আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো টের পায়, তাদের ভেতরে এমন একজন উচ্চপদস্থ ডাবল এজেন্ট আছে, যে তাদের টপ সিক্রেট তথ্যগুলো কেজিবির কাছে পাচার করে দিচ্ছে। সেই ডাবল এজেন্টের খোঁজে সিআইএ এবং এফবিআই দীর্ঘ একটা অপারেশন শুরু করে, যা স্থায়ী হয় পরবর্তী ১৫ বছর পর্যন্ত!
এই কাহিনি সেই ডাবল এজেন্টেরই সত্য কাহিনি— শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা হয়েও কীভাবে সে সবার চোখের সামনে দিয়ে কেজিবির হয়ে কাজ করে গেছে, কীভাবে কেজিবি তাকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে হ্যান্ডেল করেছে, এবং কীভাবে তাকে ধরতে গিয়ে সিআইএ এবং এফবিআই একের পর এক নিজেদের বিশ্বস্ত অফিসারদেরকে সন্দেহ করে তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছে।
স্বাগতম স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে থ্রিলিং এসপিওনাজ কাহিনিগুলোর একটাতে, যেখানে একজন ডাবল এজেন্টের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে আরও ১৪ জন স্পাইয়ের কাহিনি! আমেরিকান এবং রাশিয়ান লেখকদের একাধিক বই অবলম্বনে লেখা এই নন-ফিকশন থ্রিলার আপনাকে নিয়ে যাবে এসপিওনাজের রোমাঞ্চকর জগতে।
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা। জন্মের পর থেকেই লিবিয়াতে পড়ে আছি। পড়াশোনাও করেছি এখানেই - প্রথমে বাংলাদেশী স্কুলে, পরে লিবিয়ান ইউনিভার্সিটিতে।
২০১১ সালের গৃহযুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়ে ছিলাম গাদ্দাফীর জন্ম এবং মৃত্যুস্থান সিরতে। এরপর চাকরির সুবাদে দিন কাটিয়েছি ত্রিপোলিতে, বেনগাজিতে এবং ব্রেগায়।
পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, তবে শখ বিচিত্র বিষয়ে। সেগুলো নিয়ে জানতে, চিন্তা করতে এবং লেখালেখি করতে পছন্দ করি। লিখি ফেসবুকে এবং অনলাইন মিডিয়া হাউজ Roar বাংলায়।
অভিভূত আমি। ২৩২ পৃষ্ঠা পড়তে গিয়ে সামান্য পরিমাণ মনোযোগ সরাতে পারি নি। এবং বলতে গেলে একটানা পড়া এবছরের প্রথম বই এটাই। প্রথম খন্ডের প্রতি দারুণ তৃষ্ণা বোধ করছি এখন।
এসপিওনাজ, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, গুপ্তচরবৃত্তি এসব নিয়ে বই বা মুভির কথা মনে হলে সবার আগে অবধারিতভাবে যে নাম চলে আসে সেটা হলো ইয়াং ফ্লেমিংয়ের অমর সৃষ্টি জেমস বন্ড। দুনিয়া জুড়ে লাখো ভক্ত রয়েছে বন্ডের। আমাদের দেশে অবশ্য জেমস বন্ডের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় মাসুদ রানা। মাসুদ রানাকে সৃষ্টি করা হয়েছে জেমস বন্ডের আদলেই। দুজনেই ব্যবহার করেন ওয়ালথার পিপিকে পিস্তল। দুজনেই হ্যান্ডসাম। কিন্তু দুজনেই কাল্পনিক। তাই শত শত বুলেট তাদের উপর দিয়ে চলে যায়, কিছু ভেদ করেও চলে যায় কিন্তু তারা অমর। বিপক্ষ দল তাদের কিছু সময়ের জন্যে আটকাতে পারলেও সেসব বিপদাপদ তারা উপস্থিতবুদ্ধি এবং বিভিন্নরকম দক্ষতার বলে কাটিয়ে আসেন। কিন্তু বাস্তবে যেসব স্পাই থাকেন তাদের সবার জীবন কি এতটাই রঙিন এবং উত্তেজনাকর? বিপদ, নারী, গাড়ি, ভিলেন, দিনে দিনে দেশ ভ্রমণ, অসাধারণ সব গ্যাজেট কি সবার কপালে থাকে?
তথ্য। বর্তমান দুনিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বস্তুর নাম তথ্য। এককালে কুইন সার্সি যদিও বলেছিল, 'পাওয়ার ইজ পাওয়ার' কিন্তু আমি লিটলফিঙ্গারের 'নলেজ ইজ পাওয়ার' কথাতেই বিশ্বাসী। শুধু আমি একা না দুনিয়ার তাবত ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলোও আমার মতই লিটলফিঙ্গারের মতবাদে বিশ্বাসী। যে কোন বিষয়ে জিততে হলে আপনাকে সেই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান রাখতে হবে। নয়ত লাফালাফি করে লাভ হবে না। বিপক্ষ দেশের বিভিন্ন সামরিক বা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় তথ্য বা নিজেদের দেশের তথ্য পাচার হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্যে বড় বড় দেশ গুলো যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে তা জানলে আমজনতা তো বটেই ছোট বা মধ্যম অনেক দেশের প্রধানমন্ত্রীর চোখেও শর্ষেফুল ভেসে উঠবে। ফেলিক্স দঝেরঝিনস্কির সৃষ্টি চেকা, লাবেরেন্তি বেরিয়ার কুখ্যাত এনকেভিডি পরবর্তীতে সেটাই কেজিবিতে পরিণত হয়। এই রাশান কেজিবি, গ্রু অন্যদিকে আমেরিকার সিআইএ, এফবিআই স্নায়ুযুদ্ধের পুরোটা সময় একে অন্যের সঙ্গে টক্কর দিয়েছে। একবার ল্যাংলির মাথা খারাপ তো অন্যবার লুবিয়াংকায়। দুই দেশ সামরিক শক্তিতে ছিল সেয়ানে সেয়ানে। কিন্তু রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে দুনিয়ার ধ্বংস ঠেকানো যাবে না। তাই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্যে পশ্চিম এবং পূর্ব দুই পক্ষই বেছে নিয়েছিল এসপিওনাজ, কাউন্টার এসপিওনাজের রাস্তা। অপরপক্ষের তথ্যে সংগ্রহ করতে এমন কোন পথ নেই যা তারা গ্রহণ করেনি। টাকা, নারী, সম্পতি, ব্ল্যাকমেইল সকল অস্ত্রই প্রয়োগ করেছে দুই দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, সেটার শেষ হয় ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে। স্নায়ুযুদ্ধ সম্পর্কে যাদের আগ্রহ আছে তারা জানেন এই সময়টা পৃথিবীর ইতিহাসে কত উত্থান পতনের সাক্ষি হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে দুই দেশের গুপ্তচর সংস্থাগুলো যেসব ঘটনা ঘটিয়েছে সেসব কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। তেমনই এক জম্পেশ রোমাঞ্চকর ঘটনা নিয়ে লেখা হয়েছে দ্য স্পাই স্টোরিজ ২।
মাসুদ রানা বা জেমস বন্ডের সঙ্গে আমাদের আলোচ্য মাস্টার স্পাইয়ের মিল এক জায়গাতেই। সেটা হলো তিনিও পকেটে ওয়ালথার পিপিকে রাখতে পছন্দ করেন। বন্ড বা রানার বিপদ থাকে একদিকে। শুধু শত্রুপক্ষের হাত থেকে রক্ষা পেলেই চলে। কিন্তু আমাদের বাস্তবের মাস্টার স্পাইয়ের বিপদ দু'দিক থেকে। খোদ আংকেল স্যামের বুকে বসে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তীতে রাশিয়ায় অত্যন্ত গোপনীয় রাষ্ট্রীয় তথ্য পাচার করেছেন। তোয়াক্কা করেননি কোনো কিছুর। ছিলেন আমেরিকান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তা। ধরা খাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল দেশ বা বিদেশ যে কোন দিকে একটু ওদিক হলেই অথচ দীর্ঘ পনেরো বছর তিনি অসংখ্য অসংখ্য তথ্য পাচার করেছেন। দীর্ঘ এসপিওনাজ জীবনে অর্ধশত আমেরিকান এজেন্টের পরিচয় ফাঁস করেছেন। তার পাচার করা বিভিন্ন তথ্যের আর্থিক মূল্য কমপক্ষে কয়েকশো মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। তাকে ধরতে না পেরে অনেক প্রতিভাবান এজেন্টের ক্যারিয়ার নষ্ট করেছেন আমেরিকার কর্তা ব্যক্তিরা স্রেফ সন্দেহবশত। দীর্ঘ বাইশ বছরের ক্যারিয়ারে অবসর নেয়ার পূর্বে শেষবার তথ্য পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন। একটুর জন্য শেষ হাসি হাসতে পারেননি। কে ছিলেন এই মাস্টার স্পাই? সিআইএ, এফবিআই বা যারা তথ্য পাচ্ছে সেই গ্রু বা কেজিবি যার পরিচয় দীর্ঘদিন জানতে পারেনি?
