পাঁচটি উড়ন্ত মাছ, বাগবিম্ব, একজন ব্যাংকার - গল্প তিনটি ভালো লেগেছে। অন্য গল্পগুলোর কোনোটাই খারাপ বলা যাচ্ছে না কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে উপসংহার জোরালো না হলে পাঠান্তে স্বস্তি পাই না। লেখকের স্বকীয়তা এ বইতেও বিদ্যমান।
সার্কেলিং, ব্যাক অ্যান্ড ফোর্থ, ডুডোল কিংবা হ্যাঁচিং সম্পর্কে সন্দিহান এমন কোন মানুষ, যে লাইনিং থেকে শুরু করে ছবির কোন বেসিক সম্পর্কে জানে না তেমন কিছুই, যার হৃদয়ে নেই অবজারভেশন ও ক্রিয়েটিভির কোন ছাপ, তাকে একটি আর্ট গ্যালারিতে ঢুকিয়ে দেয়ার পর, সে যদি মন্ত্রমুগ্ধের মতো একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তবে হয়তো ঐ ছবি কিংবা আর্টিস্ট পায় পূর্ণতার স্বাদ। ‘শূন্যের মাঝামাঝি শূন্যে’ গল্পের বইয়ে লেখক জিল্লুর রহমান সোহাগকে আমরা আবিষ্কার করি সে’ই অপরিচিত শিল্পীর মতো.. প্রশ্ন হচ্ছে, ছবি সম্পর্কে অক্ষরজ্ঞানহীন আমরা কতোটা মুগ্ধ হতে পেরেছি তাই নিয়ে।
এই প্রসঙ্গে শুরুতেই বলে রাখা ভালো, গল্পকার আক্ষরিকঅর্থেই প্রতিটি গল্প লিখেছেন অ্যাবস্ট্রাক্ট কোন স্কেচের আঙ্গিকে। ফলে, গল্প পড়তে পড়তে ওয়েলকামিং ডোর পাঠককেই খুঁজে নিতে হবে। সরল পথ নয় বরং স্বকীয়তা জারি রেখে লেখক মূলত এমন একটি জগত নির্মানে ব্যস্ত ছিলেন, যে জগতের ভাগ্যবিধাতা মূলত অস্থিরতা। ফলে, অরিগ্যামি গল্পের বালকের মতো একটি পাখি তৈরিতে ব্যর্থ হয়ে বারবারই পাঠককে দাঁড়াতে হবে সামগ্রিক নিহিলিজমের সামনে। বইয়ের প্রথম তিনটি গল্প চমৎকার। এই তিনটি গল্প পড়তে পড়তে আমরা গল্পকারের ইন্টেনশন হয়তো কিছুটা বুঝে উঠতে পারি.. আমরা পরিণতি নয়, বরং আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি, ইনকম্প্লিট কোন গন্তব্যের দিকে হাঁটার মর্মার্থ বুঝতে। বইয়ের বাকি গল্পগুলো মূলত প্রথম তিনটি গল্পকে অনুসরণ করেছে ছায়াসঙ্গীর মতো।
এসবের বাইরেও গল্পকার বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেছেন, মেটাফোরের দিকে। যার ফলে, খুব পরিচিত কোন প্লটে লেখা গল্পের মধ্যেও আমরা আবিষ্কার করি মিথ থেকে উঠে আসা ইউনিকর্ণকে.. আমরা ইউনিকর্ণের পেছনে ছুটি দিকভ্রান্তের মতো। একজন ব্যাংকার আমাদের নিয়ে যায় গোগলের ওভারকোটের কাছে.. সন্দিহান আমরা অনুধাবন করি, লেখকের চোখে দুর্বৃত্তের মতো খেলা করে রাজনীতি। আসর জমিয়ে, পাঠকের সাথে কথা বলতে বলতেই লেখক একটি গানের কথা মনে করিয়ে দেন বারবার, হয়তো সে গানের অনুপস্থিতিতেই হীনমন্যতায় ভোগেন বায়েজিদ।
‘শূন্যের মাঝামাঝি শূন্যে’ মূলত একটি শূন্যতা মিশ্রিত গল্পের বই। অপ্রকাশিত কথা এবং অপূর্ণতার বই।
জিল্লুর রহমান সোহাগের গল্পগ্রন্থ ‘জুড়িগাড়ি’ পড়বার পর একটি পর্যবেক্ষণ আমি উপস্থাপন করেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, গল্পকার হিসেবে সোহাগের ভাষা কিছু বেশিই অলঙ্কারপূর্ণ। গদ্য নয়, যেন দীর্ঘ কোনো কবিতা-- বলা ভালো আবৃত্তি করবার মতো কোনো কবিতা লিখছেন যেন সোহাগ। শব্দেরা সেখানে ভারি, গতি সেখানে সম্ভ্রম জাগানো শ্লথ। ২০২৪ সালে প্রকাশিত গল্প সংকলন শূন্যের মাঝামাঝি শূন্যে পড়ে টের পাই, উদ্দিষ্ট গল্পকার তার গদ্যভাষার সেই খামতি বলো বা বৈশিষ্ট্য, পুরোদমেই ধরে রেখেছেন এবারও।
