"তারাগঞ্জে ফাল্গুন মাসের রাত অসহ্য রকমের সুন্দর। নির্মেঘ আকাশে চাঁদের কুসুম ফেটে যায়, জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে, উছলে পড়ে আলো। চাঁদের বিপরীতে শিমুলগাছের ফুল, ন্যাড়া ডালপালা কালি-কলমে আঁকা স্কেচ বলে মনে হয়। নিচের বাগান থেকে আসে হাসনাহেনার গন্ধ। দূরে কোনো এক নাইটগার্ড বাঁশের বাঁশি নিয়ে বসেছে, চাঁদের আলোর বিষের সঙ্গে বাঁশির সুরের বিষ ধরণিকে বিষাক্ত, উন্মাতাল, পাগলপ্রায় করে ফেলতে চাইছে যেন..."
শামসুর রাহমানের কবিতা থেকে নেয়া 'কখনো আমার মাকে' নামের এই উপন্যাসের শুরুটা এমনই চমৎকার। আমি যখন পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে বসেছি, ততদিনে এই বইয়ের দশম মুদ্রণ বেরিয়ে গেছে। অভিজ্ঞ, অগ্রজ লেখক জোর গলায় দাবী করে ফেলেছেন, 'বাংলাদেশে আসলে তেমন কোন লেখক নেই'। ফেব্রুয়ারি জুড়ে অসংখ্যবার অগণিত তারকার হাতে বইটা দেখা গেছে, দেশের প্রথমসারির পত্রিকায় বিজ্ঞাপিত হয়েছে বেশ কয়েকবার। বহুবার করে বলা হয়ে গেছে শৈশবের নস্টালজিয়ায় মোড়ানো মায়ের স্মৃতিচারণার গল্প 'কখনো আমার মাকে।' ঝলমলে প্যাভিলিয়নে দাঁড়িয়ে অটোগ্রাফ দেয়ার সময় লেখক হাসিমুখে বলেছেন: "আমরা যারা কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতাম, পিঁপড়া খেয়ে সাঁতার শিখতাম, সাইকেলের সিটে ডান বগল রেখে রডের নিচ দিয়ে পা ঢুকিয়ে সাইকেল চালাতাম, স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে স্কুল যেতাম, আমরা যারা হাঁসকে সন্ধ্যায় ডাকতাম তই তই তই, আমরা যাঁরা রান্নাঘরে পিঁড়িতে বসে টিনের থালায় ভাত খেয়েছি, ঢাকায় এসে টিউশনি করেছি—তাদের গল্প 'কখনো আমার মাকে'।
এই মায়ার বশেই বইটা হাতে নেয়া। কয়েক পাতা উল্টোতেই আবার চোখে পড়ে :
"ফুলপুর পাইলট হাইস্কুলের মাঠটাকে আমরা ভাবতাম তেপান্তরের মাঠ। মাঠের দুপাশে কাঠের গোলপোস্ট ছিল, বোধ হয় শালকাঠের, শুকিয়ে লোহার আকার পেয়েছিল; সেই ইস্পাতকঠিন গোলপোস্টের গায়েও শেওলা জমে থাকত সবুজ হয়ে। আমাদের শৈশব ছিল বৃষ্টিভেজা, পুরো ধরিত্রী ছিল উর্বরা; বীজ লাগাতে হতো না, চারদিকে গজিয়ে উঠত গাছ; গাছগাছড়ার সবুজে ঢাকা ছিল চারপাশ; রাস্তার দুধার, খালের ভেতর-বাহির; ভবনের গায়ে গাছ, বট-পাকুড়; টিনের চালে, গুদামঘরের দেয়ালে শেওলা, ফার্ন, ঢেঁকিশাক। আমাদের পুকুরগুলো, পগারগুলো সবুজে ঢেকে থাকত; কখনো কচুরিপানায়, কলমিলতায়, শাপলার পাতায়, শালুকের বিস্তারে; কখনো নাম না জানা এক ধরনের সবুজ ভাসমান পাতায়; শেওলার স্তর পানিকে ঢেকে রাখত নিবিড়ভাবে, সবুজ গালিচার মতো; এমনভাবে থাকত যে কেউ সবুজ মাঠ ভেবে সেই পগারে বা গাড়ায় পা রেখে ডুবে যেতে পারত; তা অবশ্য কখনো ঘটতে দেখিনি। পুকুর-ডোবা আর রাস্তার দুধারের গর্ত ঢেকে থাকত, ছেয়ে থাকত কচুরিপানা কিংবা ঢোলকলমির বেগুনি ফুলে, হেলেঞ্চা- হোগলা-কলমিলতা-বিষকাটালির ঝাড়ে..."
আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। গল্পের জগতে ডুবে যাই। টিনে ছাওয়া বাংলো ধরনের বাড়ি, বাড়ির সামনে বাগান, কাঁটামেহেদির বেড়া, কামিনী ফুলের পাগল-করা গন্ধ—এ-ই ছিল সত্তরের দশকের মফস্বল শহরগুলো। তেমনই এক শহরে দুই মায়ের সংসারে বড় হচ্ছিল চার ভাইবোন। বিশুদ্ধ স্মৃতিচারণ। গল্পের কথক বয়সে সবচেয়ে ছোট; সাত বছর, ক্লাস টু'র ছাত্র। বাকি দুই ভাইয়ের একজন ক্লাস ফাইভ আর একজন ক্লাস ফোরে পড়ে। হারানো দিনের গল্পের ফাঁকে ফাঁকে প্রশ্ন জাগে, ওদের ছোটমা এত কাঠখোট্টা কেন? সন্তানদের প্রতি এত আবেগ, এত আদর পুষে রেখেও কেন তিনি এতো বেশি শৃঙখলার বেড়াজালে বাঁধতে চান? কখনো কেন মাকে গান গাইতে দেখা যায় না?
