বালক ভ্লাদিমিরের লেনিন হয়ে ওঠার গল্প যেন একদিকে রুশ ইতিহাসের আলোড়ন, অন্যদিকে উলিয়ানভ পরিবারের একটানা বিয়োগান্ত কাহিনি। ইতিহাসের কামারশালার আগুনে আর পারিবারিক শোকগাথায় গড়ে ওঠে তাঁর মন। জারের হাতে বিপ্লবী বড় ভাই সাশার মৃত্যু কিশোর লেনিনকে দেখিয়ে দেয় জীবনের দিশা। সেই জীবনে প্রেম আসে নাদিয়া ও ইনেসার আকর্ষণ নিয়ে । ভালোবাসার আহ্বান ছিল ইয়াসনেভা ও এলিজাবেতের কাছ থেকেও। কিন্তু লেনিন যেন কাছে থেকেও দূরে, দূরে থেকেও অন্তর্গত রক্তের ভেতরে। শুধু প্রেমে নয়, বন্ধুত্বেও লেনিন যেন অধরা থেকে যান ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের কাছে। শ্রমিকের সঙ্গে তিনি শ্রমিক, অরণ্যে শিকারি, প্যারিসের আড্ডায় তুখোড় বুদ্ধিজীবী আর ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নির্জনতায় এক আচ্ছন্ন পাঠক। ইউরোপের ভূগোলজুড়ে তাঁর চলাচল। সাইবেরিয়ার বরফজীবনের নির্বাসন থেকে সুইজারল্যান্ড, লন্ডন, প্যারিস, ব্রাসেলস ও পুরো রাশিয়ায় ছড়ানো তাঁর কক্ষপথ। কখনো মনে হয় তিনি নিষ্ঠুর, কখনো বিষাদময়, নিঃসঙ্গ। ইনেসাকে কবরে শুইয়ে কাঁদছেন লেনিন। এই লেনিনই তো পিটার্সবার্গের ক্ষমতা দখলের আগে ও পরে শান্ত—যেন বিপ্লবের রেলগাড়িটার বিজ্ঞ চালক। ইতিহাসের শীতল বরফে মোড়ানো লেনিনের কঠিন ব্যক্তিত্বের তলায় যে উষ্ণ জীবনস্রোত—এ উপন্যাস তারই নিবিড় বয়ান। লেনিনের মৃত্যুর পরে ম্যাক্সিম গোর্কি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘লেনিনের মনোজগৎ নিয়ে কেউ যদি একটা ফিকশন লিখতে পারত!' তাঁকে নিয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যালান ব্রায়েন লেনিন : দ্য নভেল নামে উপন্যাস লিখলেও বাংলা ভাষায় এই প্রথম । আশানুর রহমান সেই শূন্যস্থান পূরণের পাশাপাশি গোর্কির প্রত্যাশাও মেটালেন।
একটা ৩৩৪ পৃষ্ঠার বই ২ দিনে পড়ে ফেললাম। সকালে পড়ছি, দুপরে পড়ছি, রাতে পড়ছি, কাজ আর খাবারের ফাঁকে পড়ছি। সাথে ইন্টারনেটে রেফারেন্সও ঘাটসি। এতটাই হুকড ছিলাম এই বইয়ে। লেখক আশানুর রহমান যেভাবে এই বইটা লিখেছেন, ইতিহাস, বিপ্লব আর রাজনীতি নিয়ে কিঞ্চিৎ উৎসাহ থাকলেই যে কেউ হুকড হয়ে যাবে।
একটা জিনিস আমার কাছে ভালো লাগে নাই, যদিও এটা উপন্যাস, কিন্তু যেহেতু এটা একটা বায়োগ্রাফি, পরিশিষ্ঠ একটা সেকশন করে সেখানে এই তথ্য গুলার রেফারেন্স দেয়া থাকলে আরো অনেককিছু বিস্তারিত জানতে পারতাম।
বইয়ের শেষটা চমৎকার। ১৯২০ এর সেপ্টেম্বরে এসে উপন্যাসটা হুট করে শেষ হয়ে গেলো। লেনিন আরও চার বছর বেঁচে ছিলো, সেই চার বছর চাইলে হয়তো লেখক যুক্ত করতে পারতেন। কিন্তু লেনিনের জীবনী শেষ হয়ে যায় ইনেসার সাথেই।
