স্টিফেন ফ্রাই একজন বহুরূপী। তিনি একাধারে একজন কমেডিয়ান, লেখক, অভিনেতা, উপন্যাসিক, কবি, কলামিস্ট, চলচ্চিত্র পরিচালক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। “ব্লাকএডার” “ওয়াল্ডি”-র মত জনপ্রিয় সিটকমে যেমন অভিনয় করেছেন তেমনি অভিনয় করেছেন “ভি ফর ভেন্ডেটা”-র মত সফল চলচ্চিত্রে এবং লিখেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় বই। ফ্রাইয়ের অসংখ্য বইয়ের মধ্যে প্রথম পড়ার সুযোগ হল অল্টারনেট হিস্ট্রি জনরার “মেকিং হিস্ট্রি”।
অল্টারনেট হিস্ট্রি রচনা করতে হয় ইতিহাসের পরিচিত এক বা একাধিক ঘটনাকে ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করে। যদি ইতিহাসের "এই ঘটনা"-টা "এমন" না হতো তাহলে কী হতো? ঘটনাটা "এমন" না হয়ে কী হতে পারত? সেই ভিন্ন রকম হওয়াটা কিভাবে হতো আর তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহই অল্টারনেট হিস্ট্রির প্রধান রেসিপি। অল্টারনেট হিস্ট্রিকে বলা চলে হিস্টোরিক্যাল ফিকশনের সাব জনরা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সায়েন্স ফিকশনের সাব জনরাও বলা হয়। সাধারণত টাইম ট্রাভেল করে ঐতিহাসিক কোন ঘটনাকে পালটানো হয় বলে জনরা হিসেবে সায়েন্স ফিকশনের নাম আসলেও টাইম ট্রাভেল করাটা অল্টারনেট হিস্ট্রির বাধ্যতামূলক কোন অনুষঙ্গ নয়।
অল্টারনেট হিস্ট্রি প্রচন্ড রকম জনপ্রিয় ইউরোপে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপে। এই জনরার সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয় স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, জার্মান, কাতালুনিয়া (বার্সেলোনা, স্পেন) ভাষায় এবং সেখানে এই জনরাটা পরিচিত আখ্রনি নামে, সেখান থেকেই ইংরেজি শব্দ আখ্রনিয়া (Uchronia)র আবির্ভাব; এবং বর্তমানে শুধু অল্টারনেট হিস্ট্রি বইয়ের তালিকা রাখার জন্য আখ্রনিয়া ডট নেট নামে একটা ওয়েবসাইট আছে।
অল্টারনেট হিস্ট্রিতে অবশ্যই ইতিহাসের কোন একটা ঘটনা যেভাবে ঘটেছিলো সেভাবে ঘটতে না দিয়ে ভিন্ন কোন রূপে ফুটিয়ে তুলতে হবে এবং একইসাথে তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কিভাবে এগোল সেটার বর্ণনা থাকতে হবে। আবার ভবিষ্যৎ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এমন কোন সাহিত্য যেটা সময়ের হিসেবে এখন আবার অতীত হয়ে গিয়েছে সেটাকে অল্টারনেট হিস্ট্রির অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। জর্জ অরওয়েলের “নাইন-টিন এইটি ফোর” বা আর্থার সি ক্লার্কের “২০০১ এ স্পেস অডিসি” লিখা হয়েছিল ভবিষ্যতের কাহিনী হিসেবে, সময়ের বিচারে কাহিনীর সময়কাল (১৯৮৪ / ২০০১) এখন অতীত হলেও যেহেতু তারা তাদের পরিচিত কোন অতীতকে পাল্টানোর চেষ্টা করেননি কাজেই এরা অল্টারনেট হিস্ট্রির অন্তর্ভুক্ত নয়।
অল্টারনেট হিস্ট্রির সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্লট হচ্ছে সিভিল ওয়ারে কনফেডারেট আর্মিকে জয়ী হিসেবে দেখানো এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধে নাজী বাহিনীর হাতে জয় তুলে দেয়া। ইউরোপে জনপ্রিয় এই জনরা আমাদের বাংলা সাহিত্যে বা বাংলাদেশে মোটেও জনপ্রিয় নয় এবং এখন পর্যন্ত অল্টারনেট হিস্ট্রির কোন বাংলা বই চোখে পড়েনি। আমাদের দেশের সাহিত্যিকরা অল্টারনেট হিস্ট্রি লিখলে সেটার প্লট কি রকম হতে পারে?
