পাশাপাশি দুটি স্রোতে এবং কালে প্রবাহিত এই উপন্যাসে চরিত্র শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতির অন্যান্যরাও। একদিকে মহাপ্রকৃতি যে পুরো মহাজগতকে শাসন করছে, আরেকদিকে মহাপ্রকৃতিরই দৃশ্যমান রূপ-আমাদেরকে ঘিরে থাকা ক্রমশ ক্ষীয়মান বৃক্ষ-তরুলতা-নদী-সমুদ্র-মাটি সমৃদ্ধ প্রকৃতি। একদিকে আমাদেরকে ঘিরে থাকা পরিচিত জনজীবন, অভিজ্ঞতা আর চরিত্র। অন্যদিকে একটি মানুষ আজন্ম চেনা আমাদের মেট্রোপলিটনে বাস করেই আস্বাদন করে এক তীব্র ঐন্দ্রজালিক জীবন যা তাকে দেখিয়ে দেয় জগতের কাঁচা সারসত্যকে। উন্মাদ হতে হতে বেঁচে গিয়ে সে ওই ঘিলু সেদ্ধ করা সত্যকে ভালোবাসতে শেখে কারণ সেটা প্রাকৃতিক। প্রতিটি মানুষই শৈশব-কৈশোরে নানানভাবে প্রকৃতির মুখোমুখি হয় আর সেইসব প্রভাব তার জীবন দর্শনে ভূমিকা রাখে হোক তা মনমেজাজ, প্রেম, খাদ্যরুচি, বা যৌনরুচি। এই আখ্যানে স্বরূপাকে শরীর চেনায় বেজি, আবার এই বেজিই বিপরীতভাবে গঠন করে লিও'র জীবন দর্শন। প্রান্তিক মানুষ সাত্তারের জীবনদর্শন গঠন করে সপরিবারে নদী ভেঙে শহরে এসে ঠেকা জীবন। সুক্ষ্মরুচির অখিল জীবন, প্রেম আর যৌনতার শিক্ষা পায় এই ঠাসবুনোট রাজধানীর মাঝেই এক চিলতে জমিতে জীর্ণ অস্তিত্ব ধরে রাখা একটি কুঁড়েঘরে, অবাস্তব এক নারীকে ভালোবেসে। বনে কাটানো একটি প্রযুক্তিহীন রাতের শেষে সে মোক্ষলাভের মতো খুঁজে পায় জীবনের মর্মার্থ। প্রকৃতি আর মানব-প্রকৃতি কি পরস্পর বিরোধী? জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাণিরা শুধু হেরে যায় না, খাপও খাইয়ে নেয়। স্বাভাবিক শীত বিপন্ন হয়ে উষ্ণতা বেড়ে গেলে পেঁচাও ক্রমশ বদলে ফেলে তার পালকের রঙ, নিশাচর প্রাণিরা দিবাচর হয় উঠতে শেখে, শহুরে ইঁদুররা ফাস্ট ফুডে অভ্যন্ত হতে গিয়ে পাকস্থলির গঠন প্রণালী বদলে নেয়। বিবর্তিত হয় মানুষও। লেখক এখানে প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ককে দেখেছেন প্রকৃতির উপর কোনো কাল্পনিক রোমান্টিকতা আরোপ না করে। বেসাতি ও বসতি প্রকৃতি আর প্রাণির অবিচ্ছেদ্যতা সম্পর্কে মানুষের মোহভঙ্গের কাহিনি, মোহমুক্ত হয়ে মহাকালের প্রেক্ষাপটে নিজেকে চেনার এক পরাবাস্তব আখ্যান।
ইমরান খানের জন্ম বাগেরহাটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। সেবা প্রকাশনীর রহস্য পত্রিকা দিয়ে ছাত্রজীবনে লেখা প্রকাশ শুরু। পরবর্তীতে দৈনিক প্রথম আলো, কালি ও কলম, শব্দঘর, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদে গল্প লেখেন। ‘ যন্ত্র ও জন্তু’ তাঁর দ্বিতীয় গল্প সংকলন। প্রথম গল্প সংকলন ‘জলাধারে স্রোতস্বিনী’ ২০১৮ সনে একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। প্রথম উপন্যাস ধাতব সময় এর জন্য পেয়েছেন কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৫। তাঁর ছোটগল্প ’জ্যামিতিক জাদুকর’ ২০১৮ সনে কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরষ্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়।
