গল্পই মূলত এখানে ঠাঁই পেয়েছে।”
একজন নতুন লেখকের এই প্রজেক্ট, এই ইচ্ছা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। প্রজেক্টের নামের স্বার্থকতা বজায় রাখতে লেখক প্রায় সব গল্পেই রেখেছেন পরাবাস্তবতার ছাপ।
মোট ১৩ টি গল্পের প্রত্যেকটিকে নিয়ে আলোচনা করা আমার কাছে সমীচীন মনে হয়নি। আমার কাছে এই সংকলনের সবচেয়ে ভালো গল্প লেগেছে ‘অধিলোচন’। এরপরে যথাক্রমে ‘অ-নর’ এবং ‘খঞ্জরের খেলাঘর’। তবে সবচেয়ে দুর্বল গল্প বলে মনে হয়েছে ‘পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না’ এবং ‘ঊনসন্ধান’।
সংকলনটির গল্পগুলো কখনোবা সায়েন্স ফিকশন কিংবা পরাবাস্তব। গল্পগুলো অধিকাংশ অদ্ভুত কিংবা উদ্ভট সায়েন্স ফিকশনের বেশিরভাগ গল্পগুলো সাধারণত এরকমই হয়।
‘অধিলোচন’ গল্পের রোগটা বেশ অদ্ভুত হলেও বালকটির বিশেষ ক্ষমতা ছিল দারুণ। শেষের টুইস্টটা অসাধারণ লেগেছে। আবার, ‘অ-নর’ গল্পটিতে পাওয়া যায় সায়েন্স ফিকশনের স্বাদ। বর্তমানে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে এগিয়ে চলেছে তাতে ভবিষ্যতের ‘অ-নর পৃথিবী’ অবাস্তব বলে মনে হয় না। ‘খঞ্জরের খেলাঘর’ গল্পটির প্লট বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল।
‘পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না’ গল্পটির প্লট বেশ দুর্বল মনে হয়েছে। গল্পটিতে সেরকম কোনো টুইস্ট খুঁজে পাইনি। ‘ঊনসন্ধান’ গল্পটি প্রথমদিকে ইন্টারেস্টিং লাগলেও এন্ডিং সেরকম ভালো লাগেনি।
বইটি লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই। এর আগেও লেখকের বেশ কিছু ই-বুক প্রকাশিত হয়েছে। ‘অধিলোচন’, ‘অ-নর’, ‘ খঞ্জরের খেলাঘর’ ও ‘আমি পাই না খুঁজে তোমায়’ গল্পে লেখকের লিখনশৈলী ভালো ছিল। তবে কিছু গল্পে মনে হয়েছে লেখক প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই লিখেছেন। যেমন, ‘তখনো ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ’ এ শেষ অংশে লেখক সামান্য বেশি লিখে ফেলেছেন।
যাইহোক, একটি সংকলনে ভালো খারাপ উভয় প্রকার গল্প থাকবেই। তবে নতুন লেখক হিসেবে লেখকের লিখনশৈলী যথেষ্ট ভালো ছিল। আশা করা যায় লেখক সামনে আরো ভালো বই লিখতে পারবেন।
বইটির সম্পাদনা বেশ ভালো ছিল। সেরকম কোনো বানান ভুল ছিল না। বাধাই, কাগজের মান বেশ ভালো ছিল। তবে ডাস্ট কভারটি আমার কাছে হালকা লেগেছে। এটিকে আরেকটু শক্ত করলে ভালো হতো বলে মনে করছি। প্রচ্ছদটি মোটামুটি মানের, তবে বইটির আরেকটু ভালো প্রচ্ছদ প্রাপ্য।
বই: পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর লেখক: বিনিয়ামীন পিয়াস প্রকাশনী: সতীর্থ প্রকাশনা ধরন: ছোটগল্প সংকলন প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ মূল্য: ২৫০ টাকা।
এক.
