নিয়তি বলে একটি বিষয় থাকে। সেই নিয়তির অমোঘ টানে মানুষের এই ছুটে চলা। চাইলেই নিয়তির আকর্ষণ অগ্রাহ্য করা যায় না। যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, ভাগ্যে যা লেখা আছে তা হবেই। কোনকিছুতেই সেসব বদলে দেওয়া যায় না। হয়তো কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু একসময় না একসময় নিয়তির শেষ পরিণতির দিকে জীবন ধাবমান হয়। ঘটনাক্রম হয়তো ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়, কিন্তু শেষ সময়ের গল্প যেন আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। যার সূচনা হয়েছে আঠারোশ’ বিরাশি সালে।
মানুষ খুবই অদ্ভুত প্রাণী। তার মনের মধ্যে কী চলে সে জানে না। ছোট্ট ছেলে মহেন্দ্রনাথের স্বাভাবিক জীবনে এক সাধুবাবার আগমন। যে জানান দেয়, মহেন্দ্রনাথের জীবন শুরু হয়েছে অন্য কাজের জন্য। এই চেনা পরিবেশে না, অচেনা কোনো সত্তায় মহেন্দ্রনাথ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। মা তারার আশীর্বাদ আছে তার সাথে। সেদিন থেকে মহেন্দ্রনাথের বদলে যাওয়া শুরু।
মানুষ অমরত্ব পাওয়ার নেশায় সবকিছু করতে পারে। নিজেকে শক্তিমান দেখানোর আশায় চলে সাধনা। শব সাধনার আর কিছু সময় বাকি। এরপরই মহেন্দ্রনাথ হয়ে উঠবে অমর। থাকবে অপার ক্ষমতা। যেই ক্ষমতার কাছে কেউই টিকতে পারবে না। আজকেও চলছে সেই সাধনা। পরিত্যক্ত এক মন্দিরে নগ্ম এক নারীর লাশের সামনে তন্ত্র সাধনা চলমান। কিন্তু সবদিন যে সমান যায় না। গভীর রাতের সেই অন্ধকার দুইজন জেলের সামনে উন্মুক্ত করে দেয় মহেন্দ্রনাথকে। তারা জেনে যায় মহেন্দ্রনাথের গোপন অভিসন্ধি। কিন্তু গোপন এই সাধনার খবর জানতে দেওয়া যাবে না। এখনো পুরোপুরি সাধনা শেষ হয়নি। আর কয়েকটা দিন। এতদিনের প্রচেষ্টা বিফলে যাওয়া যাবে না। তাই কঠোর হতে হবে মহেন্দ্রনাথকে। হতে হবে ভয়ংকর, হিংস্র। তাতেও কি শেষ রক্ষা হবে?
রায়কমল জমিদারবাড়ি। উদিত চন্দ্রের জমিদারিতে প্রজারা শান্তিতে জীবনযাপন করে। উদিত চন্দ্র মনে করে, প্রজাদের শান্তিতে রাখতে পারলে নিজেও সুখে থাকতে পারবেন। কিন্তু তার মনে সুখ নেই। এত বছর হয়ে গেল, এখনো নিঃসন্তান সে। স্ত্রী বিমলা দেবীর ঔরসে সন্তান তো আসে, কিন্তু মৃত হয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। একাধিকবার এমন হয়েছে। এবারও কি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে? কে জানে! তবে রায়কমল শান্তিতে নেই। ন্যায় বিচারের জন্য খ্যাত উদিত চন্দ্র সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে একটি ভুল করেছেন। যার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রজাদের। একে একে বিভৎস কিছু লাশের দেখা মিলছে। উদিত চন্দ্র বুঝতে পারছে সময় ঘনিয়ে আসছে। হিসেবের খাতায় নিজের নাম উঠে গিয়েছে। সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারবে তো সে? না-কি ভয়ংকর কোনো পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!
