কিছুদিন আগে একটা অদ্ভুত ঘটনা আপনাদের পত্রিকায় চোখে পড়েছিলো কিনা জানিনা। সাতক্ষীরার দিকে বাস করা এক মহিলা তার নিজের পরিবারের ঘুমন্ত মানুষগুলোকে জ্যান্ত মেরে খেয়ে ফেলে। লোকমুখে শোনা যায়, মহিলা না মানুষ ছিলো, না ছিলো অশরীরি। আবার আমাদের এই অতি পরিচিতি ঢাকা শহরেরই নয় দশ বছরের টোকাই ছেলেটা এক বয়স্ক লোকের চোখ তুলে কুকুরকে খাইয়ে দেয়। তারপর আবার সেদিন জানা গেলো এক পরিচিত বড় ভাই তার নিজের মেয়েকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। এইসব অসহ্য ঘটনাগুলো খুব কাছ থেকে যারা দেখেছেন, জেনেছেন তাদের অভিজ্ঞতাগুলোই এই বইয়ে গ্রন্থিত হয়েছে। এখানে একজন অসুস্থ যুবকের শেষ সম্বল, তার ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ফেলার গল্প বলা হয়েছে। আছে অভিমানী অরুন্ধতীর জীবনকথা যে সুদূর ফিলিস্থিনে তার হারিয়ে ফেলা মানুষটিকে একবার দেখার জন্য জনম জনম অপেক্ষারত। অতিপ্রাকৃত অথবা অসহ্যরকম ভালোবাসা বয়ে বেড়ানো এই মানুষগুলোর জগতে আপনাকে স্বাগতম! কিন্তু এই জগতের ভার আপনি বইতে পারবেন কি?
"সাংবাদিক অরুন্ধতী রয় ফিলিস্তিনি নাগরিক (!) খালিদ নাভানকে বললেন, 'যুদ্ধে আপনারা কেমন আছেন, তা-ও জানতে চাই।' খালিদ আমাকে বলল, 'মাশাআল্লাহ। কিন্তু আমাদের এইখানে তো যুদ্ধ হচ্ছে না। ইসরায়েলিরা আমাদের বোমা উপহার দিচ্ছে, আমরা বাড়ি-ঘর-জীবন হারাচ্ছি। এই যে দেখো আমার দুটো নাতি আল্লাহর কাছে চলে গেছে-রিম আর তারিক। রিমের বয়স তিন বছর ছিল মাত্র। তারিককে পরের বছর স্কুলে দিতে চাচ্ছিলাম। আল্লাহর কসম, আমাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। আমার নাতিগুলো কখনো অস্ত্র হাতে নেয়নি, ওরা একদম ছোট্ট ছিল। কিন্তু তবু ওরা এখন আর আমার সাথে নেই। তাহলে এটা যুদ্ধ কীভাবে হয়?"
ছুটিটা চমৎকারভাবে শুরু হলো এ বইটা দিয়ে।
বইটা ভালো লাগার ১ম কারণ হলো বইটা নিয়ে এক্সপেক্টেশন একদমই ছিল না। তাই যখন জিরো এক্সপেক্টেশন নিয়ে বসে ১০ এর মাঝে ২০ পেয়ে গেছি, পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেছি আমি। বারবার মনে হয়েছে, কেন এই লেখকের নাম আমার কাছে পৌঁছাতে এতদিন লাগল? তাই চিন্তা করলাম, আর দেরী করা যাবে না, আপনাদের কাছে এখনি পৌঁছান দরকার। আপনারা যারা ভাবেন, বাংলাদেশে সমকালীন জনরায় ভাল লেখা আসছে না, তারা চোখ বন্ধ করে এই বইটা নিয়ে নেন। বইটা আপনার ভালো লাগবে, লাগবে মানে লাগবেই। আমাকে অবশ্য Nuha Chowdhury আপা যখন রেকমেন্ড করেছিলেন তখন এভাবে বলেন নাই, কিন্তু বলেছিলেন তিনি ভালো লেখেন। সেটা বোঝার জন্যই আমি বইটা পড়ার আগে রকমারিতে গিয়ে যখন কয়েক পৃষ্ঠা পড়লাম তখন বুঝলাম, আমাকে এখন সব বাদ দিয়ে এ বইটাই পড়তে হবে।
বইটা গল্পগ্রন্থ, এখানে স্থান পেয়েছে লেখকের লেখা ৫টা গল্প। প্রতিটা গল্প ৪০০০-৭০০০ শব্দের বেশি হবে না। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, এত অল্প শব্দে এত ভারী গল্প আমি অদ্যাবধি পড়িনি। শক্তিশালী প্লটের গল্প পড়েছি কিন্তু এত অল্প শব্দে এত বাস্তব করে তুলে ধরা, এর ধারাল লিখনশৈলীর সাথে পরিচয় আমার সহসা হয়নি। ৫টা গল্প নিয়েই একটু একটু করে বলে যাই।
১. প্যালেস্টাইন: পোস্টের শুরুতে যে অংশটুকু লিখলাম ওটা এ গল্পের অংশ। লেখক এখানে শুধু আবেগ দিয়ে ফিলিস্তিনের লোকেদের অবস্থা তুলে ধরে পাঠক আটকাতে চাননি। তিনি এর পাশাপাশি একটা গল্পও বলেছেন। গল্পটা আসলে খুবই রিলেটেবল এবং মর্মস্পর্শী। বিশেষ করে গল্পের মধ্যে থাকা চিঠিটা। গল্পটা শেষ করে অসহ্য দুঃখে ডুবে যাবার পরে সংবিত ফিরে পেলে, চোখে দুফোঁটা অশ্রু আবিষ্কার করলে অবাক হবেন না, না করলেই বরং অবাক হবার কথা। আর সেটার পেছনে গল্প'র হাত যতটুকু, তার চাইতে বেশি গল্প বলার ভঙ্গির হাত।
