রেলিং ধরে উঠে দাঁড়াতে গেল জয়িতা। টের পেল হাতে শক্তি পাচ্ছে না। পা পিছলে যাচ্ছে বৃষ্টির পানিতে। কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হবেই। মৃত্যুর আরো অনেক উপায় নিয়ে ভেবেছে। এখান থেকে পড়ে মরে যাওয়ার মতো নিশ্চিত মৃত্যু আর কোথাও খুঁজে পায়নি। শক্ত করে রেলিং ধরে সরু রেলিঙের উপর উঠে দাঁড়াল জয়িতা। পাঁচ ইঞ্চি ইটের রেলিঙে ভারসাম্য রক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। কিন্তু অসীম শূন্যতায় পা বাড়ানোর আগে শেষবারের মতো বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চায়, শেষবারের মতো চারপাশের অন্ধকার, বৃষ্টির শীতল স্পর্শ শরীরের প্রতিটি রোমকূপে অনুভব করে নিতে চায়। চোখ বুজে শেষবারের মতো বৃষ্টির শীতল স্পর্শ অনুভব করে নিলো। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে পা বাড়াতে চাইল জয়িতা...
Shariful Hasan hails from Mymensingh, Bangladesh. He has spent his childhood by the banks of Brahmaputra river. He completed his Masters in Sociology from University of Dhaka and is currently working in a renowned private organization.
Shariful's first novel was published on 2012 titled Sambhala. With two other books, this captivating fantasy trilogy has received widespread acclimation both within and beyond the borders of Bangladesh. The Sambhala Trilogy was translated in English and published from India.
Although his inception consisted of fantasy and thriller, he has later worked on a variety of other genres. These works have been received fondly by the Bangladeshi reader community. Lot of his works have also been published from different publications in West Bengal.
Award- Kali O Kalam Puroshkar 2016 for 'অদ্ভুতুড়ে বইঘর'
প্রথম রিভিউ: এ যুগের লেখকরা মোবাইল ফোনটা যেভাবে এভোয়েড করে যায় মনে হয় যেন মোবাইল বলতে কিছু নাই।এসময়কার গল্প কেউ লিখে না। এটা এ সময়ের গল্প। সুনীল খুব সুন্দর মতো লিখতে পারতো এ গল্পগুলো। এটাও তেমনি একটা সুন্দর গল্প। সুমিকে এভাবে উপস্থাপন করাটা ভালো লাগেনি, যাইহোক লেখক যেভাবে এনেছেন তার চরিত্র সেভাবে ভাবলে আরও সুন্দর লাগে, মানুষের জীবনে কত কিছু হয়, কতরকম মানুষ আসে জীবনে। একটা গল্পে বেশ কিছু রহস্যময় চরিত্র সুমি, ইফতি চৌধুরি, শিহাব। জয়িতার বাবা চরিত্রটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। রাজু-তমাল পার্ফেক্ট ফ্রেন্ডশিপ যাকে বলে। যাই হোক সব মিলিয়ে সুন্দর উপন্যাস। ৩.৫/৫
ভোর ৫:০৫, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
দ্বিতীয় রিভিউ: চব্বিশের বইমেলার একটা প্রিয় ছিলো এটা। বইটার সাথে আমার ব্যক্তিগত কিছু সুন্দর স্মৃতি আছে, পছন্দের কাউকে পছন্দের বই পড়তে দেয়ার পর সে যদি বলে বইটা সে পছন্দ করেছে তাহলে ভালো লাগে, ভালো স্মৃতি। যাই হোক, বইটা একারণেও আমার একটা প্রিয় বই। গল্পটা বন্ধুত্বের, আবার তারচেয়েও বেশি কিছুর। গল্পটাতে অনেককিছু শেখারও আছে, ইফতি চৌধুরী অসুস্থ মানুষ, অপরিচিত প্রতিবেশি তার অসুস্থতার সময় তার পাশে থাকে প্রতিটা ক্ষণ। এমনটাই তো হওয়া উচিত। ধর্মের বইগুলোতে বলে, আত্মীয়স্বজনের চেয়ে প্রতিবেশী আপন বেশি, আগে বুঝতাম না কথাটা, একদিন বাড়িতে চোর আসলো, তখন সাহায্য করবে কে? তাইনা। এটা বইটার একমাত্র সুন্দর দিক নয়। আরও অনেক কিছু আছে, ফ্রেন্ডশীপ, প্যারেন্টিং ইত্যাদি ইত্যাদি, সেসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। বইটা শেষ করার পর প্রথমবার অনেক ভালো লেগেছিলো এবার বিষন্ন লাগছে। এবার বইটা শেষ করে কথা বলার মতোও কেউ নেই।
কিছু গল্প থাকে পড়ার সময় মনে হয় আরে গল্পের এই চরিত্রর সাথে দেখি আমার অনেক মিল, আবার মনে হয় এই জুটির সাথে আমার কলেজ জীবন কিংবা ভার্সিটি জীবনের উমুকের অনেক মিল এই গল্পটা তেমন। মুভিতে একজন ভিলেন কে যখন আপনি সবথেকে বেশি ঘৃণা করবেন তখন সেটা সেই ভিলেন আর পরিচালকের জন্য বিশাল প্রাপ্তি আর যখন কোন বই পড়তে পড়তে আপনার চোখ ভিজে যাবে তখন সেটা সেই বইয়ের লেখকের বিশাল বড় প্রাপ্তি আর এইটা তেমনি একটা বই। জয়িতা, তমাল, নিশিতা, শিহাব, রাজু ও স্নিগ্ধা নামের ছয়জন বন্ধু কে নিয়ে গল্পটা শুরু কিন্তু এর মাঝে আপনার নজর কারবে আরো দুইজন মানুষের তারা হচ্ছে সুমি (কৃষ্ণকলি) আর আমার সব থেকে পছন্দের গুরুগম্ভীর ইফতি চৌধুরি। লেখক এইখানে কিছু কৃপণতা করেছেন অনেক (আমার মতে)। কারণ এই ইফতি চৌধুরি কে নিয়ে আমার মনে অনেক প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই কাহিনীটা শেষ হয়েছে। তাঁর পরেও কিছু কিছু অতৃপ্তিও ভালো লাগে তেমনি এই গল্প।
বইয়ের বাইরের প্যাচাল: আমি খুব অবাক হয়েছি এত সুন্দর একটা বই নিয়ে কোথাও হাউকাউ নাই, এইবারের মেলাতে এমন কিছু বই নিয়ে পাঠিকদের মাঝে হাউকাউ হয়েছে যা বা যেগুলা এই বইয়ের ধারে কাছেও নাই। এইটার কারণ কি আমাদের রুচির সমস্যা নাকি মার্কেটিং কম?
গল্পটা আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে। অবশ্য একটা গল্প বলা যায়না৷ দুটো গল্প শুনিয়ে দিয়েছেন। একটা অসমাপ্ত অপূর্ণতার গল্প, অন্যটা...অন্যটা প্রাপ্তির গল্প বললেও বাড়িয়ে বলা হয়না। মানুষের গল্পগুলো বেশ না? চলার পথের মানুষগুলোর সাথে মিল পেয়ে যায় আবার নিজেকেই বইয়ের পাতাতে বসিয়ে নিক্তিতে বসিয়ে ফেলি।
“ও বন্ধু তোকে, মিস করছি ভীষণ তোকে ছাড়া আর কিছু জমে না এখন”
বন্ধুত্ব আছে বলেই পৃথিবীটা সুন্দর। বন্ধুত্বের কতশত গল্প লেখা হয়, গানের সুরে বন্ধুত্ব আরও পাকাপোক্ত হয়। কফি হাউজের আড্ডায় বন্ধুত্বের সংজ্ঞা হয় অমলিন। এমন কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে আজকের গল্প হোক!
