মাইন। বয়স ৩৭। এক বৈচিত্র্যহীন জীবন কাটাচ্ছে। তার প্রতিটা দিনই যেন আগের দিনটার ফটোকপি। সব সম্ভাবনাকে মেনে নিয়ে সে শূন্যতায় তাপ দিচ্ছে। হঠাৎই মোড় ঘুরে যায় তার জীবনের। এক্স-কলিগ কাশফির কাছ থেকে একটা উপন্যাস রিরাইট করার দায়িত্ব পায় সে। গোস্টরাইটিং প্রজেক্ট। মূল উপন্যাসটা লিখেছেন সাবেক আমলা আবরার ফাইয়াজ। প্লটটা ইউনিক এক কাল্পনিক সমাজব্যবস্থার গল্প, যেখানে রাষ্ট্র ম্যানিপুলেট করে ব্যক্তিকে। আর ওই ব্যক্তির ছায়া ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। যাকে যত বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তার ছায়া তত ফেড হয় এবং একসময় পুরোপুরি ‘নেই’ হয়ে যায়। এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। মাইন বুঝতে পারেনি একবার রিরাইট শুরু করলে তার চেনা জগৎটা বদলে যাবে। বাস্তব ছেড়ে সে ঢুকে পড়বে কল্পনার রাজ্যে। সেখানকার একেকটা লেয়ার সে ভিডিও গেমের মতো পার হবে, বদলে যাবে তার চেনা পৃথিবী। মাইনের পরিচিত মানুষগুলো বিপদে পড়তে থাকে। আরিয়া, সামিরা, কাশফি কেউই আর নিরাপদে নেই। পলিটিক্যাল থ্রিলারের ফ্লেভারে এটা এমন এক পরাবাস্তব উপন্যাস, যা আপনাকে আনন্দ দেবে।
দীর্ঘ ক্লান্তিকর সমুদ্রযাত্রার শেষে প্যারিসে ফিরছিলেন এক নাবিক। ইভ থংগি নাম তার। বাসে চড়ে রু লা বোয়েতি পেরোনোর সময় ইভের চোখ আটকে যায় একটা আর্ট গ্যালারির জানালায়। জানালার ওপারে থাকা একটা ছবিতে দৃষ্টিনিবদ্ধ। ছবিতে ভুতুড়ে শহরের আঁধারের মাঝে জ্বলজ্বল করতে দেখা যাচ্ছে কোমর অবধি নগ্ন এক পুরুষের ধড়। পাশের টেবিলে একটা বই রাখা। সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই পুরুষটির। চোখ দুটো বন্ধ। ছবির মধ্যে থাকা কীসের এক অমোঘ আকর্ষণে ইভ চলন্ত বাস থেকে নেমে পড়লেন। টলমল পায়ে এগোতে থাকলেন সেই জানালাটার দিকে। কাঁচে চোখ ঠেকিয়ে দেখতে থাকলেন সেই অদ্ভূত ছবি। নিচে বাঁকা অক্ষরে শিল্পীর নাম লেখা- জর্জিও ডি চিরিকো। ‘চাইল্ডস ব্রেইন’ নামের এই ছবিটা ইভের ভাগ্যকে আমূল বদলে দেয়। কোনোদিন রঙতুলিতে হাত না দেয়া এই পোড়খাওয়া নাবিককে একটা ছবি বিখ্যাত সাররিয়েল আর্টিস্টে পরিণত করে। এই ঘটনাটা ঘটেছিলো ১৯২৩ সালের প্যারিসে। তখনও আঁদ্রে ব্রেতো তার সাররিয়েল মেনিফেস্টো লিখেন নি।
ছবির আগে সাররিয়েলিজমের গোড়াপত্তন ঘটেছিলো লিখিত মাধ্যমে। অ্যাপোলোনিয়র নিজের নাটকের নাম দিয়েছিলেন ‘সাররিয়েল’, বাস্তবের থেকেও বেশি কিছু বুঝাতে। আমরা চোখের সামনে যা কিছু সত্যিকার অর্থে ঘটতে দেখি, তার থেকেও বেশি কিছু বোঝাতে একজন শিল্পী সাররিয়েলিজম বা পরাবাস্তবতার আশ্রয় নেন। স্বপ্নের মতো কিছু দৃশ্যের দেখা যায় সেখানে। যুক্তির খাঁচার ফাঁক গলে কল্পনা ডানা মেলে। আলভী আহমেদের ‘গোস্টরাইটার’ পরিচয়ে পলিটিক্যাল থ্রিলার হলেও এর নাড়িপোঁতা আছে এক সাররিয়েল জগতে। বইয়ের কভারটা লক্ষ করলে দেখা যায়, গোস্টরাইটার টাইটেলটা প্রথম অক্ষর থেকে ধীরে ধীরে ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গেছে। কলমের ছায়াটা নিচের দিকে প্রায় নেই বললেই চলে। তেমনভাবে যে কোনো লেনদেনে টাকার বদলে ছায়ার সওদা, রক্তের সওদা,স্মৃতির সওদা করতে হয় সেই সাররিয়েল জগতে। ছায়াটা ক্রমশ ফিকে হতে থাকে। স্মৃতি মুছে যায়।
এক বিখ্যাত পত্রিকার সাহিত্য পাতার দায়িত্বে ছিল লেখক মাইন হাসান। দলবাজি না করা, ঘাড়ত্যাঁড়ামির জন্য তাকে কৌশলে চাকরিচ্যুত করা হয়। ক্ষোভ-হতাশায় পুরোপুরি ডুবে থাকা মাইনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এক রাতে ঘটে রহস্যময় ট্রানজেকশন। ঘটনাক্রমে সে জানতে পারে তাকে একটা উপন্যাস রি-রাইট করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গোস্টরাইটার হিসেবে কাজটা করতে হবে তাকে। সে ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি একবার লিখতে শুরু করলে চেনাজানা জগৎটা এমন উল্টেপাল্টে যাবে রাতারাতি। ভেঙে যাবে বাস্তব আর কল্পনার মাঝের দেয়াল। মাইন বুঝতে পারে,সে ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে নিজের ছায়া। আর সেই ছায়া তার আত্মার অংশ।
আলভী আহমেদের গল্প বলার ধরনটা বেশ স্ট্রেট ফরোয়ার্ড। তবে পাঠককে লুজ বল দিয়ে কাহিনীর মাঝে নিয়ে ফেলার মতো প্রভোকিং ধরনের না। বরং রয়ে সয়ে বলা তরল গল্পের সাথে সহজে কানেক্ট হতে থাকেন পাঠক। আলভী গল্পটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চান। তাই ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট অব ভিউয়ের বদলে ‘ধরো তক্তা,মারো পেরেক’ নীতিতে মাইনের ফার্স্ট পার্সন ন্যারেটিভে এগিয়েছে গোস্টরাইটিংয়ের গল্প। ফাস্ট পেসড। শব্দ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে হোঁচট খাওয়ানোর প্রবণতা নেই। ঢাকাইয়া টোনের বাতচিতের সাথে প্রচুর ইংরেজীর ব্যবহার করা হয়েছে। তবে দৃশ্যের বর্ণনায় সূক্ষ্ম কাব্যিকতা আছে। যেমন: নিঝ্ঝুম রাতের নৈঃশব্দ্যের ওজনকে কমাতে থাকে সিলিং ফ্যান। ডিটেইলিংয়ের প্রতি এতো যত্ন আমি আলভী আহমেদের পূর্ববর্তী উপন্যাসে দেখি নি। চরিত্রায়ন করেছেন সাবটেক্সটের মধ্য দিয়ে। সরাসরি বলে দেন নি,এই ক্যারেকটারটা তো এমন। বরং একেকটা ঘটনা দিয়ে চরিত্রগুলোর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যকে ধরতে চেয়েছেন।
গোস্টরাইটারের সাথে আলভী আহমেদের ‘তিওমান’(বই- আফরিন ) গল্পটা গভীরভাবে সংযুক্ত। কেউ গল্পটা পড়ে উপন্যাসটা পড়লে আরো কানেক্ট করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এছাড়া সেটাপে হারুকি মুরাকামির ‘1Q84’ এর প্রভাব আছে। তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি,রিজার্ভ সংকট, অর্থপাচার,কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা, প্রকল্পের আড়ালের ফাঁকির মতো উল্টো তরফের সেনসিটিভ সত্যগুলো সংযুক্ত থাকায় ‘গোস্টরাইটার’ তার নিজস্বতা পেয়েছে। হয়ে উঠেছে সাহসী।
গল্পের সমাপ্তি খানিকটা রাশড মনে হয়েছে। ওপেন এন্ডেড ধরনের হওয়ায় যেন অনেকটা গল্প অধরা থেকে গেলো।
৩.৫/৫ বইয়ের শুরুটা নিঃসন্দেহে মুরাকামির "1q84" প্রভাবিত। "কাহিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয় কিন্তু গদ্য একেবারে বাজে" এই কারণে একটা উপন্যাস পুনর্লিখনের দায়িত্ব পায় মাইন। এককথায় তাকে গোস্টরাইটার হিসেবে কাজ করতে হবে। শুরুর দিকে মনে হচ্ছিলো লেখক সিনেমার চিত্রনাট্যের কথা মাথায় রেখে সংলাপ ও পরিবেশ সৃষ্টি করছেন। গল্প গতি লাভ করেছে বইয়ের অর্ধেকে এসে। এখান থেকে অপ্রত্যাশিত সব মোচড় আসে কাহিনিতে যা একইসাথে উত্তেজনাপূর্ণ ও চিন্তা উদ্রেককারী। আলভী আহমেদ একটি রাজনৈতিক থ্রিলার লিখেছেন যেখানে রাষ্ট্র ব্যক্তির সমস্ত কার্যক্রম শকুনের মতো পর্যবেক্ষণ করে ও নাগরিকদের দমিয়ে রাখে। থ্রিলারধর্মী কাহিনিতে উন্মুক্ত উপসংহার খুব একটা উপযুক্ত মনে হয় না আমার কাছে। আলভী আহমেদের মধ্যে মুরাকামি ও হুমায়ূন আহমেদের প্রভাব প্রবল। মুরাকামিধর্মী একটা গল্প লিখে উপসংহার টানা হোলো চিরাচরিত হুমায়ূনীয় পদ্ধতিতে, গল্প অসমাপ্ত রেখে, এটা ঠিক ভালো লাগেনি। তারপরও বলবো, গল্পের শেষ দৃশ্যটা সুন্দর ও মনে রাখার মতো।
