স্মৃতিকথায় নিজের প্রথম জীবনের ইংরেজি বই পড়ার অভিজ্ঞতা জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি অপরিচিত ইংরেজি শব্দ দেখলেও পড়ে যেতেন একটানা।অপরিচিত শব্দের আশেপাশের শব্দ দেখে মোটামুটি একটা অর্থ দাঁড় করিয়ে নিতেন। আমি নিজেও এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছি এককালে। বেশ ভালো কাজে দেয়। একটু কঠিন কবিতা বা গদ্যের ক্ষেত্রেও আমি এই নীতি অবলম্বন করি।আপাত অগোছালো, দুর্বোধ্য শব্দ বা বাক্যের ভিড়ে হঠাৎ এমন কিছু পেয়ে যাই যে তা পুরো লেখাটির একটা অর্থ দাঁড় করিয়ে দেয়; অনেক সময়। কথা হচ্ছে, লেখার দুর্বোধ্যতা নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক চলছে।দুর্বোধ্য লেখা কি আদৌ প্রয়োজন? যারা এ ধরনের লেখা লেখেন তাদের বহুকাল ধরে এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। আমাদের ঐতিহ্যবাহী সনাতন জীবনযাপন পদ্ধতি থেকে আমরা সরে এসেছি পুরোপুরি। জীবন জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে।আগে একটা গ্রামের বাসিন্দা হয়ে শুধু সেই গ্রামের খবর নিয়ে ও আশেপাশের সবকিছু সম্বন্ধে অচেতন থেকেও জীবন পার করে দেওয়া যেতো।এখন আর সেটা সম্ভবপর নয়। সালমান রুশদি তার এক রচনায় বলেছেন, কেউ চাইলেও এখন "মাদাম বোভারি" বা "জেন আয়ার" এর মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরল উপন্যাস লিখতে পারবে না। ব্যক্তির সাথে সমাজ ও রাষ্ট্র এখন এতো অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত যে লেখার ধরন বদলে যেতে বাধ্য। কথাসাহিত্যিক তানজীম রহমান তার এক রিভিউতে লিখেছেন, "(মওলানা) রুমির মতো যদি আমাদের মহাবিশ্বকে অর্থবহ, বুদ্ধিমান, ভালোবাসায় পূর্ণ জগত হিসেবে দেখতে পারতাম, তাহলে খুব ভালো হতো।... আমার মহাবিশ্ব হচ্ছে এলোমেলো, জটিল, নিরপেক্ষ আর হাস্যকর।"
এই জটিলতর জগতের একজন রচয়িতা হাসনাত শোয়েব, যার রচনা অনেকেই বুঝতে পারেন না; আমি নিজেও পুরোপুরি ধরতে পারি না। তার ভুবনে বিষণ্ণতার রাজত্ব, যিনি নিজের সাম্প্রতিক বইয়ের নাম রেখেছেন "স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার।" যেখানে "ফরএভার বলে কিছু নেই।" যেখানে, "মানুষ নেই, আছে শুধু কতিপয় নাম।"
২. "হঠাৎ বুঝতে পারো, তুমিও দৌড় থামিয়ে আটকে পড়েছ নিজের শরীরে।" এই যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, এই যে আমাদের পরিত্রাণহীন সময় - যেখানে ব্যক্তিমানুষের মূল্য নেই, রাষ্ট্র আমাদের গিলে খেতে চাইছে, প্রতিবাদ করলে সোজা জেল বা মৃত্যু, যেখানে সম্পর্ক হয়ে যাচ্ছে ঠুনকো আর ক্ষণস্থায়ী, সেখানে আমাদের অবস্থান কী? প্রতিবাদের যথেষ্ট সাহস আমাদের নেই, নিজের জীবন অকাতরে উৎসর্গ করার ইচ্ছা নেই কিন্তু সহ্যও করা সম্ভব নয় এসব অনাচার। ফেসবুকের নিউজফিড আমাদের কালের ও নিজেদের জীবনের দিকে তাকানোর একটা সূচক। সেখানে মৃত্যুসংবাদ, আনন্দসংবাদ, বোমা হামলা, ধর্ষণ, মিম, মানুষের প্রতিহিংসা আর ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার। মুহুর্মুহু পালটে যাচ্ছে অনুভূতি। শোক বা আনন্দ কোনোটাই স্থায়ী হতে পারছে না। এসব সময় আমাদের অনুভূতি কী? আমাদের "গলায় ঝোলানো নিয়তি, একে অতিক্রম করা যায় না, অতিক্রমের পর খুঁজে পাওয়া যায় না।" যেদিকে তাকাই আশান্বিত হওয়ার মতো কিছু চোখে পড়ে না। এখানে আত্মার দখল নিতে দেড়শ বছর ধরে যুদ্ধ চলে।তারপর "আত্মার দখল পাওয়ার বদলে তারা হারিয়ে ফেলল নিজেদের শরীরও।" আত্মা নেই, শরীরও নেই। চারদিকে তথাকথিত পাপী ও পুণ্যাত্মার ভিড়। "বিভ্রান্তির এই বাবলে পৃথিবীর ঘৃণ্য মানুষগুলো পেতে থাকল স্বর্গ আর পুণ্যাত্মাগুলোর ভাগ্যে জুটতে থাকল নরক। আর পুণ্যের আধারেই গোটা পৃথিবী ভরে উঠতে লাগল পাপে।" পুণ্যাত্মা আর পাপীও যদি একাকার হয়, এখানে আমি কই যার কোথাও কোনো অংশগ্রহণ নেই? আমাদের তো স্বর্গ বা নরক কোথাও ঠাঁই হবে না। তাই আমরা বিষণ্ণ। "প্রস্তরযুগের সবগুলো পর্যায় পেরিয়ে পৃথিবীতে লৌহযুগ আসি আসি করছে, মানুষ তখনই প্রথম আবিষ্কার করলো সে চাইলে বিষণ্ণও হতে পারে।" সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আধুনিক মানুষের জীবনে সেই বিষণ্ণতা এতো বিস্তৃতি লাভ করেছে যে হাসনাত শোয়েবের মনে হচ্ছে যে তিনি "বিষণ্ণতার চাষাবাদ" করছেন। একজন কবি হিসেবে তাই তিনি লিখে রাখছেন। চেষ্টা করছেন নিজেকে আর নিজের দুঃখ ভারাতুর সময়টাকে ধরে রাখার। কারণ তিনি জানেন "পাণ্ডুলিপিরা কখনো পোড়ে না।"
হাসনাত শোয়েব শুরু করেছিলেন দস্তয়েভস্কিকে দিয়ে। "ফিরে আসবেন দস্তয়েভস্কি", এবার লেখক নয়, মসীহরূপে। প্রশ্ন হচ্ছে - কেন? বুদ্ধদেব বসুর মতে, দস্তয়েভস্কির নায়করা পাপে ডুবে থাকে, কিন্তু সাধারণ পাপীদের সাথে এই নায়কদের পার্থক্য হচ্ছে, তারা নিজেদের পাপ সম্বন্ধে সচেতন। তারা জানে যে তারা পাপী, তাই তাদের নির্বাণের সম্ভাবনা রয়েছে। দস্তয়েভস্কি যখন ত্রাতা হয়ে আসবেন তখন কি আমরা নির্বাণ লাভ করবো? নাকি এই বইয়ের নামের মতো "স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার"ই সত্য হবে আর " শাশ্বত শূন্যতার ভেতর একটি বিন্দুর মতো অনন্তকাল ভাসতে থাকবে" আমাদের অস্তিত্ব?