এই গল্পটা ছয়জন বন্ধুর — জয়িতা, তমাল, শিহাব, নিশিতা, রাজু, স্নিগ্ধা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রঙিন গল্প বাঁধা পড়া ছয়জন যেন ভিন্ন অবয়ব। তবুও বন্ধুত্বের বন্ধনে বাঁধা পড়েছে। হয়তো মনের মিলে, কিংবা ভিন্ন কোনো কারণে।
একটি দলের বন্ধুদের মধ্যে সবাই এক থাকে না। এই যেমন তমাল ছেলেটা উড়নচণ্ডী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পড়লেও পড়াশোনায় এখন আর মনোযোগ দেওয়া হয় না। ক্লাস করতে বড্ড অনীহা তার। বন্ধুদের আড্ডাতেও নিষ্প্রভ। কারো সাথে তেমন কথা বলে না। এক সময় নিদারুন অতিকষ্টে সময় পার করা তমাল টিউশনির বদৌলতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পুরনো সে সময়কে এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়? হয়তো জীবনের কাঠিন্য আগে অনুধাবন করেছে বলেই কারও সাথে সহজ হতে পারে না। কেউ সেধে কথা না বললে নিজ থেকে কথা বলা হয়ে ওঠে না। কে জানে, তমালের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই হয়তো এমন।
জয়িতার মনের দুঃখ কেউ বুঝে না। ভালোবাসার মানুষকে অন্যের হতে দেখলে কে-ই বা সহ্য করে? যদিও এ ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলা হয়নি কখনো। তবুও শিহাব যখন নিজেরই কাছের বান্ধবী নিশিতার সাথে সম্পর্কের বন্ধনে বাঁধা পড়ল, নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে জয়িতা। বন্ধুদের আড্ডায় ঠিকই থাকে, কিন্তু কোথাও যেন এক ধরনের শূন্যতা কাজ করে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ভাবনা এখান থেকেই শুরু হয়।
ঠিক তখনই এমন একজনের আবির্ভাব হয়, যায় সাথে জয়িতার বয়সের বিস্তর ফারাক। ইফতি চৌধুরী নামের সেই বৃদ্ধ মানুষটির সাথে জয়িতার এক ধরনের মধুর সম্পর্ক তৈরি। হয়তো কিছু সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না, এ সম্পর্ক তেমনই। ছাদে বসে ইফতি চৌধুরীর জীবনের গল্প শোনে জয়িতা। একজন মানুষের জীবনের গল্প। ছোটো বেলায় যে তার বাবা-মাকে হারিয়ে ফুফুর কাছে মানুষ। সেই স্কুল জীবন থেকে রোজগারের চেষ্টা করে একমাত্র অবলম্বন ফুফুর ভরসা হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মানুষের জীবন স্বাভাবিক গতিতে এগোতে পারে না। একসময় ছন্দপতন হয়। যে ছন্দপতনে হারিয়ে যায় ছোটবেলার প্রেম। তারপর? গল্পের গতিতে লাগাম টেনে ধরা হয়। সবকিছু জানা হয় না। জয়িতা কি জানতে পারবে ইফতি চৌধুরীর জীবনের গল্প?
উড়নচণ্ডী তমাল টিএসসি চত্বরে একা বসে আছে। ঠিক এমন সময় বোরকা পরা এক মেয়ে পাঁচশ টাকা ধার চেয়ে বসে। অচেনা এক মেয়ে হয়তো বিপদে পড়ে সাহায্য চাইছে, কিংবা হতে পারে অন্য কারণ। এমন মেয়েকে সাহায্য করার কোনো কারণ নেই। তমালও করত না। ঠিক কী কারণে করেছে সে জানে না। হয়তো চোখের মায়ায় পড়েছে। সেই রাতের এক পলক দেখাতেই মেয়েটির নাম দিয়েছে কৃষ্ণকলি। এই কৃষ্ণকলি সাধারণ কোনো মেয়ে নয়। বিপুল জনপ্রিয়তা তার। তবে কেন সে এক অচেনা পুরুষের কাছে সেই রাতে সাহায্য চেয়েছিল? মাঝেমাঝেই তমালের কাছে আসে কৃষ্ণকলি। একসাথে ঘোরে। তমালের ঘোরলাগা জীবনে নতুন কিছু ঘটবে, তারই পূর্বাভাস। এভাবেই একদিন ভুল হয়ে যায়।
ভুল করে নিশিতাও। অপাত্রে ভালোবাসা প্রদান করলে জীবন সুখের হয় না। একটি ভুল থেকে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আড়াল হয়ে যাওয়া নিশিতাকে তার বন্ধুরা খুঁজছে। ঠিক কী কারণে এমনভাবে গুটিয়ে নেওয়া? শিহাবও যেন চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
এই গল্পটা বন্ধুত্বের এক অন্যরকম বন্ধনের। যেখানে ভালোবাসার জন্ম নেয়, কিছু ক্ষেত্রে থাকে তিক্ত ঘৃণাও। আবার যাকে ঠিক পছন্দ হয় না, সে-ই ধরা দেয় সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে। আলাদা কিছু মানুষ, তাদের কিছু গল্প! এক গভীরে থাকা কোনো আর্তনাদ, যা প্রকাশ হয় না। নিজের ভেতরে রেখে গুমরে মরে। আজ সেসব মানুষের গল্প হোক…
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
সামাজিক জনরার গল্পগুলো প্রায়শই মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো হতে পারে। তবে সেই দাগ কেটে যাওয়ার মতো উপস্থাপন কিংবা ভিন্ন কিছু গল্প আজকাল খুব একটা পাওয়া যায় না। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হতাশ হতে হয়। এক্ষেত্রে লেখক শরীফুল হাসানকে আমার ব্যতিক্রম লাগে। বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ, যেখানে রোদেরা ঘুমায় কিংবা ছায়া সময়ের মতো গল্পের স্রষ্টা সামাজিক জনরায় দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন।
লেখকের নতুন সংযোজন “এক নক্ষত্রের নিচে” বইটা কেমন লাগল? খুব যে আহামরি কোনো গল্প লেখক বলেছেন, এমন না। সাধারণ কিছু গল্পকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা একটি গুণ। সেই গুণ দিয়েই লেখক বাজিমাত করেন।
“এক নক্ষত্রের নিচে” সাদামাটা এক গল্প। ছয়জন বন্ধুর এক গ্রুপকে নিয়ে যেখানে মূল আলোচনা। ছয়জন হলেও গল্পের মূল চালিকাশক্তি ছিল জয়িতা আর তমাল। কেননা তাদের দুইজনের মধ্য দিয়েই ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে গিয়েছে। বন্ধুদের মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে। খুনসুঁটি, ঝগড়া বিবাদ, নানান মতামত আদান প্রদান, কেউ হয়তো কাউকে পছন্দ করছে না, আবার কারো সাথে কারো সম্পর্ক একটু বেশিই গভীর। ভালোবাসার মতো ঘটনাও এখানে ঘটে। হয়তো একজন আরেকজনকে পছন্দ করে, ভালোবাসে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। ফলে দেখা যায় যাকে এক পাক্ষিক ভালোবাসা হয়, সে নিজেকে কাছের বন্ধুটির সাথেই ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে গিয়েছে।