বিনিয়ামীন পিয়াস। একজন গল্পকার। বিনিয়ামীন পিয়াস ভাইয়ের সাথে নানা পোষ্টে একধরনের মিউচুয়াল রেসপেক্টের বৃত্তে আবদ্ধ থেকেই কমেন্ট আদান-প্রদান হয়। পরিচয় বলতে এটুকুই। তাই একজন নতুন লেখককে পড়তে তার প্রথম প্রকাশিত (ই-বুক ছাড়া) বই "পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" সংগ্রহ করা। কিছুটা পরিচিতি থাকলে একধরনের চাপও থাকে পাঠ-পতিক্রিয়া প্রকাশে। পড়ার সময় প্রত্যাশা থাকে ভালোলাগার, কিন্তু সেটা যদি বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয় তখন নিজের মধ্যেই একটা দ্বিধা কাজ করে। শুধুমাত্র লেখা প্রকাশের মাধ্যমেই পাঠকের মন জয় সম্ভব না। লেখকের আত্ম-প্রকাশ এবং তার লেখনীর মাধ্যমে যে আত্ম-উন্মোচন- সেটা পাঠকের আলোচনায় কতটুকু আনতে পারছে বা আদৌ সেটা আনার উপলক্ষ্য তৈরী করছে কিনা সেটাও দেখার বিষয়।
একটা বই পড়ে পাঠলব্ধ ধারণার বাইরেও কিছু ধারনা থাকে। কিছু ক্রাইসিস থাকে। সেগুলোকে ডিল করাটাও একটা কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায় পরিচিতির কারনে। তারপরেও আমি যথাসম্ভব সহৃদয়তা প্রকাশের মাধ্যমেই চেষ্টা করব তুলে ধরতে আমার পাঠ-প্রতিক্রিয়া। ঘটনাপরম্পরা নিয়ে কথা বলাটাও শ্রেয় মনে হয়েছে আমার নেতিবাচক কোন মন্তব্য করার পূর্বে। তাই সবগুলো গল্প আলোচনায় না এনে কিছু গল্প এবং সামগ্রিক একটা চিত্র তুলে ধরার প্রয়াশ মাত্র।
দুই.
"পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" বিনিয়ামীন পিয়াসের ১৩ টি গল্পের সংকলন। গল্পের আলোচনায় যাবার আগে বইয়ের ভূমিকার পরে "লেখকের কথা" থেকে কিছু অংশ তুলে ধরি। এই পার্টটা আলোচনায় আসবে আবারও।
লেখকের কথা:
"১৪৩০ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসের প্রথম দিনেই হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলাম ত্রিশ দিনে ত্রিশটা গল্প লিখব। প্রজেক্টের নাম দিলাম"আষাঢ়ে গল্প"। যদিও শেষমেশ গল্প লিখেছিলাম চব্বিশটা, সেখান থেকে বাছাই করা তেরোটা গল্পই মূলত এখনে ঠাঁই পেয়েছে। প্রজেক্টের নামের স্বার্থকতা বজায় রাখতেই প্রতিটা গল্পে খানিকটা পরাবাস্তবতার ছাপ রয়েছে।"
"পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" নামের গল্পটি এই সংকলনের সবচেয়ে দুর্বল গল্প বলেই আমি মনে করি। এবং তারপর "অ-নর" গল্পটি। এগুলো নিয়ে তাই বিশেষ কোন আলোচনায় যাচ্ছি না। ১৩ টা গল্পের আলাদা আলাদা আলোচনাও সময়সাপেক্ষ।
আমার কাছে "ব্রাদার অফ প্রফেট" এই সংকলনের সবচেয়ে ভালো গল্প। মানে ১৩ এর মধ্যে সবচেয়ে পলিশড এবং ধারালো গল্প হিসেবে এটাকেই রাখবো। "অটোগ্রাফ" এবং "অধিলোচন" গল্প-দুটো কেন যেন কেলাসিত গল্প হতে হতেও দানা বাঁধেনি। একজন লেখকের এই দক্ষতাটুকু অর্জন খুব প্রয়োজন যে, তিনি কতটুকু টানবেন গল্পটা এবং কোথায় থামবেন। এই জায়গাটায় আমি লেখকের কিছুটা ঘাটতি দেখেছি।
তবে এই ব্যাপারটা কালেক্টভলি জাজ করাটা ঠিক হবে না। আমি আমার কম্ফোর্ট জোন থেকেই গল্পগুলো পড়ব। তাই সেখান থেকে যদি গল্পগুলো বাতিল হয়ে যায়, সেটা এবস্যুলুট সত্য হবে না। হয়তো আমার পাঠের বা রুচির সাথে একটা মিস-কমিউনিকশন থাকতেই পারে। আমি যেটা বাতিল করে দিচ্ছি, সেটাই অনেকের কাছে গ্রাহ্যতা পাবে অনায়াসে।
"অটোগ্রাফ" গল্পটার কথাই ধরা যাক। হুমায়ূন আহমেদের অটোগ্রাফ "তুতুনকে অনেক ভালোবাস। বড় হও।" এই আশাবাদ এবং তুতুনের পরিনতি নিয়ে পাঠক হিসেবে আমার যে কমিউনিকেশনের ক্লু পেয়ে যাই - সেটাকে গল্পের শেষ প্যারায় তুলে আনা আমার কাছে গল্পটাকে অযথাই টেনে বাড়ানো। পাঠককে আলাদা ভাবে ট্রমাটাইজড করার প্রয়াশ থেকে যদি লেখক বিরত থাকতেন এখানে - এবং ওই ক্লু-টুকু নিয়েই পাঠক তার নিজস্ব চিন্তার ট্রমায় উঁকি দিতেন সেটাই বোধহয় আরো সুন্দর হতো��
চার.