গোস্টরাইটার আসলে এমন একটা বই যে ধরণের বই আমি লিখতে চাই, কিন্তু আমি লিখতে পারি না। কারণ লেখক হিসেবে আমার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। যে সীমাবদ্ধতা আমি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারি নাই। কখনো পারবো কিনা তাও জানি না।
এ নিয়ে আলভী আহমেদের দুইটা বই পড়ে শেষ করলাম। গত বছর পড়েছিলাম 'লোনলি অক্টোবর'। এ বছর পড়লাম 'গোস্টরাইটার'। লেখক হিসেবে আলাদা একটা স্বকীয়তা উনি অর্জন করে নিয়েছেন। তার ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে কথ্য ভাষায় বর্ণিত ন্যারেটিভ আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। তার গল্প বলার সহজ-সাবলীল-অনায়াস ভঙ্গিটাও আমার পছন্দের। বর্তমানে যারা লেখালেখি করছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল লেখকদের তালিকা তৈরি করলে তিনি উপরের দিকেই থাকবেন আমার বিশ্বাস। এটা উনি অর্জন করে নিয়েছেন।
বইয়ের কাহিনি গোস্টরাইটিং নিয়ে। মাইন নামের একজন লেখকের বয়ানে। সে একটা গোস্টরাইটিং প্রজেক্টের কাজ পায়। আর এটা নিয়েই গল্প এগিয়ে যায়।
কিছু আক্ষেপ আছে যদিও। বইটিতে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল মাইন যে গোস্টরাইটিং প্রজেক্টটা পায়, সেই বইয়ের বর্ণনা। তার সাথে কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনাও ঘটতে থাকে। ওই বইটার ব্যাপারে আরো কিছু জানতে চাচ্ছিলাম। আরো বিস্তারিত কিছু। ওটা পাইনি।
কিংবা আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আরিয়ার ব্যাপারেও আগ্রহ বোধ করছিলাম। কিন্তু বিস্তারিত পেলাম না।
আমার পড়া আলভি আহমেদের প্রথম মৌলিক লেখা আমার খুব ভালো লেগেছে। ভালো লাগার পেছনে অবশ্য উপন্যাসে মুরাকামীয় এলিমেন্টসের উপস্থিতি অন্যতম প্রধান কারন। যেহেতু আলভী আহমেদ মুরাকামির অনুবাদক হিসেবে সুপরিচিত, তদুপরি তার লেখায় সত্যই মুরাকামির প্রভাব আছে তাই মুরাকামির নাম আসা খু্ব স্বাভাবিক। কনসেপ্ট থেকে ধরে প্রোটাগনিস্টের নিঃসঙ্গ জীবনযাপন, গল্পে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া, হালকা চালে যৌনতার প্রসঙ্গ ইত্যাদি মুরাকামীয় জিনিসপাতির সার্থক ব্যবহার হয়েছে আলভী আহমেদের দ্বারা।
আলভী আহমেদের ইংরাজি শব্দমিশ্রিত চলতি গদ্য খুব accurate ও ভালো লেগেছে। এন্ডিংটা মনঃপুত হয়নি, লেখক প্যাঁচ লাগিয়ে খুলতে পারেননাই দেখে এমন এন্ডিং দিয়েছে বলে অনেকের মতো আমারো মনে হয়েছে। তবে এতে খু্বেকটা ক্ষতি হয়নি। সবকিছু পাঠকের মতো হতে হবে এমন তো নিয়ম নাই!
ইন্টারটেক্সটুয়ালিটি বা আন্তঃপাঠ্যতা বিষয়টা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয়।
অমুকের লেখায় তমুকের প্রভাব আছে, বা অমুক লেখাটা তমুকের মতো—এই কথাগুলো বইয়ের আলোচনায় খুব ক্লিশে যদিও; তবে, সত্যি বলি, কোনো বইয়ের আলোচনায় ওই ধরনের কথা দেখলে আমার বরং ভালো লাগে। সে কারণে বোর্হেসের ‘টলন, উকবার...’ গল্পকে পুনরায় ভেঙে যখন শিবব্রত বর্মন ‘বানিয়ালুলু’ লেখেন, আমি উচ্ছ্বসিত হই। শৈশবে পড়া ‘লুকুন্ডু’ গল্পকে হুমায়ূন আহমেদের ‘কুটু মিয়া’তে খুঁজে দারুণ লাগে। চেকভের ‘ছয় নাম্বার ওয়ার্ড’ গল্পকে প্রায় মেরে দিয়ে মার্কেজ ‘আমি শুধু একটা ফোন করতে এসেছিলাম’ লিখলেও পরেরজনকে তালি মারতে আমার বাধে না। একজন লেখক কতটা মৌলিক আর উচ্চাভিলাষী, তিনি কাকে অনুকরণ করতে চাইছেন আর কতটা অনুকরণ করছেন, এই দুই চলক দেখে পাঠক সেটা আবিষ্কার করতে পারে। বড় লেখকেরা কখনো কোনো চিন্তা-বীজ অনুকরণ করে লিখলেও, সেটা প্রায়শ নিজেই হয়ে ওঠে দুর্দান্ত সাহিত্য।
আলভী আহমেদের লেখায় হারুকি মুরাকামির গন্ধ প্রবল, অনেকেই আলাপে উল্লেখ করেছেন কথাটা। এই বইয়ের আলোচনাতেও দেখলাম, অনেকে বলছেন চিন্তা-বীজটা 1q84 থেকে ধার নেওয়া। 1q84 পড়িনি, সে বিষয়ে ধারণা নেই। তবে মুরাকামির যে গদ্যরীতি আর প্রচুর পপ-কালচার আক্রান্ত বর্ণনা, সেটা উদ্দিষ্ট উপন্যাসেও আছে। আছে, মুরাকামির ট্রেডমার্ক দুই ভিন্ন ঘরানার নারীর (যাদের একজন খুব গোছালো, বাস্তববাদী; আর অন্যজন বিরাজ করে ফ্যান্টাসির জগতে) উপস্থিতিও। ফলে, লোকে কেন এই উপন্যাসকে ‘মুরাকামীয়’ বলছে, সেটা ধরতে আমার সমস্যা হয় না। কিন্তু এই ছায়াপাতকে, উপন্যাসটা কেমন-- সেটা বিচারের জন্যেও আমার দরকারি মনে হয় না।
কারণ, আমার মনে হয়েছে আলভী আহমেদ বেশ ভালোমতোই আত্মস্থ করতে পেরেছেন মুরাকামিকে। যে-টুকু মৌলিকতা থাকলে লেখাটাকে অন্য কারো আনাড়ি অনুকরণ বলে মনে হয় না, উদ্দিষ্ট উপন্যাসে সেটা ভালোমতোই আছে। যেটা নেই, সেটা হলো মসৃণতা। সৈয়দ শামসুল হক একবার বলেছিলেন, একটা লেখা পড়লে কখনো কখনো বোঝা যায়, লিখবার সময় লেখক ঠিক এইখানে এসে লেখা থামিয়েছিলেন/ বিরতি নিয়েছিলেন। এই বইটার দ্বিতীয় অংশটা মনে হলো তেমন, শুরুর অংশটার স্বচ্ছন্দ ভাবটা সেখানে নেই।
লেখক মাইন আর কল্পনাপ্রবণ আরিয়ার ছায়া যে ক্রমশ হালকা হচ্ছে, পাঠক হিসেবে আমি খুব খুশি হতাম যদি উচ্চাভিলাষী হয়ে সেই অংশটা ঔপন্যাসিক আলভী আরো প্রসারিত করতেন।
শুরুতে একটু বিরক্ত লাগছিল, চরিত্রগুলোর কথাবার্তা বিশেষ করে। এর পরে বেশ লাগছিল পড়তে... মিস্ট্রি, সাথে আবার ম্যাজিক রিয়ালিজম...এরপরে একটা খুবই কমন জিনিস হল। তারপরে ঠাস করে বইটা শেষ হয়ে গেল...অনেক কিছুরই উত্তর পাওয়া গেল না আর এই হুট করে শেষ হয়ে যাওয়াটাও ভালো লাগলো না।
লেখকের লেখার অনেক সুনাম শুনেছি। লোনলি অক্টোবর লিস্টে ছিলো,কিন্তু সে বেড়ে উঠা লিস্টের ভীড়ে চাপা পড়ে গিয়েছিলো। শুরু হলো আফরিন দিয়ে, বইয়ের চিপা চাপায় ওয়ান ইসটু ফোরও খুঁজে পেলাম। আফরিন তেমন দাগ না কাটলেও ওয়ান ইসটু ফোর যেনো সেটা পুষিয়ে দিয়েছে। লেখক বলেছেন যে উনি গল্প না, নিজের অনুভূতি লিখেন। সেটাই আসলে। গোস্ট রাইটার পড়ার সময়ও এটাই মনে হয়েছে। আবার অনেকসময় মনে হচ্ছিলো আফরিন বইটার গল্পগুলো সাজিয়েছেন পুরো বইয়ে। একটা গল্প তো উল্লেখ করাই আছে।
আলভী আহমেদের গল্প বা উপন্যাসের মেয়ে চরিত্রগুলো বেশ। এমনকী আফরিন বা ওয়ান ইসটু ফোর বইয়েও লক্ষ্য করেছি। অতি সাধারণ মানবী, রহস্যময়ী সব যেনো থেকে যায় ওনার কথাতে।
৩৭ বছরের মাইন যে কিনা ম্যাটমেটে জীবন পার করছিলো, তার কাছে আসে গোস্ট রাইটার হিসেবে কাজের সুযোগ। সেই কাজই পালটে দেয় মাইনের জীবন৷ এ জীবনের সাথে যোগ করে দেয় অদ্ভুত এক জগত আর সে জগতের মানুষগুলো। সে কেমন জগত? সে জায়গার অধিবাসীগূলো কেমন?