বন্ধু মহলে একজন আরেকজন থেকে ভিন্ন হবে স্বাভাবিক। যেমন তমাল। যাকে জয়িতা পছন্দ করত না। কিন্তু এক সময় এই তমালের উপরই নির্ভরশীলতা বাড়ে। কেননা মানুষ এমন এক প্রাণী, যাকে দূর থেকে বোঝা যায় না। কাছে এলে অনুধাবন করা যায়। তখনই বোঝা যায় ঠিক আর ভুলের ব্যবধান। দূর থেকে অপ্রিয় মানুষ হুট করে প্রিয় হয়ে ওঠে, আবার খুব প্রিয় কোনো ব্যক্তি কাছে এলে অপছন্দের হয়ে যায়।
শরীফুল হাসানের লেখা আমার ভীষণ পছন্দের। সাবলীল ভঙ্গিতে তার রচনা সবসময় মনে ধরে। খুব যে কাঠিন্য ভিড় করে এমন না। তবুও ভাবনার জগতে আঘাত করে। আগেই বলেছি, “এক নক্ষত্রের নিচে” আহামরি কোনো গল্প নয়। তবুও আমার কাছে অসাধারণ হয়ে উঠেছে। কেননা, এখানে এমন কিছু বন্ধুত্বের কথা বলা হয়েছে— যা কখনো ভালো বা খারাপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। মানুষ মাত্রই ভুল করে, সেই ভুল কখনো কখনো অনেক বড়ো একার ধারণ করে। মানুষের স্বাভাবিক স্বভাব এখানে লেখক দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। একই সাথে তুলে ধরেছেন, কেউ কেউ মুখ লুকিয়ে পালালেও কিছু বন্ধু এমন থাকে যারা বন্ধুত্বের জন্য অজস্রবার ত্যাগ করতে পারে। হয়তো শুরুতে কেউ সেসব মানুষদের মূল্য দেয় না। কিন্তু দিনশেষে মূল্যবান হিসেবে ধরা দেয়।
শেষটা ভীষণ ভালো লেগেছে। লেখকের ট্রেডমার্ক কারো প্রাণ হরণের ঘটনা এখানেও ছিল। যদিও প্রত্যাশিত ছিল বলে অতটা খারাপ লাগেনি। অবশ্য আমি চাইছিলাম এমন কিছু না হোক। তবে শেষের “হ্যাপি এন্ডিং” জাতীয় লেখা ভালো লেগেছে। দূরত্বে বন্ধুত্ব ফিকে হয়ে যায় না, কিছু কিছু বন্ধুত্ব আজীবনের জন্য শক্ত বন্ধনে বাঁধা পড়ে।
মোট কথা, ছিমছাম এক গল্প শেষ করার অনুভূতি অন্যরকম। যদিও শুরুটা কিছুটা হযবরল লাগছিল, কিন্তু যতই পৃষ্ঠা বেড়েছে ভালো লাগার পরিমাণও বেড়েছে।
▪️চরিত্রায়ন :
চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে লেখক শরীফুল হাসানের অনেক বড়ো ভক্ত আমি। খুব সামান্য পরিসরে প্রতিটি চরিত্রকে লেখক যেভাবে ফুটিয়ে তুলেন, খুব কম লেখক এমন কিছু পারেন। কিন্তু এই বইয়ের ক্ষেত্রে এই একটি বিষয়ে আমার আক্ষেপ থেকে গেল। খুব অল্প পরিসরে লেখক সবগুলো চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ছয় বন্ধুর প্রতিটি চরিত্র সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এমন না যে, তাদের কেউ আড়ালে ছিল বা ঠিকঠাক জানা যায়নি।
তারপরও কিছু কথা থাকে। যেমন তমালের পারিবারিক বা অতীতের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় ছিল, যা লেখক খোলাসা করেননি। হয়তো লেখকের মনে হয়েছে, মূল গল্পের সাথে বিষয়টা সামঞ্জস্য নয়; কিন্তু পাঠক হিসেবে আমার জানার আগ্রহ ছিল। একই কথা ইফতি চৌধুরীর ক্ষেত্রেও। ছয় বন্ধুর বাইরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র। তার জীবনের একটা গল্প এখানে বলা হচ্ছিল। কিন্তু হুট করেই ঘটনাপ্রবাহে সেই গল্প থেমে গেল। জয়িতার মতো আমিও জানতে চাইছিলাম কী ঘটেছিল তার জীবনে? পরির সাথে তার বিচ্ছেদের কারণ। লেখক সম্ভবত ইচ্ছে করেই এখানে ধোঁয়াশা রেখেছেন, পাঠককে নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছেন। তবে এমন একটা অপূর্ণ ভালোবাসার গল্প মনে ধরেছে, সময় ও পরিস্থিতির চাপে এভাবেই হয়তো ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না। কিন্তু সম্মান, মর্যাদা ঠিকই থেকে যায়।
উপন্যাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল— কৃষ্ণকলি। তাকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, ভালো লাগেনি। কিন্তু একজন মানুষ কতটা একা হলে এমন হতে পারে! আলোর রোশনাই, চারিদিকে অজস্র মানুষ থাকার পরও কেউ কেউ একা। এই একাকীত্ব ঘোচানোর তাগিদে ভুল পদক্ষেপ নিতে হয়। আসলেই কি ভুল? না-কি জেনে বুঝে ইচ্ছে করেই…
নিশিতার দৃঢ়তা ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে জয়িতাকেও। তমালের মতো উড়নচণ্ডীকে শুরুতে তেমন ভালো লাগে না, কিন্তু একসময় মন জয় করে নেয়। কিছু কিছু বন্ধুত্বকে অনেকে সাপের সাথে তুলনা করে। সেই সাপের সাথেও পরিচয় হয়েছে।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
সম্পাদনার ত্রুটি চোখে পড়েনি। তবে অন্যধারার অন্যান্য বইয়ের সাথে তুলনা করলে এই বইয়ে চোখে পড়ার মতো বানান ভুল ছিল না। দুয়েকটা ছাপার ভুল ছিল, যেটা সব বইয়েই থাকে।
প্রচ্ছদ দারুণ সুন্দর। গল্পের সাথে মানিয়ে গিয়েছে। আমার এমন প্রচ্ছদ ভীষণ ভালো লাগে। বাঁধাইও মজবুত। তারপরও খুলে পড়তে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি।
▪️পরিশেষে, এক নক্ষত্রের নিচে আমাদের চলাফেরার পরও আমাদের গল্প ভিন্ন। প্রতিটি মানুষ আলাদা সত্তা নিয়ে বেঁচে থাকে। ভিন্ন গল্পের রেশ মনে পুষে রাখে। বাহ্যিক অবয়বে সেই গল্পের কাহিনি জানা যায় না। মনের মধ্যে সুপ্ত থাকা সেসব গল্প মাঝেমাঝে হাহাকারের জন্ম দেয়। ইচ্ছে করে কাউকে বলে হালকা হতে। সেই সুযোগ কি সবসময় পাওয়া যায়?