যা বই পড়ি, সব নিয়ে গুডরিডসে বলা হয় না। বলার দরকারও মনে হয় না অনেক ক্ষেত্রে।
তবে নতুন বইয়ের জন্য সে নিয়মটা ভাঙা দরকার বলে বোধ করি। সমসাময়িক যারা লিখছেন, তারা কেন জানি অন্য লেখকের বই নিয়ে আলাপ করতে চান না। গড়পড়তা কিছু বলে ছেড়ে দেন। সন্দেহ নেই, আমাদের অধিকাংশ লেখকের সমালোচনা-সহ্য-করতে-না-পারার সংস্কৃতিই অনেকাংশে দায়ী সে জন্য।
আমি চাই সমকালের লেখকদের নিয়ে লোকে আরও বলুক। এসব টুকরো আলাপও সেই দায়বদ্ধতা থেকেই লেখা।
কথিত আছে, রমনার আশেপাশে এক সাধু থাকেন যিনি অসম্ভব জ্ঞানধারী। খোয়াজ খিজির বললেও অবাক হবে না মানুষ। কিন্তু সেই জ্ঞানীর দেখা কেউ কোনদিন পান নি কিংবা কেউ কেউ পেয়েছেন, যা আমরা জানি না। কানাঘুষোয় শুনেছিলাম, তিনি নাকি তাদের ই দেখা দেন যাদের জ্ঞানের প্রয়োজন। তিনি কিসসা শোনান। ২ হাজার মানুষের শেষ নিঃশ্বাস বয়ামে ভরে রাখে এমন মানুষের কিসসা। যা ছড়িয়ে পড়লে পুরো পৃথিবী ছেয়ে যাবে ডিপ্রেশনে। তিনি শোনান, নরকের চেহারা কেমন কিংবা জেন গুরুরা কোথায় স্বর্গ লুকিয়ে রেখেছে। বৃদ্ধ এই ব্যক্তির খোঁজ আমিও পেয়েছিলাম রমনায়। হাড় জিরজিরে, শীর্ণকায় শরীর, আউলা ঝাউলা চুলের লোকটি আমার পাশে এসে শুনিয়েছিল এই কাহিনীগুলো।
হতাশায় সেদিন রমনায় গিয়ে বসেছিলাম, একটু নির্জনতার আশায়। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন শুনোচ্ছেন এই আখ্যান। জবাবে বৃদ্ধ, আফগানিস্তানের কাবুল শহরে একবার গিয়েছিলাম ঘুরতে। সেখানে গিয়ে কতক গল্প শুনতে পাই। সেগুলোই শুনিয়ে বেড়াই। নইলে মাথায় গল্পগুলো গাছ হয়ে গজাবে।
আমিও তাই গল্পগুলো শোনানোর দায়িত্ব নিলাম। গাছ যদি মাথায় গজিয়ে যায়। "স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার" বইয়ে দেখি হাসনাত শোয়েব সেই গল্পগুলোই শুনিয়েছেন। তিনিও কি সেই বৃদ্ধের দেখা পেয়েছিলেন নাকি পুরোটাই আমার কল্পনাপ্রসূত।
শেফালির লেখক একটা কৌশল রপ্ত করে ফেলেছেন পাঠককে ফাঁদে ফেলার। পাঠকরা রিলেট করতে পারেন এমন সব প্রিয় বইয়ের কোন সংলাপ, ক্যারেক্টার, লেখক কিংবা সিনেমার চরিত্রকে টেনে এনে কিছু একটা লিখে ফেলা। কিন্তু কি লিখছেন তিনি নিজেও হয়তো বুঝতে পারছেন না সবসময়। এই বইয়ের শুরুতেই আমার প্রিয় দস্তয়েভস্কি। পড়া শুরু করে মনে হল গভীরভাবে লেখা ফেসবুক স্ট্যাটাস। হালকা গোছের পাঠক হিসেবে আমার দশা যেন "তারে ধরি ধরি মনে করি ধরতে গেলেম আর পেলেম না" টাইপের। আবার কিছুদূর পরে মনে হল, আরে ইনি এ্যাদুয়ার্দো গ্যালিয়ানোর "চিলড্রেন অব দ্য ডেজ"র অনুকরণে কিছু একটা লিখতে চাচ্ছেন, কিন্তু স্বীকার করছেন না। আবার কিছু কিছু অংশ পড়তে মন্দও লাগছে না। কেমন একটা অন্যরকম ভাবও আছে। ঐ যে, যাদের জীবনে পাপ-পুন্য কিছুই নেই তাদের কথা বলছে। পাপ নেই বলে নরকে তাদের ঠাই হচ্ছে না, আবার পুন্য নেই বলে স্বর্গও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বিশাল এক না এর ভিতর তারা পড়ে আছে। কিন্তু আসলে না থাকার মত করে। এই বইটাতেও লেখক যে টেক্সট দিতে চাচ্ছেন তা আসলে ঐ না থাকার মত করে।
কেউ কেউ এটাকে মেটা ফিকশন বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু আমি যে ধরণের বই পড়তে পছন্দ করি, সে হিসেবে দেখলে এই বইটা ইজ নট মাই কাপ অব টি, কিন্তু আবার মাই কাপ অব টি-ও, কারণ আমার আগ্রহের অনেক ব্যাপারও উনি টেনে এনেছেন।
সবমিলে আমার পাঠের অনুভূতি দুই লাইনে স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার থেকেই বলি- "এসব ফর এভারের গল্পগুলি যে শুধুই ধান্দাবাজি তা অনেক আগেই বুঝেছিলাম। বলেওছিলাম, ফরএভার বলে কিছুই নেই। যা আছে তা কেবলই নিৎসের উত্তরাধিকার আর বোর্হেসের কান্না। তুমি বরাবরই বলতে, কান্না হচ্ছে ফাঁদ। পাখিরা নিজের নিয়মেই সেখানে পা দেয় আর মরে যায়।" এই পাখিদের মতই অবস্থা আজ আমাদের মত নিরীহ পাঠকদের।
হতাশাবাদী আর্টিস্টম্যান ভিনসেণ্ট ভ্যানগঘ মারা যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন, দ্যা স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার। জীবনে আটশো চিঠি লিখেছিলেন তিনি, যার শেষটায় ভাই থিও'কে জানালেন– এই দুঃখের শেষ নাই। হাসনাত শোয়েব বইয়ের নামও দিলেন। পৃথিবীতে বিষণ্ণতার পথগুলো ভিন্ন ভিন্ন হলেও গন্তব্য বোধহয় একই। নানাভাবে চাষাবাদ হচ্ছে মানবজীবনের আদিম এই অনুভূতির। আমি বইয়ের কথা ভাবতে শুরু করি। গঘ নাকি শোয়েব, কার দুঃখের গল্প থাকবে এইখানে!
বৃষ্টি পড়লে ভিজে যাওয়াই ছিল মানুষের নিয়তি। কিয়ামতের আগে ফিওদর দস্তয়েভস্কি নাকি আরেকবার ফিরে আসবেন প্রফেট হয়ে। বলা হচ্ছে, নরক আঁকার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয় আন্দালুসিয়ান এক কিশোরী। সে এঁকেছিল মানবআত্মার নিখুঁত প্রতিবিম্ব। কান্নার ধ্বনি থেকে সৃষ্টি হয়েছিল সংগীতের, আমি অবাক হয়ে পড়লাম এমন অদ্ভুত মিথ বা ফ্যাকট। 'পান্ডুলিপিরা কখনোও পোড়ে না'– এমন কিছু লিখে মিখাইল বুলগাকভ পুড়িয়ে ফেললেন তাঁর সমস্ত পান্ডুলিপি। হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন ছাই।
এইসব হাবিজাবি মন খারাপ করা মেলাংকলিক সারেগামাপা নিয়ে লেখা হয়েছে বইটা। লিরিকাল গদ্য। আর দুর্বোধ্য সব লিটারেরি টার্মে ভরপুর। বোঝা বা অবোঝায় কিছু যায় আসে না আমার। সাহিত্য থেকে কী কী চাই– এমন একঘেয়ে ক্যালকুলেটিভ প্রশ্ন একপাশে রেখেই আমি এই বইটা পড়ি। বারবার পড়ি ভিন্ন আয়োজনে, প্রতিবার ভিন্ন স্বাদ।
কিছুদিন আগে লেখকের একটা পডকাস্ট শুনলাম। খুব অপ্রস্তুত বোরিং আলাপের মাঝখানে তিনি জানালেন– ওজন কমানোর জন্য রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে লিখেছিলেন স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভারের ভয়াবহ নিহিলিস্টিক মুক্তগদ্যগুলো। ওপরওয়ালার কাছে বিচার দিলাম– যার লেখা পড়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাচ্ছি বারবার, ওজন কমানোর দুনিয়াবি কনসার্ন যেন তার না থাকে!