২. অমানুষ: এটা আমার কাছে এই বইয়ের সেরা গল্প। কী দারুণ স্টার্টিং আর কী দারুণ প্রতিটা গল্পবাঁকের এক্সিকিউশন! গল্পের প্রতিটা বর্ণ ইটের মত করে গল্পের দেয়ালের শরীর গড়েছে। ছোট গল্প তো দূরে থাক, এরকম গল্পের উপন্যাস পড়ে তৃপ্তি পেয়েছি শেষ কবে মনে নেই (এমনকি আমার কাছে, ওবায়েদ হকের লেখাকেও ছাড়িয়ে গেছে এই গল্পটা)। চমৎকার আবহ, দূর্দান্ত ভাষা ও শব্দ চয়ন এবং একদম পারফেক্ট চরিত্রায়ন, মুনা নামের চরিত্রটাকে একদম চোখের সামনে এসে দাঁড় করিয়েছে। আর আমি অনুভব করতে পারছিলাম গল্পকথকের প্রতিটি অনুভূতি, আলাদা মানুষ হিসেবে তার বেড়ে ওঠার গল্প বুঝতে আমার একদমই অসুবিধা হয়নি। ৩০০ শব্দে বিষণ্ণতা প্রকাশের কোনো প্রতিযোগিতা হলে এখান থেকে কয়েকটা অনুচ্ছেদ অনায়াসে তুলে দেয়া যেত। এমনকি আলম চাচা নামের চরিত্রটা রীতিমতো ভয় পাইয়ে দিয়েছে আমাকে। সব শেষে ছোট্ট গল্প এদিক ওদিক ঘুরে যেখানে এসে থিতু হয় সেটা আগে থেকে অনুমেয় হলেও, প্রচন্ড তৃপ্তিদায়ক এটা স্বীকার করতেও দোষ নেই। গল্প শেষে একটা বিষণ্ণ অনুভূতিতে আপনার মন ছেয়ে যাবার প্রবল সম্ভাবনা আছে।
৩. কবর: সাতক্ষীরার দিকে বাস করা এক মহিলা তার নিজের পরিবারের ঘুমন্ত মানুষগুলোকে জ্যান্ত মে*রে খেয়ে ফেলে। লোকমুখে শোনা যায়, মহিলা না মানুষ ছিল, না ছিল অশরীরি। আচ্ছা, এবার তাহলে হরর। একটু তো নড়ে চড়ে বসতে হয় তাহলে। হরর ভালো লিখতে পারে এমন লেখক তো বর্তমান সময়ে খুব বেশি চিনিনা। ব্যস পড়তে লাগলাম, পড়তে লাগলাম, ভয়ের আবহও বেশ জমে উঠেছে, আমি টানটান উত্তেজনা নিয়ে গল্পের ক্লাইম্যাক্সের ভূত দেখার জন্য রেডি হলাম। কিন্তু শেষে এসে যে ভূত দেখালেন, সে ভূত আমরা প্রতিনিয়ত দেখি। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম আরো একবার আর মনে মনে লেখককে বললাম, আপনি পারেনও।
৪. ফাঁসি: এ গল্পটাকে মার্ডার মিস্ট্রি থ্রিলার বলা যায়। গল্পটা নিঃসন্দেহে ভাল এবং লেখকের লিখনশৈলীর অসাধারণ পরিচয় পাওয়া যায় এ গল্পেও। সব গল্পেই চরিত্রায়নের ব্যাপারে লেখকের মুন্সিয়ানা টের পাওয়া গেলেও এ গল্পে সেটা আরো বেশি প্রখর হয়ে উঠে। মানে চরিত্র যত ছোটই হোক, গল্পে তার কোনো ইমপ্যাক্ট থাকুক না না থাকুক সেটাকে পারফেক্ট তোলার টার্গেট নিয়েই যেন লেখক নেমেছেন। আর লেখা? দাঁড়ান একটা উদাহরণ দিই-
"... কোনোরকমে তাজরিনকে কোলে নিয়ে দৌঁড়ে রাস্তায় গিয়ে চিৎকার করছিলাম, 'ভাই, বাচ্চাটাকে কেউ বাঁচান।' রাস্তার লোক জড়ো হয়ে মোবাইলে ছবি তোলা শুরু করল, কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এক রিকশাওয়ালা দৌঁড়ে এসে আমাকে আর বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে পাশের ডেল্টা হসপিটালে নিয়ে যায়। ভাগ্যিস, ব্যাটার মোবাইল কেনার পয়সা নেই।"
এই যে লাস্ট লাইনটা, এভাবে একটা লাইন লিখে গোটা জাতির অবস্থা বুঝিয়ে বলার যে যোগ্যতাটা, এটা কী কম কিছু?
৫. অভিশাপ: বইয়ের শেষ গল্প এবং এটা আমাত দ্বিতীয় পছন্দের গল্প। আমাদের লেখায় পথশিশুরা একটা সিনের এলিমেন্ট মাত্র কিন্তু পথশিশুদের বেস করে, তাদের স্ট্রাগল, মানসিকভাবে বেড়ে ওঠা বেস করে লেখা খুব বেশি নেই। হতে পারে, হৃদয়বিদারক এ লেখাটা সে কারণেই আমার মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
তো এই ছিলো 'দেখা অদেখা'র গল্প। গল্পগুলোকে একটা কমন কী-ওয়ার্ডে ফেলতে চাইলে আমার মনে হয় সেটা হবে, 'খবর'। তবে লেখক (হয়তো) এখানে চেয়েছেন, আমরা যেন হেডলাইন দেখে খবর পড়ে চলে না যাই। মানুষ হয়ে যেকোনো খবরের পেছনের খবর, ঘটনার কার্যকারণ পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি। আমি জানি না, তার উদ্দেশ্য এটা কীনা। তবে ম্যাসেজটা আমার কাছে এরকম ভাবেই এসেছে এবং আমার কাছে ম্যাসেজটা লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। বই নিয়ে স্রেফ একটা আফসোসই আছে। সেটা হলো, বইয়ের অন্তত দুটো গল্প দিয়ে লেখক আস্ত উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতেন। আমরা বড় পরিসরে তার লেখা পড়তে পারতাম।