চোরকাঁটাভরা মাঠে খেলা, বৃষ্টিতে তুমুল ভেজা শৈশব। টিউবওয়েলের নিচে গোসল, কয়লা দিয়ে দাঁত-মাজার শৈশব। বিভিন্ন পরীক্ষায় আরাধ্য সাফল্য ছিনিয়ে আনে ভাইবোনগুলো। গল্প এগোয় নদীর শান্ত স্রোতের মতো, হঠাৎ একদিন বেজে ওঠে ভাঙনের সুর। ওদের মুক্তিযোদ্ধা বাবা সরকারি চাকরি হারান অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করার অপরাধে। কারাগারে যেতে হয় বাবাকে। বড় ভাই বাবুল সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন নিজের ভবিষ্যত্ বিসর্জন দিয়ে। কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ সংবাদ দেন ছোটমা, হাসপাতালে শেষ শয্যায়। জানিয়ে যান, কেন মা কখনো গান করেননি। কে তাঁর কণ্ঠ থেকে গান নিংড়ে বের করে নিয়েছিল!
এত প্রশংসার পরেও বইটা নিয়ে আমার আপত্তি তবে কোথায়? আপত্তি হচ্ছে, মাকে নিয়ে লেখা একটা পরিবারের স্মৃতিচারণায় অনর্থক শরীরবৃত্তীয় আলাপ, যৌনতার আভাস। সাত বছরের বালক যখন পাশের বাড়ির মালতীদির উপুড় হয়ে থাকা শরীরে জামার বড় গলার ভেতর দিয়ে বুকের খানিকটা দেখে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তৎক্ষণাৎ ছাদে উঠে "নরম আতার অস্তিত্ব টিপে টিপে পরখ করে, দাঁত না থাকা সত্বেও চুষে চুষে ভেতরের নরম সাদা ঘন দ্রবণ মুখে নিয়ে শীতল হয়" - এহেন বর্ণণা নি:সন্দেহে অস্বস্তি জাগায়। রান্নাঘরে মামি যখন আদর করে জড়িয়ে ধরে তখন "নাকেমুখে বুকের ওম লাগায় সাত বছরের বালক যৌন অস্বস্তিতে ভোগে এবং রাতের বেলা তার ব্লাউজের বোতাম খুলে স্তন্যদান করার স্বপ্নদৃশ্য দেখে"- সেটাও যথেষ্ট অপ্রাসঙ্গিক এবং কুরূচিপূর্ণ। মুসলমানির পর সেই বালকের "অন্ধকার ঘরে মালতীদির আদরের চুমু পেয়ে ঘরজোড়া ঘামের গন্ধে শিহরণ জাগা" কে অবাস্তব নোংরামি বলে মনে হয়। একইভাবে অপ্রয়োজনীয় মনে হয় তহশিলদার সাহেবের শালার "লুঙ্গি তুলে নুনু নাড়া, অবিচল ভঙ্গিতে নুনু ধরে হ্যান্ডেলিং করা", কিংবা আয়নালের "বুকে মেয়েদের মতো ফোলা ফোলা বোঁটা হচ্ছে বলে গালিয়ে দেয়ার" প্রস্তাব উত্থাপন।
ফিকশনে অশ্লীলতা কিংবা যৌনতার ব্যবহার নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। প্রাসঙ্গিক কিংবা অপ্রাসঙ্গিকভাবে তার অবতারণা ঘটতেই পারে। কিন্তু যে গল্পটা পরিবারের, যে গল্পটা মায়ের, এমনকি যে গল্পের পরিণতিতে স্বল্প পরিসরে অবতারণা ঘটে স্বাধীনতা যুদ্ধের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের- সে গল্পে উপরের লাইনগুলো যথেষ্ট নোংরাভাবে চোখে ধরা দেয়।
'কখনো আমার মাকে' হয়তো আনিসুল হকের সেরা উপন্যাসগুলোর একটা হতে পারত, দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো সাহিত্যকর্ম হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারতো তারই ক্লাসিক "মা" উপন্যাসের সাথে। অথচ অগ্রজ, বিখ্যাত লেখক হয়ে সদম্ভে "বাংলাদেশে তেমন কোন লেখক নেই" দাবী করে, তার ওপর এই বস্তু লিখে তিনি আমাকে হতভম্ব করে দিলেন। আরও হতভম্ব করলেন ফেসবুক পোস্টের কোন এক কমেন্টে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে হাস্যকর জবাব দিয়ে: "আমি আমার বেড়ে ওঠার সময় বিছানা ভেজানোর কথা কাউকে বলতে পারিনি। অসহায় লাগত। এখন এগুলো স্কুলপাঠ্য। ছেলেমেয়েরা জানুক, এটা কোনো সমস্যা নয়।" অথচ এই বইটা অনেকেই নিজের মাকে উপহার দিচ্ছে, আবেগতাড়িত হয়ে হাতে তুলে দিচ্ছে পড়ার জন্য। আমি নিজেই অন্তত বিশজনকে দেখেছি। এই প্রসঙ্গে লেখক কী জবাব দেবেন, আমার জানা নেই!
আমি শুধু একটা কথাই জানি, কখনো মায়ের গল্পকে এভাবে অপমান করা উচিত নয়।