স্নায়ুযুদ্ধ, স্পাইদের নিয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ আমার সেই কৈশোর থেকেই৷ এসব নিয়ে যত ঘাটাঘাটি করেছি সেটা কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে করলে পারলে টপার থাকতাম সম্ভবত। এই জন্য স্পাই স্টোরিজ ২ হাতে পাওয়ার পর আর অপেক্ষা করা গেল না। এক বসাতে শেষ করেছি। মোজাম্মেল হোসাইন ত্বোহা ভাইয়ের চমৎকার লেখা বই ছেড়ে উঠতে দিলো না। নন ফিকশন বই একটানা শেষ করাটা কঠিন৷ কিন্তু একে পছন্দের সাবজেক্ট, দ্বিতীয়ত সহজ সরল শব্দের প্রয়োগ বইটা দ্রুত শেষ করতে সাহায্য করেছে। যেহেতু নন ফিকশন, বেশি তথ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্পয়লার চলে আসবে অনেক রাই আর সেদিকে গেলাম না। তবে নন ফিকশন বইকেও যে উত্তেজনাকর ভাবে উপস্থাপন করে দেখানো যায় সেই জন্য ত্বোহা ভাই ধন্যবাদ পেতেই পারেন। আপত্তি করার জায়গা খুব একটা নেই৷ বইয়ের টপিক এমন যে প্রচুর ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করতে হয়েছে। অধিকাংশের জন্য অবশ্য টিকা দেয়া ছিল। তবুও কিছু ইংরেজি শব্দ এড়ানো গেলে আরেকটু ভালো লাগতো। যেমন এক জায়গায় লেখা আছে কমুনিকেশন প্ল্যান উপস্থাপন করেন। এখানে যোগাযোগের উপায়/পদ্ধতি/পরিকল্পনা কিছু একটা বসিয়ে দিলেই হত। এরকম এক আধ জায়গায় চোখে লেগেছে তবে সিরিয়াস কিছু না।
মনে হতে পারে বইয়ের আলাপ পাড়তে এসে এত কী সব ছাইপাঁশ লিখলাম। বই পড়লেই বুঝবেন এত কথার কারণ কী। যারা এই টপিকে আগ্রহী, তাদের এই বই পড়ে বেশ আনন্দদায়ক সময় কাটবে। বিদায়।
স্পাই স্টোরিজ ২ লেখক: মোজাম্মেল হোসাইন ত্বোহা প্রকাশনী: শিরোনাম
গোয়েন্দা কাহিনি আমার ভীষণ পছন্দের। ফিকশনে প্রচুর গোয়েন্দা কাহিনি বা স্পাই থ্রিলার পড়া হয়েছে। কিন্তু এই নন ফিকশন বইটার মতো মুগ্ধ খুব কম বই-ই করতে পেরেছে। আমি লিটারেলি শকড হয়ে গেছি বইটা শেষ করে। কীভাবে একজন শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর ধরে সবার চোখের সামনে তথ্য পাচার করে গিয়েছে , কীভাবে তাকে ধরার জন্য ১৪ বছর ধরে চেষ্টা করেছে গিয়েছে সিআইএ ও এফবিআই, তাকে ধরতে গিয়ে নিজেদেরই কতো এজেন্টের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছে, এ সবকিছু জানতে পেরে ব্যাপক ধাক্��া খেয়েছি। বাস্তবের পৃথিবীটা যে কোনো অংশে কম থ্রিলিং নয় তা আরো একবার উপলব্ধি করলাম।
সত্য ঘটনার প্লট
ঘটনার শুরু কোল্ড ওয়ারের সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধু রাষ্ট্র এবং পশ্চিমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর মাঝে এ স্নায়ুযুদ্ধ চলে দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর ধরে। এ সময়ে রাশিয়া এবং আমেরিকা একে অপরের গোয়েন্দা সংস্থায় নিজেদের এজেন্ট রিক্রুট ক���ার জন্য অনেক ধরণের পন্থা অবলম্বন করে। কেউ কেউ ডাবল এজেন্ট হয়ে কাজ করে নিজ দেশেরই বিরুদ্ধে। আবার কেউ হয়ে যায় ট্রিপল এজেন্ট, যারা ভান করে শত্রু দেশের হয়ে কাজ করছে কিন্তু আসলে কাজ করে যায় নিজ দেশের হয়েই।
তবে আমাদের এই নির্দিষ্ট ঘটনার সময়কাল আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু। গোলমেলে এই সময়টায় আমেরিকা আবিষ্কার করে তাদের খুবই কনফিডেনশিয়াল অনেক ডকুমেন্টস পাচার হয়ে যাচ্ছে রাশানদের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির কাছে। কে এই মোল সেটা খোঁজার মিশনে মাঠে নামে তারা। আর আমাদের এই বইয়ে সেই রোমাহর্ষক ঘটনাকেই তুলে এনেছেন লেখক।
দীর্ঘ ১৪ বছরের তদন্ত প্রক্রিয়া
সাধারণত ফিকশন পড়তে গিয়ে লেখকের কারিশমায় অনেক সময় সেই গল্পকেই বাস্তব মনে হয় আমার কাছে। এই বইটার ক্ষেত্রে ঘটেছে উলটো ঘটনা। পড়তে গিয়ে যতবার মনে পড়েছে এই বইয়ে থাকা প্রতিটা ঘটনা বাস্তব, ততবার শিহরিত হয়েছি। কী অদ্ভুত!! সত্য ঘটনাকে উলটো অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করেছে, এতটাই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।
বইয়ের শুরুতে লেখক কিছু চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন পাঠককে। এরপর আস্তে আস্তে ঢুকেছেন মূল গল্প। মূল ঘটনার কুশীলবদের জানার জন্য এবং তৎকালীন সময়টাকে বুঝানোর জন্য অল্পকিছু ব্যাকস্টোরি এবং ইতিহাস জানিয়েছেন লেখক। তবে তা অন্য এজেন্টদের বিভিন্ন ঘটনার মাঝে মাঝে বলে গিয়েছেন। যে কারনে প্রথম পাতা থেকেই বইটার সাথে হুকড হয়ে থেকেছি। সত্যিকার দুনিয়ার স্পাইদের কর্মপদ্ধতি, তাদের মনোভাব, চিন্তাধারা কিংবা যাপিত জীবনের ধরণ অনেক কিছুই জানা যাবে বইটা থেকে। তবে এ সবকিছুই এসেছে গল্পের আদলে। একজন এজেন্টকে দীর্ঘদিন নজরদারিতে রেখে তাকে পিচ করার প্রক্রিয়া, কীভাবে প্রলুব্ধ করে কিংবা বাধ্য করে তার কাছ থেকে ইনফরমেশন বের করে নেয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যাবে বইটা থেকে। প্রতিটা ব্যাপার এতটা আশ্চর্যজনক যে বারবার চমকে যেতে হয়। এভাবেই তাহলে একটা দেশের গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে!!
ডাবল এজেন্টের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান
বইয়ের শুরু থেকেই বিভিন্ন তদন্তের ব্যাপারে জানা যায়। অনেক ডাবল এজেন্ট বা ট্রিপল এজেন্টদেরকে ধরার জন্য পাতা ফাঁদ, তাদের পাচার করা তথ্য; এমন একের পর ঘটনা নিয়েই এগিয়ে চলে বই। তবে আড়ালেই থেকে যায় রহস্যময় এজেন্ট, যার কোডনেম "বি"! সিআইএ এবং এফবিআই একে অপরকে সন্দেহ করে যে তাদের মাঝেই লুকিয়ে আছে এই গুপ্তচর। অবশেষে এক হয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। এরই মাঝে রাশিয়ার সাথে নিয়মিত তথ্য এবং টাকা পয়সার লেনদেন অব্যাহত থাকে ওই এজেন্টের। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছর সময় নিয়ে তার পরিচয় উদঘাটন করতে সক্ষম হয় তারা। তাও রাশিয়ার আরেক ডাবল এজেন্টের তথ্যের সহায়তায়। এই পরিচয় উদঘাটনের অংশটুকু ভীষণ ভালো লেগেছে।
পরিচয় জানার পর এজেন্ট বি ওরফে রেমন গার্সিয়াকে ধরার জন্য এফবিআই যে ফাঁদ পাতে, যেভাবে তার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে ধাপে ধাপে একেকটা প্রক্রিয়া শেষ করে তার কাছ থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে, তা পড়তে গিয়ে যেকোনো টানটান উত্তেজনাকর মুভির দৃশ্য মনে পড়ে যেতে বাধ্য৷ এই জায়গা থেকে বইটা লিটারেলি আনপুটডাউনেবল। এরপর সব শেষে তাকে ধরার পর যখন তার দ্বৈত জীবনের সকল রহস্য উন্মোচিত হয়, তখন আমি পেয়েছি এই বইটার সবচেয়ে বড় চমক। একটা মানুষ এমন কীভাবে হতে পারে!! এত অদ্ভুত এবং বৈপরীত্যে ভরপুর জীবন কারও হওয়া সম্ভব তা কোনো সাধারণ মানুষের দূরতম কল্পনাতেও আসবে না। বিশ্বাস করেন বইয়ের শেষে ওই এজেন্টের যে মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি উল্লেখ করা হয়েছে তা কোনো যুক্তির মাঝে ফেলতে পারবেন না। আমেরিকার বাঘা বাঘা মনস্তাত্ত্বিকরাও সে সময় বেশ ভুগেছেন তাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। বইটা পড়েছি প্রায় মাসখানেক আগে, অথচ এখনো আমি এই মানুষটার কথা চিন্তা করলে হতভম্ব হয়ে যাই।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৯/১০ (একেবারেই মাস্টরিড বই আমার মতে। আপনি গোয়েন্দা কাহিনি, স্পাই দুনিয়া এসব নিয়ে আগ্রহী? তাহলে ফিকশনের ভক্ত হোন আর নন ফিকশন, বইটা খারাপ লাগার কোনো সম্ভাবনাই নেই। লেখকের লিখনশৈলী দূর্দান্ত। পুরো ঘটনাবলীর চুম্বক অংশগুলো যেভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করেছেন তার জন্য আলাদা প্রশংসার দাবীদার উনি। শুধুমাত্র এ কারনেই বইটা এক মূহুর্তের জন্য বিরক্ত লাগেনি। সাথে বেশ অনেক ফুটনোট দিয়েছেন পাঠকের বোঝার স্বার্থে। সব মিলিয়ে দূর্দান্ত এক্সপেরিয়েন্স)
মুভি দেখা, বই পড়ার ক্ষেত্রে অন্যতম টানটান একটি জনরা হলো এসপিওনাজ। এই ঘরনায় থ্রিলার উপভোগ করে না এমন মানুষ মনে হয় কমই।
স্পাইদের জীবনটা অদ্ভুত। কেউ দেশের স্বার্থে, আদর্শের জন্য নিজের সাধারণ জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে স্পাই হয়। নিজের দেশকে ঝুঁকি থেকে মুক্ত করে। আবার কেউ দেশের স্বার্থই তুচ্ছ করে দেশের সাথে বিশ্বাসঘা ত ক তা করে শত্রু দেশের হাতে তথ্য তুলে দেয় আর্থিক লাভের কারণে।