ভারতে অমিতাভ ঘোষ পরিবেশবাদী উপন্যাস লিখছেন বেশ কিছুদিন ধরে (যেমন - the hungry tides, gun island)।ইমরান খানের লেখা অমিতাভের তুলনায় কম উচ্চকিত। শুধু পরিবেশ নয়, নরনারীর সম্পর্কের বিচিত্র দিক লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাসে। এভাবে একান্ত নিজের মতো, পাঠক কী বুঝবে না বুঝবে তার একদম তোয়াক্কা না করে লিখে যাওয়া কঠিন কাজ। কিছু জায়গায় বর্ণনার আধিক্য এতো বেশি যে রীতিমত ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়।কিন্তু লেখক যে প্রশ্ন তোলেন, যে পথে নিয়ে যান, সেই পথে হেঁটে যাওয়া আমাদের নিজেদের জন্যেই প্রয়োজন। এ বইটা পড়ে পৃথিবী যে শুধু মানুষের নয়, অন্য প্রাণীরও, তারাও যে মানুষের মতো সমান গুরুত্ববহ, তা উপলব্ধি করা যায়। চরিত্র হিসেবে তাই মানুষের পাশাপাশি আছে "তুচ্ছ" প্রাণীরাও। কিঞ্চিৎ ধৈর্য নিয়ে "বেসাতি ও বসতি" পড়লে অভূতপূর্ব পাঠ অভিজ্ঞতা লাভের সম্ভাবনা আছে পাঠকের।
এ বছরের পড়া অন্যতম সেরা উপন্যাস। বইমেলায় নতুন যেসব বই নিয়ে আশাবাদী ছিলাম, কোনোটিই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারে নি। বইটা অকস্মাৎ কেনা এবং এরপর এক রাশ মুগ্ধতা।
ইমরান খান ক্রিমিনালি আন্ডাররেটেড লেখক। নাম কেউ শুনেছে তেমন বলে হয় না, অন্তত আমি তো শুনিই নি। অটোগ্রাফ নিতে গিয়ে উনার বিহ্বল চেহারা দেখে আমি দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম, ঠিক লেখকের কাছে অটোগ্রাফের জন্য বই বাড়িয়ে দিয়েছি তো!
উপন্যাসের লেখনী জলের মতন, অবলীলায় বয়ে যায়। ধাপে ধাপে প্রতিটি চরিত্রের অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে ধেয়ে আসা ফুটে এসেছে। ছোটবেলায় শুনেছিলাম, মনের মিল যাদের রয়েছে প্রকৃতি তাদের ই কাছাকাছি টেনে আনে। উপন্যাসের চরিত্ররা কেউ হয়ত প্রকৃতির অভিশাপ প্রাপ্ত, কিংবা সামাজিক কৃত্রিমতায় আবদ্ধ।
দুটি মানুষের মধ্যকার যে মিল তা কি শুধু মানসপটে; নাকি মানুষ দুটোকে ঘিরে থাকা জীবনের উপকরণ তাদের কাছে টেনে আনে। লিও এবং স্বরূপার একত্র হওয়ার কারণ আমার তাই লেগেছে। বাকি চরিত্রের জীবন ঘিরে আখ্যানগুলো বেশ লেগেছে। মুগ্ধভাবে পড়ে গেছি প্রতিটি।
মানুষ কি প্রকৃতির অংশ নাকি প্রকৃতিই মানুষের এক সত্তা! প্রকৃতির প্রতি ভালবাসায়, মমতায় একদল মানু্ষের উপাখ্যান এটি।
লিও গিবসন সরকার, যার নামে তার ধর্ম পরিচয় পাওয়া দুষ্কর, নাকি স্বরূপা যে বনসাই বানিয়ে অতীতকে তার বাড়ির বারান্দার ঠিকানা দিতে চায় নাকি অখিল যে কাঁচা খাবার চিবিয়ে খায়া কিন্তু রান্না করা খাবার তার মাড়ির জন্য যম!
লিও অস্তিত্ববাদের সংকটে ভুগছে, লিওর জগত সবুজ ঠিক বইয়ের প্রচ্ছদের মতই। স্বরুপা আঁকড়ে ধরে আছে অতীতের পাকুড় গাছ আর এক বেজি দম্পত্তিকে। আর অখিল বেঁচে আছে স্বপ্নের ভিতরের স্বপ্নকে সত্যি করতে।
বইটি কি বিষয় নিয়ে?