গতবছর বইমেলায় উপহার পেয়েছিলাম এই বই, পড়েছিলাম হুমড়ি খেয়ে। এই মেলায়ও স্মরণ করছি। বইটা নিয়ে অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছা করে, শেষে কিছুই লিখতে পারি না। সত্যিই, স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার।
মনে করুন আপনি একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। ঘরে একটা ভাঙা আলমারি আছে, নতুন একটা না কিনে এটাকেই একটু ঠিক করে মনে মনে বলছেন, চলে যাচ্ছে তো। বাজারে গেলে সবচেয়ে বড় রুই মাছটা দেখেন, কিন্তু দাম জিজ্ঞেস করেন না, ছোট সাইজের রুই মাছ ৫ মিনিট দামাদামি করে তারপর কিনেন, অথবা রুইয়ের বদলে আরেকটু কমদামী মৃগেল মাছ কিনে আনেন, একেবারে কেটে কুটে। বাসায় বউ ধরেই নেয় আপনি যেহেতু রুই মাছ কিনেন সবসময়, আজওকেও রুই মাছই কিনেছেন। তখন মনে মনে ভাবেন, তিন কেজি মাছে তো ১৫০ টাকা লাভ হয়ে গেলো, মন্দ কী! এখন থেকে মৃগেল মাছই খাবো।
এই আপনি মনে করুন গেলেন ধানমন্ডি বা গুলশানে অবস্থিত কোন কোটিপতির ডুপ্লেক্স বাড়িতে। সেখানে গিয়ে দেখলেন বাসার মেঝে আপনার জামার থেকেও ঝকঝকে, মেঝেটা এতটাই পরিষ্কার যে পা ফেলতে ভয় হচ্ছে, এইযা! মেঝেটা আমার পায়ের স্পর্ষে নোংরা হয়ে যাবে না তো! ড্রয়িং রুমের গালিচায় পা রাখার পর মনে হয় এতো নরোম কোন কিছুতে তো কখনো পা দেন নাই। গালিচা এত নরোম হতে পারে আপনি তা জানতেনও না। দেয়ালের পেইন্টিংস এমনকি ফাঁকা দেওয়ালের রঙ দেখেও অবিশ্বাস হয়, এতো সুন্দর হয় নাকি কোন বাড়ির দেয়াল! এতো সুন্দর হয় নাকি কোন ড্রয়িং রুম! নিজের ভেতর তৈরি হওয়া একটা চরম অস্বস্তিকে আপনি কোনভাবেই লুকিয়ে রাখতে পারেন না। নিজের ভেতরের ইনফেরিওর কমপ্লেক্সিটি যেন আপনাকেই খুন করে ফেলছে।
বিশ্বাস করেন, এই বইটা পড়ার সময় মনে হইছে বইটা হইলো ধানমন্ডি বা গুলশানের সেই ডুপ্লেক্স বাড়ি আর আমি হলাম সেই নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকটা। বইয়ের লেখক এমন এমন সব শব্দ বইয়ে এনেছেন যেগুলো আমি জীবনে কোনদিন দেখি নাই, শুনি নাই। প্রথম দুই একটা লেখা (নাকি কবিতা? আমি আসলে sure না) পড়ার সময় গুগল করে পড়েছি, পরে দেখি, না সবগুলো লেখায় এরকম অসংখ্য শব্দ আছে যেগুলো সম্পর্কে আমি নিজে কিছুই জানি না।
নিঃসন্দেহে বইয়ের লেখক এগুলো সম্পর্কে জানে এবং উনার বইয়ের পাঠক হতে হলে অবধারিত ভাবে আমাকেও জানতে হবে। কিন্তু ভাই আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত পাঠক। আমি সত্যই এত কিছু জানি না সুতরাং এই বই আমার জন্য নয়।
অনেক শব্দের মাঝে কয়েকটা শব্দ দিচ্ছি যেগুলো না জানার কারনে আমি লেখা গুলোর ভাব ধরতে পারি নাইঃ লিওপোল্ড ব্লুম, য়েহোশাফাত, গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর, পিটার বিকসেল, কালাশনিকভ, বেহেমথ, আভেস্তা, তিকমির সম্প্রদায়, পিগমিরা, ফিগুলা, ডিরগে, অগস্ত্য ইত্যাদি।
এখানে ১১ টা লেখা(বা কবিতার) কিছু শব্দ দিলাম যেগুলো সম্পর্কে আমার একেবারেই ধারনা নাই। হয়তো আপনাদের অনেকের আছে। ফলে বইটা পড়ার সময় নিজের ভেতর প্রচণ্ড ইনফেরিওর কমপ্লেক্সিটি কাজ করতেছিলো। জীবনে কী করলাম! এতো কিছু জানার আছে, অথচ আমি কিছুই জানিনা। কিছুই জানি না।
তবে আপনারা যারা অনেক জ্ঞানী, যারা এসব জানেন, তাদের কাছে এই বইটা অনেক ভালো লাগবে। দুই একটা লেখা সহজ ছিল, আমি কয়েকবার করেই পড়েছি, সত্যই বলছি খুব ভালো লেগেছে।
হয়তো অনেক বছর পর আরও কিছু জ্ঞান নিজের মস্তিষ্কে জমা করতে পারলে তখন বইটা আবার পড়লে ভালো লাগবে।
মৃত্যুশয্যায়ী ভ্যানগঘ বলেছিলেন "স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরেভার" এককোটি বছর পরেও মানুষ উপলব্ধি করে গঘ সত্য ছিলো। স্ট্যারি নাইট, The wheat field with crows, মতো মাস্টারপিসের জন্ম হয় হয়তো স্যাডনেসের কারণে। স্যাডনেসের কারণে "কাফকা"র লেখা পেয়েছি আমরা, জীবনানন্দ দাশের মতো বিষন্ন কবি পেয়েছিলাম। আমেরিকান পোয়েট সিলভিয়া প্ল্যাথের কবিতার লাইন আছে "I shut my eyes and all the world drops dead I lift my lids and all is born again I think I made you up inside my head" স্যাডনেস জিনিসটা ক্ষানিক এমনই। মাথার ভেতর প্যাচানো যন্ত্রনা যা মাইগ্রেনের মতো আপনাকে ছাড়বেনা সহজে।
বইয়ের একটা গল্পের সাথে অন্য গল্পের মিল নেই। না আছে বিষয়বস্তুর মিল। কখনো কবিতা, কখনো ছবি, কখনো ককথোপকথন মিলেমিশে যায়। বইতে লেখক একটা প্যারালাল জগৎ তৈরি করেছেন যেখানে তার মতো করে তিনি গল্পগুলো সাজিয়েছেন। সবসময় সবকিছু মিলতে হবে এমন নাকি। কিছু জিনিস না মিলিয়েও সাজানো যায়, এটাই হয়তো মানুষ্য জগতের স্যাডনেসের সৌন্দর্য। একটা গল্প লিখি যেটা এখনো মনে কাটাদাগ দিয়ে গেছে, "অরোরা নিয়ে মানুষ কিছুই জানেনা। বেশিরভাগই তার নিজের বানানো। ২০০ বছর আগে যখন উত্তর আকাশ জ্বলজ্বল করেছিলো, তখন এক দানব ছিটকে এসেছিলো সেখান থেকে, কেউ জানেনা। পৌরানিক কোনো গ্রন্থেও তার নাম উল্লেখ নেই। গায়ের রং ছিলো সবুজাভ হলুদ। সে হাসলে টোল পড়ত ও দাঁত ছিলো কাঁচের। ভোরের দেবী যখন দরজা খুলে দিয়েছিলো সে তখন সে আড়ালে নেমে এসেছিলো পৃথিবীতে। কেউ কেউ বলে সেই দানব নেমে এসেছিলো পিটার্সবার্গের আত্না হয়ে। তাকে ধরিয়ে দিয়েছিলো আন্তোনেলি। ভাগ্যিস ধরিয়ে দিয়েছিলো। সেই দানবকে বন্ধি করে রাখা হয়েছিলো সেন্ট পিটার ও পলের দূর্গম দূর্গে। সেখানেই বোধিপ্রাপ্ত হয় সে। তাকে ভোগে নেয়নি ফায়ারিং স্কোয়াডও। সাইবেরিয়ার নির্বাসনের দিনগুলোতে মানুষকে ছিড়েখুঁড়ে দেখতে শিখেছিলো। বলেছিলো " এ পৃথিবীর মানুষ নিঃসঙ্গ, এটাই তার অভিশাপ" আর যখন সে ফের মানুষের রুপ ধরে পিটার্সবার্গে ফিরে আসলো, তখন মানুষ আর আগের মতো থাকলোনা। একদিন ফের যখন উত্তর আকাশ জ্বলজ্বল করতে শুরু করবে, আগুন ও আকাশের সেতু ধরে সেও ফিরে যাবে স্বর্গে। সন্তানকে পেয়ে দরজা বন্ধ করে দিবেন স্বর্গের দেবী। গোটা পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যাবে।"
সবগুলো গল্প মেটাফরিক হলেও টেনেছে অনেক। মনে হয়েছে আসলেই দুঃখকে অভিশাপ নাকি আর্শীবাদ বলা যায়? আমার প্রায় রাতেই নাইটমেয়ার আসে, সেইসব নাইটমেয়ার আমি গল্প হিসেবে লিখে রাখি। এভাবে আমি আরেকদিন স্বপ্ন দেখার শক্তি পাই। একদিন বিষন্নতাও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি হয়ে যাবে। বিষন্নতা কাউকে কখনো ধ্বংস করেনি, তাকে কল্পনার এক প্রবল ক্ষমতা দেয়, সেই ক্ষমতা থেকে এইসব গল্পের সূচনা হয়. Happy reading💜
ভ্যান গগের কথা মনে পড়ে, যার শেষ কথা ছিল, 'স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার।' বর্তমান সময়ের আমার একজন পছন্দের লেখক হাসনাত শোয়েব আবার ভ্যান গগের শেষ অমর বাণী নিয়ে একটা আস্ত বই লিখেছেন যা এবারের বইমেলায় চন্দ্রবিন্দু থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের নামও সেই অমর শেষ দীর্ঘশ্বাস 'স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার'।
এই বইয়ের বিষয়বস্তু হচ্ছে মেটাফিকশন। বই-সিনেমা-চিত্রকর্ম-গান-কবিতার মিশেলে এক মেটাফিকশনাল জগৎ। যেখানে কল্পনা, ভাবনা, অবচেতন মনের প্রকাশ প্রবল। আর লেখক যে একজন কবি সেটার প্রচ্ছন্ন ছাপ রয়েছে প্রতিটি লাইনে। ভিন্নধর্মী এক জগতের সন্ধান পাওয়া যায় তাঁর লেখায়।
বইটা আমার এতটা ভাল লাগছে যে আমি মুহূর্তটা সর্বোচ্চ সুখের সহিত বেঁচে থাকছি। এই যে একটু একটু আমাকে সবাই অর্থাৎ সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটা অণু-পরমাণু আনন্দ দিচ্ছে তা কি আমি সহ্য করতে পারব! সহ্য করতে পারব না বলেই হয়ত দুঃখ আসবে যা ভবিষ্যত(ভ্রম) মূহূর্তে সুখ হয়ে যাবে।
বই থেকে—
'ক্যারোল দফ নামের এক প্রাচীন চিত্রশিল্পী প্রথমবারের মতো বিষণ্ণতার স্বীকৃতিস্বরূপ বেছে নিলেন মৃত্যুকে। এরপর সেই মৃত্যু ছড়িয়ে পড়ল মহামারি আকারে। শোনা যায়, ৭০ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল সেবার। দ্বিতীয় ধাপের বিষণ্ণতার যুগে মানুষ এতে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বিপ্লবের সময়ে বিষণ্ণতা নিয়ে ভিক্তর হুগো লিখলেন ঢাউস এক বই। যেখানে লেখা হলো, 'সে এখন ঘুমিয়ে আছে, জীবনে কিছুই পায়নি যে।' এরপর কেটে গেল আরও কিছু বছর। ফিওদর নামের এক 'সাদ' লিখলেন, 'আমি লোকটা অসুস্থ, বদ একটা লোক।' কাছাকাছি সময়ে গ্রেগর সামসার গল্প শোনালেন কাফকা নামের জার্মান ভদ্রলোক। আর অখ্যাত এক বাঙালি কবি লিখলেন 'বিপন্ন বিস্ময়' এর কথা। এরপর গোটা পৃথিবী ঢুকে গেল ইটারনাল এক বিষণ্ণতায়। যা আর কখনোই গেল না...'