এমন দু-অর্থের গল্প আমার ভালো লাগে। সুক্ষ্মভাবে চলতি সমাজের ধারার উপর যে আঙুল তোলা হয়েছে,তার বিস্তৃতি আরো থাকলে ভালো হতো। যদিও শেষটা মন মতোন হয়নি। কিন্তু একটানা পড়া ছাড়া শান্তি পাওয়া যাবেনা।
সুররিয়েলিজম কী, এ বিষয় জানতাম না। মানে সম্যক ধারণা ছিলো, কিন্তু বিষয়টাকে যে সুররিয়েলিজম বলে,সেটা জানা ছিলোনা।
এই উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টার পড়েছিলাম ফেসবুকে। এবং শুরুটাতে এমন কিছু একটা আছে যে আমি এই বইটা না পড়ে আসলে পারিনি। আমাকে জোর করে এই বই পড়ানো হয়েছে। তবে পড়ে কিছু ক্ষতি হয়নি।
বন্ধু অনুর রেফারেন্স ছিল তার নাকি আলভী আহমেদের লেখা বিশেষ ভালো লাগে না। তাই কোন ধরনের expectations ছিল না।
লেখনী আহামরি কিছু না। তবে জরুরী কিছু বলছে এমন একটা ভাব আছে। উপন্যাসটা মেইনলি একটা উপন্যাসকে রিরাইট করা নিয়ে। "তিওমান" নামের একটা উপন্যাসপর রিরাইট করতে গিয়ে মাইনের জীবনে অনেক ঘটনা, দূর্ঘটনা ঘটতে শুরু করে। বেশ অতিপ্রাকৃত ঘটনারও দেখা মিলে। যেগুলো আমার একটু বেশিই কাকতালীয় মনে হয়েছে। তবে সবচেয়ে interesting ব্যাপার হলো রিরাইট করতে যাওয়া উপন্যাসটার গল্পটা। মাইন এই বইয়ের প্রধান চরিত্র এবং গোস্টরাইটার। সে বই রিরাইট করতে গিয়ে বইয়ের গল্পের মধ্যে অনেক চেঞ্জ নিয়ে আসে। এই চেঞ্জের কারণে গল্প ছিল একটা হয়ে গেলো আরেকটা। সত্যি বলতে আমার পুরো উপন্যাসটার গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে। আলাদা করে চরিত্রগুলো বেশ ভালো লেগেছে। নারী চরিত্রগুলো বেশ সুন্দর। তবে সামিরাকে অদ্ভুত বলার কারণটাই আমার কাছে হাস্যকর লেগেছে। প্রজাপতির ডানা ছিঁড়ে, সে ডানা জমালে কেউ অদ্ভুত হয়ে যায় না। এই কাজ আমি অনেক করেছি ছোটবেলায়। আমি আর আমার আপু মশা আধমরা করে একটা কাচের জারে রেখে এমনও হয়েছে৷ আর অন্য কারণও অদ্ভুত মনে হয়নি। তবে আরিয়াকে আমার দারুণ লেগেছে। কিন্তু মনে হয়েছে লেখক আরিয়াকে নিয়ে কি করবেন কনফিউজড। তবে দারুণ একটা চরিত্র উপন্যাসের বলার মতো কোনকিছুই করেনি। তার জন্য একটু অভিযোগ এবং দুঃখবোধও আছে। মাইনকে নিয়ে বললে এই ছেলেটা একট��� অসহ্য, অপরিষ্কার, দূষিত ছেলে। ফিকশন পড়ে অথচ দস্তয়েভস্কি, মার্কেসকে পড়েছে কম। এটাতে হতাশ হলাম। এতো কম কেন বুঝে এই ছেলেটা বারবার এটা মনে হচ্ছিলো। এটা লেখকের সার্থকতা। পড়তে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিলো এটা সিনেমা হলে দারুণ হতো। আরেকটা interesting part হচ্ছে বইয়ে বেশ অনেক অংশ জুড়ে লেখক কি করলে গদ্য strong হবে, চরিত্র গঠন কেমন হওয়া উচিত থেকে শুরু করে পুরোদস্তুর ফিকশন লেখার ভালোই আলাপ করেছেন। যদিও এই উপন্যাসটারও একটু রিরাইট প্রয়োজন মনে হলো। মানে শেষটা হুট করে অনেক ঘটনার ব্যাখা না দিয়ে শেষ হওয়াটা বোধহয় একটু বেশিই হয়েছে। ছায়ার ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে৷ তবে ক্লিয়ার ব্যাখা নেই। তারপর আরিয়াকে বেশ অবহেলা করেই মাঝরাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কিংবা ৩৫০ হলেও বেশ একটা দারুণ কিছু দাঁড়িয়ে যেতো। "তিওমান" নিয়ে আরেকটা উপন্যাস লিখলে বেশ দারুণ একটা গল্প হবে। ওটার গল্পটা আমার বেশ দারুণ লেগেছে। শেষটা ভালো লাগে নাই।
গোস্টরাইটার মানে আমরা জানি যে টাকার বিনিময়ে আত্মপরিচয় গোপন রাখার শর্তে অন্যের হয়ে বই লিখে দেয়। মাইন নামক এক বেকার ছেলে হঠাৎ একজন প্রাক্তন আমলার লেখা উপন্যাসের গোস্টরাইটিং এর প্রস্তাব পায়। সে যা নিয়ে লিখবে, সেটা একটা সুন্দর আইডিয়া। তিওমান নামের একটা পরাবাস্তব জগৎ, যেখানে টাকাকে পাল্টে ফেলা হয়েছে রক্ত, বা স্মৃতি দিয়ে। ধরেন আপনি একটা কিছু কিনবেন, আপনাকে বিনিময়ে দিতে হবে রক্ত, অথবা কোন সুখস্মৃতি। আপনি চাকরি করেন, মাস শেষে আপনার একাউন্টে জমা হবে নির্দিষ্ট ইউনিট রক্ত। এখানে সমাজের নেতৃস্থানীয়রা আক্ষরিক অর্থেই গরিবের রক্ত চুষে খায়। অপর দিকে কেউ নিজের স্মৃতি বিক্রি করতে করতে একসময় আবিষ্কার করে, তার জীবন থেকে সব স্মৃতি হারিয়ে গেছে, স্বগতোক্তি করে, "মেমোরি লেনে আমার কোন সঙ্গী নেই"। কাহিনী আরেকটু চমদপ্রদ করতে এগিয়ে আসে আরেকটা কন্সেপ্ট। ছায়া। যারা ক্ষমতাবান, তাদের ছায়া হবে দীর্ঘ, যারা দুর্বল, তাদের ছায়া হবে ক্ষীণ। কেউ নিজের স্মৃতি বিক্রি করে দিলে তার ছায়া হারাতে শুরু করবে, একসময় সে ছায়াহীন মানুষে পরিণত হবে। মানুষের চিন্তার সাথে তার ছায়ার রঙের পরিবর্তন হবে।
এরকম পরাবাস্তব একটা গল্পের ভেতর মাইন নিজেকেই আবিষ্কার করে নিজের ভবিতব্য উপন্যাসের একটা চরিত্র হিসেবে। নাকি ওপর থেকে কলকাঠি নাড়ছে আরো শক্তিশালী কেউ???
(প্রতিবাস্তব: স্বপ্ন ও স্মৃতি {২০২৩} কমিক সংকলনে কাছাকাছি কিছু কন্সেপ্ট পাইছিলাম)
আলভী রহমান কোন রাখঢাক না রেখে সরাসরি কাহিনীতে ঢুকে যান। সহজভাবে লেখেন বলে পড়তে খুব সুস্বাদু। এটাতেও শুরুর দিকে ভালো লাগছিলো পড়তে।
কিন্তু এন্ডিং একদম ফাউল হইছে। অনেকটা খাবি না তো মাখাইলি কেন টাইপের? আরেকটু সুন্দর করে ফিনিশিং দিতে পারলে ভালো লাগতো। এন্ডিং ছাড়া সাড়ে চার এন্ডিং সহ সাড়ে তিন।
পুনশ্চ: সমসাময়িক অনেকগুলো বিষয় (আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি, রিজার্ভ কেলেঙ্কারি, অফশোর ব্যাঙ্কিং) ভালোই নিয়ে আসছেন লেখায়। ভালো একটা দিক।
উপন্যাসের শুরুটা সুন্দর। দুয়েক পাতা পড়লেই যে কারোরই আরও পড়তে ইচ্ছা হবে। আলভী আহমেদের গদ্য ভাল। মুরাকামির প্রভাব বুঝতে পারা যায়। তবে শেষপর্যন্ত উপন্যাস যে জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ওইটা খুব একটা পছন্দ হয়নি আমার কাছে। আরও ভাল কিছু আশা করেছিলাম।
মাইনের চাকরি নাই। এহেন দশায় মনের অবস্থা বুঝাই যায়। সেই সময়ে একজন হাজির হলো একটা বইয়ের রিরাইট করার প্রস্তাব নিয়ে। কাজটা করলে বইটা প্রকাশিত হবে অন্য আরেকজনের নামে তবে মাইন বেশ ভালো এমাউন্টের টাকা পাবে যেটা এই মুহূর্তে তার খুবই দরকার। সে কাজটায় রাজি হয়ে যায় আর এখান থেকেই শুরু হয় সুররিয়ালিজমের জগতে মাইনের পা ফেলা।
কখনো শুনেছেন কোন মানুষের ছায়া হারিয়ে যায়! ছায়াহীন মানুষ আসলে তার নিজের একটা অংশকে হারিয়ে ফেলে। ছায়া শুধু ছায়া নয়, ছায়া একটা মানুষের আত্মারই অংশ। মাইন আবিষ্কার করে সে এই বই রিরাইট করতে গিয়ে ক্রমশ তার ছায়া হারিয়ে ফেলছে। ছায়াকে কি ফেরত আনা যায়? এই কাজে কার সাথে ফাইট দিবে হবে? সাহায্য কেউ করবে কি? মাইনের আজীবনের ভালোবাসার মেয়েটি কি ফিরবে তার কাছে ? আরিয়ার রহস্য কি? এদিকে বিপদের উপর বিপদ কিছু মানুষ মাইনের পেছনে লেগেছে তারা কিছুতেই বইটি লিখতে দিবে না। কিন্তু কেন? অনেক অনেক প্রশ্ন, যার উত্তর দিবে গোস্টরাইটার।
আলভী ভাইয়ের গদ্য আমার ভীষণ পছন্দের। এত আরাম আরাম লাগে পড়তে! বইয়ের কাহিনীও ইন্টারেস্টিং লেগেছে। ভাইয়ার মৌলিক উপন্যাসগুলো ধারাবাহিকভাবে আগেরটার থেকে পরেরটার কন্টেন্ট বেশি স্ট্রং হচ্ছে বলে আমার মনে হয়েছে। এটা ভালো লক্ষণ। বইয়ের পেছনে যদিও লেখা উপন্যাস কিন্তু আমি গোস্টরাইটারকে বলবো মিস্ট্রি থ্রিলার। বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। তিনি আমার খুবই প্রিয় প্রচ্ছদশিল্পী। এই বইয়ের প্রচ্ছদ ব্যাপক পছন্দ হয়েছে। আর বইয়ের সুন্দর হলদেটে কাগজ ও চমৎকার বাঁধাইয়ের জন্য ধন্যবাদ বাতিঘরকে।
সময়টা ছিল ১৯২৩ সাল। প্যারিসের এক নাবিক যিনি কখনও রংতুলি হাতে করেন নাই, হঠাৎ ই আর্ট গ্যালারির জানালা দিয়ে দেখা একটা ছবি তাঁর জীবকে পুরোপুরি বদলে দিলো এবং তিনি হয়ে উঠলেন বিখ্যাত চিত্র শিল্পী। তাঁর আঁকা একটা ছবি তাঁকে বিখ্যাত সাররিয়েল আর্টিস্টে পরিণত করে।
