রামায়ণের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, তাহা ঘরের কথাকেই অত্যন্ত বৃহৎ করিয়া দেখাইয়াছে।
—প্রাচীন সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছেলেদের রামায়ণ
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
ভারতবর্ষের প্রধান দুটি মহাকাব্যের একটি বাল্মীকি রামায়ণ। রামায়ণকে ত্রেতাযুগের ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হবে না। গল্পটা ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব, আদর্শ স্বামী-স্ত্রী, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সর্বোপরি আক্ষরিক অর্থে "রামরাজ্য" সৃষ্টি হওয়ার। রামায়ণ শব্দের অর্থ হল শ্রী রামের যাত্রা। মূল রামায়ণ ছয়টি কাণ্ডে (মতান্তরে সাত নম্বর কাণ্ডটি বাল্মীকি রচিত নয়) রচিত। সেই বাল্মীকি রামায়ণের অনুসরণেই এই সংস্করণের পর্ব ছয়টি।
রামায়ণের যে ধর্মীয় আবেগ এবং দৃষ্টিকোণ রয়েছে সে দৃষ্টিকোণ দিয়ে আমি এটা দেখব না এখানে। পাঠক এবং রচয়িতার উদ্দেশ্য এবং দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করব।
রামায়ণের কাহিনী মোটামুটি সবারই জানা। তারপরও এ বইটা কেন পড়া উচিত? কারণ এর গল্প বলার ঢং, লেখনী এবং পরিসর। কেবল শিশু নয়, যেকোনো মানুষ একবসায় রামায়ণ শেষ করতে চাইলে এ বইটার থেকে ভালো বিকল্প নেই।
ছেলেদের রামায়ণ সে সময় রচিত যখন সাধারণ শিশুরা রামায়ণের রস ঠিকভাবে আহরণ করতে পারত না। ঐসময় প্রচলিত সব রামায়ণই ছিল কাব্যিক এবং উঁচুমানের ভাষায় রচিত। যা স্বভাবতই কমবয়েসীদের জন্যে অবোধগম্য। তাই শিশুদের উপযোগী একটা রামায়ণের অভাব রবীন্দ্রনাথ থেকে উপেন্দ্রকিশোর সবাই বোধ করেছিলেন। আজ আমাদের হাতে যে "ছেলেদের রামায়ণ" তা কিন্তু প্রথম শিশুদের জন্য তৈরি রামায়ণ নয়। রচয়িতা নিজেই স্বীকার করেছিলেন কাঁচি চালিয়ে রামায়ণকে শিশুদের উপযোগী করলেন তো বটে, কিন্তু তাতে উল্টো রামায়ণেরই সৌন্দর্য হানি ঘটেছে। তাই রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এসে যদি সম্পাদকের কাজটা না করতেন তাহলে বোধহয় আজকের এত সুখপাঠ্য রামায়ণখানি পেতাম না।
মূল বাল্মীকি রামায়ণের মতই "ছেলেদের রামায়ণ"-এর মূল চরিত্র রাম। তাঁকে কেন্দ্র করেই গল্প এগিয়েছে। রামায়ণে ভ্রাতৃত্ববোধের যে দৃষ্টান্ত তা বিশ্ববিখ্যাত। হ্যাঁ, আলোচনায় সর্বদা অবহেলিত সেই চরিত্র লক্ষ্মণও আছেন। আছে 'পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম'-এর সবচেয়ে সুন্দর প্রয়োগটা। রাম-সীতার ভালোবাসার স্নিগ্ধ গল্পটা বইয়েই পাবেন। একটু করে উপস্থিত হয়ে জটায়ু তার কর্মকাণ্ড দ্বারা পাঠকমনে জায়গা করে নিয়েছেন চিরকালের জন্যে। রাম, রাবণ ও রাক্ষসীদের সাথে হনুমানের খুনশুটি হাসির খোরাক জুগিয়েছে। আপনাদের অতিপরিচিত ঘরশত্রু বিভীষণকেও পাবেন। তবে অনেক তাৎপর্যময় চরিত্রের সাথেই সাক্ষাৎ হয়নি।
আমার কিছু অপূরণীয় ইচ্ছের একটি হল ঠাকুরমা বা ঠাকুরদার কাছ থেকে ঠাকুরমার ঝুলির মত পৌরাণিক গল্পগুলোও শোনা। সেটা পূরণ করে দিয়েছেন শ্রদ্ধেয় শ্রী দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার এবং উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মত শিশুসাহিত্যিকরা। রামায়ণ মূল রামায়ণের সংক্ষিপ্ত রূপ এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শিশু-কিশোরদের জন্য এমন সুপাঠ্য রামায়ণ একমেবাদ্বিতীয়ম।