কেন একজন মানুষ স্পাই বা ডাবল এজেন্ট হয়? কেউ হয়তো চাপে পড়ে, কোনো গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার হুমকিতে, কেউবা টাকার লোভে, কেউ আবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণের ফ্যান্টাসিতে নিজের জীবনকে দ্বৈত জীবনে রূপ দেয়। আমেরিকা রাশিয়ার দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো ব্যাপার। সময়টা এমন যখন দুই দেশের মধ্যে চলা ঠান্ডা স্নায়ু যু দ্ধ একেবারে চরম অবস্থায় চলছে। রাশিয়ার কেজিবি একদিকে অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই, সিআইএ এর দৌরাত্ম্য চলছে। এফবিআই ছুটছে রুশ এজেন্টকে রিক্রুট করে তাদের অভ্যন্তরীণ তথ্য জেনে নিতে। অপরদিকে সোভিয়েত চাইছে মার্কিন এজেন্টদের হাত করে তাদের পরিকল্পনা জেনে নিতে। দুই দেশের মাঝে চলা এই চো র পু লি শ খেলায় সৈন্য হিসেবে তাই দুইপক্ষের অনেকেই একে অন্যের জালে জড়িয়ে গেছে। এদিকে আড়িপাতা চলছে তো অপরদিকে তাদের কাজ সরষের ভূতই একদম প্যাকেজ আকারে জানিয়ে দিচ্ছে বিপক্ষকে। কেউ কেউ আবার ট্রিপল এজেন্টের ভূমিকাও পালন করে। লক্ষ্য তথ্য আদায় আর তা দিয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের। স্পাই জগৎ এমন এক জগৎ যেখানে বিশ্বাসের আনাগোনা কম। প্রতি মুহূর্তে যেখানে সন্দেহের নতুন নতুন বাড়ি তৈরি হয়। এমন অস্থির সময়েই কেজিবির কাছে সুন্দর এক প্যাকেজ পাঠায় অজানা এক মানুষ। নিজের নাম পরিচয় আড়াল করে কিছু থলের বিড়াল ছেড়ে দেয় কেজিবির কাছে। কেজিবি কর্মকর্তার তো মাথায় হাত! এসব তথ্য অজানা এই ব্যক্তি এত চতুরতার সাথে কী করে পাঠালো! তবে সে নিশ্চয়ই বড়ো কোনো ব্যক্তি, যে কী না স্বেচ্ছায় গু প্ত চ রবৃত্তি করতে চাচ্ছেন। বীণ বাজানোর আগেই সা প যদি নাচতে থাকতে তবে সাপুড়ে আর থেমে থাকে কেন? কেজিবিও তাই তাদের অজ্ঞাত এই স্পাইকে লুফে নিলো। কোনো নামধাম না পেয়ে তাই তার নাম দিলেন ❛এজেন্ট বি❜। সদা সতর্ক এবং চতুর এজেন্ট বি তাই নিজের পরিচয় এমনকি দেখা করার স্থানও এমনভাবে ঠিক করেন যাতে করে কোনোভাবেই কেউ তাকে ধরতে না পারে। এদিকে কেজিবির কাছে বি এর পরিচয় থেকে তার পাঠানো তথ্য গুলোই মূল্যবান। তাই লেনদেন আর প্রশংসা বাক্য দিয়েই চলে তাদের মধ্যকার কাজ। এদিকে কেজিবি এভাবে শত্রুর তথ্য পেয���ে যাচ্ছে এটা কি চুপচাপ বসে মার্কিন কর্তৃপক্ষ দেখে যাবে? অবশ্যই না। তাদের মধ্যেও আছে কেজিবিকে ধোঁকা দিয়ে এফবিআইয়ের কাছে তথ্য পাচার করা রাশিয়ান স্পাই। একদিকে তথ্য লিক হচ্ছে অপরদিকে সে তথ্যও পেয়ে যাচ্ছে। কী এক আজব খেলা ভাবা যায়! কেজিবির বিশ্বাসঘা ত ক এজেন্ট M&M সহ বেশ কিছু এজেন্টও চতুরতার সাথে এফবিআইকে দিয়ে যাচ্ছে তাদের গোপন খবর। এসব খবরের ভিত্তিতেই এফবিআই এইমস সহ বেশ কিছু ডাবল এজেন্টকে ধরতে সমর্থ হয়। সন্দেহ করে ব্রায়ান কেলি থেকে জ্যাক প্ল্যাটের মতো কর্মকর্তাকেও। তারাও কি ছিল কোনো রাশান স্পাইয়ের লোক? আবার অপর ঘাঁটিতে এজেন্ট বি নামক চতুর স্পাইয়ের তথ্যে কেজিবি মার্টিনভ থেকে শুরু করে মোটোরিনের মতো সর্ষের ভূতকে ধরতে পারে।
কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা শিবিরে এত ধরপাকড়, স্টিং অপারেশনের পরেও যেন স্বস্তি নেই। কোনোভাবে যদি এক বা দুইজনকে ধরা হয়ও দেখা যায় তাদের সম্পৃক্ততা নির্দিষ্ট কিছু স্থানে। তবে বাকি ঘাঘু তথ্যগুলো সাফাইয়ের কাজ করছে তাদের ভেতরেই থাকা অন্য কোনো মোল! এমনও হতে পারে, যে মোলকে খুঁজতে এত কাহিনি সে মোলই এই তদন্ত পরিচালনা করছে!
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বলা যায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তদন্ত করতে হয়। আর সাথে পানির মতো ডলার ব্যয় হয়। কিন্তু মোল বাবা রয়ে যায় বহাল তবিয়তে একেবারে নিরাপদ। মার্কিনদের চিকন বুদ্ধি আর রাশানদের এই যু দ্ধে জয়ী শেষমেষ মার্কিনিরা হলেও তার পিছেও হাত আসলে কার ছিল? কোনো কেজিবি স্পাই হতেও পারে।
দেখা যায় নিজের কাজের যোগ্য সম্মান না পেয়ে কিংবা সৎ থেকে কাজ করেও শেষমেষ হয়রানির শিকার হওয়া অফিসাররা শেষ পর্যন্ত আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে নেমে যায় দ্বৈত জীবনে। আবার কেউ জীবনে যথেষ্ট গিয়ারের অভাবে বেছে নেয় এমন জীবন। এজেন্ট বি এর দীর্ঘ স্পাই ক্যারিয়ারে সে এমন সব তথ্য পাচার করেছে যার মূল্য এবং গুরুত্ব মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। তবু দেখা যায় সে বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিয়েছেন যৎসামান্যই। টাকাই অন্যায়ের মূল চাবিকাঠি এক্ষেত্রে না। একটু থ্রিল যোগ হওয়াও এর অংশ ছিল। তবে কে ছিল বিখ্যাত সেই এজেন্ট বি? যে এফবিআই, সিআইএর নাকের ডগায় বসে দীর্ঘদিন যাবত তথ্য পাচার করে এসেছেন। যাকে ধরতে রচোফর্ডকে এক যুগেরও তিন বছর পেরানো সময় ধরে নানা নামের অপারেশন করতে হয়েছে। খরচ করতে হয়েছে মিলিয়ন ডলার। এক স্পাইকে ধরতে তাই শরণাপন্ন হতে হয়েছিল ❛সেভেন মিলিয়ন ডলার স্পাই❜ এর।
অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা এই গোয়েন্দাগিরি। খালি চোখে বা উপন্যাসে দেখা জেমস বন্ড বা মাসুদ রানা কিংবা সিনেমায় দেখা সিক্স প্যাকওয়ালা স্পাইদের থেকেও ঘটনাবহুল এবং উত্তেজনার জীবন বাস্তব জীবনের স্পাইদের। যারা এক ঘুষিতে মুক্তিবেগে শত্রুকে দূরে পাঠিয়ে দেয় কিনা জানিনা তবে যাদের এক তথ্যে নড়বড়ে হয়ে যায় বিপরীত ঘাঁটির ভীত তাদের জীবন অবশ্যই উত্তেজনার।
কেন মিস্টার এজেন্ট বি এমন জীবন বেছে নিয়েছিলেন তার মুখ হা হয়ে যাওয়া ইতিহাস জানতে বইটা পড়তে তো হয়।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝স্পাই স্টোরিজ ২❞ মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার স্পাই জগতের স্পাইদের নিয়ে লেখা দ্বিতীয় বই যা প্রকাশ করেছে শিরোনাম প্রকাশন। প্রথম বইতে সাতজন তুখোড় স্পাইয়ের বৃত্তান্ত সংক্ষিপ্ত আকারে ছিল। পড়ে দারুণ লেগেছিল। তখন মনে হয়েছিল এদের প্রত্যেককে নিয়েই আলাদা একটা বই থাকলে আরো বিস্তারিত জানা যেত। লেখক এই বইতে সেই কাজেরই বাস্তবায়ন করেছেন। বইটিতে স্থান পেয়েছে একজন দুর্ধর্ষ ডাবল এজেন্টের দীর্ঘ ২২ বছরের এসপিওনাজ ক্যারিয়ারের অজানা সব তথ্য, যা পাঠক হটকেকের মতোই গিলবেন।
একজন এজেন্টের বর্ণনা থাকলেও তাকে পর্দার সামনে আনতে ব্যাবহার হয়েছে আরো ১৪ জন স্পাইয়ের। তাদের জীবনের নানা মোড়ের ঘটনাও ব্যক্ত করেছেন লেখক। নিঃসন্দেহে সেটা আগ্রহোদ্দীপক। বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত বইতে লেখক বইতে আগত চরিত্রদের পরিচিতি দিয়েছেন যা পুরো বই পড়ার জন্য সহায়ক ছিল। ভালো লেগেছে একেক অধ্যায়ের নাম যা মিল ছিল সেসময় নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের সাথে। অপারেশনের নাম থেকে শুরু করে স্পাইয়ের কোডনেমের ব্যাবহার গুলো দারুণ ছিল। প্রায় ২০-২২ টা রেফারেন্স থেকে একত্র করা তথ্যগুলোকে লেখক ২৩২ পৃষ্ঠায় নিজের লেখার দক্ষতায় সাজিয়েছেন। অবশ্যই যা সাবলীল এবং পড়তে আগ্রহ জাগিয়েছে। এত তথ্য, বিদেশি নাম কোডের ভিড়ে খেই হারিয়ে ফেলতে গেলেও এত উত্তেজনায় ভরপুর স্পাই জীবনের গল্পগুলো আবার হারানো থেকে তুলে আনছিল। বিশেষ করে শেষের দিকের প্রতিটা ঘটনা এবং তার উপস্থাপন আমি গোগ্রাসে গিলেছি। বাস্তব যে এতই উত্তেজনাপূর্ণ সেটা একজন স্পাইয়ের জীবনের ঘটনা এবং তাদের নির্ভীক করা কাজগুলো থেকে ধারনা করা যায়। বর্ণনা এবং বোঝার সুবিধার্থে লেখক ফুটনোট হিসেবে এসপিওনাজ জগৎ এবং দেশীয় অর্থে বিভিন্ন শব্দের মানে সহ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যেগুলো মূল বই বোধগম্য করতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। আচ্ছা এই ডাবল এজেন্টদের কাজকে নির্ভীক বলা যায়? তারা তো দেশের সাথে বিশ্বাসঘা ত ক তা করছে। সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে দেশকে শত্রুর কাছে খোলা করে দিচ্ছে। আপনার কী মনে হয়? একদেশের ভেতর আরেক দেশের খোচর না লাগিয়ে দেশগুলো যারযার কাজে মন দিলে কি ভালো হতো?!