▪️বই : এক নক্ষত্রের নিচে ▪️লেখক : শরীফুল হাসান ▪️প্রকাশনী : অন্যধারা ▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২২৪ ▪️মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২/৫
জীবনে ভালো বন্ধুভাগ্য সবার হয় না। সত্যিকারের বন্ধু জীবনে যারা পেয়েছে তাঁরা জানে আসলে বন্ধু মানে কী। বন্ধু শুধু একসাথে ভার্সিটিতে আড্ডাবাজি নয়। বন্ধু মানে বিশ্বাস, ভরসা, বিপদে পাশে থাকা আরো কত কী।
অনেকে বলে ছেলে মেয়ে কখনো ভালো বন্ধু হতে পারে না। বন্ধুত্বের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক চলে আসে। আচ্ছা আসলেই কী সবসময় তাই হয়? হতেও পারে কখনো কখনো।
এই গল্পটা ছয়জন বন্ধুর — জয়িতা, তমাল, শিহাব, নিশিতা, রাজু, স্নিগ্ধা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রঙিন গল্প বাঁধা পড়া ছয়জন যেন ভিন্ন অবয়ব। তবুও বন্ধুত্বের বন্ধনে বাঁধা পড়েছে। হয়তো মনের মিলে, কিংবা ভিন্ন কোনো কারণে। আজকে বন্ধুত্বের সুন্দর কিছু গল্প বলা যাক। যারা হয়তো এক নক্ষত্রের নিচে বসবাস করেও বিচিত্র তাঁদের খেয়াল।
~জয়িতার কথা~
বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তবুও যেন মাঝে মাঝে নিজেকে বাবা মায়ের থেকে আলাদা লাগে জয়িতার। নিজের মনে একা একা থাকে। ভালোবাসে কবিতা। আর হয়তোবা শিহাবকে! কিন্তু শিহাব এখন নিশিতাকে ভালোবাসে। জয়িতার নিজেকে আরও একা লাগে। শিহাবকে ছাড়া বাঁচাটা অন্যরকম! চোখের সামনে নিশিতা শিহাবের মাখামাখি প্রেম সেটাও সহ্য করতে কষ্ট। কী করবে জয়িতা? জীবনটাকে আবার গুছিয়ে নেয়া দরকার তাঁর।
গভীর রাতে জয়িতা একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেয় এবং চুপিচুপি ছাদে চলে আসে। কিন্তু সেখানে দেখা হয় ষাটোর্ধ্ব ইফতেখার চৌধুরীর সাথে। জয়িতাকে তিনি তাঁর জীবনের গল্প বলতে শুরু করেন। জয়িতার বেশ ভালো লাগতে শুরু করে ইফতি চৌধুরীর জীবনের গল্প। ওদিকে বাবার বন্ধুর ছেলে আফতাব এসে হাজির বাপসহ। কানাডা প্রবাসী এই ছেলে জয়িতাকে বিয়ে করতে চায়!
~ তমালের ছায়া~
বাড়িতে সৎ মা। বাড়ি ফেরার তাই নেই তেমন তাড়া। সবাই যখন বাড়ি যায়, তমাল হলেই থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রটির মতো খামখেয়ালি, ছন্নছাড়া ছাত্র আরো কেউ আছে কী না বলা মুশকিল। ঠিক করে এই ছেলে ক্লাস করে না। লেখাপড়ার দিকে মনোযোগ নেই।
নেশা করে বেড়ায় মাঝে মাঝে। বন্ধুদের সার্কেলে নিজেকে অবাঞ্ছিত ভাবা ছেলেটিকে জয়িতাও পছন্দ করে না। জামাকাপড়ের বিশ্রি দশা, চেহারাও তেমন আহামরি কিছু না। তমাল মানেই বিরক্তিকর একটা মানুষ যেন সবার কাছে।
তবে রাজু আর স্নিগ্ধা ওকে পছন্দ করে। সাথে আছে কৃষ্ণকলি। কৃষ্ণকলি মেয়েটি রহস্যময়ী। তমালের জীবনে হুট করেই যার আগমন। দুজনে একসাথে ঘুরছে, পাশাপাশি থাকছে। কিন্তু তমাল কী কৃষ্ণকলির প্রতি কোনো টান অনুভব করে? কেন ঘুরছে তমালের সাথে মেয়েটি?
~শিহাব ও নিশিতার গল্প~
শিহাব পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলে। নিশিতাকে সে ভালোবাসে। দুজনে সবখানেই জোড়ায় জোড়ায়। দূর থেকে এদের ভালোবাসা জয়িতার নিজেরই সহ্য হয় না। নিশিতা নিজেই অবশ্য শিহাবকে মনের কথা জানিয়েছিল। জয়িতা সেটা পারেনি।
এই দুই কপোত কপোতীর সুখ দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই একদিন কী যেন হলো। নিশিতা শিহাবের সাথে বন্ধুদের কারো দেখা হচ্ছে না। কিন্তু কারনটা কী?
~স্নিগ্ধা এবং রাজু~
এই দুজনের গল্প আসলে বলার মতো কিছু তৈরি হয়নি এখনও। তবে এরা বন্ধুদের আড্ডায় বেশ জমজমাট সদস্য। দুজনে তমালকে পছন্দ করে। এবং স্নিগ্ধা ফোন করে মাঝে মাঝে তমালের সাথে অনেক কথা বলে।
তবে ইদানিং রাজু কিছু একটা মনে চেপে রেখেছে। বলতে চায় কথাটা তমালকে। কিন্তু কী কথা? হুট করে আবার তমালকে কেন বলতে চায়?
গল্পের পরে গল্প আসে। এক নক্ষত্রের নিচে বসবাস করা বিচিত্র স্বভাবের এই চরিত্রগুলোর জীবনের উত্থান পতন, সুখ দুঃখের মিশেলে একটি গল্প এক সুতোয় বাঁধা হয়েছে এই বইয়ে।
~ পাঠ প্রতিক্রিয়া ~
বইটি পড়তে শুরু করি হাসবেন্ডের কথায়। সে বলেছিল গল্পটা সিম্পেল কিন্তু তারপরও ভালো লাগবে। এবং আমি তাঁর কথায় মিল খুঁজে পেলাম পড়া শেষ করে।
শরীফুল হাসানের একটা দক্ষতা হচ্ছে উনি গুছিয়ে গল্প বলতে পারেন। এবং লেখকের বর্ণনাশৈলী বেশ ভালো। একটা সিম্পেল গল্পকে দারুন ভাবে বর্ণনা করেছেন যে পড়তে ভালো লেগেছে। এটা কোনো আহামরি টুইস্টের গল্প নয়। এটাতে তেমন কোনো গল্পের দারুন প্লট নেই। তবুও এক নক্ষত্রের নিচে মনকে অন্যরকমভাবে নাড়া দেয়। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম আমি যেন কোনো আর্ট ফিল্ম দেখছি।
একটা শান্ত, স্নিগ্ধ ভাব আছে গল্পটায়। শুরুর দিকে আগাতে পারছিলাম না। দুই একদিন ব্লকেও ছিলাম যে গল্প চলছে না। তবে আস্তে আস্তে পড়া ছাড়লাম না, আমি এগোতে থাকলাম এবং শেষমেষ বলা যায় ভালো লাগলো।
এক নক্ষত্রের নিচে থাকা আমরা মানুষেরা এমন বিচিত্র স্বভাবের কেন হই কে জানে। তবে লেখক কিছু কিছু বিষয়ে শেষের দিকে আর তাঁদের উল্লেখ করলেন না এটা চোখে পড়েছে। যেমন কৃষ্ণকলি চরিত্রটি।
এটার ব্যাখা জানি না আমি আপাতত তবে হয়তোবা গল্প এগিয়ে নেয়ার প্রয়োজনে তাঁরা বিদায় নিয়েছে। যাই হোক সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে এইটুকু বলবো।
~প্রচ্ছদ, বাঁধাই, টুকিটাকি ~