অতীত পেরিয়ে বর্তমানে ফেরা যাক। মধুর কাজ জুতো সেলাই করা। দিন আনে দিন খায়। কষ্ট করে রোজগার করলেও সংসারে লেগে থাকে অভাব-অনটন। এ নিয়ে স্ত্রী আরতি বালার অভিযোগের শেষ নেই। থাকার মধ্যে একটি জিনিসই আছে, পরিবারের ভিটেমাটি। যেখানে এক তেতুঁল গাছ শতবছর ধরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। পূর্বপুরুষের কঠোর নিষেধ, এই তেতুঁল গাছ তুলে ফেলা যাবে না। কিন্তু লোভের কাছে হার মানে পরপুরুষের নিষেধ। আরতি বালা মনে করে এই গাছটির নিচে রয়েছে শতবছরের পুরনো গুপ্তধন। যা বদলে দিতে পারে তাদের ভাগ্য। সত্যিই কি তাই? কয়েক যুগ আগে এই গাছটির নিচে কী লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? আজ এতগুলো বছর পর কী উন্মোচিত হবে? সত্যিই কি গুপ্তধন পাওয়া যাবে, যা বদলে দিবে তাদের ভাগ্য। না-কি আবার প্রমাণিত হবে— লোভে পাপ পাপে মৃত্যু?
অপলা মায়ের সাথে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। টিউশনি করে সংসার খরচ চালায়। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে বাবা। মাকে নিয়ে এই সংসার তাই চালানো কষ্ট হয়। অপলা শুনেছে, বাবার পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন। কিন্তু এই জমিদারির শেষ কেন, জানে না অপলা। জমিদার পরিবারে জন্ম নিলেও এখন বাস্তবতার সাথে সখ্যতা তার। কয়েকদিন ধরে অপলা বুঝতে পারছে, মা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। হুট করে দরজায় নক করার শব্দ শুনে, কিন্তু কাউকে দেখা যায় না। আবার বলে অপলার একজন বোন আছে, কিন্তু অপলা জানে সে বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তাহলে? মা কি ভুল বলে? কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত? না-কি কল্পনায় নিজের আরেকটা মেয়েকে স্থান দিয়েছে মা! সত্যিই কি চপলা নামে কোনো বোন আছে অপলার?
মারইয়াম কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। হুট করে বাবা মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। তুই তুকারি করে। জিনে আছর করা মেয়ের মতো ফ্যাসফ্যাসে হয়ে ওঠে কণ্ঠ। কয়েকদিন পর মেয়েটার বিয়ে। এমন হলে তো বিয়ে টেকানো মুশকিল। এসব কথা বাতাসের আগে দ্রুত ছড়ায়। ছেলেপক্ষ জানতে পেরে বিয়ে ভেঙে দেয়। নিরুপায় বাবা জিন তাড়াতে হুজুরের স্মরণাপন্ন হয়। কিন্তু সেখানে জানা যায় অনেক পুরনো গল্প, যা এতদিন মিথ্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। উন্মোচিত হওয়া সত্য মেনে নেওয়া সবসময় কঠিন। মারইয়াম যেমন মানতে পারে না, তার বাবা-মাও পারে না। কিন্তু এখন মারইয়াম সত্যতা জানে। জানে একজনকে বাঁচাতে হবে। শতবছরের পুরনো শত্রু আবারও ফিরে এসেছে প্রতিশোধের নেশায়। কিছুতেই তাকে সফল হতে দেওয়া যাবে না।
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
“রক্তের জবা” অতিপ্রাকৃত ঘরানার উপন্যাস। গল্পের শুরুটা আগ্রহ জাগানিয়া। তন্ত্র সাধনা দিয়ে লেখক যে রহস্যের আবহ তৈরি করতে পেরেছিলেন, তার রেশ ছিল পুরো বই জুড়ে। বেশ ভালোভাবেই লেখক রহস্যের বীজ বপন করেছিলেন। লেখক মনোয়ারুল ইসলামের সূচনা হয়েছিল, অতিপ্রাকৃত ঘরানার উপন্যাস দিয়েই। শুরুর দিকের সেই আবহ যেন খেই হারিয়েছিল লেখকের লেখায়। পুনরায় সেই স্বাদ যেন আবার পেলাম।