একি ধরনের ব্যাপার আমি দেখি "তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ" গল্পে। গাব গাছ যখন তার শতবর্ষী দেহটাকে নুইয়ে দিচ্ছে বুড়ো মানুষের মতো, ঠিক এই জায়গায় লেখক তার কলমটাও নুইয়ে দিতে পারতেন। পাঠক নতজানু হতো এর পরবর্তী ভাবনায়। কিন্তু এই গল্প বা"অধিলোচন" বা আরো কিছু গল্পে লেখক টেনে এনেছেন "আপনাদের"। "আপনাদের জানানো" বা "আপনারা জানেন" এর আড়ালে লেখকের ওভার-এক্সপ্লেইনেটিভ এপ্রোচ কিছুটা বিরক্তিকর ক্ষেত্রবিশেষে।
ছোট গল্পের শুরুটা যে ড্রামাটিক সাসপেন্স তার টোন লেখক যথাযথ ভাবে বজায় রেখেছেন অবশ্যই। একি সাথে সচারাচর ছোটগল্পে একজন "আমি'র" বয়ানে যে গল্প ডানা মেলে, তার প্রতিশ্রুতিও ছিল গল্পে। এই এক "আমি" কেন্দ্রিক যে অভিজ্ঞতা বা বক্তব্য সেটাই আরো হাজার"আমি" বা"আমিত্বের" একটা মঞ্চ তৈরী করে দেয়। সেখানে থেমে থেমে "আপনাদের" টেনে এক ওভার-এক্সপ্লেইনেটিভ এপ্রোচ আরোপ অতিরিক্ত একটা বর্ণনার চিহ্ন। এই ব্যাপারে লেখক কনশাস ছিলেন কিনা জানি না, তবে সেই কনশাসটাকে ডিল ঠিকমতো করা হয়নি বলেই আমার মনে হয়।
গল্পগুলোতে মূলচরিত্র একজন ‘আমি’ এর চিন্তা-ভাবনায় সবকিছু বর্ণনা হতে থাকলেও এর সমান্তরালে "আপনাদের" উপস্থাপন গল্পকে অনেকটা গল্পশূন্যই করে ফেলে। কারণ এই "আপনারা জানেন"/"আপনাদের জানা" রূপী এক্সপ্লেনেটিভ এপ্রোচ শব্দের কংকালের মতো হয়ে ঝুলে থাকে গল্পের ভাঁজে ভাঁজে। এগুলো উহ্য রেখে লেখক কিছু গল্পের সমাপ্তি একটু বুঝে-শুনে টানলে গল্পগুলো আরও শানিত হতো বলেই আমার অভিমত।
"অধিলোচন" গল্পটা সুন্দর ছিল, তবে এখানেও শেষটায় যখন "লোকমান মিয়াকে পেছনে ফেলে অনিশ্চিত গন্তব্যে চলে যাচ্ছেন গল্পের প্রোটাগনিস্ট", সেখানেই পাঠক বাকি গল্পের টোন ধরতে পারতেন। বাড়তি বর্ননা দরকার ছিল না। রিলে রেসে প্রতিযোগী একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম শেষে তার লাঠিটা ঠিকই হস্তান্তর করেন অপেক্ষারত অন্য সঙ্গীর কাছে। লেখক পাঠকের সঙ্গ লাভের আশায়ই গল্প বলবেন স্বাভাবিক; তবে সঙ্গী কেন করলেন না বা এই দিকটা কি শুধু আমারই ফিল হয়েছে কিনা কে জানে।