প্রচ্ছদটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তানিয়া আপুর করা প্রচ্ছদ সবসময়ই বেশ সুন্দর। যেন পুরো গল্পটিকে উপস্থাপন করছে প্রচ্ছদটি। প্রোডাকশন কোয়ালিটি ভালো হয়েছে তবে এমন আঁটসাঁট বাঁধাই থাকলে স্বাচ্ছন্দ্যে পড়া একটু মুশকিল। বই ভালোভাবে খুলে পড়তে কষ্ট হয়। তবে প্রিন্ট বেশ ঝকঝকে তাই পড়তে অসুবিধা হয়নি।
👒বইয়ের নাম : "এক নক্ষত্রের নিচে" 👒লেখক : শরীফুল হাসান 👒প্রকাশনী : অন্যধারা 👒প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৪ 👒পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২২৪ 👒মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা 👒ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৩/৫
লেখক শরিফুল হাসান আমার অন্যতম পছন্দের একজন লেখক। তাঁর এই উপন্যাসটি 'এক নক্ষত্রের নিচে' দুটি ভিন্ন টাইমলাইনে সংঘটিত হয়েছে, যেখানে দুটি প্রধান চরিত্র আখ্যানটির নেতৃত্ব দিয়েছে। একটি তমালের টাইমলাইন থেকে, অন্যটি জয়িতার। যাইহোক, গল্পের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং চিত্তাকর্ষক দিক ছিলো রহস্যময় ইফতি চৌধুরী, যার যাত্রা এবং ভাগ্য অমীমাংসিত ছিল।
আখ্যানটি জয়িতা, তমাল, নিশিতা, রাজু,স্নিগ্ধা এবং শিহাব নামে ছয়জনের একটি গ্রুপকে ঘিরে। তবে অনেক চরিত্রও এসেছিলো গল্পের ভীরে, যাদের মধ্যে অন্যতম সুমি, ইফতি চৌধুরী এবং তমালের ফুফু। বিশেষ করে সামগ্রিক কাহিনীর গভীরতার জন্যে সুমির ব্যত্তিত্ব নিয়ে আরো আলোচনার দরকার ছিলো। কাহিনী অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে, আখ্যানটি একটি হিমায়িত বিন্দুতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত অনেক সাসপেন্সে ফেলেছে এবং পরবর্তীতে কী ঘটতে পারে তা নিয়ে ভাবিয়েছে। চরিত্রগুলোর জগত, তাদের সম্পর্ক এবং তাদের পছন্দের পরিণতিগুলির আরও গভীর অন্বেষণ করলে আরো বেটার হইতো মনে হইলো। শেষ পর্যন্ত, ভালো সময় কাটিয়েছি বইটির সাথে। রেটিংঃ ৩.৫/৫ এক নক্ষত্রের নিচে শরীফুল হাসান প্রকাশনী: অন্যধারা
❛বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মতো রঙিন জীবন আর নেই। বন্ধু ছাড়া লাইফ একেবারে বেসম্ভব মনে হয়। ক্লাস, আড্ডা, ক্লাস ফাঁকি, আলাদা গ্রুপ আর সেই গ্রুপে লুকানো কপোত কপোতী এইসবই তো রঙিন চশমা ওয়ালা জীবনের ছন্দ। তবে সময়ের পরিক্রমায় এসব বদলে যায়। তাইতো, বাড়লে বয়স ছোট্টবেলার বন্ধু হারিয়ে যায়!❜
রঙিন চশমাওয়ালা জীবনে আছে জয়িতা, তমাল, নিশিতা, শিহাব, রাজু আর স্নিগ্ধা এই হেক্সার দল। এদের মধ্যে তমাল একটু অদ্ভুত স্বভাবের হলেও বাকিরা নিজেদের মতো। ক্লাস করে, আড্ডা দেয়। জয়িতা সুন্দর, কোমল স্বভাবের মেয়ে। কিন্তু কী এক কষ্টে তার জীবনটার আর কোনো মানেই তার কাছে নেই। পছন্দের মানুষটা যখন তারই সামনে তারই বান্ধবীর সাথে প্রেমের সম্পর্কে থাকে তখন বন্ধুত্বের খাতিরে নিজেকে বাপ্পারাজের ভূমিকায় অবতীর্ণ করা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু কত সহ্য করা যায়? তাইতো এক বর্ষণের রাতে জয়িতা চড়ে বসলো ছাদের কিনারে।
নিজেকে শেষ করার দ্বারপ্রান্তে হ্যাঁচকা টানে আবিষ্কার করল নিরাপদ জায়গায়। বছর পঞ্চাশের এক লোক তাকে বাঁচিয়ে এনেছে। এই থেকে শুরু হলো ইফতি চৌধুরী নামক অসম বয়সের এক লোকের সাথে জয়িতার সুন্দর এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
তমালের জাগতিক বিষয় নিয়ে আশা নেই। সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও নিয়মিত ক্লাস করে না। পড়ে পড়ে ঘুমায় আর মাঝেমধ্যে নেশাপানি করে। ছয়জনের গ্রুপে সে বেমানান। তবুও চলছে। রাত বিরেতে ঘুরে বেড়ানো, মাঝেমধ্যে একটু গল্প লেখা এই করে সময় কাটে তার। বন্ধুদের সাথে আড্ডাও দেয়। তবে জয়িতাকে দেখলেই কেমন যেন গুটিয়ে যায়। কেন এমন হয়?
জয়িতা তমালকে একেবারেই পছন্দ করত ��া। নেশা ভাং করে, ক্লাস করে না একটা ছেলে তাদের দলে আছে শুধু রাজুর জন্য। রাজুর সাথে বেশ সখ্যতা আছে। কিন্তু তাতে কী? তবে হুট করেই কী হলো তমালকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করল জয়িতা। কাউকে কাছে থেকে না জানলে তার সম্পর্কে আসল ধারণা আসে না। তমালের সম্পর্কেও ধীরে ধীরে ধারনা বদলে যায়। তবে এ পরিবর্তনের উৎস কী?
তমালের ভেগাবন্ড জীবনে হুট করে এক বোরখাওয়ালির আগমন। রাত বিরেতে তমালের পাশে বসে একদিন পাঁচশ টাকা ধার চেয়ে বসে। অদ্ভুত ঠেকলেও কৃষ্ণকলি নাম দেয়া সে মেয়েকে ধার দেয় ফেরত পাবে না সে আশাতেই। তবে আশা করলেই হবে তাই কী? ধারের ফেরত বিকাশের মাধ্যমে হলো আর শুরু হলো তমালের সাথে কৃষ্ণকলির নাম না জানা এক সম্পর্ক। না প্রেম নয় সেটা। ঘোরাফেরা, খাওয়া দাওয়া, কথাবার্তায় চলছিল সে সম্পর্ক। কিন্তু বোরখাওয়ালি যা চায় সেটা আদায় করে নেয়। এবং নিলোও। সেটা কী?
তিন বছরের বন্ধুত্বের মধ্যে আচমকাই কেমন একটা ছেদ পড়ল। ছয়জনের সবাই কেমন বদলে গেল। নিশিতা আর শিহাবের সেই খিলখিলে প্রেমের সুতা কি কেটে গেল? কেউ বুঝছে না। নিশিতা কী ভুল করলো যার জন্য নিজেকে এভাবে গুটিয়ে নিলো। এদিকে রাজু আর স্নিগ্ধার মধ্যেও কেমন চো রা চো রা ভাব। তমালও বোরখাওয়ালি নিয়ে ঘুরে। মাঝে দিয়ে অপরিবর্তিত শুধু জয়িতা। কেমন লাগে!
বৃষ্টির রাতে বাঁচিয়ে দেয়া ইফতি সাহেবের সঙ্গে প্রায়দিন বিকেলে গল্প করে জয়িতা। গল্প শুনে বলাটাই যৌক্তিক। ইফতি সাহেব তার জীবনের গল্প বলছিলেন জয়িতাকে ধাপে ধাপে। লোকটার গল্প বলার ধরন এত সুন্দর না জীবনের গল্পটাই আকর্ষণীয় কে জানে, তা শোনার জন্য জয়িতা উদগ্রীব থাকে। তবে শেষটা কি জানা হবে? অসম্পূর্ণ গল্পের কি শেষ থাকে?