কী মধুর বিষণ্ণ সুন্দর লেখা। আমার মতো পাঠক যে কিনা সারাক্ষণ বিষণ্ণতার সাগরে বসবাস করতে ভালোবাসে; সে তো এমন বইই পড়তে চায়।
লেখকের লেখা থেকে অনুধাবন করা যায় যে তাঁর বিশ্বসাহিত্য পাঠ আর ধারণা অন্যান্য লেখকের চেয়ে ঢের। বাংলাসাহিত্য কতটুকু পড়েছে তা অনুমান করতে পারি না। কারণ অনুমান করা অসত্য। এ থেকে আমি বুঝতে পারি, আমার মতো পাঠকের বাংলাসাহিত্যের সাথে ঈষৎ পরিচয় হওয়ার পরই পুরোদমে বিশ্বসাহিত্যে ঘুম হওয়া উচিত। তারপর আবার বিশ্বসাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে বাংলাসাহিত্যে আবার ফিরে আসা এবং তীক্ষ্ণ সমালোচনা করা।
আর ফেসবুকে বই থেকে এতকিছু তুলে ধরা আমার অপছন্দের। এই বইয়ের প্রায় অর্ধেক লেখা হয়তো লেখকের ফেসবুকে ওয়ালে পাওয়া যাবে। এজন্য আমি ফেসবুকের লেখা পড়া থেকে নিজেকে বিরত রাখি। আমার কাছে বই সই।
আর্নল্ডের কবিতায় পড়েছিলাম, "The eternal note of sadness in Sophocles long ago Heard it on the Aegean."
অনশ্বর দুঃখবোধ, শ্বাশ্বত দুঃখবোধ জগতের সকল নান্দনিকতার উৎস। এই "Eternal note of sadness"- প্রাচীন মিথ থেকে শুরু করে শিল্পায়ন, বিশ্বায়নের যুগেও মানবসত্ত্বার পিছু ছাড়েনি। এই ক্ষুদ্রতম থেকে বৃহত্তম দুঃখবোধের ইঞ্চি ইঞ্চিকে নানাভাবে, লেখক হাসনাত শোয়েব, এই বইটিতে ধরার চেষ্টা করেছেন।
না গদ্য, না পদ্য -দুইয়ের মাঝামাঝি বিচরণ করে তিনি দস্তইয়েভস্কি,বিবলিকাল এডাম-ইভ, রাবণের নিনাদ থেকে শুরু করে গ্রিক মিথোলজির দুর্বোধ্য চরিত্র মিনোটরের সাথে নিজের অন্তরের দুঃখবোধকে মিশিয়ে ফেললেন। চল্লিশটি এমন ছোট ছোট অংশ মিলিয়ে পুরো একটা মানবজগতের বিষাদকে তিনি নান্দনিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করলেন।
সব বই, সব লেখা সব সময় ভালো লাগে না।ইদানীং সেসব আমি বেশ বুঝি। যে বই সময়মতো আপনার মনের জন্য উপযুক্ত খাদ্যের যোগান দেবে, সে বই একটু হলেও আপনার মনে দাগ কাটবে। আমার ক্ষেত্রে তেমনটাই বোধহয় হয়েছে এবারে। বইটা যখন পড়ি, তখন সংসারের যাবতীয় অভাব আর দুঃখবোধ আমার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে বুদবুদ আকারে ফুটতে আরম্ভ করেছিলো। বইয়ের প্রতিটি শব্দ ঠিক এই কারণেই হয়তো আমায় ভাবিয়েছে, অনুভব করিয়েছে অন্য জগৎ।যা হয়তো আজ থেকে দু'বছর আগে হলেও আমি বুঝতাম না কিংবা আসছে কোন বছরেও হয়তো এভাবে আর বুঝবো না। আর ঠিক এজন্যই বইটা খুব প্রিয় হয়ে থাকবে।
সব ভালোর মাঝে, খারাপ কেবল একটাই। বায়াজড জাজমেন্ট কোনোদিন করতে পারিনি, এবারেও পারবো না।বইটার একমাত্র সমস্যাও এর দুর্বোধ্য শব্দগুচ্ছ। প্রাচীন গ্রিক মিথের চরিত্র থেকে শুরু করে পুশকিন, দস্তয়েভস্কি'র মতো বিশ্ববিখ্যাত লেখকদের আনাগোনায় ভরপুর এই লেখা। কোথায় কখন কি বোঝাচ্ছে, তার থৈ খুঁজে না পেলে লেখাগুলো একেবারে নিষ্প্রাণ। তবে আমি বলবো, সময় নিন, সময় নিয়ে নাহয় পড়ুন। তাড়া কিসের? ট্রেন তো বহু আগেই ছুটে গেছে, বসে নাহয় একেকদিন একেকটা অংশ পড়ে সারাদিন আওড়ালেন। মগ্ন থেকে এই দুঃখবোধের সাথে মিশে গেলেন।
লেখককে সাধুবাদ৷ এভাবেও বিষাদের রচনা করা যায়, আজ জানলাম। Van Gogh এর লিখে যাওয়া একটি লাইন- "Sadness will last forever";সেটা থেকে আস্তো একটা বই হয়ে গেলো। এই ব্যাপারটাই আমাকে টেনেছিলো। বইটি পড়েছি বহুদিন ধরে। পড়ে কেবল মনে হয়েছে, ভালো লাগা কাজ করছে, কেনো করছে জানি না। মনে হয়েছে, Van Gogh এর প্রতিটি ছবি যেমন একেকটি বিষন্নতার গল্প বলে, এখানকার প্রতিটি লেখা তেমনিভাবে বিষন্নতায় ভরা একেকটি দিনের ছবি আঁকে।
"স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার" মৃত্যুশয্যায় খ্যাতিমান শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগ তাঁর ভাইকে এ কথা বলে গিয়েছিলেন। জীবনের অবশ্যম্ভাবী অ্যাবসার্ডিসজমের প্রতি এটিই সম্ভবত গগের শেষ ইঙ্গিত।
সঙ্গত কারণে হাসনাত শোয়েবের এ বইয়ের অপেক্ষায় ছিলাম বেশ কিছুদিন। কবিতার এ বইয়ে কখনো মনে হয়েছে মুক্তগদ্য বুঝি ক্যামিও দিয়ে গেলো। ফেসবুকে হাসনাত শোয়েবের ফলোয়ারগণ বইটির কিছু অংশের সাথে ইতিমধ্যে পরিচিত হয়েছেন। আমিও এক্সেপশন নই। ফেসবুক ট্রেইলার ভালো ছিলো। লেখকের বই হতাশ করে নি একটুও।
৪৮ পৃষ্ঠার এ বইয়ে লেখক সহজ এবং স্বতস্ফূর্ততার সাথে এপিক ব্যাপার-স্যাপারকে জায়গা করে দিয়েছেন। মিথ, মিথলজি, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে সন্নিহিত ভবিষ্যতবাণী, বিভিন্ন বিলুপ্ত সভ্যতার আগমন, কিংবদন্তি লেখক / কবি / শিল্পীর কাজকে এসবের সাথে সহজাত ভঙ্গিমায় এমনভাবে মিলিয়েছেন হাসনাত শোয়েব, যেন এসব স্বাভাবিক বিষয়। বোর্হেসের প্যারালাল জগৎ, কাফকার গ্রেগর সামসা, জয়েসের ইউলিসিস, স্বর্গ-নরক, যু*দ্ধ একীভুত হয়ে গেছে লেখকের কবিতায়।
হাসনাত শোয়েবের প্রায় সকল কবিতায় ছন্দ মিলনোর চেয়ে মহাকালের এক ধরণের "পূর্ণাঙ্গ নয়" আখ্যান তৈরি করার লক্ষ্য ছিলো মনে হয়। এ পূর্ণাঙ্গ না হওয়াটা, পাঠকের হাতে স্ট্রাকচারের দিক দিয়ে নির্দিষ্ট, ভঙ্গিমার কথা উঠলে অনেকটা প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের আধুনিক রূপায়ন, এবং গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠে বেশ খানিকটা ইচ্ছাকৃত অসম্পূর্ণ প্রিচিং দেখতে পাওয়া যায়। এসব যেন বিষণ্নতার এক ধর্মের বাণী। সমসাময়িকতার প্রবহমান ইঙ্গিত পাশ কেটে গেছে সহজতার সাথে।
হাসনাত শোয়েবের মিথলজি / ইতিহাস / সাহিত্য / শিল্প / সংস্কৃতি বিষয়ক জ্ঞান এ বইয়ে ডেলিভারেটলি দেয়া হয় নি। বরং লেখকের অবচেতন থেকে এক ঘোরের মতো বেরিয়ে এসেছে প্রায় প্রতিটি কবিতা।
পাঠক নিজেও এক ঘোরের মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারেন লেখক কর্তৃক সৃজন করা অ্যাবসার্ড এবং রহস্যময় এক জগতে। নাকি অনেকগুলি জগতে?
