Jump to ratings and reviews
Rate this book

লিও-লিসা-মিকেল

Rate this book
মিশরের পর এবার পটভূমি পঞ্চদশ শতাব্দীর ইতালি।
দুই আশ্চর্য প্রতিভাশালী শিল্পী এবং এক অতি সাধারণ নারীর চোখ দিয়ে লেখক অনির্বাণ ঘোষ খুঁজতে চেয়েছেন সেই আলোকিত অথচ অনুচ্চারিত অন্ধকার যুগকে।

নাম- লিসা ঘেরারদিনি।

বাবার নাম- আন্তনমারিয়া ঘেরারদিনি।

মায়ের নাম- লুক্রেজিয়া ঘেরারদিনি।

জন্ম- ১৫ই জুন, ১৪৭৯, ফ্লোরেন্স।

স্বামীর নাম- ফ্রাঞ্চেস্কো দেল জ্যকোন্দো।

যে মেয়েটিকে সারা পৃথিবী চেনে 'মোনা লিসা' নামে, যার চোখের চাহনি এবং ঠোঁটের হাসির রহস্যময়তার উত্তর আজও পাওয়া যায়নি, যাকে একবার দেখার জন্য প্রতিদিন প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে ভীড় জমান কয়েক হাজার মানুষ সেই মেয়েটি আদতে কেমন ছিল? কেমন ছিল তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন? কাকে ভালবেসে ফুটে উঠতে চেয়েছিল ফ্লোরেন্সের এই গোলাপটি?

লিসাকে নিয়ে বাংলা ভাষায় আগে কখনও কোন উপন্যাস লেখা হয়নি। এই মেয়েটি এবং তার আশেপাশেই ভীড় করে থাকা অত্যুজ্জ্বল জ্যোতিষ্কদের নিয়ে লেখা এই ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস লিও-লিসা-মিকেল।

এক লক্ষ কুড়ি হাজার শব্দের এই উপন্যাসে রয়েছে আশিটিরও বেশি ছবি। নবজাগরণের প্রথম আলোয় উদ্ভাসিত ফ্লোরেন্স, রোম, মিলান শহরের সঙ্গে, শহরের মানুষগুলির সঙ্গে এবারে পাঠকের পরিচয় হবে।

440 pages, Hardcover

Published January 1, 2024

7 people are currently reading
78 people want to read

About the author

Anirban Ghosh

31 books24 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
14 (37%)
4 stars
18 (48%)
3 stars
4 (10%)
2 stars
1 (2%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 13 of 13 reviews
Profile Image for Arupratan.
235 reviews386 followers
April 11, 2024
ঔপনিবেশিক ইয়োরোপের সবজান্তা ঐতিহাসিকরা দীর্ঘদিন যাবৎ একচক্ষু হরিণের মতো প্রাচীন গ্রিক সভ্যতাকে চিহ্নিত করতো সভ্য মানবসমাজের সূচনাবিন্দু হিসেবে। সেই হরিণদের আরেকটি চোখের ঠুলির নিচে চাপা দেওয়া ছিল চৈনিক সভ্যতা, আরব্য সভ্যতা এবং উপমহাদেশীয় সভ্যতার উৎকর্ষের কথা (পৃথিবীর আরো নানাবিধ প্রাচীন "ইন্ডিজেনাস" এবং প্রান্তিক অতি উন্নত সভ্যতাগুলোর কথা না হয় আপাতত বাদই দিলাম)। গ্রিক সভ্যতার পরে আরো প্রবল বেগে এলো রোমান সভ্যতা। প্রাচীন গ্রিক আর রোমান— এই দুটি সভ্যতা গোটা ইয়োরোপ মহাদেশের শৌর্য, বীর্য, চিন্তা, দর্শন, বিজ্ঞান এবং শিল্প-সাহিত্যের মাপকাঠি বেঁধে দিয়েছিল।

মহাপরাক্রমশালী সেই রোমান সভ্যতার পতন ঘটেছিল বড় মর্মান্তিকভাবে। এবং সেই পতনের পরে সমগ্র ইয়োরোপব্যাপী যে-অন্ধকার যুগের সূচনা হয়েছিল, টানা ১০টি শতাব্দী জুড়ে সেই মহাদেশ ডুবে ছিল এক অতল অনড় কুম্ভীপাকের গহ্বরে। ১০ শতাব্দী, মানে এক হাজার বছর (পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতক)— বড় কম কথা নয়। মনুষ্যত্বহীনতার সেই থিকথিকে কাদা ঠেলে, পুনরায় জেগে উঠেছিল যে দেশটি তার নাম ইতালি। সেই দেশের তাসকেনি নামের একটি ছবির মতো অপূর্ব সুন্দর প্রদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহরের নাম ফ্লোরেন্স। পৃথিবীর অল্প যে কয়েকটি শহরের নাম মানুষের পক্ষে কোনোদিন ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়, ফ্লোরেন্স তার একটি। শুরু হলো ইয়োরোপীয় ইতিহাসের রেনেসাঁস পর্ব।

সেই রেনেসাঁস যুগকে বাংলা ভাষায় কাহিনি-আকারে পড়বো বলেই সদ্য প্রকাশিত এই বইটা কিনে ফেলেছিলাম। সদ্য প্রকাশ হওয়া ফিকশন বই আমি সচরাচর পড়ি না। কিন্তু এই বইটির ক্ষেত্রে নিয়মভঙ্গ করেছিলাম দুটো কারণে। একটি কারণের নাম লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। আরেকটি কারণের নাম মিকেলঅ্যাঞ্জেলো। ফরাসি "রেনেসাঁস" শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো পুনর্জাগরণ। মানে, হারিয়ে যাওয়া কোনো গৌরবকে পুনরায় জাগরিত করা। মানুষ নতুন কীর্তি গড়তে পারে, কিন্তু মাটির অনেক নিচে চাপা পড়ে যাওয়া গৌরবকে উদ্ধার করতে এমন মানুষের দরকার হয়, যাঁদের কাঁধ সাধারণের চেয়ে বেশি চওড়া। লিওনার্দো এবং মিকেলঅ্যাঞ্জেলো ছিলেন সেই গোত্রের মানুষ। এরকম দুজন অতিমানবকে ৪৩০ পৃষ্ঠায় মোটামুটি ঠিকঠাক ধরে ফেলা খুব কঠিন কাজ। আমাদের লেখক সেই কঠিন কাজটি করতে পারেননি।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের "সেই সময়" উপন্যাসের ব্লার্বে একটা কথা লেখা আছে, বইটির নায়ক কোনো মানুষ নয়, নায়ক হলো সময়। "সময়কে নায়ক" বানানোর এই ব্যাপারটা তারপর বাংলা সাহিত্যে একটা ক্লিশে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বহু চরিত্রের সমাবেশ ঘটলেই, কিংবা একাধিক শক্তিশালী চরিত্রের উপস্থিতি থাকলেই, লেখক "সময়" নামক বস্তুকে নায়ক বানিয়ে ফেলেন। এই বইয়ের মলাটের পিছনেও লেখা আছে, বইটি "খুঁজতে চেয়েছে সেই সময়কে"। কিন্তু সময় তো চলিষ্ণু একটি বস্তু, তাই তাকে খুঁজতে হলে সময়ের অগ্রপশ্চাৎকেও খুঁজতে হয়। ব্যাকগ্রাউন্ডকে যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে চরিত্ররা অসহায় হয়ে উপন্যাসের পৃষ্ঠায় থমকে থমকে চলাফেরা করতে বাধ্য হয়। রেনেসাঁসের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়কে ধরার জন্যে যে গভীরতার প্রয়োজন আছে, উপন্যাসটিতে সেই গভীরতার অভাব রয়েছে।

এই উপন্যাসে রেনেসাঁসের পশ্চাদপট হিসেবে প্রায় কিছুই দেখানো হয়নি। অন্ধকারময় মধ্যযুগের আঁধার কাটিয়ে ক্যানো ঘটেছিল এই নবজাগরণ? রেনেসাঁসের কুশীলব ছিলেন যাঁরা, কীসের তাড়নায় বিচ্ছুরিত হয়েছিল তাঁদের চোখধাঁধানো প্রতিভা? খামচা খামচাভাবে দুই-তিন জায়গায় উল্লেখ আছে বটে যে, এই সময়ে শিল্পের সঙ্গে বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটেছিল— ইতিহাসে সম্ভবত প্রথমবার। কিন্তু এই পয়েন্টটা ইতালিয়ান রেনেসাঁসের ক্ষেত্রে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আরো বিশদে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত ছিল। খুব দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, অমিতপ্রতিভাধর লিওনার্দোকে একেবারেই যথাযথভাবে আঁকতে পারেননি লেখক (মিকেলঅ্যাঞ্জেলোকে তবু কিছুটা পেরেছেন)।

উল্টে অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, লিওনার্দোকে "রক্তমাংসের" দেখাতে গিয়ে, মিকেলঅ্যাঞ্জেলোর সঙ্গে তাঁর দ্বৈরথ দেখাতে গিয়ে, কেমন ভিলেন বানিয়ে ফেলা হয়েছে তাঁকে! তাঁর রত্নখনির মতো নোটবইগুলো, সময়ের থেকে অনেক অগ্রগামী তাঁর বিস্ময়কর চিন্তাভাবনা— এইসব নিয়ে প্রায় কিছুই বলা হয়নি। এবং সবচেয়ে আফসোসের কথা, লিওনার্দো এবং মিকেলঅ্যাঞ্জেলো— দুজনেরই শিল্পকর্মগুলো নিয়ে ব্যাখ্যামূলক আলোচনা থেকে বিরত থেকেছেন লেখক (কেবল আহা, বাহা, কী-অপূর্ব, কী-চমৎকার, এই জাতীয় জেনেরিক বিশেষণ ছাড়া)। শিল্প ছাড়া শিল্পীর কোনো অস্তিত্ব আছে? শিল্পটাই যদি ভালো করে না চিনলাম তাহলে শিল্পীর জীবন জেনে কী লাভ আমার? কী এমন শৈল্পিক বিশেষত্ব আছে মিকেলঅ্যাঞ্জেলোর তৈরি "ডেভিড" নামের ভাস্কর্যে যে এখনও সেটিকে সর্বকালের সবচেয়ে সেরা মার্বেল ভাস্কর্য হিসেবে গণ্য করা হয়?

তাহলে উৎসাহী আধুনিক পাঠক, যাঁরা বিভিন্ন ডকুমেন্টারি দেখে, কিংবা বই পড়ে, কিংবা ইন্টারনেট ঘেঁটে ইতিমধ্যেই জেনে ফেলেছেন রেনেসাঁসের ব্যাপারে অনেক তথ্য, তাঁরা এই বইটি ক্যানো পড়বেন? চেনা চরিত্রগুলোকে স্রেফ ফিকশনাল ভার্শন হিসেবে দেখবার প্রয়োজনে? অনেক সম্ভাবনা থাকলেও উপন্যাসটি একটি গড়পড়তা ঐতিহাসিক উপন্যাস হয়ে থাকবে আমার কাছে। আচ্ছা বেশ, তাহলে ভালো কিছুই নেই এই বইতে? আছে। দুটো খুব ভালো দিক আছে। এক, আজকালকার "গবেষণাধর্মী" (মানে খান-পঞ্চাশেক বইপত্র পড়ে প্লটের মালমশলা জোগাড় করা আরকি) উপন্যাসের মতো রাশি রাশি ইনফর্মেশনের আবর্জনা পাঠকের মাথায় উপুড় করে ঢেলে দেওয়া হয়নি এই বইটিতে। লেখক পড়াশুনা করেছেন বিস্তর, কিন্তু তাঁর সেই অধীত জ্ঞান জামার কলার তুলে সোল্লাসে প্রদর্শন করার চেষ্টা করেননি। দ্বিতীয় ভালো দিক, লেখকের চমৎকার মসৃণ গদ্য। বিষয়বস্তু মোটেও সহজ ছিল না, তবুও ৪৩০ পৃষ্ঠার বইটি অনায়াসে পড়ে ফেলতে পেরেছি। প্লটের গঠন খাপছাড়া মনে হলেও একটি বিষয়ে লেখক লেটার মার্কস পেয়ে উৎরে গেছেন, সেটি হলো তৎকালীন সমাজজীবনের পরিবেশ বর্ণনা। বইটি পড়ার সময় মাঝেমাঝে মনে হচ্ছিল, নিশ্চিত আমি সশরীরে পৌঁছে গেছি সেই যুগে।

আক্ষেপ সত্ত্বেও লেখককে আমি সাধুবাদ জানাবো এই বিষয়টি বেছে নেওয়া এবং নিজের সাধ্যমতো পরিবেশনের চেষ্টা করার জন্যে। হাবিজাবি বিষয়বস্তু অধ্যুষিত বর্তমান বাংলা সাহিত্যে এমন একটি অফবিট বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখার সাহস দেখিয়েছেন লেখক, এটা অনেক বড় কথা। উপন্যাসটির কাহিনি এখনও সমাপ্ত হয়নি। বইয়ের অন্যতম মুখ্য চরিত্র, মোনা লিসা, প্রায় নাগালের বাইরে রয়ে গেছেন বলা যায়। উপন্যাসের অন্তিমে লেখক পরবর্তী আরেকটি খণ্ড লেখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বর্তমান খণ্ডটি পড়ে পুরোপুরি তৃপ্তি পাইনি ঠিকই, তবুও পরের খণ্ডের জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করবো আমি। শেষ একটি কথা না বললেই নয়। সুবিনয় দাস পরিকল্পিত প্রচ্ছদটি দারুন। তীব্র লাল বর্ণের জমিতে অধরা মাধুরীর মতো ফুটে উঠেছে দুটি বিশ্ববিখ্যাত শিল্পকর্ম। আবেদনে রহস্যময় অথচ অনুভবে প্রগাঢ়। এবং হৃদয়ের গভীরে রক্তাক্ত। বইটির প্রধান দুই চরিত্রের অন্তর্জগৎ ঠিক যেমনটা ছিল।

it's not
the
history
of countries
but the lives of men.
fables are dreams
not lies,
and
truth changes
as
men change,
and when
truth becomes stable
men
will
become dead.