"অধিলোচন" গল্টার দিকে আবার চোখ দেই। এই গল্প পড়তে যেয়ে আমার হুমায়ূন আহমেদ এর "কুহক" এর কথা মনে হয়েছে। অধিলোচন গল্পে রোগির যে সুপার-পাওয়ার সেটাকে এডপ্ট করে নেবার পার্থক্যটুকু ছাড়া "কুহকের" টোনের সাথে খুব একটা পার্থক্য বোধহয় দেখি না। গল্পের মাজেজা একই। তবে একি ধরনের পাওয়ার থাকতেই পারে সেটাও ঠিক। তারপরেও আমার পড়তে পড়তে কুহকের কথাই মনে পড়েছে।
"আমরা সবাই একসাথে একা" গল্পেও আমি "Manifest" টিভি সিরিজের ছায়া খুঁজে পাই। খুব নতুন কিছু না এই প্লট-গুলো। অথবা "খঞ্জরের খেলাঘর" গল্পে "স্কুইড গেম" এর এসেন্স? এর থেকে বরং"আমি পাই না খুঁজে তোমায়" গল্পে একটা পরিশীলিত লেখা বলেই আমি সানন্দে উপভোগ করি।
পাঁচ.
"পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" বইয়ের ১৩ টি গল্পের কয়েকটা বাদে অধিকাংশ গল্পই আমকে সেভাবে টাচ করেনি। শুরুতেই বলেছি যে আমার বা শুধু একজন পাঠকের রুচির উপর পর্যবসিত হয়ে নিশ্চই লেখক লিখবেন না। সেটা থেকেও হতে পারে। আবার লেখকের লেখার ধরনের কারনেও সেটা হবার সম্ভাবনা আছে। ঘুরেফিরে কথা একই। পাঠক হিসেবে তো আমি নিজস্ব মতামতই আরোপ করবো। সকল পাঠকের মতের নির্জাসটুকু গাইড করা তো অসম্ভব।
আমি যেরকম গল্প পড়তে পছন্দ করি অথবা লেখার ধরন সেটার থেকে ভিন্ন হলেই যে আমার অপছন্দ হবে তা না। দেখার বিষয় লেখকের গল্প পাঠককে কতটা এনগেইজ করলো। এইখানে আমার প্রাপ্তি শূন্য। গল্পগুলো পড়ে যাচ্ছি, তবে সেটার কোন রেশ থাকছে না আমার মধ্যে।
সফল গদ্যের ধরন বা আমার পছন্দ কেমন সেই বিষয়েও হয়তো একটা ডিসকোর্সের সুযোগ থাকে। দুর্বোধ্যতার তপস্যা সফল গদ্যর সিদ্ধিলাভের উপায় হয়তো না, তবে তার অনুরণন কতটা পাঠক আয়ত্ব করতে পারছেন সেটা বিবেচ্য হিসেবে থেকে যায়। ছোটগল্প মানেই তো স্বল্পায়তনে প্রকাশ এবং সেই গল্প রচনায় শব্দের পর শব্দ বসাবার যে নৈপুণ্যে আমাদের একধরনের অন্তঃদর্শন বিশ্লেষনে আগ্রহী করে তোলে সেটার অনুপস্থিতি লক্ষনীয় "পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" সংকলনে। গল্পগুলোয় মেটা ফিউজিক্যাল উপাদান আছে, কিন্তু মেটাফরিক উপাদানে ঘাটতি লক্ষনীয়। এবং পাঠক হিসেবে আমার দ্বিতীয়টায় পক্ষপাতিত্ব। একান্ত ব্যক্তিগত অভিরুচির বেসিসে বলা।
গল্পের কাঠামোতে অতি সংবেদনশীল কারুকাজ সৃষ্টিতে লেখককে হয়তো আরও কৌশলী হবার ব্যাপারে ভাবনার একটা বিশাল জায়গা রয়েছে। এখানে এসে আমি আবার ফিরে যাই শুরুর "লেখকের কথা" অংশে।
ছয়.
নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং পাঠের সমন্বয়ে যখন গল্পগুলো পড়তেছিলাম এবং সেই ধারনাটাকে ডিফেন্ড করতে যেয়ে আমার কাছে"লেখকের কথার" উক্ত অংশ গুরুত্বপূর্ন হয়ে পড়ে।
"ত্রিশ দিনে ত্রিশটা গল্প" লেখার এই সিদ্ধান্তে আমি লেখকের জোশ দেখতে পাই, তবে লেখা"joss" হলো কিনা সেটা আসল কথা। ২৪টা গল্প থেকে বাছাই করে ১৩ টা গল্প নেয়ার মধ্যে আমি ৫০% গল্প বাতিল করে দেবার আয়োজন দেখি স্পষ্ট ভাবে ওই উক্তিতে। তবে বাছাইকৃত ৫০% গল্পগুলোকে আরও পলিশড করার আয়োজন ছিল কিনা সেটা লেখক বলতে পারবেন। পাঠক হিসেবে আমি এখানে অন্ধকারে এবং পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় আমি "না" এর পক্ষেই যাবো।
"ত্রিশ দিনে ত্রিশটা গল্প" লিখে ফেলার তড়িৎ সিদ্ধান্ত এবং সেই গল্পগুলোও হুট করে মাথায় এলো নাকি আগে থেকেই ছিল সে ব্যাপারেও কোন উল্লেখ নেই। তবে বলার টোনে ধরে নেয়াই যায় যে ৩০ দিনে ৩০ টা গল্প মেইড-আপের মতোই বিষয়। এই কারনেই লেখাগুলো কষ্টকল্পিত কল্পনা নাকি সাবলীল সৃষ্টি সেই প্রশ্ন পাঠক হিসেবে আমার মাথায় আসে। তবে বেনিফিট অভ ডাউট দিতে আমি ধরেই নিবো লেখাগুলো "সাবলীল সৃষ্টি" এর বৃত্তে আবদ্ধ। তারপরেও ৩০ দিনে ৩০টা লেখার যে জোশ - তার কারনে অবভিয়াসলি একটা আলাদা চাপ তো থাকেই সময়ের। এই কারনেই লেখাগুলো পড়ার সময় কতটা"সৃজন" আর কতটা"তৈরী" সেই ভাবনার এগজিসটেন্স একটা অ্যানোনিমাস প্রশ্ন হিসেবে আমার মনে রয়ে যায়।
ঠিক এই কারনেই "পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" গল্প সংকলনে গল্পের বুদ্বুদ ছিল কিন্তু পাঠক হিসেবে বুঁদ হবার অবকাশ আমার ছিল না তত। "হইয়াও হইল না শেষ" ছোটগল্পে থাকবেই, এবং তার রেশটুকুই পাঠক তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। "পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" হয়তো ভোগ করেছি; উপভোগ নয়।
সাত.
বিনিয়ামীন পিয়াস একজন নতুন লেখক। নতুন গল্পকার। সুতরাং প্রথম বই দিয়েই এবস্যুলুট কোন ধারনা এস্টাবলিশ করা টাফ। বরং সেটা এভয়েড করাই শ্রেয়। বরং একজন লেখকের জোশ বা স্পৃহাটুকুও খুব পজিটিভ একটা জিনিস আরও ভালো কিছু লেখার। কলম চালু থাকলে লেখা আসবেই এবং লেখার বাঁকবদলও হবে। লেখার মতো পরিশ্রমী মনোভাব এবং ধৈর্য আপহোল্ড করাটাই অনেকের জন্যে কঠিন। সেটা থাকাই ভালো লেখা আসার লক্ষন।
সেই লক্ষন ধরেই সৃজন হোক। তৈরী না। শুভকামনা লেখকের জন্যে।
"পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর" প্রকাশিত হয়েছে সতীর্থ প্রকাশনা থেকে। দারুন হয়েছে প্রডাকশন। প্রচ্ছদটাও দুর্দান্ত। করেছেন পরাগ ওয়াহিদ।