যাক গিয়ে, বইটা পড়ার অভিজ্ঞতা আমার দারুণ। একজন মাস্টার স্পাইকে সামনে আনতে আরো যেসব ব্রিলিয়ান্ট স্পাইদের নাম সামনে এসেছে তাদের দক্ষতাও দারুণ।পড়ার সাথে ভিজ্যুয়ালাইজ করার সুবিধার্থে সাথে বেশ কিছু চিত্রের ব্যাবহার হয়েছে।
সবথেকে ভাবার বিষয় হয়েছে দুর্ধর্ষ এই স্পাইয়েরা কিভাবে সাধারণের মাঝে মিশে থাকে। আমার তো মাঝেমধ্যে অটো বা রিক্সায় উঠার পরে চালক যদি খুব খোশ আমেজে গপ্পো জুড়ে দেয় মনে হয় ব্যাটা কোনো স্পাই নাকি! আবার দেখা গেলো পেটে কথা রাখতে পারে না আপনার আলাভোলা অমন পরিচিত মানুষটা কোনো রাশান স্পাই! কে বলতে পারে!
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা রচিত স্পাই স্টোরিজ ২-এর মতো স্পাইং নিয়ে লেখা মৌলিক/অনুবাদ বইয়ের সংখ্যা আমাদের দেশে হাতেগোণা কয়েকটা। বইপত্র, অনলাইন আর্টিকেল গবেষণা, ক্রসম্যাচিং করে তা থেকে চুম্বক অংশ তুলে মেদহীন লেখনশৈলীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা চাট্টিখানি কথা নয়। প্রতিটা চ্যাপ্টার পড়বার সময় মনে হচ্ছিল ‘The Americans’ সিরিজের এক-একটি এপিসোড দেখছি। ‘The Americans’ হচ্ছে FX চ্যানেলে সম্প্রচারিত স্পাই জনরার তুমুল জনপ্রিয় একটি টিভি সিরিজ। তবে সিরিজে জেমস বণ্ড সুলভ স্পাইগিরি নেই, বণ্ড সাহেবের ধুমধাড়াক্কা মারপিটের তুলনায় অনেক ধীরগতির এই সিরিজ, অ্যাকশনের ব্যাপ্তি বলতে গেলে মুহূর্তখানেক। তবে ধৈর্য ধরে দেখলে ঠাহর করতে পারবেন সত্যিকারের এসপিওনাজ অ্যাক্টিভিটি আসলে কতটা জটিল, কতটা সাহসিকতা, ত্যাগ আর ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেয়। এফবিআই, সিআইএ, কেজিবি, এফএসবি, জিআরইউ, এসভিআর- প্রতিটি গোয়েন্দাসংস্থার মধ্যে চলা নীরব যুদ্ধের সরঞ্জাম বুলেট-বোমা নয়; বরং এসপিওনাজ জগতের লড়াইটা হয় চতুরতা, ক্লান্তিকর রিসার্চ, কঠোর শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় আর বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে। বইটা হাইলি রিকমেন্ডেড। ভাল কথা, এটা পড়তে গিয়ে সিরিজের প্রথম বই না পড়লেও চলবে। এখানে-সেখানে প্রয়োজনীয় ফুটনোট দেবার বিষয়টা ভালো লেগেছে। যারা গোয়েন্দাগিরির অনেক টার্ম সম্পর্কে অবগত নন, তারা পড়তে গিয়ে হোঁচট খাবেন না।
স্পাই স্টোরিজ সিরিজের দ্বিতীয় বইটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধকালীন কাহিনিকে কেন্দ্র করে রচিত। প্রথম বইটির মতোই এখানে বিভিন্ন গুপ্তচর কাহিনি রয়েছে, তবে এই খণ্ডটি মূলত "এজেন্ট বি" নামে পরিচিত এক ডাবল এজেন্টের গল্পকে ঘিরে। এখানে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই ও সিআইএ এবং রাশিয়ার কেজিবির মধ্যে চলমান গুপ্তচরবৃত্তির জটিল ধাঁধার গল্প।
মোজাম্মেল হোসেন তোহা তার লেখনীতে স্নায়ুযুদ্ধের গুপ্তচরবৃত্তির পৃথিবীকে জীবন্ত করে তুলেছেন। সাধারণ একটি কাহিনির মতো মনে হলেও, এর ভেতর লুকিয়ে আছে এক ডাবল এজেন্টের টানাপোড়েনের কাহিনি। এজেন্ট বি-র জীবনপথে যেমন রয়েছে ধোঁয়াশা, ঠিক তেমনি রয়েছে উল্��োপাল্টা মনোভাব এবং বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। এই এজেন্টদের মানবিক দিক, তাদের জীবনের সংকট, আর ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর টানাপোড়েন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
স্পাই স্টোরিজ ২ এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর বাস্তবসম্মত উপস্থাপনা। এখানে গুপ্তচরদের জীবনযাপন নিয়ে একধরনের রোমাঞ্চকর বাস্তবতা ফুটে উঠেছে, যা পাঠকদের চমৎকৃত করে। এজেন্ট বি-এর কাহিনির সাথে সেই সময়ের আরও কিছু বিখ্যাত গুপ্তচরের কথা উল্লেখ করায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও এসেছে, যা পাঠকদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয়। লেখক গল্পে গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যোগ করেছেন যা এই বইটিকে সাধারণ থ্রিলার থেকে আলাদা করে।
তবে কিছু পাঠকের কাছে এর গতি কিছুটা ধীর মনে হতে পারে। গল্পটি অ্যাকশননির্ভর না হয়ে মনস্তাত্ত্বিক দিক বেশি তুলে ধরেছে, যা প্রতিটি গুপ্তচরের জীবনের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। পাঠকরা আশা করতে পারেন যে ভবিষ্যতে লেখক এই সিরিজে আরও ভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে আসবেন, যেমন ইসরায়েলের মোসাদ বা ভারতের র-এর এজেন্টদের নিয়ে। এ ধরনের গল্প যোগ করলে সিরিজটি আরও বৈচিত্র্য পাবে এবং পাঠকরা ভিন্ন ভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কৌশল এবং বাস্তবতার সাথে পরিচিত হতে পারবেন।
সর্বোপরি, স্পাই স্টোরিজ ২ এমন একটি বই যা স্নায়ুযুদ্ধের গুপ্তচরবৃত্তির জগতে বাস্তবতার অনুভূতি নিয়ে আসে। এটি শুধু বিনোদনমূলক নয় বরং ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সাথে পরিচিত হতে চাইলে এটি একটি ভালো পছন্দ হতে পারে।
গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে অসাধারণ একটি নন-ফিকশন জনরার বই। তবে এটি পড়ার সময় ফিকশনের মতোই স্বাদ দেয়। বইয়ের শুরুতে সব চরিত্রের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণ্না দেওয়া হয়েছে যা পুরো বই পড়ার সময় কাজে লাগবে। কিভাবে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা দীর্ঘ ২২ বছর নিজের দেশের গুরুত্বপূর্ণ সকল তথ্য প্রথমে সোভিয়েত এবং পরে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করতে থাকে পৃথিবী বিখ্যাত দুই গোয়েন্দা সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে সেটিই ছিলো বইয়ের মূল প্রেক্ষাপট। বইটি একদম স্মুথলি পড়া যায়। বাইন্ডিং চমৎকার তাই বই পড়তে কোনো অসুবিধা হয় না। সবচেয়ে ভালো লেগেছে বইটিতে বানান ভুল চোখে পড়ে নি। সম্পাদনা টপ-নচ লেভেলের ছিল, ফাইভ স্টার দেওয়ার অন্যতম কারণ এটি। যারা এই ধরনের ডাবল এজেন্ট বা গুপ্তচরবৃত্তি টাইপ বই পছন্দ করেন, আশা করি তাদের বেশ ভালো লাগবে বইটি।
বইটা যেহেতু লেখার পর পড়ে শেষ করেছি, তাই গুডরিডস লিস্টে সেটাকে রাখাই উচিত। আর রাখছিই যেহেতু, তাহলে রেটিং কেন দিবো না?
