মুখোশের এক জনপদে চিরকালের জন্য পালটে গেছে বিক্ষোভের ধারা, মুখোশের জন্যই। ঝড়ের রাতে একদল অস্ত্রধারী মেতে উঠেছে ষড়যন্ত্রে। নির্জন এক বাংলোয় কয়েকজন মানুষ আটকে গেছে খুনের দায়ে। বুলেট, বিপ্লব আর বৃষ্টির ওই ব্যালেরিনা মিলে যাচ্ছে কোন বাস্তবতায়? আদৌ কি সেই বাস্তবতাকে ধারণ করা সম্ভব গোয়েন্দা-উপন্যাসে? মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত উপন্যাসে আছে চেনা এক জনপদের সেই অচেনা বাস্তবতার কাহিনি।
Shuhan Rizwan is from Bangladesh. His debut novel, a historical fiction named 'সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ (Knight in the Oblivion)' was published in 2015; since then, he published 3 more full-fledged novels. His novels often centered around the geo-political nuances and predicaments of life in contemporary Dhaka.
Apart that, Shuhan is a screenwriter too, and the recipient of Chorki Best Screenplay Award-2022.
Being a Mechanical Engineering Graduate, Shuhan choose to be a fulltime writer since 2020. Now when he is not writing in his muddled studio, he spends most of his time reading, traveling with his wife and watching sports events.
২০২৪ এর বইমেলায় আমার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বই ছিলো "মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত।" প্রত্যাশা তৈরি হওয়ার কারণ লেখকের আগের উপন্যাস "গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে।" কিন্তু হতাশ হতে হোলো। গ্রাফিতি আর মুখোশের দিন দুটোই নিরীক্ষাধর্মী লেখা। গ্রাফিতিতে নিরীক্ষা গল্প বলার ক্ষেত্রে বাঁধা তৈরি করেনি, বরঞ্চ সৃষ্টি করেছিলো অভিনবত্বের। গ্রাফিতিতে ফ্ল্যাশব্যাক, ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড, ডায়েরি, বক্তৃতা, বইয়ের উদ্ধৃতি, স্বগতকথনের ব্যবহার আছে। এতে গল্প পড়তে, বুঝতে বা রসাস্বাদন করতে কোথাও সমস্যা হয়নি। বরং এসব নিরীক্ষা কাহিনিকে সুসমন্বিত রূপ দিয়েছিলো। মুখোশের দিনেও নিরীক্ষা আছে কিন্তু তা গল্পে স্পিডব্রেকার হিসেবে কাজ করেছে, এতোটাই যে, একটা সময় গল্প একদম থমকে গেছে বলে মনে হয়েছে।অতীতের এক ছাত্র আন্দোলন গল্পের সূচনাবিন্দু। এর রেশ ধরে ভবিষ্যতের এক খুনকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়েছে। প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত বেশ ভালো লাগছিলো পড়তে, যতোক্ষণ না "নিরীক্ষা" শুরু হচ্ছে।
কাহিনিতে যখনই গতি আসছে তখনই স্পিডব্রেকারের মতো উপস্থিত হচ্ছে কোনো নিরীক্ষা। দুইবার এসেছে কাল্পনিক কথোপকথন। কাজীদা আর শরদিন্দুর মধ্যে বাংলা থ্রিলার সাহিত্যের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা নিঃসন্দেহে আগ্রহ জাগানিয়া কিন্তু উপন্যাসের মাঝখানে এই কথোপকথন পীড়াদায়ক।
লেখক কাহিনির মাঝপথে বলছেন, "গোয়েন্দা উপন্যাসের উপাদান নিয়ে আমি লিখতে চাই ধ্রুপদি উপন্যাস।" গোয়েন্দা গল্পের সাথে কালোত্তীর্ণ হওয়ার কোনো বিরোধ আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। বহু থ্রিলার আছে যা কালজয়ী সাহিত্য বলে বিবেচিত। এজন্য এটা আলাদাভাবে উল্লেখের কী প্রয়োজন আছে তা বোধগম্য নয়।
এবারও গল্পের নায়ক সুহান রিয়াসাত যা লেখকেরই আরেক সত্তা। উপন্যাসের নায়কও থ্রিলার লিখছে এবং ক্রমাগত কৈফিয়ত দিচ্ছে যে সে কেন থ্রিলার লিখছে। প্রশ্ন হচ্ছে - কেন এই ক্রমাগত কৈফিয়ত? কেন এই অপরাধবোধ? "থ্রিলার"কে অনেক "মহান" সমালোচক ও পাঠক সাহিত্য পদমর্যাদা দিতেই রাজি নয়। সেটা তাদের অভিরুচি। ব্যক্তিগতভাবে থ্রিলার পড়া আমি খুবই উপভোগ করি। একজন লেখক কী লিখবেন তা তার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। থ্রিলার লেখার জন্য এই বারবার কারণ দর্শানো অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ঠেকেছে।
মূল কাহিনির ব্যাপারে আসি। "মুখোশের দিন" বা ছাত্র আন্দোলন হচ্ছে উপন্যাসের সেরা অংশ। সুহান কাল্পনিক ঘটনার আড়ালে কোন আন্দোলনকে ইঙ্গিত করছেন তা সহজেই অনুমেয়। এই অংশ দারুণ হলেও সংক্ষিপ্ত। আমার মনে হয়েছে, এ বিষয়ে লেখক পূর্ণাঙ্গ ও অসাধারণ উপন্যাস লিখতে পারতেন।
"বৃষ্টির রাত" দীর্ঘ; আক্ষরিক ও রূপক দুই অর্থেই। রহস্যময় এক খুনকে কেন্দ্র করে ঝড়জলের রাতে একদল মানুষের আটকা পড়া ও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ টানটান উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারতো কিন্তু কেন হয়নি তা শুরুতেই বলেছি। নিরীক্ষা বাদ দিলেও গল্পের "কে কেন কীভাবে" সব অংশই দুর্বল। তাই রহস্য উদঘাটিত হওয়ার পর মনের কোনো হেলদোল টের পাই না। সার্বিকভাবে, "মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত" এর কিছু অংশ ভালো লাগলেও সবটা মিলিয়ে হতাশ। লেখকের পরবর্তী উপন্যাসের জন্য আগের মতোই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকবো।
শোনা যাচ্ছে, সুহান রিজওয়ানের এবারের একুশে বইমেলা (২০২৪) এ প্রকাশিত “মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত” নাকি একটা “থ্রিলার” (Thriller) ঘরানার বই। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে যারা লিখছেন তাদের মধ্যে সুহান আমার অন্যতম পছন্দের লেখক। সুহান প্রতি বইতেই চেষ্টা করেছেন আলাদা আলাদা জনরায় কাজ করার, যেটা একজন লেখকের জন্য অলরেডি আমার কাছে মনে হয় খুবই ambitious choice। তবে বিশ্বসাহিত্যের বেশ বড় মাপের কিছু লেখকদের যে এমনটা করতে দেখিনি তা নয়, হয়তবা সুহান এমন কারো দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবেন। তাই এর আগে historical fiction, dystopian আর postmodern উপন্যাসে হাত পাঁকিয়ে এবার thriller লেখার চেষ্টা করছেন। থ্রিলার যে বাংলাদেশে আর কেউ লিখছে না এমন নয়, অনেকেই লিখছেন। এমন কি ক্লাসিক ধারার কোন কোন লেখকেরও (এ মুহুর্তে মনে পড়ছে আবু ইসহাকের “জাল” উপন্যাসটা) থ্রিলার গল্প-উপন্যাস লেখার নজির আছে। আমার মতে, আর আমার ধারনা আপনারাও একমত হবেন, একটা লেখা ক্লাসিক বা থ্রিলার হওয়া কোন mutually exclusive ব্যাপার না।
আলোচনা আপাতত সুহানের বইতে সীমাবদ্ধ রেখে চলেন আমরা দেখি কোন বই-মুভি গুলোকে আমরা সাধারণত থ্রিলার তকমা দিয়ে থাকি। একেবারে উইকিপিডিয়ায় পাওয়া সংজ্ঞা থেকে যদি বলি, থ্রিলার হল এমন ধরনের গল্প-উপন্যাস বা সিনেমা যেখানে ক্রাইম তো থাকবেই, সাথে আসতে পারে স্পাইয়নেজ, আধিভৌতিকতা, গোয়েন্দাগিরি ইত্যাদি। থ্রিলারে সচারাচর আমরা রহস্য পাব, রোমাঞ্চ ও পাব (দুটা এক নয়, এই বই পড়েই প্রথম জানতে পারলাম), থাকবে সাসপেন্স, চমক আর সোজা বাংলায় (!) “থ্রিল”। কোন বইতে “থ্রিল” এলো কি না এটা আর কেউ কিভাবে মাপেন জানি না, আমি বুঝি যে, যে বই পড়ার সময় “তারপর কী হলো?!”, “তারপর কী হলো”র চাপে আমি বইটা হাত থেকে নামাতে পারিনা, ওটাই আমার মতে “থ্রিল”।
“মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত” – এই interesting নামের বইটা মোটামুটি ৩০০ পেইজের। বইটা তিন পর্বে ভাগ করা, তবে পর্ব গুলোর বিস্তৃতি সমান নয়। যেমন – বইয়ের প্রায় অর্ধেক হল প্রথম পর্ব, এরপর বাকি ১২০ পেইজের মত দ্বিতীয় পর্ব, শেষ ৩০ পেইজ শেষ পর্ব। প্রথম পর্বে মনে হবে, সুহান দাবার বোর্ডে কেবল ঘুটি সাজিয়ে চলেছেন। একেরপর এক চরিত্র আসতে থাকবে। আসবে আড়িপাতা বিভাগের উপপ্রধান হায়দার হোসেন, স্কুলের ব্যাকবেঞ্চার ছাত্র খাজা আহসানুল্লাহ, আসবে মমিনুল হক, মতিন মীর্জা, জিনিয়া রশীদ, ইমরুল কায়েস, উপস্থাপিকা শারমিন, সরকারি কর্মকর্তা জাকিয়া, বিচারপতি মণীশ চক্রবর্তী একে একে সবাই। এ পর্যায়ে তো মনে হল ভুলে ফোনের ডিরেক্টরি কিনে এনেছি বোধহয়! একেরপর এক নাম আর মনে থাকে না! এক অধ্যায়ে কেউ “মাস্ক টুয়েন্টি টু” আন্দোলন করছে, তো অন্য অধ্যায়ে কেউ শান্তিপ্লাটুনের কোন অভিযান চালাচ্ছে, কেউ বা শহর থেকে অনেক দূরের এক বাংলোতে নৈশভোজের নিমন্ত্রণে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছে। এতো চরিত্রের এতো কাহিনি আবার মাঝে মাঝে পেছনের পাতা উলটে উলটে মনে করতে হচ্ছে। তবুও খারাপ লাগছে না। কারনটা ধরতে পেরেছেন বোধ হয়। হ্যা, থ্রিলার গল্পের সেই চিয়ায়ত trope – Anticipation। কী এক অজানা আশঙ্কার সম্ববনা ততক্ষণে ছড়িয়ে গেছে পাঠকের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এভাবেই চলবে প্রথম পর্ব, চলতে থাকবে ঘুটিদের প্রাথমিক চাল পর্ব। প্রায় পর্বের শেষের দিকে আসবে সেই অমোঘ মুহুর্ত, আমরা “থ্রিলার” গল্পে যাকে বলি “Culmination”।
প্রথম পর্বে যদি ছিপ গিলে ফেলেন দ্বিতীয় পর্বে আসতে আসতে দেখবেন ছিপে আপনাকে ভালই খেলাচ্ছেন লেখক। এবারে চিরায়ত “থ্রিলার” উপন্যাসে আমরা যা দেখে অভ্যস্ত তার বাইরেও অনেক কিছু দেখব। কথা বলবে লাশেরা, দেখব থ্রিলার নিয়ে কথা বলছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় আর কাজী আনোয়ার হোসেন। আবার আমরা ঢুকে যাব রহস্যের তিন মহারথী – এডগার অ্যালান পো, হোর্হে লুই বোর্হেস আর আলফ্রেড হিচককের কথোপকথনে। প্রিয় লেখকদের প্রতি সুহান রিজওয়ানের এটা কী এক ধরনের homage? আবার এই পর্বেই আমরা দেখব প্রথম পর্বের ঘটনা গুলোর সুতো একটার সাথে অন্যটাকে কিভাবে লিংক করবে। এইক্ষেত্রে আবার সুহান রিজওয়ান “থ্রিলার” লেখার পরীক্ষায় উতরে যাবেন – বোম ফাটানোর কিছু চমক (surprise) ���িয়ে আসবেন এ দফায়।
তৃতীয় পর্বের কাহিনি মোটামুটি সরল। খানিকটা epilogue ধারায় চলবে এর ঘটনা। উপন্যাসের শেষটায় গিয়ে পাঠক কি একটু হতাশ হবেন? যে অংক মিলিয়ে দেয়ার মতন করে লেখক কেন কাহিনিটা মিলিয়ে দিলেন না যুক্তির মারপ্যাঁচ কষে? আমার মনে হয় তা হবেন না। কারন থ্রিলারের কাছে প্রতিশ্রুত সবকিছু আপনি পেয়ে গেছেন ততোক্ষণে। এটাও হয়ত এক রকমের সমাপ্তি যেখানে আমাদের গোয়েন্দারা নায়কের বেশে বেরিয়ে আসেন না, তারা এখানে আরও বেশি মানবিক, আরও বেশি কাছের মানুষ।
উপন্যাসের ত্রুটি যদি বলি তা হচ্ছে দু -একটা loose end – যেমন দু - একজন চরিত্র কেন আসল, কেনই বা গেল, এদের কাহিনি কী হল তা জানা গেল না। ওদেরকে মনে হয় না আনলেও চলত। আবার Metafiction স্টাইলে লেখা – এইটা “গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে”তে পুরনো হয়ে গেছে, যদিও overuse স্বত্বেও ব্যাপারটা এতটুকু misuse মনে হয়নাই। পরিশেষে এই বই থেকে আমার প্রিয় একটা লাইন তুলে দিচ্ছি-
“একটা কথা বলি – কিছু মনে কইরেন না। আপনারা যারা রহস্য-গল্পের পাগলা ভক্ত; তাদের প্রত্যেককেই আমার বিশাল চিড়িয়া বলে মনে হয়! সারা জীবন আপনারা রু-মর্গের হত্যাকান্ড নিয়ে ঘোরেন; অথচ ইয়াসমিন, তনু কিংবা সুবর্ণার হত্যা রহস্য ভুলতে আপনাদের এক মিনিটও লাগে না!”
বই এর ইমপ্যাক্ট কে দুই ভাগে লেখক ভাগ করে দিয়েছেন। এক উপন্যাসের সকল কিছু, দুই থ্রিলার লেখা নিয়ে লেখকের জাস্টিফিকেশান। আর এখানেই দুই দল ভাগ হয়ে গেছে। যার কারনে রেটিং এ এত বৈষম্য!