সতীর্থ প্রকাশনীর ক্রাউন সাইজের ছোট্ট একটা গল্পগ্রন্থ সংকলন। বইটাতে গল্প আছে মোট ১৩টা। অটোগ্রাফ - বেশ কমন একটা আইডিয়ার উপর বেজ করে লেখা। ভালো লাগে নি, নতুনত্ব ছিলো না। অধিলোচন - থিম ভালো ছিল। একটা কজমিক হরর আশা করেছিলাম। কিন্তু এন্ডিং হতাশ করেছে। স্মৃতিরাও ফিরে আসে - ক্রিস্টোফার নোলানের খুব বিখ্যাত এক মুভির প্লটের সাথে অনেকটা মিল। মোটামুটি লেগেছে এই গল্পটা। তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ - জীবনানন্দ দাশের "আট বছর আগের একদিন" কবিতার গদ্যরূপ এটা বেসিক্যালি। কিন্তু তবুও এই গল্পটা অসাধারণ লেগেছে। পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না - অধিলোচনের মতই সমস্যা এখানে। ভালো থিমে অসন্তুষ্টিজনক সমাপ্তি। আমরা সবাই একসাথে একা - এ গল্পটা মোটামুটি ভালো লেগেছে। খুব বিখ্যাত এক শিশুতোষ গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। ঊনসন্ধান - এই গল্পটা দারুণ লেগেছে। সংকলনের একটা পূর্ণাঙ্গ গল্প বলা যায় এটাকে। আমি পাই না খুঁজে তোমায় - এই গল্পটার "শেষের শুরু" অংশটা প্রমিজিং ছিলো। কিন্তু "শুরুর শেষ"টা অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গল্প শেষ করে দিলো। পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর - বেশ ইউনিক কনসেপ্ট। এটাকে একটা রুরাল সাইফাই বলা যায়। ভালো লেগেছে। উপজীবন - চরকি সিরিজ "ঊনলৌকিক" এর একটা এপিসোডের থিম ফলো করেছে এটা। এক্সেকিউশন এন্ডিং ভালো ছিল। চমৎকার গল্প। অ-নর - ক্লিশে। খঞ্জরের খেলাঘর - সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। ভালো লেগেছে এই গল্প। ব্রাদার অফ প্রফেট - জিহাদী ভাই যেমন অকাল্ট কনস্পিরেসি থ্রিলার লেখেন, তেমন একটা ফ্লেভার আছে। তবে এ গল্পটাও অতৃপ্ত রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ সার্থক ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন এক বাক্যে - "শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।" এই বইয়ের গল্পগুলোকে বলা যায় - "শুরু হওয়ার আগেই হইয়া গেলো শেষ।" গল্পের পরিধি আরো বাড়াতে হবে লেখকের। উনার একটা স্ট্রং পয়েন্ট হচ্ছে, উত্তম পুরুষে উনি ফাটাফাটি লেখেন। ভবিষ্যতে উনার কাছে উত্তম পুরুষে ভালো এবং বড় কোনো লেখা আশা করছি।
‘পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর’ বইটিতে ১৩টি গল্প থাকলেও, ৪টি গল্প বিশেষভাবে পছন্দনীয় হওয়ার জন্য চার তারকা দিতে মনস্থির করলাম।
প্রথম: ব্রাদার অফ প্রফেট
কন্সপিরেসি থিউরি বরাবরই আমার পছন্দের। সেটাকে কোন লেখক কীভাবে প্রেজেন্ট করছে তা দেখার বিষয়। লেখক এখানে ‘বিনিয়ামীন’ নাম থেকে যেভাবে গল্পের রচনা করেছেন তা ছিল আগ্রহ জাগানিয়া। এবং শেষ পর্যন্ত আগ্রটা বজায় ছিল। সেইসাথে যুক্ত হওয়া কন্সপিরেসিটা মনঃপূত হওয়ায় পুরো সংকলনের এটিই আমার পছন্দের গল্প।
দ্বিতীয়: তখনও ডুবেনি পঞ্চমীর চাঁদ
এ গল্পটি পুরো সংকলনের এমন একটি গল্প, যা গড়ে সব পাঠকেরই ভালো লেগেছে। এখানে লেখকের মনস্তত্ত্বের এক পরিপূর্ণ আর বিলাসী ছাপ পাওয়া যায়। নিঃসঙ্গ থিমটা এখানে বড্ড প্রকট। জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটা টুকরো যেন এ গল্পের অস্তিত্বে মিশে আছে। দারুণ।
তৃতীয়: অ-নর