পড়ার জন্য খুব ছোটবেলায় প্রথম যে রামায়ণটা নিয়েছিলাম তার নাম কৃত্তিবাসী রামায়ণ। একেতো আমার শব্দভাণ্ডারে ভালো দখল ছিল না, তার উপর ছোট মাথায় ওসব কঠিন কাব্যময় কথা ঢুকেওনি। তখনও এ বইয়ের সন্ধান পাইনি। সন্ধানটা দিয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রই স্কুলের বইপড়া কর্মসূচির তালিকায় রেখে।
শ্রদ্ধেয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীও ঠিক এ ব্যাপারটাই মাথায় রেখে ছেলেদের উপযোগী রামায়ণ রচনা করেছিলেন। গল্পটা এমনভাবে বলা যে যেকোনো বয়সেরই পাঠক এটাকে সত্যি ভাববেন। এত সুন্দর বর্ণনা, শব্দের ব্যবহার আর ভঙ্গি যে ছুঁয়ে যাবে সবার মন। ছোটদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
বইটির টার্গেট পাঠক কমবয়েসীরা হলেও শত বছরেরও বেশি সময় ধরে বইটি পড়ে মুখর আট থেকে আশি সবাই। বাঘা বাঘা সাহিত্যিক থেকে শিশু পর্যন্ত।
রামায়ণকে প্রকাশ করে এমন কিছু কথা:
১. ক্ষত্রিয়কে 'দেখি তুমি কেমন ক্ষত্রিয়' বলিলে বড়ই অপমানের কথা হয়।
২. কিন্তু সুখ কি চিরদিন থাকে?
৩.দাদাকে মারিতে পারে, ত্রিভুবনে এমন কেহ নেই।
৪. 'ভাই, বুদ্ধির দোষে অন্যায় করিয়াছি, ক্ষমা কর।'
৫. আজও খুব ভালো রাজার কথা বলিতে হইলে লোকে বলে, 'রামের মতন রাজা!'
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী শিশুদের মন বুঝতেন খুব ভালোভাবে। চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কালক্ষেপণ করেননি। পাঠক সম্পর্কেও তিনি সম্পূর্ণ সচেতন। তাই কমেডি স্টাইলে শব্দচয়ন এবং বর্ণনা করতে কোনো কার্পণ্যতা করেননি। কঠিন মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাগুলো পর্যন্ত তিনি হাস্যচ্ছলে বলে গিয়েছেন। নৈতিক শিক্ষার অভাব নেই রামায়ণে এটা বলাই বাহুল্য। ভালো-মন্দ এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝার বোধ জাগ্রত হবে।
মিথলজি এবং ফ্যান্টাসি পড়তে ভালোবাসেন এমন যেকোনো পাঠককেই রিকমেন্ড করব অতিরিক্ত সুন্দর এই বইটি।
বইটি যখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের তখন সেখানে সম্পাদনা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। গুণসম্পন্ন কাগজ, বাইন্ডিং এর সাথে আছে রচয়িতার নিজের আঁকা চিত্র। তবে প্রচ্ছদ টার্গেট পাঠকের উপযোগী হলেও রামায়ণকে ধারণ করতে পারে নি।
সবশেষে ছেলেদের রামায়ণ পড়ে আপনি কখনো রামায়ণ পড়েছেন এটা দাবি করতে পারবেন না। ছেলেদের রামায়ণ আপনাকে সম্পূর্ণ রামায়ণের অনুভূতি দেবে কিন্তু বাস্তবিক রামায়ণ সম্পর্কে কিছু বলবে না। রামায়ণ হল একজন সাধারণ মানুষের দেবতা হয়ে উঠার গল্প, এখানে এক একটা ঘটনায় রয়েছে শত ঘটনার সৃষ্টিবিন্দু। আপনি ছেলেদের রামায়ণ পড়েই চরিত্র গুলোকে বিশ্লেষণ করতে পারবেন না, তাদের মনোজগত সম্পর্কে অজ্ঞই থেকে যাবেন। ভালো-খারাপ নির্ণয় করাটাও বোকামি হবে। দিনশেষে ছেলেদের রামায়ণ আপনাকে নির্মল আনন্দ দেবে, কিছু শিক্ষা দেবে এবং অতীতের কথাই বলবে।
(এ বইয়ের পর্যালোচনা লেখার সামর্থ্য আমার নেই। অন্য ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি খুব একটা ভালো না হলেও বইয়ের ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি মোটামুটি ভালো। সেই ভরসা-ই স্মৃতিচারণ করা।)
জনরা: এপিক, মিথলজি, শিশুসাহিত্য, ক্লাসিক
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১১
প্রকাশনী: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র