প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, কিছুটা অসামাজিকও বটে, অনেকেই হজম করতে পারবেনা। বিগত প্রায় পঁচিশ-কুড়ি বছরের বাংলাদেশের একটা দৃশ্যপট যা ঠিক ঐ হাতির ঝিলের পানির মতই স্বচ্ছ। মানে দৃশ্যপটের বিবরণ পরিষ্কার কিন্তু ভেতরটা নোংরা। এভাবে এক বইতে এত বিষয়ে আলোচনা পড়া হয়েছিল স্কুলের সমাজ বইয়ে যদিও ওগুলো ভুয়া মিথ্যে কথায় ঠাসা, এই বইয়ে সব তিঁতা সত্যি।
আরও কি কি আছে?
কিছু জানা সত্য, কিছু অজানা সত্য।
আবার কিছু অজানার ভান ধরে থাকা জানা সত্য
অবলীলায় লেখক সব বলে দিয়েছে।
আমার ব্যাক্তিগত অনুভূতি
বইটি আমার ডিপার্ট্মেন্টের ফ্যাকাল্টি ইমরান খান স্যারের। স্যারের বই দেখেই কিনেছি কথা সত্যি কিন্তু রিভিউ দিচ্ছি একজন পাঠক হিসেবে।আমি বরাবরই স্পয়লার বাদে বই রিভিউ দি।বই পড়ে আমার ব্যাক্তিগত অনুভূতির কথাই আমি মুলত রিভিউর নামে লিখে ফেলি। আমি কোনো ক্রিটিকাল এনালাইসিস করিনা। এই বই এক কথায় সুখাদ্য। বইটি পড়ার সময়টা আমার সুখের কেঁটেছে। আমার কাছে যে মূল চরিত্র সে আসলে সাইড চরিত্র অখিলের ভাই শাকিল। কারণ শাকিল আমাদের সবার পরিষ্কার প্রতিবিম্ব। এত মোটা বই পড়েও মনটা হাহাকার করছে। মনে হচ্ছে আরোও কয়েশ পেইজ পড়তে পারলে মন্দ লাগতো না।
এমন বই স্যার আরোও চাই। চিন্তার খোরাক না জাগালে আসলে বই পড়ে কি লাভ?
❛যেখানে নির্জনতা, সেখানে অনিরাপত্তা; যেখানে জনতা, সেখানে অশান্তি। এই বৈপরীত্যের সমাধান কী?❜
এই সবুজ শ্যামল দুনিয়ায় একা মানুষই কি থাকার অধিকার রাখে? অ্যাডাম ইভ কিংবা আদম হাওয়া তো স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে এসেছিল এই ধরণীতে। তবে এই ধরণীতে মানুষই অতিথি না? যারা ফল, ফুল, পশুপাখির আবাসে এসে ভাগ বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে নিয়েছে!
সাত্তার গ্রামের নদীভাঙনে একরাত গাছের উপর বাবা না নিয়ে কাটিয়েছিল। সে স্মৃতি তার বিশেষ মনে পড়ে না। সবই আবছা। গ্রাম ছেড়ে একখণ্ড ভোলা বস্তি পেয়েছিল। সেও কেন জানি কপালে রইলো না। আরেকটু সুখের আশায় বস্তি থেকে বস্তি পরিবর্তন করে সুখের দেখা মিলেছিল নাকি সে জানে না। শহুরে মানুষের খোরাক, অট্টালিকা তৈরির হিড়িক তাদের মতো ছন্নছাড়া বস্তিবাসীকে করেছিল ঘরছাড়া। তবুও রিক্সায় প্যাডেল দিয়ে সাত্তার স্বপ্ন চালিয়ে যায়। একদিন অট্টালিকা হয়তো তারও হবে। তার রিক্সায় যাত্রী চাপে। তাদের সাথে একটু আলাপ হয় আবার কখনো কবি যাত্রীর কবিতায় সে মানে খুঁজে পায়না। তবুও চালিয়ে যায় সে তার রিক্সা।
লিও গিবসন সরকার। পরবর্তীতে সে হয়েছিল হোসেন লিও গিবসন সরকার। তার এই অদ্ভুত নামের পিছের ইতিহাস আরও মজার। তবুও শেষমেশ যার নামে সাম্যেই স্থির হয়েছিল। লিও হেঁটে চলেছে। আজ তার স্মৃতি কাতর কিংবা জীবনদর্শন রোগে পেয়েছে। মুগদা, মায়াকানন আর কমলাপুরের নানা জায়গা সে অবিরাম হেঁটে চলেছে আর অতীতের স্মৃতি মনে করছে। এত স্মৃতি এতদিন কোথায় ছিল? সে মনে করতে পারেনা কী করে আজ এসব মনে পড়ছে?