রহস্যকাহিনী আমরা কেনো পড়তে এত ভালোবাসি, এর ভালো উত্তর আরেকটি প্রশ্ন দিয়ে দেওয়া সম্ভব। কখন আমরা রহস্যকাহিনী পড়তে ভালোবাসি? সম্ভবত, যে কোনো সময়।
অবসর পাওয়া মাত্রই যে বই হাতে উঠিয়ে নেওয়া যায়, আর নিজেদের চেনাজানা জীবন থেকে কিছু সময়ের ছুটি মেলে - এমন বই ও সিনেমার একটা সূত্র আছে। হত্যা, রাহাজানি, অপরাধ - এসব সমাজেরই অংশ, কিন্তু রহস্যকাহিনীর যে অপরাধ আর সমাধানের জগত, সেটি কিন্তু চেনা জগত থেকে জন্ম নিয়েও এক ধরণের অতিকাল্পনিক বাস্তবতায় আমাদের নিয়ে যায়, আমি যাকে বলতে ভালোবাসি কোজি বাস্তবতা।
অর্থাৎ, গল্পে হালকা থেকে গাঢ় সব রকমের বীভৎস ঘটনা ঘটে চলবে, কিন্তু পাঠক নিশ্চিত থাকবেন অপরাধী ধরা পড়বেই, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবেই এবং সেই যাত্রায় নায়কের সাথে সাথে পাঠকও সেই ন্যায়বিচার করার আনন্দ পাবেন। আমাদের জানা আছে বাস্তবে এমনটা হয় না, কিন্তু যে কোনো রহস্যকাহিনীতে এটা হয় - এমনকি হ্যানিবাল লেকটারের মতো খুনিও যখন অপরাধীর মগজ রান্না করে অপরাধীকেই খাইয়ে দেয় - সেটা আমাদের এক রকমের পোয়েটিক জাস্টিসের গোপন আনন্দ দিতে পারে।
পাশাপাশি, এই দুরন্ত ন্যায় বিচারের কল্পজগত যে কারণে আমাদের এত পছন্দ, একই কারণ একে অনেক দিক দিয়ে সীমাবদ্ধও করে। যে সাহিত্য নিশ্চিতভাবেই পাঠককে একটা সমাধান বা রেজুলুশন দিতে বদ্ধ পরিকর - তার সীমানাটা সে নিজেই টানে, অন্য যে কোনো সম্ভাবনা লেখক না চাইলেও খাটো হয়ে আসে। আমার মনে হয় না, এতে রহস্যকাহিনীর পাঠক ও লেখক কারও কোনো সমস্যা হয়।
তবে কিনা, এই প্রশ্নগুলো সারা বিশ্বেই খোদ সাহিত্যের পাঠক ও লেখকেরাই নিজেদের বারবার করেছেন - আর তাই থ্রিলার সাসপেন্স হু ডানিটের আধুনিক পৃথিবীতে আমরা দেখি জন্ম হয়ে গেছে এক রকমের স্পেকুলেটিভ ফিকশনের, যেখানে লেখক রহস্যকাহিনীর সাথে মিশিয়ে দেন মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সাহিত্যিক উচ্চাকাংখ্যা, শক্তিশালী চরিত্র নির্মাণের পাশাপাশি এসব বইয়ে মিলে যায় দর্শন, রাজনৈতিক বক্তব্য ও হিউম্যান কন্ডিশন নিয়ে অবধারিত নানাবিধ প্রশ্ন।
সুহান রিজওয়ানের 'মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত' তেমনই এক স্পেকুলেটিভ ফিকশন, যেখানে কেন্দ্রে আছে চিরাচরিত হু ডানিটের ঘটনা প্রবাহ, আর তার ক্রীড়নক হিসেবে একটা ডিস্টোপিয়ান রাষ্ট্র, সামরিক ক্যু এবং একটা ছাত্রআন্দোলনের ভূত।
বইটা পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করি, একটা নিটোল কাহিনী বলা সুহানের উদ্দেশ্য নয়। একদিকে আমরা যেমন দেখি ক্ষমতাবানদের হাতে কীভাবে যে কোনো গণআন্দোলন দলিত হয়ে যায় - যা আসলে বাংলাদেশেরই সাম্প্রতিক অতীতকে মনে করিয়ে দেয়, এবং এই দমন পীড়নের ফাঁকা জায়গাগুলো কীভাবে খোদ ক্ষমতাকেই আরও পতনের দিকে নিয়ে যায় - সেই চিত্রের আভাসও মেলে। এবং, অতীত বর্তমানের সংযুক্ত ঘটনাপ্রবাহকে সঙ্গে নিয়ে সুহান মূলত এগিয়ে যেতে চান রহস্য উপন্যাস ও থ্রিলার সাস্পেন্স নিয়ে নিজস্ব একটা বোঝাপড়ার দিকেও।
অর্থাৎ, রহস্যকাহিনী কেনো আমাদের একইসাথে মুগ্ধ করে ও বোকা বানায়, কেনো এর ফাঁকিটা ধরতে পেরেও আমরা একে ভালোবাসি - একজন সচেতন লেখক এই ফাঁকি বা খুঁতগুলো সাথে নিয়েও অপরাধ প্রবৃত্তির জগত নিয়ে জরুরি কিছু লিখে উঠতে পারেন কিনা - সুহানের ডিসকোর্স এ সব প্রশ্নকেই ডিল করতে চায়।
যদি এ উপন্যাসের কাহিনীর দিকে তাকাই, সেটি সরলাংকের। তবে চরিত্রগুলো সাদামাটা নয় - এরা উঠে আসে তাদের অতীত ও বর্তমানের মিশেলে - এই জায়গাটিতে সুহান এক কমেন্ডেবল গ্রে এরিয়া তৈরি করেন - মনে হয় নিশ্চয় এরা গল্পে দারুণ কোনো ভূমিকা রাখবে। তখন আমার খেয়াল হয়, এর মাঝেই তিনি সমালোচনা করে ফেলেছেন রহস্যকাহিনীর পার্শ্বচরিত্রদের প্রাণহীনতা নিয়ে - যারা গল্পে আসেই কেবলমাত্র লেখকের ঘুঁটি হয়ে - একটা খুব সচেতন উদ্দেশ্যপূরণ ছাড়া যেন তাদের আগে পিছে আর কিছুই থাকে না বলার মতো। এবং, এ উপন্যাসের ধারাপাতেও আমরা দেখি চরিত্রগুলো রহস্যকাহিনীর সেই স্টেরিওটাইপ নিজেরাই এক হাতে ভেঙে ফেলে অন্য হাতে জোড়া লাগিয়ে নিচ্ছে। এবং, এখানেই চলে আসে এন্টিনভেলের উপাদান। নিজের সমস্ত আলাপ শেষে পাঠককে একটা মন মতো রেজুলুশনও যেন দিতে অস্বীকার করে এর চরিত্রেরা।
এসমস্ত উপভোগ্য দিকের পাশাপাশি উপন্যাসটির দুই জায়গায় সমালোচনার জায়গা দেখি আমি। প্রথমটি সোশিও পলিটিকাল। লেখক দেখাচ্ছেন ছাত্র আন্দোলনের কারণে পারমাণবিক কণা নিরোধক মুখোশ নির্মাতা শ্রমিকেরা পেশাগত বিপদে পড়ে, তাই ক্রোধবশত তারা বিভিন্নভাবে ছাত্রদের বিরুদ্ধে মবিলাইজড হয়, বুলি করে, এটাক করে। এই জায়গাটায় শ্রমীকদের ভিলেন মনে হয়, যা হওয়ার কথা না - আমি মনে করি এই প্লটলাইনকে একপেশে না রেখে এর ধূসর জায়গাটা কিংবা শাখের করাত পরিস্থিতির যথার্থ চিত্রায়ন করা সুহানের পক্ষে সম্ভব ছিল।
দ্বিতীয় সমালোচনা, ক্যু প্রসঙ্গে হায়দারের কর্মকান্ড ও অবস্থান যুক্তিযুক্ত লাগে না। তবে একে কেটে দেয়া যায় এন্টিনভেলের সূত্র ধরে - যেখানে প্রায় সমস্ত রহস্য কাহিনীর ফাইনাল এক্টে সকল লুজেন্ড মিলিয়ে দিতে লেখক আবির্ভূত হন সবজান্তা জাদুকরের মতো - হায়দারের যুক্তিহীন সিদ্ধান্ত হতে পারে সেই দিকটির প্রতি লেখকের করুণ বিমার।
সব মিলিয়েই, আমার মনে হয় বইটা এর অভ্যন্তরে উৎপাদিত রাজনৈতিক প্রশ্ন, আর ব্যবহৃত উপাদানগুলোর নিজেই নিজেকে কাটতে থাকার এক অভিনব মিথস্ক্রিয়া নির্মাণ করতে পারে - যা কখনও খুব আত্মকেন্দ্রিক, পাঠকের বিরক্তি জাগায়, আবার কখনও উত্তেজিত ও চিন্তিতও করে তোলে, ভাবায়।
খোদ আমাদের পাঠাভ্যাস নিয়ে ভাবনার অবকাশ আর অস্বস্তি উৎপাদনের কাজটা মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত হয়তো সার্থকভাবেই করে। ওসব মেনে নিতে আমাদের দ্বিধা যেমন থাকে, প্রশ্নগুলোও তো থেকে যায় - থাকা জরুরিও লাগে।
কখনও স্থির তো কখনও উত্তাল এমন এক ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দাঁড়িয়ে যখন হাওয়ায় গোত্তা খায় ‘পারমাণবিক কদম্বরেণুর ঘ্রাণ’, তখন আমাদের কাছে, 'মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত' উপন্যাসের বাস্তবতা স্পস্ট হয়ে আসে। উপন্যাস পড়তে পড়তে কোন প্রকার পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই আমরা পাই একটি ধ্রুপদী থ্রিলারের স্বাদ। বিশেষ কাব্যিকতা নয়, ঔপন্যাসিক গল্প শুরু করেন সিরিয়াল কিলারের মতো ধীর কিন্তু তীব্র বোধ নিয়ে.. ফলে, গল্পের শুরুতেই পাঠককে দিতে হয় বিশেষ মনোযোগ।
তিনটি ভিন্ন গল্প নিয়ে প্যারালালি ঔপন্যাসিক তৈরি করেছেন সুনিপুণ ফাঁদ। তিনটি ভিন্ন জগতের মানুষ ও তাদের মানবিক বোধ যখন আমাদের সামনে খুলে দেয় গল্পের দুয়ার তখন থ্রিলার নয় বরং শুরুতে আমাদের অন্তর্গত বোধের মাঝে খেলা করে ডিস্টোপিয়ান কোন উপন্যাসের ছায়া। এই ছায়াকে সঙ্গী করে, কোন দক্ষ এক ট্রাভেল গাইডের মতো ঔপন্যাসিক আমাদের হাঁটতে বাধ্য করেন চেনা পথ ধরে। পরিচিত গল্প আসে মেটাফোর হয়ে, আমাদের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ক্রমশ রুক্ষ দেবতার রূপ ধারন করলে, আমরা দেখতে পাই পরিচিত বৃক্ষও ছড়িয়ে দিয়েছে ডালপালা। এইসব ডালপালায় অ্যান্টিসিপেশনের নামে পরীযায়ী পাখির মতো বসতে তাই কোন দ্বিধা থাকে না।
অভ্যুথানের পরিকল্পনা দিয়ে যে যাত্রার শুরু তা আমাদের টেনে নিয়ে যায় ১৮ বছর আগে ঘটে যাওয়া কোন ছাত্র বিপ্লবের দিনে। তেজস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত নগরী আরও একটু বিষাক্ত হয়ে উঠলে, অপরিচিত চরিত্রগুলো পরিচিত আচরণ করতে শুরু করে। ঘূর্ণিঝড় অমঙ্গলের রাতকে ক্রমশই মনে হয়, হাজার বছরের সে’ই কাঙ্খিত রাত। উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টার যখন শেষ হয়, তখন ক্লিপ হ্যাঙ্গারে ঝুলে থাকতে থাকতে আমাদের মনে হয়, পরের চ্যাপ্টারের সমাপ্তি জানা খুব দরকার। এসব ক্ষেত্রে অবতার হিসেবে আবির্ভূত হয়, লেখকের চনমনে গদ্য.. ক্লান্তি নয় বরং প্রশান্তির বার্তা নিয়েই এই গদ্য দখল নেয় পুরো উপন্যাসের।
আড়িপাতা বিভাগ থেকে উঠে আসা চেয়ার কিংবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা নয়, স্টিম অব কন্সাসনেসের সাহায্য নিয়ে বারবার প্রথাগত উপন্যাসকে আক্রমণ করা লেখক সুহানকে সঙ্গত কারণেই আমাদের ভালো লাগে। আমাদের ভালো লাগে, কাজী দা থেকে শরদিন্দু কিংবা অ্যালেন পো, বোর্হেস ও হিচককের ক্যামিও রোল। পাঠককে মেন্টাল রিলিফ দেয়ার জন্য এরচেয়ে চমৎকার পন্থা হতে পারে না।
যখন আপনি থ্রিলার পড়ার জন্য মনস্থির করে বসবেন, তখন কোথাও ল্যুজ এন্ডিং কিংবা ল্যুপ হোল আছে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত হতেই হবে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, প্রথাগত থ্রিলারের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেও, সাসপেন্স সাসপেন্স খেলায় উৎড়ে গিয়েও ঔপন্যাসিক ফিনিশিং নিয়ে ছিলেন যথেষ্ট সচেতন। ফলে, চমক নয় একটি দার্শনিক জায়গায় পাঠককে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন বলেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই। তাই, হত্যা রহস্য আগেই উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার পরেও কিংবা আঁচ করতে পারার পরেও আমরা আগ্রহ নিয়ে পড়ে যাই বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত।
তবু কিছু কথা থাকে, যেমন ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে লেখক হয়তো আরও একটু সময় দিতে পারতেন .. যেমন সময় দিতে পারতেন সংকটের দিকগুলো নিয়েও.. সংকট ও পরণতি নিয়ে ভাবতে গিয়ে পাঠক হয়তো জাকিয়া আর সূবর্ণার মধ্যে সামান্য ক্লোনিংয়ের স্বাদ পাবে.. তবে, তা এতোটাই সূক্ষ্ম যা উপেক্ষা করাই যায়। কেননা, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে হায়দার হিসেবে আবিষ্কার করতে করতে পাঠকের হয়তো মনে পড়ে যাবে, কোন একদিন এই তেজস্ক্রিয়া বিস্তৃত নগরীতে বিপ্লব হয়েছিল, যা এনে দিয়েছিল আরও একটি ব্যর্থ বিপ্লবের বীজ.. কিন্তু, বিপ্লবী মাত্রই জানে, এই নগরীতে বিপ্লব কখনওই শেষ হয় না।