ছোটবেলার প্রেম পূর্ণতা না পেলেও সেখানে কি মিষ্টতা থাকে? পরির মাঝে সেই কোনকালে দেয়া কথার মূল্য কি আজও আছে? শেষবারের মতো হাতটা ধরা হবে?
এতগুলো মানুষ, যাদের বসবাস এক নক্ষত্রের নিচে। তবুও তারা আপন আলোয় জীবন দেখছে। ভিন্ন কক্ষপথে ঘুরছে। এরমধ্যে কেউ কি কক্ষপথ পরিবর্তন করে একত্রে চলতে পারবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
সামাজিক ধারার উপন্যাসে বর্তমানে আমার অন্যতম পছন্দের লেখক শরীফুল হাসান। সামাজিক জীবন, সমকালীন বিষয় ঘটনা নিয়ে লেখক এত সুন্দরভাবে লেখা সাজান যা মুগ্ধ করে। বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ, ছায়া সময় এর মতো উপন্যাস লিখেছেন তিনি যাকে বিষন্ন সুন্দরের তকমা দেয়া যায়। বেশিরভাগ মানুষ উনাকে ❛সাম্ভালা❜ খ্যাত বললেও আমি বলি, ❛ছায়া সময়❜ খ্যাত শরীফুল হাসান। এমন ধারার আরেকটি সুন্দর উপন্যাস ❝এক নক্ষত্রের নিচে❞। আহামরি কোনো গল্প নেই। কিন্তু বর্ণনার গুণে মিষ্টি এক আবেশ ছড়িয়ে গেছে ২২৩ পৃষ্ঠার বইতে। আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা গল্পগুলোর মধ্যেই কয়েকজন মানুষের জীবনের গল্প এসেছে। তমাল আর জয়িতার মধ্যে দিয়েই পুরো উপন্যাস এগিয়েছে। কখনো জয়িতার দৃষ্টিকোণ থেকে আবার কখনো তমালের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। গল্পটা বন্ধুত্বের, ভালোবাসার, পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাপোড়ার। কখনো মনে হয়েছে ছন্নছাড়া এরা, শুধু মেশার খাতিরে একত্রে চলছে। কিন্তু কিছুদূর যেতেই দেখা গেল সম্পর্ক, বন্ধুত্ব কখনো কখনো কতটা গভীর হতে পারে। অনুভূতি কতটা প্রাণবন্ত হতে পারে। পুরো উপন্যাসে লেখক প্রতিটা চরিত্রের মাঝে তাদের গল্প, মনের ভাবনাগুলো দারুণভাবে প্রকাশ করেছেন। শুরুর দিকে ভাবছিলাম টিপিক্যাল কিছু হবে। একদলে ছয়জন আছে এদের মধ্যে তিনজোড়া কাপল বাইর হবে। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না করবে। এরপর কারো মিল হবে, কারো হবে না। কেউ বি ষ খাবে, কাহিনি খতম। কিন্তু আমার চিন্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লেখক কত সুন্দর একটা গল্প বলে গেলেন। হিসেব করলে ব্যাপারটা অনেকটা একইরকম হলেও গল্পের ধরন, কাহিনির গভীরতা আর পরিণতি মিলিয়ে কোমল একটা উপন্যাস ছিল। পৃষ্ঠা যত এগিয়েছে ততো গেঁথে গেছি ঘটনার সাথে। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রঙিন দিন গুলোও যেন স্মৃতির ক্যানভাসে একটু করে ভেসে এসেছিল। ক্লাস, বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, গ্রুপের মধ্যে কাপল জন্মাতে দেখা, ধানমন্ডি লেকে সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া এসব তো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেরও স্মৃতি। খালি জীবনে রাজু বা শিহাবের উপস্থিতি ছিল না। কেউ প্রেমে টেমে পড়েনি। শেষটা দারুণ ছিল। শেষের আগে দিয়ে লেখক তমালের এমন একটা দৃশ্যের অবতারণা করেছেন ভাবছিলাম, ❛লেখক আপনি কি আর ভালো হবেন না?❜ শেষটায় এমন কিল্লাই করতে হবে? তবে এবার লেখক দাগ একটু কম দিলেও পুরোপুরি ভালো হননি। মানুষ ঠিক ই মা রছেন, যদিও ধারনা করেছিলাম বলে চোট লাগেনি তেমন। গল্পটা বন্ধুত্বের যেমন ছিল, তেমন ছিল বিশ্বাসঘা তকতার। মন ভাঙার, বিশ্বাস ভঙ্গের। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারা কিংবা কাপুরুষতার প্রমাণও ছিল। এরকম মানুষ তো ডানেবামে তাকালেই দেখা যায়।
এক নক্ষত্রের নিচে কতগুলো গল্প কিন্তু তার খোঁজ পায় কয়জন?
চরিত্র:
মূল চরিত্র জয়িতা আর তমালকেই ধরা যায়। তাদের মাঝেই বাকিদের চরিত্র ফুটে উঠেছে। এবং যার যার চরিত্রে তারা যথেষ্ঠ ছিল। ভালো এবং মন্দের মিশেল যেমন ছিল তেমন ছিল সহজ সরল নিশিতাও। বন্ধুত্বের প্রগাঢ়তা এই কয়জন মানুষের মধ্যে এত সুন্দর ছিল যেটা দারুণ লেগেছে। বিপদে যেমন কিছু বন্ধু পিঠ বাঁচিয়ে চলে তেমন কেউ আছে চরিত্রের বিপরীতে গিয়ে সাহসিক কাজ করে বসে। এতসব চরিত্রের মাঝে ইফতি চৌধুরী অবশ্যই আমার মন কেড়ে নিয়েছে। সে অমীমাংসিত, অধরা একজন চরিত্র হিসেবে আবির্ভাব হয়েছিলেন। তার ব্যক্তিত্ব, জীবনের রহস্য দারুণ ছিল। তবে তমালকে নিয়ে কিছু অধরা রহস্য ছিল, যা একটু জানতে পারলে ভালো লাগতো। কৃষ্ণকলির চরিত্র ভালো লেগেছে। এমন একজন মানুষের চরিত্র আর বিচিত্র জীবন অস্বাভাবিক হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এক্ষেত্রে তমালের আচরণ মনঃপুত হয়নি।
প্রচ্ছদ:
প্রচ্ছদ এক কথায় দারুণ। দেখলেই ভালো লাগে ধরনের প্রচ্ছদ।
❛জীবনে কত ঘটনা ঘটে। কিছু ঘটনা মনে দাগ ফেলে যায় কিছু দাগ আবার ক্ষতের সৃষ্টি করে। সময়ের ব্যবধানে ক্ষত শুকিয়ে যায়। তবুও জীবন চলে যায়। এক নক্ষত্রের নিচে কত গল্প, কত বিচিত্রতা!❜
এই যুগের প্রেম কাহিনি হচ্ছে সবথেকে দূর্বল প্রেম কাহিনি। গল্পেও এবং বাস্তবেও। বাস্তবেও কারন প্রেম-ভালবাসার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, কষ্টের এবং একই সাথে আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে প্রিয় মানুষের জন্যে অপেক্ষা করা। যা এখন নেই, না মেসেজের রিপ্লাই এর অপেক্ষা সেই অপেক্ষা না! এই অপেক্ষা নেই, প্রিয়জন হারানোর ভয় নেই বলেই বাচ্চারা এখন ভালবাসা আসলে কি তা উপলব্ধি করতে পারেনা, পারে তখন যখন ছ্যাকা খায় আর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। যাই হোক লেখক ভালই চেষ্টা করেছেন ভাল একটা গল্প দাড় করানোর। কিন্তু ত্রুটি ছিল তেমন ইন্টারেস্টিং কোনো ক্যারেক্টার ছিলনা এবং গল্পের প্রথম হাফে কিছুই হয়নি আর শেষটা অনেকটা হুমায়ুন আহমেদ টাইপ হুট করে শেষ। শরিফ ভাইয়ের বই পড়ার সময় আমি সবসময়ই তার চরিত্রগুলো, ক্রিয়েট করা সিচুয়েশনগুলো চোখের সামনে দেখতে পাই এবং একটানা পড়েও যেতে পারি এই জন্যে। শরিফ ভাইকে এজন্যে ক্রেডিট দিব। ওভারঅল ভালই ছিল, কিন্তু এই ডিজিটাল যুগের প্রেমের গল্প কখনোই আমাকে টানেনা তাই এবং চরিত্রগুলো একদম সাদামাটা ছিল তাই ৩।
কলেজ জীবনের দিনগুলো সবাই পার করে থাকে। কিন্তু এই পথে যে উত্থান পতন আসে তার মাত্রা ঠিক কতটা হতে পারে?