লেনিনকে নিয়ে উপন্যাস ব্যাস এটুকু জেনেই বইটি কিনেছিলাম। এতদিনে পড়া হলো। উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে চমৎকার ভাবে বেস একটা রাশান রাশান গন্ধমাখা আবহ পাওয়া যাচ্ছিল। এরপর লেনিনের জন্ম, তার বেড়ে উঠা, পড়াশোনা, পিতার মৃত্যু, তার ভাইবোন, জার বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার জন্য বড়ভাই সাশার ফাঁসি ও বোনের নির্বাসন সবই বেস গুছানো লাগছিল। তবে লেনিন যা বলেন তাই ঠিক এই ব্যাপারটা একটু দৃষ্টিকটু লাগলো। আর বইয়ের শেষ একশ পৃষ্ঠা পড়ার সময় মনে হচ্ছিল উইকিপিডিয়া পড়ছি। রাশান বিপ্লবের ঘটনার ঘনঘটায় মুখর।
রাসপুটিনের নাম এসেছে সম্ভবত একবার আর জার নিকোলাসকে নিয়ে শুধু তিনটি কথা বলা হয়েছে তিনি পদত্যাগপত্রে সই করেছেন, ট্রেনে করে যাচ্ছেন, শেষে এক লাইনে জানানো হলো ’জার দ্বিতীয় নিকোলাই সপরিবারে নিহত হয়েছে।’ লেখক সম্ভবত বিতর্ক এড়াতে চেয়েছেন বা তিনি লেনিনের বেশ ভক্ত বলে হয়তো এই বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু এটাকে উপন্যাস বলা হচ্ছে সেহেতু লেখক চাইলে কল্পনার ঘোড়া দৌড়ানোর স্বাধীনতাটুকু নিতে পারতেন। লেনিনকে কেন্দ্র করে সত্যি ঘটনার সাথে কল্পনা মিশিয়ে চমৎকার একটা উপন্যাস হিসেবেই এটাকে দাঁড় করাতে পারতেন। যাহোক বইয়ের শুরুটা ভালো লাগা দিয়ে হলেও শেষটা তেমন ভালো লাগলো না।
উপন্যাসের শুরুটা খুব সুন্দর। সহজ-সরল লেলিন তার মামাচুক্কা(মা) আর ভাই বোনদের সাথে কীভাবে শৈশবের দিনগুলা কাটাচ্ছিল, সেটার দারুণ বর্ণনা করেছেন লেখক। সাশা পড়তে যাবার পর লেলিনের কথা যেনো লেখক একদমই ভুলে গেলেন। সাশার বিপ্লবী হয়ে উঠা থেকে তার ফাঁসি পর্যন্ত; মা ও বোনের সাথে ঘটনাগুলা বিস্তারিত লিখেছেন লেখক (সেখানে লেলিন অনুপস্থিত)। কিন্তু এরপর উপন্যাসের ছন্দপতন.....! লেলিনকে নিয়ে লেখার আরো অনেক সুযোগ ছিল। একমুখী বর্ণনার কারণে শেষের অংশটুকু একদমই টানছিলো না।
বইটা "narrative-driven" বা "expository style" লেখা। এমন পড়তে একটু বোরিং লাগে। তার পরে কিছু কিছু অধ্যায় ভালো ছিলো। কিন্তু জীবনধর্মীয় উপন্যাস হিসেবে আরো ভালো হইতে পারত।
বই সম্পর্কিত মতামত বলার আগে বলে নেই আশানুর রহমানের লেখা অক্টোবর রেভুলেশন এর নায়ক ভ্লাদিমির ইলিয়াচ উলিয়ানভ ওরফে ভ্লাদিমির লেনিনের আত্মজীবনীভিত্তিক উপন্যাস "লেনিন" আমার জন্য ২০২৫ এ পড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই. এই উপন্যাসটি পড়ার পর যে উপলব্ধি হয়, তা হলো – বইটা ব্যক্তি লেনিনকে চেনানোর একটি সৎ প্রচেষ্টা। ইতিহাসের পাতায় উধ্বৃত কিংবদন্তির লেনিনকে সরিয়ে মানুষ লেনিনের চরিত্রকে খোলস ভেঙ্গে দেখার প্রয়াস আছে এখানে। এত বড় ক্যানভাসে এমন কাজ করা সহজ না, চরিত্র নির্মাণে লেখক যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, সেটি প্রশংসাযোগ্য। বিশেষ করে লেনিনের মা ও বড় ভাই সাশাকে যেভাবে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে বইয়ের পাতায় জীবন্ত করে তোলা হয়েছে, তা পাঠক