"স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার"এ বারবার ফিরে যাওয়া যাবে। ঠিক এরকম বই এটি।
বই রিভিউ
নাম : স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার লেখক : হাসনাত শোয়েব প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০২৪ প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন জনরা : কবিতাবই রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
জীবন আর বিষণ্ণতা যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্যাডনেসের শেষ কোথায়? জীবন থেমে গেলেই কি স্যাডনেস মুছে যায়? এর শুরুই বা কোথা থেকে? গার্ডেন অফ ইডেন থেকে এডাম এবং ঈভের পৃথিবীতে আসার পর থেকেই কি সাফারিংসের শুরূ। সে কথায় না গিয়ে বরং ভ্যান গগের কথা "দা স্যাডনেস উইল লাস্ট ফর এভার" এ ফিরে আসা যাক। আগুন কিংবা বরফ কোনটা ছাড়া বরং একটু অন্যভাবে এপোক্যাপিলস কিংবা কেয়ামতের কথা চিন্তা করা যাক। দারুণ হতো যদি ধর্মগ্রন্হের তথাকথিত মহামানবের না আবির্ভাব হয়ে দস্তোয়ভস্কি প্রফেট হয়ে ফিরে আসতেন নিকোলাই গোগোলের পকেট থেকে, সেইন্ট পিটার্সবার্গের ঝকঝকে সাদা আলোয় প্রতিধ্বনিত হতো প্রফেট, প্রফেট কলোরব। আন্ডারগ্রাউন্ডসের নোটসে ছেয়ে যেতো শহরতলীর প্রতিটা বিজ্ঞাপন, সেখানে জ্বলজ্বল করে লেখা থাকতো, "ম্যানুস্ক্রিপ্ট নেভার বার্ন", তা দেখে বুলগাকভ নিশ্চয় মুচকি হাসতেন, হো হো করে অট্টোহাসি হাসতো কু্ত্তার হৃৎপিন্ড ট্রান্সপ্লান্ট করা পাগলটা আর বলতো, "ঈশ্বর মইরা গেছে।" সিসিপাসও একটা সময় ক্লান্ত হয়, হ্যাপি না হয়ে ইটারনাল লুপে ঘুরতে থেকে কতো আর প্রিটেন্ড করা যায়! হয়রান হয়ে সে খুঁজে বেড়ায় সেই সূর্যমুখী, যেইটা অমরত্য দেয় না ঠিকই তবে মইরা যাওনের পর কবরের পাশে ফুটে সুবাশ ছড়ায়। একটা সময় ফিনিক্স পাখির ব্যাপারটা খুব ফ্যাশিনেটিং লাগতো, এখন জাস্ট মিথ লাগে। ফুল দেখলেই রাজ্যের বিষণ্ণতা ভর করে আমার উপর, মনে হয় মুঙ্কের পচাগলা দেহ ওগুলোতে মিশে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেছে, আর সূর্য ডোবার আগে মেঘের ওপারে যেন 'দা স্ক্রিম' এর অবয়ব ফুটে উঠছে। লেখক এখানে এমন একজনের কথা বলেছেন যে কিনা মানুষের শেষ নিংশ্বাসটুকু বোতলে আটকে রাখতো। এইভাবে যারা গতো হয়েছেন তাদের সবার জমাকৃত নিঃশ্বাস ছেড়ে দিলে নাকি পৃথিবী বিশাল এক দীর্ঘশ্বাসে ছেয়ে যেতো। স্বর্গ, নরক, আত্না, অস্তিত্ব, ঈশ্বর, মিথ এবং আরো অনেক কিছুর ছোট্ট অথচ সুন্দর বর্ণণা দেয়া হইছে বইটায়, বেশিরভাগ অবশ্য মেটাফোরিক। সম্ভবত সংগীতের জন্ম আর এলোমেলো টিউলিপ এই দুইটা চ্যাপ্টার আমার অধিক প্রিয় হয়ে থাকবে। নিৎসের ইটারনাল রিটার্ন দিয়ে সবকিছু লুপ আকারে চলবে কিনা জানিনে তবে শ্বাশ্তত শূন্যতায় বিলীন হয়ে গেলেও মন্দ হয় না। এন দা স্যাডনেস উইল লাস্ট ফর এভার! হাসনাত শোয়েব এর লেখা ফলো করতাম সেই কোভিড এর সময় থেকে। তার আগের বই "শেফালি কি জানে" নিয়ে একটা আক্ষেপ ছিলো বইটা বেশ অগোছালো, সেই আক্ষেপটা এইবার ঘুচলো। প্রত্যাশা যে পুরোপুরি পূর্ণ হইছে তাও না, তারপরো ফিলস গুড টাইপ ফিল আসে শেষ করার পর। প্রচ্ছদটা আরেকটু সুন্দর হতো পারতো, সাইকেলের জায়গায় একা সূর্যমুখীর ছবি থাকলে দারুণ হতো। এনিওয়ে ৪/৫ তারকা দেয়া যায়।
বইটা দুর্বোধ্য। সবকিছু বুঝে উঠতে পারি না। এখানে কিছু কথামালা আছে।
এরকম—
চির বসন্তের দিনে সৃষ্টি হলো পৃথিবী। মেষরাশিতে সূর্যও তখন থরথর করে কাঁপছিল। আর অজান্তেই ফাঁক হলো নরকের দরজা, বেরিয়ে পড়ল পাপের তিন মূর্তি-চিতা, সিংহ ও নেকড়ে। তখনও মানুষ আসেনি ভূ-তলে। তবু পাপে ডুবে গেল গোটা পৃথিবী। সবকিছুর আগে পৃথিবীতে পাপের আগমন ঘটলেও মানুষের মধ্যে পাপের ধারণা তৈরি হতে সময় লেগেছে প্রায় পৌনে দুই কোটি বছর। যেহেতু পুণ্য বলে তখনো কিছু ছিল না, পাপকে আলাদা করার কোনো উপায়ও ছিল না। গোটা পৃথিবী ছেয়ে গিয়েছিল পাপের তিন রূপকে, অর্থাৎ চিতা, সিংহ ও নেকড়েতে। পুণ্য সৃষ্টির পূর্বে পাপই ছিল মানুষের একমাত্র প্রবৃত্তি। যার জন্ম ইডেনের সেই গন্ধম থেকে। প্রায় আড়াই লাখ বছর আগে তেমন এক গাছ দেখা গিয়েছিল বাবেলের উদ্যানেও। মেসোপোটেমিয়ার বিলুপ্ত গ্রন্থগুলোতেও ছিল এর বর্ণনা। তবে মানুষ নৈতিকতার বোধি লাভের পর সেইসব গ্রন্থ ভাসিয়ে দিয়েছিল ইউফ্রেটিসের জলে। যা পারস্য উপসাগর হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল মধ্য ও দূর প্রাচ্যে। এখনো সেসব পাপ সমুদ্রবাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের মনে।