তবে রিভিউ দিচ্ছি না। এটা কোনো রিভিউ না। এটা হচ্ছে লেখকের কথা:
আমার প্রথম বই "স্পাই স্টোরিজ" প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই পাঠকদের প্রধানত দুটো অনুরোধ ছিল। প্রথমত, এটাকে যেন সিরিজ হিসেবে চালিয়ে নিই। আর দ্বিতীয়ত, বইয়ের কলেবর যেন আরেকটু বড় হয়। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে কিছুটা দেরি হলেও অবশেষে পাঠকদের দুটো অনুরোধই রক্ষা করতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ।
গোয়েন্দা কাহিনিগুলো এমনিতেই যথেষ্ট রোমাঞ্চকর হয়। তার উপর সেই কাহিনিগুলো যদি হয় ইতিহাসের সত্য ঘটনা, এবং সাধারণ স্পাই না হয়ে সেই গোয়েন্দারা যদি হয় ডাবল এজেন্ট, তাহলে তো কথাই নেই। সেজন্যই শুরু থেকেই আমার পরিকল্পনা ছিল, সিরিজের দ্বিতীয় বই "স্পাই স্টোরিজ ২"-এর সবগুলো কাহিনি হবে সত্যিকারের ডাবল এজেন্টদেরকে নিয়ে, যারা প্রকাশ্যে নিজ দেশের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করলেও বাস্তবে সব তথ্য পাচার করে দিচ্ছিল শত্রুরাষ্ট্রের কাছে।
শুরুতে আমার পরিকল্পনা ছিল, প্রথম বইয়ের মতো এই বইয়েও একাধিক স্পাইয়ের কাহিনি বর্ণনা করব। সেই উদ্দেশ্যে প্রাথমিকভাবে ইতিহাসের সেরা আটজন ডাবল এজেন্টের কাহিনি বাছাই করেছিলাম, যাদের প্রত্যেকের গুপ্তচরবৃত্তির বিবরণ যেকোনো কাল্পনিক গোয়েন্দা কাহিনীকে হার মানাতে বাধ্য।
কিন্তু প্রথম ডাবল এজেন্টের কাহিনীটা লেখার জন্য বিভিন্ন বইপত্র পড়তে শুরু করার পর আমার মনে হয়েছে, তার পুরো জীবনটাই এত রহস্যময়, তার গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাস এত বিস্তৃত এবং সেখানে পরতে পরতে এত রোমাঞ্চ যে মাত্র ৩০-৪০ পৃষ্ঠায় তার কাহিনিটা লিখে শেষ করলে পাঠকদের প্রতি অবিচার করা হবে। তারা ঘটনাগুলো জানতে পারবে ঠিকই, কিন্তু একটা সফল গোয়েন্দা কাহিনিতে যেরকম রহস্য এবং উত্তেজনা থাকার কথা, সেটা পরিপূর্ণভাবে পাবে না। সেজন্যই শেষ পর্যন্ত আমি প্রথম বইয়ের ফরম্যাট থেকে বেরিয়ে এসে এই বইয়ে মাত্র একজন স্পাইয়ের কাহিনিই বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তবে পাঠকদের নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে একজন স্পাইয়ের কাহিনি তুলে ধরা হলেও বাস্তবে তার ২১ বছরের দীর্ঘ এসপিওনাজ ক্যারিয়ার, তাকে খুঁজে বের করার জন্য কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের ১৪ বছরের দীর্ঘ অনুসন্ধান কর্মসূচি এবং এরপর তাকে হাতেনাতে ধরার জন্য চালানো স্পেশাল অপারেশন- সব মিলিয়ে কাহিনিটা এত বেশি বিস্তৃত যে এতে মূল স্পাইয়ের পাশাপাশি উঠে এসেছে আরও ১৪ জন স্পাইয়ের কাহিনি। আর বাকি যে সাতজন ডাবল এজেন্টের কাহিনি প্রাথমিকভাবে আমি নির্বাচন করেছিলাম, সেগুলো তো জমা আছেই। তাদের গল্প বলা যাবে স্পাই স্টোরিজ ৩, ৪, ৫ অথবা সিরিজের পরবর্তী কোনো বইয়ে।
বলাই বাহুল্য, সিরিজের প্রথম বইয়ের মতোই এই বইয়েও বর্ণিত প্রতিটা ঘটনাই সত্য। অন্তত যে আটটা বই এবং বিভিন্ন আর্টিকেল থেকে আমি তথ্যগুলো সংগ্রহ করেছি, সেগুলোর লেখকদের দাবি অনুযায়ী। আটটা বইয়ের মধ্যে পাঁচটা লিখেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা, আর বাকি তিনটা লিখেছেন আমেরিকান এবং রাশিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, যারা নিজেরাই ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। যেসব ক্ষেত্রে তাদের তথ্যগুলো মিলে গেছে, সেগুলো আমি সরাসরিই গ্রহণ করেছি। আর যেসব ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য বা ব্যাখ্যা উঠে এসেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কোথাও দুটোই উল্লেখ করেছি, কোথাও যেটা অধিকতর বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে, সেটা উল্লেখ করেছি।
গোয়েন্দা কাহিনি বলতে মানুষ সাধারণত কাল্পনিক গোয়েন্দা কাহিনিই বোঝে। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তব গোয়েন্দাদের জীবন এবং ক্যারিয়ার যে অনেক সময় কল্পনার জগতকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে, সেটা হয়তো অনেকেরই অজানা। আমার “স্পাই স্টোরিজ” সিরিজের মূল লক্ষ্য এ ধরনের স্পাইদের কাহিনিই পাঠকদের সামনে তুলে ধরা। বইটা যদি পাঠকদেরকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি সাহিত্যের নন-ফিকশন ধারা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা সম্পর্কে তাদেরকে আগ্রহী করে তোলে, তাহলেই আমার কষ্ট সার্থক হয়েছে বলে মনে করব।
সবশেষে বইয়ের প্রাথমিক প্রুফ দেখে দেওয়ার জন্য এবং প্রয়োজনীয় ফিডব্যাক দেওয়ার জন্য স্ত্রী অন্তরার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তার সাহায্য এবং সমর্থন না পেলে বইয়ের কাজ সময়মতো শেষ করা আমার জন্য কঠিন হতো।
গুপ্তচরবৃত্তি মানব ইতিহাসের বহু পুরনো একটি পেশা। তবে কল্পকাহিনীর স্প��ই আর বাস্তবের স্পাই জীবনের বাস্তবতা কিছুটা হলেও ভিন্ন। আমিতো বলবো, মোটাদাগে ভালো রকমের তফাৎ আছে। তবে তফাৎ যাই হোক, গোয়েন্দা কাহিনী, থ্রিলার পড়তে যারা ভালোবাসেন, তাদের জন্য সত্যিকারের এসপিওনাজ ঘটনাসমৃদ্ধ বই কিছুটা বিরিয়ানির কিংবা ফুচকার স্বাদ এনে দেয়।
সম্প্রতি মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার 'স্পাই স্টোরিজ ২' পড়ে শেষ করলাম। পড়ার পর আপাতত ২টি বিষয় নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে।
১. কন্টেন্ট একটি বইয়ের প্রাণ। সেটা ভালো হলে অন্যান্য ত্রুটি পাঠক হিসেবে এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়। সেদিক থেকে কন্টেন্ট আমার কাছে ফার্স্টক্লাস লেগেছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মত ভিন্ন ট্রেড থেকে লেখালেখিতে এসে উন্নতমানের লেখা উপহার দেয়ার ঘটনা অনেক আছে আমাদের বাংলা সাহিত্যে। সেই তালিকায় এই লেখক আপন শক্তিতে জায়গা করে নিয়েছেন। নাম করা অনেক লেখক ও প্রকাশনী থেকে বের হওয়া বইয়ের ভেতর এখন একটা কমন মহামারী দেখা যায়, সেটা হচ্ছে- 'র' এবং 'ড়' এই দুটো বর্ণ কোথায় ব্যবহার করতে হয় তাঁরা জানেন না। কিন্তু এই বইটি সেদিক দিয়ে দারুণ শান্তি দিয়েছে। 'শিরোনাম প্রকাশনী' এর আগে আমি চিনতাম না (সেটা আমার অজ্ঞতা), কিন্তু পুরো শিরোনাম টিমকে অভিনন্দন এমন 'মহামারী' মুক্ত একটা বই বাজারে আনার জন্য, পাঠককে বিরক্ত না করার জন্য, শান্তি দেয়ার জন্য।
আমেরিকা আর রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার 'টম এন্ড জেরি' খেলা এতটাই উপভোগ্য ছিলো যে, আমার কাছে মনে হয়েছিলো বই পড়ছিনা, সিনেমা দেখছি (আশাকরি এই বইকে উপজীব্য করে ভবিষ্যতে কোন দক্ষ নির্মাতা চলচ্চিত্র বানাবেন)। 'এজেন্ট বি' জাস্ট মাইন্ড ব্লোয়িং। কারণ, এক 'এজেন্ট বি'কে ধরতে গিয়ে কতগুলো স্পাইকাহিনী সামনে চলে এলো, কতগুলো মানুষের গল্প পড়ে ফেললাম মন্ত্রমুগ্ধের মত!
তবে লেখকের একটা সিগনেচার ঢঙ আছে লেখার। সেটা 'স্পাই স্টোরি' নামে তাঁর পূর্বপ্রকাশিত একটি বই আছে সেটা পড়লেই বোঝা যাবে। যেমন, তাঁর বই সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা, সুতরাং এখানে রঙ লাগিয়ে পাঠকমনে জায়গা করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রতিটা ঘটনার একটা পজ লাইন আছে, সাময়িক পজ, সেই পজে/বিরতিতে তিনি নিজের আয়োজনে কিছু বাক্য যুক্ত করে থাকেন। সম্ভবত এই লেখকের সেটাই একটা গোপন মেধা। কারণ বিরতিতে যুক্ত করা নিজস্ব কয়েক বাক্যের মত বা বিশ্লেষণ পুরো ঘটনাকে রঙ্গিন করে দেয়, তাঁর বলার স্টাইলটা এতটাই দারুণ। তবে এটাকে শুধু লেখকের মেধা বলবো না, এটা তাঁর লেখার প্রতি, তাঁর সৃষ্টির প্রতি ডেডিকেশান বা অকৃত্তিম ভালোবাসা। স্পাই, ডাবল এজেন্ট, ট্রিপল এজেন্টসহ অনেক নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছি। ৬৭টি ফুটনোট আছে এই বইয়ে শুধু অচেনা এসপিওনাজ জগতের সাংকেতিক শব্দের বিশ্লেষণ দেয়ার জন্য। ২২টি রেফারেন্স দেয়া আছে একদম শেষের পাতায়।
স্পাই জীবনের রোমাঞ্চ, বিলাসবহুল জীবন, ক্ষমতা, ঝুঁকি, দারিদ্র, সিদ্ধান্ত, এনালাইসিস, যোগাযোগ, মানে স্নায়ুযুদ্ধ যেন প্রতিটি পাতায় পাতায়। এতটা ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এসপিওনাজ জীবনে বেছে নেয়া মানুষগুলোর জীবন আসলে কেমন হয়? কী হয় শেষতক এসব বিশ্বাসঘাতক এজেন্টদের ভাগ্যে? আর এতসব ভয়ানক ঘটনার মাঝখানে থেকে 'এজেন্ট বি' কেন নিজেকে 'জেমস বন্ড' ভাবতে গেলেন? ২৫ বছরের কর্মজীবনে ২২ বছরই কীভাবে কেজিবির হয়ে কাজ করে গেলেন? কেনই বা সেটা করলেন? কী ছিলো তাঁর অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব?