হিসেবে আমাকে ছুয়ে গেছে। উপন্যাসের প্রথম ভাগ খুবই চমৎকার, পড়তে পড়তে দৃশ্যপটে মানসিকভাবে হারিয়ে যাওয়া যাওয়া যায়, লেখক পারিপার্শ্বিকতাকে এত চমৎকারভাবে জীবন্ত করতে পেরেছেন। উপন্যাসের প্রথম অংশ বর্ণনা বিচারে যেন সুন্দর এক ন্যাচারাল পেইন্টিং। শৈশবের দিনগুলো— লেনিনের মা, আর ভাইবোনদের সঙ্গে তার সরল স্বাভাবিক ও নির্ভার সময়—লেখক প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন। স্পেশালি লেনিনের ছেলেবেলা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের খুব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। রাশিয়ার গ্রামীণ পটভূমি চোখের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। তবে বড়ভাই সাশা পড়াশোনার জন্য ঘর ছাড়ার পর লেনিনের জীবন কাহিনির ফোকাস হঠাৎ করেই বদলে যায়। সাশার বিপ্লবী হয়ে ওঠা, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান এবং শেষ পর্যন্ত ফাঁসি—এই পুরো অংশটি বিশদ বিধায় তা লেনিনের মনোজগতের অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে।
আত্মজীবনীতে স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আসার কথা এবং লেখক ব্যক্তিগত ভালোবাসার সম্পর্ক গুলোকে অপেক্ষা করেননি। যেহেতু লেনিন বিপ্লবের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন সেহেতু তার প্রেম ভালোবাসার সাথে বৈপ্লবিক সংযোগ থাকা স্বাভাবিক। লেনিনের রুক্ষ জীবনেও প্রেম এসেছিল, বিপ্লবের সহযোগী নাদিয়াকে তিনি বিয়ে করেন তবে বিদেশ থেকে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড চালানোর সময় একই কারণে ইনেসার প্রতিও তিনি দুর্বল হয়েছিলেন। বইতে নাদিয়া ও ইনেসার উপস্থিতিও এসেছে ভারসাম্যপূর্ণ বিচারে—কোনো অতিরিক্ত পক্ষপাত বা রোমান্টিক অতিশয়োক্তি ছাড়াই। শত টানাপোড়েন এর পরেও তার লক্ষ্য থেকে তিনি বিচ্যুত হননি যার ফলে একসময় শাসনভার তার হাতে আসে।
লেনিনের জীবনী ভিত্তিকে উপন্যাস পড়তে গিয়ে বিপ্লব সম্পর্কে আমার ধারণা এবং জানাশোনা অনেকটুকুই বদলে গিয়েছে। এই উপন্যাস শেষ করে আমি বিপ্লব কি বিপ্লব কিভাবে হয় বিপ্লবের বিনিময় মূল্য এবং বিপ্লব পরবর্তী পুরীর জীবন নাগরিক জীবন - সব মিলিয়ে বিপ্লবকে নতুন করে বুঝেছি। কিছু বিষয় লেখক সংক্ষিপ্ত করেছেন হয়তো বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা বা উপন্যাস কলেবর বিবেচনায় কিংবা বিপ্লবের প্রতি পাঠকের বিশ্বাস বা ধারণা বিষিয়ে ওঠা রোধ করতেই।
আমরা আত্মজীবনী পড়তে পড়তেই লেনিনের রুক্ষ একরোখা দিক দেখতে পাই। লেনিনের কাজ কারবার প্রথাবিরোধী, তাকে দেখতে পাওয়া যায় আদর্শের ইমপ্লিমেন্ট করার লড়াইয়ে জিতবার জন্য স্বাভাবিক মাপকাঠিতে আদর্শের পরিপন্থী কাজ করতে ও প্রোপাগান্ডা পরিচালনা করতে। যাইহোক রাশিয়ার শাসক হিসেবে তিনি দায়িত্ব নেন এবং এর আগ থেকে শাসনভার হাতে নিয়ে তার জীবনাবসান পর্যন্ত উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগের ভাষা বর্ণনামূলক - বিধায় পড়তে কিছুটা একঘেয়ে লাগতে পারে।