ছোটোকালে অন্ধকারে বেজি দেখে আতঙ্কে পড়া লিও সে হয় দূর করতে পারেনা। বেজি দেখলে যার মনে বিবমিষা আতঙ্ক ফুটে উঠে সেই একই বেজির জীবন অন্য কারো কাছে রোমাঞ্চের সে কথা হাঁটতে থাকা লিও জানে না। ভদ্র হয়ে জীবন কাটানো লিও জানেনা তার স্ত্রীর মনের গোপন চাহিদা। মুগদা দিয়ে হেঁটে হেঁটে সে মনে করে এই ঝিলপাড়েই শুরু আর শেষ হয়েছিল তার জীবনের প্রথম প্রেমের। নগরায়নের এই যুগে এখন আর আগের মুগদাপাড়া নেই। আছে গায়ে গায়ে নিঃশ্বাস ফেলা অট্টালিকা। নেই একটুকরো কোনো খালি জমি। স্থপতি হয়েও সে বুঝে না ঢাকার বুকে এত জায়গা আর কোথায় তাও কেন শেষ হয়না স্থাপনা তৈরি? নতুন করে বানাও কিংবা পুরোনোকে ভেঙে আবার গড়ো এই চলছে। চলবে নগরায়ন। এসব ভাবতে ভাবতে লিও এই গলি থেকে ঐ গলি হাঁটছে আর অবিরাম স্মৃতির পাতা উলটে যাচ্ছে।
স্বরূপা ভারী পেট নিয়ে বাড়ির বারান্দায় পায়চারি করছে আর একা একা কত কি ভেবে চলেছে। লিও জানিয়েছে ফিরতে দেরি হবে। যাক না ছেলেটা এমনেই শান্ত, নীরব। আজ একটু ঘুরতে বেরিয়েছে যাক। স্বরূপা বরং একটু স্মৃতি হাতড়ে নিক।
বাবার বদলি চাকরির সুবাদে দেশের গ্রাম থেকে গ্রামে কিংবা সদরে বিচরণ করেছে সে। কোনো জায়গায় থিতু হওয়ার আগেই বেজেছে বিদায় ঘন্টা। এলাকার ঘর-বাড়ি, গাছপালা কিংবা পশুপাখিকে আপন করার আগেই বদলির নোটিশ নিয়ে বাবা ঘরে ফিরেছে। তার জীবনে সঙ্গী ওই পাকুড় গাছ, অনুরাধা আপা। তারাও জীবনের প্রয়োজনে কোথায় হারিয়ে গেছে। তবুও পাকুড় গাছকে বনসাই করে রেখেছে স্বরূপা তার ঘরে। কিন্তু অনুরাধা আপা কিংবা ছেলেবেলায় বিভিন্ন জেলায় ফেলে আসা বন্ধু বান্ধবী?
❛গাছকে তো বনসাই করে রাখা যায়। মানুষকে বনসাই করা যায় কি?❜
স্বরূপা প্রকৃতিকে দেখেছে কাছ থেকে, অনুভব করেছে। প্রকৃতির ভালোবাসাকে উপলব্ধি করেছে। তবুও সে বিচ্ছিন্ন হয়েছে প্রকৃতি থেকে প্রতি বদলিতে। স্বরূপার মা, যিনি আজীবন ছুটে বেরিয়েছেন স্বামীর সাথে বদলীতে। তার একটা সংসার গোছানোর সাধ আজন্ম। মিটেছিল কি তা?