সংগীতের জন্ম সবকিছুর আগে। এমনকি শাশ্বতেরও! যখন কিছুই ছিল না, এক সংগীতিক বিন্দুই ছিল সব। নিরেট শূন্যতার ভেতর দিনমান বেজে যেত সেই সুর। সুরের সেই বিন্দু থেকেই সবকিছুর শুরু। আর পৃথিবীতে সংগীতের বিস্তার 'ওঁম' থেকে। যা সৃষ্টির শুরু থেকেই চিরন্তন। তবে সংগীত যে আসলে সংগীত মানুষের মধ্যে সে ধারণা তৈরি হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৪১ হাজার বছর পূর্বে। বরফ যুগে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে মানুষ প্রথম আবিষ্কার করে সংগীত। ভালুকের হাড় দিয়ে বানানো সেই বাঁশির সুর পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও শোনা যেত। মানুষের কণ্ঠ থেকে সুর হিসেবে প্রথম নিঃসৃত হয়েছিল কান্না। কান্নার ধ্বনি থেকেই আজকের গানের জন্ম। মধ্য যুগে ইতালিতে 'ডিরগে' ছিল তেমনই এক সংগীত। যা গাওয়া হতো শুধু মৃত মানুষদের শোক পালনে। এরপর প্রথম রেনেসাঁর সময় কান্না ও গানকে পৃথক করে লাতিনরা। নিজেদের কান্নাকে শিল্পের রূপ দিতে এবং চার্চের শক্তি কমাতেই এই কাজটি করেছিল তারা। অথচ এর আগে হেলালুইয়ার কোরাসে তারা মেসিয়াকেও স্বর্গ থেকে নামিয়ে আনতে পারত। যেমন রেবাব দিয়ে ফোরাতে ঢেউ খেলাতে পারত এজিদ-কন্যা। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে সংগীত সব সময় ছিল আত্মার গান। যেখানে বীণার সুরে বৃষ্টি নামত, আর সেতারের সুরে জ্বলত প্রদীপ। পৃথিবীর আদিতে যেমন সংগীত, অন্তেও তাই। ধ্রুপদের সুরে যে সৃষ্টি জগতের জন্ম, তা বিলীন হয়ে যাবে রক এন্ড রোল এবং হেভি মেটালের বিটে।
অতঃপর তারা শুরু করল বিষণ্ণতার চাষাবাদ। প্রস্তরযুগের সবগুলো পর্যায় পেরিয়ে পৃথিবীতে লৌহযুগ আসি আসি করছে, মানুষ তখনই প্রথম আবিষ্কার করল সে চাইলে বিষণ্ণও হতে পারে। শুরু হলো বিষণ্ণতা উদযাপন। বিষণ্ণতাকে টিকিয়ে রাখতে মানুষ সৃষ্টি করল গান, নাচ, শিল্প-সাহিত্য, চিত্রকলা। সেসবের টানে দলে দলে সব মানুষ বিষণ্ণ হতে শুরু করল। সিয়েস্তা পেরিয়ে যাওয়া দুপুরগুলোতেই মানুষ সবচেয়ে বেশি বিষণ্ণ হতো। মানব সভ্যতার বিস্তারের সঙ্গে বিষণ্ণতাও ছড়িয়ে পড়তে থাকল। বিষণ্ণতার নানা ধরন ও রং আবিষ্কার হতে থাকল। ক্যারোল দফ নামের এক প্রাচীন চিত্রশিল্পী প্রথমবারের মতো বিষণ্ণতার স্বীকৃতিস্বরূপ বেছে নিলেন মৃত্যুকে। এরপর সেই মৃত্যু ছড়িয়ে পড়ল মহামারি আকারে। শোনা যায়, ৭০ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল সেবার। দ্বিতীয় ধাপের বিষণ্ণতার যুগে মানুষ এতে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বিপ্লবের সময়ে বিষণ্ণতা নিয়ে ভিক্তর হুগো লিখলেন ঢাউস এক বই। যেখানে লেখা হলো, 'সে এখন ঘুমিয়ে আছে, জীবনে কিছুই পায়নি যে।' এরপর কেটে গেল আরও কিছু বছর। ফিওদর নামের এক 'সাদ' লিখলেন, 'আমি লোকটা অসুস্থ, বদ একটা লোক।' কাছাকাছি সময়ে গ্রেগর সামসার গল্প শোনালেন কাফকা নামের জার্মান ভদ্রলোক। আর অখ্যাত এক বাঙালি কবি লিখলেন 'বিপন্ন বিস্ময়' এর কথা। এরপর গোটা পৃথিবী ঢুকে গেল ইটারনাল এক বিষণ্ণতায়। যা আর কখনোই গেল না...
আধুনিক জীবনের জটিলতা ও বিভ্রান্তি আমাদের লেখাপড়া ও অনুভবের ধরন বদলে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মতোই অপরিচিত শব্দ ও দুর্বোধ্যতার ভেতর দিয়েই আজ অনেক পাঠক অর্থ খুঁজে নিতে শেখে। কারণ ব্যক্তিমানুষ আর সমাজ–রাষ্ট্র আলাদা নয়; তাই সাহিত্যও আর সরল থাকতে পারে না। এই জটিল বাস্তবতায় হাসনাত শোয়েবের লেখায় উঠে আসে বিষণ্ণতা, অস্তিত্বহীনতা ও অনিশ্চয়তা—যেখানে মানুষ নামমাত্র, সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী, ন্যায়–অন্যায় গুলিয়ে যায়। প্রতিবাদ করার শক্তি নেই, মেনে নেওয়াও যায় না—এই দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় গভীর বিষাদ। দস্তয়েভস্কির মতো মুক্তির আশার কথা উঠলেও প্রশ্ন থেকে যায়: এই সময়ে কি নির্বাণ সম্ভব, নাকি আমাদের অস্তিত্ব চিরকালীন বিষণ্ণতার মধ্যেই ভেসে থাকবে?
আমার ঘরের দেয়ালে ভিনসেন্টের পেইন্টিং টানানো। ওকে আমি শুধু ভিনসেন্ট ডাকি, তাই তো ও চেয়েছিল। ভ্যান গঘ নয়৷ বরিনেজের কয়লা খনি থেকে যে যিশু বেরিয়ে এসেছেন, তিনি শুধু ছবি আঁকতেন। আমার এই যিশু মানুষকে ভালোবাসতেন আর ভালোবেসেছেন বিষণ্ণতাকে। তার শেষ আঁকা ছবিটা "the wheat field with crows" কি প্রফেসি বহন করে না? ভিনসেন্টের অন্তিম পরিণতিকে নির্দেশ করে দেয় না? ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলে দেখবেন, বিস্তীর্ণ গম ক্ষেতের মাঝে চলে যাওয়া পথটি মাঝপথেই শেষ হয়ে গেছে। কেন? কেন মাঝ পথে শেষ হয়ে গেল? তার জীবনের অন্তিম সিদ্ধান্ত কি অবচেতন মনেই নিয়ে ফেলেছিলেন? যাই হোক, পরের ঘটনা আমরা সবাই জানি। পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। এই "স্যাডনেস"কে ভালোবেসেছেন বাংলা সাহিত্যে আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ। মাল্যবানের পরতে পরতে যে অসুখী মানুষের ছবি দেখতে পাই, সে কি ভিনসেন্টই কি নয়? ভীষণ দুপুরে কাক উড়ছে...কা..কা..কা... গম ক্ষেতের মাঝে দুপুরের কড়া রোদের মাঝে হালকা হাওয়া বয়ে গেলে মনে হয় এই জীবনে আর কি চাই? কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে দুই হাতে ডাবের ছড়া নিয়ে আসা পঞ্চাশ পেরুনো নিপাট ভদ্রলোকটি চেয়ে আছেন আকাশের দিকে৷ কি এক পাখি উড়ে গেল নাকি? দোয়েল? মনে পড়ে যায় বরিশালের আকাশের কথা, নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসে কত কথা! এক জীবনে আর কি চাই?
