উপমহাদেশে জনপ্রিয় নেতা অনেকেই ,কিন্তু মহান নেতার সংখ্যা অতি অল্প। মাওলানা ভাসানী সেই অল্প সংখ্যক মহান নেতার একজন। বৈচিত্র্যময় ও ঘটনাবহুল তাঁর দীর্ঘ জীবন।তাঁকে অনেকের কাছে থেকে দেখেছেন অগণিত মানুষ। তাঁদের অনেকের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে তাঁর জীবনের অনেক অজানা দিক। এই বইয়ের টুকরো টুকরো কাহিনীগুলো শুধু আকর্ষণীয় নয়, মাওলানা ভাসানীর রাজনীতি বোঝার পক্ষেও তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যক্তি ভাসানী ও রাজনীতিবিদ ভাসানীকে জানতে আজো অজানা এই ঘটনাগুলোর আর কোনো বিকল্প নেই। শুধু অসাধারণ পাঠক নন, লেখক ও গবেষকদেরও এ গ্রন্থ অবশ্যপাঠ্য।
Syed Abul Maksud (Bangla: সৈয়দ আবুল মকসুদ) was a Bangladeshi journalist, columnist, research scholar, essayist, and writer. He was acclaimed for his critical and research work. His essays on literature, society, culture, and politics are much appreciated for his clear view, lucid language, and simple style. He carried out substantive research works on the lives of famous litterateurs such as Rabindranath Tagore, Buddhadeva Bose, Mohandas Karamchand Gandhi, Syed Waliullah, etc. His Journal of Germany is a popular travel book. In 1995 he has been awarded the Bangla Academy Award for his contributions to Bengali Literature.
একবার এক নেতা মওলানা ভাসানীর সামনে তাকে খুশি করার জন্য অতিরিক্ত প্রশস্তি শুরু করলে ভাসানী বলেন, শোনো মিয়া, আল্লাহ বলেছেন, 'হে মানুষ, তোমরা আমারে প্রশংসা করো বা না করো আমি আছি।'
কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গ্রামে ঘুরতে যেয়ে ভাসানী বলেন, " ব্যানার্জি বাবু এখানে এসে একটা স্মৃতি মনে পড়ছে। তারাশঙ্কর বললেন, কী স্মৃতি? মওলানা বললেন, এই গ্রামে অনেক ঘর হিন্দু ছিল। এখানে কোনো কোনোদিন সন্ধ্যার পর খোল-করতাল বাজিয়ে কীর্তন হতো। নানান উপলক্ষে কোনোদিন সারারাত কীর্তন ও নাম-সংকীর্তন গাওয়া হতো। তখন গ্রামগুলোতে একটা প্রাণ ছিল। হিন্দুরা চলে গেল। সেই কীর্তন আর শোনা যায় না। প্রাণহীন হয়ে গেছে পল্লীগুলো।" এ থেকে ধর্মপ্রাণ মওলানার অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শহিদ আসাদকে নিয়ে আরেকটা ঘটনা এমন,
"আসাদ বামপন্থী রাজনীতি করলেও ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন বিশ্বাসী এবং ধর্ম পালন করতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়তেন। মওলানা নিজে যেহেতু ছিলেন ধর্মপরায়ণ, সুতরাং তাঁর ধর্মপালনের কথা শুনে খুশি হবেন সেটা ভেবে আসাদের বড় ভাই (তার মৃত্যুর পর) একবার মওলানাকে বলেন, 'আসাদ খুব ধার্মিক ছিল। সে নিয়মিত নামাজ পড়ত।' এ কথা শুনে মওলানা বললেন, 'নামাজ তো অনেকেই পড়ে। নামাজের জন্য আসাদ বড় না। যারা নিয়মিত নামাজ পড়ে তাদের চাইতে আসাদ অনেক বড়। সে বড় অন্য কারণে, কারণ আসাদ মানুষকে ভালোবাসত।' আসাদের সংগ্রামী জীবনের মূল্যই ছিল তাঁর কাছে বেশি। কারো ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে তিনি প্রশ্ন করতেন না।" সবচেয়ে মজা পেয়েছি এই ঘটনা পড়ে -
"১৯৫৪ সালের নির্বাচনের কিছু আগে বা পরে লাহিড়ী মোহনপুর থেকে মওলানা ভাসানী তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে পাবনার শাহজাদপুরে যাচ্ছিলেন নৌকায়। শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের জনসভা ছিল। সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন অলি আহাদ, আবদুল মতিন, রণেশ মৈত্র, খুলনার মাহমুদ আলম খান, যিনি মুকু ভাই বলে পরিচিত ছিলেন, সত্তরের দশকের শেষ দিকে সাপ্তাহিক 'স্বাধিকার' প্রকাশ করেন এবং আরো কেউ কেউ। শাহজাদপুরে তাঁরা যাচ্ছিলেন নৌকায়। মওলানা যে আসবেন সে খবর আগেই জানাজানি হয়ে গিয়েছিল নদীতীরের গ্রামগুলোর মানুষদের মধ্যে। নৌকা থেকে মওলানার সহকর্মীরা অনেক দূরে থাকতেই লক্ষ্য করেন, নদীর তীরে অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে কোনো কিছুর প্রতীক্ষায়। কাছে আসতেই তারা হাত উঁচিয়ে নৌকা থামায়। মওলানাও সঙ্গীদের বলেন, শোনো তারা কী বলে। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই গ্রামবাসী শিশি-বোতলে পানি নিয়ে মওলানাকে 'পানি পড়ে' দিতে বলেন। তিনি দোয়া পড়ে অনেকের বোতলের পানিতে ফুঁ দেন।মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং মওলানার তাড়া থাকায় তিনি তাঁর সহযাত্রীদের বলেন, তোমরাও একটু ফুঁ দিয়ে দাও। রণেশ মৈত্র অবাক হয়ে বলেন, হুজুর আমাদের ফুঁতে কি কাজ হবে? তারা চাইছে আপনার ফুঁ। মওলানা বলেন, ওরা আশা করে এসেছে। দিয়ে দাও ফুঁ। সবার ফুঁতে একই কাজ হয়।"