বন্ধুত্ব যখন ভালবাসায় পরিনত হয় তখন মনে এক ভয় জাকিয়ে বসে।এই ভয় বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাওয়ার,বন্ধু হারানোর ভয়। তবে কিছু মানুষ হয় ভাগ্যবান। তাদের না হারায় বন্ধুত্ব না হারায় ভালবাসা। কম বয়সে করা ভুল গুলো মানুষকে কোথায় নিয়ে দাড় করায় এবং তার পরিনতি কি হতে পারে?ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব কখনোই নয় কিন্তু ভুলে যাওয়া কি এতই সহজ? মায়ের ভালবাসা বাবার আদর জীবনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে? আচ্ছা, শৈশবের বন্ধুকে কেন কেউ দূরে সরিয়ে দিয়ে থাকতে পারে,এমন কি তার মুখদর্শনেও আসে বিরক্তি?
একে একে অনেক গুলো প্রশ্ন করে ফেললাম।এর উওর গুলো লেখক এই বইটিতেই সাজিয়ে দিয়েছেন প্রতিটি চরিত্রে। আমাদের চারিপাশে শিহাবের মত অজস্র লম্পট ঘুরে বেড়াচ্ছে,আছে তমালের মত ছন্নছাড়া ও বিবেকবান ছেলে।আরো আছে জয়িতার মত আবেগী ও নিশিতার মত বিপদগ্রস্ত মেয়ে,সঞ্জু ও স্নিগ্ধার মত ভাল বন্ধু। ইফতি চৌধুরীর মত ভালবাসায় ব্যর্থ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সফল একজন মানুষের গল্পও কিঞ্চিৎ শোনার সৌভাগ্য হবে। এই উপন্যাসের একটা মজার বিষয় হচ্ছে আপনি যেমন টা পরিনতি আশা করবেন ঠিক তেমন টা হবে না।চরিত্রগুলো খুবই বাস্তবসম্মত আচরণ করবে। কিছু কৌতুহল দমিয়ে রাখাতেই ভাল তারা তা অনুভব করেছে।
পড়া শেষে মনে হবে আরো কিছু শুনতে ইচ্ছে করছে, কৌতুহল কাজ করছে একটি বিষয়ে জানতে। কিন্তু ওইযে বললাম,কিছু জিনিস অজানা থাকাই ভাল।যা স্মৃতি আছে বরং তাই থাক না, অতীতের অজানা দুঃখের গল্পগুলা জাগিয়ে তুলে কি লাভ।
#এক_নক্ষত্রের_নিচে লেখক: Shariful Hasan প্রকাশনী: Anyadhara অন্যধারা মুদ্রিত মূল্য: ৫৪০ পৃষ্ঠা: ২২৩ জনরা: সমকালীন উপন্যাস
#ফ্ল্যাপ: রেলিং ধরে উঠে দাঁড়াতে গেল জয়িতা। টের পেল হাতে শক্তি পাচ্ছে না। পা পিছলে যাচ্ছে বৃষ্টির পানিতে। কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হবেই। মৃত্যুর আরো অনেক উপায় নিয়ে ভেবেছে। এখান থেকে পড়ে মরে যাওয়ার মতো নিশ্চিত মৃত্যু আর কোথাও খুঁজে পায়নি। শক্ত করে রেলিং ধরে সরু রেলিং এর উপর উঠে দাঁড়াল জয়িতা। পাঁচ ইঞ্চি ইটের রেলিং এ ভারসাম্য রক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। কিন্তু অসীম শূন্যতায় পা বাড়ানোর আগে শেষবারের মতো বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চাইল, শেষবারের মতো চারপাশের অন্ধকার, বৃষ্টির শীতল স্পর্শ শরীরের প্রতিটি রোমকূপে অনুভব করে নিতে চাইল। চোখ বুজে শেষবারের মতো বৃষ্টির শীতল স্পর্শ অনুভব করে নিলো। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে পা বাড়াতে চাইল জয়িতা...
#কাহিনী_সংক্ষেপ:
❝আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন কতদিন আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো; এক নক্ষত্রের নিচে তবু একই আলো পৃথিবীর পারে আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়...❞
গল্পটা বন্ধুত্বের, ভালোবাসার। বন্ধুত্ব যা মানে না বয়স, সীমা, পার্থক্য। জয়িতা, তমাল, রাজু, স্নিগ্ধা, নিশিতা আর শিহাব। ওদের মিলে ইউনিভার্সিটিতে একটা গ্রুপ। একই সাথে থাকে সবাই অথচ সবাই আলাদা। সবাই কোনো না কোনো দিকে একা, বিষন্নতার শিকার। এক নক্ষত্রের নিচে থেকেও সবাই বিচ্ছিন্ন। শিকড়ের খোঁজে হাতরে বেড়াচ্ছে সবাই, ধরেও যেনো ধরতে পারছে না।
এই ৬ জনের বাইরে আছেন আরো ২ জন নিঃসঙ্গ মানুষ। যারা সুখ হাতরে বেরিয়েছে কিন্তু মহাশূণ্যের অতল গহ্বরে থাকা সুখ তাদের নাগালে আসে নি। যা এসেছে তা সাময়িক ভ্রম, সেই ভ্রম যা তাদের আজীবন আবেশে জড়িয়ে রাখবে এক মধুর আঘাতের ক্ষত চিহ্ন হিসেবে। তারা হলেন ইফতেখার চৌধুরি আর কৃষ্ণকলি। বন্ধুত্ব যে বয়স, স্ট্যাটাস মানে না তার বাস্তব প্রমাণ এই দুইজন মানুষ।
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া: দু'শো তেইশ পৃষ্ঠার এই বইটায় প্রথম দিকটা সাধারণ কাহিনী হিসেবে শুরু হলেও শেষটায় আছে হৃদয়স্পর্শী কিছু ঘটনা যা পাঠকের মন কে বিষাদগ্রস্ত করে তুলতে যথেষ্ট। জয়িতাকে বলা ইফতেখার চৌধুরির স্বল্প জীবন গল্প এক আবেশের মতো মনোযোগ আটকে রাখে বইয়ের পাতায়। আছে বন্ধুত্বের মায়াজালে আটকা পড়া মানুষদের আরেকজনের বিপদে নিজের মতো করে এগিয়ে আসার মানসিকতা। আছে কৃষ্ণকলি যে খুব করে চেয়েও আটকে রাখতে পারে নি ভাবনাহীন সেই ছেলেকে। সময়ের সাথে বন্ধুত্ব গুলো পরিণতি পেয়েছে চিরস্থায়ী সম্পর্কে।
বইটাতে আরেকটা মেসেজ দেয়া আছে। বন্ধুত্বের জালে জড়িয়ে গেলেও কেও কেও ঠিক বন্ধু হয়ে উঠতে পারে না। তারা হয় শীতের অতিথি পাখির মতো। প্রয়োজনে কাছে আসে, প্রয়োজন ফুরোলেই চলে যায় বহু দূরে। এড়িয়ে যায় দায়িত্ববোধ, ছিঁড়ে ফেলে বন্ধুত্বের বাঁধন।
সামাজিক প্রেক্ষাপটে লেখা বইটায় লেখক দারুণভাবে বন্ধুত্ব, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা, মৃত্যু, বাস্তব নির্মমতার এবং খুব করে চেয়েও না পাওয়ার যন্ত্রনাটা ভালো মতোই তুলে ধরেছেন। তবে রাজু আর স্নিগ্ধা চরিত্রটাকে আরেকটু বর্নণা করলে বেশ হতো। আর "পরী" মেয়েটা সব পেয়েছি'র দেশে থেকেও অপূর্ণতায় পরিপূর্ণ।
