ঘুম আসছে না বিদ্যাসাগরের, অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ঈশ্বর , কেন তুমি এইসব করে বেড়াও? ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে কী লাভ? কী লাভ আমি জানি না, শুধু একটা কথাই জানি, মানুষের দুঃখে আমার প্রাণ কাঁদে। ওদের কান্না আমার সত্তার মধ্যে ধ্বনিত হয়। চোখে জল চলে আসে, আমি উন্মাদ হয়ে যাই। পারি না নিজেকে স্থির রাখতে। অনেকেই হয়তো পারেন, কিন্তু আমি পারি না। কেন পারি না, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। হয়ত এটা আমার জন্মার্জিত প্রবণতা। আমার নিয়ন্ত্রক। আমাকে সারাজীবনই বহন করতে হবে এই প্রবণতার অভিঘাত। একটা খবর পেয়ে অস্থির হয়ে পড়লেন বিদ্যাসাগর। তাঁর একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্র অন্যায় ভাবে বিন্ধ্যবাসিনী দেবী নামে এক বিধবার বাড়ি দখল করার চেষ্টা করছে। স্ত্রীর গায়ে হাত দেওয়ার জন্য নারায়ণের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন বিদ্যাসাগর, এক্ষণে বিধবার জমি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টার খবরে তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। ভাবলেন, এই ছেলেকে আর আমার পুত্রের পরিচয় দেওয়া উচিত নয়।ও কুপুত্র শুধু নয়, কুলাঙ্গারও। ওকে ত্যাজ্যপুত্র করা ছাড়া নিজের মান-সম্মান রক্ষার আর কোনো উপায় নেই। স্ত্রী দীনময়ীকে বললেন, নারায়ণের মতো একটি দুর্বৃত্তকে আমি আর ছেলের পরিচয় দিতে পারব না। ওকে ত্যাজ্যপুত্র করলাম। হ্যাঁ, এইরকমই ছিলেন বিদ্যাসাগর। তিনি যন্ত্রণায় অধীর হয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে, বন্ধুরা দূরে সরে গেছেন, তবুও নিজের সিদ্ধান্তে অবিচলিত থেকেছেন। সেই আপসহীন যন্ত্রণাদগ্ধ ঈশ্বরের নিঃসঙ্গতা ও অন্তরাত্মার কান্নার শব্দ এই উপন্যাস।
সমীরণ দাসের 'নিঃসঙ্গ ঈশ্বর' উপন্যাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ইতিহাসের পাথরে খোদাই করা চরিত্র নন — বরং তিনি এমন এক মানুষ, যাঁকে ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে নিঃসঙ্গতা, শোক আর আত্মনির্বাসনের বাসনা। বাংলা ভাষায় এমন গভীর সংবেদনশীল এবং আত্মবিশ্লেষণাত্মক সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণ আমরা খুব কমই দেখি, যেখানে বিদ্যাসাগরের শেষ কুড়ি বছরের জীবন এভাবে মেঘ-ভেজা সকালের আবেশে ধরা দেয়।
এই বই পড়তে পড়তে মনে হয়, যেন কোনো অপ্রকাশিত স্মৃতিকথার ভিতরে ঢুকে পড়েছি—যেখানে বিদ্যাসাগর এক পরাজিত নিঃসঙ্গ মানুষ, এক পরিণত মানব। উপন্যাসটি আমাদের নিয়ে যায় তাঁর জীবনের শেষ কুড়ি বছর, যেখানে কলকাতা-র সামাজিত উত্তাপ থেকে সরে এসে তিনি আশ্রয় নেন ঝাড়খণ্ডের কার্মাটাঁড়ে। এক আমবাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নন্দনকানন নামের সেই একতলা কুড়েঘর যেন ছিল তাঁর পলায়নের নয়, এক গভীর প্রত্যাবর্তনের জায়গা।
