বর্তমানে সর্বত্র জঁরা বিচরণকারী যে ক’জন দেশিয় লেখক আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন জুনায়েদ ইসলাম। তিনি ‘ফ্যান্টম সাগা’ নামক যে এপিক যাত্রার সূচনা করেছেন প্রথম বই ‘দ্য রেড ডোর’-এর মধ্য দিয়ে তা নেটি-পাঠকদের নিকট পরিচিত ও আলোচিত। প্রথমত তিনি লেখালিখির ক্ষেত্রে তেমন কোনো সীমানার তোয়াক্কা করেন না। ‘যা মন চেয়েছে, লিখেছি’ ধরনের মানসিকতা নিয়ে লিখে গিয়েছেন একের পর এক বই। ইতোমধ্যে ফ্যান্টম সাগার চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তারমধ্যে ‘অসমাপ্ত ক্যানভাস’ ছাড়া পড়া হয়েছে বাকি তিনটে। আজকের আলোচনা সাগার চতুর্থ বই ‘ক্রিমসন’ নিয়ে।
ফ্যান্টম সাগা একটি থ্রিলার সাগা হলেও, এখানে একে একে যুক্ত হয়েছে হরর, ডিটেকটিভ, সাই-ফাই ও গথিক জঁরা। শেষ বইটি লেখা হবে ‘কসমিক’ হিসেবে। লেখক শুধু থ্রিলার কেন্দ্র করে অন্যান্য জঁরার যে মিশ্রণ দেখিয়েছেন তা অনবদ্য। অন্তত এমন কাজ দেশিয় সাহিত্যে এর পূর্বে আর হয়েছে কি না আমার জানা নেই। তার ওপর লেখকের কাজগুলো পুরোটাই রেফারেন্স বেজড। বইয়ের শেষে দেওয়া থাকে ইয়া লম্বা একখানা ‘Easter Eggs and References’-এর তালিকা। তবে লেখক এতকিছু দেওয়ার পরেও ঠিক অভিযোগ মুক্ত হতে পেরেছেন কি না সেটা সঠিকভাবে বলা যায় না। কারণ তিনি পুরোদমে সিনেমা, অন্যান্য বিখ্যাত লেখকের বই, অ্যানিমি, সিরিজ, পিসি গেম ইত্যাদির তালিকা দেওয়ার পরেও কেউ কেউ এসবের সাথে মিল খুঁজে পাওয়াতে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে থাকেন। কিন্তু লেখক যেখানে ইতোমধ্যে সবটা ক্লিয়ার করে দেন উপন্যাসের শুরুতে এবং শেষে... সেখানে বাড়তি প্রশ্নের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা জানা নেই।
বইয়ের চেয়েও বোধ হয় বাড়তি আলাপ বেশি হয়ে যাচ্ছে। ‘ক্রিমসন’-এর নিকট ফিরে আসা যাক। গথিক প্রেক্ষাপট নির্ভর উপন্যাসটি আমাকে কিছুটা নস্টালজিয়া করেছে। তার মূল কারণ আমি ‘Van Helsing’ সিনেমার ডাই-হার্ড ফ্যান। এমনকি ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ পড়ার পূর্বে ভ্যাম্পায়ার-ওয়্যারউলফ কনসেপ্ট ও-ই সিনেমা দিয়ে পুরোপুরি মাথায় গেঁথে যায়। পূর্ব প্রণোদনা হিসেবে ছিল তিন গোয়েন্দা: ভলিউম ২৪-এর ‘মায়া নেকড়ে’ গল্পটি। এরপর তো নানান সিনেমা দেখা। ‘The Twilight Saga’ পছন্দের সিনেমা সিরিজগুলোর মধ্যে অন্যতম। ‘ক্রিমনস’ বইটি আমাকে এই সবকিছুর একটা প্যাকেজ মনে হয়েছে। মিল-অমিলের কেঁচো খোঁড়াখুঁড়িতে যাব না। ইদানীং যে-কোনো কিছু পড়তে নিয়ে মস্তিষ্কে একটা জিনিস সেট করে নিই তা হলো—দুনিয়াতে নতুন বলে কিছু নেই। যা রয়েছে তা কেবল জোড়াতালি। সেক্ষেত্রে শুধু এতটুকু দেখি গল্পটা লেখক কত সুন্দরভাবে গুছিয়ে উপস্থাপনা করেছেন।