(Charles Bukowski, "It's Not Who Lived Here")
Profile Image for Zabir Rafy.
313 reviews10 followers
August 3, 2025
(রিভিউটা দিয়েছিলাম গুডরিডসে, মুছে গেলো কেন জানি না। আবার এড করলাম।)

সভ্য দুনিয়ার সাবেক রাজধানী রোমে প্রজাতন্ত্র গড়ে উঠেছিল যিশু ���্রিস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে। জুলিয়াস-অগাস্টাস সিজার জুটির হাতে রোমান গণতন্ত্রের মৃত্যু হলেও, জার্মান বার্বারদের হাতে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন হবার আগ পর্যন্ত রোমান সভ্যতা পৃথিবীকে দিয়েছে অনেক কিছু। রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব এতটাই বেশি, উক্ত সভ্যতা কিংবা সাম্রাজ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা না রাখা ব্যক্তিও জুলিয়াস সিজারের নামটি জানেন। সিজারের নাম ধারণ করে জার্মান সম্রাটরা নিজেদের উপাধি নিয়েছিলেন কাইজার, রাশিয়ানরা জার।

আইন প্রণয়ন, শিল্প সংস্কৃতি, স্থাপত্যকলা, প্রকৌশল বিদ্যা; মানব সভ্যতায় অনেকদিন প্রভাব বিস্তার করেছিলো রোমান সভ্যতা। রোমুলাস অগাস্টুলাসের পতনের পরে মাঝখানে অন্ধকার সময়টার পরে ইউরোপে যেই রেঁনেসার অভ্যুত্থান ঘটলো; তার অনুপ্রেরণা ছিল পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ।

আলোচ্য বইটির বিষয়বস্তু মোটাদাগে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের ধনী মেদিচি পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ইতালিজুড়ে শিল্প-সংস্কৃতি-স্থাপত্যকলার পুনর্জাগরণ।

মায়েস্ত্রো বত্তিচেল্লি, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলএঞ্জেলো, রাফায়েল সান্তি প্রমুখ।

আলোচ্য বইটির প্রোটাগনিস্ট হিসেবে ধরা যায় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে। বইয়ের নাম অনুসারে ভিঞ্চির পরেই খানিকটা জায়গা পেয়েছেন জগদ্বিখ্যাত ভাষ্কর মাইকেলএঞ্জেলো। তবে নামের প্রতি অবিচার করে, লিসা ঘেরারদিনি খুবই কম জায়গা পেয়েছেন বইটায়।

তাতে অবশ্য বইটার গুরুত্ব খুব একটা কমে যায়নি।

ইতালির রেনেসাঁ নিয়ে এবং সেই সময়কার ইতালির শহরগুলোর বাণিজ্য, সামরিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনীতি, ধনী পরিবারগুলোর হাতে শহরের কর্তৃত্ব, মানুষের জীবনযাত্রা, পোশাক, সমাজের হালচাল; সোজা বাংলায় সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায় সেটার একটা বিস্তারিত চিত্র অংকন করেছেন লেখক, চারশো পৃষ্ঠার বিশাল ক্যানভাসে।

মানব ইতিহাসের অন্যতম সৃজনশীল, প্রতিভাধর এবং একই সাথে রহস্যময় ব্যক্তি হিসেবে ভিঞ্চি খুবই সুপরিচিত একজন মানুষ। শুনেছিলাম ভিঞ্চির একখানা নোটখাতা নাকি বিল গেটস ত্রিশ মিলিয়ন ডলারে কিনেছিলেন!

চিত্রাঙ্কণে চিরাচরিত ক্যানভাস, রং, তুলির বাইরে বিস্তর গবেষণা করে ভিঞ্চি বানিয়েছিলেন নিজস্ব অনেক উপকরণ। তাই তো আজও, কোনো চিত্রশিল্প ভিঞ্চির আঁকা কি না, সেটা যাচাইয়ে গবেষকরা দ্বারস্থ হন উক্ত চিত্রকর্মের ক্যানভাস কিংবা রংয়ের।

স্বাভাবিকভাবেই বইটায় সবচেয়ে বেশি স্ক্রিনটাইম পেয়েছেন মায়েস্ত্রো ভিঞ্চি। ভিঞ্চির জন্মের ট্রাজেডি, তারপর স্ট্রাগলিং শৈশব, উত্থান আর খ্যাতির চূড়ায় অবস্থান করার আখ্যান পড়তে পড়তে মাইকেলএঞ্জেলোর সাথে তার দ্বন্দের বিষয়টায় খানিকটা অবাক হয়েছি বটে।

বইটার অন্যতম সাফল্য, খুবই নির্মোহ এবং নির্দয়ভাবে প্রতিটা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং চরিত্র বিচার করেছেন লেখক। লেখক, সাহিত্যিক৷ কবি, শিল্পীদের সম্পর্কে মানুষ যেই ফেরেশতা-লাইক পারসোনা ধারণ করে তাদের সম্পর্কে; লেখক সেই দিকে যাননি। আপনার প্রতিবেশী কিংবা কাছের বন্ধুটি সম্পর্কে আপনি যেভাবে বিচিং করেন অন্যদের সাথে; লেখক আপনাকে এইভাবে গল্পটি শুনিয়েছেন বইয়ে।

°
এই বছরে পড়েছিলাম থ্রিলার লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীনের ভিঞ্চি ক্লাব। বইটায় ভিঞ্চি আর লিসা ঘেরারদিনি নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্নের চাঞ্চল্যকর উত্তর ছিল। ব্যাপক আগ্রহ পেয়েছিলাম ভিঞ্চি সম্পর্কে আরও পড়াশোনা করতে।

সেই ধারাবাহিকতায় এই বইটি পড়া। লেখক বিস্তর পড়াশোনা করে ভিঞ্চি সম্পর্কে অলমোস্ট সব ইনফরমেশনই বইটায় উপস্থাপন করেছেন উপন্যাস আকারে। যেহেতু একটা ডকু-ফিকশন ধরে পড়েছি বইটা; কাজেই ইনফো ডাম্পিংয়ের অভিযোগ তোলা যাচ্ছে না। ভিঞ্চি সম্পর্কে আরও অনেক গবেষণামূলক বই রয়েছে। তবে ফিকশন আকারে লেখা এই বইটা অনন্য হয়েই থাকবে আমার বিশ্বাস।

লিও-লিসা-মিকেল:

লিও আর মিকেলের প্রতি সুবিভার করলেও লিসা ঘেরারদিনি তথা মোনালিসা সম্পর্কে নতুন কিছু পাওয়া গেলো না। খুবই কম স্পেস পেয়েছেন মানব ইতিহাসের সবচাইতে রহস্যময়ী এই নারী। বইটা সম্পর্কে অভিযোগ কেবল এইটুকুই।
Profile Image for Shuk Pakhi.
513 reviews315 followers
May 17, 2024
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মিকেল অ্যাঞ্জেলো এ দুজনের জীবনী ভিত্তিক উপন্যাস এটুকু জেনেই বইটা কিনে ফেলেছিলাম। দুজনই ভীষণ প্রিয় হওয়ায় বইটা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু মাঝামাঝি গিয়ে আগ্রহের পারা কমতে থাকে। এর একটা কারণ হতে পারে লিওনার্দো, মিকেল এদের নিয়ে নেট ঘেটে বেস ভালো রকমের পড়াশোনা করেছিলাম একসময়। আমি পেইনটিং এর অতশত টেকনিকাল দিক বুঝি না কিন্তু এদের পেইনটিং, ভাস্কর্যগুলোর ছবি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেছি এবং সেসব নিয়ে লেখাও পড়েছি, ডকু দেখেছি। সেজন্যই হয়তো বইটি আমাকে চমকে দিতে পারেনি।

তবে বলতেই হবে লেখক অনির্বাণ ঘোষ প্রচুর পড়াশোনা করেছেন সেই সময়ের ইটালির সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থাকে তুলে ধরতে। আর সাথে করে সে সময়ের শিল্পীদের জীবন নিয়ে, কাজ নিয়েও প্রচুর জেনেছেন। সেজন্য সাধুবাদ প্রাপ্য।
যারা লিওনার্দো, মিকেল, তাদের জীবন ও কাজ, সেই সময়ের ইটালি নিয়ে আগ্রহী তাদের বইটা ভালো লাগবে। তবে যাদের এই বিষয়ে বিশেষ জানাশোনা আছে তারা হয়তো একটু আশাহত হবেন বইটা পড়ে।
Profile Image for Riju Ganguly.
Author 38 books1,865 followers
May 31, 2024
রেনেসাঁ সম্বন্ধে আমরা কতটুকু জানি?
ইতিহাস বইয়ের একটি অধ্যায়ে বড়োই ভাসা-ভাসা কিছু কথা, 'টিনটোরেটোর যিশু'-তে কয়েকটি নাম, 'দ্য ভিঞ্চি কোড' পড়তে গিয়ে জানা কিছু তথ্য, আর নারায়ণ সান্যালের "লেওনার্দোর নোটবই এবং"-এর কিছু লেখা— মোটামুটি এটুকুই আমাদের পুঁজি। অথচ ইউরোপ তথা বিশ্বের ইতিহাসে, বিশেষত শিল্পের ক্ষেত্রে ওই অধ্যায়টি ছিল যুগান্তকারী। সেই নতুন যুগের যাঁরা অগ্রপথিক, এমনকি স্রষ্টা, তেমনই কয়েকজনকে নিয়ে লেখা হয়েছে এই বই।

কিন্তু এ কি ইতিহাস? নাকি কাল্পনিক উপন্যাস?
উত্তরে বলব, একে ফিকশনলাইজড ইতিহাস বলাই শ্রেয়। যা ঘটেছে, তারই তথ্যের কঙ্কালে কাল্পনিক রক্ত-মাংসের প্রলেপ দিয়ে একে সৃষ্টি করেছেন লেখক।
সহায়ক পাঠ তথা রেফারেন্সের বিশাল তালিকা দেখলে তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে লেখকের শ্রম, নিষ্ঠা ও মেধা স্পষ্ট হয়। তবে আমার মতে লেখকের সিদ্ধিলাভ ঘটে সৃষ্টির নির্মাণে নয়, বরং প্রাণদানে। সেই মাপকাঠিতে কি উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি?

আজ্ঞে হ্যাঁ। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিই শুধু নন; তাঁর সময়কাল, তাঁকে প্রভাবিত করা নানা ঘটনা ও ভাবনা, সর্বোপরি তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টি— এরা সবাই জীবন্ত ও বর্ণাঢ্য হয়ে দেখা দিয়েছে আমাদের মনের চোখে।
শুধুই কি লিও?
উঁহু। মিকেলেঞ্জেলো-ও স্বমহিমায়, দোষে-গুণে-প্রতিভায় ভাস্বর হয়েছেন এই লেখায়।
আর আছেন লিওনার্দোর এক অমর সৃষ্টির প্রেরণা।
উপন্যাস যেখানে (আপাতত?) শেষ হয়েছে, তা এই শিল্পীদের জীবনে এক সন্ধিক্ষণ। আমরা জানি যে এরপরেও থেকে যায় এঁদের অনেক গল্প, জীবনের অনেক মোচড়। তার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ই বা কী?