এই গল্প কেবল তাঁর প্রাত্যহিক দিনলিপি নয়; বরং শহর থেকে দূরে যাওয়ার নেপথ্যে তাঁর যে আর্তি, যে ক্লান্তি, যে সামাজিক বিরক্তি—তা আমাদের ছুঁয়ে যায়। তিনি সেখানে রাতের স্কুল চালান, আদিবাসীদের পাশে দাঁড়ান, নিজেই চিকিৎসা করেন, তাঁদের ভাষা শেখেন, আর ভালোবাসেন—নিঃশব্দে, গভীরভাবে। “তুই আসেছিস”—সাঁওতালদের এই আহ্বান তাঁর কাছে এক নতুন মানবধর্মের ভাষা হয়ে ওঠে।
সমীরণ দাসের লেখায় এক অদ্ভুত মিশেল আছে—ইতিহাস আর সাহিত্য পাশাপাশি হাঁটে, কখনও একে অপরকে ছুঁয়ে যায়, কখনও অতিক্রম করে। তিনি বিদ্যাসাগরের আত্মজীবনী ও সমকালীন নথি থেকে উপাদান নেন, কিন্তু কল্পনার ছোঁয়ায় তাকে করে তোলেন সংবেদনার। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ যেমন কথামৃত থেকে নেওয়া, তেমনি তার আবহ তৈরি হয় যেন কোনো বাউল বেদনার ভিতর দিয়ে।
বিদ্যাসাগরের পরিচিত চটি-ধুতি-চাদরের বাইরেও লেখক তুলে ধরেছেন একজন সহজ অথচ দৃঢ় মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাঁর পোশাক হয়ে ওঠে এক নৈতিক অবস্থান, এক আত্মমর্যাদার স্টেটমেন্ট। সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ তকমার প্রতি ছিল তাঁর একান্ত অবিশ্বাস। তিনি ‘আদর্শ বাঙালি’ হতে চাননি—তিনি নিজেই একটি আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন।
কিন্তু এ শুধু সংবেদনশীল সমাজকর্মীর কাহিনি নয়—এটা এক গভীর নিঃসঙ্গতার জার্নিও। ১৮৭২ সালে নিজের পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে ত্যাজ্য করা, স্ত্রীর মৃত্যু, আত্মীয়স্বজনের অবহেলা, প্রিয়জনদের দূরত্ব—সব কিছু মিলে বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠেন একা, কিন্তু সেই একাকীত্ব ছিল নিঃসঙ্গ ঈশ্বরের মতো মহিমান্বিত। বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা যেন আগুনে লেখা, এমন একটা মানসিক ছাইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে—যেখানে মানুষ ভেঙেও নিজের উচ্চতা খুঁজে পায়।
এই উপন্যাস পড়ে মনে হয়, বিদ্যাসাগর যেন আমাদের সময়ের কেউ—অসামাজিক মিডিয়ার ভিড়ে দাঁড়িয়ে, এখনও কেবল কাজের মধ্যে দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে চাওয়া কেউ। তাঁর নিভৃত জীবনের মধ্যে ছিল এক অমোঘ আলোকচ্ছটা, যা আজও পথ দেখায়। তাঁর জীবন, তাঁর লড়াই, তাঁর নির্জনতা—সবটাই যেন এক অন্তর্জাল, যেখানে নেমে যেতে হয় ধীরে, গভীরভাবে।
ব্রায়ান হ্যাচারের ইংরেজি জীবনী Vidyasagar: The Life and After-Life of an Eminent Indian যেখানে বিদ্যাসাগরের উত্তর-জীবন, সামাজিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে, সমীরণ দাস সেখানে চলে যান মৌন জীবনের ভেতরে—কর্মটার গ্রামে, এক বুড়ো মানুষ বসে আছেন স্যানথালদের পাশে, হোমিওপ্যাথি দিয়ে রোগ সারাচ্ছেন, চাদর মুড়ি দিয়ে শীতে কাঁপছেন। ইতিহাস নয়, এখানে বিদ্যাসাগর এক নিঃসঙ্গ উপস্থিতি, চুপচাপ জীবনযাপন করছেন।
সুবলচন্দ্র মিত্রের প্রাচীন জীবনী Isvar Chandra Vidyasagar: A Story of His Life and Work বিদ্যাসাগরকে প্রায় দেবত্ব দিয়ে চিত্রিত করে—সাহসী, নীতিবান, আদর্শবান। কিন্তু তাঁর দ্বিধা, রাগ, ক্লান্তি—সবই surprisingly absent!! 'নিঃসঙ্গ ঈশ্বর' ঠিক এখানেই উল্টো পথে হাঁটে — এখানে বিদ্যাসাগর তাঁর ছেলেকে ত্যাগ করেন, স্ত্রী মারা গেলে একা বসে থাকেন, কেউ এলে মুখ তুলে তাকান না — এই বিরক্ত, বিষাদগ্রস্ত, flawed, distant, অথচ নির্মোহ মানুষটিই যেন আরও বাস্তব।