সুহান রিজওয়ান এর লেখার বেশ ফ্যান আমি। তাঁর অন্যান্য বই এবং ফেসবুকে টুকটাক লেখা পড়ে এই পছন্দটা জন্মেছে। আর সে কারণেই এই বইমেলায় মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত এর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। নামটা প্রথমে অদ্ভুত লাগলেও বইটা পড়ার সাথে সাথে নামকরণের কারণটা স্পষ্ট হতে থাকে এবং সত্যি বলতে বইয়ের সাথে মিলালে নামটা একেবারেই যুতসই। গল্পটা এখনকার চাইতে পরবর্তী সময়ের। সেই পরবর্তী সময়ের মাঝে আবার দুইটা টাইমলাইন। একটা ১৮ বছর আগেকার মুখোশ আন্দোলনের আর তারপরেরটা ১৮ বছর পর একটা বৃষ্টির রাতে হওয়া হত্যাকাণ্ডের। এই দুইটা কাহিনীর মধ্যে থ্রিলারের আবহ সৃষ্টির মাধ্যমে একটা যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। তার মধ্যেই আবার লেখক নানা ধরনের জনরা এক্সপ্লোর করেছেন। কিছুটা ধ্রুপদী উপন্যাস ঘরানার, কিছুটা থ্রিলার, কিছুটা ডিস্টোপিয়ান, কিছুটা ফ্যান্টাসি৷ শব্দও ব্যবহার করেছেন সচেতনভাবে, অমাত্য, সহায়ক যন্ত্র এসব শব্দের ব্যবহার একটা অন্যরকম ভাইব দেয়, কিছুটা সাইফাই ঘরানার ভাইব। উপন্যাসের কিছু অংশ মনে করিয়ে দেয় যে সবকিছুই ফিরে আসে বা এগুতে এগুতে একসময় আবার বোধহয় আদিমতা ফিরে আসে কিংবা আসলে মানুষ বোধহয় তার আদিম প্রবৃত্তি গুলো থেকে কখনোই বের হতে পারে না। এখন হোক বা ১০০ বছর পরে হোক। সব মিলিয়ে ভাবনাটা যে রীতিমতো ইউনিক তা স্বীকার করতেই হয়। উপন্যাসের টাইমফ্রেম যা-ই হোক না কেন, এখানে লেখক বর্তমান এবং অতীতে ঘটে যাওয়া অন্ধকার দিকগুলো প্রায়ই তুলে এনেছেন ফাঁকে ফাঁকে। আবার কেন হঠাৎ তিনি থ্রিলার লিখছেন তার উত্তরটাও সুহান রিয়াসাত নামে লেখক চরিত্রটির জবানে বলিয়েছেন৷ তাঁর নিজস্ব ভাবনায় থ্রিলার কেমন হওয়া উচিত, প্রচলিত মার্ডার মিস্ট্রিগুলোর কোন কোন দিক তাঁর কাছে ভালো লাগে না এসবও এসেছে। ব্যোমকেশ এবং শরদিন্দু, মাসুদ রানা এবং কাজী আনোয়ার হোসেন এদের প্রতি একবার হোমেজ ও এসেছে লেখাতে, যেটা বেশ ভালো লেগেছে। আরো এসেছে পো, হিচকক আর বোর্হেস এর মধ্যকার একটা চিত্তাকর্ষক কাল্পনিক কথোপকথন। তবে প্রদোষ চন্দ্র মিত্রকে ছোট করাটা আশা করি সুবর্ণা ইসলামই করেছেন, সুহান রিজওয়ান নন৷ কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক গোয়েন্দার সাথে কিশোরপাঠ্য একজন গোয়েন্দার প্লট এবং ভূমিকা একজন অর্বাচীন পাঠকের কাছে তুলনামূলক আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে, সুহান রিজওয়ান এর মতো বিদগ্ধ পাঠকের কাছে নিশ্চয়ই হওয়ার কথা নয়। সুহান রিজওয়ান এর অন্যান্য বইয়ের চাইতে এই বইটি নানা দিকেই অনেক আলাদা। নতুন নতুন ক্ষেত্র একজন লেখকের নিশ্চয়ই এক্সপ্লোর করা উচিত, আর তার মাঝেও লেখকের নিজস্বতা অনেকটাই রক্ষিত হয়েছে, বিষয়টা ভালো লাগার। গ্রাফিতিও এর মতো অবশ্য মুগ্ধ করতে পারে নি এটা আমাকে। ওই বইটার সাথে যতটা কানেক্টেড ফিল করেছিলাম এইটার সাথে ততটা না, সম্ভবত এইটাই মূল কারণ। আর শেষটা বোধহয় আরেকটু সংক্ষেপিতও করা যেত।
মুখোশের দিন বৃষ্টির রাতে লেখক একটা সময়কে ধরতে চেয়েছেন। সেই সাথে বর্তমানে প্রচলিত "থ্রিলার" জনরাকে প্রশ্ন করেছেন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে উঠিয়ে এনে সাহিত্যে ঠাঁই দেয়ার প্রয়াস চালি���়েছেন এবং সেই সাথে দেখিয়েছেন বাস্তবের সাথে বই কিংবা সিনেমা জগতের গোয়েন্দা গল্পের ফাক ফোকড়গুলো।পড়তে পড়তে মনে হয়েছে লেখক থ্রিলার জনরাকে ভাঙতে চেয়েছেন।
লেখক ‘কী’ লিখবেন এটা একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু ‘কী লিখেছেন’ সেটা যাচাই-বাছাই করার জন্য শ’ খানেক পাঠক অবশ্যই প্রস্তুত থাকবে এটাকে কাটাছেঁড়া করে একেবারে হাড়-মাংস ঠিক কীভাবে জোড়া দিয়েছে তা দেখার জন্য। আদতেই কী এর প্রয়োজনীয়তা আছে কি নেই—সেই বিষয় ভিন্ন। তবে ‘মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত’ নিরীক্ষাধর্মী লেখা হলেও লেখক সম্ভবত যে বিষয়টা উপলব্ধি করাতে চেয়েছেন, তা অনেক পাঠক/লেখকের পছন্দ হয়নি অথবা না হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি যে বার্তা উপন্যাসের মাধ্যমে দিতে চেয়েছেন, তা নিয়েই এ আলোচনা।
‘মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত’ (মুদিবৃর) মোটাদাগে সেই উপন্যাসটি নয়—যেটা আপনি আরাম করে পড়ে একটা তৃপ্তিকর ঢেঁকুর তুলে বলবেন ‘বাহ! দারুণ টুইস্ট অ্যান্ড টার্ন দিয়েছেন লেখক। এখানে আর ভাবনা-চিন্তা করার মতো কিছু নেই। যাই গিয়ে নতুন একটা বই পড়ি।’ অথচ এই ধারণাই আপনার ভুল প্রমাণিত হবে উপন্যাসটি পড়ার শুরুতে এবং শেষে এসেও। ‘গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে’ যারা পড়েছেন, তারা ইতোমধ্যে লেখকের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি খুব সম্ভব অনুধাবণ করতে সক্ষম হবেন। নতুন কিছুর সৃষ্টির পাঁয়তারা একজন লেখককে, অন্য একজন ‘একই ধারার’ লেখক থেকে ভিন্ন করে তোলেন। উক্ত উপন্যাসে লেখক ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তার একটু ভিন্ন ব্যাখ্যা দিই।
ক. লেখক এমন এক উপন্যাস লিখতে চেয়েছেন, যেখানে সকল উপদানের মিশ্রণ থাকবে। এবং তা অবশ্যই ছিল। বেশ ভালো পরিমাণে ছিল। যেমন: আপনি যদি রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল কোনো প্রেক্ষাপট খুঁজতে চান, যেখানে হর্তাকর্তারা সর্বেসর্বা—তবে অবশ্যই সেই প্লট পাবেন। তুমুল আলোচিত ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্রে রেখে যে পলিটিক্যাল গ্রাউন্ড তৈরি করে সেটাকে ডিস্টোপিয়ানের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন লেখক—তা প্রশংসনীয়। এখানে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ধরা দিলেও, লেখক সেটা নিয়ে খুব একটা তোয়াক্কা করেন না। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সময়কে যে উপজীব্য করে ডিস্টোপিয়ান লিখতে হবে এমন চিন্তুা-ভাবনা লেখকের ভেতর দেখিনি এ উপন্যাসে। ‘গ্রাপক’-এর ক্ষেত্রে একই বিষয় বলব। তিনি অতীতের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমানে গল্প বলতে পছন্দ করেন। মুখোশ সুরক্ষার দাবি নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে স্যাটায়ার তিনি লিখতে চেয়েছেন বটে কিন্তু সেটা টার্ন করে চলে যায় চারিত্রিক মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাবলিতে। যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। যেখানে একজন প্রাইভেট জব করা মানুষ, একজন গার্মেন্টস শ্রমিক, একজন ছাত্র, সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া, একজন অসহায় পড়ুয়া ছেলে... সবশেষে একজন সাংবাদিকের ওপর দিয়ে ঠিক কীরকম মানসিক ঝড়টা যায়—তা সুনিপণভাবে ফুটিয়ে তোলার যে যুক্তি—তা একেবারে খাপে খাপ বলা চলে।
এছাড়া অল্প শিক্ষা ও আয়ের মানুষগুলা মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করা মানুষদের যেভাবে ট্রিট করে থাকে... এ নিয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গি লেখক অবতারণা করেছেন... সেটাকে আমি একশ-তে একশ দিব নির্দ্বিধায়। সমাজের বিভিন্ন সেক্টরে ঘুরপাক খেয়ে যখন আপনি অভিজ্ঞতা লাভ করবেন তখন এমন একটা লেখার সাথে নিজের জীবন খুব গভীরভাবে রিলেট করতে পারবেন।
পশ, ধরি মাছ না ছুঁয় পানি টাইপের জীবন অতিবাহিত করলে এ উপন্যাসের গভীরে যাওয়া একেবারে পসিবল না। মাইন্ড ইট।
খ. ডিস্টোপিয়ানে মূল হলো রাজনীতি। কী উপদানে ডিস্টোপিয়ান গল্প লিখছে সেটা মূল বিষয় না। বিষয় হলো কতটুকু রাজনীতি মিশিয়েছে সেই গল্পে—তা পরখ করতে অথবা ধরতে পারাটা। আর এ উপন্যাসে কোনো কাল্পনিক সময় কিংবা জগৎ-কে টার্গেট না করে বাংলাদেশেরই, ঢাকারই একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে জাল তিনি বুনেছেন—তা করতে এবং লিখতে গাটস্’র জরুরত অবশ্যই আছে। এমনকি শেষে যখন লেখক, উপন্যাসেরই একজন লেখককে দিয়ে একজন প্রাক্তন ডিআইজি’র থেকে এমনতর উপন্যাস লেখার মতো মতামত চেয়ে বসেন—ব্যাপারটা তখন প্রহসনই লাগে। শুধু তা-ই না। এমন প্রহসন খুঁজলে আরও কয়েকটা পাওয়া যাবে। একটা জায়গায় একজন চরিত্রকে দিয়ে বলিয়েছেন,
‘আপনার প্রথম বইটা আমার খুব ভালো লাগছিল! কিন্তু পরেরগুলো — একটু কঠিন লাগছে! ... একটু সহজ করে লিইখেন না আমাদের জন্য!’
এবং গুডরিডস অথবা ফেসবুকে লেককের উক্ত বই নিয়ে যখন আপনি প্রতিক্রিয়াগুলো পড়তে যাবেন, দেখবেন মিশ্র সেইসব প্রতিক্রিয়া। এর পিছনে কারণও ব্যাখ্যা রয়েছে। এবং পাঠক সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হয়েছে কেন লেখক একটা গল্পের ফ্লো-তে ‘থ্রিলার’ বিষয়ক আলোচনা ঢুকিয়েছেন বিভিন্ন প্রয়াত শক্তিশালী চরিত্র দ্বারা।
গ. এই প্যারাটা সেই আলোচনা কিংবা সমালোচনার অংশ। এখানে আমি উপন্যাস পড়ে নিজের ব্যাখ্যাটা দিই। ‘মুদিবৃর’ উপন্যাস তিনটা ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ গল্পের মূল চরিত্র হায়দার, মতিন মীর্জা, ইকতিয়ার, শারমিন-সহ গুরুত্বপূর্ণ বহু চরিত্রের সমাগম দেখানো হয় ধীরে ধীরে। সেইসাথে ছাত্ররা কেন আন্দোলনে রাস্তায় নামে আর এতে জনসাধারণ ও রাজনীতি আমত্যদের কী কী অসুবিধা হয় সেই পার্সপেক্টিভ খুব বিস্তারিত ব্যাখ্যা হিসেবে দেওয়া রয়েছে। গল্পে হুক হতে এতেই যথেষ্ট। আরও একটা বিষয় বলে রাখা ভালো। লেখকের শোয়িং থেকে টেলিং মেথডে বলা বর্ণনা উপন্যাসে বেশ ভালোই গতি দেয়। এবং গতিটা সহজ-সরল। হুইচ ইজ ভেরি গুড।
এইবার আসা যাক দ্বিতীয় ভাগ বা পর্বে। যার কারণে অনেকে উপন্যাসটাকে অতটা পছন্দ করে উঠতে পারে নাই। নিরীক্ষাধর্মী লেখায় নিরীক্ষা কীভাবে আসবে তা একমাত্র লেখকই ভালো বলতে পারেন। এটার প্রেজেন্টেশন নিয়ে কোনো পূর্বধারণা দেওয়া হয় না। এখানে নিরীক্ষার বিষয়টা হলো ‘থ্রিলার’। লেখক আদতেই একটা থ্রিলার লিখতে চেয়েও লিখনেনি শেষ পর্যন্ত। এবং কেন লিখেননি তার ব্যাখ্যাটা এ প্যারা দিয়ে বুঝিয়ে দিই:
‘প্রথমে যেকোনো একটা রহস্য-গল্পের কথা ভাবেন। ধরেন, সেটা একটা মার্ডার-মিস্ট্রি। দেখবেন প্রত্যেক মার্ডার-মিস্ট্রিতেই কাহিনি একটা ছকের ভেতর আটকানো: শুরুতেই একজন লেখা খু ন হবে, তারপর একজন গোয়েন্দা সূত্র ধরে ধরে খুঁজে বের করবে কে—কীভাবে খুন করেছে। আর সব শেষে বিচারের আওতায় আনা হবে দোষী ব্যক্তিকে। এবং এই গোটা ব্যাপারটাই চলবে একটা সত্যিকারের আইনের শাসনযুক্ত পরিবেশে, যেখানে গোয়েন্দার ওপর বাইরের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রভাব খাটাতে পারবে না। তাহলে একটু চিন্তা করে দেখেন—যেখানে আইনের শাসন নাই, সেই পরিবেশে কীভাবে মার্ডার-মিস্ট্রির সমাধান করতে পারে কোনো গোয়েন্দা? রাজনৈতিক প্রভাব এড়িয়ে সেই দেশে কি খু নি কে আদৌ আইনের মুখোমুখি করা যায়?’