এগারোটা গল্প নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সংকলন 'শূন্যের মাঝামাঝি শূন্যে'। মোটাদাগে বলতে গেলে গল্পগুলো ক্রোধের, রাগী গলায় একধরনের নিস্ফল প্রতিবাদের বর্ণনা দিচ্ছে তারা। একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে যেসব বাস্তবতা ওই রাগের জন্ম দেয়, তাদেরও কখনো কখনো সনাক্ত করা যায় গল্পগুলোর ভেতর থেকে। কিন্তু তবু সোহাগের গল্পের জগৎ ঠিক আমাদের চেনা জগৎ নয়, তারা বরং অনুভূতি দেয় এক ধরনের সানগ্লাস চোখে চাপিয়ে আমাদের বাস্তবতাকে দেখার।
সংকলনের সমস্ত গল্প বর্ণনাত্বক। ‘বায়েজিদ’ বা ‘অরিগ্যামি’ গল্পগুলোর কথা বলতে পারি, উৎকর্ষতা সত্ত্বেও গল্পগুলোর শেষে ওই মোচড়-প্রচেষ্টায় খানিকটা ভুরু কুঁচকে যায় পাঠকের। সোহাগের গল্প এগোয় মনোজগতের ভারি বর্ণনায়; ফলে ঘটনার ঘনঘটা থাকাতেই বোধহয় বেশ আলাদা মনে হয়েছ ‘পাঁচটি উড়ন্ত মাছ’ আর ‘একটা গান’ গল্প দুটো।
আরেকটা লক্ষণীয় ব্যাপার, সংকলনের অধিকাংশ গল্পে কোথাও যেন আশা নেই। ‘ডলফিন’ বা ‘অনুসন্ধান’ গল্পগুলো এর উজ্জ্বল উদাহরন। গল্পগুলোর এই আশাহীনতা, এই ক্লেদাক্ত ভাব পাঠককে ক্রমাগতই পোড়াতে থাকে। আর কোথাও যদি এক টুকরো আশা মিলে যায়, ‘রেড অ্যালার্ট’ গল্পে ইউনিকর্নকে দেখে খুশি হয়ে ওঠা পথশিশুটির মতোই পাঠকের মাঝেও তখন জন্ম হয় এক ধরনের ভালোবাসার। একই কথা বলতে হয় ‘বিচ্ছেদবিষয়ক’ আর ‘একজন ব্যাংকার’ গল্পদের ক্ষেত্রেও, গল্পকারের অবিরাম নৈরাশ্যবাদের পরেও এখানে অল্প কিছু দৃশ্যকল্পেই জিতে গেছে আশাবাদ।
পাঠক হিসেবে গল্পকার জিল্লুর রহমান সোহাগের পরবর্তী গল্প সংকলনে আরও বেশি করে আবিষ্কার করতে চাই জীবনের ওসব টুকরো ইতিবাচকতাকেই।
৩.৫/৫ লেখকের "ডি মাইনর" বেশ ভালো লেগেছিল। সেই প্রেক্ষিতেই পড়ে দেখা। ঠিক হতাশ না হলেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। লেখনীশৈলীতে যথারীতি চমৎকারিত্ব আছে তবে গল্পগুলো ঠিক মনমতো হয়নি। বারবার শুধু মনে হচ্ছিল লেখকের পক্ষে আরো দারুণ কিছু লেখা সম্ভব। "রেড এলার্ট", "পাচটি উড়ন্ত মাছ" এবং "একজন ব্যাংকার" গল্পগুলো ভালো।
কাছাকাছি সময়ে পড়া গল্পগুলোর মাঝে “রেড অ্যালার্ট” সেরা। এই সাম্প্রতিক সময়ের দৈর্ঘ্য কতদুর হবে সেটা ঠিক করে বলে উঠতে পারছিনা। তবে আমার মনে হয় “রেড অ্যালার্ট” আমার মনে থাকবে, মনের গভীরেই থাকবে। একটা রক্তাক্ত স্কুল ব্যাগ থেকে যে গল্পের শুরু সেই গল্পটি গল্পকারের ভিন্নতা আর শক্তির প্রমান দিতেই হঠাৎ করে একটা ইউনিকর্নের আবির্ভাব ঘটিয়ে ফেললো আমাদের ধুলো আর পাপে পরিপুর্ণ নোংরা শহরে। আর তারপরেই গল্প আর পাঠকের কল্পনায় রইলোনা। সেখানে লেখকের একক আধিপত্য । আমরা তার নির্দেশিত পাঠক মাত্র । কিন্তু গল্পের সাথে দুর্দান্ত একাগ্রতা হয়ে গেছে ততক্ষনে। ইউনিকর্ন যখন “আমগো ঘোড়া” হয়ে উঠেছে, তখন আর তাকে স্বর্গের প্রাণ মনে না হয়ে মনে হচ্ছে আমাদের প্রাণের স্বর্গ। সে হয়ে উঠেছে আমাদের হৃদয়ের স্বল্প সাহসের অসীম কল্পনার এবং প্রত্যাশার