প্রিয় লেখক, আপনি যদি এই পোস্ট দেখে থাকুক তবে জেনে রাখুন, এই বইয়ের মাধ্যমে আমাকে আপনার ফ্যান বানিয়ে ফেললেন। আপনি এরপর যা-ই প্রকাশ করবেন অন্তত একজন পাঠক হলেও, সেটা হবো আমি। আপনি এরপরের ৫টা বই ভালো না লিখলেও, আপনার তার পরের বইটাও কিনবো আমি। কারণ আপনি ভালো লিখবেন সে বিশ্বাস আমার আছে।
২০২৪ সালে বইমেলায় উপকথা থেকে এ বইটা প্রকাশ পেলেও এই বই নিয়ে একটা পোস্টও চোখে পড়েনি। এই ব্যাপারটা খুবই হতাশাজনক। যে লেখক ১০৪ পৃষ্ঠার মাঝে এরকম ৫টা গল্প মলাটবন্দি করার যোগ্যতা রাখেন, তার নাম কেন কেউ জানবে না? তবে আমার ধারণা, তার নাম আজ হোক কাল হোক সবাই জানবেই। গল্প বলতে পারার এইরকম গুণ নিয়ে সবাই জন্মায় না। যারা জন্মায়, তারা হারায়ে যায় না।
"প্যালেস্টাইন " আর "কবর" গল্প দুটো ভালো লেগেছে। থ্রিলার ও রহস্য ঘরানার বাকি গল্পগুলোয় প্রচুর পরিমাণে প্লটহোল। প্রচুর মানে প্রচুর। বিষয়বস্তু জোরালো হলেও এই প্লটহোল আর জোর করে পাঠকের সহানুভূতি আদায়ের ব্যাপার থাকায় বিরক্ত হয়েছি। সব মিলিয়ে পাঠানুভূতি মিশ্র। লেখকের গদ্য সাবলীল, পড়তে আরাম আছে।
কবর আর প্যালেস্টাইন গল্প দুইটাই ভালো লেগেছে। বাকিগুলোতে জোর করে আবেগ ঢেলে দিতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছে গল্প। অভিশাপটাও ভালো এগোচ্ছিল কিন্তু শেষে জোর করে আবেগ।
সবচাইতে বেশি অবাক হয়েছি লেখকের লেখনী আর গল্প বলতে পারার এতো চমৎকার গুণ দেখে। সত্য বলতে, খুব বেশি আশা নিয়ে বইটা ধরিনি। পড়া শেষ করে আসলেই অনেককিছু ভাবতে বাধ্য হয়েছি। হায়রে দুনিয়া! এতো দু:খ কেনো দুনিয়ায়?! পরীক্ষাকেন্দ্র বলেই হয়তো।
বইটা সাজানো হয়েছে পাঁচটা গল্প দিয়ে। প্যালেস্টাইন, অমানুষ, কবর, ফাঁসি আর অভিশাপ। পাঁচটা গল্পই ভালো। আমার সবচাইতে ভাল লেগেছে 'অভিশাপ'। পড়ার পরে খুব বেশিই খারাপ লেগেছে। আমাদের সমাজটা এতোই অন্ধকার, এতোই কুৎসিত!!
সবমিলিয়ে বলবো, চোখ বন্ধ করে বইটা ধরেন। লেখনী আর প্লট খুব বেশিই চমৎকার। আপনার ভালো লাগবেই লাগবে। ভালো লেখার প্রশংসা করাও উচিত, হওয়াও উচিত। অনেক সুন্দর একটা বই।
দেখা অদেখা, প্রথমেই ধন্যবাদ দিবো বাপ্পি ভাই কে বইটা দাওয়ার জন্য এই বইটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বইটা পাঁচে পাঁচ দাওয়া যাবে এমন না প্রত্যেকটা গল্পই পাঁচ দেওয়া যাবে কিছু কথা, আমাদের সমাজের চারপাশে এমন হাজারো নির্যাতিত নিপীড়িত শুভ মুমু আছে যাদের জন্য আমরা কিছু করতে পারি না।লিখতে লিখতে কবর গল্পের শেষ কথাটা মনে পড়ে গেল । আমি আমারা শুধুই একটা ব্যর্থ পৃথিবীর অংশ।
সাদ আহাম্মেদ নামের লেখকের সাথে পরিচয় হল এই বইটার মাধ্যমে। পরিচয়টা পর্বটা এত এত সুন্দর যে, আমি নিজেকেই কথা দিলাম ভবিষ্যতে এই লেখকের কোন বই বের হলে চোখ বন্ধ করে কিনে নিব। এর আগে এমন মুগ্ধ হয়েছিলাম ওবায়েদ হকের লিখা পড়ে। মাত্র ১০৪ পাতার এই বইতে ৫টা ভিন্ন স্বাদের অদ্ভুত মায়াময় ছোট গল্প লিখেছেন তিনি। বলতে গেলে প্রায় পুরো বইটাই আমি চোখ মুছতে মুছতে পড়ে গিয়েছি। কি যে হাহাকার বুকের মাঝে তৈরী হয়েছিল বইটা পড়তে গিয়ে তা যে পড়বে একমাত্র সেইই বুঝবে।
শুরুতে বইয়ের উৎসর্গপত্র পড়তে গিয়েই বেশ বড় একটা ধাক্কা খেয়েছি বুকে। একটা সাদামাটা উৎসর্গপত্র শেষ প্যারায় এসে এভাবে বদলে যাবে তা ঘূনাক্ষরেও ভাবিনি। এরপর আসে ৫টি ছোট গল্প। গল্পগুলো নিয়ে অল্প কথায় নিজের অনুভূতি বলছি:
প্যালে*স্টাইন
যেকোন ভিডিও বা মুভিতে দেখার চেয়ে লিখিত কথাগুলো পড়লে আমার সেটা বেশী হৃদয়ঙ্গম হয়। আপনাদেরও তেমনটা হয় কিনা আমার জানা নেই। তবুও একটু জোড় দিয়েই বলতে পারি, ফিলি*স্তিন নিয়ে যত নিউজ, ডকুমেন্টারি আর ভিডিও দেখে থাকুন না কেন এই লেখাটা আপনাকে তাদের কষ্টের তীব্রতার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌছে দিতে পারবে। অথচ গল্পটা মাত্র ১৯ পেইজের!! এক সাংবাদিকের ইসরা%য়েল ভ্রমণ নিয়ে গল্পটা সাজানো। গল্পটা হয়তো ফিকশন, কিন্তু ফিলি*স্তিনের যে পরিবেশ এখানে দেখিয়েছেন লেখক তা পুরোদমেই বাস্তব। এবং প্রতিনিয়ত নিয়ম করে সেখানে কারো না কারো ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে চলেছে। এই গল্পটা (!) বইয়ের সবচেয়ে প্রিয় গল্প আমার। কত অজস্রবার দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়েছে গল্পটা পড়ার সময় তা আমি নিজেও গুনে রাখতে পারিনি। সেখানে চলমান গনহত্যার ভয়াবহ কষ্টের অনুধাবন যদি এই গল্প পড়েও আপনার ভিতরে না জন্মে, তাহলে জেনে রাখতে পারেন আপনি পৃথিবীর সকল মায়া, ভালোবাসা, আর আবেগের উর্ধে চলে গিয়েছেন। গল্পটার কিছু লাইন এতো করুণ যে আমি যতবার পড়ি ততবার চোখ ভিজে উঠে।