১। দেশভাগের সময় ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ না হয়ে ইংরেজদের হটিয়ে দিয়ে এখনো মোঘল সাম্রাজ্য হিসেবে টিকে আছে।
২। দেশভাগের সময় বাংলাদেশের সাথে বাংলা ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গ এবং সেই সাথে বাংলাদেশের উত্তর এবং পশ্চিমের মেঘালয়, আসাম, মনিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা, নাগা-ল্যান্ড, অরুণাচল নিয়ে বড় ভূখণ্ডের বাংলাদেশ গঠন, যার সাথে রয়েছে নেপাল, ভুটান এবং চীনের সীমান্ত এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক এবং ভৌগলিক অবস্থা।
৩। পশ্চিম পাকিস্তানের অধীনে বাংলাদেশ না হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে বাংলাদেশের অধীনে রেখে দেশভাগ।
কিংবা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে,
১। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনী জয়ী আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমেদের শপথ গ্রহণ এবং তার পরবর্তী সময়কাল।
২। ১৯৭৫ এর নভেম্বরে খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা দখল এবং ক্ষমতায় অবস্থান।
৩। সিপাহী বিপ্লবে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে কর্নেল তাহেরের উত্থান এবং ক্ষমতায় আসীন।
অলটারনেট হিস্ট্রির প্রথম ভাগে থাকে ইতিহাসের নিখাদ সত্য, ২য় ভাগে লেখক ছুটিয়ে দেন তার কল্পনার ঘোড়াকে; দিনশেষে তাই অল্টারনেট হিস্ট্রি কোন হিস্ট্রি / হিস্টরিক্যাল ফিকশন/ নন-ফিকশন নয়, শুধুই ফিকশন। ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠা এই জনরায় হয়তো আমাদের এখানেও কেউ সাহিত্য রচনা শুরু করবে।
অল্টারনেট হিস্ট্রি সম্পর্কে কিছু জানার আগেই এই জনরার বই পড়া হয়েছিল মার্ক টোয়েনের “এ কানেক্টিকাট ইয়াংকি ইন কিং আর্থার কোর্ট”, জানার পর পড়া হল “মেকিং হিস্ট্রি”। উপন্যাসের শুরু হয় প্রধান চরিত্র মাইকেল ইয়াং নামক ইতিহাসের এক ছাত্রের ক্যামব্রিজে তার ডক্টরেট থিসিস জমা দেবার দিন থেকে। তার থিসিসের বিষয় ছিল এডল্ফ হিটলারের শৈশব এবং নেতা হিসেবে তার উত্থান। থিসিস জমা দেবার দিনেই ইয়াংয়ের গার্ল-ফ্রেন্ড তাকে ছেড়ে চলে যায়, জমা দেয়া থিসিসকে আবর্জনা বলে প্রফেসর ছুড়ে ফেলে দেন।
উপন্যাসের ২য় প্রধান চরিত্র টাইম মেশিন আবিষ্কার করা পদার্থবিদ লিও জুকারম্যান, ইহুদী না হয়েও যে ইহুদী পরিচয়ে পরিচিত। জুকারম্যানের বাবা ছিল হিটলারের নাজী বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ডাক্তার। ইহুদীদের উপর অত্যাচারের পদ্ধতি এবং উপকরণ স্বেচ্ছায় না হলেও অনেকগুলোই তার আবিষ্কার এবং যুদ্ধ শেষে ঘটনাচক্রে লিও এবং তার মা নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করে ইহুদী বলে।
উপন্যাসে ইয়াং এবং লিও-র কাহিনী যখন আগাচ্ছিল তখন অল্টারনেট চ্যাপ্টারে আগাচ্ছিল ১৮৮০র দশকে অষ্ট্রিয়ার এক পরিবারের কাহিনী। আলই্স এবং ক্লারার সংসার, আলই্সের আগের সংসারের পুত্র কন্যা, ক্লারার সন্তানদের জন্ম নেবার সময় কিংবা জন্ম নেবার কিছুদিন পর বা গর্ভাবস্থাতেই মৃত্যুবরণ। অবশেষে ক্লারা কোল জুড়ে আসা ছেলে ডলফি অসময়ে মৃত্যু বরণ না করে হাসি ফুটায় মায়ের মুখে। সেই ছেলে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, আলই্স তার পরিবার নিয়ে অষ্ট্রিয়া ছেড়ে চলে আসে জার্মানিতে এবং একসময় সেই ছেলে পরিণত হয় এডল্ফ হিটলারে।
অন্যদিকে, বর্তমান সময়ে ইয়াংয়ের সাথে পরিচয় হয় লিওর। দুইজন মিলে সিদ্ধান্ত নেয় সুন্দর একটা বর্তমানের জন্য অতীতের সামান্য রদবদল করতে হবে, ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে হবে হিটলারকে। কিন্তু দুইজনের কেউ খুন, ধ্বংস, রক্তারক্তিতে রাজি নয়, তারা বেছে নেয় ভিন্ন এক পথ। হিটলারের জন্মের আগে গিয়ে তারা হিটলারের বাবা আলই্স হিটলারকে খাইয়ে দেয় প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংসকারী ট্যাবলেট এবং প্রজনন ক্ষমতা হারানো বাবার ঔরসে জন্ম নিতে না পেরে পৃথিবী মুক্ত হয় এডল্ফ হিটলার নামক এক অভিশাপ থেকে।
