ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগের আর তার মাঝের সময়টা প্রায়ই চাপা পড়ে যায় অন্য নানা ঘটনার ভিড়ে। ওই সময় সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে যেন-তেন-প্রকারেণ দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য যে চেষ্টাটি হয়েছিল, বিশ্বাসঘাতকদের জন্য তা ব্যর্থ হয়। কিন্তু সেই বিশেষ লড়াইয়ের সব যোদ্ধাকে ব্রিটিশ পুলিশ বা সেনাবাহিনী গ্রেফতার করতে পারেনি। কেউ-কেউ পালিয়ে গেছিল জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে। এই কাহিনি তেমন এক চরিত্রের— যে কাল্পনিক হয়েও ভীষণভাবে সত্যি, কারণ তার ঘাম আর রক্তের মধ্যে মিশে গেছে শুধু এ-দেশের নয়, নানা দেশে নানারকম স্বাধীনতার স্বপ্ন। তার নাম রাও। তার সম্বন্ধে রটল নানা কথা। সে নাকি আদর্শ ভুলে এক খুনি লুঠেরা হয়ে গেছে। সেভাবেই কেটে গেছিল অনেকগুলো বছর। তারপর... এই বইয়ের প্রথম কাহিনি 'দহন বেলার গান'-এর পটভূমি লন্ডনের শহরতলি। লোভ আর হিংস্রতার থাবায় একটু-একটু করে পিষে যেতে থাকা একদল দুর্বল মানুষের ভিড়ে আবির্ভূত হল রাও। তাকে খুঁজতে লাগল অনেকেই। কেউ তাকে ধরতে চায়। কেউ চায় তাকে বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করতে। কিন্তু রাও নিজে কী চায়? সে কি পারবে লক্ষ্যপূরণ করতে? বইয়ের দ্বিতীয় কাহিনি 'মৃত্যু কুহক'-এর পটভূমি মেক্সিকো। স্বার্থ আর ষড়যন্ত্রের এক ভয়ংকর জালে জড়িয়ে গেল রাও। লালসা, ক্রোধ, উন্মাদনা, মিথ্যা দিয়ে গড়া সেই মৃত্যুগহ্বর থেকে মাথা উঁচু করেই বেরিয়ে আসতে চাইল সে। পারল কি? আর, কেনই বা এই দেশে এসেছিল সে? অকপটে বলি, এই বইটি পড়ার সময় আমার ন্যূনতম প্রত্যাশাও ছিল না এটি থেকে। লেখক একজন অত্যন্ত মনোযোগী পাঠক— এটুকুই ছিল তাঁর সম্বন্ধে আমার জ্ঞান। কিন্তু পড়ার পর স্রেফ আভূমি সেলাম ঠুকতে হচ্ছে তাঁকে। তার কারণ তিনটি~ প্রথমত, ইতিহাসের এই বিশেষ সময় আর এমন এক আপাতধূসর ভারতীয় চরিত্র নিয়ে আজ অবধি কিছু পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। রাসবিহারী থেকে বাঘা যতীন— এঁদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলেই ইতিহাসে লেখা থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্ন দুচোখে নিয়ে যারা সর্বস্ব পণ করেছিল, তাদের ইতিহাস পুরোপুরি উপেক্ষা করে। সেই শূন্যস্থানে এ এক অসামান্য প্রয়াস। দ্বিতীয়ত, লেখকের ভাষার মধ্যে একটা হার্ডবয়েল্ড ভাব আছে যেটা ওই বিশেষ সময় ও চরিত্রদের স্পষ্ট করতে শতকরা একশোভাগ সফল হয়েছে। এটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারব না। তবে বাংলায় এমন অদ্ভুত গতিময়, নৈর্ব্যক্তিক, অথচ নিঁখুতভাবে যেকোনো বর্ণনা চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম লেখা খুব বেশি পড়িনি। তৃতীয়ত, রাও। এমন একটি চরিত্রকে চোখের সামনে বাঁচতে, ভালোবাসতে, প্রায় মরতে এবং অবশ্যই মারতে দেখা একটা অভিজ্ঞতা বিশেষ। ইতিহাসের উপাদান ব্যবহার করে বাস্তবিক পটভূমিতে লেখা দুটি নভেল্লার সংকলন হিসেবে এই বইটি থ্রিলারপ্রেমীদের কাছে অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। তবে কোনোরকম প্রত্যাশা না রেখে পড়ার চেষ্টা করুন। আমার ধারণা, তাহলে তৃপ্তির মাত্রাটা অনেক বেশি হবে— যেমনটা আমার হল। শেষে আবারও লেখকের উদ্দেশে আভূমি সেলাম জানাই। এই বই পড়তে পাওয়াটা আমার কাছে প্রিভিলেজই হয়ে রইল।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অসংখ্য ঘটনা ও চরিত্রে ভরপুর। এই ইতিহাসের গভীরে বিচরণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, অনেক সময় আমরা এমন অধ্যায়গুলি অতিক্রম করি, যা ইতিহাসের মূল স্রোতে আসে না। বিশেষ করে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও তার মধ্যবর্তী সময়ের সশস্ত্র বিপ্লবীরা যেন আমাদের কাছে প্রায় অদৃশ্য। এই বিপ্লবীদের নিষ্ঠা, সাহস এবং প্রাণপণ লড়াই অনেক সময় বিখ্যাত আন্দোলন ও ঘটনার ছায়ায় চাপা পড়ে যায়। তবুও, এই সময়ের বিপ্লবীরা নিজেদের জীবনের বাজি রেখে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন রাও—একটি কাল্পনিক কিন্তু সত্যনিষ্ঠ চরিত্র।
রাওয়ের কাহিনী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্মস্থলকে। লেখক 'দহন বেলার গান' ও 'মৃত্যু–কুহক' নামক দুটি নভেল্লার মাধ্যমে রাওকে লন্ডন ও মেক্সিকোর পটভূমিতে হাজির করেছেন। এই চরিত্রের মাধ্যমে পাঠক এমন এক যুদ্ধের সাক্ষী হন, যেখানে মানুষ শুধুমাত্র স্বাধীনতার জন্য নয়, বরং তাদের স্বপ্ন, বিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদার জন্য লড়ছে।
রাওয়ের জীবন কাহিনী বিশ্বাসঘাতকতার, লোভ এবং ষড়যন্ত্রের চিরন্তন থাবা তুলে ধরে। একজন যোদ্ধা যখন নিজের জাতির মুক্তির জন্য লড়ছেন, তখন তাকে কতভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, তা অতি সহজে কল্পনা করা যায় না। তার নিজস্ব গন্তব্য খুঁজে পাওয়ার যাত্রা, যেখানে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে মোকাবিলা করছেন, তা আমাদের এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামের এক নতুন দ্বার উন্মোচন করে।
লেখকের সাবলীল লেখনী যেন একটি বিস্তৃত সময়ের পরিসরের দরজা খুলে দেয় আমাদের জন্য। তাঁর প্রতিটি শব্দ আমাদের হৃদয়ের গহীনে প্রবেশ করে, ইতিহাসের জটিলতাকে চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দেয়। অতএব, এই বইটি শুধুমাত্র ইতিহাসের অনুরাগীদের জন্য নয়, বরং থ্রিলার প্রেমীদের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।