অমানুষ
প্রথম গল্পটা শেষ করার পর বুকে এতো ওজন চেপে বসেছিল যে আমি আর ২য় গল্প পড়ার শক্তি পাইনি সহসা। অনেক পরে যখন পড়া শুরু করলাম তখন আবিষ্কার করলাম এই গল্পের সেটিং একেবারেই ভিন্ন। লিখনশৈলীর ধারটা বজায় থাকলেও, এই গল্পটা অনেকটা মার্ডার মিস্ট্রি টাইপ। তবে থ্রিলের চেয়ে এখানেও আবেগের বাড়াবাড়ি ছড়িয়ে আছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। আর আমি তাতেও মুগ্ধ। গল্পের কিছু বর্ণনা অতিরিক্ত নৃশংস এবং হৃদয়বিদারক। থ্রিলার হিসেবে পড়তে গেলে হয়তো কিছু কমতি, খুঁত চোখে পড়বে। তবুও সব ছাপিয়ে প্রতিশোধের অংশটাই আমার বেশী ভালো লেগেছে। অমন প্রতিশোধই নেয়া উচিত।
কবর
গল্প শুরুর দু'পাতা যেতে না যেতে ভ্রু কুঁচকে উঠেছিল। তাহলে এবার হররে প্রবেশ করাচ্ছেন লেখক! এই গল্পের পুরো সেটিংসটা আগাগোড়া একটা ভয় ভয় পরিবেশ নিয়ে লিখা। গ্রাম্য ডাইনী, জ্বলজ্বলে চোখ, লাশ খেয়ে ফেলা, অন্ধকারের ছড়াছড়ি। ১৭ পেইজের গল্পের ১৪ পেইজ জুড়েই কিছু ব্যাকস্টোরি আর এমন আবহে গল্প এগিয়ে চলে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম এবার লেখক আর আবেগের সুতোটা ধরে টান দিবেন না সম্ভবত। কিন্তু এরপরই শেষ ৩ পাতার ধাক্কা!! করোনা কালীন সময়টার ক্ষুদ্র একটা ভয়াবহ চিত্র এমনভাবে কেউ লিখতে পারে তা আমার দূরতম কল্পনাতেও ছিল না। এমন ভয়াবহ সময়ের মাঝে দিয়ে হয়ত কতো মানুষ আসলেই গিয়েছে। আমরা তার খোঁজ পাইনি, কিংবা পেতে চাইনি। শেষ ৩ পাতা আবারও সেই অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলে পড়তে হয়েছে। বইয়ের ২য় প্রিয় গল্প এটা।
ফাঁসি
বিনা অপরাধে সাজা ভোগ করা এদেশে এতোটাই স্বাভাবিক ব্যাপার যে এসব খবরে এখন আমাদের গা সয়ে গিয়েছে। তবে খবরে থাকা প্রতিটা মানুষের ভিতরের করুণ চিত্রটা যদি আমরা জানতে পারতাম, তাহলে কি এতোটা উদাসীন হয়ে যেতে পারতাম? আমি কখনোই পারিনি। সকল সৃষ্টির কষ্টে আমার বড্ড মায়া হয়। নিজের ফুটফুটে মেয়েকে হত্যার দায়ে ফাঁসি সাজা হয় এক বাবার। কিন্তু আসলেই কি সে মেয়েটাকে হত্যা করেছে? যদি না করে থাকে তাহলে কেনোই বা সে সাজা মাথা পেতে নিচ্ছে? এই গল্পে কিছু ভালো মানের টুইস্ট আছে। থ্রিলারপ্রেমী হিসেবে টুইস্ট ভালো লাগলেও, শেষ পর্যন্ত গল্পটা যথারীতি মন খারাপ করবার মতোই। তবে লেখকের দূর্দান্ত লিখনশৈলীর দরুণ কবীর নামের মানুষটার জন্য বেশ মন খারাপ হয়েছে। বারবার মনে হয়েছিল এর তো একটা বিকল্প সমাধান দেয়া যেতো! আরো একটা ভালো লাগার, দীর্ঘদিন মনে রাখবার মত গল্প।
অভিশাপ
ফিলিস্তিন, ধর্ষন, করোনা আর বিনা অপরাধে সাজা ভোগের ভয়াবহ সব চিত্রের পর এবার লেখক শেষ গল্পে নিয়ে এসেছেন পথ শিশুদের। আশা করি এতোক্ষণে আপনারাও বুঝে গিয়েছেন, এই গল্পে যথারীতি পথশিশুদের জীবনের করুণ আর ভয়াবহ চিত্রটাই ফুঁটে উঠবে। আর হয়েছেও তাই। সমস্যা হচ্ছে লেখক আবেগ নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন আর তাই এমন একটা দৃষ্টিকোণ নিয়ে আসেন গল্পে যে তা প্রবল মায়ার পাশাপাশি দুঃখবোধ আর অস্বস্তিরও জন্ম দেয়। ছোট ছোট বাচ্চাদের এমন পরিণতি আমি আসলে পড়তে পারি না। বেশী কষ্ট লাগে। তবে আমরা চোখ ফিরিয়ে নিলেই তো আর এগুলা মিথ্যে হয়ে যায় না। তাই আরো একবার লেখকের প্রশংসা করে যাই এমন স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে লেখার জন্য। আরো একটা দূর্দান্ত গল্প কিংবা বাস্তবতা!
