টেবিলের উপর পা তুলে ব্যোমকেশ পা নাচাচ্ছিল। খোলা সংবাদপত্রটা তার কোলের উপর খোলা। শ্রাবণের কর্মহীন সকালে দু’জনে বাসায় বসে আছে; গত চারদিন ঠিক এইভাবে কেটেছে। আজকেরও এই ক্ষুরধার ধূসর দিনটা এইভাবে কাটবে, ভাবতে ভাবতে বিমর্ষ হয়ে পড়ছিল অজিত। অবশেষে নীরবতা ভেঙে অজিত বলল, ‘খবর কিছু আছে?’
ব্যোমকেশ চোখ না তুলেই বলল, ‘খবর গুরুতর—দু’জন দাগী আসামী সম্প্রতি মুক্তিলাভ করেছে।’ অজিত একটু আশান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, ‘কে তারা?’
‘একজন হচ্ছেন শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন—তিনি মুক্তিলাভ করেছেন বিচিত্রা নামক টকি হাউসে; আর একজনের নাম শ্ৰীযুত রমানাথ নিয়োগী—ইনি মুক্তিলাভ করেছেন আলিপুর জেল থেকে। দশ দিনের পুরনো খবর, তাই আজ দৈনিক ‘কালকেতু’ দয়া করে জানিয়েছেন।’ এইটুকু বলে সে ক্রুদ্ধ-হতাশ ভঙ্গীতে কাগজটা ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। অজিত বুঝল সংবাদের অপ্রাচুর্যে বেচারা ভিতরে ভিতরে ধৈর্য হারিয়েছে। অজিত বলল, ‘শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীনকে তো চিনি, কিন্তু রমানাথ নিয়োগী মহাশয়ের সঙ্গে পরিচয় নেই। তিনি কে?’
ব্যোমকেশ ঘরময় পায়চারি করল, তারপর বলল, ‘নিয়োগী মহাশয় নিতান্ত অপরিচিত নয়। কয়েক বছর আগে তার নাম খবরের কাগজে খুব বড় বড় অক্ষরেই ছাপা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ পাঠকের স্মৃতি এত দূর্বল যে দশ বছর আগের কথা মনে থাকে না।’
‘তিনি একজন চো*র। ছিঁচ্কে চো*র নয়, ঘটিবাটি চুরি করেন না। তার নজর কিছু উঁচু—‘মা*রি তো গণ্ডার লুটি তো ভাণ্ডার। বুদ্ধিও যেমন অসাধারণ সাহসও তেমনি অসীম। আজকাল আর এরকম লোক পাওয়া যায় না।’
শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়ে গিয়েছিলেন এবং প্রকাশ্য আদালতে তার বিচার হয়েছিল। সে সময় কলকাতা শহরে হঠাৎ জহরত চু*রির খুব ধুম পড়ে গিয়েছিল; আজ জহরলাল হীরালালের দোকানে চু*রি হচ্ছে, কাল দত্ত কোম্পানির দোকানে চু*রি হচ্ছে—এই রকম ব্যাপার। তারপর একদিন মহারাজ রমেন্দ্র সিংহের বাড়িতে চু*রি হলো। মহারাজ রমেন্দ্র সিংহ যেমন ধনী তেমনি ধার্মিক। তার মত সহৃদয় দয়ালু লোক আজকালকার দিনে বড় একটা দেখা যায় না। একদিন রাত্রিবেলা চো*র ঢুকে দু’জন চৌকিদারকে অজ্ঞান করে তার কয়েকটা দামী জহরত নিয়ে পালাল। মহারাজের সংগ্রহে একটা রক্তমুখী নীলা ছিল, সেটা তার অত্যন্ত প্রিয়। নীলাটাকে মহারাজ নিজের ভাগ্যলক্ষ্মী মনে করতেন; সর্বদা আঙুলে পরে থাকতেন। চো*র সেই নীলাটাও নিয়ে গিয়েছিল।
ব্যোমকেশ এবং অজিতের কথার মাঝখানে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ এবং দরজায় হাজির স্বয়ং মহারাজ রমেন্দ্র সিংহ! ওনার সেক্রেটারির মৃ*ত্যুর কোন কিনারাই পু*লিশ করতে পারল না। পাঁচ দিন হয়ে গেল, পুলিশ তো কিছুই করতে পারল না; তাই মহারাজ ভাবলেন যদি ব্যোমকেশ কিছু করতে পারে। ব্যোমকেশের কাছে মহারাজের সেক্রেটারির খু*নের তদন্তের ভার এলো ঠিকই কিন্তু তাতে জড়িয়ে গেছে অতীতের একটি চু*রির ঘটনা। কীসের চু*রি? কী আবার, সেটা হলো সেই রক্তমুখী নীলা!