গল্পের শুরুটা অনেক অনেক বছর আগের। প্রায় দেড়শ বছর আগের সময়ের সাথে বর্তমান সময়ের মেলবন্ধন লেখক খুব সূক্ষ্মভাবে করেছেন। যেহেতু অতিপ্রাকৃত ঘরানার বই, সেহেতু ভয়ের এক ধরনের আবহের সাথে পরিচয় ঘটবে স্বাভাবিক। বর্তমান সময়ে দেখা যায়, এই ভয়ের সেই আবহ অনেক লেখকই ফুটিয়ে তুলতে পারেন না। এক্ষেত্রে লেখক মনোয়ারুল ইসলাম সফল, ভয়ের রেশ বেশ ভালোভাবেই ছিল। কিছু কিছু মুহূর্তে গা ছমছমে বিষয় ছিল। গভীর রাতে পড়তে গেলে হয়তো মেরুদন্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে আসাও অস্বাভাবিক নয়।
বিভৎসতার এক অনন্য নিদর্শন বইটি। ভয়ংকর সব খুনের ঘটনা বই জুড়ে রয়েছে। গা শিউরে উঠতে হয়। তবে লেখকের বর্ণনায় বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দারুণভাবে গল্পের গতিপথ সাজিয়েছেন লেখক। বর্তমান আর অতীতের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। তবে প্রথম অধ্যায়ে লেখক সময়কাল উল্লেখ করলেও বাকি অধ্যায়গুলোতে করেননি। আমার মনে হয়েছে প্রতিটি অধ্যায়ে সময়কাল উল্লেখ করলে বেশ ভালো হতো। প্রথমদিকে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল কোনটা অতীত আর কোনটা বর্তমান বুঝতে গিয়ে। পরে অবশ্য মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। যেহেতু দুই সময়ের গল্প এখানে বলা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে আরো স্পষ্টভাবে বলা যেত।
লেখকের বর্ণনা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে বর্ণনা করেন। খুব সহজেই বইয়ের সাথে এক ধরনের সংযোগ স্থাপিত হয়। যা খুব দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। “রক্তের জবা” বইটির শুরু থেকেই আকর্ষণীয়। কী হবে, কীভাবে হবে— জানার আগ্রহ লেখক তৈরি করতে পেরেছেন। লেখকের লেখনশৈলীতে কাঠিন্য বলে কিছু নেই। তবে কিছুক্ষেত্রে মনে হয়েছে আরেকটু ভালো হতে পারত। যেমন, একই অনুভূতি ব্যবহার করতে একই শব্দের পুনরাবৃত্তি ছিল। একটা বিষয় বলা যায়, অবাক হওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করতে লেখক একাধিকবার ‘এমন হয়!’ শব্দের ব্যবহার করেছেন। লেখক যে কারণে এমন শব্দচয়ন করেছেন, তা হয়তো সঠিক। কিন্তু একাধিকবার পড়তে গিয়ে আমার কিছুটা বিরক্ত লেগেছে।
টুকরো টুকরো একাধিক মানুষের গল্প লেখক বলেছেন। শেষে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। অতীত আর বর্তমানের এই মেলবন্ধন মনে ধরেছে। গল্পটা মিলিত প্রতিশোধের। ধাপে ধাপে গল্প সাজিয়ে শেষের দিকে এসে মূল কাহিনি উন্মুক্ত হয়। আমার মনে হয়েছে লেখক তাড়াহুড়ো করে সমাপ্তি এঁকেছেন। আরেকটু সময় দেওয়া যেত। হুট করে এভাবে শেষ হয়ে যাওয়া বেশ আক্ষেপের জন্ম দেয়। এর দারুণভাবে সবকিছুর পর এমন সাদামাটা সমাপ্তি ঠিক পছন্দ হলো না। যদিও লেখক ইচ্ছে করেই হয়তো এমনভাবে শেষ করেছেন। কিছু ঘটনা বলতে হয় না, পাঠককে বুঝে নেওয়ার মতো সুযোগ দিতে হয়।