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৯/১০ ( লেখক গল্পে গল্পে যা উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, তাতে উনি শতভাগ সফল। প্রতিটা গল্পেই রয়েছে ভাবনা চিন্তার খোরাক, রয়েছে আবেগের ছড়াছড়ি আর এসব কিছুই এসেছে সুন্দর সাবলীল আর মায়াময় লিখনশৈলীর হাত ধরে। নিজের ভেতরের মানবিক অনুভূতিটা কতটা তীব্র তা যাচাই করার জন্য এই বইটা পড়ে দেখতে পারেন। সকল ধরণের পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য আমার মতে।)
প্রোডাকশন: উপকথার অন্যান্য বইগুলোর মতোই বইটার প্রোডাকশন গতানুগতিক। প্রচ্ছদটা ব্যতিক্রম। যদিও কন্টেন্ট অনুসারে আমার কাছে দামটা অবশ্যই ভালো। তবুও নতুন লেখক হিসেবে দামটা হয়তো আরো কিছু কম হলে বইটা আরো বেশী মানুষের কাছে পৌছুতো বলে আমার বিশ্বাস। অবশ্য আমি বইটা অনেক অনলাইন বুকশপেই বেশ বড় একটা ছাড়ে বিক্রি হতে দেখেছি। আশা করি সেখান থেকে আপনারা কিনে নিবেন।
‘দেখা অদেখা’ একটা ছোট্ট গল্পগ্রন্থ। পাঁচটা গল্প। আর সারপ্রাইজিংলি প্রতিটা গল্পই মনোমুগ্ধকর। লেখার ভঙ্গিমায় একটা মারাত্মক সম্মোহন আছে। ওই সম্মোহনটা লেখক কোনো ভারী শব্দ অথবা নিখুঁত উপমা দিয়ে তৈরী করেন নাই। সম্মোহনটা তৈরী করেছেন তিনি গল্প বলার জায়গা নির্ধারণ দিয়ে। আরেকটু ব্যাখ্যা করি।
‘থেলমা’ নামে নরওয়ের একটা সুপারন্যাচারাল থ্রিলার জনরার সিনেমা আছে, দুই হাজার সতের সালে মুক্তি পেয়েছিল। এই সিনেমাটা বেশ স্লো, ধীরগতিতে অল্প আঁচে রান্না করা তরকারীর মতো। যারা একটু অস্থির, টানটান থ্রিলার চায়, একশো ষোল মিনিটের এই সিনেমা তাদেরও আটকে ফেলতে সক্ষম শুধুমাত্র শুরুর দৃশ্যটা দিয়ে। ওই দৃশ্যটায় একজন বাবা তার ছোট্ট কন্যা নিয়ে শিকারে গিয়েছেন। বরফের জঙ্গলে দাঁড়িয়ে একটা হরিণের সাক্ষাৎ পেয়েছেন তারা। বাবা বন্দুক তাক করেছেন হরিণের দিকে। কাছেই একটু দূরত্বে নিয়ে তার কন্যা দাঁড়িয়ে আছেন উৎসুক চোখে। বাবা বন্দুকের নলটা ধীরে ধীরে হরিণ থেকে সরিয়ে কন্যার দিকে আনলেন। শেষ।
এটাই ‘থেলমা’ মুভির ‘কেলমা’। এই একটা দৃশ্য দেখেই আপনার উৎসুক মন জানতে চাইবে, পৃথিবীর কোন পিতা তার নিষ্পাপ কন্যার দিকে বন্দুক তাক করবেন? তার সমস্যা কী? তাদের মধ্যে সম্পর্কটা কী? বন্দুক তাক করার উদ্দেশ্য কী? এবং সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন, কেন একজন পিতা হত্যা করতে চাইছেন তার কন্যাকে?
সিনেমায় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় আস্তে আস্তে। যখন আপনি উত্তর জানবেন, আপনি তৃপ্ত হবেন আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে। এই তৃপ্ত হওয়াটাও অবশ্য আরেকপ্রকারের অমানবিকতা। কারণ ওটা দিয়ে কোথাও না কোথাও জাস্টিফায়েড লাগে ছোট্ট কন্যার প্রতি পিতার বন্দুক তাক করাটা। আর এই কাজটা রাইটার হাতে তুলে দর্শককে খাইয়ে দেননি। রাইটার গল্পটা লিখেছেন ওভাবেই, যাতে আপনি পিতা ও কন্যার মাঝখানে তাক করা বন্দুকের নলের ট্রিগার হয়ে ওঠেন।
‘দেখা অদেখা’ ও ‘থেলমা’ ওতপ্রোতভাবে মিশে যায় যে জায়গায়, ওটা হচ্ছে শুরু। আমি ছোটোগল্পের শুরু ও প্রথম প্যারায় সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিই। আমায় আটকাতে হবে ওতে, নয়ত না। শুধু আমায় নয়, অস্থির এই প্রজন্মের অ্যাটেনশন ক্ষমতাও ওরকম। সাদ আহাম্মেদ তার গল্পের শুরুগুলো কতটা ভেবে লিখেছেন আমি জানি না কিন্তু আমি তাকে জানাতে চাই, তিনি ব্রিলিয়ান্ট কাজ করেছেন। আমায় প্রায় ঘাড় ধরে বসিয়েছেন নিজের উপন্যাস লেখা ছেড়ে তার বই পড়তে বসার জন্য। পাঁচটা গল্প, আর প্রতিটা গল্পের স্টার্টিং পয়েন্ট বাছাই করার ক্ষমতাটা তার আউটস্ট্যান্ডিং। ‘দেখা অদেখা’ প্রায় একশো আটাশ পৃষ্ঠার বই। আর পাঁচটা গল্পেরই প্রথম পৃষ্ঠায় সাদ আহাম্মেদ জানাচ্ছেন, বাকি পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে হবে আমায়।