শরীফুল হাসানের “এক নক্ষত্রের নিচে” উপন্যাসটি শুধু গল্প নয়, এটি জীবনের টুকরো টুকরো সত্য, ভালোবাসা, আশা-নিরাশা আর মানবিক সম্পর্কের গভীরতাকে তুলে ধরে লেখা এক অসাধারণ কাজ। বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়—আমরা সবাই একই আকাশের নিচে বাস করি, একই নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত হই, অথচ প্রত্যেকের জীবনযাত্রা ভিন্ন, বেদনা ভিন্ন, আনন্দ ভিন্ন। শরীফুল হাসানের ভাষা সহজ, কিন্তু হৃদয়ছোঁয়া। কোথাও কবিতার মতো মোলায়েম, আবার কোথাও কঠিন বাস্তবতার মতো ধারালো। তিনি এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে পাঠক সহজেই চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে।
এই বই পড়তে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যেটি অনুভব করেছি তা হলো—আমরা যতো দূরেই থাকি না কেন, যতো ভিন্ন জীবনই যাপন করি না কেন, শেষমেশ সবাই একই আকাশ, একই নক্ষত্রের নিচে।
“এক নক্ষত্রের নিচে” একটি আবেগময়, বাস্তবমুখী এবং হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার মতো বই। যারা প্রেম, বন্ধুত্ব, সংগ্রাম আর জীবনের গভীর গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ সংযোজন হবে।
শরীফুল হাসানের লেখা বই মানেই আমার মধ্যে এক আলাদা রকমের এক্সাইটমেন্ট কাজ করে। তাঁর লেখার সবচেয়ে বড়শক্তি মনে হয় বইয়ের একেবারে শুরুতেই পাঠককে হুকড করে ফেলার ক্ষমতা, যেটা তিনি বেশ দক্ষতার সাথেই আয়ত্ত করেছেন। এই বইটাও কিনেছিলাম অনেক আগেই। কিন্তু বারবার পড়া শুরু করেও যেন সামনে এগোনোর তেমন তাগিদ পাচ্ছিলাম না। কারণটা খুব স্পষ্ট, ইফতি চৌধুরীর জীবনের গল্পের সূচনাটাই তখনো ঠিকভাবে শুরু হয়নি। কারণ বইটার প্রতি আমার মূল আকর্ষণই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই চরিত্রটি। আর জয়িতার জীবনের সঙ্গে বারবার নিজের জীবনের এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম। জীবন তো আসলে বদলেরই নাম। পরিস্থিতি বদলায়, সময় বদলায়, ���ানুষ বদলায়। সেই বদলের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার যে চেষ্টা, জয়িতা সেখানে সফল। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর বাস্তবতার এক সুন্দর মেলবন্ধনের গল্প। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে জয়িতার জীবনের ছন্দটাকে লেখক যেভাবে জীবনানন্দ দাশের কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন, সেটি— “আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন কতদিন আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো; এক নক্ষত্রের নিচে তবু একই আলো পৃথিবীর পারে আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয় প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়…”
"বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ" এত ভালো লেগেছিল যে গত দুই মাসে শরীফুল হাসানের বেশ কয়েকটা বই পড়া হয়েছে। এক নক্ষত্রের নিচে তার মধ্যে একটা।
ইউনিভার্সিটি জীবনের বন্ধুত্ব, প্রেম , ভালোবাসা নিয়ে গল্প। বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, ভালবেসে ভালোবাসার মানুষ কে না পাওয়ার যন্ত্রণা সব কিছু এসে জমা হয়েছে দুই মলাটের মধ্যে। লেখক মূলত তমাল আর জয়িতার টাইমলাইন থেকে সম্পূর্ণ ঘটনাবলী সাজিয়েছেন। বাউন্ডুলে তমাল আর নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে বড় হওয়া জয়িতা। ঠিক যেন উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু।বছর খানেক আগে ফেসবুকে কয়েকটা গল্প , উপন্যাস পড়েছিলাম। জগাখিচুড়ী টাইপ, লুতু পুতু কাহিনী না। গল্পের গাঁথুনি ভালই ছিল।
এই বইটা পড়ার সময় আমার অনুভূতিতে আসছিল আমি ফেসবুকের কোন গল্প পড়ছি। স্টোরি টেলিং, প্লট সব কিছুই কোন ভাবেই আমাকে আকর্ষণ করেনি। বিশেষ করে ইফতি সাহেবের সাথে জয়িতার কনভারসেশন গুলো অনেক বেশি দূর্বল ছিল। এক কথায় বইটা আমার তেমন ভালো লাগে নি।
খুব ঠান্ডা মাথার একটা গল্প। খুব সুন্দর ভাবে গল্প তার একক তাল লয় ঠিক রেখে চলছিলো। কিন্তু হটাৎ করেই খুব বিষণ্ণ করে দিয়েছে। এ গল্প বিষণ্ণের, এ গল্প আনন্দের।
জয়িতা, তমাল, নিশিতা, শিহাব, রাজু ও স্নিগ্ধা নামের ছয়জন চরিত্রকে ঘিরে গল্প চলতে থাকে। কিন্তু মূল চরিত্রের ভূমিকায় থাকে জয়িতা, তমাল, শিহাব, নিশিতা, সুমি ও গুরুগম্ভীর ইফতি চৌধুরি। দুটি ভিন্ন সময়ের গল্প সফলভাবে এক তালে বলে গেছেন লেখক। দুটো ভিন্ন কারণেই খুব শক্তিশালী ভাবে গল্পে চূড়ান্ত বিষণ্ণতা ও তৃপ্তি এনে দিতে পেরেছেন। গল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার ও সংযোজনে সামান্যতম কৃপণতা করেননি লেখক। এবারের মেলায় সামাজিক জনরার আধুনিকতম উপন্যাস এটি। সাধু সাধু।
মাত্রই ভার্সিটি জীবন শেষ হলো তাই ভালোই রিলেট করতে পেরেছি উপন্যাসের কাহিনীর সাথে। ব্যক্তিগতভাবে ভালোই ছিলো, খারাপ লাগেনি তবে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে 'তমাল' চরিত্রটি একেবারেই বিরক্তিকর লেগেছে। লেখকের লেখার ভক্ত হিসেবে প্রত্যাশা আরও বেশি ছিলো।