যে-প্রাণ দিয়েছি তাকে, সে ছিল তারই দান পাওনা যা, আসলে তার দিইনি প্রতিদান
জান দি দি হুয়ি উসি কি থি হক তো ইউ হ্যায় কে হক আদা না হুয়া
পৃষ্ঠা ১১
মির্জা গালিবের শায়েরির সাথে আমার পরিচিতি এতদিন প্রায় শূন্যের কোটায় ছিল। উর্দুতে আমার দখল হাস্যকর। কোন অনুবাদও আগে পড়া হয় নি। চট্টগ্রাম অমর একুশে গ্রন্থমেলায় চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনের স্টলে যখন প্রিয় লেখক নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের গালিব ভাষান্তর দেখলাম তখন সঙ্গত কারণে সংগ্রহ করতে দ্বিধাবোধ করি নি।
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য মূলত প্রেমের লেখক। তাঁর জাদুবাস্তবতা প্রেমের-ই। মির্জা গালিবের 'গুল-এ-নগমা' তে যেসব নির্বাচিত শায়েরি আছে, আমি নিশ্চিত আগ্রহী বোদ্ধা পাঠকরা ইতিমধ্যে ঐ সকল আত্মস্থ করে ফেলেছেন। তবে আমার মতো অনেকেই তো আছেন কখনো মির্জা গালিবের শায়েরির দেখা পান নি। নির্ঝরের ভাষান্তরে নির্বাচিত শায়েরি তাঁরা পাঠ করতে পারেন।
যদি কখনো মন জাগে তার আমার ভালো করার কামনায় তার অতীতের নিঠুরতার কথা মনে করে সে লজ্জা পায়।
মির্জা গালিব যেন আকন্ঠ প্রেমে নিমজ্জিত এক কবি। বিভিন্ন শায়েরিতে তাঁর স্বগোতক্তি, প্রেমিকার প্রতি আহ্বান, বেদনা, ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা সেইজনের প্রতি ঝরঝর বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়েছে পাঠকের মনের দেয়ালে। নিজ কবিসত্তার কথাও বলেছেন মির্জা।
সারা দুনিয়ায় রয়েছে আরো ভালো কবি অনেকে ধরণ আলাদা গালিবের, এ কথা বলছে লোকে
কবিতা কিংবা শায়েরির অনুবাদের কথা উঠলে আমার মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া কাজ করে। কারণ কবিতা সাহিত্যের এমন এক ধারা যা অনুবাদে অনেক সময় অন্য কিছু হয়ে যায়। নির্ঝর নৈঃশব্দ্য বইয়ের প্রথমে 'কতিপয় কৈফিয়ত'এ বেশ কিছু ব্যাপার স্পষ্ট করেছেন। মূলানুগে থাকার সমান্তরালে পুরো 'গুল-এ-নগমা' জুড়ে তাল ধরার প্রচেষ্টা তাঁর অব্যাহত ছিল। দুই লাইনে মাত্রা একই রেখে অন্ত্যমিল রেখেছেন ভাষান্তরকারি।
শায়েরির দুর্বোধ্যতার কথাও গালিব বলেছেন।
আবেগের বশে কী কী যে বকে যাচ্ছি আমি কেউ বুঝবে না জানি সহায় অন্তর্যামী
বক রাহা হুঁ জুনুন মে ক্যায়া ক্যায়া কুচ কুচ না সমঝে খুদা করে কোই
পৃষ্ঠা ৫০
খ্যাতিমান এ শায়েরিকার অবশ্য শুধুমাত্র প্রেম নিয়েই ভাব ব্যক্ত করেন নি। যাপনের অপরিবর্তনীয় যন্ত্রণা নিয়েও বলেছেন কয়েক লাইন।
যাতনা যদি মনে তবে মনের অষুধ খাওয়া যায় মনটাই যখন যাতনা তখন কী আর করা হায়
শায়েরি বিষয়টা আমার কাছে ম্যাক্সিমের মতো মনে হয়েছে। পুরো বই জুড়ে দু'লাইনের চিন্তার খোড়াকের উদ্রেককারি তীব্র আবেগ ঢেলে দিতে চেয়েছেন নির্ঝর। গালিবের এই আবেগের তীব্রতা আবার কেমন যেন শান্ত-শিষ্ট টাইপ। শায়েরি বোধ হয় এরকম কিছু।