পুরো উপন্যাসের স্ট্রাকচারটা ঠিক এই বর্ণনার অথবা থিমের ওপর নির্ভর করে লেখা। এ কারণে শেষ পর্যন্ত এসে দেখা যায় উপন্যাসটা লেজেগোবরে হয়ে পড়ে আছে আর পাঠক হতাশ হয়েছে। অথচ এখানে হতাশার কিছু দেখছি না। যেটা ঘটার তা-ই ঘটেছে। অবশ্যই সেখানে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। যা গোঁজামিল হিসেবে মনে হয়। দেখা গেল ২০৯ পৃষ্ঠায় এসে আমি বুঝে নিলাম কালপ্রিট কে। কিন্তু লেখক যে ব্যাখ্যা দিলো সেটা জুতসই লাগল না। তবে মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখতে গেলে জুতসই। যে দু’জন পুরো কাহিনি ওলটপালট করে রেখে দিয়েছে, তাদের মৃত্যু—দুঃখ থেকে হতাশা জোগায় বটে। এর চেয়ে বেশি গভীরে আমি যেতে চাই না। কারণ লেখকেরই যেখানে কোনো আগ্রহ নেই কাহিনির সুতো বাঁধার, সেখানে পাঠক হিসেবে হাজার মাথা ফাটিয়ে আদতেই লাভ নেই। কাহিনিকে কাহিনির মতো গড়িয়ে যেতে দেওয়া ভালো।
ঘ. আলোচনার আরেকটু বাকি। থ্রিলার জনরা বহু বিস্তৃত। এবং লেখক যে ‘থ্রিলার’ নিয়ে আলোচনা করেছেন তা গোল্ডেন এইজের থেকে মাসুদ রানা, ফেলুদা ও বোমক্যাশ পর্যন্ত বর্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ অ্যালান পো থেকে শুরু করে ডয়েল, ক্রিস্টির সাথে সাথে স্বয়ং উঠে এসেছে শরদিন্দু, কাজী আনোয়ার হোসেন, সত্যজিৎ রায়-সহ অনেকেই। বোর্হেস, হিচকক’রা বাদ যায়নি। কথা কে কী বলেছে সেই বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। তবে থ্রিলার নিয়ে একঝাঁক লেখকদের পার্সপেক্টিভ থেকে যেসব আলোচনা উঠে এসেছে তা পড়তে খারাপ লাগেনি। বরং টক শো হিসেবে বিষয়টা উপভোগ্য। যেমন শরদিন্দুর বোমক্যাশ আমার পার্সোনাল ফেভারিট। লেখক এ চরিত্রকে দারুণ প্রশংসিত করেছেন। এছাড়া দ্যুঁপো থেকে শার্লক, পোয়ারো-সহ বহু গোয়েন্দার উত্থান এ তো সবারই জানা। পো’র দেখানো পথে ডিটেকটিভ নিয়ে লেখকরা বহুদূর হেঁটেছেন। ব্যতিক্রম ছিলেন ও-ই বোমক্যাশই। সে সত্যান্বেষী। তবে ‘তিন গোয়েন্দা’ নিয়ে কিছু আলোচনা আমি নিজ থেকে আশা করছিলাম। সম্ভবত রকিব হাসানের সাথে চাইলে সরাসরি সেই আলোচনায় লেখক যেতে পারেন। অথবা, আশা করি কখনও এ নিয়ে লেখক কিছু লিখবেন। যেহেতু পুরো একটা শৈশব আমাদের দারুণ রোমাঞ্চিত করে রেখেছিল কিশোর-মুসা-রবিনরা।
যা বলছিলাম, লেখক এখানে সমালোচনা যা করেছেন থ্রিলার নিয়ে তা খুবই সমান্য। এখানে ট্রিগার খাওয়ার মতো তেমন কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং যা বলেছেন তা দিনের আলোর মতো সত্য। তবে সবকিছুরই বিবর্তন ঘটে। তেমনই থ্রিলারও বিবর্তিত হয়েছে বহু। অনেক লেখক এ-ই বিবর্তনের অংশীদার। তারা আর পো’র দেখানো পথে হাঁটেনি। এখনকার পলিটিক্যাল, ক্রাইম, সাইকোলজিক্যাল, লিগ্যাল, টেকনোলজিক্যাল, অ্যাকশন, সুপারন্যাচারাল, মেডিক্যাল, মিলিটারি, ডিসাস্টার, আরবান-সহ প্রচুর থ্রিলার লেখা হয়। আক্ষরিক অর্থে সেইসব এখন আর একই ধাঁচের গোয়েন্দা গল্প হিসেবে থাকে না। বহুকিছুর মিশ্রণ হয়, নতুন তত্ত্বের সৃষ্টি হয়। কারণ লেখকরাও জানে বাস্তবে আইন-কানুন ঠিক কীভাবে কাজ করে। তাই এমনও দেখা যায় গল্প শেষে খু নি থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে অথবা যে ট্রমা থেকে সে কাজগুলো করেছে—তার জন্য পাঠকদের উলটো সিম্প্যাথি জমে।
এছাড়া, থ্রিলারের সাথে আজকাল কেবল গোয়েন্দারা লেগে থাকে না। সুপারন্যাচারাল, কসমিক থ্রিলারও এখনও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
তাই ‘মৃদিবর’ উপন্যাসটা একদিক থেকে কেবল আপনাকে একটা কাহিনিই উপহার দিচ্ছে না, তার সাথে সাথে বিস্তর থট উপহার দিচ্ছে। যা নিয়ে আপনি একান্তে কিছুক্ষণ হলে ভেবে এর একটা লজিক্যাল ব্যাখ্যা দাঁড়া করাতে পারেন।
ঙ. উপন্যাসে দর্শনের কমতি নেই। দারুণ সব দর্শন লেখক তুলে ধরেছেন বিশেষ করে মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে। এই উপন্যাস কারও কাছে পলিটিক্যাল থ্রিলার, কারও কাছে কিঞ্চিৎ ডিস্টোপিয়ান, কারও কাছে মার্ডার-মিস্ট্রি অথবা নেভার গুড এন্ডিং থ্রিলার মনে হলেও এটা আগাগোড়া একটা সাইকোলজিক্যাল জার্নি। যা তৃতীয় পর্বে নির্ধারিত হয়ে যায়। নিরীক্ষা হিসেবে জার্নিটা আমি উপভোগ করেছি। বহুবার বই হাত থেকে নামিয়েছি এসব নিয়ে চিন্তা করতে। তার ওপর লেখকের শব্দের গাঁথুনি খুবই যত্নশীল। একেবারে আয়েশ করে, ভেবে ভেবে যদি কেউ শব্দ বুনন করে বাক্য রচনা করে—তেমনেই। কেবল লেখার জোরে এ উপন্যাস শেষ করা যায়।
বলব না বইটা আপনাকে অবশ্যই পড়তে হবে। তবে আপনি কোনো একটা বিষয় নিয়ে লেখকের সাথে কাল্পনিক বাহাস করতে চাইলে, যেমনটা খোদ লেখক করেছেন কাল্পনিক বহু লেখকের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে, তাহলে হাতে তুলে নিতে পারেন। একটা ভালো পলিটিক্যাল সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট থেকে মার্ডার-মিস্ট্রি টপকে রাতে ‘অমঙ্গল’-এর তাণ্ডবে অবিরাম বারিধারার যে আবহ—তা দারুণ পুলকিত করতে বাধ্য। গল্পের ডিটেইলস নিয়ে আমি আর বেশিকিছু আলোচনা করতে চাই না।
শেষ একটা উক্তির মাধ্যমে লেখাটার সমাপ্তি টানা জরুরি।
‘বাস্তব তো আর ডিটেকটিভ গল্পের মতো না যে সবকিছু অঙ্কের মতো হবে! বাস্তবের কেইসে অনেক উত্তরই মিলে না, মামলা সাজানোর জন্য আমরা তখন ইসে করি—মিলায়ে দিই।’
‘মুদিবৃর’ উপন্যাসটা এমনই। এটি ধ্রুপদি কোনো সাহিত্য নয়, এটি আগাগোড়া একজন লেখকের চিন্তার খোড়াক অথবা বিশুদ্ধ বয়ান। এখানে সমাপ্তি খুঁজতে গেলে আপনি দারুণ হতাশ হবেন।
সহায়ক যন্ত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে একটি ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে। যে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়েছে, “ঘূর্ণিঝড় অমঙ্গল”। ঘূর্ণিঝড় অমঙ্গলের সাথে কারো কারো জীবনে নেমে আসছে ঘোর অমঙ্গল। যে অমঙ্গলের কালো ছায়া থেকে বেঁচে ফেরা প্রায় অসম্ভব। তবুও মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। অমঙ্গলের এই ঝড়ের রাতে জীবনের ঝড় থেকে বাঁচতে কি পারবে সেইসব মানুষ?
▪️কাহিনি সংক্ষেপ :
তেজস্ক্রিয়তা বড্ড ভয়াবহ জিনিস। একটি দেশ বা অঞ্চলকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে। ঘটনাটা আজ থেকে কত বছর পর, সেটা নাহয় নাই বা জানা হলো। এই তেজস্ক্রিয়তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশ ও সমাজ খুবই ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তেজস্ক্রিয়তারোধী মুখোশ পরা এখন যেন স্বাভাবিক কার্যক্রম হয়ে গিয়েছে। অক্সিজেন কিংবা পানি, মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রধান উপায় হলেও এখন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ রোধ করা সেসব মুখোশও জীবন বাঁচানোর প্রথম ও প্রধান উপকরণ। কিন্তু অধিক মুনাফা লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা কতটা নিচে নামতে পারে, তার চিত্র প্রতিনিয়ত এই অঞ্চলের মানুষ দেখেছে। আরও একবার নাহয় দেখল! নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহারের কারণে মুখোশ প্রতিনিয়ত ফুটো হয়ে যায়। ফলে তেজস্ক্রিয় জীবাণু মানুষের জীবননাশের কারণ হয়। এইবার একজন স্কুল ছাত্রের মৃ ত্যু সহ্য করা গেল না। প্রতিবাদ জানাতে ছাত্ররা নেমে এসেছে মাঠে। তাদের প্রবল প্রতিবাদ ও দাবীর মুখে শুরু হলো “নিরাপদ মুখোশ চাই” আন্দোলন।
কর্নেল হায়দার হোসেন স্বাভাবিকভাবে তার দৈনন্দিন কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে আছে। কেননা এতদিনের অপেক্ষা শেষ হতে চলেছে। নিজের অভ্যন্তরে যে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল, তার যবনিকাপাত ঘটানোর সময় এসেছে। সমন নিয়ে হাজির হয়েছে একজোড়া কবুতর। খেলা শুরু করতে তাই সময় নেওয়া যাবে না। নিজের ক্ষমতা আর বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জানান দিলো বার্তা সে পেয়েছে। যেভাবে পরিকল্পনা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই হোক সবকিছু। কী ঘটানোর পরিকল্পনা করছিল হায়দার? কার সাথে এ পরিকল্পনা? বড় কিছু ঘটবে কী?
“নিরাপদ মুখোশ চাই” আন্দোলন যেন হয়ে উঠেছে সর্বসাধারণের আন্দোলন। স্কুল না পেরোনো ছাত্রদের সাথে জনগণও একাত্মতা প্রকাশ করেছে। সহিংসতাবিহীন এই আন্দোলন যেন সবকিছুর আদর্শ। কিন্তু সব যে ভালোর দিকে যায় না। কোনো এক আমত্যর তীর্যক কথা আর বাঁকা হাসি আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো দাবানল ছড়িয়ে দেয় চারিদিকে। জোরদার হয় আন্দোলন। যেসকল কারখানা এসব মুখোশ তৈরি কো, তাদের ঘেরাও করার কর্মসূচির দিকে এগিয়ে যায় শিক্ষার্থীরা। পুলিশ জায়গা মতো ঠিকই থাকে। মুখোমুখি অবস্থানে দুইপক্ষ থাকার পর কোথা থেকে একদল মুখোশ পরিহিত যুবকশ্রেণী অতর্কিত আক্রমণ চালায়। ফলে ছাত্রদের আন্দোলন আর ছাত্রদের থাকে না। এই অনৈতিক আঘাতের কথা তুলে ধরতে কোনো সাং��াদিক নিহত হয়, কারো জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। কোনো সাধারণ ছাপোষা মানুষ কোনো ছাত্রকে বাঁচাতে গিয়ে বাসের তলায় পিষ্ট হয়। এভাবেই এক যৌক্তিক আন্দোলন হারিয়ে যায়। তারা হেরে যায় এক অসম লড়াইয়ে।
দেশের অভ্যন্তরে দানা বাঁধছে অসন্তোষ। শন্তিপ্লাটুনের বড় হর্তাকর্তারা তাই এক ধরনের অভ্যুত্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য রাষ্ট্রপতিকে গদি থেকে নামানো। সকল প্রস্তুতি শেষ। এবার কাজে নামার পালা। কিন্তু একটি ভুল পদক্ষেপ তাদের জীবনে নামিয়ে আনতে পারে বিভীষিকা। যদি কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে? তারা কি পারবে, তাদের লক্ষ্য পূরণ করতে? না-কি ব্যর্থ হবে এই অভিযান?
শহরতলীর অদূরে এক বাংলোতে বসছে পার্টির আসর। যার মূল কুশীলব সাবেক প্রতিমন্ত্রী মতিন মির্জা। এছাড়াও আছে একজন সাবেক জাস্টিস, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি। আরও আছে একজন টিভি ব্যক্তিত্ব, যার সাথে মতিন মির্জার একসময় প্রণয় ছিল। আর বর্তমানে যাকে মতিন মির্জা চোখে হারায়, সেই তরুণীটিও ছিল আসরে। আর ছিল একজন লেখক, যে এই আসরের সাথে ঠিক খাপ খায় না। এমন এক আড্ডা ও পার্টিতে যদি কেউ খু ন হয় তবে পুরো বিষয়টা এক ধরনের প্রহসনের আকার ধারণ করে। আর যদি জানা যায় এই হত্যাকাণ্ডের বীজ লুকিয়ে আছে আঠারো বছর আগের সেই “নিরাপদ মুখোশ চাই” আন্দোলনে। আর আড্ডায় আসা প্রত্যেকে যেন জড়িয়ে আছে সেই সময়ের ঘটনায়। কীভাবে?
একটি ষড়যন্ত্র, কিংবা প্রতিশোধ? সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করার একটি চেষ্টা! আরও আছে একটি যৌক্তিক ও মানবিক আন্দোলনের রূপরেখা। যা হারিয়ে যায় ব্যর্থতার অতলে। আর সবশেষে, একটি খু ন! যা উন্মুক্ত করে তুলবে সঞ্জের উচ্চপদস্থ কিছু মানুষের মুখোশ। বৃষ্টির রাতে মুখোশের সেই দিনে ফিরে যাবে সবাই…
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
থ্রিলার গল্পও এভাবে লেখা যায়! এমনভাবে গল্প সাজানো যায়! যেখানে মনে হবে কোনো ধ্রুপদী গল্পের চিত্র চিত্রিত হয়েছে, আবার মনে হয় এ যেন যোগ্য থ্রিলার গল্পের পটভূমি ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা! লেখক সুহান রিজওয়ান আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে। তার প্রতিটি বই পড়া শেষে অন্যরকম এক ঘোর সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বইয়ে ভিন্ন ভিন্ন সুহান রিজওয়ানকে আবিষ্কার করি। আর মুগ্ধতার পাল্লাটা একটু একটু করে বাড়ে। এই বইয়ের তার ব্যতিক্রম নয়। “মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত” বইটি এমন এক পটভূমিতে রচিত, যে পটভূমি আমাদের চেনা পরিচিত। নিখাঁদ বাস্তব।
বইটি তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্ব নিয়ে আলোচনা করা যায়। এই অংশটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে। যেখানে একটি ছাত্র আন্দোলনের রূপরেখা গঠিত হয়। ফলশ্রুতিতে এর পরিণতির দিকে আলোকপাত করা হয়। বলাই বাহুল্য, যা সুখকর হয় না। অন্যদিকে একটি গণঅভ্যুত্থান এগিয়ে আসছে। পাশাপাশি চলছে চলছে একটি ঘটনা ঘটার পূর্বাভাস। যা শুরুতেই পাঠককে বইয়ের সাহে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে।
দ্বিতীয় পর্ব থেকে যেন বইটি পুরো থ্রিলার যাত্রায় প্রবেশ করে। একটি বাংলোমতন বাড়িতে কয়েকজন সমাজের উচ্চ স্থানীয় কুশীলব, তারই মাঝে একজন খু ন হয়। কিন্তু সেই সময়টা বড্ড সঙ্গীন। দেশে এক অভ্যুত্থান চলছে। ফলে সাহায্য পাওয়ার আশা দুরাশা। এমন অবস্থায় একজন সরকারি গোয়েন্দার আগমন ও জিজ্ঞাসাবাদে একটু একটু করে রহস্যের উন্মোচন আমার বেশ ভালো লেগেছে। না, লেখক প্রথাগত থ্রিলারের মতো চমকের পর চমক দিয়ে হতবাক করে দেননি। স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই রহস্যের যবনিকাপাত ঘটেছে। টুকরো টুকরো করে একটি ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনার সংযোগ স্থাপিত হয়েছে।
তৃতীয় পর্বে সব রহস্য শেষে সমাপ্তির শেষ অধ্যায়। এখানেও লেখক কোনো চমক রাখেননি। শুধু শেষ পরিণতির দিকে আলোকপাত করেছেন। লেখকের লেখনশৈলী, বর্ণনাশৈলী আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে। ভাষার এরূপ দক্ষতা বা উপমার যথাযথ প্রয়োগ খুব কমই দেখা মেলে। গল্প বলতে বলতে লেখক অনেক কিছুই বলেন। যা হয়তো শুধু লেখকের কথা নয়, অনেকের হয়ে লেখক যেন দায়িত্ব নিয়েছেন সেসব বলার।
উপন্যাসে একটা বিষয় বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে। একজন মৃ ত মানুষের স্বীকারোক্তি জাতীয় দুয়েকটা অধ্যায় লেখক লিখেছেন। মৃ ত্যু হলেই যে কারো জীবন শেষ হয়ে যায় না। দেহ থেকে আত্মার বিচ্ছেদ হয় কেবল। একজন মৃ ত্যুর পর কী ভাবছে, কীভাবে ভাবছে; এই বিষয়গুলো বইটির আকর্ষণীয় দিক বলে কোন হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সাহিত্য জগতের দুইজন মৃত লেখককে তুলে এনেছেন লেখক। তারাও নিজেদের ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। একই সাথে বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতাও ছিল। তারা কারা? ঘটনাক্রমে কী ভাবছিল তারা? সবকিছু জানতে বইটি পড়া বাঞ্ছনীয়।
তবে বইটিতে বেশকিছু বাহুল্য, গল্পের সাথে সামঞ্জস্য নেই এমন কিছু ঘটনা ছিল। যদিও পড়তে খারাপ লাগেনি। যেমন, গল্পের মূল ঘটনা একটি খুনকে ঘিরে গল্পের এগিয়ে যাওয়া। এর পাশাপাশি লেখক সেই সময়টাকে ধরে রেখেছেন। যেমন সেই সময় রাজনৈতিক যে অস্থিরতা ছিল, সেই অস্থিরতার কারণে বিপাকে পড়তে হয়েছে ঘটনাস্থলে থাকা মানুষজনকে কিংবা কেউ এর ফায়দা নিয়েছে। এই জাতীয় কিছু ঘটনা বা সাবপ্লট উপন্যাসের শোভা বর্ধন করেছে। লেখকের লেখনশৈলী যেভাবে মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে দেয়, তিনি যা-ই লেখেন পড়তে ভালো লাগে। আগেই বলেছি বইটিকে যেমন থ্রিলার উপন্যাস বলা যায়, ঠিক তেমনি বলা যায় কোনো রাজনৈতিক জাতীয় কাল্পনিক উপন্যাস। তবে পাঠক বইটিকে কীভাবে নেবে, তার এখতিয়ার পাঠকের।
প্রথাগত যে থ্রিলার উপন্যাস লেখা হয়, তার মধ্যে এক ধরনের মেকি ভাব থাকে। যা পাঠককে কল্পনার রাজ্যে পাঠিয়ে দেয়। খুন, রহস্য, তদন্ত, সফলতা সবই যেন এক নিয়ম মেনে চলমান। বাস্তবে যার অস্তিত্বের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কিন্তু যদি থ্রিলার এমন হয়? যার সাথে বাস্তবতা খুব সহজে মিশে যায়। সমাজের নানান দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পের গতিপথ বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়। এমন এক গল্পে ডুব দেওয়া মানে এক সার্থক উপন্যাসের সানিধ্যে আসা। যে উপন্যাস ভাবতে শেখাবে। শুধু থ্রিলার গল্পের সফলতায় তৃপ্তি এনে দেবে না। থ্রিলারের বাইরের ঘটনাতেও আকর্ষণ বোধ করবে। সব রহস্য কি সমাধানের চূড়ায় পৌঁছায়? তাহলে সব থ্রিলার কেন সফলতার কেন সফল হওয়ার গল্প লিখবে?