পরাবাস্তবতা বা সারিয়ালিজম মূলত স্বপ্ন ও জাগরণ বা বাস্তবতার মধ্যে যে একটা পার্থক্য তার একটি সমন্বয়ের চেষ্টা। এখানে এমন সব চিত্রকল্প সৃষ্টি করা হয় যা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। অনেকটা অবচেতন মনের প্রভাবে দেখা স্বপ্ন যার প্রতিটি উপাদানই বাস্তবিক, তবে অসঙ্গতিপূর্ণ। সেখানে চিন্তায় প্রবাহ যুক্তির পথে চলে না।
তেমনই এক পরাবাস্তবতা বা সারিয়ালিজম এ স্বাদ পাওয়া যায় লেখক আলভী আহমেদ এর "গোস্ট রাইটার " এ। পুরোপুরি সারিয়ালিজম না থাকলেও লেখক সেই আবহটা তৈরি করেছেন চমৎকার ভাবে।
ঘাড়ত্যাঁড়া বাঁধা বন্ধনহীন এক যুবক মাইন হাসান। যে চাকরি করতো বিখ্যাত এক পত্রিকায়। নিজের জেদের কারনে চাকরি হারিয়ে হতাশায় ডুবে গলা পর্যন্ত মদ খেয়ে এক রাতে সে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। সকালে মদের নেশা কাটতেই ফেসবুকে দেওয়া পোস্ট ডিলেট করতে মন চাইলেও তার একাউন্টে ততোক্ষণে অর্ধলক্ষ টাকা জমা হয়ে গেছে। টাকাটা তাকে দেওয়া হয় মূলত একটা লেখাকে রি-রাইট করে ভালো একটা মানসম্মত উপন্যাসে দাঁড় করাতে। সে গোস্ট রাইটার হিসেবে কাজটা করবে। মাইন রাজি হয় এবং সে লিখতে শুরু করে। যার ফলে নিজের অজান্তেই সে আস্তে ধীরে নিজের আইডেন্টিটি হারাতে বসেছে, একই সাথে হারাতে বসেছে নিজের ছায়া ও আত্মাকে।
লেখক আলভী আহমেদ এর লেখা আগে দুটো গল্প গ্রন্থ পড়েছি। একটা গল্পের রেশ কিছুটা এই উপন্যাসে আছে। চমৎকার গল্প বলার ধরনটা উপন্যাসের মধ্যে পেলাম সাথে সেই চেনাজানা ঢাকা শহরের চেনা পথঘাট। চরিত্রগুলো সব এই সময়ের, বর্তমানের এক আবহ। মাইন চরিত্র টার প্রকাশ ও বিকাশটা ভালো লাগলেও শেষ টা কেমন দুম করে শেষ হওয়ার মত লাগলো, কেমন যেন আরও কিছু বলার ছিল বা হতে পারতো টাইপের মনে হয়েছে। তবে নানা বিষয়ে র সাথে এই সময়ের সমাজ ও রাষ্ট্রের সুক্ষ্ম একটা দিক ইঙ্গিত করেই লেখক আলভী আহমেদ এই " গোস্ট রাইটার "। অনেকদিন পর ভিন্ন স্বাদের চমৎকার একটা বই পড়লাম।
এই বইয়ের সবথেকে ভালো দিক হল এর লেখার ধরন। যেভাবে লেখা হয়েছে, মনে হচ্ছিল যেন চোখের সামনে সব ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। আর ঘটনাপ্রবাহ স্বতঃস্ফূর্ত। মোটাদাগে বইটাকে থ্রিলার বা কোনো জনরায় ফেলা যায় না। থ্রিল জিনিসটা উপভোগ যখনই শুরু করলাম তখনই বই শেষ। আর যে গোস্টরাইটিংয়ের কনসেপ্ট ধরে বইটা লেখা, সেই গল্প লেখক আগেই এক ছোটগল্পে বলে দিয়েছেন বলে নতুনত্ব একটু কম ছিল। অ্যাবসার্ড কিছু ঘটনা ঘটিয়ে লেখক জাদুবাস্তব একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। ভালো প্রচেষ্টা অবশ্যই। তবে মুরাকামি প্রভাব একটু বেশিই স্পষ্ট। সবমিলিয়ে মনে দাগ কাটার মত কিছু না। যতটুক সময় পড়েছি ভালো লেগেছে।
আলভী আহমেদের সাথে আমার পরিচয় ২০২২ এর বইমেলায়। পরিচয়টা সরাসরি না, পরিচয় বাতিঘরে তার অনুবাদ করা মুরাকামির "নরওয়েজিয়ান উড" উপন্যাসের মাধ্যমে।
উপন্যাসটা পড়ে আমার এত ভাল লেগে যায় যে, তার অনুবাদ করা বাতিঘরের মুরাকামির "পিনবল", "হিয়ার দ্য উইন্ড সিং", "সাউথ অব দ্য বর্ডার, ওয়েস্ট অব দ্য সান", " কনফেশনস অব আ শিনাগাওয়া মানকি" কিনতে দ্বিতীয়বার ভাবিনি। এদিকে আমি পড়ে যাই মুরাকামির প্রেমে, এমনকি এখনো অনুবাদ না করা হলেও পড়ে ফেলি মুরাকামির "After Dark” “Men and Women” “A Wild Sheep Chase” “Dance Dance Dance” “Colorless Tzsuru Tazaki and his years of pilgrimage” এর মতন বইগুলো। আমার ক্ষুদ্রকালের পাঠক জীবনে মুরাকামি এক অনন্য অবস্থান নিয়ে ফেলেন।
আলভী আহমেদের অনুবাদ অসাধারণ, মনে হয় যেন মুরাকামি বাংলাতেই লিখেছেন বইগুলো। কেবলমাত্র আমি নয়, আরো অনেকেরই মুরাকামির সাথে, বা আলভী ভাইয়ের সাথে প্রথম পরিচয় মুরাকামি অনুবাদের মাধ্যমেই। আলভী ভাইয়ের হাত ধরে পরিচিত হই মুরাকামির সাথে, আবার মুরাকামির লেখার প্রেমে পড়ে আলাদা করে চিনতে পারি আলভী ভাইকে।আলভী আহমেদ এর নতুন উপন্যাস "গোস্টরাইটার" পড়ে আমার মনে হচ্ছে যে আমি হারুকি মুরাকামিরই নতুন কোনো অনুবাদ উপন্যাস পড়ছি, কেবল প্লট, স্থান ভিন্ন। পুরো উপন্যাসেই সাররিয়েলিজম ও ম্যাজিক রিয়েলিজমের ছাপ স্পষ্ট, প্রোটাগনিস্টকে দেখা যায় একজন মাঝবয়সী নি:সঙ্গ লেখকের চরিত্রে, যার জীবনে কোনো পিছুটান নেই, নেই কোনো ভবিষ্যৎচিন্তা,যে কেবল দিনের কাজ দিনে করেই খেয়েপড়ে বেঁচে থাকে।মুরাকামির উপন্যাস পড়েছেন এমন যে কেউ বুঝতে পারবেন এর সাথে তার উপন্যাসের প্রটাগনিস্টের কতটুকু মিল।
"গোস্টরাইটার" উপন্যাসের সারকথা এই যে, প্রোটাগনিস্টকে একটা উপন্যাস রিরাইটের কাজে এসাইন করা হয়,যেখানে ছদ্মলেখক হিসেবে সে একজন নামকরা আমলার লেখা পলিটিক্যাল স্যাটায়ারকে সহজ ভাষায় রিরাইট করবেন। সেখানে তিওমান নামক এক কাল্পনিক রাজ্যের কথা উল্লেখ রয়েছে, যে রাজ্যে কারেন্সি বলতে রয়েছে মূলত রক্ত ও স্মৃতি: একজন ব্যক্তি নিজের রক্ত ও স্মৃতি বিক্রির বিনিময়ে জীবনধারণ করতে পারেন। ধনীরা এত ধনী হয়ে গিয়েছে - সেখানে তাদের অর্থের আর বিশেষ কোনো মূল্য নেই।তারপরে লেখক ও ছদ্মলেখক, সাথে বই প্রকাশক সবাই-ই ঝামেলায় পড়ে যায়, পলিটিক্যাল এই বাধা উতরে গোস্টরাইটার কি লিখতে পারবেন উপন্যাস- তাই হলো উপন্যাসের কাহিনী।(লেখকের "আফরিন" গল্পগ্রন্থে অলরেডি গল্পটা রয়েছে।)
“You’re not alone in the universe, somewhere you’re connected with another” - মুরাকামির লেখায় এটি একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই উপন্যাসেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই, গোস্টরাইটারের সাথে আরিয়ার পরিচয়ে। সেও একি সাথে নিয়ে যায় ম্যাজিক রিয়েলিজমের দুনিয়ায়, বাস্তব যেখানে মিশে থাকে অবাস্তবের সাথে। মুরাকামির সাথে সাথে এই উপন্যাসে উঠে আসা আরবান লাইফ, মদ-বার, অবাধ স্বাধীন যৌনতা, এটাচমেন্টের শৃঙ্খলে টানাপড়েন, ম্যাজিক রিয়েলিজম ও পলিটিক্স সবকিছু যেন টেনে নিয়ে যায় মুরাকামির "1Q84” উপন্যাসে, মুরাকামির যেকোন উপন্যাসেই।
এত বার মুরাকামি কেন বলছি, তা নিয়ে কারো প্রশ্নটা থাকা অবান্তর না। কিন্ত "গোস্টরাইটার" পড়ে অনেস্টলি আমার এটাই মনে হয়েছে যে লেখক চেষ্টা করেছেন মুরাকামি ঘরানাতেই,মুরাকামির প্রতি ট্রিবিউট রেখেই কিছু লিখতে। মুরাকামি ফ্যান যে কারোই বইটা ভাল্লাগবে।
কিন্ত, যদি আমার "মুরাকামি প্রেমী" স্বত্তার বাইরে গিয়ে আমাকে উপন্যাসটা যাজ করতে বলা হয়, আমি বলব যে উপন্যাসটা আমার অনেকগুলো কারণেই ভালো লাগে নি।
প্রতিটি উপন্যাসই একটা প্লট, পরিবেশ, সংষ্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে উঠে, যেখানে লেখনী যত এগিয়ে চলে - সেই সমাজের সমাজবাস্তবতা আমাদের চোখে পরিষ্কার হয়ে আসে। একটা ভালো উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যই হলো এই যে সেটা একটা সুনির্দিষ্ট সময়, স্থান, ঘটনাকে ধারণ করতে পারে। "পথের পাঁচালী" বাংলার প্রেক্ষাপটে একটি ভালো উপন্যাস, কিন্ত একি ঘটনাকে কেবল চরিত্রের নাম পাল্টে ইউরোপে তুলে ধরলে তা ভাল নাও হতে পারে,মানুষ সেটাকে রিলেট না করারই সম্ভাবনা বেশি।
মুরাকামি তার উপন্যাসগুলোতে মূলত জাপান-আমেরিকার কালচার তুলে আনেন, যার সাথে বাংলাদেশের কালচারের ভালোই পার্থক্য আছে। এখানে মন চাইলেই ঘরে স্বামী রেখে আরেক লোকের সাথে লিভ টুগেদার করা যায় না যেখানে স্বামীর কোনো দ্বিমত নেই, একি চাদরে ঢেকে ছেলে মেয়ে বাড়ির ছাদে গাজা টানতে পারে না, বারে গিয়ে মদ সাটাতে পারে না, মুরাকামির উপন্যাসের ন্যায় বেশিরভাগ নারী ক্যারেকটার সিগারেট খায় না।(আপনি করতে পারেন, সেটা আপনার স্বাধীনতা, কিন্ত এটা আমাদের কালচার না,এখানে এটা নরমাল না। সেন্টি খেয়ে এসব লিখতেসি এমন না,কি বলতেসি আগে বুঝার চেষ্টা করেন।উপন্যাসটা তবে কি ঢাকাকে পোট্রে করে?)
আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের সাথে এই কালচার যায় না। সবকিছু ছেড়েছুড়ে ঘরে বসে মদ,বিড়ি,নুডলসের সাথে এক বোহেমিয়ান জীবন ও হ্যালুসিনেশন সবকিছুই একেবারে যেন খাপে খাপ মিলে যায় - কিন্ত ঢাকার কালচারের সাথে নয়,মুরাকামির সেই জাপান আমেরিকার কালচারের সাথেই। কেবল মুরাকামির "মিউজিক ডিটেইলিং" টা থাকলেই সব খাপে খাপ মিলে যায়, মনে হয় যেন মুরাকামিরই আরেক বইয়ের অনুবাদ পড়তেসি।
Creative কিছু পেলাম না,যারপরনাই আমি হতাশ। নতুন কিছু কই? লেখকের নিজস্বতা, অনন্যতা কই? এমনকি উপন্যাসের শেষে প্রেমিকার কাছে একটুখানি আশ্রয় পাবার আকাঙ্খা,আমরা কেউই যে একা বাঁচতে চাই না- সেটাও পুরোপুরি মুরাকামি ধাঁচে লেখা। “Where it all started” এর মিনিং বুঝেই বলছি, এটাও মুরাকামির লেখায় বহুবার পড়া শেষ। আরিয়া সায়রা হয়ে ধরা দিয়েছে, এইতো?
এত কথা লেখতাম না,কিন্ত অনুবাদক আলভী আহমেদ আমাকে যতটা অভিভূত করেছিল, লেখক আলভী আহমেদ আমাকে যেন ঠিক ততটাই হতাশ করলো।আমি কেন কাউকে সাজেস্ট করব ৬০০ টাকা মুদ্রনমূল্যের এই বই সে কিন���ক, আমি তার রিজন খুঁজে পাচ্ছি না। কেন যেন বিরক্ত লাগতেসে অনেক।মুরাকামি প্রেমীরা পড়ে জানাইয়েন কেমন লাগলো।
এই বই নিয়ে 'লেখার ইচ্ছা আমার পুরোদমে আছে,কিন্তু স্টার্টিং পয়েন্ট টা মিসিং' এই লাইনটাও বই থেকে নেয়া।
যাই হোক,আপনি একদিন খেয়াল করলেন আপনার ছায়া নেই।ভাবতে ভাবতে মনে হলো অদ্ভুত একটা শর্তের বেড়াজালে পড়ে আপনার ছায়াকে নিজ থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে। আদৌ কি ছায়া ছাড়া কোনো জড় পদার্থ হয়?
বছর দুয়েক আগে ফ্রান্সেস হাডসন বার্নেটের একটা বই পড়েছিলাম,'দ্য সিক্রেট গার্ডেন'।অর্ধেক অব্দি পড়ে নিজস্ব ইমাজিনেশনে অন্য আরেকটা গল্প বানিয়ে চরিত্র হয়েছিলাম আমি নিজে।আশ্চর্য তখনো আমি সুরিয়েলিজম কি এটাও জানতাম না।ভাগ্যিস একজন আঁদ্রে বেত ছিলেন নয়তো জীবনানন্দ দাশের কবিতা কিংবা গোস্টরাইটার উপন্যাসের লেখা হতো না।প্রসঙ্গ টেনে টেনে ভুলভাল কথা বলা আমার জাত স্বভাব।উপন্যাসে ফিরি।
মূল চরিত্র বোধ করি ৩৭ বছর বয়সী মাইন।একটা উপন্যাস রি রাইট করার দায়িত্ব পেলে আপনিও কি মাইনের মতোন এথিক্যাল ব্যাপার স্যাপার টেনে আনবেন?এরপরেও নিজের অস্তিত্ব টেকানোর স্বার্থে এসব না আনাই ভালো��এই প্রশ্ন উত্থাপনের জন্যই ফিলোসোফিতে mercy killing উদাহরণের উৎপত্তি।একদল বলে গেছেন,এথিকস ধুয়ে পানি খাওয়ার দিন শেষ। মাইন ও এই পথেই হেঁটেছে।প্রথম প্রথম একটু ফিল্ম ফিল্ম ভাইভ মনে হলেও আরিয়া চরিত্রটির শুরুর দিকটা সুরিয়েলিজমের ফিল আনে একটু একটু করে।একটা পর্যায়ে এসে আফরিন গল্পের মিল পেয়েছি,আফরিন না পড়ে থাকলে এ ব্যাপারটাতেও থ্রিল পাওয়া যেত।
এরপর আসলে কি হয়?
বইটা শেষ করে সকল ঘটনাবলি দ্রবীভূত হয়ে কেবল একটা সংলাপ ই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে-
"ডানের কন্ঠ উত্তর দিল না,বাঁয়ের কন্ঠ মৃদুস্বরে বললো,'আমরাও এই লাইব্রেরিতে এসেছিলাম।তারপর বইয়ের মাঝে আটকা পড়ে গেছি।"
বইয়ে ঘটনাবলির যতটুকু বিস্তর,আমার কথাবার্তায় তার সিকিভাগ ও নেই।দুঃখিত....