প্রকৃতি থেকে শেখার কত কী আছে। স্বরূপা শরীর, শরীরের ভালোবাসা চিনেছে বেজির কাছ থেকে। বেজি যে এক দিবাচর প্রাণী সে তাকে কী করে শরীরী তৃপ্তি শিখাতে পেরেছিল? পেউ এক কুকুরছানা, যে স্বরূপার ভেতরের মাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তুলেছিল। এই প্রাণী গুলোও একটা চরিত্র। তাদের নিজস্ব জীবন আছে, দর্শন আছে, আছে জীবনযাত্রার অদ্ভুত নিয়ম। প্রাণী, পরিবেশ আর প্রকৃতিতে স্বরূপা ভালোবাসা, যৌনতা শিখেছে। ওদিকে লিও যে কিনা বেজি মানে মূর্তিমান আতঙ্ক ভাবে তার সাথে পার্থক্য কতটাই না! অনাগত সন্তানকে পেটে নিয়ে স্বরূপা ভেবে যায়....
অখিল বিশ্বাস... যার জন্মের শুরু থেকেই অস্বাভাবিকতা, অদ্ভুত কান্ড ঘটে আসছে। এই অস্বাভাবিকতা শুরু হয়েছিল মাথার বদলে যে দুনিয়াতে প্রথম দুটো পা বের করে দিয়েছিল, কান্নার বদলে যে ডাক্তারের দিকে চেয়ে হেসেছিল। নাভিপোতা থেকে শুরু করে যার জীবনে সূক্ষ্মতাকে দেখে এসেছে। শালদাঁত যার পড়েছিল ত্রিশ পেরিয়ে, যে রান্না ছাড়া খাবার অবলীলায় খেতে পারলেও রান্না করা কোনো নরম খাবার খেতে গেলেও মাড়িতে ব্যথা পেত, আর ভেসে যেত শোণিতে। যাকে প্রেম, ভালোবাসা আর শরীর চিনিয়েছিল পুরান ঢাকার অজানা কোনো গলির আয়তক্ষেত্র। যে জেনেছিল জোনাকি কেন আলো জ্বেলে আর পাখিরা কেন ডাকে। এরপর তার কাছে প্রকৃতির এই রূপ অসহ্য ঠেকেছিল। একরাত বনের মধ্যে কাটিয়ে যে নিজেকে ভিন্নভাবে আবিষ্কার করেছিল। আবার প্রেমিকার কাছে চরম সত্য শুনে যে দিশেহারা হয়ে গেছিল।
তারা সবাই যে যার পথে, যে যার চিন্তায় মশগুল আছে। যার এভাবে এই ধরণী শুধুই মানুষের নাকি ততটাই পশুপাখিদেরও। ভাবতে ভাবতে তাদের দুনিয়ায় মহামারি এসেছে। তবুও সাফ সুতোরো করে তাদের জীবন চলছে সেই বেসাতিতে যাকে বসতি বলা যায় না।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝বেসাতি ও বসতি❞ ইমরান খানের প্রকৃতিকেন্দ্রিক অদ্ভুত এক উপন্যাস।
অদ্ভুত কেন বলছি?
কারণ সচরাচর আপনি যা পড়েন তার থেকে অনেক ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা হয়েছে বসতির আলাপ নিয়ে এই বেসাতি।
উপন্যাসের কলেবর বিশাল কিন্তু কলেবরের কুশীলব স্বল্প। তারাই তাদের জন্ম থেকে বর্তমান বিচরণ করেছে। স্মৃতি কাতর হয়ে প্রশ্ন করেছে ধরণীকে। প্রশ্ন করেছে অট্টালিকায় বাসরত মানুষকে। যারা নিজের তাগিদে, নিজের সুবিধায় ধ্বংস করছে বন, পশুপাখি। যাদের কারণে পশুপাখি নিজেদের বিবর্তন করছে টিকিয়ে রাখতে।
লেখক সামাজিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক, কিংবা অনেকটা অসামাজিকতার আশ্রয় নিয়ে বর্ণনা করে গেছেন পুরো উপন্যাস।
কোথাও কোথাও বর্ণনার ধার এতই বেশি ছিল যে মাথায় গুবলেট পেকে গেছিল। ভারী বর্ণনা যেমন অবাক করছিল তেমনি সে বর্ণনার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতেও বেগ পেতে হয়েছিল।