মওলানার জীবনে ঘটে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা, যা তার জীবনদর্শন, মানসিকতা, অভিজ্ঞতা ও বাঙালির মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান তুলে ধরে ; সেগুলো নিয়ে বইটি লিখেছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। আনন্দ পেয়েছি পড়ে।
মওলানা ভাসানীর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানার জন্য দারুন সহায়ক একটা বই। পাশাপাশি তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড, সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের মানুষের সাথে তার সম্পর্ক কেমন ছিলো সে সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়।।
মানুষ মওলানা ভাসানী,পীর মওলানা ভাসানী,রাজনীতিক মওলানা ভাসানী, 'Prophet Of Violence ' মওলানা ভাসানী, বামপন্থী মওলানা ভাসানী - এতো সবকিছুর মিশ্রণে কেমন ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী? তাঁরই দীর্ঘ জীবনের নানা মাত্রিক স্মৃতি নিয়ে মওলানার এক ভক্ত সৈয়দ আবুল মকসুদের গুরুকে বন্দনার উদ্দেশ্যে, ভাসানী বন্দনা বয়ানে আবুল মকসুদের এই বই একপাক্ষিক বটে। কিন্তু মওলানা ভাসানীকে নিয়ে জানার আগ্রহকে জাগিয়েও দেয় এই বই।
এই বইটি শুধু একজন রাজনীতিকের জীবনী নয়—এটি একটি আদর্শিক যাত্রার অনন্য দলিল। বইটিতে মাওলানা ভাসানীর জীবনের অসাধারণ কিছু টুকরো ঘটনা অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে, যা পাঠককে তৎকালীন সমাজ, রাজনীতি ও বাস্তবতার গভীরে নিয়ে যায়।
বইটির একটি বিশেষ অংশে মাওলানা ভাসানীর কাছে এক নেতা জানতে চেয়েছিলেন,"মানুষ যদি আপনাকে প্রশংসা না করে?" জবাবে ভাসানী বলেন, *“আমি ভাসানী আছি, প্রশংসা করলেও আছি, না করলেও আছি। চাটুকারিতা জিনিসটা ভালো না।”
এক অধ্যায়ে মাওলানার সহকর্মী আসাদ সম্পর্কে বলা হয়েছে—তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। কিন্তু মাওলানা বলেন, “নামাজ তো অনেকেই পড়ে। নামাজের জন্য আসাদ বড় না। সে বড় এজন্য, কারণ সে মানুষকে ভালোবাসত।”এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, মাওলানার কাছে ধর্ম মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ।
বইটিতে মাওলানার রাজনৈতিক দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ব্যক্তিগত নীতিশুদ্ধতা এবং ধর্মের প্রতি তাঁর মানবিক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর বিপ্লবী মনোভাব, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক, এবং রাজনীতিকে জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের বিশ্বাস—সবই পাঠককে গভীরভাবে ভাবায়।
'ভাসানী কাহিনী' বইটি ইতিহাস, রাজনীতি ও মানবিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এটি শুধু জ্ঞানবর্ধকই নয়, বরং অনুপ্রেরণাদায়কও। যারা সত্যিকারের নেতৃত্ব, সততা ও আদর্শের খোঁজ করেন—তাঁদের জন্য এই বইটি অনন্য এক পাঠ্য অভিজ্ঞতা।
মাওলানা ভাসানীর সম্পূর্ণ জীবন বৃত্তান্ত জানা সম্ভব নয়, সৈয়দ আবুল মকসুদ অনেক চেষ্টার পর যতটুকু জানা যায় ভাসানী চরিত ও মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বই থেকে। তারপরও কিছু ঘটনা এবং উক্তি উক্তি বৃত্তান্ত নিয়েই এই বই ভাসানী কাহিনী
কয়েকটি আকর্ষণীয় ঘটনার বিবরণ থাকলেও সার্বিক ভাবে কালের পরম্পরা না থাকা, ঘটনার বৈচিত্র্য অনেকটা বিচ্ছিন্নতায় রুপান্তরিত হয়েছে। সাধারণ পাঠক হিসেবে ভালো লাগেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।