অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহর। মানুষ যেখানে সদা কর্মব্যস্ত। বাঙালি তাবাসসুম জীবনের নানা মোড় পেরিয়ে, বিচ্ছেদের দাহ সয়ে একসময় সেই মেলবোর্নেই চাচা-চাচির সংসারে থিতু হয়। যদিও তার স্বাচ্ছন্দ্যময় প্রবাসজীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে বিচ্ছিন্নতাবোধ আর একাকিত্ব। তবে এই অনুভূতিগুলোকে এক পাশে সরিয়ে রেখেই পথ চলে সে; যতক্ষণ না একটি ঘটনার অভিঘাতে সবকিছু উল্টেপাল্টে যায়। ২০১৯ সালের মার্চে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে এক মসজিদে পবিত্র জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন একান্নজন মানুষ। সে ঘটনার ধাক্কা এসে লাগে অস্ট্রেলিয়ায় তাবাসসুম আর তার পরিবারেও। মনের গভীরে জমে থাকা প্রশ্নেরা এ সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ফিরে আসে ফেলে আসা জীবন, ভালোবাসা ও সন্তান হারানোর স্মৃতি। টালমাটাল এই সময় তাকে জর্জরিত করে আত্মজিজ্ঞাসায়ও। হাতড়ে ফেরে সে তার আত্মপরিচয়। আর তখনই তার ফোনে একের পর এক রহস্যময় বার্তা ভেসে আসে অতীতের হাতছানির মতো। কে আছে ফোনের ওপাশে? কেউ কি তাকে খুঁজছে?
লুনা রুশদীর জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯৭৫ সালে। শৈশব কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে লেখাপড়া নবম শ্রেণী পর্যন্ত, তারপর ১৯৮৯ থেকে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে লা-ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, পরবর্তীতে বৃত্তি নিয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এ স্নাতোকত্তর লেখাপড়া সিডনির ইউ.টি.এস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি নিয়ে দশ বছর নিউজিল্যান্ড থাকার পর বর্তমানে আবার মেলবোর্নে। প্রথম বাংলাদেশি পত্রিকা ‘অঙ্কুর’ সম্পাদনা ছাত্রজীবনে। বাংলায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৯৪ সালে। এরপর বিভিন্ন বাংলাদেশি ও ভারতীয় পত্রিকায় লেখালেখি। প্রথম প্রকাশিত ইংরেজি গল্প নিউজিল্যান্ডের ‘লিসেনার’ পত্রিকায় ২০১১ সালে। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ অরুন্ধতি রায়ের ‘দ্যা ব্রোকেন রিপাব্লিক’ (২০১৩)। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘আর জনমে’ ২০২৪ সালের বইমেলায়। এবং দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বইবাহিক’ও ২০২৪-এর মেলাতেই প্রকাশ পায়।
২০০১ এর ১১ সেপ্টেম্বর ইসলামী সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল কায়েদা কর্তৃক টুইন টাওয়ারে হামলা পৃথিবীর ইতিহাস চিরতরে বদলে দেয়। পাশ্চাত্যে বসবাসকারী মুসলিমরা সাধারণভাবে সে সময় চিহ্নিত হয় "অপর" বলে । অকারণে গ্রেফতার, হয়রানি, সন্ত্রাসবাদী তকমা পাওয়া, পথেঘাটে ও চাকরিক্ষেত্রে হয়রানি ছিলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, সেই সাথে সার্বক্ষণিক ভয় তো আছেই। কখন কী যে হয়, কখন কী যে হয়! ২০১৮ সালে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা আবার মুদ্রার অপর পিঠ দেখিয়েছিলো। পাশ্চাত্যের অনেক মানুষ ও সরকার মুসলিমদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমা প্রবাসী লেখিকা লুনা রুশদী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা ও কল্পনা মিশিয়ে তিনি লিখেছেন "আর জনমে।" তার গদ্যশৈলী অনেকটা বৈঠকি ঢঙের, মনে হয় কেউ সামনে বসিয়ে গল্প করছে। উপন্যাসের "বাস্তব অংশ" পাঠকের মনে যেভাবে অভিঘাত তৈরি করে, কল্পনার অংশটা সেভাবে আলোড়িত করতে না পারলেও সব মিলিয়ে "আর জনমে" পাঠকের মনোযোগ দাবি করে।
"দুনিয়ার যেকোন জায়গায় সবচেয়ে মারাত্মক মনে হয় বাইনারি চিন্তাভাবনা। যেখানে সাদা - কলোর বাইরে আর কোনো রকম চিন্তাভাবনার ঠাঁই নেই , হয় তুমি আমার সঙ্গে আর নয়তো ওদের সঙ্গে। এর মাঝের কত রকম থাকা, কত রকম রং রয়েছে, এরা এসব দেখতে পায় না।"
গল্পের মূল চরিত্র তাবাসসুম, যার জবানীতেই পুরো কাহিনি বর্তায়। তাবাসসুম এর সাথে আমার বয়সের তফাৎ, তাবাসসুমের কষ্টের সাথেও আমি রিলেট করতে পারার কথা না কিন্তু কেন জানি তাবাসসুমের শূণ্যতা আমাকেও গ্রাস করে ফেলছিল।হয়তো "আর জনমে" লেখাটি এত বাস্তবভিত্তিক আর চারপাশের সমসাময়িক ঘটনার সাথে এতটাই প্রাসংগিক যে তাবাসসুমের কষ্ট,চিন্তাভাবনা সবকিছুর সাথেই খুব বেশী রিলেট করতে পারছিলাম।আবার হতে পারে নিজের ব্যক্তিজীবনের শূণ্যতার সাথেই তাবাসসুমের শূন্যতা কে মিলিয়ে ফেলে একইরকম ভাবে কষ্ট পাচ্ছিলাম।তবে যখন কোনো কাল্পনিক চরিত্রের কষ্ট, শূণ্যতা, অভিমান,আক্ষেপ আপনার মনেও দাগ কাটবে তার শতভাগ কৃতিত্ব কিন্তু লেখকেরই প্রাপ্য। হঠাৎ হঠাৎ তাবাসসুমের ৯০ দশকে চলে যাওয়া,জয়েন্ট ফ্যামিলির স্মৃতিচারণ কেমন জানি নস্টালজিক করে তুলছিল।বাস্তবতা, স্মৃতিরোমন্থন সাথে একটু নাটকীয় সমাপ্তি সব কিছুর মিশেলে "আর জনমের" সাথে আমার এই জনমের কিছু সময় বেশ ভালোই কাটলো।