লেখক তার লেখনীর নিপুণ দক্ষতায় উপন্যাসের প্রতিটা অধ্যায় বর্ণনা করেছেন। সবথেকে চমকপ্রদ ছিল অধ্যায়গুলোর নাম। নামের সাথে বর্ণনার মিল ছিল। কেন অধ্যায়ের নাম ওরকম দেয়া হয়েছিল পড়তে গিয়ে সেটা বুঝতে সমস্যা হয়নি।
লেখক এখানে মানবকেই শুধু চরিত্রের বেড়াজালে রাখেননি। চরিত্র হিসেবে ধরা দিয়েছিল গাছ, মাছ, মুরগি, সাপ, বাঘডাস, বেজি, বনবেড়াল, বানর, শুশুক, কুকুর, কুকুরছানা, পিঁপড়া, টুনটুনি সহ অনেক অনেক প্রাণী। তারাও এই ইকোসিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ সেটা লেখক প্রতিটি বাক্যে প্রকাশ করেছেন। মানুষেরও সেইসব নির্বাক প্রাণী কিংবা পাখি থেকে শেখার আছে, তাদেরও অধিকার আছে সেটা লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যক্ত করেছেন।
মানুষের ক্রিয়াকর্মের ফলে প্রকৃতি ব্যাপকহারে তার ভারসাম্য হারাচ্ছে, হারাচ্ছে প্রাণীদের বাসস্থান। মানুষের আনন্দ, উদযাপনের ফল হিসেবে হার্টফেল কিংবা স্ট্রোক করে প্রাণ হারাচ্ছে অবলা প্রাণী। তবুও আমাদের কোনো হেলদোল নেই। প্রকৃতি ছাড় দেয় কিন্তু ছেড়ে দেয়না। যদি প্রকৃতি তার দান উঠিয়ে নেয় দুর্বল হোমো স্যাপিয়েন্স কোথায় যাবে? ক্ষমতা, বিজ্ঞান আর চাকার জোরে মানুষ প্রকৃতিতে নিজের প্রভুত্ব এনেছে। কিন্তু সেটা কয়দিন? যখন গাছ পালা ছাড়া মানুষ বাঁচতে শিখবে তখন কি একটা গাছকেও সে বাঁচতে দিবে না!
পুরো উপন্যাস জুড়ে সংলাপ থেকে আধিক্য পেয়েছে বর্ণনা। এই কারণেই পাঠ অভিজ্ঞতা হয়তো বেশি ভালো। গম্ভীর বিষয় হলেও পড়তে খুবই উপভোগ্য লেগেছে। এমন ভিন্ন জাতের বই পড়লে ভাবনার জগৎ প্রসারিত হয়।
বইটা পড়ার আগে লেখকের নাম জানতাম না। পড়ার পর মনে হলো তিনি যথেষ্ট আন্ডাররেটেড একজন লেখক। এত চমৎকার বর্ণনা দিয়ে যে পাঠককে অভিভূত, মুগ্ধ করতে পারেন তাকে নিয়ে আরও বেশি আলোচনা, পর্যালোচনা হওয়া উচিত।
উপন্যাসের মাঝের থেকে শেষের দিকে লেখক শরীরী চাহিদা আর যৌনতাকে অনেক বেশি মোটাদাগে দেখিয়েছেন। আমার কাছে সেগুলো খুব একটা ভালো না লাগলেও সেই স্থূললতাকে লেখক বেশ দারুণভাবেই প্রকাশ করেছেন।
আক্ষেপ রয়ে গেল নদী আর গ্রাম জীবন ছেড়ে জীবনের তাগিদে সাত্তারের জীবনের কথা উপন্যাসে এক পর্যায়ে এসে একেবারেই থেমে গেল। আরও ব্যাখ্যা বা তাকে নিয়ে আরও বর্ণনা থাকলে মন্দ হতো না।
বৃহৎ কলেবরের ইতি লেখক নিজের মতোই টেনেছেন। মহামারীর দিনগুলো আর স্থূলতার মাঝেই জীবন নদী ভেসে যায় তাই দেখিয়েছেন। দারুণ একটা উপন্যাস পড়লাম।