সবমিলিয়ে কন্টেন্ট আমাকে ভালো লাগিয়েছে। অবশ্য লেখক ভূমিকাতেই বলেছিলেন, পাঠকের প্রতি অবিচার করবেন না। ইয়েস, তিনি সুবিচারই করেছেন, কথা রেখেছেন। বইয়ের শেষে আমেরিকার এজেন্সিগুলোকে গ্লোরিফাই করে লেখা বই, রাশান এজেন্সি ও এজেন্ট বি নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ ঠিক আমার পাঠকমনের না বলা কথাগুলোই বলেছেন।
২. বইটার মেকিং এতই দারুণ যে, প্রচ্ছদ, কাভার, হার্ডকাভার, পুস্তনি, প্রতিটি পাতার ও অধ্যায়ের অলঙ্করণ, কাগজ, রিবণ, বুকমার্ক সবকিছু এই বইয়ের প্রতি আন্তরিক যত্নের সাক্ষর বহন করছে। মনটা সত্যিই ভরে গিয়েছে বইটি হাতে নিয়ে। প্রচ্ছদ শিল্পী সজল চৌধুরীকে একটা ধন্যবাদ না দিলে অন্যায় হবে। শিরোনাম প্রকাশনী, আপনাদের পুরো টিমকেও ধন্যবাদ জানাই। শুধু প্রচ্ছদ আর অলংকরণ নিয়েই সম্ভবত ১০ মিনিট বলা লাগবে যদি ভিডিও বানাই!
একটা প্রশ্নঃ ১৯৯০ সালে ফেলিক্সের উপর থেকে নজরদারির ইতি টানা হলে ফেলিক্সের জীবন একরকম বিধ্বস্ত হয়ে যায়। শেষতক পাবলিক বাসে ড্রাইভারি করেও বেঁচে থাকতে হয়। কিন্তু ৩২ নম্বর পাতায় একটা ছবিতে ক্যাপশন দেয়া ১৯৯৮ সালে ফেলিক্স ভিয়েনার একটি পার্টিতে। এটা কীভাবে সম্ভব!! আমার ধারণা এটা হবে ১৯৮৮, কারণ ৮৮তে ফেলিক্স চাকরিতে বহাল তবিয়তেই ছিলেন।
পুনশ্চ ০১ঃ যেহেতু এটা একটা সত্য ঘটনার এসপিওনাজ স্টোরি, সেহেতু লেখক বইয়ের ভেতর অনেক চরিত্রের ছবি বিভিন্ন পাতায় দিয়ে দিয়েছেন। যেটা পাঠকের জন্য ভালো লাগার উদ্রেক করবে।
পুনশ্চ ০২ঃ বইমেলার অপেক্ষায় না থেকে, বছরের মাঝে অন্তত আরও একটি বই বাজারে আনলে পাঠকের ক্ষুধা নিবারণ হতো।
গোপন কথাঃ লেখকের নিজের ওয়েবসাইট আছে, সেখানেও অনেক লেখা পাবেন। আমার সব পড়া শেষ, চাইলে আপনারাও পড়তে পারেন।
বইয়ের নামঃ স্পাই স্টোরিজ ২ লেখকঃ মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা প্রকাশকঃ শিরোনাম
I knew the story yet I felt the suspense till the end! It's a great story of one of the greatest stories in spying history. Well written and well narrated. Get ready to mesmerize in the world of espionage.
সেরা !!! 'স্পাই স্টোরিজ ' বইটা পড়া না হলেও 'স্পাই স্টোরিজ ২' প্রি-অর্ডার এ নিয়ে পড়ে শেষ করলাম।লেখার ধরন, অপরিচিত শব্দগুলোর ক্ষেত্রে ধারণা দেওয়া,সব মিলিয়ে আমার সংগ্রহে থাকা নন-ফিকশনগুলোর মধ্যে সেরা🫶 লেখক ত্বোহা ভাই ঘটনাগুলোকে দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন।প্রায় পুরোসময় থ্রিল আর রহস্য'র উপস্থিতি ছিলো।
"I trust no one, not even myself." ( আমি কাউকে বিশ্বাস করি না, এমনকি নিজেকেও না।) এ কথাটি বলেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী জোসেফ স্তালিন। তবে এই কথাটি এসপিওনাজ জগতের জন্য এক কঠিন সত্য। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ-এর দ্বৈরথ সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশি জানি। যদিও সিআইএ টিকে থাকলেও বর্তমানে কেজিবি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাগের পর বিলুপ্ত হয়ে যায়। অনেকেই হয়তো জানেন যে, রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১৬ বছর কেজিবির গোয়েন্দা ছিলেন এবং তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদবীতে থেকে অবসর গ্রহণ করেন। মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্লক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্লকের মধ্যে গুপ্তচর বৃত্তি বেড়ে যায় ব���ুগুণ। এ সময়টাতেই জন্ম হয় অসংখ্য ডাবল এজেন্টের ( যে গোয়েন্দা কোন একটি সংস্থা বা দেশের হয়ে কাজ করার ভান করে গোপনে প্রতিপক্ষ দেশের হয়ে কাজ করে )। সেরকমই স্নায়ুযুদ্ধের সফলতম এক ডাবল এজেন্টের কাহিনী নিয়ে Mozammel Hossain Toha হাজির হয়েছেন তার "স্পাই স্টোরিজ ২" বইটিতে।
লেখককে আমি মূলত Roar বাংলা এর কিছু আর্টিকেল পড়ে চিনেছি। বিশেষ করে তার ই স রা ই ল - ফি লি স্তি ন সং ঘাত নিয়ে কিছু লেখা আমার খুবই ভালো লেগেছে। এবার বইয়ের কথায় আসি। বইটি পড়ে অনেক নতুন টার্মের সাথে পরিচিত হলাম, যেমন- হ্যান্ডলার, পিচ, ড্রাইক্লিনসহ আরো অনেক। যেখানে কোন দুর্বোধ্য টার্ম বা শব্দ আসে তার নিচেই সে শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়া থাকে। তবে কিছু শব্দের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা দেয়াটা অযৌক্তিক মনে হয়েছে। যেমন: ফিনিশ ( ফিনল্যান্ডের নাগরিক ), ক্যাথলিক ( খ্রিস্ট ধর্মের প্রধান একটা সম্প্রদায় ), ইনফর্মার ( চর বা তথ্যদাতা ), ফরেনসিক এনালাইসিস (আদালত সম্বন্ধীয় বিশ্লেষণ)। এ জাতীয় শব্দ সম্পর্কে প্রায় সকলেই অবগত।
বইটি অত্যন্ত সাবলীল এবং সহজ সরল ভাষায় লেখা। স্নায়ুযুদ্ধ এবং এসপিওনাজ জগতের মত দুর্বোধ্য জিনিসগুলোকে লেখক খুবই প্রাঞ্জলভাবে পাঠকের সামনে উপস্থিত করতে পেরেছেন বলে অবশ্যই তিনি প্রশংসার যোগ্য। বইটি পড়ে যে ব্যাপার উপলব্ধি করা যায় তা হল বাস্তবজগতের গোয়েন্দা কাহিনীগুলো খুবই কমপ্লিকেটেড এবং তারা রূপালী পর্দার যেকোনো স্পাই মুভির কাহিনীকে হার মানাতে বাধ্য।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে এই স্পাইরা কিভাবে জনসাধারণের মাঝে মিশে যায় অথবা কিভাবে তাদের আসল পরিচয় গোপন রেখে বছরের পর বছর সরকার এবং আশেপাশের মানুষকে ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে তা আপনাকে অবাক করবে।
বুদ্ধিমত্তা, দেশপ্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা এইসব কিছু মিলে বইটিকে খুবই ইন্টারেস্টিং করে তুলেছে। Kudos to the writer for connecting all the dots perfectly. ব্যাপারটা এমন নয় যে বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের বই কখনো লেখা হয়নি। তবে লেখক যেখানে অনন্য হয়ে উঠেছেন তা হল তিনি তার পারপাস সার্ভ করতে পেরেছেন। অর্থাৎ বইটিকে সহজবোধ্য ভাষায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। লেখকের লেখার ধরন আমাকে অনেকটা ড. আকবর আলী খানের "পরার্থপরতার অর্থনীতি" বইয়ের লেখার স্টাইলকে মনে করিয়ে দেয়। তিনিও অর্থনীতির দুর্বোধ্য জিনিসগুলো অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় পাঠকের জন্য উপস্থাপন করেছিলেন।
আশা করি লেখক এই স্পাই স্টোরিজ সিরিজকে নিয়ে ভবিষ্যতে আরো এগিয়ে যাবেন। সবশেষে একটি উক্তি দেয়ার লোভটা আর সংবরণ করতে পারলাম না। " The worst thing about the betrayal is - it never comes from the enemy."
এই বইটা হাতে পাওয়ার পর প্রথমে যেটা মুগ্ধ করলো, সেটা হলো বইয়ের প্রচ্ছদ। ফেসবুকে ছবিতে যেমন দেখা যায়, হাতে নিলে তারচেয়ে অনেকবেশি সুন্দর প্রচ্ছদটা। সুন্দর প্রচ্ছদ মন ভালো করে দেয়! বইটা খুলতেই একটা কিউট বুকমার্ক পেলাম। সব লেখকরা বইয়ের সাথে বুকমার্ক দেয়না কেন?