প্রতিবাদের নাম। দেবশিশুদের আন্দোলনের মাঝ থেকে বের হয়ে আমগো ঘোড়া যখন দাত কেলিয়ে হাসা সংসদ ভবনের পাশ দিয়ে ছুটে খেজুর বাগান , বিজয় সরণি সিগন্যাল পার হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে যাচ্ছে আমিও তখন রুপকথা-রুপকতা-পরাবাস্তবতা-বাস্তবতার নানা রকমের ধকল সইতে সইতে ভাবছি গল্পকার গল্প শেষ করবে কোঁথায়। গল্পের শেষাংশই হবে তার সেরা চমক , সফলতা অথবা ব্যর্থতা। জিল্লুর রহমান সোহাগ যেভাবে গল্পটা শেষ করেছে তার চেয়ে দুর্দান্ত সমাপ্তি বোধ হয় এই গল্পের আর হয়না। “শূন্যের মাঝাম���ঝি শূন্যে” লেখক আমাদের অদ্ভুত এক শূন্যর কথা বলেছে; এই যে আমরা শূন্য থেকে এসে আবার শূন্যতেই চলে যাই তার মাঝের একটা শূন্যতে মাঝে মাঝে গেলে কে���ন হয়? “একজন ব্যাংকার” গল্পে জীবনের হিসাবেও অনেক উলোট পালোট ঘটিয়ে ফেলা একজন ব্যাংকার ঠিক ঠাক হিসাব মেলানোর শেষ সময়ে এসে কেমন হিসাব মিলিয়ে দিলো। পাচটি উড়ন্ত মাছ বা ডলফিন বা বাগবিম্ব আপনাকে দ্বিতীয়বার পড়ে নেবার তাড়া দিবে। কারন আপনার লেখকের উদ্দেশ্য বোঝা হয়নি তখনো, বোঝার দরকার আসে বটে। সোহাগের গল্পে বারবার গল্পকারের সাথে গল্পের আত্বিক পরিচয়ও সে করে দিতে চেয়েছে। আমরা মাঝেমাঝেই দেখি গল্প গল্পকারের হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। গল্পকারও অবাক হয়ে দেখতে চাচ্ছে গল্প কোনদিকে যেতে চায়, কোনদিকে যায়। গল্পকারের এই যে করুন বেদনা , ব্যর্থতা আবার কখনো কখনো নিজের শক্তিতে আন্দোলিত হয়ে ওঠা সে আমার মতো সামান্য গল্পকারকেও প্লাবিত করেছে। ভাবতে বাধ্য করেছে এইসব বেদনা আমারো রয়েছে। বেদনা ছাড়া তো লেখক হওয়া যায়না। আমি সোহাগের লেখা “শূন্যের মাঝামাঝি শূন্যে” বইটির বেশির ভাগ গল্পই দুই চোখ আর মগজ খাটিয়ে পড়েছি। আজকাল অনেক লেখা পড়তে এমনকি একটা চোখ হলেও যথেষ্ট। সে আমাকে মগজের পুরো অংশটুকুই ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে তবুও অনেক জায়গাতেই মনে হয়েছে আমার স্বল্প বুদ্ধিতে ঠিক যেন অনুভব করতে পারছিনা অথবা হয়তো আমি অনুভব করার যথেষ্ট শক্তিই রাখিনা। সেখানে আফসোস নেই। লেখকের দায় নেই সবকিছু বুঝিয়ে বলার; পাঠকের ক্ষতি নেই যদি সব না বোঝে বা কিছুটা কম বোঝে। সাহিত্য মাত্রই সাধনা; তাকে ধরতে চাওয়ার ইচ্ছে। সোহাগ সেই ইচ্ছেকে আরেকটু জাগিয়ে দিবে। তার লেখা পড়তে গিয়ে আমার কখনো কখনো শহিদুল জহির বা হারুকির কথা মনে হয়েছে কিন্তু লেখা শেষ হয়ে সে হয়েছে শুধু মাত্র সোহাগেরই গল্প। সোহাগ গায়ক। যদিও ব্যান্ড সংগীতের সাথে আমার অনেক আগে থেকেই একটা দুরত্ব তবুও তাদের “ঢাকা” বিষয়ক একটা গান শুনেছি, মুগ্ধ হয়েছি।আরো শোনা হবে নিশ্চয় । তার আবৃত্তিও আমি শুনেছি। মনোমুগ্ধকর। এই বহুবিধ প্রতীভার অধিকারী ছেলেটির লেখার হাতও খুবই আধুনিক,চিন্তাশীল আর নতুনত্বে পরিপূর্ণ । সোহাগের লেখা আপনার মেধা মননে প্রভাব ফেলবেই। আমার মনে হয় তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার নৈতিক দায়িত্ব আমাদের আছে। চন্দ্রবিন্দু'র স্টল (৫০৮-৫০৯) তে সোহাগের “শূন্যর মাঝামাঝি শূ্ন্যে”কে পাওয়া যাবে।