সত্য বলতে পুরো ‘ক্রিমসন’ জার্নিটা আমাকে হুকড করে রেখেছে শেষতক। না-হয় একদিনের মাথায় ৪০০ পৃষ্ঠার বই খতম করা সম্ভব হতো না। তার ওপর ‘ফ্যান্টম সাগা’ সিরিজের পূর্বের বইয়ের রেফারেন্স, ওখান থেকে উঠে আসা চরিত্রদের লেখক বেশ ভালো সময় দিয়েছেন। প্রতিটা চরিত্রকে প্রয়োজন মাফিক ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন দেখে ভালো লাগল। দু-তিনটে চরিত্রের সফলতা থেকে ব্যর্থতা চোখে পড়েছে কিছুটা। ওসব ধর্তব্যের বিষয় নয় যদিও। ‘ওয়াইগিউ বিফ’-এর মতো উপন্যাসে মেদ ছিল। ওটা কিছুটা কাটছাঁট করে কমিয়ে আনা যেত বলে মনে করি। সংলাপে বৈচিত্রতা বলতে তেমন কিছুই ছিল না। এটা পূর্বেও লক্ষ করেছি। সবাই একই তালে কথাবার্তা বলছে। ইন্টারেস্টিং তেমন কিছুই খুঁজে পাইনি এখানে। তবে লেখকের লেখনশৈলী বরাবরের মতো সহজবোধ্য। টানা পড়া যায়। বোর হওয়ার চান্স নেই বলা চলে। পারিপার্শ্বিক বর্ণনা নিয়ে লেখক খুব একটা মাথা ঘামাননি বোধ হয়। ঠিক যতটুকু একটি দৃশ্যকে ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন, শুধু ওটুকু ব্যবহার করেছেন। অ্যাকশন সিকোয়েন্স বেশ ভালো। উপন্যাসের মাঝে এবং শেষে দুটো ফাইট সিকোয়েন্স রয়েছে, দুটোই উপভোগ করেছি। যদিও ওগুলো ‘ভ্যান হেলসিং’ সিনেমার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল বারবার।
এছাড়া উক্ত উপন্যাসে লেখক নিজস্ব কিছু কনসেপ্ট বিল্ড করার চেষ্টা করেছেন। যেখানে ফিলোসফিক্যাল টাচ থাকলেও, সেইসব আলোচনা কেবল বীজ হিসেবে থেকে গিয়েছে। পরবর্তীতে ওসব নিয়ে আর আলোচনা হয়নি। কেবল ‘আমরা ফ্যামিলি’ কনসেপ্ট ব্যবহার করে পুরো যাত্রাটা শেষ করেছেন। ‘ফ্যান্টম সাগা’ সিরিজটি যে ১৮+ তা ইতোমধ্যে অনেক পাঠক জানেন। ‘রেড ডোর’-এর এক্সট্রিম টার্ম এখানে ব্যবহার না করলেও, কিছুটা হলেও এসেছে তবে সেটা শতকরা ২৫ শতাংশ। লেখক ‘ক্রিমনস’ উপন্যাসে গল্পকে প্রাধান্য দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তার ওপর ঈনা চরিত্রটা নিয়ে যেসব ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ডিস্ট্রাকশনের যে সংজ্ঞা তুলে ধরেছেন তা পুরোপুরি সমর্থন করার মতো না। কিন্তু মানুষের মন-মর্জি বড়ো অদ্ভুত। কখন কী থেকে কী হতে চায়, সেটা কেবলই তারা ভালো জানে। সেদিক থেকে সংজ্ঞাটা ভ্যালিড মনে হবে। স্যাক্রিফাইসের মতো বিষয়টা ইতিবাচক হিসেবে ধরা দেয় এখানে।