▪️চরিত্র :
বইটির চরিত্র গঠন আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে। প্রথম পর্বে মনে হয়, এই উপন্যাসটির মূল চরিত্র বোধহয় গল্প। যে গল্পের গভীরতা এত বেশি ছিল যে, কোনো চরিত্রই গল্পের কাছে ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারেনি। গল্পের প্রয়োজনে একাধিক চরিত্র এসেছে, আবার প্রয়োজন শেষে হারিয়ে গিয়েছে। কেউ এসেছে আন্দোলনকারী বেশে, কেউ সাধারণ পথচারী। আবার সাংবাদিক বেশে আবির্ভাব হয়েছে, কারো কারো শেষ পরিণতি হয়েছে বিভৎস। কেউ আবার ফেঁসে গিয়েছে কিছু না করেই।
তবে দ্বিতীয় পর্বে মূল কুশীলবরা প্রবেশ করেছে। দারুণভাবে চরিত্রগুলোর গভীরে প্রবেশ করেছেন লেখক। প্রতিটি চরিত্র ও চরিত্রগুলোর সাথে গল্পের যোগসাজশ লেখক যেভাবে স্থাপন করেছেন, এই কৃতিত্ব লেখকের। কোনো জোর জবরদস্তি নেই। শুধু গল্পের মধ্য দিয়েই এক একজন চরিত্র তাদের উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তাদের ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো জানান দিয়েছে। লেখকের এরূপ মুন্সিয়ানার তারিফ করলেও কম হয়ে যায়। এই দিক দিয়ে আমি খুবই তৃপ্তি পেয়েছি।
উপন্যাসে একজন লেখক ছিলেন। এই লেখক খুব সম্ভবত আমাদের লেখকের প্রতিচ্ছবি। তিনি যা ভাবেন বা করতে চান, তা-ই যেন তিনি উপন্যাসে থাকা লেখক চরিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। লেখকের লেখার মাধ্যমেই তো সমাজকে ধরে রাখা যায়। কাল্পনিক কিছু গল্পে নিজের ভাবনা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সুহান রিজওয়ান পেরেছেন, সুহান রিয়াসাত পারবেন কি?
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
বানান, সম্পাদন কিংবা প্রোডাকশন কোয়ালিটিতে বাতিঘর বরাবরই একশয়ে একশ। তারপরও কিছু ছাপার ভুল চোখে পড়েছে। তবে দামটা বাতিঘরের বইয়ের একটু বেশিই। এই বইয়ের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু যে বই লেখকের লিখতে প্রায় দেড় বছরের মতো লাগে, সেই বইয়ের মেধা মূল্য হয়তো বেশি হয়।
প্রচ্ছদটা খুব বেশি রকমের উপন্যাসটিকে প্রতিনিধিত্ব করে। সাদামাটা এমন প্রচ্ছদ আমার বেশ পছন্দের। এই বইয়ের প্রচ্ছদটা আরো বেশি পছন্দ হয়েছে কারণ গল্পের সাথে মিলে যাওয়া কিছু উপাদান আছে। প্রচ্ছদের তিনটি উপাদান বইটির তিনটি সাবপ্লটের প্রতিচ্ছবি যেন। যা বইটি পড়লেই বোঝা যাবে।
▪️পরিশেষে, কখনোবা নীরব থেকে সরব হওয়া যায়। নিজেকে হারিয়ে সব খুঁজে পাওয়া যায়। জীবনে এমন একটা সময় হয়তো নিজেই বিসর্জন দিতে হয়। সবকিছু প্রকাশ্যে আনতে কিংবা স্বীকারোক্তি আদায় করতে আত্মহনন সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। এ আত্মহনন হতে পারে দৈহিক, কিংবা মানসিক…
খুব অদ্ভুত সময়ে (জুলাই ২০, ২০২৪ এ), যখন দেশজুড়ে কোটা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শাসকপক্ষের হামলার প্রতিবাদে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে মোটামুটি পাখির মতন গুলি খেয়ে মরছে, কারফিউতে দেশ পুরোপুরি ইন্টারনেটবিহীন অবস্থায় বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন, জনগণ সারাক্ষন টিভি সেটের সামনে খবর দেখছে প্রচন্ড আতংক-হতাশা-উৎকন্ঠা নিয়ে... কাকতালীয়ভাবে হাতে তুলে নেই সুহান রিজওয়ানের এ বিশেষ বইটি।
একটু ভারি কলেবরের বই হওয়ায় উদ্দেশ্য ছিল, বইটায় মন দিতে পারলে দেশের অবস্থা হয়তো ভুলে থাকা যাবে… কিন্তু কিসের কি! কাকতাল কি এমন হয়? দেশের অবস্থার সাথে বইয়ের বিষয়বস্তু এত মিলে গেল কি করে?
ছাত্র প্রতিবাদ -শাসকগোষ্ঠির অনাচার - সেনাজীবন - অভ্যুত্থান – জনগনের জীবনের অনিশ্চয়তা সংক্রান্ত বিষয়বস্তুর সাথে বইটির প্রেক্ষাপটের এত মিল দেখে ভ্রম হয়- লেখক কি আগেই অনুমান করে ঠিক এই বছরের বইমেলায় বইটি বের করেছিলেন কিনা !
বইতে ত্রিমুখী রাজনৈতিক বাস্তবতার সমান্তরালে চলছে রহস্য উদ্ধারের চেষ্টা। থ্রিলার উপন্যাসের সাথে পাঠক গুলিয়ে যায় কিনা সে ভাবনায় লেখক বইটির এক চরিত্রের মুখ দিয়ে থ্রিলার উপন্যাস সংক্রান্ত কিছু আলাপ উগরে দিয়েছেন। সে আলাপে মালমসলা ঠিক থাকলেও, এক তরফা আলাপটা পড়ে যাওয়াটা একটু বোরিং।
বইটার কাহিনী ঠিক বর্তমান রাজনৈতিক ও সমাজবাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। পড়তে পড়তে জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ এর কথা মনে পড়ে, তবে এ কাহিনীতে ১৯৮৪ এর চেয়ে বেশি হিউম্যান টাচ থাকায় বাংলাদেশী পাঠকদের জন্য রেলেভেন্ট বেশি। সুহান রিজওয়ানের অন্যতম সুলিখিত বই বলে মনে হয়েছে। আর হ্যা, এটি থ্রিলার উপন্যাস বলে মনে হয়নি। থ্রিলার আশ্রয়ী রাজনৈতিক উপন্যাস? কে জানে, এটি বলার মত এত জ্ঞানী পাঠক আমি নই। পড়তে ধীরগতির মনে হলেও, পড়া শেষে মনে হবে লেখকের কাছ হতে পাঠক হিসেবে অন্তত কিছুতো পেলাম। হালকা চালের আলাপের মধ্যে অন্তত গোয়েন্দা কাহিনী সম্পর্কে কিছু এসেসমেন্ট তো জানা গেল… খারাপ কি?
সুহান রিজওয়ানের ১টা বাদে বাকি বইগুলো সব কালেকশনে থাকলেও এটি আমার পড়া ৩য় বই। মনে হচ্ছে বইটি কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে না। রিপ্রিন্ট হবে। অতএব, পাঠকদের জন্য রেকমেন্ডেড - পড়ে নিন। এই বিক্ষুব্ধ সময়ের সাথে ভালভাবে রিলেট করতে পারবেন।
অদূর ভবিষ্যতের কোন এক সময়ের, আমাদের এই চেনা ভূখণ্ডেরই কাহিনি। রাসায়নিক তেজস্ক্রিয়ায় যেখানে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস অসম্ভব, জীবন বাঁচাতে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহার করতে হয় সবাইকে। মাস্ক তৈরিতে নিন্ম মানের উপকরণ ব্যবহার করার ফলে ত্রুটিপূর্ণ মাস্ক ব্যবহারে এক ছাত্র মারা যাওয়ার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে একে একে নগরের সব স্কুলের শিশু কিশোর। রাস্তায় নেমে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিল আর কারখানা মালিকের শাস্তির দাবী চাওয়ায় সরকারের মদদপুষ্ট পুলিশ আর মুখোশবাহিনীর নির্মম সহিংস নির্যাতন শুরু হয় প্রতিবাদী ছাত্রদের উপর...
কী, চেনা মনে হচ্ছে না? ফেব্রুয়ারী ২০২৪ বইমেলায় প্রকাশিত এই উপন্যাস কেউ যদি গত জুলাইয়ের পরে পড়তে বসে, নিশ্চিত ভাবেই বিস্মিত হবে জুলাই-বিপ্লবের সাথে এর ঘটনাক্রমের অভাবনীয় সাযুজ্য দেখে। অবশ্য লেখকের এই বইয়ের ঘটনাক্রম জুলাই আন্দোলন নয়, বরং ২০১৮ র সড়ক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকে অনুপ্রাণিত। এবং গত ১৫ বছরের ৪/৫ টা ছাত্র আন্দোলন দমনের ছকটা সব সময়ই খুব পরিচিত ছক মেনেই এগিয়েছে। গল্পে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে সরকার পতনের জন্য এক ক্যু'র পরিকল্পনাও। যেটা সড়ক আন্দোলনে ছিল না, ছিল জুলাই আন্দোলনে। ফলে পড়তে গিয়ে দারুণ উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন লেখক ভবিষ্যত বক্তা হিসেবে জুলাই আন্দোলন ও সরকার পতনের বাস্তব কাহিনিটিই প্রকাশ করে ফেলেছেন ঘটনার চার মাস আগে, ফেব্রুয়ারিতেই!
কিন্তু তরতর করে প্রথম অর্ধেকটা পড়ে যাওয়ার পরেই মাঝখান থেকে প্রতিবন্ধকতার শুরু। এক চ্যাপ্টার পরে পরে কাজী আনোয়ার হোসেন, শরদিন্দু, এলান পো, হিচককদের মত কিছু বাস্তব চরিত্রের ভূত নামানোর এক্সপেরিমেন্ট পুরো বইটার দফা রফা করে দিয়েছে। এই চ্যাপ্টার গুলো না থাকলে বইটা বেশ চমৎকার একটা বই হিসেবেই উৎরে যেতো। এছাড়া, আত্মাদের যে কথোপকথন থ্রিলার আর ধ্রুপদী সাহিত্যের মধ্যে, (সত্যি বলতে একে কচকচিই বলা ভালো) পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো লেখক নিজেকে ধ্রুপদী লেখক হিসেবেই দেখতে চান, কিন্তু থ্রিলার লিখতে বসায় নিজেই বেশ আইডেন্টিটি ক্রাইসিস ফিল করছেন, হীনমন্যতায় ভুগছেন। তাই জোর করে থ্রিলার কাহিনির মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে চাচ্ছেন। যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, এবং যুক্তি গুলোও অযৌক্তিক লেগেছে।
অবশ্য, বইতে লেখক নিজেই আবার নিজের লেখার সমালোচনাও করেছেন। এই উপন্যাস যে আদৌ কিছু হয়ে উঠে নি, এবং তার প্রথম উপন্যাসের সাথে পরের উপন্যাস গুলোর তুলনা, এই নিয়ে পাঠকদের অনিবার্য মন্তব্য, সেসব মাথায় নিয়ে উপন্যাস সম্পর্কে যে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি এখন বদলে গেছে, এই স্বীকারোক্তিটাও বিবেচনায় নিতে হয়। এই জবানবন্দিকে সত্যি বলে ধরে নিই যদি, তাহলে বলা যায় সুহান রিজওয়ান এভাবেই এক্সপেরিমেন্ট করতেই থাকবেন ভবিষ্যতেও, হয়তো। তবে আমার মত পাঠকের কাছে তিনি স্মরণীয় থাকবের সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রানের লেখক বলেই।
আরও কথা থেকে যায় কিছু। পুরো বই শেষে মনে হলো বড় দুইটা যায়গায় কাহিনি ফাঁক রয়ে গেছে এক্সপেরিমেন্টে বেশি নজর দিতে গিয়ে। প্রথমত, ১৮ বছর আগের আন্দোলনে একজন মারা যাওয়ার ঘটনার আশেপাশে ইনডিরেক্টলি জড়িত মানুষ গুলোকে জড়ো করে প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে তাদেরকেই খুন করাটা লজিক্যাল ছিল। ভিক্টিমের আত্মহত্যা না। কেননা যে সমাজ ব্যাবস্থা দেখানো হয়েছে বইতে, আইনগত, রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক, সেখানে জাস্ট খুনের সন্দেহ টাইপ ঘটনা তৈরি করে জবানবন্দি আদায় করে এমন পাওয়ারফুল অবস্থানের ব্যক্তিদের চুলটাও ছেঁড়া সম্ভব না, সেটা মূল দুই স্মার্ট প্রট���গনিস্ট বা এন্টোগনিস্টের বুঝতে পারার কথা ছিল।
দ্বিতীয় যেটা, হায়দারের ক্যু স্যাবোটাজের ব্যাপারটা, যুক্তিহীন পুরোপুরিই। সে যদি ভিক্টিম ফিল করে থাকে নিজেকে, যে সরকার ব্যাবস্থার কারনে সে ভিক্টিম হয়েছে, সেই সরকারকে উৎখাত করাটাই তো মনেপ্রাণে তার চাওয়া হওয়া উচিৎ। অথচ প্রায় সফল হয়ে যাওয়া একটা বিল্পবকে কেন সে ব্যার্থ হতে দিবে? এর পেছনে একেবারেই কোন লজিক নেই।
লেখা বেশ বড় হয়ে গেছে, তবে এতটা লেখার কারনও একটাই, এটা সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রানের লেখকের বই। এবং আমি উনার লাস্ট তিনটা বইতে পরপর হতাশ হয়েছি।
This entire review has been hidden because of spoilers.