গতবছর "আফরিন" যখন পড়া শুরু করছিলাম তখন নাম গল্পের পর আর বেশিদূর আগাইতে পারি নাই কারণ চিরাচরিত আলভী ভাই সেখানে মিসিং। উনার লেখা টানা যায় না এইটা একটা রেয়ার কেস। ব্যক্তিগতভাবে আমার আলভী ভাইয়ের লেখা ভাল লাগার একটা বিশেষ কারণ আছে, লেখায় আধুনিকতার একটা স্মেল আছে। সবাই ই চিরাচরিত একটা কনভেনশনাল প্যাটার্ন ফলো করেই লিখেন কিন্তু আলভী ভাই সেই ধারাটায় কিছুটা পরিবর্তন আনছেন, যেমন ক্যাজুয়াল একটা টোন আনা লেখায়।
আফরিনের অপূর্ণতাটুকু গোস্ট রাইটারেই কাটায়ে উঠছে আমি মনে করি। "আফরিন" আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে আলভী ভাইয়ের সেরা লেখা মনে হয় নাই। কিন্তু, গোস্টরাইটার ব্যক্তিগতভাবে আমার বেশ ভাল লাগছে।
গোস্ট রাইটারের শুরুটা পড়ে মনে হচ্ছিল মুরাকামির 1Q84 এর মতন। গল্পের নায়ক মাইন সাহেব ও 1Q84 এর টেঙ্গোর মতন গোস্ট রাইটিং করে। প্লট দুর্দান্ত কিন্তু লেখনী দূর্বল একটা উপন্যাস কে রিরাইট করার কাজ। কাহিনীটা গোস্ট রাইটিং এই শেষ হতে পারত কিন্তু লেখকের প্ল্যান ছিল অন্য। তিনি গল্পের শেষে সুররিয়েলিজম এর ছোঁয়া দিছেন।
গতবছর সুররিয়েলিজম এর বই নিয়ে উনার পড়াশোনা, লেখালেখি খুব সম্ভবত এই উপন্যাসকে কেন্দ্র করেই ছিল। কথ্যভাষায় গল্পের নায়ক মাইনের ভাষ্যে কাহিনী ন্যারেট করা হইছে। বইয়ে লেখা অনুসারে, কোন গল্প থার্ড পারসন ন্যারেটিভ থেকে না দেখায়ে ফার্স্ট পারসন ন্যারেটিভে দেখাইলে বেশি আকর্ষণ করে। মাইনের করুণ একটা ফেসবুকের স্ট্যাটাস দিয়ে শুরু করায় এবং ফার্স্ট পারসন ভিউ তে কাহিনী ন্যারেট করায় পাঠকের সাথে ইমোশনাল কানেকশন টা জোরদার হইছে।
আলভী আহমেদের লেখায় নারীরা রহস্যময়ী, তারা অদ্ভুত জগতে ভ্রমণ করে, আগে থেকে ভবিষ্যৎ বলতে পারে কিংবা তারা সামিরার মতন রেকলেস এবং অদ্ভুত হয়। ক্ষমতার ট্রায়াংগেল, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন দিক কিংবা বিভিন্ন জায়গায় নেপোটিজমের বিষয়গুলা ভাল লাগছে পড়ে। ওভারলি একটা ভাল রিড। অনেকদিন পর এক বসায় কোন একটা বই শেষ করলাম। রেকমেন্ডেড।
৩.৫/৫ দিলাম। আলভী আহমেদের লেখার মাঝে কেমন জানি মাধুর্য আছে।চুম্বকের মত টানে তার লেখা।একবার শুরু করলে শেষ না করে উঠা যায় না।বর্তমান সময়ের লেখকদের মধ্যে তিনি অন্যতম।ধারালো তার লেখনি।শব্দের খেলা যেমন তিনি খেলতে জানেন,তেমনি কাহিনির গভীরতাও অনেক।বই শেষ করেও আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে।ঘোর কাটতে সময় লাগবে। গুড রিড।
ইশিগুরো ২০১৭ সালে নোবেল পাওয়ার পর কারও একটা কমেন্ট এখনো আমার মনে আছে। মিক্স কাফকা উইথ জেন অস্টিন অ্যান্ড অ্যাড সাম মার্সেল প্রুস্ত, ইউ উইল গেট ইশিগুরো। তো, আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ ভালোই লাগছে যে, কেমিস্ট্রি ল্যাবের মতো বিভিন্ন রেশিওতে লিকুইড ফিকুইড মিশাইয়া নতুন কিছু বানানো, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন কালারের, অদ্ভুত ধোঁয়াও ওড়ে।
আর্ট অফ ফিকশন সিরিজে মুরাকামির ইন্টারভিউ যারা পড়েছেন তারা জানেন যে উনি এক পর্যায়ে উপন্যাস নিয়ে কথা বলছেন। বলছেন, এই সময়ে যে কোন কিছুর চাইতে ভিডিও গেমস ফিকশনের অনেক কাছাকাছি। আর নিজের উপন্যাস নিয়ে বলছেন যে, ব্যাপারটা সিনেমার সেটের মতো যার দেয়ালগুলো কাগজের। তো, গোস্টরাইটার উপন্যাসের সেটে এই লাইটনেসটা কখনো কখনো ছাপিয়ে উঠে খুবই সিরিয়াস হয়ে উঠতেছিল আবার পারদ নিচে নেমেছে অবশ্য। রাইটারের সিগনেচার বলে মনে হলো না। আর আলভী আহমেদের মুরাকামি কিংবা হুমায়ূন প্রীতি এবং প্রভাব নিয়ে নতুন কিছু বলার নাই।
চার স্টার যেহেতু দিছি, ভাল্লাগছে অনেক উপন্যাসটা পড়ে। আসলেই ভাল্লাগছে। মন মিটিয়ে পড়ে শান্তি পাইতাম যদি -
১. উপন্যাসটা ২৪০ পেইজ না হয়ে ৫০০ এর কাছাকাছি পেইজের হতো।
২. যেটা আগে বললাম, সিরিয়াস কিছু জায়গা যদি আরও লাইট হতো।
৩. ডায়লগগুলা সরাসরি কাহিনি আর ন্যারেটিভের অনুগামী না হয়ে ডায়লগ ইটসেলফ যদি কোন রিয়েলিটি বা ফ্যান্টাসি তৈরি করতো।
৪. মুরাকামির 1Q84 উপন্যাস থেকে কিছু ক্রাফট আর সেট আপ নেওয়া, সেটা ব্যাপার না কিন্তু বইয়ের মাইন আর আরিয়ার আম্মার কাহিনি বানাইতেও ঐ উপন্যাসের দ্বারস্থ হওয়াটা ভাল্লাগে নাই। শুধু গোস্টরাইটিং এর ব্যাপারটা আর সেট আপটা নিয়ে বাদবাকি নিজের মতো লিখলে ভাল্লাগতো। অবশ্য এইসব রিডার হিসেবে হুদাই এক্সপেকটেশন। তাও আবার পড়ার পর। হাহা।
৫. কিছু কিছু জায়গায় কমিক করার ট্রাই করলেও মোমেন্টা একই সাথে হালকা এবং কমিক্যাল হয়ে উঠে নাই যেটা মুরাকামিতে আছে। যেমন, মাইন যখন ব্যাড গাইদের কাছে আটকা, তারে ওরা কিছু বলে না, খালি স্যান্ডউইচ খাওয়ায় তখন তার মনে হয়, পৃথিবীর যাবতীয় স্যান্ডউইচগুলো খাওয়ানোর জন্যই যেন তারে নিয়ে যাওয়া হইছে। উপন্যাসে কমিক্যাল মোমেন্ট সার্ভ করা উচিত আরও ওয়ার্মলি আরও বিলো ওয়েটে এবং অবশ্যই একেবারে মানডেন কোন মোমেন্টে।
বকবক করলাম। এইবার বলি একটা ব্যাপার যেটা ব্যাপক লাগছে আমার। তা হইলো, ফ্ল্যাপে আলভী আহমেদের ছবিটা। জোশ! মুরাকামির উপন্যাস বা গল্পের কোন প্রটাগনিস্ট দেখতে ঐরকমই হওয়ার কথা।
বইটা শেষ করলাম। তারপর একটা স্ট্যন্ডিং অভেশান দিলাম হাত তালি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। বলা বাহুল্য এখানে পাঠক থেকে শুরু করে স্ট্যন্ডিং অভেশান দেওয়ার পুরো দায়িত্ব পালন করছি আমি একা। বাট দ্যাটস নট দ্যা কেইস হিয়ার । সমস্যা হলো এতোটা ভালো লাগলো কেন?
একটু রিস্ক নিয়ে যদি বলি সময়কে ধারণ করার অসাধ্য সাধন করে চমৎকার একটা আবেশে ঘোর উৎপন্ন করার জন্য আমার থেকে এমন রিয়েকশন আসলো। একদম চূড়ান্ত আমাদের ভাষা ( শহুরে মধ্য বিত্ত আমাদের) যা কীনা ইংরেজি, বাংলা ( গালি সহ) মিশিয়ে তৈরী তার মাধ্যমে লেখক গড়ে তুলেছেন এই সময়ের আখ্যান। মাইন এর সম্পর্ক বিষয়ক ক্রমাগত লুপ তৈরি হওয়া জটিলতা, তার লেখক জীবন, গোস্ট রাইটার হওয়ার সূচনা, সামিরা - কাশফি - আরিয়ার সাথে তার কথোপকথন প্রত্যেক জটিল অস্থির অবস্থায় আমার মতো পাঠক উপলব্ধি করতে চায় ব্যক্তির মৌলিক অবস্থানের উপর অস্থিরতা লুকিয়ে আছে ঠিক কোথায়। তার সাথে কী অতীত স্মৃতি জড়িত? হুমম হতে পারে। কিন্তু শুধু এতোটুকু হওয়াটা স্বাভাবিক নয়। এই অস্থিরতা তৈরি করতে সমাজ এর ভূমিকা আর রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভূমিকা কী তারও একটা স্পষ্ট আলামত পাওয়া যায় মাইন চরিত্রে অন্তত আমার দৃষ্টিতে। আবরার সাহেব তিওমান ( কল্পিত বাজে চরিত্রের একটা রাষ্ট্র তবে বাংলাদেশের সাথে প্রচুর মিল) নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। উপন্যাস থেকে প্রবন্ধ এর ঘ্রাণ ঝেড়ে ফেলতে চান। মাইন এর কাজ গোস্ট রাইটার এর এটা প্রথমেই ধরে ফেলা যায়। তো মূল কথা হলো এটা আউটস্ট্যান্ডিং লাগে কেন? কারণ এর গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে আগে থেকে কাজ করা উত্তেজনা আর সেই উত্তেজনা যখন বেড়ে যায় একটা ঘটনা শেষ হওয়ার পরে৷ আরো জানতে ইচ্ছে হয়, আরো বুঝতে ইচ্ছে করে এবং আরো ভাবতে ইচ্ছে করে। আবরার সাহেব আর তাকে মাঝখানে রেখে ঘটে চলা ঘটনা আমাদের একটা সময় নো ম্যানস ল্যান্ড এ এনে থামি দেয় এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উসকে দেয় আর ঠিক তখনই ইচ্ছে করে বর্তমান যা কীনা সমসাময়িক বা কন্টেমপোরারি তার সাথে সবকিছুকে আবার মিলিয়ে দেখতে। আর এজন্যই আমার মতে আলভী আহমেদ এর এই উপন্যাস সমসাময়িক সাহিত্য এর একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে পঠিত হতে থাকবে এবং একটি মাইলফলক হয়েও বেঁচে থাকতে পারে শেষাংশ এর আক্ষেপ এর পরেও।
প্রথমে যদি ভালো দিক দিয়ে শুরু করি, তাহলে বলা যায়, লেখক Suspense ভালো রেখেছেন । আমি অধ্যায়ের পর অধ্যায় পড়েছি, এর পর কি হবে জানতে। তাই ২ দিনেই বইটা শেষ হয়। সমসাময়িক কিছু বিষয়ও চলে এসেছিল গল্পে, যেটা গল্পটায় খুব সামান্য হলেও Political thriller vibe টা আনতে পেরেছে।
আমার সাধারণত "গল্পের মধ্যে গল্প" ব্যাপারটা খুবই পছন্দ। কিন্তু এখানে দুটো গল্পের একটিও শেষ হয় নি। শেষটা, আমার খারাপও লাগে নি, আবার ওভাবে মনেও ধরে নি।
এখন ভালো লাগেনি যে বিষয়গুলো সেটি যদি বলতে চাই, তাহলে প্রথমেই আসবে ভাষা।
এটা আমার পড়া লেখকের প্রথম বই, তাই জানি না, ওনার লিখার ধরণই এরকম, নাকি উনি শুধু এই বইয়ের চরিত্রের জন্য এমন ভাষার ব্যবহার করেছেন। আমি ব্যাক্তিগতভাবে শুদ্ধ প্রমিত বাংলা ভাষা পছন্দ করি গল্প পড়ার সময়। কিন্তু "করসে” " খাইসে" এই সব শব্দের আধিক্যে পড়তে সমস্যা হচ্ছিল। আর ইংরোজি শব্দের অত্যাধিক ব্যবহারে, লিখাটি একটু কলকাতার লেখকদের মত মনে হয়েছে। গল্পের flow ভালো থাকলেও, প্রত্যেকটা গল্প অপূর্ণ থাকায় একটা খালি খালি ভাব রয়ে গেছে বইটায়। ছায়ার ব্যাপারটাও অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। বই শেষমেষ কল্পকাহিনীতে পরিণত হবে, নাকি thriller সেটাও ঠিক মত বোঝা যায় নি।
আমি গল্পের পূর্ব কথা পড়ে, একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম, লেখক কি গল্প শুরু করে দিয়েছেন? 🤣 কারণ এই status এ একটা চরিত্রের frustration টা খুবই বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করে পেরেছেন। তাই অবাক হলাম, এটা কি গল্পের অংশ না "লেখকের কথা" ?
