কথায় আছে বয়সের নাকি গাছপাথর নেই। আসলেই তো তাই। মানুষের বয়স তো বাড়তেই থাকে, বয়সের সাথে শরীরের শক্তি কমতে থাকে। শরীর আর চলতে চায় না যেন। তখন বুড়ো বয়সে সেই মানুষটি যেন সবকিছু থেকেই অবহেলাই পায় শুধু। সে হয়ে যায় "বুড়ো ঘোড়া "। তাঁকে আর কেউ কাজের মনে করে না।
ক্রিকেটকে বলা হয় ভদ্রলোকের খেলা। কিন্তু ভদ্রলোকের এই খেলায় কত যে অন্ধকার দিক আছে তাঁর অনেকটাই আমরা জানি না। এই ক্রিকেটেও বয়স একটা বিষয়। বয়স বেড়ে গেলে সাধারণত খেলোয়াড়রা আর ক্রিকেট খেলেন না। খেলা থেকে অবসর নিয়ে নেয়। আর যারা টিকে থাকে তাঁদের সহ্য করতে হয় পদে পদে অপমান। তেমনি একজন জহর পাল। একসময়ে দাপটের সাথে ক্রিকেট খেলা এই মানুষটাকে এখন পদে পদে শুনতে হয় বয়সের খোঁচা।
বাংলার ক্রিকেটে প্রাণকৃষ্ণ গত চার বছর ধরে প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য কাজ করে চলেছেন। ব্রাদার্স ইউনিয়ন কলকাতার নামি ক্রিকেট ক্লাব, ফুটবলও খেলে। এই ক্লাবটির ক্রিকেট দল চালাবার দায়িত্ব সে চার বছর আগে নিয়েছে। বিস্তর টাকাও খরচ করেছে। প্রাণকৃষ্ণর ঠাকুর্দা ছিলেন পাটের আড়তদার; থাকতেন উত্তর কলকাতায় কুমারটুলিতে। পাটের সঙ্গে তিনি যোগ করেন কাঠের ব্যবসা। যথেষ্ট ধনী হয়ে ওঠেন।
যে ব্রাদার্স ইউনিয়নের সে এখন ক্রিকেট সেক্রেটারি, একদা সেই ক্লাবে ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। তাঁর সেক্রেটারিত্বে ব্রাদার্স ইউনিয়ন, কলকাতা গড়ের মাঠে যে ক্লাবটি শুধুই ব্রাদার্স নামে পরিচিত, দু’বার সি এ বি নক আউটে আর লিগে রানার্স হয়েছে। জে সি মুখার্জি ট্রফি জিতেছে কিন্তু পি সেন ট্রফি এখনও জেতা হয়নি।
প্রাণকৃষ্ণ ঠিক করে ফেলেছে কলকাতার সব ক্রিকেট সম্মান ব্রাদার্স ইউনিয়নকে এনে দেবে, দেবেই। এজন্য দু’লাখ টাকা পর্যন্ত সে খরচ করবে।
জহর পাল এই প্রাণকৃষ্ণের কাছেই এসেছেন সাহায্যের জন্য। এই ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবে একটা সময় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন জহর পাল। এখনো হয়তোবা খেলতেন কিন্তু বয়স তো হচ্ছে। এখন আর বড় ক্লাবে তাঁর মতো বুড়োকে কে নেবে। ছোটখাটো ক্লাবে খেলা আসলে নিজের শক্তি ক্ষয়। কিন্তু ক্রিকেট যে এখনো রক্তে মিশে আছে। জহর পাল কী করে ছেড়ে দেয় তাকে?
ছেলের সাঙ্ঘাতিক একটা রোগ হয়েছে। মাথার ব্রেনের মধ্যে পোকা। সিটি স্ক্যান করিয়েছেন, নিয়ে এসেছেন তার রিপোর্ট আর ছবি। জহর হাতের খামটা থেকে সেগুলো বের করতে যেতেই প্রাণকৃষ্ণ হাত তুলে বলল, ”থাক, থাক, ওসব ডাক্তারি রিপোর্ট এমন ভাষায় লেখা হয়, পড়ে বুঝতে পারব না।” ”আমার কাছে, কেন?” প্রাণকৃষ্ণ টেবিল থেকে পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল।
”চার হাজার এখনও বাকি আছে।” মৃদুস্বরে জহর বললেন। ”টাকাফাকা কিছু বাকি নেই।” প্রাণকৃষ্ণ বিরক্ত স্বরে বলল। ”খেলেছেন তো মোটে তিনটে ম্যাচ। স্কোর কত করেছেন?’ ”তা ছাড়া আপনাকে একটা ব্যাট দিয়েছি, সামান্য পুরনো হলেও ইংলিশ উইলোর ব্যাট। ওটারই দাম এখন চার হাজার টাকা তো হবেই। ওটা বিক্রি করুন।” ”ব্যাট বেচতে পারব না।”বললেন জহর।
”যাদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি হয়েছিল তাদের সবাইয়ের পাইপয়সা পর্যন্ত মিটিয়ে দিয়েছি। মৌখিক চুক্তি যাদের সঙ্গে তাদেরও যা দেওয়ার দেওয়া হয়ে গেছে। জহরদা আপনি এবার আসতে পারেন।” প্রাণকৃষ্ণ মাপা স্বরে কথাগুলো বলল।