লেনিনের জন্ম, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, বাবার মৃত্যু, ভাইবোনদের রাজনৈতিক পরিণতি—সবকিছুই মোটামুটি গুছিয়ে এসেছে। ল��নিন যা বলেন বা ভাবেন, সেটাকেই একধরনের বিবরণ হিসেবে হাজির করা হয়েছে, তার আইডিয়া এবং কার্যপদ্ধ্বতিকে প্রশ্ন করা হয়নি, অর্থাৎ লেখক নিজস্ব মতামত দেননি। বিশেষ করে শেষের দিকে, রাশান বিপ্লবের ঘটনাপ্রবাহ যখন একের পর এক আসতে থাকে, তখন উপন্যাসের বদলে তথ্যভিত্তিক লেখার স্বাদ বেশি পাওয়া যায়। উপন্যাসের সমাপ্তি আসে—১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বাস্তবে লেনিন আরও চার বছর বেঁচে ছিলেন, সেগুলো যুক্ত করা যেত। শুরুটা যেমন চমৎকার ছিল, শেষটা ততটা তৃপ্তিদায়ক না হলেও, সামগ্রিকভাবে এটি একটি চিন্তা জাগানো ও পাঠযোগ্য বই। লেখক বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ রিরাইট করতে পারেন।
যা বললাম ব্যক্তি লেনিন, রাশিয়া, বিপ্লবের ধারণা, বৈপ্লবিক কার্য পরিচালনা, বিপ্লব এবং বিপ্লব পরবর্তী অবস্থা এসব বিষয়ে আমার ধারণা এবং জানাশোনার ঘাটতি পূরণে এই উপন্যাসের ভূমিকা থাকায় এবং উপন্যাসটি উপভোগ করতে পারার কারণে এটি ২০২৫ এ পড়া আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই।
my rating would be:4.5 I found it very well written.the leader Lenin was also a just a boy vladimir.with the rise of Lenin,there was the fall of his family.and we get to see it all in the book. the book talked about his early years, getting into politics and becoming the founder of the Soviet union in a very well put way.boshevic vs mensheviks, Marxism vs others,the illiterate people of Russia vs the upperclassmen,it was all there. there were so many struggles,barriers,clashes.friends became foes and then friends again but there was one thing in the mind of Vladimir ilyich ulyanov: revolution.
লেনিন উপন্যাসের জন্মটা আমি দেখেছি। লেখকের মগ্নতা, পরিশ্রম এবং নিরলস লেগে থাকাটা দেখেছি একদম কাছ থেকে। লেনিনকে নিয়ে, এত বড় পরিসরে কাজ করার পাশাপাশি চেনা লেনিনকে, মিথের লেনিনকে এমন চিরে চিরে দেখনো সহজ ছিল না। উপন্যাসের প্রত্যেকটি চরিত্র চিত্রণে লেখক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। লেনিনের মা ও ভাই সাশাকে লেখক যেভাবে তুলে এনেছেন পাঠক হিসেবে তা আমাকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে গেছে। নাদিয়া ও ইনেসাকে লেখক তুলে ধরেছেন পক্ষপাতহীন দারুণ দক্ষতায়। এককথায়, লেনিনপাঠ এক দারুণ আনন্দদায়ক অনুভূতি।