লেখকের আগের বই 'গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে'-তেও ছিলো সুহান নামের একটি চরিত্র। এই বইতেও আছে আরেক সুহান। দুই সুহানই লেখক, দারুণ কিছু একটা লিখতে চায়। দুটো বই পড়তে গিয়েই আমার মনে হয়েছে লেখক সুহান রিজওয়ান আসলে সুহান রিয়াসাত-এর মাধ্যমে নিজেকেই স্থাপন করেছেন এই উপন্যাসের প্লটে। উপন্যাসের সুহান রিয়াসাত এমন একটি থ্রিলার উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলেন যেটার মাঝপথে রহস্যের সমাধান হয়ে গেলেও পাঠক বাকী অংশটা পড়তে চাইবে। বাস্তবের লেখক সুহান রিজওয়ানের 'মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত' ঠিক তেমনই এক থ্রিলার, বইয়ের দুই তৃতীয়াংশে এসে মূল রহস্যের সমাধান হয়ে গেলেও পাঠকের মনে হবে আচ্ছা বাকীটাও পড়ে দেখি তো! টিপিক্যাল থ্রিলার পড়ে যারা অভ্যস্ত তারা একটু ধন্দে পড়ে যাবেন, একটা খুন হবে আর ডিটেকটিভ খুনীর পেছনে দৌড়াবেন এমন একঘেয়ে গল্প নয় এটি। কিছুটা Dramatic Metafiction ধাঁচের লেখা আবার 'গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে'-এর Dystopian ছায়াও একটু আছে (এই বইয়ের মত তেজস্ক্রিয়তা, মুখোশ, শান্তিপ্লাটুন এই টার্মগুলো ও এই টাইপের প্লট ঘুরে ফিরেই এসেছে, নাকি এটা আগের উপন্যাসের সিক্যুয়েল?)।
গল্পের প্রতিটা চরিত্রকে পরিনত হওয়ার পর্যাপ্ত সময় দিয়েছেন লেখক। খাজা, হায়দার, মতিন মীর্জা, শারমিন, জাকিয়া, নওশিন, মনীশ, জিনিয়া প্রত্যকের গল্প আলাদা আলাদাভাবে এসে এক সুতোয় মিলেছে। শুরুর দিকে অনেকগুলো চরিত্রের আলাদা আলাদা বর্ণনা কিছুটা ক্লান্তিকর লাগলেও ২৫/৩০ পাতা পরেই পাঠক রহস্যের বেড়াঁজালে নিজের অজান্তেই আটকে যাবেন। সুহানের অন্য উপন্যাসগুলোর চেয়ে এই উপন্যাসে শব্দ, উপমা আর মেটাফোরের ব্যবহার আমার কাছে আরো অনেক বেশী পরিনত মনে হয়েছে৷ আখ্যান বর্ণণার স্টাইলটিও এমন যে খানিক জায়গায় মনে হবে কোন বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থার বর্ণনা পড়ছি, আবার খানিক বাদেই বোঝা যায় এটি লেখকের সৃষ্ট পরাবাস্তব এক জগতের কাহিনী। তিন পর্বের এই উপন্যাসের প্রথম পর্বের প্রায় পুরোটাই গল্পের চরিত্রগুলোর বর্ণনা, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড এবং মূল রহস্যের গঠন নিয়ে ব্যপ্ত, একটার পর একটা চরিত্রকে নিয়ে এসে একটু একটু করে মূল গল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন লেখক। পাঠক হিসেবে এই জায়গায় এসে একটু চিন্তায় পড়ি, এতগুলো ডিফারেন্ট ব্যাকগাউন্ডের চরিত্রকে কীভাবে এক সূতোয় গাঁথবেন লেখক? কিন্তু বিস্ময়ের সাথে দেখি দ্বিতীয় পর্বে এসে খুব সফলভাবেই সেই কাজটি করেছেন তিনি, টুইস্টে ভরপুর দ্বিতীয় পর্বের মাঝামাঝি আসা পর্যন্ত পাঠক কাহিনীর গতিবিধি নিয়ে নানা আন্দাজ করবেন কিন্তু কোনটাই হয়তো মিলবে না শেষ পর্যন্ত। তৃতীয় পর্বটি খুবই ছোট এবং সরলরৈখিক, তৃতীয় পর্ব বাদ দিলেও এটি পূর্নাঙ্গ থ্রিলার উপন্যাস হতে পারতো তবুও পুরো বই পাঠ শেষে এই পর্বের প্রাসঙ্গিকতাও মূর্ত হয়ে উঠবে পাঠকের কাছে, সব কিছুর শেষেও কি যেন একটা বাকী রয়ে গেলো টাইপের অনুভূতি হবে, হয়তো একটু হতাশাও, রহস্যের জাল খুলে যাওয়ার পরও একটু মারপ্যাচ রয়ে গেলো কী? থ্রিলার তো এমনই হওয়া উচিত, না কি?
***সুবর্ণার কথার মাধ্যমে লেখক টিপিক্যাল থ্রিলার লেখকদের যেভাবে ধুয়ে দিলেন সেটায় ভীষণ মজা পেয়েছি, আবার আরেক জায়গায় লেখক নবাব আর চন্দ্রহাসের কথোপকথনের অংশ হিসেবে নিজের কম্ফোর্টেবল জনরা ছেড়ে থ্রিলার লেখার যৌক্তিকতাও কি বুঝিয়ে গেলেন না? রহস্য বা অপরাধের সাথে মনস্বত্ত্ব, সামাজিক ইতিহাস, ভাষার সৌন্দর্য, মেটাফোরের ব্যবহার ইত্যাদি যে থ্রিলারের মত অন্ত্যজ শ্রেণীর (অনেকের তাই ধারনা) লেখাকেও কালোত্তীর্ণ ধ্রুপদী সাহিত্যে পরিণত করতে পারে লেখকের এমন যুক্তিও লেখক যেন নবাবের বুলি তে নিজেই বলিয়ে নিয়েছেন। এভাবেই নিজের কথা গল্পের চরিত্রকে দিয়ে বলিয়ে নেয়ার উদাহরণ দেখেছিলাম 'শেষের কবিতা'য়, রবীন্দ্রনাথ যেভাবে অমিত রায় বা নিবারণ চক্রবর্তীর কথায় মূলত আউড়েছেন নিজেরই মত।
সুহান ভাইয়ের লেখনির অনেক প্রশংসা শুনেছি, সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রান নিয়েছি কয়েক মাস আগে কিন্তু নতুন বই দিয়েই শুরু করলাম। লেখাটা এক্সপেরিমেন্টাল ছিল বলাই বাহুল্য, বেশ কিছু জনরা আছে এতে, আছে অনেক অনেক চরিত্র। ভাল না লাগার সবথেকে বড় কারন, আমার পড়া সব থেকে বোরিং ৩ টা বইয়ের লিস্ট করলে এটা হয়ত ১ এই থাকবে। প্রথম ৫০/৬০ পৃষ্ঠা পড়তে অনেক কষ্ট হয়েছে। বই হাতে নিয়ে ঘুম চলে আসবে বেশ কয়েকবার। আর এই পূরনো বাতিঘর এর চড়া দাম। এমনেই বেকার মানুষ, এত দামের বইটা এত বোর ফিল করালো বলেই ১ তারা দিতে ইচ্ছে করছে। লেখকের এফোর্ট এর জন্যে ২ দিলাম।
TLDR: A very politically-conscious novel with a refreshingly new take on the plot, combined with polished and enjoyable prose.
This novel consists of three parts - liked first (and the longest) part the best. I personally thought it was a shame some of the storylines were not (continued to be) developed in the latter parts, to experiment with the unwarranted murder mystery plot, in my humble opinion. Really solid writing carried the book through - you feel the presence of a crafty and powerful novelist behind the pages and appreciate the many hours of background research and digging on his part.
Felt good to visit the Ekushey boimela and read physical copy of a Bangla book after many years.
উপন্যাসটি (থ্রিলার?) বেশি এক্সপেরিমেন্টাল মনে হলো, থ্রিলার+ ডিস্টোপিয়ান হাইব্রিড টাইপ কিছু একটা! প্রথমটুক ভালো লাগলেও, পরে প্রায় জোর করে উপন্যাসকে থ্রিলার ঘরানায় কনভারসন চোখে লেগেছে।
বরাবরের মতোই লেখক নিজেও আবার ঢুকে গেছেন গল্পের মধ্যে।
১৫ই এপ্রিল তারিখটি লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার হোসেনের জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিবস। শান্তিনিবাসের আড়িপাতা বিভাগের এই শান্তিপ্লাটুন কর্মী তার বহুকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হাসিলে প্রস্তুত, তাই তো দীর্ঘ এই যাত্রায় প্রতিটা পদক্ষেপ ছিল সতর্কপূর্ণ, দৃষ্টি ছিল সজাগ। কিন্তু ঝামেলা বাঁধে শান্তিনিবাসের অন্যান্য কর্মীদের নিয়ে, যাদের অনেকেই রাতের আঁধারে শহরে ক্যু এর পরিকল্পনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মূলে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িত, উদ্দেশ্য প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেশের সার্বিক ক্ষমতা নিজেদের দখলে নেওয়া।
একই দিনে নির্জনপুর চা বাগা��ে নেতা মতিন মির্জার বাংলোতে আগমন হয় ছয়জন অতিথির। পরিচিত মানুষগুলোর একত্রে ভালো কিছু সময় যেন কাটে তাই মূলত মতিন মির্জার নিমন্ত্রণের মূল কারণ যদিও অতিথির সকলেই যে একে অপরের সাথে পূর্বপরিচিত তা নয়। এমনকি পূর্বপরিচিত হওয়া সত্ত্বেও অতিথিদের মধ্যে কেউ কেউ একে অপরকে অপছন্দই করে বরং তবুও সামাজিক পদমর্যাদার কারণে নিয়ম রক্ষার্থে কিংবা নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য এদের একে অপরের মুখোমুখি হতে হয়। অতিথিদের মধ্যে সকলেই নামজাদা পেশায় নিয়োজিত হলেও মতিন মির্জার অসম বয়সের প্রেয়সী মুনিয়া নওশীনের পরিচয়ই কেবল ঘোলাটে মতিনের কাছে। সেই ঘোলাটে পরিচয় পুরোপুরি জানার সুযোগ হয়নি মতিন মির্জার, কারণ সে রাতেই মুনিয়ার মৃত্যু হয় গুলি লেগে। আততায়ী যে বাংলোতে উপস্থিত কেউ একজনই তা নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ থাকে না সকলের। তবে শহর জুড়ে প্রতিকূল আবহাওয়া ও ক্যু পরিচালনাকারী বিদ্রোহীদের বিশৃঙ্খলার দরূন আইন নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
সেই রাতে বাংলোতে তদন্ত হয় ঠিকই তবে তদন্তের ভার এসে পড়ে হায়দার হোসেনের কাঁধে কিংবা যেচে হায়দার নিজেই বেছে নেয় এই দায়িত্ব। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে আঠারো বছর আগের অতীত যা ছিল নিরাপদ মুখোশ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। অতীতে পদচারণা করতে গিয়ে মুখোশ খসে পড়ে অনেকেরই।
গল্পে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যা যা উল্লেখ করা হয়েছে তা মূলত আমাদের দেশের বিগত আন্দোলনগুলোরই খন্ড খন্ড চিত্র যা লেখক অকপটে তুলে ধরেছেন, এজ্জন্য লেখকের তারিফ করতেই হয় কেননা ব্যাখ্যাগুলো পলাতক হাসিনার শাসনব্যবস্থাকেই সরাসরি ইঙ্গিত করে। গল্পের রাজনৈতিক দলগুলোর নোংরা রাজনীতি ও কুটিল চাল, মুখোশ বাহিনীদের দ্বারা ছাত্রদের উপর হামলা, প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরায় চেষ্টারত সাংবাদিকদের জেরার মুখে নেওয়া, গণমাধ্যম কে নিজের মতো সাজিয়ে উপস্থাপন করা, আইনের অপপ্রয়োগ করে নির্দোষদের শাস্তি দেওয়া সবই আমাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঘটে যাওয়া নির্মম দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
গল্পের শুরু থেকে বাংলোতে খুন হওয়া পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল, এক ধরনের অধীরতা কাজ করছিলো যে আন্দোলন আর বাংলোতে উপস্থিত মানুষগুলোর সঙ্গে লেখক কীভাবে সংযোগ স্থাপন করবেন। তবে একরাশ হতাশা নিয়েই বইটি শেষ করতে হয়। আমার মনে হয় লেখক ঠিক নির্ধারণ করতে পারেননি যে কোন কোন বিষয়গুলোকে সে বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে চান কেননা গল্প রাশভারী অবস্থায় পৌঁছে গেলে হঠাৎ করে উপন্যাস, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, গোয়েন্দা কাহিনীর আলাপ শুরু হয়ে যায়। কোত্থেকে যেন নবাব , চন্দ্রহাস, প্রবীণ ও অনুজরা চলে আসে তাদের খোশ গল্প পেশ করতে যা আমার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও বিরক্তিকর লেগেছে। পাশাপাশি হায়দারের জিজ্ঞাসাবাদ করতেই অর্ধেক বই শেষ, হায়দার থেকে গল্পের আকর্ষণ সুহানের দিকে পরিবর্তন করা , সুহানের কাছে হায়দার কী তথ্য দিয়েছিল তা সম্পর্কে অজ্ঞাত রাখা ছিল আমার মতে গল্পের অবনতির আরও কিছু কারণ।