জহর পালের কালো মুখটা শুকিয়ে গেল। আঙুলে ধরা খামটা কেঁপে উঠল। ”তা হলে টাকা পাব না? আমার যে ভীষণ দরকার।”
জহরের সাথে রাস্তায় দেখা হলো একসময় জহরের সাথে খেলা অবনীর সাথে। খুব উদীয়মান খেলোয়াড় ছিলো সে, কিন্তু খেলা ছেড়ে দিলো হঠাৎ। তাঁর বাসায় জহর গেলেন অবনীর জোড়াজুড়িতেই। ঘণ্টাখানেক থাকার পর জহর পাল যাওয়ার জন্য যখন দরজার দিকে এগিয়েছেন, অবনী তখন ডাকল, ”জহরদা, তোমার ছেলের জন্য একটা ছোট্ট উপহার…. না বলতে পারবে না।” হাতে একটা খাম। বিস্মিত জহর খামটা নিয়ে খুললেন। ভেতরে একটা চেক। তাঁরই নামে। পাঁচ হাজার টাকা। অবনী এখনো মনে রেখেছে জহরকে।
জহর পালের সংসারে আছে স্ত্রী মীরা, এক ছেলে ও এক মেয়ে, মানিক ও মণিকা। জহর একটা ছোটোখাটো দোকান চালান। ওতেই সংসার চলে যায়। তবুও ক্রিকেট ভুলতে পারেননি। ব্যাংকে চেক জমা দিয়ে আসার সময় পথে একটা মাঠে দেখলেন এক ছেলে চমৎকার ভাবে ব্যাটিং করছে দেয়ালে বল মেরে মেরে। জহর বাস থেকে নেমে এগিয়ে গেলেন। আলাপ করে জানলেন তাঁর সময়ের বিখ্যাত আম্পেয়ার অমর দত্তের ছেলে সমর বা সমু। ছেলেটির সাথে আলাপ করে ভালো লাগলো জহরের।
এরপর একদিন সমু নিয়ে এলো ওদের ক্লাবের তরফ থেকে নিমন্ত্রন। ক্লাবের মালিক নিজের দেশের বাড়িতে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করেছেন। জহরকে সেখানে খেলতে হবে। এবং বলাই বাহুল্য এই বুড়ো ঘোড়া সেখানে চমক দেখিয়েছেন। এবং ফলাফল হিসেবে তিনি পেয়েছেন নতুন ক্লাবে ডাক।
খেলোয়াড়দের দলবদলের মৌসুমে চুক্তি হলো নতুন দলের সাথে। জহর সাথে অফার পেয়েছেন ক্রিকেট কোচিং করানোর।
ফুলবাগান হচ্ছে জহরের নতুন দল। এবং এরপরে ব্রাদার্স ইউনিয়নের সাথেই ক্লাব ক্রিকেটে খেলা পড়লো জহরের দলের। এবার বুড়ো ঘোড়ার সামনে সুযোগ। প্রতিশোধ নাকি নিজের জাত চেনানো নাকি দুটোই করবেন জহর? বুড়ো ঘোড়ার আছে কী এত দম? উত্তর মিলবে বইয়ের পাতায়।
এই বইটি কিশোর উপন্যাস হলেও আমার মনকে জয় করেছে। মতি নন্দীর লেখা নিয়ে অনেক শুনেছি। ওনার বই থেকে তৈরি হয়েছে সিনেমাও। একজন ক্রিড়া সাংবাদিক হবার সুবাদে তিনি খেলা বিষয়ক বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছেন। আজ "বুড়ো ঘোড়া" পড়ে রীতিমতো অবাক হয়েছি। কারণ এমন ভাবে তিনি লিখেছেন যেন চোখের সামনে দেখছি এক খেলোয়াড়ের খেলোয়াড়ি জীবনটাকে।
জহর পাল যেন এক অদৃশ্য প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছেন সেইসব খেলোয়াড়দের যারা সাহস করে বয়স নিয়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। হুম বর্তমান সময়েও আছেন এমন খেলোয়াড়। যাদের ���্রতিবার অপমান করে, যোগ্যতার প্রশ্ন তুলে অবসর নিতে বলা হয়। কিন্তু এইসব বুড়ো ঘোড়ারা যখন ব্যাট হাতে দাঁড়ান তাঁরা কিন্তু ঝড় তুলতে পারবেন ক্রিজে।
আমি মতি নন্দীর লেখায় মুগ্ধ হয়েছি। এবং আমার আগ্ৰহ দেখে এক বড় ভাই আমাকে নিজে থেকে মতি নন্দীর আরো বেশ কিছু বইয়ের সন্ধান দিলেন। আস্তে আস্তে সব পড়বো ইনশাআল্লাহ। ক্রিকেটের কিছু খটমটে জিনিস বুঝে নিয়েছিলাম বইপড়ুয়া বন্ধুর থেকে। সবমিলিয়ে ভালো সময় কাটলো বুড়ো ঘোড়া নিয়ে।
বইয়ের নাম: "বুড়ো ঘোড়া"
লেখক: মতি নন্দী
ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৭/৫