🥐পাঠ প্রতিক্রিয়া🥐
ব্যোমকেশ বক্সী পড়া হলো বেশ বছর পর। এবং এই গল্পটি ভাবছিলাম হয়তো আমার পড়া নেই। কিন্তু নাহ পড়েছিলাম আর কী। যখন আমি রিভিউ লিখতাম না সেই সময়ে পড়া তাই কিছুদূর পড়েই মনে পড়লো আরে এটা তো এমন এমন কাহিনী। তবে পড়ে ফেললাম আবার এবং খানিকটা অনুভূতি ব্যক্ত করি বরং কেমন লাগলো রক্তমুখী নীলা।
নীলা জিনিসটা হীরে, তবে নীল হীরে। অন্যান্য হীরের মত কিন্তু কেবল ওজনের ওপরই এর দাম হয় না; অধিকাংশ সময়—অন্তত আমাদের দেশে—নীলার দাম ধার্য হয় এর দৈবশক্তির ওপর। নীলা হ��্ছে শনিগ্রহের পাথর। এমন অনেক শোনা গেছে যে পয়মন্ত নীলা ধারণ করে কেউ কোটিপতি হয়ে গেছে, আবার কেউ বা রাজা থেকে ফকির হয়ে গেছে। নীলার প্রভাব কখনও শুভ কখনও বা ঘোর অশুভ।
একই নীলা যে সকলের কাছে সমান ফল দেবে তার কোনও মানে নেই। একজনের পক্ষে যে নীলা মহা শুভকর, অন্যের পক্ষে সেই নীলাই সর্বনেশে হতে পারে। তাই নীলার দাম তার ওজনের ওপর নয়। বিশেষত রক্তমুখী নীলার। ব্যোমকেশ কুসংস্কারাচ্ছন্ন গোঁড়া হিন্দু নয়, ভূ*ত-প্রে*ত মা*রণ-উচাটন বিশ্বাস করে না। কিন্তু রক্তমুখী নীলার অলৌকিক শক্তির উপর ব্যোমকেশের অটল বিশ্বাস। এবং এখানেই আগ্ৰহ ছিল যে ব্যোমকেশ বিষয়টি কীভাবে খতিয়ে দেখে।
এবং গোটা গল্প আসলে ছোট পরিসরে তো তাই ব্যোমকেশের বুদ্ধির উপর আপনার ভরসা রাখতে হবে কীভাবে সে খু*নি ধরবে। আগেই যদি বলে বসেন যে কীভাবে বুঝতে পারলো এত তাড়াতাড়ি তবে সে উত্তর ও ব্যোমকেশ নিজে দেবে। তাই আসলে বইটি পড়ার আনন্দে বেশি খুঁত ধরতে পারি না। আমার কাছে মোটামুটি ভালো লেগেছে। তবে আসল ব্যোমকেশের মজা এখানে পাবেন না আগেই বলে রাখছি। ছোট বই, গল্প ও ছোট তাই খুব বেশি আশা নিয়ে না পড়াই ভালো। তবে গল্প ছোট হলেও বেশ উপভোগ্য হবে।
ইচ্ছা আছে ব্যোমকেশের আরো কিছু বই পড়ার। এবং রিভিউ দেয়ার। এই বইয়ের সাথে অভিজ্ঞতা তো ভালোই। দেখা যাক আরো পড়ি কেমন লাগে।
🥐 বইয়ের নাম: "রক্তমুখী নীলা"
🥐লেখক: শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
🥐 প্রকাশনী: আনন্দ পাবলিশার্স