বিলিয়ন বছর আগে সমুদ্রে উদ্ভব ঘটেছিল প্রাণের। সেই প্রাণ একদিন উঠে এসেছিল ডাঙায়। তারপর বহু বছর মানুষ জেনেছে সে-ই সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। কিন্তু মানুষের চেয়েও যে বুদ্ধিমান ও দক্ষ প্রাণী রয়ে গেছে সমুদ্রের গভীরে, তারা যদি আজ পৃথিবীর দখল নিতে চায়?
কক্সবাজারে মেরিন বায়োলজিস্ট রুনা খন্দকার ও স্থানীয় সাংবাদিক অর্জুন মারমা সেই জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভাবছে, এখান থেকেই কি তবে শুরু হতে যাচ্ছে এক নতুন সভ্যতা?
তানজিনা হোসেনের জন্ম ১৯৭৫ সালে। বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ঢাকায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞান কল্পগল্প ও ফিকশন দিয়ে লেখালেখির শুরু। পাশাপাশি নিয়মিত ছোটগল্প লিখে আসছেন। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অগ্নিপায়ী’ (২০০৬)। তানজিনা হোসেন পেশায় চিকিৎসক। শিক্ষকতা করেন ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে।
সায়েন্স ফ্যান্টাসি উপন্যাসিকা। বিলুপ্ত প্রাণীদের মানুষের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার গল্প। তথ্যনির্ভর, আগ্রহোদ্দীপক এবং উপভোগ্য। তবে পরিসর আরো বড় হলে দ্রুত ফুরিয়ে যাবার আফসোসটা থাকতো না।
২.৫/৫ মানুষ পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে তাই সামুদ্রিক প্রাণীরা প্রতিশোধ নিচ্ছে - এমন একটা গল্প নিয়ে লেখা হয়েছে "সমুদ্র এক ধূসর সিন্দুক।" বিষয়বস্তু ভালো, লেখায় গতিও আছে কিন্তু বিষয়টির যথাযথ তাৎপর্য ধারাবাহিক ঘটনা ও সংলাপের মাধ্যমে পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারেননি লেখিকা। প্রধান কারণ গল্পের স্বল্পায়তন ও তাড়াহুড়ো। হরর সিনেমার মতো একের পর এক অপঘাতে মৃত্যুও বিরক্তির উদ্রেক করেছে।
কক্সবাজার;পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। সমুদ্রের ঢেউ এখানে ধুয়ে নেয় নাগরিক জীবনের ক্লান্তি। বিশাল সমুদ্র,উত্তাল ঢেউ কিছুক্ষণের জন্য যে কাউকে ভুলিয়ে দিবে জাগতিক দুশ্চিন্তা। কিন্তু সেই কক্সবাজারই যদি হয়ে ওঠে চরম বিপদজনক স্থান? যদি সেখানে ২৪ ঘন্টা জারি থাকে কারফিউ,তখন? এমনই এক ঘটনা ঘটছে কক্সবাজারে। সামুদ্রিক চরম শান্ত প্রাণীগুলো বলা নেই কওয়া নেই আক্রমণ করছে পর্যটকদের। ডুবিয়ে দিচ্ছে কোস্টগার্ডদের বোট। স্থলের প্রাণীরাও হয়ে উঠেছে সমান অশান্ত। ভেঙেচুড়ে গুড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। একের পর এক মারা পড়ছে মানুষ।
বিজ্ঞানীরা এর কারণ খুঁজতে খুঁজতেই খবর এলো,কেবল কক্সবাজার নয় গোটা পৃথিবীতেই ক্ষেপে উঠেছে বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু। দেখা মিলছে বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তিমি সহ আরও নানান জীবের। তারা সবাই ফিরে এসেছে, ফিরে আসছে। কীভাবে? কী উদ্দেশ্য তাদের? কেনইবা তারা তাণ্ডব চালাচ্ছে পৃথিবী জুড়ে? তাদের কিসের এতো আক্রোশ মানুষের উপর? তবে কী, যে পৃথিবী একসময় ছিল মাছেদের,পাখিদের,তিমিদের, হাতিদের,যেখানে ছিলনা মানুষ নামের বিধ্বংসী প্রাণীর অস্তিত্ব....সেই সময়কেই ফিরিয়ে আনতে চাইছে তারা?