তথ্যনিষ্ঠা এবং বর্ণনার জন্যই শুধু নয়; এই বইটি শিল্পভাবনায় আগ্রহী প্রতিটি পাঠকের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এর নিবিড় বিশ্লেষণের জন্যও। উদাহরণ হিসাবে জগদ্বিখ্যাত 'ভিত্রুভিয়ান ম্যান' সৃষ্টির অধ্যায়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সুধীজন জানেন, শিল্পের আসল কথা হল পার্সপেক্টিভ— যাকে দৃষ্টিভঙ্গি বা দৃষ্টিকোণ ইত্যাদি বলে আংশিকভাবে বোঝানো যায়। এই পার্সপেক্টিভ কীভাবে মূর্ত হয়, এই অধ্যায়ে লেখক তা দেখিয়েছেন। তারই সঙ্গে তিনি প্রায় প্রতিটি সৃষ্টির পটভূমি অতি সংক্ষেপে অথচ নাটকীয় ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন— যার প্রভাবে বইটা একটা গাইড-বুকের সীমা ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে একটি সময়ের প্রতিনিধি��� আমার মতে এটিই লেখকের সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব তথা অর্জন।

বইটিতে বহু সাদা-কালো আলোকচিত্র আছে; তবে তাদের পরিবেশনে কিঞ্চিৎ অস্পষ্টতা দেখা গেল। পাঠ মোটামুটি নির্ভুল, কিন্তু শেষের উপ-অধ্যায়ের শীর্ষকে আবার কেন ৪৬ লেখা হল, বুঝলাম না।

যদি শিল্পের ইতিহাসে আগ্রহী হন, বা কৌতূহলী বোধ করেন কিছু অবিস্মরণীয় কীর্তির পটভূমি নিয়ে, তাহলে এই বই আপনার জন্য অবশ্যপাঠ্য।
Profile Image for Ashik.
221 reviews42 followers
October 7, 2024
ইতিহাসের নির্জীব চরিত্রগুলোতে লেখক প্রাণপ্রতিষ্ঠা করলেন, চলনশক্তিও দিলেন, কিন্তু সঠিক পথের নির্দেশনা দিতে পারলেন না। উদ্দেশ্যহীন গল্পের পথে হেটে চললো কিছু বিখ্যাত চরিত্র!

গল্পে লুকা প্যাসিওলি, ক্রিস্টোফার কলম্বাস, আমেরিগো ভেসপুচি, নিকোলা ম্যাকিয়াভেলিও আছেন। এতগুলো বিখ্যাত চরিত্র কেন গল্পে এলো, কী দরকার ছিল তাদের সেটা অনেক ভেবেও বের করতে পারলাম না। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো তারা এলেন, চলেও গেলেন। গল্পে কোনোরকম প্রভাব ফেলা ছাড়াই!

লেখক বেশ ভালো পড়াশোনা করেছেন, সেজন্য তাকে সাধুবাদ জানাই।
ইতিহাসের বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি খামচে অনেক ঘটনাও নিয়েছেন। কিন্তু সবকিছু ব্লেন্ড করে সুন্দর একটা গল্প বলতে পারেননি। মূল গল্পের পাশাপাশি শাখাপ্রশাখা মেলা অনেক গল্পের কোনো কিনারা করতে পারেননি লেখক। অবশ্য এত শাখাপ্রশাখার দরকারও ছিল না কোনো।

মোনালিসার নামে বইয়ের এক-তৃতীয়াংশ নাম হলেও বইয়ে মোনালিসাকে কতটুকু তুলে ধরতে পেরেছেন লেখক সে প্রশ্নটা রয়েই যায়।
মিকেলাঞ্জেলোর সাথে মহাকবি দান্তের যে আধ্যাত্মিক সংযোগ লেখক দেখাতে চেয়েছেন সেটাও ঠিক জমেনি, ঘটনাটা আরো কাব্যিকভাবে তুলে ধরা যেত। বইয়ের বাকি সবকিছু ত্রুটি ভুলে শুধু এটুকুই উপভোগ করতাম। এখানেও হতাশ!

সর্বোপরি ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়তে গেলে আমার একটা গল্প চাই, শক্তিশালী চরিত্রায়ন চাই। প্রচুর তথ্য এবং ইতিহাসের মিশেল জানার ইচ্ছা থাকলে তো নির্ভেজাল ইতিহাসের বই খুলেই বসতাম।
Profile Image for Sutanu Chatterjee.
5 reviews1 follower
April 19, 2025
বইটি নিয়ে দু চার কথা বলা যাক, এটি একটি বিস্তৃত সময়কাল জুড়ে রচিত যদিও এটাই শেষ নয় আরো একটি খণ্ড প্রকাশিত হবে হয়তো আগামী বছর যেখানে লিওনার্দো মিকেলাঞ্জেলো আর মোনালিসা তিনজনেরই জীবন রেখার হয়তো সমাপতন ঘটবে (যে ভাবে উপন্যাসে বর্ণিত) এবং এক এক করে এদের শিল্পী জীবনের অনুসন্ধান শেষ হবে। আসলে এই উপন্যাস কারুর জীবনীমূলক উপন্যাস নয় যদি একান্তই সেই ভেবে বইটি কেনেন আর ভাবেন প্রত্যেকের জীবনের বর্ণনা (বা জীবনী) পাবেন তাহলে ভুল বলা হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যেকের জীবনের শুরু থেকে তাঁদের শিল্পকর্মের যে অনুসন্ধিৎসা সেই পরিচয় পাবেন।
লিওনার্দো আর মিকেলাঞ্জেলো দুই শিল্পী একজন উচ্চাকাঙ্খী নিজের প্রতিভার উপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস এমনকি অহংকার বলা চলে আর অপরদিকে ভিঞ্চি তিনি শিল্পের সন্ধানে স্পষ্ট করে বললে জীবন্মুখী শিল্পের আঙ্গিক খুঁজতে তিনি ব্যস্ত, প্রতিনিয়ত তিনি খুঁজে চলেছেন শিল্পের মধ্যের আমি কে, প্রত্যেকটি শিল্প কর্মের মধ্যে দিয়ে তাঁর যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সেটাই তিনি খুঁজে চলেছেন। অবশ্যই বিজ্ঞান তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু মিকেল? তাঁর উদ্দেশ্য তাঁর শিল্পকে শ্রেষ্ঠ বানানোর কারণ সব থেকে নিম্নমানের শিল্পী হিসাবে ফ্লোরেন্স ভাস্কর কেই খুঁজে পায়, কিন্তু শুধুই কি প্রতিভা দিয়ে তাকে জয় করা যায়?

কিন্তু একসময় মিকেলাঞ্জেলো যে ভিঞ্চি নিজের গুরু ভাবতেন? তাঁরই প্রতিদ্বন্ধিতায় নিজেকে জাহির করলেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি "ডেভিড" দিয়ে। আর তখনই হয়তো লিওনার্দো উপলব্ধি করলেন শিল্পী চলে যায় কিন্তু তাঁর শিল্প অমর, সময় রেখার মুছে যাওয়া দাগে এই শিল্পকেই মানুষ মনে রাখবে ভুলে যাবে তাঁর জন্মদাতা কে। এই ঈর্ষা মিশ্রিত যে উপলব্ধি সেই খিদেই হয়তো আমাদের মোনালিসার জন্ম দিয়েছে আর সেই হেতুই মোনালিসার জীবন কাহিনীর কিছুটা লেখক তুলে ধরেছেন (এই বইতে ) যাতে তাঁদের শিল্প কর্মের উৎস টা বোঝা যায়, কি কারণে লিওনার্দো শুধু মোনালিসা কেই বাছলেন আর বিগত ১৫০৩ থেকে জীবনের শেষ অব্দি মোনালিসা কেই বানিয়ে ছিলেন কিন্তু সেই কাহিনী জানতে গেলে হয়তো দ্বিতীয় বইটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

আমার এই উপন্যাসটা প্রকৃতপক্ষেই ভালো লেগেছে, লেখকের ভাষা বোধ, সময়কাল গুলোর সমাপতন গুলোকে বেছে নেওয়া খুব দারুণ লেগেছে আর লিওনার্দো ভিঞ্চির প্রতিটি শিল্প কর্মে, শিল্পী আর শিল্পের যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব লেখক তুলে ধরতে চেয়েছেন সেটা খুব প্রশংসনীয়। মিকেল এর ক্ষেত্রেও শ্রেষ্ঠত্বের পিছনে শুধু প্রতিভা নয় আরও অনেক কিছু আবশ্যক আর তাঁর সন্ধান করে চলা মিকেল কে লেখক দারুণ বর্ণনা করেছেন। আমার মতে এই দুই শিল্পীর একদা দ্বৈরথ পড়ার জন্যই এই বইটি কেনা যায়।
আমার এদের জীবন সম্মন্ধে খুব বেশি কিছু জানা ছিল না শুধু ভিঞ্চির উপরই কিছু বই পড়েছিলাম তাও তাঁর আবিষ্কার নিয়ে এই জাতীয়, মিকেলাঙ্গেলো সম্মন্ধে এমন কিছু সম্যক ধারণা আমর ছিলনা যার জন্যই হয়তো এইটা পড়তে ভালো লেগেছে, এখন কেউ যদি এই সমকালীন পর্যায়ের খুঁটি নাটি ব্যাপার অবগত হয়ে পড়তে বসেন হয়তো ভালো নাও লাগতে পারে (ব্যক্তিগত মতামত) কারণ এখানে ভিঞ্চির বৈজ্ঞানিক দিক টাকে যতটা তার চরিত্রের বিস্তারের জন্য প্রয়োজন ততটাই দেখানো হয়েছে যদিও তাঁর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার গুলি শিল্প কর্মের থেকে কম কিছু না কিন্তু লেখক আমার মনে হয়েছে এখানে প্রডিজি লিওনার্দোর থেকে শিল্পী লিওনার্দো কে তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী আর সেটা কেনো উপন্যাস পড়লে স্পষ্ট হয়।

বইটি বিভিন্ন শিল্প অনুরাগী আর এই সমকালীন ইতিহাস আর শিল্প কর্মের প্রতি অনুসন্ধিৎসা থাকলে অবশ্যই পড়ুন, দারুণ লাগবে।
Profile Image for Shoroli Shilon.
169 reviews75 followers
April 19, 2025
শিল্পী মাত্রই সৌন্দর্যের পূজারি আর তার অন্তর্নিহিত সমস্ত উপলব্ধিকে বাস্তবে রুপ দান করে শিল্প নামক জাদুকরী কম্পাস। আর শিল্পকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থেকেছেনে যারা—অমর হয়ে আছেন গোটা বিশ্বজুড়ে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন—লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মিকেল অ্যাঞ্জেলো, প্রমুখ। 

শিল্পকে কেন্দ্র করে রচিত 'লিও-লিসা-মিকেল’ মূলত একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস, যা ইতালির রেনেসাঁস যুগের তিনটি প্রধান চরিত্র—লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মোনা লিসা এবং মিকেল অ্যাঞ্জেলো—এর জীবন ও সময়কে উপজীব্য করে লেখা। তবে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং মিকেল অ্যাঞ্জেলোর অংশটুকুই বেশি রাখা হয়েছে। তাদের দ্বৈরথের গল্প, অভাব-অনটন, সমালোচনা—সবকিছুকে ছাপিয়ে অসামান্য কীর্তির কথা আবার দম্ভ-জেদ এর বশবর্তী হয়ে অসম্পূর্ণ সৃষ্টির স্বরুপ নিদর্শনও রয়েছে। মূলত পঞ্চদশ শতাব্দীর ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে তাদের সম্পর্ক, সংগ্রাম এবং সৃষ্টিশীলতাকে আলোকপাত করে উপন্যাসটি। ঐতিহাসিক তথ্য ও কল্পনাশক্তির সমন্বয়ে সেই সময় ও চরিত্রগুলোকে ভীষণ জীবন্ত করে তুলেছেন লেখক অনির্বাণ ঘোষ।

লেখনীর কথায় আসি। ঝরঝরে আর উপভোগ্য। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বিশাল একটা চারশো চল্লিশ পাতার এ বই পড়তে তাই আরাম লাগার-ই কথা। ��দিও উপন্যাসের মাঝে এসে কিছুটা ঝিমিয়ে যাচ্ছিল পড়ার গতি। এছাড়া শুরু এবং শেষটা যেমনটা হওয়া উচিৎ একদম তেমনই। একদম শেষে গিয়ে পাঠক যেমন চমকে যাবেন, ঠিক তেমনই সন্তোষের ঢেঁক গিলবে। আমার কাছে এ উপন্যাসটির সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে—সমান্তরালে চলা প্রত্যেকটা দৃশ্যকল্প বেশ গোছানো।

যারা ইতিমধ্যে এ বিষয়ে বিস্তর জানেন, অনেক পড়াশোনা করে ফেলেছেন—রেনেসাঁস যুগ, ইতালির সামাজিক কিংবা স���ংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে, লিওনার্দো কিংবা মিকেল অ্যাঞ্জেলো সম্বন্ধে — তাদের কাছে আহামরি নতুন কিছু লাগবে না।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির চিত্রকর্ম: 'মোনা লিসা', 'দ্য লাস্ট সাপার' 

বিখ্যাত অঙ্কন: ভিট্রুভিয়ান ম্যান, অথবা তার বড় চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে একটি—'দ্য ব্যাপটিজম অব ক্রাইস্ট'; অধ্যয়নমূলক কাজ 'অ্যানালিসিস অফ দ্য ফ্লাইট অব দ্য বার্ডস' অথবা

মিকেল অ্যাঞ্জেলোর চিত্রকর্ম: 'সিস্টিন চ্যাপেল এর সিলিং', দ্য লাস্ট জাজমেন্ট';

উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য: 'ডেভিড', 'পিটা', 'মোসেস', ইত্যাদি সৃষ্টির পর্দার আড়ালের গল্প অনেকটাই জানিয়ে দিবে অনিবার্ণ ঘোষের 'লিও-লিসা-মিকেল'।

সবমিলিয়ে লিও - লিসা - মিকেল লিখতে গিয়ে অনিবার্ণ ঘোষ প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। যে প্রয়াস তিনি দেখিয়েছেন নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবীদার।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,194 reviews387 followers
July 3, 2025
লিও-লিসা-মিকেল: রেনেসাঁর আলো-ছায়ার একটি শিল্পজীবনী
লেখক: অনির্বাণ ঘোষ
প্রকাশক: পত্রভারতী
মূল্য: ₹৫৯৫

(১) ভূমিকা: ইতিহাস না উপন্যাস, নাকি দুয়ের মাঝখানে দাঁড়ানো এক ধ্রুপদী ক্যানভাস?