সত্যি কথা বলতে কি, বইটা প্রথমদিকে আমার বেশ কাঠখোট্টা লাগছিলো। এতো চরিত্র, এতো কেইস একসাথে, গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছিলো। তার ওপর সব ডাবল এজেন্টদের কাহিনী। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, বইটা মনে দাগ বসাতে পারছে না কেন? আমরা কি সব বইয়েই হিরো খুঁজি নিজের অজান্তে? এখানে সব প্রতারকদের কাহিনী বলেই কি পছন্দ হচ্ছে না? নাকি উপস্থাপনার কারণে? এতো চরিত্রের মধ্যে মূল চরিত্রকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না বা টুকটাক পাওয়া গেলেও মূল চরিত্রের সাথে অন্যদের কাহিনীর এতো বিস্তারিত বর্ণনা কেন আসছে বোঝা যাচ্ছিলো না। তবুও এফবিআই, সিআইএ, কেজিবির কাজের ধরণ সম্পর্কে জানার আগ্রহ বইয়ে আটকে রাখছিলো। আর সবগুলো কাহিনী যেহেতু সত্য কাহিনী, ওটার আলাদা আকর্ষণ তো আছেই।
বইয়ে মন বসতে শুরু করে যখন হ্যানসনের কাহিনী শুরু হয় অন্যসব বাদ দিয়ে। এরপর ও'নীল চরিত্রটির আগমনের পর জমজমাট হয়ে ওঠে কাহিনী। এরপর বইটা একবসায় পড়ার মতো বই। বইয়ের এই দ্বিতীয় অর্ধেক সত্যিই ভালো লেগেছে। বইয়ের প্রথমে কোনো চরিত্রের সাথে কানেক্ট করতে না পারলেও শেষে এসে একবার মনে হলো হ্যানসন ধরা না পড়ুক!
কেইসটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যে মূল চরিত্র নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা ছিলো এটা ভালো লেগেছে। এই আলোচনাটায় পড়তে পড়তে মনে জেগে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নের কিছুটা উত্তর পাওয়া গেছে। এটা বলতেই হবে, চরিত্র বাছাই ভালো হয়েছে। হ্যানসন চরিত্রটা আসলেই ইন্টারেস্টিং!
পড়তে পারেন বইটা। যারা ডিটেকটিভ উপন্যাস, থ্রিলার পছন্দ করেন বা যাদের এসপিওনাজ জগত সম্পর্কে জানার আগ্রহ আছে তারা পড়ে মজা পাবেন।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে এসে এ বছরের প্রথম বই পড়লাম৷
এক নিঃসঙ্গ, নীরব মানুষের অসম্ভব, অবিশ্বাস্য সত্যিকার এক রোমাঞ্চকর জীবনের গল্প। যিনি আমেরিকার গোয়েন্দা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছেন। টানা ২২ বছর ধরে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরে বসে তাদেরই শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে তুলে দিয়েছেন শত মিলিয়ন ডলার মূল্যের গুরুত্বপূর্ণ নথি।
বিনিময়ে তিনি নিয়েছেন মাত্র ৬ লাখ ডলার। অথচ তাকে খুঁজে বের করার জন্য এক রুশ এজেন্টের পেছনেই আমেরিকার খরচ হয়েছে ৭০ লাখ ডলার!
পুরো বই জুড়ে টুইস্টের পর টুইস্ট। মাথায় যেন জট লেগে যাচ্ছিল৷ স্পাই ফিকশনে যেমন লেখকরা একের পর এক জট তৈরি করেন, শেষে গিয়ে সব জটগুলোকে এক সূত্রে গেঁথে দেন ঠিক সেই অবস্থা। কিন্তু ঘটনা যেহেতু বাস্তবের সে কারণে রোমাঞ্চ অনেক বেশি।
এই বইতে ঘটনার পেছনের ঘটনাকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেকটা লেয়ার বাই লেয়ার।
একই সাথে এই বইতে স্পাই জগতের বিভিন্ন ছোট ছোট শব্দের যেভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয় এখান থেকে ছোট একটা ডিকশনারি তৈরি করা যাবে।
তবে অফিস থেকে ডিভাইস চুরি ও তাকে আটকের বর্ণনা পড়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে থ্রিল একটু কম লাগছে। তখন মনে হচ্ছিলো বিষয়টা স্কিনে, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে দেখতে পারলে আরো বেশি থ্রিল অনুভব করা যাইতো। পড়ে গুগল করে দেখলাম এ বিষয়ে একটা মুভিও আছে। যদি মুভিটা দেখার ইচ্ছে আমার নাই। কারণ ঘটনার আদ্যোপান্ত সবই স্পাই স্টোরিজ-২ তে উঠে এসেছে।
এক বসায় শেষ করার মতো বই। এক বসাতেই শেষ করা উচিত৷ নয়তো মজা কম পাবেন। অন্তত ডাবল এজেন্টের পরিচয় জানা পর্যন্ত। এখানে অবশ্য একবার বোকা হতে হবে৷ একবার একজনের নাম জানার পর মনে হবে যাক অবশেষে বেটা ধরা খেয়েছে। কিন্তু না। টুইস্ট আরো বাকি।
স্পাই-মুভিগুলো দেখতে গেলে সাধারণত আমরা স্পাইদের পারস্পেক্টিভে ঘটনাগুলো দেখি যে, কিভাবে তারা অন্যদেরকে ধোঁকা দিয়ে নিজেদের কাজ হাসিল করছে। কিন্তু এই বইতে আসলে স্পাইকেই খুঁজে বের করার অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা আছে। বইয়ের শুরুতেই চরিত্র পরিচিতিতে এত এত বিদেশী নাম, বিশেষত রাশিয়ান নামগুলো পড়ে ভাবছিলাম এত এত ইনফো মাথায় রাখবো কিভাবে। গল্প শুরুর দিকে ব্লক-কেসটা দেখে ভাবলাম একে নিয়েই কাহিনী, কিন্তু না! আসল মানুষ তো অন্যকেউ পেছনে বসে আছে। এরপর একে অপরকে নিজের দলে টা���া, মোল হান্টিং এর বিভিন্ন পদ্ধতি, ডেডড্রপের তারিখ ঠিক করা ইত্যাদি ঘটনাগুলো অনেক ইন্টারেস্টিং লেগেছে। কিন্তু মূল ব্যক্তিকে শনাক্ত করার পর খেয়াল করলাম, এতক্ষণ যা যা ঘটলো কাহিনীগুলো মাথার ভেতর এলোমেলো হয়ে গেছে। এইক্ষেত্রে লেখক পুনরায় সামারি আকারে সবগুলো ঘটনা পরপর জুড়ে দেওয়ায় পূর্ণ তৃপ্তিটা পেলাম। সফলতম এই ডাবল এজেন্টের ব্যক্তিগত জীবন এবং এই কাজে জড়ানোর গল্পগুলো শুনতে শুনতে এবং রিয়েল লাইফ ফুটেজগুলো দেখে বেশ মায়া জমে গিয়েছিলো। বারবার মনে হচ্ছিলো সে যেন তীরে এসে তরী না ডোবায়, ধরা যেন না পড়ে। অথচ ধরা না পড়লে আমরা এসব ঘটনা জানতেও পারতাম না।
এসপিওনাজ কিংবা স্পাই রিলেটেড গল্প আমার একটু পছন্দের টাইপের। এই টাইপের বই পেলে আমি গোগ্রাসে পড়ার চেষ্টা করি। আর কোল্ড ওয়ারের সময়কার এসপিওনাজ গল্প হলে তো কথাই নাই। তাই বইটা হাতে পেয়ে আমি বিনা দ্বিধায় পড়তে বসে যাই। এসপিওনাজ থ্রিলারের স্বর্ণযুগ ছিল আশি নব্বই দশকে। কোল্ড ওয়ারকে কেন্দ্র করে আমেরিকাতে কিংবা অন্যান্য দেশে হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে। এই জনরায় লেখার জন্য তো জন লে ক্যারে কিংবদন্তী হয়ে রয়েছেন। বিশেষ করে তার কার্লা ট্রিলজি ( Tinker Tailor Soldier Spy, The Honourable Schoolboy, Smiley's People ) এবং দ্য স্পাই হু কেম ইন ফ্রম দ্য কোল্ড তো এসপিওনাজ থ্রিলার জগতের ক্লাসিকের তকমা পেয়েছেন।
তবে কোল্ড ওয়ারের পরে এই জনরার লেখা কমে এসেছে। কিন্তু আবেদন একটুও কমেনি। তুলনামূলক আমরা যেরকম মারমার কাটকাট থ্রিলার পড়ি এসপিওনাজ থ্রিলার কিংবা বাস্তবের এসপিওনাজ জগত এরকম মারমার কাটকাট না হওয়াতে অনেক পাঠকই এই জনরার সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না। কিন্তু যে একবার এসপিওনাজ ইঁদুর বেড়াল খেলায় মজা পেয়ে যায় তার কাছে এর চেয়ে অমৃত আর কিছু হতে পারে না। তো যদি এখন লে ক্যারে এবং অন্যান্য যারা স্পাই থ্রিলার লিখেছে তাদের বইয়ের পাতা যদি সত্যি হয়ে দেখা দেয় কেমন লাগবে বলেন তো? তাদের লেখা কোন বই নয় বরং সত্য ঘটনা যা ঘটে গিয়েছে কোল্ড ওয়ারের সময় সেটা নিশ্চয় পাঠকের মনে থ্রিল দিয়ে যাবে। লে ক্যারের রাশিয়ান স্পাই মাস্টার কার্লা কিংবা জর্জ স্মাইলি না বাস্তবের স্মাইলি এবং কার্লার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে স্পাই স্পোরিজ ২ এর গল্প।
