গোয়েন্দা, ফ্যান্টাসি, রহস্য কিংবা ভৌতিক ঘরানায় না লিখেও যে টানটান উত্তেজনার উপন্যাস লেখা যায়, এই বইটি না পড়লে আমার সে অভিজ্ঞতা হয়তো হত না।
এখান থেকে মাত্র ২৫০ বছর আগেও প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে ছিল ছোট ছোট সামন্ত রাজ্য বা জমিদারি। সম্রাট বা সুলতানদের কর দেয়া এবং যুদ্ধে সৈন্য সরবরাহ করা বাদে স্থানীয় রাজাদের হাতে ছিল নিজের ভূমির উপর একচ্ছত্র ক্ষমতা। কিন্তু ইংরেজদের আগমনের পরে এইসব ছোট ছোট নেটিভ স্টেট ধীরে ধীরে ভেঙ্গে বিভিন্ন প্রেসিডেন্সির (প্রশাসনিক অঞ্চল) নিচে চলে আসে।
কিন্তু তারপরেও ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষজুড়ে প্রায় তিনশোর মত নেটিভ স্টেট টিকে ছিল। কিন্তু ভারত স্বাধীনতা পেলে সরকার একসেসান ঘোষণা করে। অর্থাৎ আলাদা করে কোন নেটিভ স্টেট বলে কিছু থাকবে না। সব হবে অখন্ড ভারতের অংশ। অর্থাৎ রাজা, মহারাজার সাথে ঠেলাওয়ালা, রিক্সাওয়ালা, মুঠে এমনকি চোর কিংবার ভিখারীরও সাংবিধানিক কোন পার্থক্য থাকবে না। কারণ সকলের ভোট প্রয়োগের ক্ষমতায় কোন পার্থক্য নেই। অন্য অনেক স্টেট সরকারের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও হায়াদ্রাবাদের নিজাম এবং ত্রিবাংকুর মহারাজা প্রতিবাদ করে। ফলশ্রুতিতে সরকার শক্তি প্রয়োগ করে অঞ্চলগুলো ভারতের অধীনে আনে।
গল্পের প্রেক্ষাপট স্বাধীনতার ৫০ বছর পর। সেই তিনশো স্টেটের একটি অংশ ছিল প্রতাপপুর স্টেট। স্টেটের রাজবাড়ি প্রতাপপুর প্যালেস জীর্ণ অবস্থায় এখনো টিকে রয়েছে কোনভাবে। নেই আগের সেই জৌলুস, বৈভব, আলোর রোশনাই, ভৃত্য-চাকরদের পদচারণার মুখরতা। কিন্তু এতদিন পরেও বনেদিয়ানায় চিড় ধরেনি এতটুকুও। সাবেক রাজা শৌর্যেন্দ্রনারায়ণের পুত্র সংগ্রামনারায়ণের শিরায় শিরায় প্রভাবিত আভিজাত্য, রাজরক্তের অহংকার। কিন্তু পিতাপুত্র দুজনেই অসুস্থ। প্রাক্তন রাজার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে পুরোপুরি, সে এখন অনেকটা জীবন্ত জড়বস্তুর মত আর অন্যদিকে পুত্র প্রতীকী রাজা তিনবার হার্ট এ্যাটাকে শয্যশায়ী। তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন পুত্রবধূ সুবর্ণা আর নাতনী দেবী। সুবর্ণাই খুব যত্ন দিয়ে, মমতা দিয়ে নিজের দাদাশ্বশুর এবং শ্বশুর মহাশয়কে সেবা করে চলেছে। এই কাহিনী মূল চরিত্র সুবর্ণাকেই ধরা যায়।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলছিল। প্রাচুর্য না থাকলে রাজবাড়িতে অভাব ছিল না। ডিভোর্সি সুর্বণা খুব গুছিয়ে একদিন চাকুরী, সমাজসেবা আর অন্যদিকে সংসার দিব্যি সামলে চলছিল। কিন্তু একদিন সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। সদর দরজা খোলা পেয়ে এক সন্ধ্যায় রাজবাড়িতে ঢুকে এলো ভয়ঙ্কর এক বিচ্ছিন্নতাবাদী। সাথে ভয়ংকর সব আগ্নেয়াস্ত্র। যার উপর ৭০/৮০ টা পুলিশ, মিলিটারি এবং সাধারণ মানুষ হত্যার অভিযোগ। যার মাথার দাম সরকার ঘোষণা করেছে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা।
তারপর সম্পূর্ণ অদ্ভুত এক অস্থিরতার মাঝে ঘুরতে শুরু করে গল্পের চাকা। জানতে হলে পড়ে ফেলতে হবে বইটি।
ব্যক্তিগত অভিমতঃ
প্রফুল্ল রায়ের লেখা এই প্রথম পড়লাম। প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গেছেন লেখক। উপন্যাসটি অনায়াসে ২০০ থেকে ৩০০ পৃষ্টা পর্যন্ত করা যেত। তাই বলে এটা বলছি না লেখক তাড়াহুড়ো করেছেন। বরং এটা বলছি যে লেখক অযথা কাহিনী টেনে লম্বা করে ঢাউস সাইজের বই সৃষ্টির লোভ থেকে নিজেকে সংবরণ করেছেন। আর এটা অনেক বড় একটা গুন কিংবা সঠিক সিদ্ধান্ত। আর এই কারণের এই বইটিতে কোথাও বিন্দুমাত্র একঘেমেয়ি আসে না। ভেতরের উত্তেজনাটা টের পাওয়া যায়। উঠতে ইচ্ছা করেনা শেষ না করে।