“লিও-লিসা-মিকেল” পড়তে পড়তে এক অদ্ভুত বিভ্রমে ভোগে মন—আমি কী পড়ছি? ইতিহাসের এক সত্যান্বেষী পুনর্গাথন? এক ফিকশনলাইজড ক্রনিকল? নাকি শিল্প ও শিল্পীর চোখ দিয়ে গড়ে ওঠা এক নবজাগরণের ইমারত? প্রতিটি অধ্যায় যেন একেকটি প্যানেল—ফ্রেস্কো নয়, রেনেসাঁসের প্রতিচ্ছবি।

উপন্যাসটির বুনন এমন এক ধরণের, যা জর্জিও ভাসারির Lives of the Artists–এর ধাঁচে লেখা হলেও তার মধ্যে ঢুকে পড়েছে ওয়াল্টার আইজ্যাকসনের Leonardo da Vinci-র মতো অদম্য অনুসন্ধিৎসা এবং ইরভিং স্টোনের The Agony and the Ecstasy–র মতো শিল্প-সংবেদনার উত্তাল ঢেউ।

পাঠের শুরুতেই লেখক আমাদের নিয়ে যান ইতালির হৃদয়ে—ফ্লোরেন্সের রাজপথ, পাথরবাঁধানো চত্বর, দিগন্তজোড়া গির্জার টাওয়ার, আর আর্নো নদীর মৃদু গর্জনের মাঝে। সেখানে শিল্পী কেবল শিল্পী নন, তিনি ঈশ্বরের প্রক্সি; brushstroke-এর নিচে চাপা থাকে ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা, আর ঈশ্বরস্পর্শী উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

এই উপন্যাস ইতিহাস নয়, আবার নিছক কল্পনাও নয়। বাংলা সাহিত্যে এরকম ইতিহাস-অনুপ্রাণিত শিল্প-উপন্যাস অত্যন্ত বিরল—যেখানে গবেষণা আছে, রেফারেন্স আছে, অথচ কোনোটিই “ইনফো ডাম্প” হয়ে ওঠে না। বরং চরিত্র, আবেগ, দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন আর এক কর্কশ অথচ কোমল সময়ের হৃদয়চিত্র হয়ে ওঠে অনির্বাণ ঘোষের কলমে।

এ বই পড়া মানে এক ধরণের ক্যানভাসে ঢুকে পড়া—যেখানে প্রতিটি স্ট্রোক ইতিহাস, প্রতিটি রঙ শিল্পের শিরা, আর প্রতিটি মুখের রেখায় এক রেনেসাঁসের পুনর্জন্ম।

(২) লিও এবং মিকেল: এক আকাশে দুই সূর্য, নাকি একটাই আলো দুই বিভাজনে?

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি—দ্য পলিম্যাথ, দ্য সিক্রেট সিস্টেম।

তিনি ছিলেন একজন “visual philosopher”—চিত্রের রঙে, রেখায়, গাণিতিক ভারসাম্যে তিনি খুঁজে ফিরতেন এক মহাজাগতিক নকশা। Vitruvian Man ছিল তাঁর ঈশ্বরভাবনার কেন্দ্র, যেখানে মানুষ নিজেই হয়ে উঠেছে কসমিক গঠনের মানচিত্র। তাঁর আঁকা প্রতিটি মুখ যেন আবেগ আর অঙ্গসংস্থানকে এক সিম্ফনিতে বেঁধে তোলে—“art is never finished, only abandoned”—এই কথাটা যেন তাঁর অসম্পূর্ণ ক্যানভাসগুলোর অনুরণন।

অন্যদিকে মিকেলেঞ্জেলো—তিনি ছিলেন এক জ্বলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

পাথরে ঈশ্বরের আঙুলের ছাপ রাখার জন্য তিনি রাতের পর রাত কাটিয়েছেন মর্গে, শব ব্যবচ্ছেদ করে। তাঁর পিয়েতা এক প্রার্থনা, ডেভিড এক বিদ্রোহ, আর সিস্টিন চ্যাপেল যেন ঈশ্বরের দৃষ্টির নিচে মানবতার এক ট্র্যাজিক মহাকাব্য। Ross King's Michelangelo and the Pope’s Ceiling-এ যে অভিশপ্ত নিষ্ঠা ফুটে ওঠে, তার প্রতিটি ঢেউ খেলে গেছে অনির্বাণ ঘোষের উপন্যাসেও।

দুজনেই চেয়েছিলেন ঈশ্বরকে স্পর্শ করতে— লিও করেন সরল রেখা, সুনির্মিত গোলক আর রেনেসাঁসীয় অপটিক্সে; মিকেল করেন পাথরে আঘাত করে, মাংসপেশির শিরায় ঈশ্বরের ছোঁয়া খুঁজে।

কিন্তু এই উপন্যাসে তাঁদের সম্পর্ক দ্বৈরথ নয়, এক ধরণের duet— যেখানে দুজনের আত্মা পরস্পরের উপস্থিতিতে প্রতিধ্বনিত হয়। একে অপরকে দেখে তাঁরা খোঁজেন নিজস্ব সীমাবদ্ধতা, ঈর্ষা, অহংকার আর শিল্পসিদ্ধির তৃষ্ণা।

এ যেন এক গভীরতর প্রশ্ন— এক আকাশে কি দুই সূর্য থাকতে পারে? নাকি সূর্য একটাই, আর আমরা, পাঠকেরা, কেবল তার বিভাজিত আলো দেখছি—লিওর রেখায়, মিকেলের আঘাতে, রেনেসাঁসের হৃদস্পন্দনে?

(৩) লিসা: মোনালিসার অন্তঃসত্ত্বা মহত্ত্ব

লিসা ঘেরারদিনি—ইতিহাসের সেই "নীরব প্রতিমা", যিনি কথা বলেন না, কিন্তু তাঁর হাসি এক বহুবর্ণ ভাষ্য।

তিনি কেবল এক ধনী ব্যবসায়ীর স্ত্রী নন; এই উপন্যাসে তিনি হয়ে ওঠেন এক আত্মমগ্ন, আত্মচর্চিত নারীর রূপক, যাঁর জীবন ক্যানভাস ছাড়িয়ে এক নতুন ব্যঞ্জনার জন্ম দেয়।

লিসার চোখ যেন সময়ের আয়না, যার ভেতরে ফ্লোরেন্সের নারীত্ব, নিঃশব্দতা, নিঃস্বতা এবং এক অন্তর্লীন প্রতিবাদ একসঙ্গে জ্বলে ওঠে।

Dianne Hales-এর অসাধারণ বই Mona Lisa: A Life Discovered-এ যেভাবে লিসাকে একজন flesh-and-blood Florentine woman হিসেবে দেখা হয়—এই উপন্যাসেও অনির্বাণ ঘোষ সেই ইতিহাসের গভীরে ঢুকে তুলে এনেছেন এক নারী, যিনি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের নৈঃশব্দ্যে থেকেও থেকে যান কালোত্তীর্ণ।

উপন্যাসের লিসা কোনো “মিউজ” নন, তিনি নিজেই শিল্প। তিনি সেই নীরব আলোকবর্তিকা—যাঁর নিঃশব্দ উপস্থিতি লিওর ভাবনাকে সঞ্জীবনী দেয়। তাঁর চোখের দিকে তাকালে পাঠক অনুভব করেন—এই তো, এই নারীর ভিতরেই জেগে আছে আত্মবিশ্বাস, ক্ষোভ, প্রেম, অপূর্ণতা ও আর্দ্র স্মৃতি। যিনি হয়ে ওঠেন এক প্রতীক, এক interface—প্রজন্মের মধ্যবর্তী সেতু।

যেমনটা Irving Stone লিখেছিলেন The Agony and the Ecstasy-তে: “A portrait is not made in the camera but on either side of it.”
ঠিক তেমনই, লিসার প্রতিচ্ছবি কেবল ব্রাশে আঁকা নয়—তা গড়ে উঠেছে লিও ও লিসার মধ্যেকার এক অন্তঃসলিলা সখ্যে।

তিনি হলেন রেনেসাঁসের অন্তঃসত্ত্বা মহত্ত্ব— একজন নারী, যাঁকে ইতিহাস খণ্ডে খণ্ডে ভোলে, কিন্তু শিল্প চিরকাল মনে রাখে।

(৪) ভাষা ও ভঙ্গিমা: তথ্যের কবিতা, ইতিহাসের সিম্ফনি

অনির্বাণ ঘোষের ভাষা ঠিক যেন এক Renaissance fugue—প্রতিটি বাক্য তথ্যের ধ্রুপদী স্বরলিপি, প্রতিটি অনুচ্ছেদ এক গীতল সংলাপ। তাঁর বর্ণনা নাট্যরসসমৃদ্ধ, কিন্তু কখনোই ‘ড্রামাটিক’ নয়—বরং মেপে রাখা আবেগে তিনি আঁকেন ইতিহাসের প্যানোরামা।

লেখকের ভাষাশৈলী এমন, যা Martin Kemp-এর লেখা Leonardo বা Charles Nicholl-এর Flights of the Mind পড়ার মতো—তথ্যনিষ্ঠ, কিন্তু কল্পনায় আলোড়িত।

ফ্লোরেন্সের বৃষ্টি এখানে কেবল আবহাওয়া নয়, এক মেয়ের রাগ। রোমের গির্জার সিলিং শুধুই ইট-চুন নয়, এক শিল্পীর পিঠভাঙা যন্ত্রণা।
আর মিলানের আতরের গন্ধ—তা যেন লিসার নীরব উপস্থিতির অদৃশ্য ছায়া।

লেখক কেবল ইতিহাস বলেন না; তিনি chiaroscuro আঁকেন— ক্যারাভাজিওর মতন, আলো ও ছায়ার সংঘাতে জীবনের রূপরেখা ফুটিয়ে তোলেন।

তাঁর প্রতিটি অনুচ্ছেদ যেন একখণ্ড দৃশ্যপট: একবার ফ্লোরেন্সের রাজপ্রাসাদের উঠোনে দাঁড়িয়ে, আরেকবার সিস্টিন চ্যাপেলের সিলিংয়ে ঝুঁকে থাকা এক ক্লান্ত মায়েস্ত্রো।

অনির্বাণ ঘোষের সবচেয়ে বড় গুণ—তথ্যকে কখনও ভারী করেন না। বরং তার নিচে এক অনুভবের ভিৎ গেঁথে দিয়ে যান। তাঁর কলম art history-র গদ্য নয়, এক ধরনের linguistic chiaroscuro— যেখানে ইতিহাস আলোর মতো ঝলসে ওঠে, আর উপন্যাসের ছায়া তার গভীরতা তৈরি করে।

এটাই এই লেখার শক্তি। এটাই “লিও-লিসা-মিকেল”-এর সাউন্ডস্কেপ।

(৫) সময়: এই উপন্যাসের গোপন নায়ক

এই উপন্যাসে লিওনার্দো, মিকেলেঞ্জেলো কিংবা লিসা—তিনজনেই যেন এক বিশাল চিত্রনাট্যের মুখ্য চরিত্র, কিন্তু সেই স্ক্রিপ্টের সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে অনুপম ভূমিকাটি যেন ‘সময়’-এর। সময় এখানে শুধু পটভূমি নয়—সে নিজে এক জটিল চরিত্র, এক নীরব নায়ক, যাকে আমরা পাতার পর পাতা ধরে অনুভব করি।

ফ্লোরেন্স, ১৪৮০-এর দশক। শব ব্যবচ্ছেদ নিষিদ্ধ। ধর্মীয় অনুশাসন ভয়ঙ্কর কঠিন। কিন্তু একজন যুবক—লিও—মোমবাতির আলোয় মৃতদেহের শিরা-উপশিরা দেখতে দেখতে আ���কেন এক হৃদয়ের ম্যাপ। এমন না যে সে শিল্প করছে—সে যেন সময়ের শরীরে শল্যচিকিৎসা চালাচ্ছে।

রেনেসাঁসের সময়কে আমরা শুধু আলোয় ধোয়া বলে জানি, কিন্তু অনির্বাণ ঘোষ দেখান, তার গভীরতম স্তরে রয়েছে এক গহন ছায়া:

➤ লিওর অস্থিরতা, অসম্পূর্ণ ক্যানভাসের পাশে পড়ে থাকা রংতুলির দীর্ঘশ্বাস,

➤ মিকেলের ঔদ্ধত্য, যা শেষমেশ নিজেই নিজের মূর্তিকে চূর্ণ করে,

➤ লিসার মুখের চাপা ব্যথা, এক অসময়ের নারীর মৌন বিপ্লব।

এই সময় শুধু মহত্ত্ব সৃষ্টি করেনি, এ সময় অসম্পূর্ণতাকেও শিল্পে পরিণত করেছে। একটা যুগ, যাকে ভেবেছিলাম মহিমা ও জয়গানের,
তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে অপ্রাপ্তি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিষণ্ণতা আর বিপ্লব।

“Time stays long enough for anyone who will use it,” —লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এই কথা যেন এই উপন্যাসের মজ্জায় লেখা।

এই উপন্যাসে সময় কখনও মোমের মতো গলে যায়, কখনও পাথরের মতো অনড়, আবার কখনও রংতুলির মতো কাঁপতে থাকে শিল্পীর হাতে।
আর সেই অনন্ত প্রবাহেই পাঠক বুঝে যায়— লিও-মিকেল-লিসা আসলে সময়ের সন্তান, আর পাঠক তার সাক্ষী।

(৬) চিত্র ও ছাপা: বইটি নিজেই যেন একটি আর্টিফ্যাক্ট

"লিও-লিসা-মিকেল" কেবল একটি উপন্যাস নয়—এ এক বহুমাত্রিক শিল্পবস্তু, একটি চিন্তাশীল book-object, যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন ক্যানভাস, প্রতিটি অলংকরণ যেন একেকটি চিত্রগাথা।

বইটিতে প্রায় ৮০টিরও বেশি চিত্র—স্কেচ, ভাস্কর্য, ম্যাপ, আর্কিটেকচারের খসড়া ও রেনেসাঁর যুগের চিত্রকলার হস্তছাপ। কিন্তু এগুলো কোনোভাবেই mere embellishments নয়। এগুলো উপন্যাসের একেকটা শিরা-উপশিরা। কখনও একঝলক হাসি-ভরা লিসা, কখনও কারারার মার্বেলের অভ্যন্তরে বন্দি দেবতা, আবার কখনও সিস্টিন চ্যাপেলের সিলিংয়ের স্নায়ুযুদ্ধ।

অনেক ছবির ক্যাপশন নেই—কিন্তু একে আমি দুর্বলতা না বলে ইন্টেনশনাল ইন্টার‍্যাক্টিভিটি বলব। লেখক ও প্রকাশক যেন পাঠককে আহ্বান করছেন: “চলুন, একটু গুগল ঘাঁটুন, একটু নিজে খোঁজ করুন, আপনি নিজেই হোন রেনেসাঁর দর্শক ও দ্রষ্টা।”

এ এক জ্ঞানের gamified experience, যেখানে বই থেকে ফোন, ফোন থেকে মিউজিয়াম, মিউজিয়াম থেকে মনের অন্দরে এক নরম প্রস্থানে পাঠক নিজেই রেঁনেসাঁ অনুভব করে।

প্রচ্ছদ, বাঁধাই ও ছাপা? একেবারে সংগ্রহযোগ্য। রীতিমতো museum edition-এর অনুভব। সুবিনয় দাসের প্রচ্ছদ যেমন ঋদ্ধ, তেমনই প্রতীকধর্মী—রেনেসাঁর জ্যামিতি আর মানবশরীরের অনুপুঙ্খ একত্রে দাঁড়িয়েছে সেখানে। পত্রভারতীর মুদ্রণ ও বাঁধাইও নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, যেন এক এক্সক্লুসিভ ইবেরিয়ান মিনিয়েচার।

এই বই শুধু পড়া যায় না—ধরা যায়, ঘ্রাণ নেওয়া যায়, ছুঁয়ে দেখা যায়। যেমন শিল্পীর তুলির ঘ্রাণ মিশে থাকে ক্যানভাসে, এই বইয়ের পাতায় মিশে আছে লিওর হাতের রেখা, মিকেলের আঘাত, আর লিসার চোখের উজ্জ্বল নিরবতা।

(৭) পাঠ্যপুস্তকের বাইরে: যারা জানে না, তাদেরও জন্য এক অন্তরঙ্গ নিমন্ত্রণ

যাঁরা রেনেসাঁস জানেন না, ইতিহাসে খুব একটা যান না, ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন—তাঁদের জন্য এই উপন্যাস এক 'ইনভিটেশন টু ইনটেলেকচুয়ালিটি'। এটি কোনো বাহারি তথ্যজঞ্জাল নয়, বরং এক ধীর অথচ ঘন পাঠ—একটি অভ্যন্তরীণ জার্নি, যা চেতনা ও কৌতূহলের নতুন দরজা খুলে দেয়।

তবে হ্যাঁ, এটিকে "পেজ-টার্নার" গোত্রে ফেলা যাবে না। এটি এক ধরণের পাঠকের বই—যারা পাশে গুগল খুলে রাখে, পাশে একটা ছোট নোটবুকে টুকে রাখে ধ্রুপদী নাম, চরিত্রের সংযোগ, ইতিহাসের টানাপোড়েন।

কারণ, এখানে নামগুলো খটোমটো, চরিত্র বহুস্তরীয়, প্লট ঘন ও তর্কশীল।

লিও—এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র—মিরর ইমেজে লিখতেন, অর্থাৎ উল্টো হাতে, ডান থেকে বাঁ দিকে।

এই তথ্য বইটিতে লেখা নেই।

কিন্তু এটাই বইটির পাঠক-সৃষ্টিশক্তি—তোমাকে খোঁজার, খুঁড়ে পাওয়ার স্বাধীনতা দেয়।

এই বই পাঠ্য নয়—পাঠকের তৈরি হওয়ার এক দুঃসাহসী উপলক্ষ।

(৮) শেষের সূচনা: যেখান থেকে ক্যানভাস আবার সাদা

"লিও-লিসা-মিকেল" উপন্যাসটি শেষ হয় না—অন্তরাল রচনা করে। মোনালিসা তখনও ক্যানভাসে স্নায়বিক ছায়া মাত্র, রাফায়েল শুধুই ছায়া-পার হয়ে আসা এক প্রতিভার প্রেক্ষাপট। কিন্তু পাঠক জানেন, গল্প এখনও শেষ হয়নি। এই রেনেসাঁসীয় triptych-এর শেষ প্যানেল এখনো আঁকা বাকি।

“A good painting is not done when the artist stops painting. It is done when the painting refuses to take any more strokes.” —Inspired by Michelangelo

তেমনই, এই উপন্যাস থেমে যায়, কারণ ইতিহাস আর নিতে চায় না—সে বরং সামনে এগোতে চায়। এইখানে এসে আমরা বুঝতে পারি, লেখকের সংকল্প শুধু চরিত্র আঁকার নয়, সময় আঁকার।

রাফায়েল এই খণ্ডে আড়াল থেকে উঁকি দেন, যেন কোনো ভবিষ্যৎ মহারথীর তরবারির ঝলক। তাঁর গল্প এখনো বলার বাকি—‘লিও-লিসা-মিকেল এবং রাফায়েল’ সেই নতুন উপাখ্যানের নাম।

ততদিন পর্যন্ত এই বইটি রয়ে যাবে— একটি অর্ধসমাপ্ত ছবি, একজন ঘুমন্ত শিল্পীর জার্নাল, একটি শহরের নিঃশব্দ ঝলকানি, আর আমাদের পাঠকদের জন্য এক অনির্বাণ অপেক্ষা।

The canvas waits. The maestro will return. Ready for the reader reflections and echoes next? Or shall we move to the rating, final verdict, and recommendations?

(৯) শেষ পঙক্তি: পাঠের পরে, হৃদয় জুড়ে

এই বই পড়ে মনে হয় না কেবল পড়ছি— মনে হয় যেন ফ্লোরেন্সের রাজপথে হেঁটে চলেছি, পাশ দিয়ে মিকেল হেঁটে যাচ্ছেন ছেনি-হাতুড়ি হাতে, দূরে ভেসে আসছে লিসার আধহাসি, আর কোথাও এক কোণে একা বসে লিও—চোখ বন্ধ করে রঙ বাছছেন, আঙুল ছুঁয়ে অনন্তের নীলটা খুঁজে চলেছেন।

আর এখানে—একটা ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি:

এই বইয়ের লেখক আমার ভাই। তাকে বেশ ছোট থেকেই চিনি। আর আমি মূলত ইংরেজি পাঠক, এইসব চরিত্র-ইতিহাস-গল্প আমার বহু আগেই পড়া। তবু, অনির্বাণের গল্প বলার এমন এক মোহময়তা আছে, যে সে অচিরেই আমায় দিয়ে এই বই পড়িয়ে নিল—তাও বাংলায়। এক নিশ্বাসে, এক ভালোবাসায়।

আর একটা কথা— সে আমায় বলেছিল, বইটা লন্ডন থেকে পাঠাবে। আজও পাঠায়নি। শেষমেশ নিজের হাতে কিনেই নিলাম।

তবে তাতে কি? এই অভিজ্ঞতা তো আমার—অবশেষে বইয়ের পাতায়, আর রক্তে মিশে।

বলতেই হয়, 'Some stories are not read. They are remembered before reading, and relived after the last page is turned.'

পাঠ-প্রস্তাব ও পাঠ-উত্তর যাত্রাপথ:

যাঁরা পড়েছেন Irving Stone-এর The Agony and the Ecstasy, Sarah Dunant-এর In the Company of the Courtesan, Ross King-এর Leonardo and the Last Supper, অথবা Dan Brown-এর The Da Vinci Code— এবং বাংলায় ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস ভালোবাসেন—তাঁদের জন্য লিও-লিসা-মিকেল নিঃসন্দেহে এক অপরিহার্য শিল্পভ্রমণ। এটি কেবল উপন্যাস নয়, একটি চেতনার পুনর্জন্ম—শিল্পের অভ্যন্তরীন আর্তি আর ইতিহাসের গূঢ় ধ্বনির সম্মিলিত একটি ঘোর।

এবং পাঠ শেষে, যদি আরও জানার তৃষ্ণা থেকে যায়, তবে নিচের বইগুলো এক এক করে খুলে দেবে লিও, লিসা আর মিকেলের আরো অনেক গোপন দরজা— একটুও অত্যুক্তি না করে বলছি, এইগুলো হলো রেনেসাঁস-পাঠের crème de la crème।

রেনেসাঁ পাঠের সঙ্গী:

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মোনালিসা এবং মিকেলেঞ্জেলোকে কেন্দ্র করে রচিত কিছু শ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক প্রশংসিত গ্রন্থ—যা জীবনী, শিল্পতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের মেলবন্ধন।

লিওনার্দো সংক্রান্ত:--

১) Leonardo da Vinci – Walter Isaacson: অসাধারণ গবেষণানির্ভর, বিশদ এবং সহজবোধ্য জীবনী। বিজ্ঞান, শিল্প ও লিওনার্দোর নোটবুককে একত্রিত করে রচিত।

২) Leonardo – Martin Kemp: বিশ্বের অন্যতম সেরা লিওনার্দো গবেষক এক সমৃদ্ধ চিত্রসহ, পাণ্ডিত্যপূর্ণ অথচ উপভোগ্য রচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন।

৩) Leonardo da Vinci: Flights of the Mind – Charles Nicholl: এটি একটি সাহিত্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক জীবনী। লিওনার্দোর অন্তর্জগতের গভীর, অন্তর্মুখী বিশ্লেষণ এতে পাওয়া যায়।

লিসা সংক্রান্ত:--

১) Mona Lisa: A Life Discovered – Dianne Hales: লিসা ঘেরারদিনি (চিত্রের পিছনের নারী), ফ্লোরেন্স এবং লিওনার্দোর মোহের এক উজ্জ্বল ও মানবিক আখ্যান।

২) The Theft of the Mona Lisa – Noah Charney: ১৯১১ সালের মোনালিসা চুরির ঘটনার অনুসন্ধান। শিল্প ইতিহাস, গোয়েন্দাকাহিনি ও মিডিয়া তত্ত্বের এক দুর্দান্ত সংমিশ্রণ।

৩) The Da Vinci Legacy – Jean-Pierre Isbouts & Christopher Brown: কিভাবে মোনালিসা হয়ে উঠল পৃথিবীর সর্বাধিক বিখ্যাত চিত্রকর্ম—এই বই তা বিশ্লেষণ করে।

মিকেলেঞ্জেলো সংক্রান্ত:

১) Michelangelo: A Life in Six Masterpieces – Miles J. Unger: ছয়টি আইকনিক শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে শিল্পীর জীবনী বলা হয়েছে। ��ড়তে অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও আলোকোজ্জ্বল।

২) The Agony and the Ecstasy – Irving Stone: বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত এক ক্লাসিক ঐতিহাসিক উপন্যাস। আবেগঘন, নাটকীয় ও পাঠকপ্রিয়। যদিও এটি ফিকশন, তথাপি গভীরভাবে গবেষণানির্ভর এবং বিশ্বজোড়া ভালোবাসা অর্জন করেছে।