আমার কাছে বইটি তিন তারকা পেল, কারণ excitement নিয়ে পড়েছি, কিন্তু একটা অপূর্ণতা রয়ে গেছে।
আলভী আহমেদ এর সাথে আমার পরিচয় " মুরাকামি " দিয়ে। " পিনবল,হিয়ার দ্য উইন্ড সিং " মুরাকামির এই দুইটা বই আমি আলভী'র অনুবাদে পড়েছিলাম। ভালো লেগেছিল খুব।
লেখক সম্পর্কে আগ্রহী হলাম। তার মৌলিক লেখা পড়ার ইচ্ছে জাগলো। পড়লাম "লোনলি অক্টোবর "। একটুও ভালো লাগেনি। কোন গভীরতা নেই,পলকা লেখা। এলোমেলো। টানা পড়া যায়,কিন্তু পড়া শেষ হলে,আর কিছু নায়! খুব বিরক্ত হয়েছিলাম। বিরক্তি স্বত্তেও তার লেখা পড়ার ইচ্ছে তখনো ডুবেনি! প্রমাণ আমি " গোস্টরাইটার" পড়ে শেষ করেছি।
গোস্টরাইটার। ২৪০ পৃষ্ঠার বেশ হেলদি একটা বই। মোটা বইয়ে আমার একটু ভয় আসে। শুরু করি বেশ ভয় নিয়ে। "গোস্ট রাইটার" ও তেমনি ভাবে শুরু করলাম। পড়তে গিয়ে দেখি,তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। বেশ তড়তড়িয়ে পড়া যাচ্ছে।
পড়ে ফেললাম। একদিনে টানা পড়ে শেষ করেছি। সহজ ভাষার গদ্য হওয়াতে তেমন ঝুট ঝামেলা হয়নি। শুরু তে বেশ ভালোই লাগছিলো পড়তে। বেশ জমাট একটা রহস্যের গন্ধ। রহস্য ধরে খুব চমৎকার ভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলো গল্প। মাঝখানে আবার গল্প ঢুকল। সেটাও তাল মিলিয়ে যাচ্ছিলো ভালো-ভাবে,সুর তখনো কাটেনি। হঠাৎ শেষ এসে দেখি কেমন জানি আর গল্পের প্রাণ নায়। পড়তে ভালো লাগছে না। জগাখিচুরি পাকিয়ে ফেললেন।
আলভী সাহেব সিনেমা জগতের লোক। স্ক্রিপ্ট লেখার গুণগত বৈশিষ্ট্য তার থাকবে, সেটা জানা কথা। তার লেখা পড়ে, আরো স্পষ্ট হলো বিষয়টা। তবে "উপন্যাস " আর নাটক/সিনেমার স্ক্রিপ্টে ভিন্নতা আছে। প্রথমত আলভী সাহেবের এই জিনিসটা বোঝা উচিত। " উপন্যাস " সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। শুধু গাদা গাদা সংলাপ আর এক ঘটনার সাগর সমান ডিটেলিং দিলেই উপন্যাস হয়ে যায় না। লেখার প্রাণ থাকতে হয়,গল্পটার মধ্যে অনুভূতি ছুঁয়ে যাবে এমন উপাদানের সমষ্টি দরকার। শুধু মদ আর সিগারেট দিয়া উপন্যাস হয় না।
আলভী সাহেবের গদ্য ভালো। সাবলীল। তবে উনার উপন্যাস নিয়ে আরো বিস্তারিত কাজ করা দরকার। ভালো বই পাঁচ বছরে মিলে একটা আসলে,সেটাই সই। বছর বছর নতুন বই পয়দা করা লাগে না।
ঘুমের ভেতর আমরা স্বপ্ন দেখি। নানারকম স্বপ্ন। কিছু মনে থাকে, কিছু থাকে না। কিছু স্বপ্নের বিষয়বস্তু বেশ গোছানো থাকে, আবার কিছু কেমন অগোছালো! ঘুম ভেঙ্গে গেলে স্বপ্নগুলোও হারিয়ে যায়। স্বপ্নের মাধ্যমে আমরা অনেক সময় হারিয়ে যাই নতুন কোন জায়গায়, অপরিচিত কোন পৃথিবীতে। অনেক সময় ঝটকা লেগে ঘুম ভেঙ্গে যায়, পাহাড় থেকে পড়ে যাচ্ছি এই ভেবে! চোখ খুললেই সব ঠিক!কিন্তু এই স্বপ্নের জগতের কিছু ফ্র্যাগমেন্ট যদি বাস্তবতার সাথে মিশে যায়, তখন ব্যাপারটা কেমন হবে? ভীষণ অদ্ভুতুড়ে, তাই তো? সুররিয়ালিজমের ধারণাটা মনে হয় অনেকটা এরকমই।
সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ-এই শব্দের সাথে আমার প্রথম পরিচয় Salvador Dalí-এর আঁকা ছবিগুলোর মাধ্যমে। খুব বেশি পড়াশোনা নেই আমার এ বিষয়ে। তবে এটুকু বুঝতে পারি যে, নিজের কল্পনাকে কোন একটি ফর্মে উপস্থাপন করা। হতে পারে ফর্মটা লেখালেখি, হতে পারে ছবি আঁকা।মানুষের কল্পনার রাজ্য বৈচিত্র্যময়। সবকিছুই সম্ভব সেখানে। বাস্তবতার সাথে কল্পনার কিছু টুকরো মিশিয়ে তৈরি গল্পগুলো বেশ উপভোগ্য মনে হয় আমার কাছে।
মাইনের গল্পটাও সেরকম কিছু। খ্যাপাটে, চাকরি হারানো, নিকোটিন নির্ভর মাইন কি আসলে ঢাকার কোন সুবিশাল অট্টালিকার ১৬ তলার ছোট্ট একটা স্টুডিও এপার্টমেন্টের বাসিন্দা, গোস্টরাইটার হিসেবে যে নিজের লেখক স্বত্বাকে ভাড়া দিচ্ছে? নাকি সে তিওমান সম্রাজের অ্যারন, যে কিনা মেয়ের জন্য জরুরী একটা ইঞ্জেকশন কিনতে দিশেহারা হয়ে ঘুরছে। বেচবার জন্য দিশেহারা অ্যারনের কাছে না আছে কোন সুন্দর স্মৃতি, না আছে রক্ত। তিওমানে টাকা দিয়ে কিছু কেনা যায় না!
আমার পড়া আলভী আহমেদের তৃতীয় বই এটা এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভালো লাগা। তিওমান রাজ্যের কথা গল্পে আসা মাত্রই মনে হলো যে এই গল্প তো আমি জানি! পরে মনে পড়লো যে আফরিন বইটা দিয়ে গত বছরের বই পড়া শুরু করেছিলাম, সেখানে ছোটগল্প হিসেবে আছে তিওমান। কাকতালীয় ব্যাপার হলো, এ বছরও বই পড়া শুরু করলাম ওনার লেখা দিয়েই! আলভী আহমেদের লেখাগুলো অনেকটা একই ধাঁচের, ঐ যে সুরিয়ালিস্টিক একটা টাচ থাকে। কিন্তু পড়তে বেশ ভালো লাগে। ওনার লেখা বেশ এঙ্গেজিং। স্পেশালি এই বইয়ে আমি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি আরিয়ার অংশটুকু। একটা মানুষের ছায়া হারিয়ে যাওয়ার মতো অদ্ভুত ব্যাপার আর কিছু হতে পারে বলে মনে হয় না। খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল টপিকটা। তবে এই টপিকের একটা প্রোপার এন্ডিং আশা করেছিলাম। লেখক খুব নিরাশ করলেন এই ক্ষেত্রে! এরকম ওপেন এন্ডিং চাই নি আসলে। শেষটা আরেকটু গোছানো হলে পুরো ব্যাপারটা জমে যেত।
কেমন জগৎ এটি? আসল নাকি মন এর ভুল? ছায়া কী ছিনিয়ে নেয় যায়? ছায়া ছাড়া কী মানুষ হয়? বই পড়তে পড়তে আমরা সবাই কল্পনার জগৎ এ ঢুকে পড়ি কিন্তু যদি হটাৎ একদিন দেখতে পায় ঐ জগৎ আসল এর পর কী করণীয় হবে আমাদের? দু জন লেখক এর কথা এখানে বলা হয়েছে। দু জন এর চিন্তা ভাবনা আলাদা লেখার ধরন আলাদা কিন্তু দু জন ই প্রচুর মাত্রায় বই পড়েছেন এবং টুকি টাকি বই ও লিখেছেন।মাইন মূলত আবরার ফাইয়াজ সাহেব এর গোস্ট রাইটার হিসেবে কাজ হাতে নেয় যেখানে আবরার সাহেব এর লেখা একটি গল্প তিনি রি-রাইট করবে আরেকটু সুন্দর ভাষায়। মাইন এবং আবরার ফাইয়াজ যে গল্প নিয়ে একসাথে কাজ করছে গল্পটি একটি অদ্ভুত পৃথিবী নিয়ে ।কিন্তু তার লেখা এই গল্প এই কাহিনি কোনো একজন নিজে দেখে এসেছে প্রায় বহু বছর আগে।এবং তিনি তা জানেনই না। তার মতে এটি একটি কাল্পনিক রাজ্য যা শুধু বই এর পাতা পর্যন্ত সীমিত।তাহলে এই গল্প তার মাথায় কেমনে এলো? তার লেখা এই পৃথিবী কী আসলে সত্য?ঐ পৃথিবীতে ঘটা প্রত্যেকটা জিনিস কী আসল? মাইন তার সোজা সাপটা জীবন থেকে এ কোন গোলক ধাদায় ঢুকে গেলো? মাইন যখন কাজটি করতে সম্মতি জানলো তখন সে জানেই না তার বাস্তব আর কল্পনার মাজখানের দেয়ালে ফাটল পড়বে। সে ক্রমশৌ হারিয়ে ফেলতে থাকবে তার ছায়া।গল্প শুরু হয় খুব সাদারণ কিন্তু গুরত্ব পূর্ণ জিনিস দিয়ে।প্রত্যেকটা সেক্টর এ হওয়া অসৎ কাজ আর কেমনে অসৎ কাজ না করলে চাকরি থেকে হাত ছাড়া হতে হয়। কিন্তু পাঠকের জন্যে পরে কী অপেক্ষা করছে তা লেখক আলভি আহমেদ গুণখোরেও বোঝতে দেয়নি।বইটিকে আরও ভালো মানের করার পিছনে শুধু রহসময়ী কাল্পনিক জগৎ এর পাশে আছে পলিটিক্যাল এবং আইন সংক্রান্ত বিষয় ও। রিয়েলিটির আড়ালে তিনি লিখেছে একটি সারিয়াল জগৎ কিন্তু মাজখানে সব ধরনের ধান্দা বাজ মানুষদের মুখোশ আলতো ভাবে দেখিয়ে দিলেন।বই এ মাইন এর হিউমার আমার সব চেয়ে প্রিয় জিনিস ছিলো।একজন লেখক বই লেখার সময় কী কী চিন্তা করেন তা খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু গল্পের শেষটা কেনো জানি মন মতো হয়নি। পুরো গল্পে জানার যে খোরাক ছিলো তা মিটাতে পারেনি।
লেখার মান এবং গল্প বলার ধরণ বেশ ভালো লেগেছে। চরিত্র গঠনের দিক থেকেও উপন্যাসটি প্রশংসনীয়। তবে চরিত্র সামিরাকে কিছুটা বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। প্রথমদিকে তাকে একেবারেই নির্ভার ও দায়হীন একজন মানুষ মনে হয়েছিল, যে ভালোবাসা কিংবা অপরাধবোধে সহজে জড়াবে না। কিন্তু শেষে গিয়ে চরিত্রটির পরিবর্তন এলো, যা আমার কাছে খানিকটা অসংগতিপূর্ণ লেগেছে।
এছাড়া বইয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। যেমন—ছায়াটি কেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল, সেটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বিষয়টি রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে, যা আমার ভালো লাগেনি। আবার, সরকার কেন আবরারের লেখা উপন্যাস প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছিল, সেটিও পরিষ্কার হয়নি। এমন আরও কয়েকটি জায়গায় উত্তরহীন প্রশ্ন থেকে গেছে, যা পাঠকের কাছে অর্থবোধক মনে নাও হতে পারে।
আমার মতে, উপন্যাস শেষ করার সময় এ ধরনের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র রহস্য হিসেবে ফেলে রাখা সবসময় ভালো কৌশল নয়। তবুও, আমি বইটিকে ৪ স্টার দিয়েছি, কারণ লেখার ধরণ ও গল্পের গঠন সত্যিই প্রশংসনীয়। লেখকের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজের প্রত্যাশা রাখছি। শুভকামনা রইল।
This entire review has been hidden because of spoilers.