গথিক জঁরার সকল টার্ম অ্যান্ড কন্ডিশন লেখক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পূরণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভ্যাম্পিরিজম এখানে যতটা শক্তপোক্ত হয়ে ধরা দেয়, তেমনটা ওয়্যারউলফের ক্ষেত্রে দেয়নি। না দেওয়াটা স্বাভাবিক। ডেড-আনডেড, রিলিজিয়ন, এল্ডার গড নিয়ে আলোচনাটা এখানে ঢুকিয়ে দেওয়া সহজ কোনো বিষয় ছিল না। কিন্তু লেখক সেটা স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তে করেছেন। উপন্যাসের টাইমলাইন সামলানো, ব্যাকস্টোরি, ফ্ল্যাশব্যাক-সহ নানান বিষয়আত্তি শক্ত হাতে সামলানোর প্রয়াস করেছেন। যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে হয় হয় তা হলো সাগার কোয়ালিটি। প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ বই যেহেতু পড়েছি, সেদিক থেকে কোয়ালিটি ড্রপ চোখে পড়েনি। একই ধাঁচে পুরো স্টোরি বিল্ড করেছেন লেখক। যা বেশ ইতিবাচক একটি দিক। তবে সমস্যার সমাধান আশ্চর্যজনকভাবে খুব সহজ হয়ে পড়ে। শুরু থেকে সমস্যা যতটা জটিল মনে হয়, ততটা সমাধানের সময় মনে হয়নি। উত্তেজনার চেয়েও শেষটা জানতে আগ্রহী থাকায় বিষয়টা অনুভব করেছি কম।
Robert W. Chambers-এর লেখা বই ‘The King in Yellow’, টিভি সিরিজ ‘Supernatural’, গেম সিরিজ ‘Dark Souls’, এছাড়া ‘Salems Lot’, ‘Bloodborne’ গেম, ‘Midnight Mass’ মিনি-টিভি সিরিজ, ‘Resident Evil Village’ গেম এবং ‘Dracula’ ছাড়াও আর বেশকিছু সিনেমা, সিরিজ ও গেম থেকে ‘ক্রিমসন’ বইটি ইন্সেপায়ার্ড। তাই, কারও যদি উক্ত তালিকার সবকিছু দেখা ও খেলা হয়ে থাকে, তবে তারা নির্দ্বিধায় বইটি এড়িয়ে যেতে পারেন। অথবা কীভাবে এ সবকিছুর মিশেল ঘটেছে একটা বইতে সেটা জানার আগ্রহ থাকলে পড়তে পারেন বইটি। উপভোগ করাটা মূল উদ্দেশ্য।
আমি আনন্দিত এমন একটি জার্নির সাথে শুরু থেকে থাকতে পেরে। শেষটা শুধু কেমন হয় সেটা দেখার অপেক্ষায়। গথিক জিনিসপাতি নিয়ে আগ্রহ থাকলে বইটি আপনার জন্য। যেহেতু বইটি একটি সিরিজের চতুর্থ বই, তাই এর বেশি আলোচনা করা সম্ভব না। পূর্ণ আলোচনা করতে হলে স্পয়লার চলে আসবে। আর এটা কেবল ফ্যান্টম সাগার পাঠকদের জন্য লেখা হয়নি। হয়েছে অন্যান্য পাঠকদের জন্য। যারা সিরিজটি পড়তে আগ্রহী, তারা জেনে-বুঝে নিজ দায়িত্বে পড়ে নিবেন।
এই সিরিজটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অতটা পরিচিত লাভ না করার পিছনে কয়েকটি কারণ অবশ্য রয়েছে। তবে আশা করছি, ভবিষ্যতে অনেক পাঠকদের নিকট সাগাটি পরিচিত লাভ করবে। ইয়াং অ্যাডাল্টের ফ্যানরা সিরিজটি লুফে নিতে পারেন, যদি না বাহ্যিক কোনোকিছু তোয়াক্কা করে থাকেন। মনে রাখতে হবে, সাহিত্যে কোনো বাধা-ধরার নিয়ম নেই। এটি মহাকালের ন্যায় অসীম।
ক্রিমসন | জুনায়েদ ইসলাম | অন্বেষা