গল্পগ্রন্থের অপেক্ষাকৃত কিঞ্চিত দূর্বল গল্প ‘ফাঁসি’ শুরু হচ্ছে- ‘কবীর ভাইয়ের মে মাসের বিশ তারিখ ফাঁসির তারিখ দেওয়া হয়েছে। বছর দুই আগে উনি উনার বাচ্চাকে নিজ হাতে গলা টিপে হত্যা করেন।’‘অভিশাপ’ নামের গল্পটা শুরু হচ্ছে- ‘১৯৯৮ সালের মে মাসে খুব ভয়ংকর একটা খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, আপনাদের কয়জনের নজরে পড়েছিল আমি জানি না। খবরটা ছিল একটা ১১ বছরের কিশোরের, যে নৃশংসভাবে ফার্মগেটের লুকাস ব্যাটারি মোড়ে বসবাসরত এক বৃদ্ধের চোখ তুলে নিয়ে সেটা রাস্তার কুকুরদের খাইয়ে দিয়েছিল।’‘কবর’ গল্পটা শুরু হচ্ছে সাতক্ষীরার জাদুটোনা করা এক মহিলার সংবাদ দিয়ে, গ্রামজুড়ে রটেছে, যে মহিলা তার স্বামী ও সন্তানকে জীবন্ত পুড়িয়ে খেয়ে ফেলেছে।‘প্যা*লেস্টা%ই*ন’ শুরু হচ্ছে, অরুন্ধতী রয় নামের একজনকে নিয়ে, নামের মিল থাকার কারণে যাকে সবাই প্রথম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে- আপনি দ্য গড অফ স্মল থিংস বইটা পড়েছেন?এবং সর্বশেষ, আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্প, যেটা পড়ে আমি রীতিমতো হা হয়ে থেকেছি কিছুক্ষন, ওই ‘অমানুষ’ গল্পটা শুরু হচ্ছে মুনা নামের এক তরুণীকে দিয়ে, কোনো এক সকালবেলা যার নগ্ন ও রক্তমাখা লাশটা পড়েছিল গল্পকথকের বাসার গেইটের কাছে।
ক্রমানুসারে আমি গল্প পড়িনি। টপকে টপকে পড়েছি। প্রথম পড়েছি গল্পগ্রন্থের তৃতীয় গল্প, কবর। এক ডাইনি মহিলার নিজ স্বামী ও সন্তানকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার সংবাদ পেয়ে দুইজন সাংবাদিক যাচ্ছেন প্রত্যন্ত গ্রামে। ওই যাত্রাপথের গল্প। গন্তব্যে পৌঁছার গল্প। আর সত্য উদঘাটনের গল্প এটি। হরর আবহ তৈরীতে সাদ আহাম্মদের লেখার ভঙ্গিমা চমৎকার লাগল আমার।
‘কবর’ গল্পটা প্রথমবার পড়ার পর আমি একটা অপূর্ণতা খুঁজে পেয়েছিলাম। ছোটোগল্পে যেমন অপূর্ণতা দেখা দেয়, অমন নয়। এই অপূর্ণতা ভেবেছি লেখকের লেখার দূর্বলতা। কিন্তু একই গল্প দ্বিতীয়বার পড়তে যেয়ে বুঝতে পেরেছি, ওটি অপূর্ণতা নয়। সাদ আহাম্মেদ এই গল্পে ওই কাজ করেছেন, যা আমি পছন্দ করি। স্পুনফিড না করা। পাঠককে হাতে তুলে খাইয়ে না দেওয়া। ওই অপূর্ণতার জায়গাটা ছিল, গল্পের প্রোটাগনিস্ট প্রত্যন্ত গ্রামে যাওয়ার পথে স্মৃতিচারণ করা নিজের প্রেম ও সংসারের একটা গল্প। যা গল্পের ভেতর ছন্নছাড়া, খাপছাড়া, পরিণতিহীন এবং প্রথমবার পড়তে যেয়ে মনে হয়েছিল, শুধু্ই পৃষ্ঠা বাড়ানোর জন্য লেখা। কিন্তু আসলে তা নয়। ‘কবর’ গল্পটার কোর ধারণাটা যা কেন্দ্র করে আবর্তিত, তারই একটা মধ্যবিত্ত আটপৌরে উপস্থাপন ছিল ওই সংসার, ওই পরিণতি। আমি ওই কোর ধারণাটা বলে স্পয়লার দিয়ে গল্পের মজা নষ্ট করলাম না।
আমার দ্বিতীয় পড়া গল্পটা বইয়ের প্রথম গল্প। ‘প্যা*লেস্টা%ই*ন’। অরুন্ধতী রয় নামের একজন সাংবাদিক একটা বিশেষ জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছেন, যে জায়গা ও মানুষদের প্রবল ঘৃণার চোখে দেখে প্রায় পুরো বিশ্বের মানুষ। তাদের পক্ষে নয়, অরুন্ধতী প্রতিবেদন তৈরী করবেন নিরপেক্ষ হয়ে। আর গল্পটা প্রতিবেদন তৈরীর জন্য অরুদ্ধতীর ছোটাছুটির গল্প। গল্পটা তার ব্যক্তিগতও। ছোট্ট ছোট্ট ঘটনা, কিছু ধ্বঃসস্তুপের বর্ণনা আর কয়েকটা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সাদ আহাম��মেদ ওই গল্প লিখেছেন, যে গল্পটা লেখা বর্তমান সময়ে দরকার ছিল খুব।
তৃতীয় পড়া গল্পটা বইয়ের দ্বিতীয় গল্প। ‘অমানুষ’। নির্দ্বিধায় গল্পগ্রন্থের সেরা গল্প। পড়তে গিয়ে হাঁসফাঁস লেগেছে, উত্তম পুরুষে লেখা বলে হয়ত আরো বেশী বুঁদ হওয়া গেছে গল্পের ভেতর, চরিত্রের ভেতর। গল্পটা বাসার গেইটের কাছে মুনা নামের এক নারীর লাশ দিয়ে শুরু হয়। যার সঙ্গে গল্পকথকের সতের মাসের একটা সম্পর্ক ছিল। এই গল্প বলার স্টার্টিং পয়েন্ট আর ধীরে ধীরে গল্পকথকের মনস্তত্ত্বের একেকটা স্তর খোলার কাজটা এতটা নিখুঁতভাবে করতে অনেকদিন কাউকে দেখিনি আমি। দুর্ধর্ষ একটা গল্প। পারফেক্ট থ্রিলার। অনবদ্য রচনা।
বাকি দুইটা গল্পের একটা ‘ফাঁসি’ এবং অন্যটা ‘অভিশাপ’। ওই দু’টো গল্পেও একই কাজ করেছেন সাদ আহাম্মেদ, বাকি গল্পগুলোর সাথে যা করেছেন। প্রতিটা গল্পই প্রতিটা পৃষ্ঠায় পাঠককে জানাচ্ছে, অনুমান করা যাবে না। লেখক প্রতিটা গল্পেই কিছু কিছু জায়গায় এই জিনিসটা এত বেশী প্রয়োগ করেছেন, পাঠক হিসেব পড়তে যেয়ে আমার খাবি খেতে হয়েছে। প্রথম গল্পের অরুন্ধতী রয়, দ্বিতীয় গল্পের গল্পকথকের সাথে স্ত্রীর সম্পর্কের একটা স্তর, তৃতীয় গল্পের অরুণিমা, চতুর্থ গল্পের প্রকৃত সন্তান এবং পঞ্চম গল্পের অপ্রত্যাশিত বেদনা- সব মিলিয়ে মিশিয়ে অনুমান করা দুস্কর, গল্পটা কার, কাকে নিয়ে, কেন সবাই ছুটছে!