বর্তমানে যাঁরা লেখালেখি করেন, তাঁদের মধ্যে সুহান রিজওয়ান আমার পছন্দের তালিকার শুরুতে রয়েছেন। তবে এই বইটা পড়ে আমি বেশ আশাহত হয়েছি। বইয়ের প্লটের সাথে জুলাই ২৪ এর অনেকটা মিল পাওয়া যায়, যার কারণে ভাবছিলাম হয়তো দারুণ কিছু হবে। কিন্তু মাঝপথে যেয়েই পড়া থামিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিল সবগুলো কাহিনী একসাথে মিলছে না। খুব খাপছাড়া লাগলো :(
- এটা সত্যি যে সুহান ভাইয়ের কোনো বই-ই আমি এক বসায় কখনো পড়া শেষ করি নাই। এইটার একাধিক কারণ আছে, প্রথমত - বইগুলো কোনোভাবেই ছোট বলা যাবে না। দ্বিতীয়ত, দুর্দান্ত গতিতে আমি যে বইপত্র পড়ি, সেগুলো সাধারণত থ্রিলার ধাঁচের বই। সুহান ভাইয়ের বইপত্র কোনোভাবেই থ্রিলার বলা যায় না, আর যাই হোক না ক্যানো।
এই বইটা ব্যাতিক্রম। সন্ধ্যার দিকে পড়তে বসেছি, মাঝখানে দুই একটা ছোট ব্রেক নিয়ে রাতের মধ্যে পড়া শেষ হয়ে গেছে। টানা পড়তে চাওয়ার পেছনে আমার কোনো শ্রম দিতে হয় নি, কারণ বইয়ের প্রথম অংশ বেশ টানটান উত্তেজনার, সাসপেন্স ধাঁচের, এবং পরবর্তী অংশটি, যেটা তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত, সেটাও বেশ গতিশীল।
তো একবারে পড়া শেষ হয়ে যাবার পরে আমার মনে হয়েছে পুরো বইটি বেশ ঝরঝরে, কিছু অংশ একটু শ্লথ, তবে সেটা গল্পের প্রয়োজনে। মনোলগের যে অংশগুলো, সেখানে প্রচুর কথা উঠে এসেছে - ব্যাক্তিগত, সামাজিক ও পারিবারিক। এ অংশে এসে মনে হয়েছে বিষয়গুলোর উপস্থাপন আরো গোছানো হতে পারতো। অনেক কথাই আছে, যেটার প্রয়োজন হয়তো আছে, সেটা শুধুমাত্র বুঝে উঠতে পারি নি।
কাজেই সংক্ষেপে বলা যাক, প্লট বেশ আকর্ষণীয়, থ্রিলিং অবশ্যই, অন্তঃত একটা অংশ পর্যন্ত। বেশ একটা রবার্ট লুডলাম, কিংবা ফ্রেডরিক ফোরসাইথ, কিংবা ড্যান ব্রাউনীয় মোশন বিদ্যমান! কয়েকটি বিষয় ঠিক প্রচলিত ছকটায় পড়ে না, অথবা পাঠক হিসেবে আমি যেহেতু বকলম, অভিজ্ঞতার অজ্ঞতার কারণে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে।
২) প্লট বিশ্লেষণ
আগেই বলেছি, উপন্যাসের অর্ধেকের বেশি অত্যন্ত গতিশীল। আগে পড়ে মিলিয়ে প্রচুর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে চারপাশে, সেখানে উত্তেজনা আছে, হতাশাও আছে। পরের অংশের বিষয়টি সুতো জোড়া দেবার মত, চিন্তা করতে হয়, মাথা একটু হলেও ঘামাতে হয় যোগসূত্র খুজে বের করার জন্য। একটা রহস্য আছে এ অংশে, যেটার সমাধান সবার শেষে না, বরং শেষের অনেক আগেই দেয়া আছে। তবে এটা যেহেতু রহস্য উপন্যাস না, কাজেই সমাধান খোঁজার জন্য এই বইটি আপনি পড়বেন না, পড়বেন সমাধানের পরেও গল্প আসলে কোথায় যাচ্ছে, সেটা বুঝতে।
দুইটি ভিন্ন টাইমলাইনের ব্যাক এন্ড ফোর্থ ন্যারেটিভটা একদম শুরুতে ধরতে একটু বেগ পেতে হয়। তবে কিছু পাতা পড়ে ফেললে, সেক্ষেত্রে আর ভ্রান্তির অবকাশ থাকে না। আগাথা ক্রিস্টির খুব জনপ্রিয় একটা গল্পের কথা আপনার মাথায় উকি দিয়ে যেতে পারে, তবে এটা পুরোই ভিন্ন একটা পারস্পেক্টিভ।
উপন্যাসটি সরল, অন্তঃত ন্যারেটিভের বিচারে এটি অনেকগুলো ধারাবাহিক ঘটনা, সমসাময়িক চিন্তাভাবনা, এবং কিছুটা অতীতের পুনরাবৃত্তির সংমিশ্রণ বলা যেতেই পারে। ক্রিটিকালি চিন্তা করলে, কিছু প্লট হোল আছে অথবা ব্যাখা নেই এইরকমটাও মনে হয়েছে কয়েকটি বিষয়ে।
গল্পের জটিলতা বেশ ইন্টারেস্টিং। কিছু বিষয় খুবই চিরাচরিত, আশেপাশের প্রচুর চরিত্র থেকে নেওয়া, পত্রপত্রিকা খুললে, একটু বই পড়লে, একদম কিছু চরিত্র মাথায় চলে আসে না, এরকম প্রচুর চরিত্র পাবেন। কিছু চরিত্র বেশ জটিল, আচার আচরণ বেখাপ্পা, কিছু আদিম প্রবৃত্তির তাড়নায় চালিত চরিত্র চয়েছে, আর কিছু চরিত্র রয়েছে নিতান্তই কৌতুহলী, দর্শক ভূমিকার। তবে, এই গল্পে চরিত্রের ভিন্নতা রয়েছে অনেক বেশি, ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার, ভিন্ন ভিন্ন ধাঁচের, ভিন্ন স্থান থেকে উঠে আসা। এদিক ওদিক খুঁজলে এদের অনেককেই আপনার অনেক বেশি চেনা মনে হবে।
৩) চরিত্র বিশ্লেষণ
মাত্রই বলেছি চরিত্রগুলোর ভিন্নতার কথা। সম্পূর্ণ উপন্যাস ধরে যদি চিন্তা করি, মূল চরিত্রগুলর পেছনে প্রচুর সময় দেয়া হয়েছে ডেভেলপমেন্টের জন্য। একদম শুরু থেকে এই অবস্থানে পৌছাবার আগ পর্যন্ত, ছোট ছোট গল্পে, বাক্যে ব্যাখা করা হয়েছে তাদের পরিবর্তনের ধাপগুলো। মোটামুটি পরিচিত ছকে পড়লেও, মূল চরিত্রগুলোর ডেভেলপমেন্ট আমার খুবই স্ট্রং মনে হয়েছে। এর তুলনায় পার্শ্ব চরিত্রগুলোর ডেভেলপমেন্ট মাঝামাঝি মনে হয়েছে, কিছু চরিত্র খুবই ওয়েল ডিফাইন্ড, কিছু চরিত্রের উপস্থিতি অনেক বেশি আকস্মিক, ছকের বাইরে। প্রধান চরিত্রগুলোর ডেভেলপমেন্ট ধারাবাহিক এবং প্রেডিক্টেবল, তবে পার্শ্ব চরিত্রের ডেভেলপমেন্ট অনুপস্থিত থাকবার কারণেই কিনা, কিছুটা চমকে দিতে পারে। গল্পে দুইটা বিষয় অনুমান করেছিলাম, একটা কাজে লেগেছে। কাজেই চরিত্র বিশ্লেষণ করলে যে ধারণা পাওয়া যায়, সেই মিথস্ক্রিয়ার মধ্যেই আছে বলতে হবে।
প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় বলা যাক।
চরিত্রগুলোর আচরণের পেছনে সাধারণ মোটিভ থাকে কোনো একটা। মোটামুটি এখানে সবার মোটিভ স্পষ্ট, যেকারণে আচরণও সহজ ভাবেই ব্যাখা করা যাবে, একটি/দুইটি বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়া। তাদের কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত গ্রহণও বোধগম্য হতে সমস্যা হবে না, দুই একটু বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া।
মনোলগের কিছু অংশ অতিরিক্ত মনে হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু উঠে আসতে পারতো বলে মনে হয়েছে, যেটা হয়নি। মনোলগের সাধারণত মূল উদ্দেশ্য থাকে, ভিন্ন একটা অবস্থান থেকে নতুন একটা দৃষ্টিভঙ্গী উপস্থাপন করা। সে জায়গা থেকেই আমার মনে হয়েছে। ও অংশটা অতটা পোক্ত নয়।
শেষ আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, ডাইভার্সিটি। এখানে শিশু-কিশোর, মাঝবয়েসী থেকে শুরু করে ছোট চাকুরীজীবি, নেতা, বড় অবস্থানে থাকা হোমড়াচোমড়া, সব চরিত্রই আছে। একটা প্লটে এদের সবাইকে নিয়ে এসে, তাদের সামাজিক অবস্থান ফুটিয়ে তোলার সাথে সাথে আচরণ তুলে ধরে, তাদেরকে জায়গামত বসানোটা চাট্টিখানি কথা নয়, এটায় লেখক খুবই খুবই সফল।
৪) থিম ও মোটিফ
ইয়ে, এইটা আমি ঠিক আসলে জানি না।
বইয়ে খুবই সিরিয়াস কিছু বিষয় আছে, জটিলতার পারিপ্রেক্ষিতে ভালোরকম ব্যালেন্সড বইটি। কোন একদিকে অনেক বেশি বায়াসড কি? মোরাল কোশ্চেনের বা ডাইলেমার জায়গা খুব বেশি নেই, বেশিরভাগ জায়গাই খুবই স্পষ্টভাগে ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট মার্ক করা। দুই একটি চরিত্র আপনাকে নতুন করে ভাবাতে পারে এ অংশে, তবে বেশিরভাগই আমাদের বহুচেনা, বহু পরিচিত। কনটেম্পোরারি টাইমের সাথে অতীতের ঘটনার যোগসূত্র মিলিয়ে ভাবতে গেলে সহজ সরলই মনে হয় প্রথমে। তবে পুরো ঘটনার ব্যাপকতা চিন্তা করলে মনে হয়, বড় তাৎপর্যটা বোধ হয় মিস করে গেছি।
৫) লেখার ধাচ
লেখার ধাচ উপভোগ্য, টাইমলাইনের মধ্যে হুটহাট ঢুকে পড়া, বের হয়ে আসা, আর অনেকগুলো মনোলগের মধ্যেই সবগুলো চরিত্রে ভিন্নতা, ও ভয়েস স্পষ্ট এবং আলাদা। এটা ভালো লেগেছে অনেক।
সেটিংস এর ব্যাপারটায় এসে একটু ধন্দ লাগলো। যে প্লটে দাড় করানো গল্প, সেখানে কিভাবে পৌছেছে, এটার বিস্তারিত ব্যাখা নেই। কাজেই আপনাকে ধরে নিতে হবে, এটা একটা ফ্যান্টাসি ফিকশনের সেটিং এর মতই, পার্থক্যটা হচ্ছে ইতিহাস আপনার জানা নেই, অথবা ইতিহাসটা আপনি আপনার মত করে চিন্তা করে নিতে পারেন, কারণ এ গল্পের প্রেক্ষাপট আপনার অতি পরিচিত। কাজেই পূর্বাপর অনুমানে আপনার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা বিদ্যমান!
ভাষায় যথেষ্ট তারল্য আছে, ভাষার নুয়ান্সের জায়গাতে ভারিক্কী ভাব নেই, হালকা চালেই সবকিছু এসেছে। খুব ভারী, গভীর মনে হয় নি আমার কাছে। একটা ব্যাপার আছে, সেটা হচ্ছে পুরো উপন্যাসটা একত্র করে চিন্তা করে এক অংশের সাথে আরেক অংশের যোগসূত্রে, ভাষাগত ছোট্ট ছোট্ট সূত্র, সেটা যদি ধরতে পারেন, তাহলে বেশ ভালো লাগার কথা!
৬) সমাপিকা চিন্তা
প্রথমেই বই পড়ে ওঠার পরে কিরকম লেগেছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
সমাপিকাটা স্যাটিস্ফায়িং না, আপনাকে গুডফিল ভাইব দেবে, এ আশায় গুড়ে বালি। কিছুটা শূন্যতা কাজ করবে, একটু আক্ষেপও কাজ করতে পারে। আমার ক্ষেত্রে যেটা কাজ করেছে, সেটা হচ্ছে একটা বড়সড় ঘটনার সাক্ষী হওয়া মানুষগুলোর পরবর্তীতে চিন্তাভাবনা কি রকম হয়, তাদের পরিবর্তন কোথায় কোথায় আসে, সে অনুভূতিটার জায়গায়। রেকর্ড কিপিং টাইপের একটা অনুভূতি মাথায় আসে, তবে সেটা আপনি কতটুকু উপভোগ করবেন, সেটা আমি ঠিক বলতে পারছি না!
এই ধাচের অন্যান্য উপন্যাসের সাথে তুলনা করাটাও বেশ মুশকিল। কারণ কোনোটার সাথেই এটা আসলে পুরোপুরি যায় না। তাই তুলনীয় কোনো কিছুও এখানে তুলে ধরতে পারছি না।
৭) উন্নতির জায়গাগুলো যা হতে পারে - মনোলগের ন্যারেটিভ আরেকটু টাইট হতে পারতো। - গল্পের দুই অংশের উপস্থাপন ভঙ্গী ভিন্ন। ট্রাঞ্জিশনে একটু কষ্ট হতে পারে পাঠকের। - গল্পের প্রথম অংশে কিছু জায়গা প্রলম্বিত, এবরাপ্ট সুইচিং আছে। এটা আরেকটু মসৃণ হলে ভাল্লাগতো।
৮) যা যা ভালো লেগেছে
- অনেক অনেক চরিত্র, অনেক ভিন্নতা - উপন্যাসের প্লট, খুবই খুবই ইন্টারেস্টিং - লেখা আগের চাইতে অনেক বেশ সাবলীল, গতিময় - সমসাময়িক ঘটনার সুস্পষ্ট প্রভাব, কোনো রকম এড়িয়ে যাবার মানসিকতা চোখে না পড়া - সহজ-সরল-প্রাঞ্জল উপস্থাপন - ব্যাকগ্রাউন্ড স্টাডির (অথবা অভিজ্ঞতা) এফোর্ট
তো, এই হচ্ছে আমার উপন্যাসের পাঠ-অভিজ্ঞতা। এইখানে যা কিছু লেখসি, বলসি, সব কিছু আসলে নিজের চিন্তা থেকে বলা, কাজেই ভুলভাল বলার সম্ভাবনা প্রচুর। তারপরেও দুর্বল পাঠকের জায়গা থেকে চিন্তাভাবনা শেয়ার করলাম!