বেসাতি ও বসতি উপন্যাসের প্রচ্ছদের অন্যতম মূল চরিত্র হলো একজোড়া বেজী। শুধু বেজী না, শিয়াল, বাঘডাস, সাপ, মাছ, গাছ, চড়ুই পাখি এবং আরো অনেক পার্শ্বচরিত্রও আছে। পৃথিবীতে কী পরিমাণ প্রাণী আছে আমি জানি না। গুগল করতে ইচ্ছা করছে না এই মুহূর্তে। তবে এই বিষয়ে সন্দেহ নেই যে মানুষ ছাড়াও কিছু প্রাণী আছে পৃথিবীতে এবং পৃথিবীটা শুধুমাত্র মানুষের বসবাসের জন্যে তৈরি হয় নি। মানুষ না থাকলে পৃথিবীর কিছু এসে যাবে না।
একটা খরগোশ অথবা একটা গরু অথবা একটা মানবশিশুর গলায় যখন ছুরি ধরা হবে, তখন কারো প্রতিক্রিয়াই ভিন্ন হবে না। সবাই তখন ফিরে যাবে জীবনের মৌল অনুভূতিতে। এই মৌল অনুভূতি অনুভব করার বড় একটা প্রয়োজন আমাদের পড়ে না। কারণ, প্রকৃতি এখনও আমাদের অফুরন্ত দিয়ে যাচ্ছে। পাকুড় গাছের দেহ, মহিষের শিং আর মাটির গভীর থেকে উত্তোলন করা খনিজ থেকে আমরা আমাদের যাবতীয় প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলে আরো আগ্রাসী হয়ে যাচ্ছি। নিজেদের চাহিদা আর সুবিধার বাইরে চিন্তা করার খুব একটু দরকার পড়ে না আমাদের। একশজনের মধ্যে নিরানব্বই জনই হয়তো চিন্তা করে না। কিন্তু এই বইয়ের লেখক ইমরান খান ভাবেন এসব।
বিপন্নতার সাথে আমাদের পরিচয় নেই, এমন না। তবে আমরা শিখে গেছি নানা কৌশল। মহাবিশ্ব যতই বড় হোক, পৃথিবী যতই একটা ছোট্ট নীল বিন্দুর মতো হোক, মানুষ যখন নিজের বিপন্নতাকে আবিষ্কার করে, তার কাছে সবই তুচ্ছ। স্বাভাবিকভাবে জন্ম নিয়ে খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থানের জন্যে নিজেকে সঁপে দিয়ে একটা জীবন কাটালে এই বিপন্নতার সাথে হয়তো কখনও পরিচয় হবে না। কিন্তু এই অনুভূতির সাথে পরিচিত না হয়েই কি মরে যাওয়া উচিত হবে কারও? যদি মানুষ মরে যাওয়ার পর আবার জন্ম নিতে পারে জলপাই গাছের শাখায় ছোট্ট একটি বাবুই পাখি হিসেবে, অথবা গুঁইসাপ হিসেবে ঘুরে বেড়াতে পারে বনেবাঁদারে, তখন না হয় বলতে পারি, “এই জন্মটা না হয় কাটিয়ে যাই বড় কোনোরকম অস্তিত্বের সংকটের সাথে পরিচিত না হয়েই!” বহু মানুষ তো এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে, আসছে, যাচ্ছে, খাচ্ছে।
কিন্তু কাউকে কাউকে এই দায়িত্ব নিতেই হবে। যেহেতু মানুষ খাদ্যশৃঙ্খলের উচ্চতরর চেয়েও উচ্চতম অবস্থানে বসতে পারছে, বদলাতে পারছে সব ইচ্ছেমতো; বিলুপ্তির দায়ভার মানুষের কাঁধেই। তাই গোপন প্রেমিকার উন্মত্ত অতীত জেনে ফেলার মনোবেদনার পাশাপাশি দূষণে আক্রান্ত নদীতে ভেসে ওঠা মাছদের দলের কথাও ভেবে বিপন্ন হবার অনুভূতিটা আমাদের মনে জন্ম নিক।
বেসাতি ও বসতি এই বহুমাত্রিক বিপন্নতার আখ্যান।
বইয়ের কলেবর অনুসারে চরিত্র কম। অনর্থক সাবপ্লট আর নানাবিধ মানুষের আনাগোনা নেই। তবে, একটি অধ্যায়ে বস্তি বিষয়ক বিশাল কাহিনী ফেঁদে পরবর্তীতে ঐসব চরিত্র নিয়ে আর এগুন নি তিনি। তিনি কি পরিকল্পনা বদলেছিলেন? স্বরূপার নাম মাঝেমধ্যে সাবিহা হয়ে গেছে। পরবর্তী সংস্করণে এটা ঠিক করতে হবে।