মূল গল্প খুব সরল আবার কঠিনও। আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো টের পায়, তাদের ভেতরে এমন একজন উচ্চপদস্থ ডাবল এজেন্ট আছে, যে তাদের টপ সিক্রেট তথ্যগুলো কেজিবির কাছে পাচার করে দিচ্ছে। সেই ডাবল এজেন্টের খোঁজে সিআইএ এবং এফবিআই দীর্ঘ একটা অপারেশন শুরু করে, যা স্থায়ী হয় পরবর্তী ১৫ বছর পর্যন্ত। এই সুদীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নানা ঘাত প্রতিঘাত , এসপিওনাজ এবং রিভার্স এসপিওনাজের সম্মুখীন হতে হয় কেজিবি,সিআইএ এবং এফবিআই’কে। ১৫ বছরের সুদীর্ঘ তদন্তের বিস্তারিত বর্ণণাই হচ্ছে এই বই। আর একটা ডাবল এজেন্ট ধরতে গিয়ে পর্যাযক্রমে উঠে আসে আরও কয়েকজন স্পাইয়ের ঘটনা এবং তাদের কার্যকলাপের হালচাল। খুবই উপাদেয় এবং সুস্বাদু উপায়ে লেখা বইটি এক মিনিটের জন্য হাত থেকে নামানো দায়। বস্তুত এসপিওনাজ জগতের এই ঘটনাগুলো এতোই আলোচিত, যে কেউ চাইলেই ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করতে পারে। কিন্তু কথার পীঠে কথা থাকে। আর থাকে স্বাদু হাতের লেখার প্রেজেন্টেশন। এই ক্ষেত্রে লেখক ১০০ তে ১০০ ভাগ সফল। দারুণ প্রেজেন্টেশনে বইটা আরও উপভোগ্য করে তুলেছে।
স্পাইগিরি বা গুপ্তচরগিরি মানুষের ইতিহাসের শুরু থেকেই মনে হয় হয়ে আসছে। তবে টিভিতে নাটক, সিনেমা কিংবা ফিকশন বইতে গুপ্তচরবৃত্তিকে ঘিরে যে ধুন্ধুমার অ্যাকশান দেখি, নাটকীয়তা দেখি বাস্তবে কি আসলেই এতটা হয়? আমার ধারণা ছিল হয় না। জন লে কার এর বই বা বই থেকে হওয়া সিনেমা দেখেও মনে হয়েছে আসলে এতটা হয় না বাস্তবে।
সে জায়গা থেকে মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা’র লেখা ‘স্পাই স্টোরিজ ২’ বইটা যখন পড়ার জন্য হাতে নিই তখন ধরেই নিয়েছিলাম তথ্যে ঠাসা একটা নন-ফিকশন বই হতে যাচ্ছে, যেটা কিনা তথ্যের তরল উপচে পড়ার ভয়ে একবারে না ঢেলে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে ঢালতে হবে। কিন্তু বই শুরু করার খানিক পরেই বুঝতে পারলাম আমার ধারণা পুরোপুরি ঠিক না। এর একটা বড় কারণ হচ্ছে, ক্ষুরধার লেখা। লেখক একটা নন-ফিকশন বইকে যেভাবে প্রাণ দিয়েছেন, শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যের তৈরি করেছেন তা আক্ষরিক অর্থেই শ্বাস আটকে দিতে বাধ্য করে। আমার ধারণা ছিল, নন-ফিকশনে নারায়ণ সান্যালের ধারে কাছে লিখতে পারে এমন লোকের লেখা আমি পাবো না। খুবই আনন্দ নিয়ে বলতে হচ্ছে, মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা অনেকটাই আমার সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। ইতোমধ্যে ফেসবুক জুড়ে তার লেখার সুনাম ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু আমি যখন পড়েছিলাম তখন আসলে এটা নিয়ে তেমন কোন কথা দেখিনি। সে হিসেবে আমি লাকি যে, আমাকে যে এক্সপেরিয়েন্সটা পেতে হলো, সেটা দারুণ দারুণ এবং দারুণ।
বইয়ের কন্টেন্ট নিয়ে যারা এখনো জানেন না, তারা জেনে রাখুন, এই বইটাতে উঠে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মধ্যকার কোল্ড ওয়ারের সময়ে এক দেশের প্রতি আরেক দেশের স্পাইগিরির নমুনা। এজেন্ট থেকে কখনো ডাবল এজেন্ট, কখনও আবার ট্রিপল এজেন্ট হয়ে যাচ্ছে স্পাইরা। বিস্তারিত আর কিছু বললাম না তবে ২৩২ পৃষ্ঠার এ বইতে একটা পৃষ্ঠাও যে আপনাকে বোর হবার সুযোগ দেবে না এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। আর এ বইটাতে স্পাইগিরির সাথে সম্পর্কিত অনেক টার্ম আছে যেটা হয়তো সাধারণ পাঠকদের অনেকেই জানবেন না। আমিও জানতাম না কিন্তু লেখক টীকা সংযোজন করে এখানেও কোন কথা বলা সুযোগ রাখনেনি। এত কিছু ঠাসা এই বইটার দামও কম, মুদ্রিত মূল্য মাত্র ৪০০ টাকা যেটা ডিসকাউন্টে ২০০ টাকার আশেপাশে পাওয়া যাবে। তাই আপনি থ্রিলার লাভার হলে তো অবশ্যই এমনকি থ্রিলার লাভার না হলেও স্রেফ দারুণ লেখায় তথ্যসমৃদ্ধ একটা বই পড়তে চাইলে এই বইটা কিনে নিতে পারেন কোন দ্বিধা ছাড়াই। কারণ এ বইটা বাংলা নন-ফিকশন, গবেষণাসাহিত্যে অনন্য একটা সংযোজন যেটা রেফারেন্স বই হিসেবেও কাজে লাগতে পারে।
প্রি অর্ডার করা বইটা হাতে পেয়েছি ছুটি'র দিনে। আর বাসা ছিলো মোটামুটি ফাঁকা। তাই দেরী না করে পড়া শুরু করে একটানে শেষ করলাম।
বইয়ের জন্য একটা প্রচলিত শব্দ হচ্ছে "আনপুটডাউনেবল"। মানে বিরতিহীন ভাবে একবারে পড়ে শেষ করার মতো বই। "স্পাই ষ্টোরিজ ২" হচ্ছে আনপুটডাউনেবল বই।
১৫ বছর যাবৎ চলা শ্বাসরুদ্ধকর এক স্পাই হান্টের কাহিনী।
এজেন্ট বি ওরপে রেমন গার্সিয়া ছদ্ম নামের ডাবল এজেন্ট কে নিয়ে যে কাহিনী'র জন্ম, তাতে জড়িয়ে ছিলো আরো কয়েক ডজন ডাবল এজেন্টের কাভার ফাঁস হবার করুন পরিনতি। "এজেন্ট বি" এফবিআই, সিআইয়ে'র মতো জাঁদরেল গোয়েন্দাদের ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে সেটা জানতে বইটা শেষ পর্যন্ত না পড়ে উপায় নেই।
সাধারনত গতানুগতিক স্পাই থ্রীলারের চেয়ে অনেক বেশী রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কাহিনী। বাস্তবের স্পাই এবং তাদের কর্মকান্ডের সাথে আমরা খুব কম পরিচিত। জেমস বন্ড কিংবা মাসুদ রানার মতো একশনে ভরপুর বই পড়ে আমাদের প্রজন্ম স্পাই, ডাবল এজেন্ট কিংবা স্পাই শিকারের গল্প পড়েছি।
কিন্তু বাস্তব জিবনে এরকম ডাবল এজেন্ট শিকারের কাহিনী যে এতো উত্তেজনাপূর্ণ, তা এই বই না পড়লে কেউ জানতে পারবেনা।
কেজিবি এজেন্ট স্লানিতাভ লেভচেঙ্কো'র "আমি ছিলাম কেজিবি'র লোক' বইটা ছিলো আমার পড়া সেরা রিয়েল লাইফ গোয়েন্দা কাহিনী। কিন্তু "স্পাই ষ্টোরিজ ২" তার চাইতে অনেক গুন বেশী সাসপেন্স আর থ্রীলারে ভরপুর বই।
জেমস বন্ডে'র মতো ভেলকীভাজী চাতুর্য, ষ্ট্রিট ফাইট কিংবা চেজিং এ ভরপুর একশান থেকেও বেশী থ্রীল পেয়েছি বইটা পড়ে।
ত্বোহা ভাইয়ের লেখনী'র সাথে অনেক আগে থেকেই পরিচিত। সাবলীল উপস্থাপনা এবং প্লট সাজানোতে দারুন মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তিনি তার আগের বই গুলো থেকে।
শেষে একটা বিরক্তি প্রকাশ করে যাই। ৬৭ টা ফুটনোট দিয়েছেন বইটাতে। যারা এই জনারার বই পড়ে অভ্যস্থ তাদের সবার ৮/১০ টা ছাড়া প্রায় সব গোয়েন্দা টার্ম জানার কথা।
This is the best book I have read in a couple of months. The contents of the book is unparalleled in the Bengali literature. It definitely is better than it's previous version spy stories, not only with respect to content but also in rhetorical aspects. Frankly, I was feeling a little bit off in last few days, but after getting myself immersed in this book, I certainly am feeling a lot better. I have read countless books both in Bengali and English literature and thriller novel. If I had to rank this book, I am certain that it will be in top 3, regarding this Genre, probably because of its truth and reality aspects. A must read for all thriller and detective novel lovers. My suggestions would be, If you buy 3 books in thriller genre this year, it should be one of them, yes, it is that good.
এ বইটা অনেকটা সময় নিয়ে পড়েছি। প্রতিটা অধ্যায় পড়া শেষ করে নতুন করে ভাবতে হতো। এখানে লিখকের গবেষণা, গল্পের উপস্থাপনার প্রশংসা না করলেই নয়। এ বইয়ে ভালো লেগেছে রেফারেন্স সহ যুক্ত থাকায় প্রতিটা ঘটনার একটা শক্ত ভিত পাওয়া যায়। যার কারণে এ বইটা বারবার পড়লেও খারাপ লাগেনা। যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়ে আগ্রহী, তাদের জন্য হৃদয়ের খোরাক বলা যাবে এ বইকে।