আমার শরীরে তিনটা উল্কি আছে। একটা হচ্ছে প্রাচীন মিশরীয় জাদু (আর পরবর্তীতে অ্যালকেমি)-তে ব্যবহৃত চিরন্তন চক্রের প্রতীক: ওরোবোরোস। দ্বিতীয়টা হচ্ছে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার লাইন, যে লাইনের একটা শব্দের সাথে আমার ডাকনাম মিলে যায়। তৃতীয় উল্কিটা একটা পাতাঝরা ওক গাছের। সেটা একটা জেন কোয়ান থেকে অনুপ্রাণিত। কোয়ানটা এমন:
”একবার এক ভিক্ষু জোশুর কাছে জানতে চাইলেন: আমাদের চিন্তারীতির প্রতিষ্ঠাতা বোধিধর্ম কেন পশ্চিম থেকে যাত্রা করেছিলেন?
জোশু জবাব দেন: বাগানের ওই ওক গাছ।”
আমার জীবনে যে দুটো দর্শন বা চিন্তাপদ্ধতি সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলেছে, সেগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে অস্তিত্ববাদ। অন্যটা হচ্ছে জেন। জেন হচ্ছে বৌদ্ধধর্মের উপশাখা। কিংবদন্তী অনুযায়ী ভারতীয় ভিক্ষু বোধিধর্ম এই চিন্তাপদ্ধতি ছড়িয়ে দেবার জন্য নিজের রাজ্য থেকে পূর্বদিকে, মানে চিনদেশ অবধি যাত্রা করেন। সেখানে পৌঁছানোর পর স্বয়ং সম্রাট উ তাকে স্বাগত জানান। সম্রাট ভিক্ষুকে জিজ্ঞেস করেন—”আমি বহু মঠ আর মন্দির স্থাপন করেছি। বুদ্ধের শাস্ত্রের অনেকগুলো সংস্করণ লিখিয়েছি। আমার যোগ্যতা কতোটুকু?” বোধিধর্ম জবাব দেন: “একটুও না।” এ জবাব শুনে সম্রাট তাকে তাড়িয়ে দেন। বোধিধর্ম চিনের এক পাহাড়ী মঠে আশ্রয় নেবার চেষ্টা করেন। মঠের ভিক্ষুরা ভয়ে তাকে ঢুকতে নিষেধ করে। তারপর বোধিধর্ম সেই মঠের সামনে টানা নয় বছর ধ্যান করেন। অবশেষে ভিক্ষুরা তাকে প্রবেশাধিকার দেয়। তারা দেখতে পায় বোধিধর্ম যেখানে বসে ধ্যান করছিলেন, তার উলটোদিকের পাথরে দুটো গর্ত হয়ে গেছে। বোধিধর্মের দৃষ্টি এতোই তীব্র, পাথরও তার সামনে হার মানতে বাধ্য হয়।
’ধ্যান’ শব্দটাই চিনদেশে এসে ‘চেন’ হয়ে যায়, তারপর জাপানে এসে হয় ’জেন’। তবে জেনের ইতিহাস বা কিংবদন্তী নিয়ে বেশি মাথা ঘামালে আসলে এই দর্শনের মূল শিক্ষাটাই এড়িয়ে যাওয়া হয়। জেন ধর্মের দুটো ব্যাপার আমার খুব পছন্দ। একটা হচ্ছে মানুষের সত্তা বা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে তাদের যে ধারণা, সেটা। মূলতঃ জেনবাদীরা মনে করে মানুষ এবং মহাবিশ্বের মধ্যে, বস্তু এবং আত্মার মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। এই বিষয়টা নিয়ে পরে লেখার ইচ্ছা আছে, হয় গল্প বা প্রবন্ধ। তাই এখানে কথা বাড়ালাম না। যারা এ বিষয়ে আরও জানতে চান, তাদের জন্য শিগেনোরি নাগামোতোর লেখা ‘জাপানিজ জেন বুদ্ধিস্ট ফিলোসফি’ প্রবন্ধটা পড়ার অনুরোধ রইলো। স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফিলোসফিতে লেখাটা বিনামূল্যে পড়া যাবে। এই প্রবন্ধের ’ওভারকামিং ডুয়ালিজম’ অংশটায় ওপরের প্রসঙ্গের সুন্দর ব্যাখ্যা আছে।