হিটলার মুক্ত অতীতের বর্তমানে জেগে উঠে ইয়াং; এবং ভুল করতে থাকে পদে পদে। ইয়াং জেগে উঠে তার বর্তমানের পূর্ণ স্মৃতি নিয়ে, কিন্তু সেই ১৮৯০ সালে হিটলারের জন্ম নেয়া থেকে পৃথিবী চলেছে এক ভিন্ন পথে, হিটলারের পৃথিবীতে পরিবর্তনের যেই ধারায় এসে ইয়াং ঘুমিয়েছিল, ইয়াং জেগে উঠে বর্তমানের ভিন্ন একটা ধারায় যেখানে হিটলার নেই এবং এই পরিবর্তনের ধারা চলমান গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ইয়াং ভুল করে প্রতিটি পদক্ষেপে, লোক হাসায়, বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ইতিহাসের বই ঘেঁটে ইয়াং দেখতে পায় ইতিহাসে হিটলার বলে কেউ ছিল না, তবে তার চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গিয়েছে। হিটলারের জন্ম না হলেও নাজি বাহিনীর ক্ষমতা দখল করেছিল রুডল্ফ গ্লডার নামক জনপ্রিয় এক রাষ্ট্রনেতা এবং পৃথিবী ব্যাপী চালিয়েছে ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা। মজার ব্যাপার পৃথিবীকে ইহুদী মুক্ত করার জন্য সে ব্যবহার করে প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংসকারী সেই পিল, যেটা ইয়ং ব্যবহার করেছিল হিটলারের বাবার উপর। নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ইয়াং এবং লিও সিদ্ধান্ত নেয় আবার অতীতে ফিরে গিয়ে নিজেদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার। ফ্রাইয়ের ভাষায়, “to make the world a better place by ensuring that Adolf Hitler lived and prospered”...
বইয়ের চমৎকার একটা দিক ছিল এক রৈখিক ভাবে শুধুমাত্র হিটলারের অনুপস্থিতি এবং গ্লডারের উপস্থিতির দিকে নজর না দিয়ে পারিপার্শ্বিক সবকিছুকে আতস কাঁচের নিচে ফেলে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেখাটা। রক ব্যান্ড ওয়েসিস কে নিয়ে জোকস, বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড বিটলসের জন্ম না নেয়া, “কাসাব্লাঙ্কা”, “দ্য থার্ড ম্যান”-এর মতো মুভিগুলোর নির্মাণ না হওয়া, সমকামীদের তুলনামূলক অবস্থান, বৈশ্বিক ক্ষমতার হস্তান্তর থেকে শুরু করে আমেরিকান এবং ইংল্যান্ডের গালি গালাজের তুলনা পর্যন্ত অনেক কিছু। বিস্ময়কর রকমের উপভোগ্য ছিল দুই খণ্ডে বিভক্ত বইয়ের প্রথম খণ্ডে হিটলারের অধীনে বিশ্বযুদ্ধের একটা খণ্ডিত অংশের বর্ণনা, ২য় খণ্ডে সেই একি যুদ্ধের একি সময়ের বর্ণনা লেখক আবারো দেন, তবে এবার হিটলারের অনুপস্থিতিতে - গ্লডারের অধীনে। অল্টারনেট হিস্ট্রির অন্যতম অনুষঙ্গ টাইম ট্রাভেল হলেও টাইম মেশিন কিভাবে কাজ করে সেই টেকনিক্যাল কচকচানিতে বিস্তারিত না গিয়ে অল্প কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যেই লেখকের টাইম মেশিনের কাজ শেষ করে দেয়াটাও ছিল স্বস্তিকর।
স্টিফেন ফ্রাইয়ের বর্ণনা রীতি চমৎকার, পুরো বই জুড়েই একটা রম্য আবহ থাকলেও বিশ্বযুদ্ধ, হিটলার, নাজি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ বর্ণনা করতে গিয়ে স্বজন হারানোদের প্রতি কোথাও অবহেলা বা অসম্মান করা হয়নি। কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে হাস্যকর কিছু একটা হয়েছে কিন্তু ধরতে পারিনি। ডার্ক কমেডিগুলোর সাথে সময়কাল, স্থান, স্থানীয় ট্যাবু উতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকে বলেই ভিন্ন পরিবেশ এবং সংস্কৃতির কারো পক্ষে হুট করে ধরা ফেলাটা কঠিন। আর কঠিন বলেই এই কমেডি গুলো ধরতে না পারাতে খুব বেশি আফসোস নেই। “মেকিং হিস্ট্রি” নিঃসন্দেহে অল্টারনেট হিস্ট্রি এবং ইংলিশ হিউমারের এক চমৎকার মিশেল। লেখকের হিউমারের প্রশংসা করতেই হয় এবং তার আরো কিছু বই পড়ার আশা রাখি...