সত্য উদঘাটনের ভয়াবহ দায় বেশীরভাগ লেখককেই বয়ে বেড়াতে হয়। ব্যাপারটা আসলে দুইভাবেই হয়। কেউ বা স্বেচ্ছায় বেছে নেন এই পথ আবার কেউ আসেন এক প্রকার নিরুপায় হয়ে। অথবা সত্য নিজ থেকে্ই হয়তো উণ্মোচিত হবার জন্য এই দু’য়ের একজনকে বেছে নেয়। আর এসবের জন্য একজন লেখককে হাঁটতে হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন, বাস্তব-পরাবাস্তব জটিল-প্যাঁচালো সব ল্যাবিরিন্থ ধরে। যাত্রাপথে মিলে যায় বিবিধ অভিজ্ঞতার সাক্ষাৎ, তবুও শেষমেশ দরজাবন্ধ ঘরে লেখক মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে একাকি একজন মানুষ। বন্ধ দেয়ালের মাঝখানে তাকেই মেলে ধরতে হয় তার নিজস্ব পৃথিবীর মানচিত্র। লেখক মূলত জীবনভর চেনা বাস্তবের আদলে তার সেই মানচিত্রেরই খণ্ডাংশ তুলে আনেন তার লেখায়। একই সাথে তাকে লড়তে হয় পাঠকের উচ্ছ্বাস কিংবা হতাশা নামক দুই মহিরুহের সাথে। পাঠক ছুড়ে ফেললে লেখকের সেই নিজস্ব পৃথিবী টলে ওঠে, আবার পাঠকের উচ্ছাস্বে লেখকের পৃথিবী হয়ে ওঠে বর্ণাঢ্য। এসবই এক জটিল ডিসকোর্স। সেই কর্পূর আনন্দের প্রত্যাশায় দিনের পর দিন পাড়ি দিতে হয় ক্লান্তিকর, পরিশ্রমসাধ্য এক পথ। আমার মতে পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্ঠসাধ্য কাজ লেখালেখি। কিন্তু লেখালেখির উদ্দেশ্য কি শুধুই ব্যক্তিগত আনন্দের অনুসন্ধান? এপ্রশ্নের হাজারো উত্তর মিলবে কেননা এই জটিল যাত্রাপথে নেমে পড়বার, ঝুকি নেবার জন্য হাজারটা কারণেরও প্রয়োজন। আমার মতে একজন লেখক পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল মানুষ। তারপক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না পরিপার্শ্বের কোনকিছু। তিনি মোটামুটি ছোটবড় সবকিছুতেই আক্রান্ত হন। আর তার কাছে লেখালেখির ব্যাপারটা কখনো হয়ে ওঠে যন্ত্রণার ভার নামিয়ে ফেলার মতো। এসবের বাইরে মহৎ কিছু একটা লিখে ফেলার উচ্ছ্বাসাজনিত যন্ত্রণাবোধ তো রয়েছেই যা তাকে দু:স্বপ্নের মতো তাড়া করে নিয়ে বেড়ায় অহর্নিশ।
এসব বলছি কারণ সুহান রিজওয়ানের সাম্প্রতিক উপন্যাস “মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত” পড়তে গিয়ে সব কিছু ছাপিয়ে আমার কাছে একজন লেখকের ভ্রমণ বৃত্তান্তটাই সাবলাইম হয়ে ধরা দিয়েছে। এর বাইরে উপন্যাস আসলে হেঁটেছে চেনা পথ ধরেই। রহস্য উপন্যাসে স্বভাবতই লেখক নির্মাণ করেন গভীর এক ফাঁদ যেখানে মূলত পাঠক আটকে পড়ে এবং শুরু থেকে শেষ অবধি তারা রুদ্বশ্বাসে খুঁজে বেড়ায় সেই ফাঁদ থেকে নিষ্ক্রান্তির উপায়। শেষমেশ লেখক সেই উপায় বাতলে দিয়ে পাঠককে উদ্ধার করেন। রহস্য উপন্যাসের পাঠের আনন্দ তাই অনেকটা দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তির আনন্দের কাছাকাছি। সেই রহস্য নির্মিত হয় যে বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কখনো কখনো তার ইঙ্গিত মিলে যায় উপন্যাসের শুরুতেই আবার ইঙ্গিতবিহীন ভাবে চলতে থাকা গল্পের মাঝখানে হুট করে আবির্ভাব ঘটতে পারে বিশেষ এক পরিস্থিতির যা উপনাসের কুশিলব এবং একইসাথে পাঠকের রহস্যের কেন্দ্র বরাবর টেনে নিয়ে যায়। এসবই আসলে নির্ভর করছে লেখকের মর্জির উপর। যেমন মার্ডার মিস্টিরির কথায় ধরা যাক না! পাঠকের মনোযোগ স্বভাবতই ঘুরে থাকে হত্যাকারীর পরিচয় উদঘাটনের দিকে। অথচ এমনো উপন্যাস আছে যেখানে লেখক শুরুতেই বলে দিচ্ছেন হত্যাকারীর পরিচয় অথচ পাঠকের মনোযোগ আটকে আছে হত্যাকান্ডের মোটিফ নির্ণয়ের দিকে। প্রথাগত থ্রিলার পাঠের প্রক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সুহান রিজওয়ানের উপন্যাস ‘মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত’ পড়তে বসলে সম্ভাবনা থাকবে কিছুটা ধাক্কা খাবার। সামরিক ক্যু, নিরাপদ মুখোশ আন্দোলন, নির্জনপুর বাংলোয় জড়ো বিশেষ মানুষজনের সমাগম এসব কিছুই আলাদা আলাদা ভাবে ইঙ্গিত দেবে এক একটা রহস্যের। কিন্তু দৃশ্যকল্পে লেখক যখন সরাসরি ঢুকে পড়বেন উপন্যাসের সুহান রিসায়াত চরিত্রের জুতোয় পা দিয়ে তখনই পাঠকের চিরাচরিত ছক মিলতে চাইবে না। সমান্তরালে চলতে থাকা রহস্যগল্পগুলোকে ছাড়িয়ে যখন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠবে সুহান রিসায়াতের কণ্ঠস্বর তখনই পাঠকের মনে হবে রহস্য উন্মোচন নয় লেখকের অভিনিবেশ আসলে অন্যকিছুতে। সেই ইঙ্গিতটাও একসময় স্পষ্ট হয়ে উঠবে যখন উপন্যাসের ভেতর একে একে হাজির হবেন অ্যাডগার অ্যালান পো, বোর্হেস, হিচকক, শরদিন্দু এবং কাজী আনোয়ার হোসেন। আর এসবের সাথে রহস্য উপন্যাস লিখতে চাওয়া সুহান রিসায়াতের যোগাযোগটা খুঁজে পাওয়া যাবে খুব সহজেই।
নির্জনপুর বাংলোয় ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ড, সামরিক ক্যু এবং আঠারো বছর আগের নিরাপদ মুখোশ আন্দোলনের ভেতরকার যোগাযোগ খুঁজতে চাওয়া পাঠকের মনোযোগ তখন ঘুরে যাবে সুহানের রিসায়াতের দিকে। পাঠকের মনোযোগ থাকবে সুহান রিসায়াতের হাতে নির্মিতব্য ভবিষ্যত রহস্য উপন্যাসের আদলের দিকে।
সুহান রিজওয়ানের “মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত” সেই অর্থে একটি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ, ভালোমন্দ বিচারের বাইরে যা পাঠকের আলাদা মনোযোগ দাবি করে।
এক বসায় পড়ে শেষ করার মতো বই বোধহয় নয় এটি, কিন্তু সময়ের অভাবে ভুগতে থাকা কর্মজীবী প্রাণী হিসেবে কাজটি করতেই হলো। কিছুটা ডিস্টোপিয়ান, কিছুটা থ্রিলার, আর কিছুটা লিটারেরি ফিকশনের সংমিশ্রণের এই বইটা মাথায় থাকবে অনেকদিন। বাংলাদেশে বর্তমানে লিখছেন যারা, তাদের মধ্যে সুহান রিজওয়ানের লেখা কেন সবসময়ই আগ্রহ নিয়ে পড়ি তার একটা উত্তর আবারও থেকে গেলো এই বইটায়।
মাস্ক-টোয়েন্টি টু মুখোশ আন্দোলন কে কেন্দ্র করে কয়েকজন রাজনীতিবিদ এবং নির্জনপুরেে সেই বৃষ্টির রাতটিকে ঘিরেই "মুখোশের দিন বৃষ্টির রাত"।
আমার কাছে মনে হয়েছে লেখক সাহেব বইটি বেশি রকমের টেনে বড় করেছেন। আরেকটু সংক্ষিপ্ত আকারে লিখলে পড়ার সময় বিরক্ত কিঞ্চিৎ কম লাগতো! যাই হোক, বইটি আমার ভালো লাগেনি।
লেখকরা তো যেকোন সমাজের দর্পন স্বরুপ তাই না? জুলাই মাসে যখন ক্রমে ক্রমে সবাই সোচ্চার হয়ে উঠছে তখন একটা বেশ তর্ক-বিতর্ক করেছিলাম,এই বিষয়ে যে সমাজের যে কোন ইস্যুতে বা যদি শুধু সাধারণ মানুষের কথাই বলি, যাদের ভালবাসা ছাড়া লেখকের সাফল্যর গল্প হয়না, এই মানুষের কোন ক্রাইসিসে উনাদের সামনে আসা বা যোক্তিকতা বিবেচনা করে পাশে দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা কতটুকু।
বর্তমান সময়ে অনেক লেখককেই দেখা যায় কর্তৃপক্ষের আশে পাশে জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর করতে অথবা হয়ত আগ্রহ বা সাহস নেই কোন অসংগতি নিয়ে কথা বলার। না জানি কোন বিপদে পড়ে যাই।
যাই হোক, “মুখোশের দিন, বৃষ্টির রাত” এই বইটা এ বছর বই মেলা থেকে কেনা, বেশ আলোচিত বই। আমি জানিনা শেখ হাসিনার আমলে এত সাহস নিয়ে উনি বইটা কিভাবে লিখেছেন, কারণ কেউতো আসলে আমরা জানতাম না কয়েক মাস পরে স্বৈরাচার থাকবে না। তবে আবার মনে হলো সুহান রিজওয়ানও হয়ত বুঝেছিলেন স্বৈরাচারের দোসররা চিনে শুধু টাকা। অন্য দিকে নজর কম। সে হিসেবে উনি নিরাপদে থাকতে পারবে 😂
এই বইয়ে গল্প যেভাবে এগিয়েছে সেটা এক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। যা যা উল্লেখ করা হয়েছে তা মূলত আমাদের দেশের বিগত আন্দোলনগুলোরই খন্ড খন্ড চিত্র যা লেখক অকপটে তুলে ধরেছেন, এজন্য লেখকের প্রশংসা করতেই হয় কারণ আন্দোলনের প্রতিটি ধাপ এবং সেটা প্রতিহত করতে সরকার দলের চাল পলাতক হাসিনার শাসনব্যবস্থাকেই সরাসরি ইঙ্গিত করে।
অদূর ভবিষ্যতের গল্প যখন বাতাস বিষাক্ত! টিকে থাকার জন্য তৈরি হলো মুখোশ। চাহিদা মোতাবেগ দেশে তৈরি হয় মাস্ক বা মুখোশ তৈরির কারখানা। কিন্তু আমরা তো ধীরে ধীরে না, একবারে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখি তাই না? বেশি লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা কতটা নিচে নামতে পারে যা আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি, সেটাই আরও একবার দেখলাম এই বইয়ে! নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহারের কারণে মুখোশ প্রতিনিয়ত ফুটো হয়ে যায়। এই নিম্ন মানের মুখোশের কারণে মৃত্যু হয় স্কুল ছাত্রের। শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন । যেটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে । দেশের মানুষের কাছে সেটা সমর্থনও পায় । ক্ষমতায় থাকা কর্তৃপক্ষ প্রথমে সব দাবী মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও পরে দেখা যায় ছাত্রদের উপরেই চড়াও হয় । পালিত গুন্ডা বাহিনী দিয়ে হামলা চালান হয় । দেশের মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রন করা হয় কঠিন হাতে । আন্দোলনে ছাত্রদের কিভাবে মারা হচ্ছে তা লুকানো হয় দেশবাসীর কাছ থেকে। কেউ গোপনে সঠিক নিউজ বের করতে চাইলে তাকেও দমন করা হয় শক্ত হাতে। এভাবে আন্দোলন দমণ করে, পরে বেঁছে বেঁছে সবার উপরে বিভিন্ন লেভেলে অত্যাচার শুরু করে যারা যারা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল । এটা শুধু গল্পের শুরু। এরপর এটা রূপ নিয়েছে এক রহস্য উপন্যাসে।
সাহসী প্লট, সুন্দর লেখনী, এন্ডিং একটু ভালো নাও লাগতে পারে কিন্তু ওভারঅল বেশ ভালো একটা বই। সাথে একটু বলেই দেই, সুহান রিজওয়ান বর্তমান সময়ে যারা লেখালেখি করছেন তাদের মধ্যে আমার অন্যতম পছন্দের লেখক। 😃
ভালো হয় নি বইটা। কিছু অংশ একদম অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে; যেমন "তারা তিনজন"! বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক ঘটনার সাথে মিল রেখে গল্প যেভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে এটাকে একটা জগা খিচুরি মনে হয়েছে। গল্পের মধ্যে লেখক চরিত্রের যে নাম দেয়া হয়েছে, সেটা কেন যেন আরও বিরক্তিকর লেগেছে। মনে হয়েছে লেখক গল্পের জন্য নাম খুঁজে না পেয়ে নিজের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন। বইটা গল্প এবং প্রবন্ধের কেমন যেন একটা উদ্ভট মিশ্রণ হয়েছে। পাঠক হিসেবে শুধু একটা গল্প পড়তে চেয়েছি, গল্প/উপন্যাস কেমন হয় বা হওয়া উচিত, সে আলোচনা আশা করিনি গল্প পড়তে বসে। কিন্ত, সুহান রিজওয়ানের ভালো গল্প শোনাবার দক্ষতা যে আছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতির বর্ণনা ভালো হয়েছে এবং আশা করা যায় লেখকের এই দক্ষতা আরো বাড়বে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কে ডিস্টোপিয়ান এক আন্দোলন দেখিয়ে বইটা লেখা কিন্তু গল্পটা মসৃণ না, মাঝে মাঝেই স্পিডব্রেকার মত আটকে গিয়েছি বিরক্ত লেগেছে পড়তে। এই বইটা বেটা রিডিং করেছিলো এখন উনার অভিজ্ঞতাও এমনি ছিলো তার পরেও নিজে পড়ে দেখার জন্য কেনা, কিন্তু খুব একটা ভালো লাগেনি। হয়ত অনেকের কাছে ভালো লাগতে পারে, তাই কিনে পড়ে দেখেন।
I read this book with great expectations,this was my second read of the author.The story telling was okay but I think the author was trying to prove himself at every point why he was writing a thriller which was a bit disappointing and at the same time I find the author a bit misogynistic.Overall I would rate 3/5
ভেবেছিলাম পড়ছি ডিস্টোপিয়ার আড়ালে একটি সামাজিক রূপককাহিনী। বইয়ের মাঝখানে চেহারা পাল্টে হয়ে গেল রহস্যপনাস। সাধারণত রহস্য গল্পে প্রথমে রহস্যটি উপস্থাপন করা হয়, তারপর ধীরে ধীরে চরিত্রগুলোর সাথে পরিচয় হয়, যারা রহস্যটির কারণে সকলেই সন্দেহভাজন। রহস্য থেকে শুরু না করে লেখক চরিত্রগুলোকে সাদা চোখে জানার সুযোগ দিয়েছেন। বইটি সম্পর্কে কিছুই না জেনে পড়তে শুরু করায় এই হঠাৎ ভোল পাল্টানো আমার জন্য বেশ চমকপ্রদ ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত বইটা রহস্যপনাস নয়। ডিস্টোপিয়া, সামাজিক, প্রেম, কিংবা রূপক? হতে পারে। এই সব উপাদান থাকা সত্বেও আমার কাছে এটা সব কিছু ছাড়িয়ে অটোফিকশন। শুধু লেখক নিজেই একজন প্রধান চরিত্র হিসাবে হাজির বলে না, বরং অনেকভাবেই এই বইটাকে মনে হয়েছে লেখকের নিজের সাথে বোঝাপড়া, কখনো লেখক, কখনো পাঠক, কখনো নাগরিক হিসাবে। পাঠকের সাথে সরাসরি আলাপের জায়গগুলো আমি ব্যক্তিগতভাবে উপভোগ করেছি। লেখক যখন তার সাহিত্যের হিরোদেরকে অবতারণা করলেন, সেখানে গদগদ ভাব পড়তে কিছুটা বিব্রতবোধ (cringe?) করেছি। কিন্তু লেখকের মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা আন্তরিক ও অকৃত্রিম। কোন লেখকের থেকে এর থেকে বেশি কিছু আশা করা অন্যায়।
পুরো বইয়েই সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তেজস্ক্রিয়তার কারণে মনে হয় এটি বাংলাদেশের কোনো একটা ভবিষ্যতে। আবার ছাত্রদের বিক্ষোভের সময়কাল বিবেচনা করলে বর্তমানে বা পেছনে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্পষ্ট এবং অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ দুইই হতে পারে। এই সময়কাল বিষয়ক জটিলতা লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয়। কী যেন এক অচলায়তনে আটকে আছে আমাদের সময়।
"ঘুরে ঘুরে নিজেকেই কামড় মারার সেই প্রচেষ্টায় সারমেয়টি এখন ক্রমাগত পাক খায় সাপের মতো। চক্রটি দেখতে কুৎসিত , সহসা এর কোনো শেষ নেই।"
ভালো লেগেছে লেখকের নতুন কিছু করার প্রয়াস, ন্যারেশন, থিম। বেশিরভাগ ক্যারেক্টারের ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট ভালো লাগেনি; মোটিফ ছিল যুক্তিযুক্ত, কিন্তু সারাক্ষণ মনে হয়েছে কী যেন মিসিং কী যেন মিসিং। প্রথমার্ধ অত্যন্ত ধীর গতির, একের পর এক চরিত্রের আগমন ঘটেছে, আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন কয়েকটি গল্প প্যারালালি এগিয়ে গেছে - থ্রিলড না হলেও, ভালো লেগেছে, অন্তত কী হচ্ছে জানার আগ্রহটা বজায় ছিল। ভালো লাগেনি পরের অংশে থ্রিল বাড়াতে যাওয়ার প্রচেষ্টাটাকে; গল্প খেই না হারালেও, পড়তে গিয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়েছি। এই অংশটাকে শুরুর দিকে মনে হচ্ছিল কিছুটা জেবি প্রিস্টলি'র 'অ্যান ইনস্পেক্টর কলস'এর মতো, তবে না, সেটা শেষমেশ হয়নি। কিন্তু ওটা হলেই বোধহয় তুলনামূলক ভালো লাগতো। হত্যা-রহস্যের জট খোলার মুহূর্তটা উপভোগ করিনি। উপভোগ করেছি শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা; যেখানে কোনো রহস্য ছিল না, ছিল বাস্তবতা।
এটা একটা রাজনৈতিক উপন্যাস, তবে রাজনৈতিক সংকটের জায়গাগুলো নিয়ে ততটা আলাপ করা হয়নি। লেখক মূল চরিত্রগুলোর প্রতিশোধ-প্রবণতা নিয়ে মেতে ছিলেন, কিন্তু তাদের সাফারিং বা স্ট্রাগলগুলো সেভাবে চিত্রিত করেননি।
বিখ্যাত লেখক-চলচ্চিত্রকারকে ক্যামিও হিসেবে এনে তাদের মুখ দিয়ে ভারী ভারী কিছু কথা বলানোর ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে থ্রিলার কেন উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য না, সেই যুক্তিগুলো - যুক্তিগুলোর সাথে আমার বক্তিগত ভাবনার মিল আছে।
তিনটা গল্পের পাশাপাশি ছুটে চলা । এর ভেতরে একটা গল্প শুরু হয়েছিল আঠার বছর আগে । পরের দুটো সময় সাময়িক। এই গল্পের পৃথিবী আমাদের বর্তমান পৃথিবী থেকে একটু আলাদা । এই গল্পে মানুষকে বাধ্যতামূলক ভাবে মাস্ক পরতে হয় । কারণ তেজস্ক্রিয়তায় পৃথিবীর একটা অংশের বায়ু হয়ে গেছে দুষিত। এই দুষিত বায়ুতে নিঃশ্বাস নিলে মৃত্যু নিশ্চিত। তাই সবাইকেই পরতে মাস্ক। https://oputanvir.blogspot.com/2024/0...