স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরেভার। কেন নয়? ঐসব প্রাসাদে কি টিকেছিল লুই চতুর্দশ? স্যাডনেসকে ভালোবাসতে নেমে আসো জীবন মৃত্তিকার কাছে। এই স্যাডনেসকে ভালোবেসে লিখেছেন আমার আরেক প্রিয় কবি হাসনাত শোয়েব।
একটা অল্টারনেটিভ টেস্টামেন্ট হয়ে উঠেছে " স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরেভার "। এখানে যিশু নয়, স্বয়ং ফিওদর দস্তয়েভস্কি' চলে এসেছেন তার সন্তানদের পাপের ভার বহন করতে, আর সবাইকে নিয়ে চলেন নরকের টানেলের দিকে৷ ইস্রাফিলের শিঙা নয়, রক অ্যান্ড হেভি মেটালের আওয়াজে যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সমস্ত সৃষ্টি জগৎ, মানুষের আত্মা ভেসে বেড়ায় ক্যানারি পাখির দেশে। ধ্বংস সৃষ্টি বিষন্নতা আর মিথ নিয়ে যে টেস্টামেন্ট লিখেছেন হাসনাত শোয়েব, আরও বহু বহু বছর পাঠককে বিস্মিত করবে।
আমি এই বইটা হাতে নিয়েছিলাম ভ্যান গঘকে নিয়ে লেখা কোন বই মনে করে। প্রচ্ছদটাও যেন বলেছিলো এটা গঘকে নিয়ে লেখা কিছু। আমার বরাবরই মনে হতো দুঃখের রং বোধহয় মাটি-অন্ধকার কালোর মিশেলে কোন রং। কিন্তু গঘের আঁকিবুঁকি আমাকে নতুন করে বোঝালো যেন দুঃখের রং নীল। আমি বরাবরই দুঃখ করতে ভালোবাসি এবং বিষন্নতায় আঁটকে থাকি। বের হতে পারি না এসব ফাঁদ থেকে।
প্রফেট প্রফেট বলে শুরুটা করলো দস্তয়েভস্কিকে নিয়ে। আমার ভীষণ প্রিয় লেখক দস্তয়েভস্কি। সারাটা জীবন মনস্তত্ব নিয়েই ভেবেছেন এবং এই ভাবনাগুলোর ছাপ ফেলে গেছেন লেখায়। সেই দস্তয়েভস্কি এসে মানুশের পাপের বোঝা কমাচ্ছে। শাস্তি মাফ করছে। ভাবতেই অদ্ভুত লাগছে।
আমি পাপ ব্যাপারটাকে ভীষণ পছন্দ করে চলি। আমার কেন যেন মনে হয় পাপ থেকেই সবচেয়ে সুন্দর কিছুর জন্ম হতে পারে। এই যেমন গান। “সংগীতের জন্ম” কবিতাটা বেশ ভালো লেগেছে। জানলাম সংগীতের জন্ম সবকিছুর আগে, শাশ্বতেরও আগে। লেখকের ধারণা, মানুশের কণ্ঠ থেকে সুর হিসেবে নিঃসৃত হয়েছিলো কান্না। আমারও মনে হয় কান্নার ভেতরেই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সুর এবং গানগুলোর জন্ম।
এই পাপের মধ্যেই মানুশের জন্ম হয়। এভাবে পাপটুকু আমাদের রক্তে মিশে আছে। এরপর পুর্ণ্যের জন্ম হয়। মানুশ পুর্ণ্য করতে না পারলেও পাপটা ঠিকই করে এবং এই পাপের ভার বয়ে নিয়ে যায় যেকোন ভাবে। আর যারা পাপ কিংবা পুর্ণ্য কোনটাই করে না তারা আসলে কোথায় যাবে? স্বর্গে না নরকে? ভেবে দেখেছেন কখনো? লেখকের ধারণা- “তারা আসলে বিশাল এক ‘না’ এর ভেতর পড়ে আছে, না থাকার মতো করে। সুখ তাই তাদের ত্যাগ করেছে, শান্তি পথ ভুলে চলে গেছে অন্য কোথাও। তারা আসলে কোথাও নেই।”
“স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার” এই কবিতাটা পড়তে গিয়ে আসল ধাক্কাটা খেলাম। দোষটা আমারই। আমিই বেশি ভেবে বসেছিলাম। উনি এই নামটা দিয়ে গল্প শুরু করে পাগলামির আঁকিবুঁকি করেছেন। গঘ নেই। গঘের ফাঁদে ফেলেছেন আমাকে। পড়তে বেশ মজা লাগছিলো। নরম দুঃখ পোহাচ্ছিলাম।
“নিঃশ্বাস ও ঘ্রাণের পার্থক্য” পড়তে পড়তে ভাবনায় গেলাম। এই দুটাকে কি আদতেই আলাদা করা সম্ভব? নিঃশ্বাস শব্দটার পরের শব্দ বোধহয় দীর্ঘশ্বাস। প্রায় সাথে সাথেই লেখক জানতে চাইলেন আমি কি আমার শেষ নিঃশ্বাসটি নিয়ে কখনো ভেবেছি? আমার অন্য চিন্তাগুলো কোথাও একটা আঁটকে যায়। চিন্তায় এসে আঘাত করতে থাকে বেঁচে থাকা, মরে যাওয়ার মতো শব্দগুলো। শেষ নিশ্বাসের ধুলোও মাথায় জমা হতে শুরু করে। জীবন নিয়ে, বেঁচে থাকা নিয়ে এতো মগ্ন আর বিভোর হয়ে জীবনের প্রতি অভিযোগ কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করতে করতে আসলে ঐ শেষ নিশ্বাসের কথাটাই ভাবা হয়নি কখনো। এই কবিতাটা পড়ে বেশ নাড়া খেলাম। জীবন নিয়ে চিন্তায় একটা বিশাল ফাটল ধরলো। আচ্ছা, এই দীর্ঘশ্বাসগুলো জমলে আসলে কি হতো? কিংবা শেষ নিশ্বাসটি ত্যাগ করার সময় কি ভাববো আমি? সেই শেষ নিশ্বাসগুলোই বা যায় কোথায়? পৃথিবীতে আঁটকে পড়ে নাকি ইউলিসিসের কোন পাখির ডানায় ভর করে মহাবিশ্ব পার করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়? তাহলে আমি যে পৃথিবীতে ছিলাম তার আর কোন চিহ্ন রইলো না। এভাবেই শেষ হয়? তাহলে স্বর্গ কিংবা নরক পর্যন্ত মানুশের কি যায়?
“সর্বনাশা জুডাস” গল্পটাও বেশ ভালো লাগলো পড়ে। পাপ-পুর্ণ্যের অর্থের গোলমিলটা বেশ ভাবনার মতো। “দুর্বোধ্য ভাষা” পড়তে পড়তে বিভূতিভূষণ, কমলালেবুর মৃত্যুর দেখা পেতেই পরিচিত গন্ধটা পেলাম। কিন্তু শেষ পাতায় অপেক্ষা করছে নীরবতা, একা করে দেওয়া অনুভূতি। শাশ্বত শূন্যতা কি জানি না। তবে যেই অনুভূতিটা হচ্ছে সেটা শাশ্বত শূন্যতা বলে বোধহয়। অনেকদিন ধরে একটা বই পড়ার ফল এটা। শেষ হওয়ার কালে মন কেমন করে করে শেষ হয়ে যাবে ভেবে। ঘোর লাগে লেখাগুলো পড়লে। এমন মোহ মায়া বইটার ভেতর বন্দী হয়ে আছে যে দেখলেই দুঃখ হয়।
এমন গল্পও আছে যেগুলো বিশেষ বুঝলাম না। তাও ছোটবেলায় অন্যদের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে না বুঝে হেসে মজা পেতাম, এদিকে কিছু একটা মজার বিষয় মিস হয়ে গেলো বলে মন খারাপও করতো এই বইটা পড়ে তেমনি না বুঝেও মজা পেয়েছি।
বেশ অনেকবার করে পড়ার কারণে অনেককিছু না বুঝতে গিয়েও বুঝেছি বলে মনে হচ্ছে। না বুঝলেও ব্যাপার না। বুঝে যাবো৷ তবে এই ফরএভারের ধান্ধাবাজি আর কতদিন?? এভাবে লেখক আমাকে বারবার উনার বই পড়াবেন এবং আমি বারবার পুরো বই না বুঝে ভালো লাগার অনুভূতিতে উড়ে বেড়াবো রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাস হয়ে।
মানুশের ভাবনার অদ্ভুত হওয়ার মনে করতাম বুঝি একটা কিছু সীমা থাকে বা লিমিটের অঙ্ক কষে ক্যালকুলাস দিয়ে বাঁধা যায়। তবে এই অদ্ভুত কবিতা এবং এর ভেতরকার কথাবার্তাগুলো সেসব সীমা অতিক্রম করে কোথায় যে গেলো!! বেশ কয়েকবার পড়েছি। প্রথমে তো কিছুই বুঝিনি। শেফালি কি জানে পড়ার পর মনে হয়েছিল এবার মনে হয় একটু mature হয়েছি উনার লেখার বুঝার জন্য৷ পড়তে ভালো লাগছে। কিন্তু পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। এটা আমার জন্য নতুন কিছু না। তবে এই যে পড়ছি, ভালো লাগছে, ঘুমিয়ে যাচ্ছি, উঠে আবার পড়তে বসলাম এবং মনে হলো যেন ঘুমানোর সাথে সাথে যা পড়েছি সব তো ভুলে গেলাম। মনে পড়ছে কিন্তু ঐ যে বুঝতে পারছি না এবং একটুও বুঝতে পারছি না। এমন বুঝতে পারা না পারার লড়াই লড়তে লড়তে এই বই পড়ে পড়তে আমার অনেক সময় লেগেছে। আমি আবার পড়বো হয়তো এই বইটা।
অদ্ভুত কথায় ভরা এই বইটা আসলে সবার জন্য না। সবার ভালোও লাগবে না। যারা মেটাফিকশন, আবস্যার্ড ধরনের লেখা পছন্দ করেন তাদেরই ভালো লাগবে। এর মধ্যে বুঝতে না পারার কারণে অনেকে পড়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলতে পারে।
বইটা পড়ার সময় মনে হয়নি কবিতার বই পড়ছি। বারবার মনে হচ্ছিলো মুক্তগদ্য পড়ছি। কবিতার সংজ্ঞা আসলে কি?
This entire review has been hidden because of spoilers.
❝স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার❞ - অনেকদিন থেকেই পড়ার ইচ্ছে ছিল। অবশেষে সংগ্রহ করে পড়ে ফেললাম ৪৮ পাতার বইটি- যদিও ঠিক কোন জনরাতে পড়বে তা নিয়ে অনেক তর্কের অবকাশ আছে।
কলেবরে ছোট হলেও প্রতিটি গল্প অনেক গভীর- মনে ছাপ ফেলে যায়। গল্পগুলো মেটাফরিক্যাল না অ্যাবসার্ড - সেটাও চিন্তার খোরাক জোগায়। হাসনাত শোয়েবের লেখার ভঙ্গি অনেকটা লিরিক্যাল- মনে হবে যেন কবিতা পড়ছি। সাথে আছে পুরো পৃথিবীর ইতিহাস, সাহিত্য - সব মিলেমিশে যেন এক হয়ে যায়। প্রতিটি গল্পকে নিয়ে যেন এক একটা ছোটখাটো থিসিস করে ফেলা যাবে!
শেষে একটা কথাই বলব: হাসনাত শোয়েবের লেখা আরও আলোচনার দাবি রাখে!