৩) Michelangelo and the Pope's Ceiling – Ross King: সিস্টিন চ্যাপেলের সিলিং চিত্র আঁকার পিছনের ইতিহাস, রাজনীতি, ধর্মীয় টানাপোড়েন ও শিল্প-সংগ্রামের এক ব্যতিক্রমী চিত্র।

এই তালিকাভুক্ত বইগুলো সেইসব পাঠকের জন্য, যাঁরা শুধু ইতিহাস পড়েন না—ইতিহাসকে অনুভব করতে চান, শিল্পের ভিতর দিয়ে সময়কে ছুঁতে চান। কিংবা হয়তো, ভবিষ্যতের অনির্বাণ ঘোষ হয়ে ওঠার স্বপ্ন লালন করেন।

অনির্বাণকে অনেক আদর।

অলমতি বিস্তরেণ।
1 review1 follower
October 3, 2024
পাঠপ্রতিক্রিয়া
বই : লিও লিসা মিকেল
লেখক : অনির্বাণ ঘোষ
প্রকাশক: পত্রভারতী
মুদ্রিত মূল্য: 595/- টাকা
-----------------------------------

".. ওর ঐকান্তিক ইচ্ছা এখন একটিই, ও ঈশ্বরকে স্পর্শ করতে চায়।"

"ও হেরে যাবে? ও তো কোনো সাধারণ শিল্পী নয়, ওর ক্ষমতা অসীম, ছেনি হাতে নরম পাথর কেটে ও একদিন তৈরি করবে ঈশ্বরকে।... "

ঈশ্বরকে খুঁজছে দুজন। পাথর মন্থন করে ঈশ্বর, রেখাকৃতি ভেঙে বা বেঁধে ঈশ্বর। শিল্পী কোথায় পায় ঈশ্বর? শিল্পীর ঈশ্বর কি অবাঙমনসগোচর? নাকি সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে Goddess of Inspiration বা Muse? ঈশ্বর কি সেই অনন্ত perfection যার জন্য রেখায় রঙে সারাজীবন একটু করে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে ভিঞ্চি গ্রামের এক কিশোর? কী প্রচন্ড আর্তনাদে প্রেম হারিয়ে সে এক পলের মধ্যেই ভেঙে প'ড়ে ঈশ্বর সম্পর্কে উদভ্রান্ত যন্ত্রণায় ভেবেছিল - "সে আসলে ভুলে ভরা মানুষেরই ভাবনার ক্রীতদাস।" আরেকজন, রক্তে তার সেত্তিগনানোর পাথরখনির ধুলোর গুঁড়ো, মেরিমাতার মুখ পাথরে ফোটায় মৃদু ও নমনীয়। মেরিমাতা স্তন্যপান করাচ্ছেন শিশু যীশুকে। মেরিমাতার শান্ত মুখে ছায়া ফেলে যায় সেই ভাস্কর্যশিল্পীর স্তন্যদায়িনী ধাত্রীমা আন্তোনিয়া বাসো। কেন? ঈশ্বর কি তবে কোনো perfection নন; বরঞ্চ শোকেতাপে পূর্ণ ত্রুটিময় মানুষেরই মতন কোনো স্নেহকাতর অস্তিত্ব - Holy Trinity র বাইরে মানুষের জীবনের এক কোণে এক মায়াময় নীড়ের মতো এক উপস্থিতি?
রেনেসাঁর সময় তখন। ভেঙে যাচ্ছে পুরোনো সৃষ্টিচিন্তন, সমস্ত সৃজনযাপনের কেন্দ্রে ঈশ্বরের বদলে এসে দাঁড়াচ্ছে মানুষ ও মানবীয় আবেগ-আকাঙ্ক্ষা : তার উন্মথিত প্রেম থেকে অতুল বিরহ, স্নেহ থেকে বিরাগ, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দবেদনাসমূহ। এরই মধ্যে দুজন শিল্পী - লিও আর মিকেল খুঁজছে ধ্রুবতমকে। সে জীবনাধিক নাকি জীবনসম্পৃক্ত? জীবনের সুখদুঃখের প্রতি তন্ত্রীতে তার বিস্তার নাকি সে "নিশিদিন অনিমেষে" দেখে চলে এই পৃথিবীকে নির্লিপ্ত? লেখক অনির্বাণ ঘোষের উপন্যাস "লিও লিসা মিকেল" পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল - এই প্রশ্নে চিরকাল বিদীর্ণ হতেই সৃজকজন্ম পান লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ও মাইকেলেঞ্জেলো, কিংবা বিশ্বের যেকোনো কিংবদন্তি স্রষ্টা।

ইতিহাসানুসারে যে সময়পর্বকে আমরা ইউরোপীয় নবজাগরণ বলে জানি, তার অনেক আগেই মানুষের অনুভূতিকে কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন মহাকবি দান্তে (Dante)। বিয়াত্রিচের জন্য তাঁর ফুটিয়ে তোলা লীলাকমল "দিভিনা কোমেদিয়া" (Divine Comedy) যদিও কবিচিত্তের অনুভবসরোবরে ভেসে শেষপর্যন্ত তন্নিষ্ঠ ঈশ্বরপ্রেমের তীরে চলে গিয়েছিল, তবু এই গ্রন্থেই প্রথমবার মানবানুভবের শাশ্বত সুর পাওয়া যায়। বিয়াত্রিচেকে সেখানে অমর করে রাখলেন দান্তে। সেই "ইমমর্তালিতা" (Immortality)-র বাণী কোথাও না কোথাও জ্বালিয়ে রাখে মিকেলকে। উদ্ধতস্বভাব, অহংকারী কিশোর মিকেল দান্তে পড়েনি আগে। একদিন অকস্মাৎ ব্যর্থতার কোনো আত্মধ্বংসের মুহূর্তে সে যেন শুনতে পায় - ".. তার স্মৃতিচিহ্ন একসময় বাতাসে মিলিয়ে যায় ধোঁয়ার মতো.."। এই একটি কথা "ইমমর্তালিতা" মিকেলকে ছুটিয়ে মারে নিজের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টির জন্ম দেওয়ার প্রেরণায়। সেই দিন থেকে সে অনুভব করতে থাকে - এই শব্দগুলো "যেন তার আত্মা থেকে উৎসারিত"। তারপর -"কথা বলো"... পাথরের সাথে নিয়ত কথা বলে সে। কত যন্ত্রণা পেরিয়ে একদিন তৈরি হলো "পিয়েতা",- যীশুর মৃতদেহ কোলে কুমারী মেরি নিঃস্ব গাম্ভীর্যে শান্ত, মুখের রেখায় অপূর্ব দৈবী সৌন্দর্য কিন্তু আত্মজকে হারাবার প্রচন্ড শোকও। "দাভিদ" (বা "ডেভিড", David) -এর সুকুমার অঙ্গসৌষ্ঠব ধরা থাকল মার্বেল পাথরেই।
অন্যদিকে লিও, যাকে মিকেল বরাবর আদর্শ বলে মেনে এসেছে, সে কতকটা অজান্তেই অপমান করে বসে মিকেলকে। ততদিনে লিও "মায়েস্ত্রো" (Master) উপাধিধারী প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। লিওর জীবনেও বহুতর বাঁক। সে ভিত্রুভিয়াসের উপপাদ্যের কাছে খুঁজেছিল ঈশ্বরত্ব বা অমরত্ব, পেয়েছিল ত্রুটি। সেই ত্রুটি সংশোধন করে সে এঁকেছিল "ভিত্রুভিয়ান ম্যান"। কিন্তু তবু অমরত্বের সাধ তার থেকেই গিয়েছিল। সারাজীবন সে নানা ছবিই এঁকেছে, কিন্তু শ্রেষ্ঠতমের সন্ধান তার শেষ হয়নি এখনো। সাঁলো দেই সিনকুয়েসেন্তো'র ফ্রেস্কো আঁকার সময় একদিন দুজনের মনোমালিন্য ঘুচে গেল - দুই শিল্পীই উপলব্ধি করল একে অপরের সৃজন-বেদন।

দুই প্রবল শিল্পীর জীবন দুই ভিন্নরকমের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরম আপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নিজের নিয়মে। কিন্তু এর মাঝে তাহলে লিসা কই? লিসা ঘেরারদিনি, সাধারণ এক ফ্লোরেন্সীয় মেয়ে। বাবা আন্তনমারিয়া ঘেরারদিনি এক কার্তোলাই (স্টেশনারি দোকান) - এর সাধারণ কর্মচারী। কিশোরী লিসাকে প্রায় অসময়েই হয়ে উঠতে হয় সাংসারিক বিষয়ে পরিণতবুদ্ধি এক নারী - নিজের ভাইবোনদের খেয়াল রাখতে রাখতে সে যেন আস্তে আস্তে ভুলেই যায় যে সে একদিন লাতিন শিখতে চেয়েছিল, দান্তে বা চেকো দ্য অ্যাসকোলি (Cecco d'Ascoli) খুব টানত তাকে। বছর পনেরোর লিসার বিয়ে হয়ে যায় তার দ্বিগুণ বয়সী ধনাঢ্য এক ব্যবসায়ী ফ্রাঞ্চেস্কো জ্যকোন্দো'র সাথে। ভালোবাসেছিল সে, কিন্তু প্রতিদান পায়নি। বছর কুড়ির লিসা একটু একটু করে সইয়ে নিয়েছে একটা অপূর্ণ জীবনের বিষণ্নতা। রূপবতী ছিল সে, কিন্তু শোক আর খেদ তার অবয়বে একরকমের ধীময়ী রূপ এনেছে। তার একটি সাধারণ কথায় কেঁপে লিও - "আপনি যথার্থই উচ্চকোটির শিল্পী মায়েস্ত্রো। ... কিন্তু আপনি মানুষ হয়ে উঠতে পারেননি লিওনার্দো। ঈশ্বরের কাছে আপনার জন্য সহমর্মিতার প্রার্থনা করব।" শিল্পী যে আসলে শিল্পী নয় যতক্ষণ না সে সহমর্মী, যতক্ষণ না সে মানুষের অন্তরের মুক্তাশ্রুবিন্দু দেখতে পায়। সে যে ভেবেছিল, ঈশ্বর মানুষেরই ভাবনার ক্রীতদাস, তখন থেকেই তার মন কঠিন হয়েছিল বোধহয় আস্তে আস্তে। আসলে ঈশ্বর বা অমরত্ব - যাই বলা হোক না কেন, সে কেবলই এক শুদ্ধতম অনুভব। লিও তার খর জিহ্বায় লিসাকে কথার বাণ দিয়ে বিদ্ধ করে এক অস্মিতাময় আনন্দ পেয়েছিল। কিন্তু লিসার কথার প্রভাব তাকে ছাড়েনি কখনো। প্রবল বৃষ্টির জলে যখন ধ্বংস হয়ে যায় তার সাঁলো দেই সিনকুয়েসেন্তো'র ফ্রেস্কো, যখন তারই পরিকল্পনা অনুসারে বানানো আর্নো নদীর বাঁধ ভেঙে পড়ে, সেই তীব্র ব্যর্থতা আর হেরে যাওয়ার মুহূর্তে তাই সে ছুটে যায় লিসার কাছে, ক্ষমা চায়। বলে, "আমার প্রতিভার কিছু ক্ষণিকের স্ফুলিঙ্গে এরা হয়তো অবাক হয়, তার উদযাপন করে। কিন্তু সিনিওরা লিসা, আমার এই আগুন কোনোদিন অনির্বাণ শিখায় রূপান্তরিত হয়নি, আমিই পেরে উঠিনি কখনো।" লিসা যখন ক্ষমা করল লিওকে, সাথে সাথেই তার মনে হলো -"ও ভারশূন্য। ভিঞ্চি গ্রামের স্নিগ্ধ বাতাসে ও যেন ভেসে যাচ্ছে।" শুধু তো সামান্য ক্ষমা, সামান্য শান্তিবোধ। তাতেই লিসাকে দেখে "লিওর মনে হল যেন মাতা মেরী সস্নেহে চেয়ে রয়েছেন ওর দিকে।" এই অংশটি পড়বার পর আমার মনে হয়েছিল - যেন এই মুহূর্তে, ঠিক এই ক্ষণেই ঈশ্বরকে অনুভব করছিল লিও। ঈশ্বরকে স্পর্শ করছিল আপন চৈতন্য দিয়ে। তার চিরায়ত ঈশ্বর স্পর্শের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছিল।

এরপর মায়েস্ত্রো ভিঞ্চি আঁকছেন লিসার অবয়ব। শিল্পীর অনুরোধে লিসা ধীরে ধীরে মনে করছে বেফানাবুড়ির উৎসবের সেই দিন, মনে করছে দান্তের লেখা, মনে করছে কত সুখদুঃখের কথা। বেফানার উৎসবের দিনেই সেই ছোট্টবেলায় একদিন একটা ছেলের সাথে দেখা হয়েছিল না? লিসা তখন বছর পাঁচেকের বাচ্চা মেয়েটি। সেই ছেলেটিই ছিল মিকেল। লিসার আজকে আর সেসব কি মনে পড়ে? মিকেল ফ্লোরেন্স ছেড়ে এখন রোমে চলে গিয়েছে। লিসা বোধহয় জানেও না তার কথা। মায়েস্ত্রো এবার আঁকবেন "মোনা লিসা" চিত্র, তাঁর একান্ত অমরত্বের অনুভবের অবয়ব। সদ্য আঁকা শুরু হলো তাঁর ঈশ্বরের প্রথম চিত্র। এখনো কত কিছু জানা, ভাবা বাকি আছে। মিকেলও ঠিক খুঁজে নেবে তার ঈশ্বর, তার মহাকরুণা। তার হাতেই যে প্রাণ পেয়েছিল "পিয়েতা"। কত যন্ত্রণা যে তারও পাওয়া বাকি।