শেষে অবশ্য একটা প্রশ্ন করা-ই যায়, এখানেই কি শেষ? না-কি আবার কোনো রহস্য সামনে এসে ধরা দিবে। লেখক যেভাবে উন্মুক্ত সমাপ্তি রেখেছেন, সিক্যুয়াল আসা সম্ভব। কেননা এত সহজভাবে শেষ হওয়া যে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।
▪️চরিত্রায়ন :
উপন্যাসটির সবচেয়ে দুর্দান্ত যে বিষয় লেগেছে, সেটা হচ্ছে চরিত্র গঠন। প্রতিটি চরিত্র খুব সূক্ষ্মভাবে তৈরি করা। সেটা হোক জমিদার বা তার স্ত্রী, কিংবা মহেন্দ্রনাথের মতো তান্ত্রিক। ছোটখাটো চরিত্রগুলোও লেখক বেশ যত্ন নিয়ে তৈরি করেছেন।
অতীতের পাশাপাশি বর্তমানের চরিত্র যেমন মধু, আরতি বালা, অপলা, মারইয়াম চরিত্রগুলোও গল্পের ক্ষেত্রে বেশ ভালো ভূমিকা পালন করেছে। সামান্য সময়ের জন্য আবির্ভাব হওয়া কিছু চরিত্রও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গল্পের প্রয়োজন মিটিয়েছে।
চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে লেখক খেই হারাননি। যে চরিত্র যেভাবে দরকার, সেভাবেই উঠে এসেছে। তাদের অনুভূতিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। ভীতিকর পরিস্থিতিকে চরিত্রের মাধ্যমে আরও ভীতিকর করে তোলার যে প্রয়াস লেখক করেছেন, তাকে সাধুবাদ দিতেই হয়।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
বানানের ক্ষেত্রে খুব একটা ভুল না দেখলেও, গল্পের মাঝে বেশ কিছু ইংরেজি শব্দের ব্যবহার কেন জানি ভালো লাগে না। যে শব্দের প্রচলিত বাংলা শব্দ আছে, তা কেন ইংরেজিতেই বলতে হবে? সংলাপের ক্ষেত্রে ঠিক আছে, কিন্তু বর্ণনার ক্ষেত্রে না করাই উত্তম বলে মনে করি।
এছাড়া কি/কী এর ভুল ব্যবহার অধিক হারে লক্ষণীয়। কী সঠিকভাবে ব্যবহার হলেও কি এর পরিবর্তে কী এর ব্যবহার প্রায় সবখানেই ছিল। ফলে অর্থ বিভ্রাটের সুযোগ থাকে, বুঝতে অসুবিধা হয়। আরেকটা বিষয়, কিছু বানান বইতে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। যেমন তেজকে ত্যাজ লেখা ছিল। আমি জানি না বানানটি সঠিক কি না। তবে পড়তে অস্বস্তি লাগছিল।
সংলাপের ক্ষেত্রে ভাষার প্রয়োগে কিছুটা ভুল লক্ষ্য করেছি। শুদ্ধ-অশুদ্ধের দোষ ছিল। যার শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা উচিত, সে অশুদ্ধ ভাষায় বলছে আবার উল্টোটাও ঘটেছে। একই মানুষ আবার শুদ্ধ-অশুদ্ধ দুই ভাষায় কথা বলছে। একবার আপনি বলছে, আবার তুমি বলছে। সম্পাদনা ভালো হলে এগুলো হয়তো ঠিক করে নেওয়া যেত।
বাঁধাই দারুন। প্রচ্ছদটা শুরুর দিকে পছন্দ না হলেও ছাপাতে দারুণ এসেছে। একই সাথে গল্পের নিবেদন যেন প্রচ্ছদে ফুটে উঠেছে।
▪️পরিশেষে, সময় তার আপন গতিতে চলতে থাকে। কিন্তু কোনো এক সময়, কোনো একজনের জন্য সময় থেমে যায়। তার অপেক্ষা চলে। একদিন সঠিক সময় আসবে, সুযোগ পাবে নিজেকে জানান দেওয়ার। সেদিন সকল কিছুর জবাব দিবে, জানান দিবে সে ফিরে আসছে! সেদিন কেউ নিস্তার পাবে না… কেউ না!
▪️বই : রক্তের জবা
▪️লেখক : মনোয়ারুল ইসলাম
▪️প্রকাশনী : অন্যধারা
▪️প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৪
▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২০৮
▪️মুদ্রিত মূল্য : ৫২০ টাকা
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২/৫