জেন চিন্তায় দ্বিতীয় যে বিষয়টা আমার পছন্দ, সেটা হচ্ছে ভাষার দুর্বলতা। মানুষ যতোরকম ভাষা ব্যবহার করে, তা মৌখিক হোক বা লিখিত, গল্প হোক বা ইতিহাস, কোনোকিছুই আসলে পুরো সত্যকে ধরতে পারে না। বাস্তবকে পুরোপুরি বর্ণনা করতে পারে না। বিশেষ করে যুক্তি অতিরিক্ত জটিলতা সৃষ্টি করে। প্যারাডক্স জন্ম দেয়। বাস্তব জগতে প্যারাডক্স বলে কিছু নেই। সেটা শুধু যুক্তি আর ভাষার অসম্পূর্ণতার ফলাফল। জেনের অনুসারীরা তাই বারবার মনে করিয়ে দেন—সত্যিকারের এনলাইটেনমেন্ট হয় মনের ভেতরে। মুখের কথায় নয়। আলোকিত হওয়া মানে কোনোকিছু উপলব্দি করা, সেটা ঘটে মনের জগতে। এ বিষয়ে আরেকটা বিখ্যাত জেন কোয়ানের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সেটা এমন: “যদি গভীর জঙ্গলে একটা গাছ মাটিতে পড়ে যায়, আর সেটার শব্দ শোনার জন্য আশেপাশে কোনো মানুষ না থাকে, তাহলে কি আসলে শব্দ হয়েছে?” যদি মনে করেন শব্দ হয়েছে, তাহলে বুঝতে হবে বাস্তবতা আসলে অন্য মানুষের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে না। তার মানে আপনার যখন বোধোদয় হবে (এখানে শব্দটা আক্ষরিক অর্থে, ‘বোধির উদয়’ হিসেবে ব্যবহার করছি), সেটার সত্যতা বোঝার জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করার দরকার নেই। স্বয়ং গৌতমেরও সেই দরকার পড়েনি।
জেনের অনুসারীরা বারবার বর্তমানের ওপর মনোযোগ দিতে বলেন। কারণ অতীত আর ভবিষ্যৎ আসলে বাস্তব নয়। সেগুলোর অস্তিত্ব শুধু মানুষের ভাষায়, আর স্মৃতিতে। যে ভাষা আর স্মৃতি দুটোই বিশ্বাসঘাতক। তাই জেনবাদীরা ইতিহাস, শাস্ত্র, নিয়ম-রীতি-সংস্কৃতি, যা কিছু অতীতের ওপর নির্ভর করে, এসবের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে নিজস্ব, ব্যক্তিগত উপলব্ধির ওপর জোর দেন। বেশিরভাগ বরেণ্য হাইকু কবি জেনের অনুসারী ছিলেন। তাই তাদের কবিতায় বর্তমান মুহূর্তকে ধরার চেষ্টা থাকে, সবকিছুর ক্ষণস্থায়ীত্ব ধরার চেষ্টা থাকে। কোয়ানের উদ্দেশ্যটাও কাছাকাছি। কোয়ান হচ্ছে এমন ধাঁধা, যেটার কোনো উত্তর ভাষা দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ভাষার সীমা পরীক্ষা করার জন্য কোয়ানের জন্ম। কোয়ান নিয়ে ধ্যান করতে করতে একসময় ব্যক্তিগত এনলাইটেনমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আমার কাছে গেইটলেস গেইট বইয়ের যে সংস্করণ আছে, সেটায় এমন ৪৮টা কোয়ান আছে। প্রত্যেক কোয়ানের সাথে আছে দুই জেন মাস্টার মুমন এবং কৌন ইয়ামাদার মন্তব্য। একদম শুরুতে ওক গাছ নিয়ে যে কোয়ান বললাম, ইয়ামাদা সেটার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে—”জোশু ওক গাছ দিয়ে আসলে সম্পূর্ণ মহাবিশ্বকে বুঝিয়েছেন। মহাবিশ্বের একটা ভগ্নাংশকে পুরোটার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।” অর্থাৎ ভিক্ষুকে জোশু বলছেন, ইতিহাস আর শাস্ত্রে তোমার নির্বাণ পাবে না, পাবে মহাবিশ্বের একক অস্তিত্বে। বোধিধর্মের ইতিহাসে নয়, বর্তমানে মনোনিবেশ করো।
মার্কিন সাহিত্যিক উইলিয়াম বারোজ বলেছিলেন: “ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ আ ভাইরাস।” অস্ট্রিয়ান দার্শনিক উইটগেনস্টাইন বলেছিলেন ভাষার জটিলতা সরিয়ে দিলে দর্শনের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জেন চিন্তায় এই উপলব্ধিগুলো বহু আগেই ধরা পড়েছে। আমি ওপরে দুটো কোয়ানের ব্যাখ্যা দিয়েছি। আসলে এগুলোর ব্যাখ্যা বলে কিছু নেই। আছে শুধু চিন্তা। কোয়ান মানুষকে শুধু চিন্তার ধাপ চিনতে সাহায্য করে, যেগুলো বেয়ে পৌঁছানো যায় উপলব্ধি অবধি।