লেখক যে অনায়াস দক্ষতায় তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ফুটিয়ে তুলেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। সম্ভবতঃ, এই প্রেক্ষাপট না তুলে আনলে আমরা ব্যক্তিমানুষ হিসাবে লিওকে, মিকেলকে চিনতেই পারতাম না। আর এই পরিচিতির মাঝে কুয়াশা থাকলে এই দুই শিল্পীর যন্ত্রণাসমূহ বুঝতে পারতাম না, বুঝতাম না এনাদের ঈশ্বর বা অমরত্বের আকুতি ঠিক কতখানি। উপন্যাসটিই তৈরি হতো না। আর তৎকালীন ইতালিয়ান সমাজ কেমন নারীচরিত্রকে আদর্শ বলত, তাকে তুলে ধরেছে লিসার চরিত্র। তার সংবেদনশীল হৃদয়ে আভাসিত হয়েছে স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার বেদনা। রেনেসাঁর আলোজ্বলজ্বল সময়ের নীচে যে কিছুটা অকথিত অন্ধকার। এই অন্ধকার বত্তিচেল্লিকে বাধ্য করে প্রিয় সিমোনেতার ছবি পুড়িয়ে ফেলতে, এই অন্ধকার মানুষকে বাধ্য করে ধর্মের নামে শিল্পকলার বিসর্জন দিতে। লিসা সেই সমাজের মধ্যে বেড়ে ওঠা এক নিবিড়করুণ নারী। লিসার বিবাহের সময়ে পণ নিয়ে আন্তনমারিয়ার চিন্তার কথা আমায় নারায়ণ সান্যালের "আর্টিমিসিয়া" বইয়ের আর্টিমিসিয়ার বিয়ের সময় তার বাবা ওরাজিও জেন্টিলসচির উদ্বেগের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

বইয়ের ব্লার্বে লেখা আছে, "দুই আশ্চর্য প্রতিভাশালী শিল্পী এবং এক অতি সাধারণ নারীর চোখ দিয়ে লিও - লিসা - মিকেল খুঁজতে চেয়েছে সেই সময়কে।" কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে বলব, এই বই লিওর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ও মিকেলের মাইকেলেঞ্জেলো হয়ে ওঠার সাধনার একটা অংশও ধরে রেখেছে। অন্ততঃ, আমার চোখে এরকমভাবেই ধরা পড়ছে। উপরে তা বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। প্রেক্ষাপট বিস্তারের কারণে এসেছেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস, আমেরিগো ভেসপুচি, বত্তিচেল্লি, জিরোলামো সাভোনারোলা এবং আরো অনেকে। আমি জানি, যদিও এনারা শুধু প্রেক্ষাপট নির্মাণের জন্যই এসেছেন, তবু এটা স্বীকার করেই ফেলি যে, বত্তিচেল্লির বিস্তার আরেকটু হলে ভালো লাগত আমার। একধরনের অবুঝ ইচ্ছা বলা যায় একে। আসলে বত্তিচেল্লিকে নিয়ে আমার আগ্রহ খুব।

লেখা যথেষ্ট গতিময়। কিন্তু কয়েকটি মুদ্রণ প্রমাদ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে আমার। যেমন, 36 পাতায় দেখলাম, পাউলিনো লিওনার্দোকে "এল দুয়োমো" নির্মাণের গল্প বলছে 1469 সালে। ফিলিপ্পো ব্রুনেলেশি সমগ্র নির্মাণকাজ শেষ করেন 1436 সালে। এদিকে পাউলিনো বলছে, "সেই দিনটার পরে আরও একশো চল্লিশ বছর কেটে গেছে...।"! কীভাবে হয়? 1469 থেকে 1436 বাদ দিলে 33 হয়, সুতরাং হিসাবানুসারে 33 বছর হওয়ার কথা। বানানেরও ত্রুটি দেখলাম কয়েকটি। যদিও এগুলি কেবল সামান্য অনবধানতার ফল, তবু এমন ঝরঝরে উপন্যাস পড়তে গিয়ে এসব জায়গা চোখ টেনে নেয়। এভাবে আটকে যাওয়া প্রার্থিত নয়। তবে একটি জিনিস ভালোও লাগল আমার - খ্রিষ্টান মিথের চরিত্রগুলি যখন এসে পড়েছে বর্ণনাপ্রসঙ্গে, তখন সংক্ষেপে হলেও সংশ্লিষ্ট গল্পটি জানিয়ে দিয়েছেন লেখক। আর একখানি সময়সারণি দিয়েছেন বলে পড়তে পড়তে সালতারিখের খেই হারিয়ে যায় না। কিছু অসামান্য সাদাকালো ছবি রয়েছে বইটিতে, সেগুলি কিছুক্ষেত্রে অস্পষ্ট হলেও আগ্রহী পাঠক ছবিগুলির নাম দেখে গুগল থেকে সার্চ করে দেখে নিতেও পারেন।

মোটের ওপর, উপন্যাসটি বেশ সুন্দর। সেই সময়ের ইতালি সম্পর্কে এত বিস্তৃতভাবে কিছুই জানতাম না প্রায়। জানতাম না, কোন ইতালি জন্ম দিয়েছে লিওনার্দো, বত্তিচেল্লি, মাইকেলেঞ্জেলোদের। আমার মতো historical fiction এর ভক্তের কাছে এই বইটি বেশ আকর্ষণীয়। বইটিকে তো একটি cliff ending দিয়েছেন লেখক এবং সেকথা শুরুতেই স্বীকার করেছেন। তাই, সেই "লিও- লিসা- মিকেল ও রাফায়েল" উপন্যাসটি প্রার্থিত। তখন নিশ্চয়ই এর থেকেও আরো পরিণত লেখনী পাব। সুতরাং, অপেক্ষা রইল। ✨♥️
Profile Image for Bratik Bandyopadhyay.
22 reviews
December 25, 2025
লিও-লিসা-মিকেল: এক আশ্চর্য লেখা, রেনেসাঁসের আলো-আঁধারির এক অসামান্য চিত্রকল্প এঁকেছেন লেখক অনির্বাণ ঘোষ।

বাংলা সাহিত্যে ইতিহাস নির্ভর উপন্যাসের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হলেও, ইউরোপীয় রেনেসাঁসের মতো এক বিশ্বজনীন যুগকে এতটা সূক্ষ্মতা ও গভীরতার সঙ্গে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা কাজ সম্ভবত খুব কমই হয়েছে। অনির্বাণ ঘোষের 'লিও-লিসা-মিকেল' (২০২৪ সালে, পত্রভারতী থেকে প্রকাশিত) ঠিক এমনই এক চমৎকার সৃষ্টি, যা শুধুমাত্র একটি উপন্যাস নয়, বরং একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিল।
এই বিশালকায় গ্রন্থে লেখক লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মোনা লিসা এবং মিকেল অ্যাঞ্জেলোর জীবনকে একত্রিত করে রেনেসাঁসের পঞ্চদশ শতাব্দীর দিগন্তকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। বইটি কেবল শিল্পীদের জীবনী নয়, বরং সেই যুগের আলোর সঙ্গে জড়ানো অন্ধকারেরও এক অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ অনুসন্ধান। বাংলা ভাষায় এই ত্রয়ীকে কেন্দ্র করে লেখা সম্ভবত প্রথম উপন্যাস এবং বইয়ের মধ্যে দেওয়া অসাধারণ সাদা- কালো ছবি এক অন্য মাত্রা যোগ করে সেই যুগের ফ্লোরেন্স, রোম ও মিলানের রাস্তায় নিয়ে যায়।

পঞ্চদশ শতাব্দীর ইতালি, বিশেষ করে মেডিসি পরিবারের অধীনে ফ্লোরেন্স ছিল সেই যুগের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে মানবতাবাদ, বিজ্ঞান এবং শিল্পের নতুন আলো। লেখক এই যুগকে শুধুমাত্র 'আলো' হিসেবে দেখেননি, দেখিয়েছেন কীভাবে এই আলোর নীচে জমাট বাঁধছিল অন্ধকার—প্যাজি পরিবারের ষড়যন্ত্র, ধর্মীয় কট্টরতা, লিঙ্গভিত্তিক অসমতা এবং শিল্পীদের অভ্যন্তরীণ সংঘাত। উদাহরণস্বরূপ, ফ্লোরেন্সের আরনো নদীর তীরে বাজারের হট্টগোল, গিল্ড সিস্টেমের কঠোরতা, এবং বেফানা (ইতালীয় লোককথার জাদুকরী দিদি) মতো কুসংস্কারগুলোকে লেখক সজীবভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

ঐতিহাসিক সত্যতার দিক থেকে, লেখকের গবেষণা অত্যন্ত গভীর। লিওনার্দোর অ্যানাটমিকাল স্টাডি, ভিট্রুভিয়ান ম্যানের জ্যামিতিক নির্মাণ, মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর 'ডেভিড' মূর্তির সৃষ্টি প্রক্রিয়া এবং মোনা লিসার বাস্তব জীবনকে (লিসা গেরার্দিনি, ১৪৭৯-১৫৪৭) ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার বা ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক চিন্তাধারার মতো সমকালীন ঘটনাগুলোকে পটভূমিতে ব্যবহার করে লেখক সেই যুগের বৃহত্তর ছবি এঁকেছেন। উপন্যাসটি নন-ফিকশনের মতো ঐতিহাসিকতা এবং ফিকশনের স্বাধীনতার মধ্যে এক সুন্দর ভারসাম্য রক্ষা করে।

লিও- লিসা- মিকেল, এই ত্রয়ীর জীবনপথ কে আধার করে রচিত এই উপন্যাসটি তিনটি সমান্তরাল সুতোয় বোনা। লিওনার্দোর শৈশব থেকে উত্থান, মিকেল অ্যাঞ্জেলোর কঠোর শিল্পীয় যাত্রা এবং লিসার সাধারণ জীবনের মধ্য দিয়ে। গল্প শুরু হয় ফ্লোরেন্সের এক ব্যস্ত বাজারে, যেখানে লিসা গেরার্দিনি (মোনা লিসা) জন্মগ্রহণ করে ১৪৭৯ সালে। তার বাবা অ্যান্টনমারিয়া একজন স্টেশনার, এবং মা লুক্রেজিয়া, একটি সাধারণ পরিবারের ছবি যা রেনেসাঁসের উজ্জ্বলতার মধ্যে সাধারণ মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরে। লিসার যৌবনে বিবাহ হয় ফ্রানচেস্কো দেল জিয়াকন্ডোর সঙ্গে, কিন্তু তাঁর জীবনের সত্যিকারের রহস্য লুকিয়ে থাকে চোখের হাসিতে, যা পরবর্তীকালে লিওনার্দোর ক্যানভাসে অমর হয়।

লিওনার্দোর অধ্যায়গুলো তাঁর জন্ম (১৪৫২), ভেরোকিওর অধীনে শিক্ষা, এবং সোডমির অভিযোগের মতো ব্যক্তিগত সংকটকে কেন্দ্র করে। তাঁর বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, প্রকৃতির বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ, অঙ্কন এবং উইঙ্গসের মতো উদ্ভাবন—তাঁকে বটিচেলির মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আলাদা করে।
অন্যদিকে, মিকেল অ্যাঞ্জেলোর (১৪৭৫-১৫৬৪) গল্প তাঁর দারিদ্র্যপূর্ণ শৈশব, লরেনজো দে মেডিসির অধীনে পৃষ্ঠপোষকতা এবং 'পিয়েতা' বা 'ডেভিড'-এর মতো মূর্তির সৃষ্টির মাধ্যমে তার অসম্ভবতা ও প্রতিযোগিতার মনোবিজ্ঞানকে উন্মোচিত করে।
লিও এবং মিকেলের মধ্যে ঈর্ষা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা (এবং একইসাথে পারস্পরিক অন্তর্নিহিত শ্রদ্ধা) এই উপন্যাসের মেরুদণ্ড, যা ফ্লোরেন্সের শিল্পজগতের রাজনীতিকে প্রতিফলিত করে।

গল্পের ক্লাইম্যাক্সে লিও, লিসার পোর্ট্রেট আঁকতে শুরু করেন, যা একটি ক্লিফহ্যাঙ্গারে শেষ হয় এবং পরবর্তী খণ্ডে রাফায়েলের প্রবেশের ইঙ্গিত সহ। এই গঠন পাঠককে যুগের প্রবাহের সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায়।তবে কিছু সাবপ্লট (যেমন: কলম্বাসের আকস্মিক উপস্থিতি) অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। এছাড়াও লিসার ভূমিকা কিছুটা যেন অপর্যাপ্ত এবং আলোচনা কম বলে মনে হয়েছে, আশাকরি এর পরবর্তী অংশে তা বিস্তারিত ভাবে পাওয়া যাবে।

