এই বইটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪২ সালে। এরপর বিভিন্ন দফায় নতুন এডিশন বেরিয়েছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে গেলেও নতুন এডিশন বেরিয়েছে।
কমিউনিজমের সবকিছু ভালো, ক্যাপিটালিজমের সবকিছু খারাপ- এই বাইনারি ভাবনা বইয়ের মূলকথা। এটা 'ছোটদের রাজনীতি' নয়, এটা 'ছোটদের প্রিয় সোভিয়েত ইউনিয়ন'। বুর্জোয়া, পেটি-বুর্জোয়া সাম্রাজ্যবাদীরা জীবনীশক্তির শেষ বিন্দু দিয়ে কমিউনিজমকে শেষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শেষে জয় হবে কমিউনিজমের, কারণ কমিউনিজম সত্য: সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ছিল, তখন বইয়ের সারমর্ম এমনই ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বইতে একটা নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়, সেখানে বলা হচ্ছে লেলিন স্টালিনের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা, কৃষক-শ্রমিকরা অলস হয়ে গিয়েছিল, উৎপাদন কমে গিয়েছিল; আর ক্যাপিটালিজমের লাল-নীল দুনিয়ার মরীচিকার আকর্ষণ তাদের পথভ্রষ্ট করেছিল।
বইটা পড়তে গেলে কালসংক্রান্ত কিছু অসামঞ্জস্য দেখা যায়। বইয়ের কিছু যায়গা পড়লে মনে হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন এখনও আছে, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়ে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে কমিউনিজমের জনপ্রিয়তা। আবার কিছু জায়গা পড়লে মনে হয় সর্বনাশ হয়ে গেছে। বইয়ের শুরুতে জানলাম কমিউনিজম দোষ ত্রুটির উর্ধ্বে, এর জয় অবশ্যম্ভাবী; তারপর শেষাংশে জানলাম কমিউনিজম খুব ভালনারেবল, নিজেই নিজের সর্বনাশ করতে পারে।
লেখক যদি পুরাতন লেখা কাটছাট না করে সোভিয়েতের পতনের পর সম্পূর্ণ নতুন করে লিখতেন, তাহলে এমন বৈপরীত্যে এড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু লেখক ১৯৪০ এর দশক থেকে ১৯৯০ এর দশক পর্যন্ত দফায় দফায় বইটা এডিট করেছেন। ইতোমধ্যে তরুণ বয়স থেকে বৃদ্ধ বয়সে এসে পড়েছেন, কিন্তু কমিউনিজমের প্রতি লেখকের অন্ধবিশ্বাস দূর হয়নি। ক্যাপিটালিজমে বুর্জোয়াদের শোষণের গল্প সত্য, ক্যাপিটালিস্ট সাম্রাজ্যবাদের সন্ত্রাস সত্য; কিন্তু ক্যাপিটালিজমের ভালোটাও কিছু বলতে হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপকে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাড়াতে বড় সাহায্য করেছিল মার্শাল প্ল্যান, এমন সফল একটা উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ইউরোপ নিয়ন্ত্রণের ঘৃণ্য চাল, সোভিয়েতের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলাটা খুব অশ্লীল ঠেকে। কমিউনিজমের স্বৈরাচারী শাসন সম্পর্কে তো কিছু বলা হলো না। স্টালিনের গুলাগ সম্পর্কে দুটো কথা বললে হতো না? সোভিয়েতে খাদ্যসংকট চলছে, কৃষিখাত ভঙ্গুর, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোভিয়েত মহাকাশ জয়ের রেস খেলছে সেসব জানানোর প্রয়োজন নেই 'ছোটদের'?
বইটা পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের কিশোরদের মগজ ধোলাইয়ের কাজে ব্যবহার করলেও চলতো। কিন্তু আজকের দিনে এই প্রোপাগাণ্ডা বইয়ের অনেককিছুই অপ্রাসঙ্গিক। এই বইটা পড়ে যে ভুল লার্নিং হবে, সেটাকে 'আনলার্ন' করার জন্য বাড়তি পরিশ্রম করতে হবে।
বইটা পড়ার পেছনে একটা আজব কারণ আছে; একটা পলিটিক্যাল জোকসের বই পড়ার জন্য এইটা পড়তে হলো! কৌতুকের বইটা সোভিয়েত ইউনিয়নের ফ্যাসিজমের উপর। তাই একজন বলল ওটা পড়ার আগে তোমাকে সোভিয়েতের ওই সাম্যবাদী জণগণের হালটা বুঝতে হবে। এখন টাইম ট্রাভেল তো আপাতত পসিবল না; তারচেয়ে বরং কোনো মস্কোপন্থি বাঙালি বামের বই পড়। ওদের মুখে সোভিয়েতের অতি সুখ্যতি শুনলে বুঝতে পারবে জনগণের দশাটা।
আজাইরা ব্যাকগ্রাউন্ড থাক। বইটা যে শুধু একপেশেই নয়, তার চেয়েও ভয়ানক কিছু তা প্রথমে সন্দেহ হয় এর অধ্যায় বিভাজন দেখে। স্বাভাবিকভাবে চতুর্থ অধ্যায়ের প্রথমদিকের টপিকগুলো প্রথম অধ্যায়ে না এনে শুরুতে ক্যাপিটালিজমের কোনো স্বাভাবিক আলোচনা না রেখে সংজ্ঞা দিয়েই শুরু হয়েছে বিষ ঝাড়া। এরপর যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যাপারে আসে তখন শুধুই গুণগান পেলাম। পতনের কারণটাও অন্যদের ঘাড়ে চাপানোর মতো। মাঝখানে অনেক বিষয় এসেছে সেগুলো সম্পর্কে মোটামুটি জানাশোনা থাকলেও অনেকগুলো বিষয় সম্পর্কে ভালোমতো জানা হয়ে গেল যদিও বইটা রাজনীতির একটা এলিমেন্টারি বই। নামে ছোটদের রাজনীতি তবে এই ছোট বলতে বাচ্চাকাচ্চা নয় বরং যে বয়সে রাজনীতি বোঝার পরিপক্বতা আসতে শুরু করে সেই বয়সটা ধরা উচিত। ইতিহাস+সাল তারিখ খুব কম এনে শুধু রাজনৈতিক ব্যাপারে ফোকাসড এবং টপিকগুলো বোঝার গদ্য খুব সাবলীল রাখা যেটা পড়তে কোনো বেগ পেতে হবে না।
একপেশে বলে ভেবেচিন্তে পড়ার সিদ্ধান্ত নিবেন যদি কেউ পড়তে চান।
এই বই তো সেই উত্তরই দিচ্ছে। ছোটদের উদ্দেশ্য করে যখন লেখা, তখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা আনা প্রয়োজনীয় ছিল। সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা যেভাবে মহিমান্বিত করেছেন, তাতে বোঝা গেল কেবল সমাজতন্ত্রই স্বীকৃত রাজনৈতিক পন্থা হবার যোগ্যতা রাখে।
পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, গণতন্ত্র, নয়া সাম্রাজ্যবাদ প্রভৃতি বিষয়গুলোকে অত্যন্ত সহজ ও অনুধাবন যোগ্য করে ব্যখা করা হয়েছে। যেকোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তির এই বইটা পড়া উচিৎ রাজনীতির ন্যুনতম প্রয়োজনীয় জ্ঞানটুকু লাভের জন্য।