কিছু ভাবনা জাগানো কথা:
❝তুমুল অট্টহাসির ভেতর ফেলে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসগুলোর পরিধি মাপার চেষ্টা করতাম। কোথাও অবশ্য কিছু নেই। খাতা ভর্তি করে একটা লাইনই শুধু লিখে রেখেছে, 'দ্য স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার।' এসব ফরএভারের গল্পগুলো যে শুধুই ধান্ধাবাজি তা অনেক আগেই বুঝেছিলাম। বলেওছিলাম, ফরএভার বলে কিছু নেই। যা আছে তা কেবলই নিৎসের উত্তরাধিকার আর বোর্হেসের কান্না। তুমি বরাবরই বলতে, কান্না হচ্ছে ফাঁদ। পাখিরা নিজের নিয়মেই সেখানে পা দেয় আর মরে যায়।❞
❝অতঃপর তারা শুরু করল বিষণ্ণতার চাষাবাদ। প্রস্তরযুগের সবগুলো পর্যায় পেরিয়ে পৃথিবীতে লৌহযুগ আসি আসি করছে, মানুষ তখনই প্রথম আবিষ্কার করল সে চাইলে বিষণ্ণও হতে পারে। শুরু হলো বিষণ্ণতা উদযাপন।❞
❝তপ্ত বালুতে সে লিখে রেখেছিল নিজের নাম, যদিও কেউ পড়েনি সে নাম। একদিন নাম থেকে মুছে গেল সে। নামহীন মানুষ যেন ছায়ার কঙ্কাল। ছায়ার পিছু নিয়ে সে পৌঁছে যায় আদোনিসের বাগানে।❞
❝পৃথিবীর আদিতে যেমন সংগীত, অন্তেও তাই। ধ্রুপদের সুরে যে সৃষ্টি জগতের জন্ম, তা বিলীন হয়ে যাবে রক এন্ড রোল এবং হেভি মেটালের বিটে।❞
❝সেই কান্নার ভেতর দিয়ে পৃথিবী যখন বিলীন হয়ে যাবে, তখন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু এক জায়গায় মিলিত হয়ে সপ্ত আসমানের দিকে ছুড়ে দেবে নিজেকে। আর শাশ্বত শূন্যতার ভেতর একটি বিন্দুর মতো অনন্তকাল ভাসতে থাকবে।❞
❝মৃত্যুর আগ মুহূর্তে যখন তার জীবনের কথা মনে পড়বে আপনি নিজের অজান্তেই বলে উঠবেন, 'সারা আকাশজুড়ে ধূসর পাণ্ডুলিপির রং।'❞
❝প্রতিনিয়ত কেউ জন্মেছে আবার কেউ মরেছে। তবু 'সে' মরেনি। কারণ সে 'কেউ' ছিল না, সে ছিল বহু। যখন মানুষ বিলুপ্ত হতে শুরু করল সে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করল অন্য প্রাণী ও জড়বস্তুর মাঝে। এভাবেই সে হয়ে উঠল সর্বপ্রাণের প্রতীক। যা একদিন তাকে পরিণত করেছে সর্বগ্রাসী এক বেহেমথে।❞
❝রাষ্ট্র বললে আমাদের যে গুঁড়ো দুধ, নীল ডাউন আর ডোরাকাটা বেতের কথা মনে পড়ে সে গল্পটা পুরনো। রাষ্ট্র আসলে একটা ভয়, যা সবার আগে দেখিয়েছিলেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা।❞
❝সেই শব্দ ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে তার মাত্রা। আর মাথার ভিতর অবিরাম ঘুরছে টারবাইন-'তবুও গ্লানির মতো মানুষের মনের ভিতরে...' খুবলে নেওয়া মাংসগুলো থেকেই মূলত বেরিয়ে আসে এই গান, সংগীতের আদি ধ্বনি। যদিও 'গান কেউ অন্ধকারে নিজে নিজে লেখেনি কখনো।' যেমন কেউ লেখেনি মানুষের অস্তিত্ব হারানোর বেদনা-গাথা। তবু এসবের মধ্যে টেলড্রপের মতো পড়ে থাকে সূচনা সংগীত, আর জীবিত মানুষের হাড়ের নির্যাস।❞
“তুমুল অট্টহাসির ভেতর ফেলে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসগুলোর পরিধি মাপার চেষ্টা করতাম। কোথাও অবশ্য কিছু নেই। খাতা ভর্তি করে একটা লাইনই শুধু লিখে রেখেছে, 'দ্য স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার।' এসব ফরএভারের গল্পগুলো যে শুধুই ধান্ধাবাজি তা অনেক আগেই বুঝেছিলাম। বলেওছিলাম, ফরএভার বলে কিছু নেই। যা আছে তা কেবলই নিৎসের উত্তরাধিকার আর বোর্হেসের কান্না। তুমি বরাবরই বলতে, কান্না হচ্ছে ফাঁদ। পাখিরা নিজের নিয়মেই সেখানে পা দেয় আর মরে যায়।”
বইয়ের নামটি যেমন, মনেও তার কিছুটা গাঢ় ছাপ রেখে যায়—“স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার।” হাসনাত শোয়েবের এই কাব্যিক সংগ্রহ পড়ে, মনে হয়, কোনো এক গভীর, অন্ধকার গহ্বরে আমরা নিজেকে খুঁজে পেতে চাই। মনে হতে থাকে, এই বিষণ্ণতা তো সত্যিই চিরকালীন—এটি কোনো না কোনোভাবে আমাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো আমরা একে ভিন্ন চোখে দেখি, আবার কখনো যেন হালকা সুখের ঝলকেও তার অস্তিত্ব জাগ্রত হয়ে ওঠে।লেখার ধরনে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা আছে, কিন্তু সেটা অস্বস্তিকর নয়—বরং শান্ত, নরম, অনেকটা শরতের শেষ বিকেলের মতো, যেখানে আলো আর অন্ধকারের মাঝে একটা বিষণ্ন সৌন্দর্য থাকে.
এক জায়গায় হাসনাত শোয়েব লেখেন, “প্রস্তরযুগের সবগুলো পর্যায় পেরিয়ে পৃথিবীতে লৌহযুগ আসি আসি করছে, মানুষ তখনই প্রথম আবিষ্কার করলো সে চাইলে বিষণ্ণও হতে পারে।” আর এই বিষণ্ণতা কেবল সময়ের নয়, আমাদের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তে আমরা এই বিষণ্ণতার সঙ্গে বসবাস করি, আর কখনো কখনো সেটা আমাদের সঙ্গী হয়ে ওঠে।
বইটি পড়তে শুরু করলেই প্রথমেই একটা অনুভূতি হয়, যা এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মতো,এমন একটা জটিলতা আছে, যা পাঠককে কিছুটা বিভ্রান্তও করে তোলে। বইটি পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হয়, ভাষার অজানা এলাকা পেরিয়ে যাচ্ছি, যেখানে প্রতিটি শব্দ একটু একটু করে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে—অথবা কখনো কখনো কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। এটা একটা প্রক্রিয়া, যেখানে শুধুমাত্র পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, লেখককে বুঝতে গেলে মনে হয় নিজের মনের গভীরে প্রবেশ করতে হচ্ছে। "আমার বইয়ের অনেক কিছু তোমরা বুঝবে না," এমন কিছু বলতে গিয়ে হাসনাত শোয়েব যেটি নিজে বুঝতে পেরেছেন, সেটা আমাদের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছানোটা আসলেই কঠিন।লেখার এই জটিলতা অবশ্য একপ্রকার প্রশংসনীয়। এই বইটি কেবল একটি পড়ার অভিজ্ঞতা নয়, বরং মনে প্রশ্ন এবং ভাবনা জাগানোর পথ। একদিকে, আপনি লেখার গভীরে যেতে গিয়ে সমস্যায় পড়বেন, আবার অন্যদিকে আপনি বুঝতে পারবেন—এটা আমাদের সমাজ, আমাদের নিজস্ব অনুভূতির এক ছবি। তার ভাষা সোজা কিন্তু অসীম গভীরতায়, এক ধরণের ভারসাম্যহীনতা নিয়ে চলে যায়। "ফরএভার বলে কিছু নেই"—এই কথাটা যেন এক সময় আমাদের জীবনে সত্যি হয়ে ওঠে, যখন জীবনের যন্ত্রণাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিজে বলি, 'বিষণ্ণতা আমাদের সঙ্গে থাকবে, আর সবকিছু চলে যাবে'।
কোনো এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে খুন হয়েছিল সে। মহাজাগতিক একটি পাখির পাশ ফেরা ছাড়া তেমন কিছুই ঘটেনি তাতে। ওহ, আর বাতাসের ভরও বেড়েছিল কিছুটা। টাওয়ার অব সাইলেন্সে শুয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে। সে শুধু বলতে পেরেছিল, 'কতিপয় চিল'। তার এই কথাতেই উড়ে গিয়েছিল সারি সারি চিল। তপ্ত বালুতে সে লিখে রেখেছিল নিজের নাম, যদিও কেউ পড়েনি সে নাম। একদিন নাম থেকে মুছে গেল সে। নামহীন মানুষ যেন ছায়ার কঙ্কাল।
বহুদিন কিছু লিখি না। লিখতে গেলেই মনে হয় যা বলতে চাই বলা হয়ে গেছে। না লেখার জন্য অপরাধবোধ জাগে, তাও লিখি না। বোধটা চিরকালের জন্য হোক, চাই না। এই বইয়ের জন্য অনেক লেখা যায়, আবার কিছুই লেখা যায় না। হয়তো লিখব, কোন একদিন।