সম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন, বিদ্যাসাগরের ভাই, যিনি জীবনচরিত লিখেছিলেন, নিজ চোখে যা দেখেছেন তা তুলে ধরেন—একান্ত পারিবারিক স্মৃতি, ছোট ছোট মুহূর্ত, অভ্যন্তরীণ দৃশ্যপট। কিন্তু সেই লেখা সময়ের দ্বারা প্রভাবিত, কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট। দাসের কাহিনি সেই অতীতের ভারমুক্ত—এখানে কল্পনার স্বাধীনতা আছে, কুয়াশার ভোরে এক বুড়ো মানুষকে দেখা যায় গ্রামের পথে, ধীরে হাঁটছেন, কিছুটা ক্লান্ত, কিন্তু নিষ্কলুষ।
বিহারীলাল সরকারের বিদ্যাসাগর এক সংরক্ষণশীল বয়ান, যেখানে বিধবা-বিবাহ বা নারী-শিক্ষার মতো বিদ্যাসাগরের কাজগুলি সমালোচিত হয়। সেখানে লেখক সংশয় প্রকাশ করেন তাঁর আদর্শ নিয়ে। কিন্তু সমীরণ দাস কোনো মতবাদ নয়—জীবনের ভেতরের বিদ্রোহকে তুলে ধরেন। নিজের ছেলের বিয়েতে বিধবা কনে, কলেরা রোগীর পাশে বসে নিজ হাতে ওষুধ দেওয়া—এইসব ঘটনায় প্রতিটি পদক্ষেপেই আমরা দেখি একজন মানুষ, যার জন্য মানবতা ছিল ধর্মের ঊর্ধ্বে।
প্রয়াণের শতবর্ষে বিদ্যাসাগর, করুণাসাগর বিদ্যাসাগর, মহাপথিক বিদ্যাসাগর—এইসব স্মারকগ্রন্থ ছবি, তথ্য, স্মৃতিচারণে ভরপুর, বিদ্যাসাগরকে স্মরণীয় করে তোলে। কিন্তু তারা মানুষটিকে চেনায় না। দাস চেনান। তাঁর বিদ্যাসাগর রাগ করেন, একা থাকেন, কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না, এবং এই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই তাঁর মানবতা ঝলসে ওঠে।
বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিগত ভাঙাগড়ার বর্ণনা—ছেলে নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ, স্ত্রী দিনময়ী দেবীর মৃত্যু, ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে আজীবন দ্বন্দ্ব—এই সব কিছুই এই উপন্যাসে রয়েছে, কিন্তু তা রয়েছে আর্তনাদে নয়, নিরবতায়। কর্মটারে তাঁর অবসরজীবন, যেখানে তিনি স্কুল বানালেন, গাছ লাগালেন, সাঁওতালদের শেখালেন, রাতে ঘুঙুরের শব্দ শুনে উদাস হলেন—এইসব খণ্ডচিত্রে উঠে আসে এক নিঃসঙ্গ মহাজীবনের অপার দীপ্তি।
সমীরণ দাসের ভাষা কখনও কবিতার মতো। তাঁর লেখা কোনো জীবনী নয়, ইতিহাসের সম্পূরক নয়—এ এক কল্পিত স্মৃতিকথা, যা সাহিত্যের জাদুতে সত্য হয়ে ওঠে। জীবন যদি হয় একটি প্রাসাদ, তবে নিঃসঙ্গ ঈশ্বর আমাদের দেখায় সেই প্রাসাদের জানালা দিয়ে বয়ে আসা বাতাসটি।
উপন্যাসের শেষে কোনো বড়ো বক্তৃতা নেই, কোনো গম্ভীর দর্শন নেই, নেই কোনো মহাকাব্যিক বিদায়। কেবল আছেন একটি মানুষ, যিনি একা বসে, চাদর কাঁধে, আমগাছের ছায়ায় সূর্যাস্ত দেখছেন। সেই নিস্তব্ধতায়, আমরা কোনো মহান সংস্কারক নয় — একজন পরিপূর্ন মানুষকে দেখি।
আর সেই দেখাতেই, সাহিত্যের জয়। পুঁথিগত ইতিহাস যেখানে শেষ হয়, এই উপন্যাসের পথ চলা সেখানেই শুরু।