‘সমুদ্র এক ধূসর সিন্দুক’—এ মিলবে সেসব প্রশ্নের উত্তর। এই বইটা আসলে আমার পড়ার কথা ছিল না। সিলেট বাতিঘরে বই দেখতে দেখতে হুট করে বইয়ের নামে চোখ আটকে যাওয়ায় পড়তে শুরু করি। লেখিকা তানজিনা হোসেন—এর গদ্য এতো ঝরঝরে যে একটানে পড়ে শেষ করতে পেরেছি। সায়েন্স ফিকশন আমার পছন্দের জনরা না হলেও, দেশীয় পটভূমিতে লেখা এই বইখানা পুরোটা সময় আমায় আটকে রেখেছিল। গল্পের মাঝে লেখিকা যে বার্তাটা দিতে চেয়েছেন সেটা পেয়ে বেশ আনন্দিত এবং বিস্মিত হয়েছি। তবে গল্পের পরিসর আরেকটু বড় হলে দারুণ হতো। কিছু জায়গায় তাড়াহুড়ো কিঞ্চিৎ চোখে লেগেছে। এটুকু বাদ দিলে যারা সায়েন্স ফিকশন পছন্দ করেন এবং যারা করেন না, উভয়েই ‘সমুদ্র এক ধূসর সিন্দুক’ চেখে দেখতে পারেন।
এক বসায় শেষ করার মত ছোট্ট সুন্দর একটা বই। জনরা হালকা ধাঁচের সাইফাই। যারা সাইফাই পাঠক না তাদেরও ভালো লাগবে। জীববৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এই নভেলার প্লট। আরও ভালোভাবে বলতে গেলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। আমরা যেভাবে প্রাণীকূলের ওপর চড়াও হই, ঠিক উলটো হলে কি ঘটবে সেই প্রশ্নই ছুঁড়ে দিয়েছেন লেখিকা। বায়োলজির/জুওলজির বেশ কিছু টার্মস ব্যাখ্যা সহ বর্ণনা হয়েছে, অক্টোপাস নিয়েও রয়েছে বিশদ ইন্টারেস্টিং আলোচনা। সব মিলিয়ে সাইফাই হলেও একটা গা শিউরে ওঠা ভাব আছে গল্পে। ভালো লাগবে।
জগতের সকল পশুপাখি যদি বিদ্রোহ শুরু করে তাহলে মানুষ কি করবে?কারণে অকারণে যে মানুষ পশুপাখি হত্যা করে সেটা কতটুকু ঠিক?পশুপাখি যদি নির্মম প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করে মনুষ্য জাতির উপর তাহলে? এই প্লট নিয়েই বই হচ্ছে সমুদ্র হচ্ছে এক ধূসর সিন্দুক।প্রাণীদের উপর নিয়ে অনেক তথ্যবহুল একটা বই কিন্তু পরিসরে বড্ড ছোট।আরেকটু বড্ড পরিসরে হলে দারুণ লাগত বইটা নিঃসন্দেহে।বরাবরের মতই চমৎকৃত লেখনী দ্বারা চুম্বকের মত আবিষ্ট করে রেখেছেন লেখক।ভিন্ন ভিন্ন প্লটের জন্য লেখিকাকে সাধুবাদ জানাই।যে কয়টা গল্প পড়েছি সব ই দারুণ লেগেছে।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব কি আসলেই মানুষ?নাকি শুধুই ক্ষমতাধর? ক্ষমতাধর আর শ্রেষ্ঠত্ব কি একই অর্থ বহন করে?এই যে মানুষ প্রকৃতিতে এক ধ্বংসাত্মক খেলায় লিপ্ত এর শেষ কোথায়? প্রকৃতি কিন্তু তার প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে।সেটা আমরা নানাধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগের মাধমে দেখতে পাই। শুধু প্রকৃতিকেই না ধ্বংসলীলায় মত্ত মানব সমাজ পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে।কখনও যদি যুদ্ধ লেগে যায় মানুষ আর প্রাণীদের মধ্যে তাহলে কি মানুষ তার ক্ষমতা, শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে জিততে পারবে?যদি দেখি বিলুপ্ত সব প্রাণীরা একত্রিত হয়ে ধবংস করে দিচ্ছে মানব সভ্যতা কে, তখন কি হবে?এইসব প্রশ্ন মনের ভিতর তৈরি হতে না হতে বইটি শেষ। লেখকের গল্প বলার ধরণ,গতি বেশ ভালো। তবে কেমন জানি তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে।গল্পের দৈঘ্য আর একটু বাড়লে, শেষটুকু আরেকটু গোছানো হলে নির্ধিদ্বায় ৪ তারকা দিয়ে ফেলতুম!