দীর্ঘদিন রিডার্স ব্লকে আটকায়ে থাকার পরে গতকাল তেমন কোনো এক্সপেক্টেশান ছাড়াই বইটা হাতে তুলে নিলাম। যাক, এ যাত্রা ভুল করিনাই। ঠিক থ্রিলার জনরা এর না হয়েও এতটা ক্যাচি ওয়ে তে আমার এটেনশন গ্র্যাব করে ফেলবে বইটা, প্রথমে বুঝিনাই। যতক্ষণে বুঝলাম, ততক্ষণে রাত পেরিয়ে ভোর। ভাবলাম, একটু শুয়ে রেস্ট নিই, ঘুমাই। বাকিটা পরেও পড়া যাবে। ঘুম আসলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। ওমা, ঘুমের মধ্যেও স্বপ্নে গল্পের প্লট নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম! একসময় ঘুম ভাংলে দেখি মাত্র তিন ঘন্টা ঘুমাইছি, অথচ গত তিনরাত আমি না ঘুমানো, আমার উচিত আরও কয়েক ঘন্টা ঘুমানো। কিন্তু গল্প টা কোনোভাবেই মাথা থেকে দূর করতে পারতেছিলাম না। শেষ পর্যন্ত কৌতুহলেরই জয় হইলো। আরও কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে অবশেষে বইটা পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠে পড়লাম। ফ্রেশ হয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে শুরু করলাম পড়া। কখন যে ২৩৯ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস শেষ হয়ে গেলো, টের ই পাইলাম না!
আমার কাছে বইটা বেশ ভালো লেগেছে। পরপর দুইটা বই পড়লাম লেখকের। দুটো বই বেশ দারুণ। লেখকের লেখার স্টাইল দুর্দান্ত , সাধারণ জিনিসকে কিভাবে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হয় উনার লেখাতে তা ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। ছোটছোট কিছু জিনিস যা হয়তো বাদ দিলেও সমস্যা নেই কিন্তু লেখকের লেখাতে সেই জিনিসগুলোর ব্যবহারের কারনে লেখা পড়তে আরো বেশি ভালো লেগেছে। বইয়ের প্লটটাও বেশ সুন্দর। কিছুদিন আগেই লেখকের ছোটগল্প 'আফরিন' পড়া হয়েছিল, সেই বইয়ের একটা ছোটগল্প থেকেই বইটা লেখা। যদিও প্লট আলাদা। যাইহোক, একজন লেখকের গোস্ট রাইটিং নিয়েই বইটা লেখা। বইটা বেশ ভালো লাগলেও কিছু জিনিস আরেকটু ক্লিয়ার করলে হয়তো আরো ভালো লাগতো। বিস্তারিত বললে স্পয়লারের ঝামেলা হতে পারে। সবমিলিয়ে আমার কাছে বইটা ভালো লেগেছে। লেখকের অন্যান্য বইগুলো পড়ার ইচ্ছা রইলো।
আলভী আহমেদের কয়েকটা অনুবাদ পড়া হলেও তার মৌলিক পড়া এটা দিয়েই শুরু আমার।
শুরুতেই অবাক হয়ে গেছি তার চমৎকার লিখনশৈলীর দ্বারা। আর সম্ভবত এটাই তার লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য। এর মানে এই না যে তার প্লট খারাপ। প্লট নিঃসন্দেহে এক্সক্লুসিভ তবে চমৎকার লিখনশৈলীর কারণে সেটাই প্রথম স্থানে এসেছে।
তবে এন্ডিং আশাহত করেছে, ভীষণভাবে। অনেকে বলতে পারেন আলভী আহমেদের লেখায় হারুকি মুরাকামি প্রবল ভাবে উপস্থিত থাকেন, ওপেন এন্ডিং এ সেটা আরো স্পষ্ট। তবে এই বইয়ের ক্ষেত্রে এন্ডিংটা ওপেন না বলে, আমি খাপছাড়া বলবো। চমৎকারভাবে এগিয়ে চলা সুন্দর একটা গল্পের করুণ পরিণতি।
রোজ রাতে ঘুমাতে যাবার আগে আমাকে কিছু একটা পড়তেই হয়। অনেকদিনের অভ্যাস। পড়বো বলে মোটামুটি সারাদিনই বইটা হাতে নিয়ে বসেছিলাম কিন্তু নানাকারনে শুরু করা হয়নি। রাত এগারোটার দিকে প্রায় উথাল-পাতাল ঘুম পাচ্ছে ভাবলাম অন্তত প্রোলগটা পড়ি তারপর ঘুমাতে যাই। এরপর আর বই থেকেই বের হতে পারি নাই। ভোরের দিকে শেষ করে তারপর ঘুমাতে গেছি। গোস্ট রাইটার নিয়ে এর থেকে বেশী বোধহয় আর কিছু না বললেও চলবে৷ Alvi Ahmedকে চিনেছি আফরিন দিয়ে তারপর থেকেই মনে হচ্ছে এই লেখকের সব বই পড়ে ফেলতে হবে। অতিদ্রুত।
চাকরি হারিয়ে বেকার দিন কাটানো পত্রিকার এক সম্পাদক, হঠাৎই সাবেক এক সহকর্মী মারফত একটা কাজের প্রস্তাব পেলো। সাবেক এক আমলা আমরার ফাইয়াজ, যে সরকারবিরোধী কলাম লেখালেখি করে সরকারের কুনজরে গেলেও মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়, সে একটা পলিটিকাল স্যাটায়ার লিখেছে। 'তিওমান' নামের সেই উপন্যাস প্লটের দিক থেকে দুর্দান্ত হলেও আবরার সাহেবের কলাম লিখে অভ্যস্ত লেখনীতে হয়ে গেছে ব্যাপক খটোমটো। তাই আমাদের উপন্যাসের নায়ক মাইনের কাঁধে দায়িত্ব এসেছে গোস্ট রাইটার হিসেবে কাজ করে সেই উপন্যাসকে উপন্যাস বানানোর।
বইয়ের শুরুটা মোটামুটি এমন। একটু স্লো হলেও পড়ে আরাম পাওয়া যাবে এমন লেখা। কাহিনী যত আগায় তত নতুন নতুন এলিমেন্ট এসে যোগ হয়। 'তিওমান' উপন্যাস যে কাল্পনিক দ্বীপরাষ্ট্রকে নিয়ে লেখা তা চলে আসে ঢাকা শহরে, ঢাকা মিশে যায় তিওমানে। সাথে মানুষকে ফলো করে বেড়ানো দাঁড়কাক আর ছায়া হারিয়ে ফেলা মানুষের মতো দু-চিমটি ম্যাজিক রিয়েলিজম। লেখক allegory (এইটার ভালো বাংলা প্রতিশব্দ কী?) টানার চেষ্টা করেছে বেশ কিছু, কিন্তু এক্সিকিউশন খুব একটা যুতসই লাগেনি। বরং শেষের দিকে যেয়ে মনে হচ্ছিলো নিজের টেনে আনা এলেগরি আর ম্যাজিক রিয়েলিজমের মাঝে লেখক নিজেই হিমশিম খাচ্ছে।
এর বাইরে অসমাপ্ত রেখে দেওয়া এন্ডিংটাও ভালো লাগলো না। (যদিও, পৃথিবীর সব গল্পই কি আদতে অসমাপ্ত গল্প না?)। সাথে সুন্দর প্লট আর ঝরঝরে লেখনীর পরও মাঝপথে খেই হারিয়ে ফেলার অনুভূতি থেকেই গেল।
সবমিলে, বই থেকে নেওয়া একটা লাইনই ধার করে বলি, 'তোমার ভাষা ভালো। গদ্য সাবলীল। বাট কনটেন্ট দুর্বল।'