মানুষের মধ্যে অমরত্বের সন্ধান এই
উপন্যাসের শক্তি, এর চরিত্রগুলোর মানসিক গভীরতায় তা সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। লিসা গেরার্দিনি কোনো রহস্যময়ী নারী নন, তিনি একজন সাধারণ নারী, যাঁর জীবন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খলে বাঁধা। তাঁর চোখের হাসি—যা লেখক 'অনুচ্চারিত অন্ধকারের' প্রতীক হিসেবে দেখান, পুরুষতান্ত্রিক যুগে নারীর অদৃশ্য সংগ্রামকে প্রতিফলিত করে। লিসার দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প বলা হয়েছে, যা পাঠককে শিল্পের পিছনের রক্ত-মাংসের মানুষটিকে দেখায়।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এখানে এক অসম্পূর্ণ জিনিয়াস। তাঁর অহংকার, প্রকৃতির প্রতি অবসেশন এবং অমরত্বের স্বপ্ন তাঁকে মানবিক করে তোলে। তাঁর অ্যানাটমি স্টাডির মাধ্যমে লেখক দেখান কীভাবে শিল্প বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিত হয়, কিন্তু তাঁর সোডমির অভিযোগ যেন যুগের সামাজিক অন্ধকারকে উন্মোচিত করে।
মিকেল অ্যাঞ্জেলো, বিপরীতভাবে, এক কঠোর যোদ্ধা-শিল্পী, তাঁর গর্ব, লিওর প্রতি ঈর্ষা এবং দান্তের প্রভাব তাঁকে রেনেসাঁসের 'এক আশ্চর্য শক্তি'র প্রতীক করে তুলেছে।
সহায়ক চরিত্রগুলো—ভেরোকিও, লরেনজো দে মেডিসি, বটিচেলি—যেন ঐতিহাসিক ক্যামিও, যা গল্পকে সমৃদ্ধ করে। এই চরিত্ররা শুধু ঘটনা ঘটায় না, তারা যুগের মানসিকতাকে প্রতিফলিত করে: লিওর পর্যবেক্ষণমুখী দৃষ্টি বনাম মিকেলের নিখুঁততার অবসেশন।

এই উপন্যাসের মূল থিম হলো রেনেসাঁসের দ্বৈততা—আলো এবং ছায়া। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে শিল্পীরা সমাজের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করেন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, কিন্তু এই মুক্তি একইসাথে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জন্ম দেয়।
মানবতাবাদের থিমের মধ্য দিয়ে উঠে আসে লিঙ্গভূমিকা, পরিবারের গতিবিধি এবং জুয়ার সংস্কৃতির মতো সামাজিক বিষয়। শিল্পের অমরত্ব—লিওর ক্যানভাস বা মিকেলের মূর্তিতে—মানুষের অসম্পূর্ণতাকে অতিক্রম করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এছাড়া, পর্যবেক্ষণ এবং অনুভূতির থিম যেন লেখকের নিজস্ব দর্শন, শিল্পী যেন একজন চিরকালীন দর্শক, যিনি মানুষের রহস্যকে ক্যাপচার করেন। এই থিমগুলো বেশ নতুন লেগেছে , কারণ এটি ইউরোপীয় ইতিহাসকে আমাদের বাঙলা সাহিত্যে নিয়ে এসেছে।

লেখনী সাবলীল এবং চিত্রময়। অযথা ইনফো-ডাম্প এড়িয়ে ছোট ছোট ঘটনা, খণ্ডিত স্মৃতি এবং সাবটেক্সটের মাধ্যমে যুগকে জীবন্ত করেছেন লেখক, নন-ফিকশন এবং লেখকের নিজস্ব কল্পনা খুব নিখুঁতভাবে মিলে যায় এই উপন্যাসের মধ্যে।
আলো-ছায়ার বর্ণনা (যেমন: ফ্লোরেন্সের সূর্যোদয়) যেন লিওর শিল্পের মতো জ্যামিতিক, এবং মনোবৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি খুব আকর্ষণীয়।
বইয়ের গঠন সমান্তরাল অধ্যায়ের মাধ্যমে তৈরি, যা ত্রয়ীর জীবনকে একত্রিত করে, এবং বইয়ের সাদা কালো ছবিগুলি, একটি ভিজ্যুয়াল ডায়েরি।

লিও-লিসা-মিকেল' শুধু একটি উপন্যাস নয়, এটি রেনেসাঁসের আলোকে বাংলা পাঠকের চোখে ফিরিয়ে আনার এক অসামান্য প্রচেষ্টা। এই বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল তারিখ নয়, মানুষের আবেগ, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের জাল। এই বই পড়ে ফ্লোরেন্সের রাস্তায় হাঁটার সাথে লিসার হাসির পিছনে লুকানো রহস্যকে অনুভব করা যায়। বাংলা সাহিত্যে এটি এক অনবদ্য সংযোজন , এবং আশা করি, এর পরবর্তী অংশ আরও গভীরতা যোগ করবে। বইটি পড়ার অনুরোধ রইলো, দেখবেন কীভাবে একটি সাধারণ নারীর চোখ দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত হাসি জন্ম নেয়।
Profile Image for Arghadipa Chakraborty.
182 reviews5 followers
June 18, 2024
🍁বই:- লিও-লিসা-মিকেল
🍁লেখক:- অনির্বাণ ঘোষ
🍁প্রকাশনা:- পত্রভারতী
🍁মুদ্রিত মূল্য:- ৫৯৫ টাকা

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মোনালিসা ও মিকেল এঞ্জেলোর জীবন, যাপন, কর্ম ও ভাবমূর্তি নিয়ে উপন্যাসের মোড়কে এক অসামান্য নন-ফিকশন এই বইয়ের মাধ্যমে আমাদের উপহার দিয়েছেন লেখক অনির্বাণ ঘোষ। এই ধাঁচের বই আমি আগে কখনও পড়িনি। মানে সাহস হয়নি আরকি। বিদেশি লোকেদের খটমট নাম, তথ্যের বাহুল্য এসব আমার পড়তে ভালো লাগবেনা এমনটাই ধারণা ছিল। তার ওপরে আবার ভারতের স্বাধীনতার সময়ের ইতিহাস ছাড়া ইতিহাস বিষয়টির প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহও নেই। তাই এসমস্ত বিষয়ে পড়বো কোনোদিন ভাবিও নি। কিন্তু আমরা যা ভাবি সবসময় কি তা হয়? সেরকমই হঠাৎ একদিন ফেসবুক মারফত এই বইটার কথা জানতে পারি ও অদ্ভুত ভাবেই বইটা পড়ার ইচ্ছে হয়। বইটার সম্বন্ধে একটু খোঁজ খবর করতে গিয়ে জেনেছিলাম বইটার মধ্যে অনেক ছবি আছে আর উপন্যাসের ঢঙে লেখা বলে নন-ফিকশন হলেও তা পড়তে খারাপ লাগবেনা। আর পত্রভারতীর বই হাতে নিলে আমার একটা ভালোলাগা কাজ করেই। তাই সব মিলিয়ে সাহস করে বইটা কাছে পেয়েই পড়তে শুরু করে দিলাম।

খুব শীঘ্রই ডুবে গেলাম সে সময়ের জনজীবনে। এক করুণ পরিস্থিতিতে লিওর জন্ম হওয়া, তাঁর শৈশব, তাঁর ছবি আঁকা শেখা, মায়েস্ত্রো হয়ে ওঠা, তাঁর শিল্পীজীবন সব যেন কেমন মোহগ্রস্থর মত পড়ে যেতে থাকলাম। একসময় বইয়ের পাতায় উঠে এলো মিকেল এঞ্জেলো। তাঁর বাবা তাঁর শিল্পী সত্ত্বাকে প্রথমে সম্মান দেয়নি। মিকেল কে তাঁর প্রকৃত অভিভাব��� হিসেবে পথ দেখিয়েছে লোরেঞ্জো দি মেদিচি। তিনিই মৃত্যুর আগে মিকেল কে বলে গিয়েছিলেন তাঁর বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য। অনেক কঠোর জীবন সংগ্রাম আর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে এই দুই শিল্পীকে। মিকেল যখন ভাবছে, ছেনি হাতুড়ি নিয়ে কাজ করবার জন্য সাহিত্য শিক্ষার কি প্রয়োজন, খানিক হতাশা গ্রাস করে তাকে ঠিক তার পরক্ষনেই মিকেলের সাথে ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনা যেভাবে বর্ণনা করেছেন লেখক ১৪৭-১৫৪ পাতা জুড়ে, সেটা পড়ে গায়ে কাঁটা দিয়েছে রীতিমত। আর চোখের কোলে জল এসেছে যখন বইয়ের প্রায় শেষ দিকে নিজেদের সমস্ত অহংকার কে দূরে সরিয়ে রেখে শিল্পকে জিতিয়ে দিয়ে মুখোমুখি হয় সেই সময়ের দুই অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী। আর এঁদের সাথে এই বইতে রয়েছে লিসার কথা। কিভাবে এক সাধারণ পরিবারে জন্মেও ইতিহাসের পাতায় বেঁচে রইলো এই নারী তার গল্পও শুনিয়েছেন লেখক।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইতালির দিগন্তে যে নবজাগরণের সূর্যোদয় হয় তার আলো ক্রমে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রেনেসাঁসের প্রভাবে যেন কয়েক শতকের মধ্যে কয়েক হাজার বছর এগিয়ে যায় দর্শন, সাহিত্য, শিল্পের বোধ। কিন্তু ঠিক কেমন ছিল সেই আলো ঝলমলে সময়টা? কেবল কি আলো? নাকি প্রদীপের নীচে কিছুটা অনুচ্চারিত অন্ধকারও জমাট বেঁধে ছিল? দুই আশ্চর্য প্রতিভাশালী শিল্পী এবং এক অতি সাধারণ নারীর চোখ দিয়ে লিও-লিসা-মিকেল খুঁজতে চেয়েছে সেই সময়কে।

বইটা পড়ে আমি কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম। অসাধারণ, অভূতপূর্ব এই বিশেষণ গুলো এই বইয়ের ক্ষেত্রে ঠিক খাটবেনা বলেই আমার মনে হয়। এই বইটা পড়ে আমি মুগ্ধ। তবে এই বইটা আমার মতে তাড়াহুড়ো করে পড়ার বই নয়। বরং সামান্য একটু খাটিয়ে নেবে পাঠককে যা খানিক সময়সাপেক্ষ । ঐ সময়কার এতো অজস্র চরিত্র সারা বইতে রয়েছে, আর তাঁদের যা খটমট নাম সেগুলোকে মনে রাখার জন্য আপনাকে আলাদা করে কাগজ কলমের সাহায্য নিতে হতে পারে যেমন আমি নিয়েছি। লেখকই এই বইতে ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন এর পরবর্তী খন্ড আসবে। আসতে তো হবেই। পাঠকের দাবি যে! মিকেল এঞ্জেলো আর লিওর আবার দেখা হয়েছিল কিনা, হলেও কিভাবে হয়েছিল, লিসার ছবি আঁকার মাধ্যমে লিওর সমস্ত কাজই অর্ধসমাপ্ত থাকার অভিশাপ ঘুচলো কিনা, রাফায়েলের জীবন কোন খাতে বইলো এসব জানার অপেক্ষায় থাকলাম। লেখকের সুস্থতা আর কলমের দীর্ঘায়ু কামনা করি। সাথে পত্রভারতী কে জানাই অশেষ ধন্যবাদ এরকম একটা সৃষ্টি পাঠকের দরবারে নিয়ে আসার জন্য।
Profile Image for প্রিয়াক্ষী ঘোষ.
364 reviews34 followers
December 31, 2025
পেইন্টিং বা ভাস্কর্যের কিছুই বুঝি না কিন্তু বিষয়টা খুবই পছন্দ। তবে এটা নিয়ে খুব একটা জানাশোনা বা পড়ালেখা ও নাই। তাই বইটা দেখে মনে হয়েছিল এটা লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি ও মিকেল অ্যাঞ্জেলো কে নিয়ে হয়তো লেখা জীবনী ভিত্তিক উপন্যাস।
সবই ঠিক আছে লেখক প্রচুর পড়ালেখা করেছেন, অনেক জানাশোনা বইয়ে তার প্রমান রেখেছেন কিন্তু আমি কিছুটা আশাহত।
ভালোলোগেছে কিন্তু কিছু একটা নাই যা আমি হয়তো খুঁজতেছিলাম, কি খুঁজতেছিলাম নিজেও জানি না।
Profile Image for Arijit Saha.
77 reviews1 follower
March 22, 2025
Some books were timeless, this is on of that kind. One of the best biographical novel written in Bengali language. Eagerly awaits for its next part.
Displaying 1 - 13 of 13 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.