‘দেখা অদেখা’ বইয়ের আরেকটা শক্তিশালী দিক হলো সংলাপ। রোমান্টিক সংলাপ আদুরে ও আহ্লাদি আবহে লিখতে যেয়ে ক্রিঞ্জ, ক্লিশে ও একঘেয়ে করা ফেলা রাইটারদের জন্য একটা মহা আতংকের ব্যাপার। তোমার চোখে ডুবে যাই, ডুবে যাই শুদ্ধতম চোখে- জাতীয় ক্লিশে সংলাপও একটু ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হলে, আর ক্রিঞ্জ থাকে না। সাদ আহাম্মেদ এই রোমান্টিকতা ও ক্রিঞ্জনেসের মাঝখানটা ব্যালেন্স করতে পেরেছেন ভালোই। তার পাঁচটা গল্পই প্রায় সব জায়গা থেকেই পোক্ত। পড়া শুরু করার পর না থামার মতো বেশ কিছু জায়গা আছে। টানটান গতি আছে। আছে- প্রতিটা গল্পের একেকটা চরিত্রের অপ্রত্যাশিত সব স্তর কোনোরকম উত্তেজনা ছাড়াই ধীরে সুস্থে করা উপস্থাপন।
‘প্রিয় পাঠক...’ জাতীয় লাইন লিখে প্রায় গল্পের মাঝখানে সাদ আহাম্মেদ গল্প থেকে বের হয়ে কিছু লাইন লিখেছেন। যা পড়ে ওই গল্পের একটা বিশেষ জায়গা অনেক উপর থেকে বার্ডস আই এঙ্গেলে দেখা যায়। রিভিউটাও আমি ওই বার্ডস আই এঙ্গেলে শেষ করি।
প্রিয় পাঠক... পুরো রিভিউতে যা জানানো হয়নি; ‘দেখা অদেখা’ সাদ আহাম্মেদের প্রথম বই। এই বই উৎসর্গ করা হয়েছে পৃথিবীর সকল মাকে।
৫টা গল্পের সংকলন। ২টা গল্প সম্ভবত আগেই পড়েছিলাম। লেখকের কাহিনী বুনন, লেখার বর্ণন আমার আগেও ভালো লাগতো, এবারও ভালোই লেগেছে। গল্পের প্রেক্ষাপটগুলি আনকোরা না, আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা ভিত্তিক। তবে ভাবাবে, ভাবতে বাধ্য করবে। এবং আগ্রহী বা অনুসন্ধিৎসু পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন এর ভেতরের বিভিন্ন টুকরো টুকরো ঘটনাগুলি মোটেও মনগড়া নয়।
এ জায়গায় এসে আমি ২টা সূত্র নিয়ে আসবো। জাফর ইকবাল স্যারের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস 'ক্যাম্প' এবং একটা আর্জেন্টাইন চলচ্চিত্র 'Wild Tales'। ১মটা উল্লেখের কারণ, আশপাশের অনেক ঘটনার পেছনেই আমাদের সহজাত কিছু ব্যাখ্যা থাকে; তবে সেই ব্যাখ্যাগুলি যে দৃষ্টিভঙ্গি ভেদে পরিবর্তন হতে পারে তা ক্যাম্পের পাঠক জানবেন। উল্লেখিত চলচ্চিত্রের আবহসংগীত আমার বেশ পছন্দের, তবে এর পেছনের প্রেক্ষাপট আরও চমৎকার, এটা পরিস্থিতি ভেদে মানুষের আবেগ এর ভিন্নরকম বহিঃপ্রকাশকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এই ২ রকম পরিস্থিতিই গল্পগুচ্ছে দৃশ্যমান।
পরিশেষে, প্রত্যেকটা গল্পই ভালো লেগেছে। লেখকের মাথায় গল্প আছে, হাতে আছে গল্পলেখকের গুণাবলি। আশা করি, তাঁর লেখার কলম থেমে থাকবে না, বইমেলার বাইরেও তা সদাচলমান থাকবে।
সাদ আহাম্মেদ লেখক হিসেবে আমার কাছে নতুন মুখ। দেখা অদেখা বইটা দিয়েই তার লেখা প্রথমবার পড়ছি। বইটার মধ্যে দারুন ৫ টা গল্প আছে।
১. প্যালেস্টাইন ⭐⭐⭐⭐
• যুদ্ধ বিদ্ধস্ত একটা দেশ। এক দেশের মানুষ দোষ টেলে দিচ্ছে অপর দেশের উপর। একপাক্ষিক সংবাদ প্রচারের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে অরুন্ধতী রয়কে; এ যুদ্ধের তাণ্ডব কোনো একভাবে জড়িয়ে আছে তার জীবনের সাথেও। • এ যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে আসছি দীর্ঘসময় ধরে, তাই গল্পটা বেশ রিলেটেবল লেগেছে। লাগাতার গণহত্যা মনটাকে বিষয়ে দিতে দিতে একসময় সহ্য হয়ে এসেছিলো। কিন্তু তাও কোথাও যেনো গল্পটা পড়তে গিয়ে ভেঙে পড়ছিলাম। গল্পের সংলাপ কিছুটা 'অনুবাদিত' অনুভূত হয়। হয়তো ভিনদেশী ভাষার ইঙ্গিত দেয়ার জন্য লেখক এমনটা রেখেছেন।
২. অমানুষ ⭐⭐⭐⭐
• আবির ডিবি কার্যালয়ে কাজ করে। একটা গোপন মানসিক অশান্তি আছে তার। এমন একটা কষ্ট আছে মুনারও। মুনা আবিরেরই প্রতিবেশী, খুব বিশেষ কেউ। কেউ একজন হঠাৎ নৃশংস নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে সেই বিশেষ মানুষটাকে। কে এবং কেনো? • এ গল্পটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘোরের মত কেটেছে। গল্পের আকারও বড়। তাই চরিত্রগুলোর অনেকগুলো দিক, জীবনের আলো আঁধার অনেককিছুই সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। শেষে অবশ্য গল্পটা একটা পরিচিত রূপ পেয়েছে। অর্থাৎ, এ ধরনের সমাপ্তি থ্রিলার পড়লে দেখে থাকবেন। তবে উপভোগ্য ও হৃদয়াবেগী একটা গল্প, তাতে সন্দেহ নেই।
৩. কবর ⭐⭐⭐⭐⭐