তানজিনা হোসেনের লেখার ভক্ত বনে গিয়েছিলাম লেখকের গত বছরের হাইপ তোলা সায়েন্স ফিকশন ফুসিয়া হাউস বইটি পড়ে। যদিও বইটি সায়েন্স ফিকশনের চেয়ে ফ্যান্টাসি ঘরানার মনে হয়েছিলো। যাই হোক, বইটি পড়ে তবুও ভালো লেগেছিলো। সুন্দর ঝরঝরে লেখনী। সেই রেশেই লেখকের এবারে প্রকাশিত সমুদ্র এক ধূসর সিন্দুক বইখানা পড়া। আবারও লেখক হতাশ করেননি। সায়েন্সের সাথে ফ্যান্টাসির সুন্দর এক মেলবন্ধন। তবে বইয়ের পরিসর আরেকটু বাড়ালে আরো ভালো লাগতো।
সমুদ্র এক ধূসর সিন্দুক— অনেকটা ঠিক প্যান্ডোরার বাক্সের মতো; যার অতল গহ্বর থেকে জন্ম নিয়েছিল আদি প্রাণ, তা আজও নিজের বুকে লুকিয়ে রেখেছে প্রাণের এক বিস্ময়কর ভাণ্ডার। কী হবে যদি খুলে যায় এই বাক্সের ঢাকনা, আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ায় বিবর্তনের কোনো এক ধাপে আলাদা হয়ে যাওয়া এই ধরিত্রীর অন্যরকম অংশীদাররা? মানুষের প্রতিমুহূর্তের বিধ্বংসী কার্যকলাপ তাদের চিন্তার ওপর কী প্রভাব ফেলেছে তা তো আমাদের জানা নেই, কেমন হবে তাদের প্রতিক্রিয়া— তাও জানিনা আ��রা, “সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তা”র ঠুনকো শিরোপা মাথায় নিয়ে তা ভাবার চেষ্টাও করিনি কখনো৷ ঠিক এই জায়গাতেই আলো ফেলার একটা চেষ্টা “সমুদ্র এক ধূসর সিন্দুক” বইটি। তানজিনা হোসেনের সংক্ষিপ্ত কলেবরের বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, যা বইমেলা ২০২৪ এ প্রকাশ করেছে বাতিঘর৷ ফিজিকাল সায়েন্স বেজড সায়েন্স ফিকশনের স্টেরিওটাইপ ভেঙে লেখক কাহিনির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন প্রাণবিজ্ঞানকে। সামুদ্রিক প্রাণ নিয়ে চমৎকার তথ্যসমৃদ্ধ হলেও তথ্যের ভারে একবারের জন্যও ন্যুব্জ হতে দেননি গল্পের গতিকে। উত্তেজনা, সেই সাথে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে কাহিনি— একেবারেই আনকোরা দেশি পটভূমিতে। তবে শেষ পর্যায়ে যেন হুট করে সবটা ফুরিয়ে যায়, মনে হয় নটে গাছটির মুড়োনোর এমন কী তাড়া ছিল! আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর তো দেয়া যেত! কী জানি, হয়তো কিছু প্রশ্নের উত্তর না-বলা থেকে যাওয়াই ভালো। সেই ভালোটা মানুষ আর তার মিথ্যে অহংকারের জন্য নয়, পুরো বিশ্বপ্রকৃতির জন্য!
………………………………………
কোথায় তোমাদের মনুমেন্ট, তোমাদের যুদ্ধ, শহীদেরা? কোথায় তোমার আদিম স্মৃতি? জনাব, এই সেই ধূসর সিন্দুক। সমুদ্র! সমুদ্র তাদের লুকিয়ে রেখেছে। সমুদ্রই ইতিহাস।