কমন থিম কিন্তু উপস্থাপনা স্মার্ট। সাই-ফাই হিসেবে গল্পটা ভবিষ্যতকে অবশ্যই হিট করে। তবে এমন গল্প ন্যূনতম উপন্যাসিকা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। আশা করি লেখক আগামীতে এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখবেন।
চতুর্থ: খঞ্জরের খেলাঘর
কেন জানি না, গল্পটা অনেকটা ‘ভি ফর ভেনেডেট্টা’-কে স্মরণ করিয়ে দিলো ক্ষণিকের জন্য। রিভেঞ্জ অথবা পূর্ণ কর্ম—যা-ই হোক, গল্পটা ভালো।
তাছাড়া লেখকের গল্প বলিয়ে ধরন ভালো। সুখপাঠ্য যেটা। কাঠিন্য নেই। আরাম করে পড়া যায়। তবে তাঁর প্রতি সাজেশন একজন পাঠক বা সহ-লেখক হিসেবে... ব্রাদার অফ প্রফেট, অ-নর, অধিলচন, খঞ্জরের খেলাঘর গল্পগুলোকে উপন্যাসিকায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করতেই পারে। অথবা নতুন কোনো প্লটে ছোটো গল্প লেখা শুরু করলে সেগুলোকে উপন্যাসের জন্য প্রস্তুত করতে পারে।
সব লেখকের নিজস্বতা বলে কিছু থাকে। এর বিপরীতে যেতে বলাটা দৃষ্টতা। তা-ই নিজ গণ্ডি থেকে আরও সেরা কিছু লেখা লেখক থেকে আমরা পেতেই পারি। উপরিক্ত চারটা গল্প ব্যতীত বাকি গল্পগুলো চিন্তনীয়। কেবল প্রথম গল্পটা নেগেটিভ হিসেবে মার্ক করব আমি।
আমি বই পড়ি আনন্দ পাবার জন্য। বিনিয়ামীন পিয়াস আমাকে আনন্দ দিতে পেরেছেন, সেজন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বেশিরভাগ গল্পই ভালো লেগেছে। ব্রাদার অফ প্রফেট গল্পটা নিঃসন্দেহে আমার কাছে এই বইটার হিরো স্টোরি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে। লেখক বেশ ভালোই চমক দিতে পেরেছেন। এই বইয়ের অন্যতম দুর্বল গল্পটা হচ্ছে যার নামে এই বইয়ের নাম, অর্থাৎ "পৃথিবীর সব সুর থেমে গেলে পর"। অধিলোচন গল্পটায় লাভক্রফটিয়ান হররের ছায়া পেয়েছি কিছুটা। বেশ ভয় জাগানিয়া। গাব গাছে আসলেই ফাঁস নেয়া যায় কিনা, তা নিয়ে আমার একটু সন্দেহ ছিলো। তবে লেখক আমার সন্দেহ দূর করেছেন। তখনও ডোবেনি পঞ্চমীর চাঁদ গল্পটা লেখার স্টাইল বেশ ভালো লেগেছে। শেষটা বিষণ্ণতায় মাখা। খঞ্জরের খেলা একটু খাপছাড়া লেগেছে। এই গল্পটায় আরেকটু সময় দেয়া উচিত ছিলো। আমি পাই না খুঁজে তোমায় গল্পটা দারুণ। উপজীবন গল্পটা বেশ, তবে শেষটা নিয়ে আক্ষেপ আছে। মানুষটাকে সত্যি বললে খুব বেশি ক্ষতি হতো কি? কে জানে! আরেকটা গল্প ভালো লাগেনি। অ-নর। এই প্লটে এর আগেও ঢের গল্প পড়া আছে। চমকে দেবার মতো কিছু নেই।
লেখকের লেখায় ধার আছে। তবে বর্ণনা প্রকাশে একটু অতিরিক্ত লেগেছে। টুকটাক টাইপো আছে, যেগুলো মাথা ঘামানোর মতো কিছু না। আমার কাছে পুরো প্যাকেজটা ৩-৩.৫ এর মধ্যে থাকলো। লেখকের জন্য শুভকামনা...
ছোট গল্পের সংকলন। মূলত অতিপ্রাকৃত, সাই-ফাই ও পরাবাস্তব জনরার। গল্পের মান তেমন একটা পদের লাগেনি। লেখার মান আরও উন্নতি করা প্রয়োজন। "অধিলোচন" গল্পটা ভালো লেগেছে। তবে বেশিরভাগ গল্পই আমার ভালো লাগেনি। লেখায় ম্যাচুরিটি আনতে পারলে আশা করি লেখা আরও পাঠকপ্রিয় হবে। শুভকামনা রইল লেখকের জন্য।