• করোনা কালীন সময়, সারাদেশে লকডাউন। ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক শাওনের কাছে মাঝরাতে খবর এলো, কুঞ্জবাড়ি গ্রামের এক মহিলা তার স্বামী সন্তানকে মেরে খেয়ে ফেলেছে। সংবাদ করার জন্য সেই গ্রামে ছুটতে হবে শাওনকে। • বেশ কঠিন একটা গল্প। বাস্তবতার কঠিন এক রূপ। লেখক গল্প বলার কৌশল দিয়ে আরো বেশি ফুঁটিয়ে তুলেছেন। খুব বিস্তারিত বলবো না, পড়লে হয়তো পাঠকের কাছে এ গল্পটাই সেরা লাগবে।
৪. ফাঁসি ⭐⭐⭐⭐
• আবিরের প্রতিবেশী কবীর ভাই তার নিজের সন্তানকে গলা টিপে হত্যা করেছেন। খুব ভালোবাসতেন ছোট্ট মেয়েটাকে। লোকটা এমন কাজ করতে পারে বিশ্বাস করেনি আবির। কিছুদিন পর ফাঁসি হয়ে যাবে তার। ফাঁসির কয়েকদিন আগে আবিরকে কিছু বলার জন্য ডেকে পাঠালেন তিনি। • এ গল্পটাও মন ছুঁয়েছে। যদিও শেষের দিকে ঘটনাপ্রবাহে একটু তাড়াহুড়া ছিলো। যেনো সবকিছু কেমন কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে।
রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে মোবাইলে ছবি তোলা শুরু করল, কেউ সাহায্যে এগিয়ে আস��নি। এক রিক্সাওয়ালা দৌড়ে এসে আমাকে আর বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে পাশের ডেল্টা হসপিটালে নিয়ে যায়। ভাগ্যিস, ব্যাটার মোবাইল কেনার পয়সা নেই।
গল্পের এ অংশের লেখাটা একেবারে গায়ে এসে লেগেছে।
৫. অভিশাপ ⭐⭐⭐⭐⭐
• ১৯৯৮ সালের এক ভয়াবহ ঘটনা। ফার্মগেটের মোড়ে এক ছেলে এক বৃদ্ধের চোখ তুলে কুকুরকে খাইয়েছিল। রুমন সেই ছেলেটাকে চেনে। তার সাথে দেখা করতে যায় থানায়, জানতে চায় এমন অপরাধের কারণ। • আমাদের দেশে কিশোর অপরাধ আর পথশিশুদের উপর অত্যাচার, দুটোই ব্যাপক হারে ঘটছে। সমাজের এ অনিয়মের একটা সাইকেল তৈরি হয়ে গেছে। তাদের নিয়ে কেউ ভাবে না, লেখে না, তারা হারিয়ে গেলেও কেউ জানতে পারে না; জানতে চায় না। এমন একটা সেন্সিটিভ ইস্যু গল্প আকারে বেশ ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে লেখকের হাত ধরে।
• সার্বিকভাবে অভিমত:
• লেখকের বই পড়ার অভিষেক আমার বেশ ভালোভাবেই হয়েছে। চমৎকার লেখনশৈলী আর দারুন কিছু কনসেপ্টের গল্প, সব মিলিয়ে প্রশংসাযোগ্য একটি বই। গল্পগুলোর মূল উদ্দেশ্য বাস্তব জীবন। দৃশ্যায়ন এমনভাবে করা হয়েছে, যে না পড়ে উঠা মুশকিল। আবার, গল্প বলার পদ্ধতিটাও পাঠককে কৌতূহলী করার জন্য উপযোগ্য। • তেমন কোনো অভিযোগ নেই; তবে যদি বলতেই হয়, তাহলে লেখককে সংলাপের দিকে আরেকটু খেয়াল করতে বলবো। এমন নয় যে সংলাপ মন্দ লেগেছে। কিন্তু লেখকের লেখার উৎকৃষ্ট মানের সাথে কিছু সংলাপ খাপ খায়নি। আবেগ তাড়িত ঘটনার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, এমন সংলাপে একটু বিরতি রাখা যায়। পরপর সংলাপ বেশি লম্বা হলে অস্বাভাবিক লাগে। • আরেকটা বিষয় উল্লেখ করি। গল্পগুলোয় হয়তো ভালবাসার একটা উপস্থিতি পাবেন। কিন্তু লেখক সেটা পুরোপুরি ভালোবাসা কিংবা প্রেমের রূপে উপস্থিত করেননি। বিষয়টা 'ঠিক ভালোবাসা নয়, ভালবাসার মতো'।
• ব্যক্তিগত রেটিং: ৮.৫/১০
(উপকথার বই এর আগে পড়েছি বলে মনে পড়ছে না। পৃষ্ঠার মান, বাইন্ডিং, সব মিলিয়ে প্রোডাকশন ভালোই লেগেছে। প্রচ্ছদটা বেশি সুন্দর লেগেছে। তবে ব্যাক কভার ফাঁকা না রেখে কিছু যুক্ত করা যেতো।)
• বই: দেখা অদেখা • লেখক: সাদ আহাম্মেদ • ধরণ: গল্পগ্রন্থ • প্রকাশনী: উপকথা প্রকাশন • প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৪ • প্রচ্ছদ: ফাইজা ইসলাম • অঙ্গসজ্জা: স্বপ্নীল বড়ুয়া • মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা
কোনো রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই লেখকের পরবর্তী বইগুলো কিনে পড়ে ফেলব।
গল্পের বিষয়বস্তুতে গেলাম না। তবে, পুরোপুরি "সাহিত্যগুণ" ধরে না রেখেও আমাদের মতোন সুসভ্য মানুষদের সরাসরি অ্যাটাক দেওয়া গল্পগুলো আমার পছন্দের। উল্টো আর্টের নামের ভাসা ভাসা করে কিছু বলাটাকেই বুদ্ধিবৃত্তিক ভাওতাবাজি মনে হয় এখন। তাই ওরকম কিছু না করার জন্য লেখককে ধন্যবাদ! পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম।
সমস্যা হলো প্রথম গল্প টা সবথেকে ভালো হলে বইয়ের বাকি গল্প গুলো ফিকে লাগে। দেখা অদেখার প্রথম গল্প টার ধারেকাছে বাকিগল্প গুলো ঘেষতে পারেনাই সেজন্য কিছুটা হতাশা কাজ করেছে মনের মধ্যে। কিন্তু বাকি গল্প গুলো ও ভালই ছিলো। ৩.৫/৫।
সত্যি ঘটনানির্ভর এই গল্পসংকলন শেষ করে মনে হইলো "জীবন নাটকের চেয়েও নাটকীয়, সিনেমার থেকেও বেশি সিনেম্যাটিক'' অভিষেকেই লেখক প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে। সলিড সাড়ে চার তারা★