মির্জা গালিবের নির্বাচিত শায়েরি ও ভাষান্তর অনেক ক্ষেত্রেই মনকে ছুঁয়ে যায়। অল্প কিছু ভাব একটু রিপিটেটিভ লেগেছে। শেষ করছি সুন্দর একটি শায়েরি দিয়ে।
আছে কি এমন কেউ মরিয়মপুত্রের মতো যে এসে ছুঁয়ে দিলে আমার দুঃখ চলে যেত
ইবনে মরিয়ম হুয়া করে কোই মেরি দুখ কি দাওয়া করে কোই
পৃষ্ঠা ৯৬
বই রিভিউ
নাম : গুল-এ-নগমা লেখক : মির্জা গালিব ভাষান্তর : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ প্রচ্ছদ : লেখক প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন জনরা : নির্বাচিত শায়েরি রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
bahut sahī ġham-e-gītī sharāb kam kyā hai ġhulām-e-sāqī-e-kausar huuñ mujh ko ġham kyā hai (পৃথিবীতে আছে দুঃখ বহু, মদ কম কীসে ভুলতে তাকে সাকি-কাউসারের গোলাম আমি, দুঃখ কী করবে আমাকে)
tumhārī tarz-o-ravish jānte haiñ ham kyā hai raqīb par hai agar lutf to sitam kyā hai
suḳhan meñ ḳhāma-e-ġhālib kī ātish-afshānī yaqīñ hai ham ko bhī lekin ab us meñ dam kyā hai
kaTe to shab kaheñ kaaTe to saañp kahlāve koī batāo ki vo zulf-e-ḳham-ba-ḳham kyā hai
likhā kare koī ahkām-e-tāla-e-maulūd kise ḳhabar hai ki vaañ jumbish-e-qalam kyā hai
na hashr-o-nashr kā qaa.il na kesh o millat kā ḳhudā ke vāste aise kī phir qasam kyā hai
vo dād-o-dīd garāñ-māya shart hai hamdam vagarna mehr-e-sulaimān-o-jām-e-jam kyā hai
মির্জা বেগ আসাদুল্লাহ খান গালিব, যিনি মির্জা গালিব নামেই বেশি পরিচিত। তাঁকে নিয়ে যা-ই না কেন,কম হয়ে যাবে। বলা হয়ে থাকে তিনি ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক কবি। তিনি উর্দু কবিতাকে নিয়ে গিয়েছেন এক অনন্য উচ্চতায়। যুগে যুগে কত শত কবি এসেছেন,ভবিষ্যতে আরও শত-শত হয়ত আসবেন, তবে গালিব থেকে যাবেন অবস্মরনীয়। গুল এ নগমা বইতে গালিবের শায়েরীর বাংলা অনুবাদ ও বাংলা হরফে উর্দু লিখেছেন লেখক। শায়েরী পড়ে ভাবনার জগতে বুঁদ হয়ে থাকা যাবে মুহুর্তের পর মুহুর্ত। অনুবাদ আমার ভালো লাগেনি। ছন্দ মেলাতে গিয়েই যেনো অনুবাদ আরও খাপছাড়া হয়েছে। তবে বাংলা বর্ণমালায় উর্দু শায়েরী পড়ে খোরাক মিটেছে।
সম্ভবত জাকির খান একবার বলে���িলো ‘গুরুর‘ যদি কারো মধ্যে থেকে থাকে তাহলে সেটা গালিবের মধ্যেই আছে । আসলে গালিবের জগতটাই ভিন্ন, যেই জগৎ হয়ত আমাদের এই পৃথিবীর এতসব নিয়মের বেড়াজালে বন্দী না । হয়ত সেখানকার পাখিদের জন্য এখনও খাঁচার আবিষ্কার হয়নি । আর গালিব— সে তো এসবের বহু উর্ধ্বে! গুল- এ - নগমা পড়ার সময় বারবার এই কথাগুলোই মাথায় ঘুরেছে । কি গভীর তার ভাবনা আর কতো ব্যাথাতুর তার প্রেম!